# “ঘৃণায় আমি এক মুসলিমের নাক ও পাঁজর ভেঙে দি*ছিলাম” - ব্রাজিলিয়ান যুবকের ইসলাম গ্রহণ

- Language: bn
- Published: 2026-09-19
- Canonical: https://blog.towardseternity.com/bn/blog/ami-ek-muslimer-cule-an-dhrize-dizechilam-islambidweshee-theke-muslim
- Source video: https://www.youtube.com/watch?v=HnueNtrXVtY
- Channel: Towards Eternity

This is the cleaned transcript of the source video. The speech is unaltered.

---

আমি একটি ক্যাথলিক বৌদ্ধ পরিবার থেকে এসেছি। ইসলাম সম্পর্কে ১ম শুনেছিলাম 9/11 এর সময়। মুসলিমরা ছিল সন্ত্রাসী। মুসলিমরা ভীষণ বিপজ্জনক। মোহাম্মদ নামে এক ছেলে ছিল যে আমার বেশ বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। "এই দোস্ত, তুমি ভুল লোকের সঙ্গে লাগতে এসেছ। আর তার উপর তুমি একজন মুসলিমও। তাই তোমাকে তোমার জায়গা বুঝিয়ে দিচ্ছি।" শেষ পর্যন্ত আমি ওর দুই চোখের নিচে কালশিটে ফেলে দিই, নাক ভেঙে দিই, এমনকি একটি পাঁজরও ভেঙে দিই। তার শার্ট রক্তে একেবারে ভরে গেল। আমরা আপনাকে আমাদের ওয়ালিমায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি যেটি মরক্কোতে অনুষ্ঠিত আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। তার উপর সে তার স্বামীকেও সঙ্গে এনেছিল, যার নাম ছিল সিমু মোহাম্মদ। তিনি ছিলেন লম্বা দাড়িওয়ালা একজন দাই, অর্থাৎ ইসলামের দাওয়াতদাতা। আর আমি তখন শুধু টিভির দিকে তাকিয়ে চ্যানেল পাল্টাচ্ছিলাম। ধরুন, রাত প্রায় ৩টা হবে। আমি শুনলাম এই ভাইটি ঘুম থেকে উঠছেন। তারপর যে আমি শুনলাম, "আল্লাহু আকবার, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।" আমি থমকে গেলাম। ভয়ে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। কারণ আমরা তো সবাই জানতাম আল্লাহু আকবারের পর কী হয়। একটা বিস্ফোরণ ঘটে। সিমু মোহাম্মদের ছায়াটা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। আমি মেঝের করমোর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম আর তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন। আমার মনে আছে তার হাতটা খুব স্পষ্ট, বড় আর ভারী মনে হচ্ছিল। আমার সামনে এগিয়ে আসছিল। মরক্কো থেকে ফিরে আসার পর ইসলামের প্রতি আমার আগ্রহ যেন ১০ গুণ বেড়ে গেল। কেউ কোরআন নিয়ে বাজে কথা বলতে শুরু করলেই আমি বলতাম, "শেষ কবে বইটা খুলে দেখেছ?" কখনও না। "তাহলে চুপ থাকো।" সিনেমাটা দেখা শেষ করেই আমি ওসামাকে ফোন করে বললাম, "ওসামা, ভাই, আমি এখন একজন মুসলিম।" আসসালামু আলাইকুম, ভাই এদুয়ার্দো দোস আনজোস। Towards Eternity-তে আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনাকে পেয়ে আমরা সত্যিই খুব আনন্দিত। ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ। আমি সম্মানিত বোধ করছি। আমি শুরু করতে চাই এই প্রশ্ন দিয়ে— এদুয়ার্দো দোস আনজোস কে?

আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলতে পারেন? আমার জন্ম ব্রাজিলে আর ২ বছর বয়সে আমি কানাডায় চলে আসি। আমি একটি ক্যাথলিক বৌদ্ধ পরিবার থেকে এসেছি আর বড় হয়েছি মুসলিমদের ঘৃণা করতে করতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি ইসলামেরই প্রেমে পড়ে যাই। বিশ্বাসের দিক থেকে আপনার জীবন কেমন ছিল? আপনি কিসে বিশ্বাস করতেন?

হ্যাঁ, আমি ব্রাজিলিয়ান ক্যাথলিক পরিবার থেকে এসেছি। অন্যদিকে, আমার বাবা কিছুটা বেশি ধর্মচর্চাকারী ক্যাথলিক ছিলেন। তবে তিনি এমন টাইপের ছিলেন, রবিবার গির্জায় যেতেন আর সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে ভুলেই যেতেন যে তিনি ক্যাথলিক। আমার মা বৌদ্ধ ছিলেন। আমাদের পরিবারে সেই প্রভাবটা ছিল। ধর্মের ক্ষেত্রে আমার বাবা নিজের মতো করে কিছুটা মিশ্রণ তৈরি করেছিলেন বলতে পারেন। তিনি বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা একসঙ্গে মিশিয়েছিলেন। তাই সত্যি বলতে, বিশ্বাসের ব্যাপারে আমি বেশ বিভ্রান্ত হয়েই বড় হয়েছি। আমার কাছে ধর্ম ছিল খুবই রহস্যময় একটা বিষয়। বিষয়টা আগ্রহযোগ্য লাগত কিন্তু খুব গুরুত্ব দিয়ে নিতাম না। তবে ঈশ্বরকে আমি মনে করতাম এক সর্বশক্তিমান, সর্বব্যাপী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, যার কাছে জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে ফিরে যেতে হয়। কিন্তু এর বাইরে বিষয়টা আর এগোয়নি। সত্যি বলতে, খ্রিষ্টধর্ম নিয়েও আমার ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সবকিছুর অর্থ খুঁজে পাওয়ার আমার যে প্রয়োজন ছিল, খ্রিষ্টধর্ম তা মেটাতে পারছিল না। বুঝতে পারছেন?

তাই আমার কাছে ঈশ্বর তিন এই ধারণাটাই অসংগত মনে হত। এটার কোন যৌক্তিক অর্থ আমি খুঁজে পেতাম না। ইসলাম সম্পর্কে প্রথম কীভাবে শুনেছিলেন? আপনার কি কোনো পূর্বধারণা ছিল?

আমার ইসলাম গ্রহণের গল্পের মজার বিষয় হল, ইসলাম সম্পর্কে ১ম বার আমি শুনেছিলাম 9/11 এর সময়। অন্তত তখনই ১ম বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করি। মুসলিমরা ছিল সন্ত্রাসী। মুসলিমরা ছিল বিপজ্জনক। আমার ধারণা ছিল এরা বর্বর মানুষ, যাদের জেলে পাঠানো উচিত, না হলে আরও খারাপ কিছু। অধিকাংশ মানুষের মতো আমিও বুদ্ধিবৃত্তিক শর্টকাট নিয়েছিলাম আর শেষ পর্যন্ত আমি চরম ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলাম। এসব দৃশ্য দেখার পর স্কুলে যখন মুসলিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাৎ হত, তাদের প্রতি আমার রাগ ছিল, ঘৃণাও ছিল। আর আমি যেন তাদের জায়গা বুঝিয়ে দিতে চাইতাম। তাই স্কুলে মুসলিমদের ভয় দেখানো ও বুলিং করার ক্ষেত্রে আমি প্রায় সামনের সারিতে থাকতাম। বিশেষ করে একদিন ক্লাসে বসে থাকার কথা মনে আছে। আমার ঠিক সামনে আব্দুল নামে এক ছেলে বসে ছিল। শুধু সে মুসলিম বলেই আমি তার প্রতি প্রচণ্ড বিরক্ত ছিলাম। ভাবছিলাম কী করলে ওকে জায়গা বুঝিয়ে দিতে পারি। ভাবলাম ওর চুলে আগুন ধরিয়ে দিই না কেন?

তাই একটা লাইটার দিয়ে সত্যিই ওর চুলে আগুন ধরিয়ে দিলাম। সেদিনের পর সে স্কুল ছেড়ে যায় আর আমরা তাকে আর কখনো দেখিনি। এমনও মনে আছে বাসে আত্মঘাতী বোমারু অভিনয় করতাম আর ভুম!

মানুষকে হাসানোর জন্য। আর মুসলিমদের এমন অনুভব করাতে, "এই, তোমরা তো বোকা। নিজেদের ধর্মের নামে নিজেরাই মর।" এই ধরনের কথা বলে মূলত তাদের উপহাস করার সুযোগ খুঁজতাম। মোহাম্মদ নামে এক ছেলে ছিল যে আমার বেশ বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। আর আমি সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ওকে বুঝিয়ে দিতে চাইলাম যে, "এই বন্ধু, তুমি ভুল লোকের সঙ্গে লাগতে এসেছ। আর তার উপর তুমি একজন মুসলিমও। তাই তোমাকে তোমার জায়গা বুঝিয়ে দিচ্ছি।" শেষ পর্যন্ত আমি ওর দুই চোখের নিচে কালশিটে ফেলে দিই, নাক ভেঙে দিই, এমনকি একটা পাঁজরও ভেঙে দিই। তার শার্ট জুড়ে রক্ত লেগেছিল। আর আমার মনে আছে, অ্যাড্রেনালিন তীব্র স্রোত আমার শরীর জুড়ে ছুটছিল। আর পুরো ঘটনাটা যেন এক মুহূর্তেই ঘটে গেল। আমাকে গ্রেফতার করতে পুলিশ স্কুলে আসে। পরদিন গণিতের ক্লাস থেকে আমাকে নিয়ে যায় আর আমাকে হাজতে যেতে হয়। আমার বাবা আমাকে নিতে এসেছিলেন। এমনকি এই ঘটনার জন্য কিশোর আদালতেও যেতে হয়েছিল। আমাকে কমিউনিটি সার্ভিস করতে হয়েছিল এবং গ্রুপ থেরাপিতেও অংশ নিতে হয়েছিল, যাতে আশা করা যায় একদিন আমি বড় হয়ে সহিষ্ণুতামুক্ত একজন মানুষ হতে পারব। আর তখন স্কুলও আসলে আমার পক্ষ নিয়েছিল। তারা আমার জন্য একজন আইনজীবীর ব্যবস্থা করেছিল এবং তার বদলে আমার পক্ষই নিয়েছিল। ভাবলে বিষয়টা সত্যিই বেশ দুঃখজনক। কারণ আমি নিজেকে কখনো সহিষ্ণু মানুষ হিসেবে ভাবিনি। কিন্তু প্রোপাগান্ডা মানুষের সঙ্গে ঠিক এটাই করে। আমি সমস্যাগ্রস্ত একটা ছেলে ছিলাম। কিন্তু এতটা সহিংসতা কখনোই আমার স্বভাবের অংশ ছিল না। আপনার মুসলিম হওয়ার গল্পটা কীভাবে শুরু হয়েছিল?

হ্যাঁ, সত্যি বলতে আমার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটা আমার কাছে এক অলৌকিক ঘটনা। জীবনের খুব অন্ধকার একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। জীবনের প্রতি আমার আগ্রহটাই হারিয়ে গিয়েছিল। আমি আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলাম না। কিন্তু মনে হতো কোন গাড়ি যদি আমাকে ধাক্কা দিত তাহলে যেন অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত। তবে আমার ভেতরে একটা সীমারেখা ছিল, যার কারণে আমি কখনো এমন কোন বোকামি করতে পারতাম না। কারণ আমার একটাই কথা ছিল, আমি আমার মাকে কাঁদাতে পারব না। কিন্তু সেই চরম হতাশার মুহূর্তগুলোতে যখন নিজের অস্তিত্বকেই একেবারে অসার মনে হতো, আমার মনে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে, চাঁদের দিকে চেয়ে আমি ঈশ্বরের কাছে সত্য জানতে চেয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার ১ম প্রার্থনা। আমি তাঁর কাছে চেয়েছিলাম, তিনি যেন আমাকে সত্যের সন্ধান দেন এবং এমন কাউকে আমার কাছে পাঠান যে আমাকে এমন এক গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে, যেখানে আমি সেই গোষ্ঠীরই একজন জীবনসঙ্গী পেতে পারি যে সারাজীবন আমার পাশে থাকবে। সে সময় এটাই ছিল আমার চারপাশের পরিবেশ। প্রতিদিন রাস্তায় থাকতাম স্কেটবোর্ডিং বন্ধুদের সঙ্গে। বোকামি করতাম, গ্রাফিতি আঁকতাম, ধুমপান আর মদ্যপান করতাম। এর কয়েক বছর পর সেকেন্ডারি ফাইভ পড়ার সময় উসামা নামে এক ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয়। উসামা ছিল খুবই মজার, প্রাণবন্ত, রসিক ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের একজন। হঠাৎ করেই যেন এসে হাজির হয়েছিল। সে ছিল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। আমার জীবনে ১ম বার আমাদের হাই স্কুলে কোন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে আসতে দেখলাম। তাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল ছেলেটি একটু অদ্ভুত কিন্তু বেশ মজার, আকর্ষণীয়। একদিন ফুটবল খেলার পর আমরা পানি খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম আর উসামা ছিল আমার ঠিক সামনে। একসময় সে পানি খেতে যাচ্ছিল কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে থেমে গেল। আমি খুব বিরক্ত হয়ে গেলাম কারণ আমার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেয়েছিল। আমি বললাম, "ভাই, সামনে থেকে সরো তো। আমি পানি খাব। তুমি এখানে করছোটা কি?" সে বলল, "হ্যাঁ, আমি রোজা রেখেছি। আর জানো আমরা মুসলিমরা সত্যিকারের পুরুষ। আমাদের আত্মসংযম আছে। পুরো এক মাস আমরা খাবারও খাই না, পানিও পান করি না। তোমরা খ্রিস্টানরা দুর্বল। যখন যা ইচ্ছা তখন তাই করো। তারপরও নিজেদের সত্যিকারের ঈমানদার ভাবো। আসল ঈমানদার আমরা।" আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি বলতে চাচ্ছো আমি যদি সত্যি রোজা রাখতে চাই তাহলে পারব না?" সে বলল, "ঠিক তাই।" সেই মুহূর্তে আমি ঠিক করলাম এই ছেলেকে প্রমাণ করে দেব সে যা পারে আমিও খুব সহজেই তা করতে পারি। তাকে প্রমাণ করার জন্যই দুপুরের খাবারের সময় তার সঙ্গে থাকতে শুরু করলাম। বাড়ি ফিরে অবশেষে খাওয়ার সময় এলো। আর তখন এমন কিছু ঘটল যা আমাকে ভেতর থেকে বদলে দিল। আমি এতটাই ক্ষুধার্ত ছিলাম যে ঘরে একা বসে খেতে খেতে খাবার খাওয়ার জন্য এমন কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম যে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম। কাঁদতে কাঁদতে শার্ট দিয়ে চোখের পানি মুছছিলাম। তখন শার্টের দিকে তাকিয়ে মনে হলো আমার তো স্কুল ইউনিফর্ম আছে। কারণ আমি প্রাইভেট স্কুলে পড়তাম। তারপর এক চিন্তা থেকে আরেক চিন্তা আসতে লাগল। আমি ভালো মানের শিক্ষা পাচ্ছি তো?

হা ঈশ্বর! একটু দাঁড়াও। আমার মাথার উপর একটা ছাদও আছে। ছাদের দিকে তাকাতে তাকাতে আমি আরও গভীরে ডুবে গেলাম সেই আবেগের উত্থান-পতনের ভেতর। তারপর নিজেকেই জিজ্ঞেস করলাম, এসবের খরচ কে দেয়? আমার মা। আমার তো একজন মা আছে। শেষ কবে মাকে জড়িয়ে ধরেছি? শেষ কবে আমি মাকে বলেছি যে আমি তাকে ভালোবাসি?

আমি ছুটে গেলাম মায়ের ঘরের দিকে তাকে ভালোবাসার কথা বলতে। আমি বললাম, "মা আমাকে মাফ করে দাও। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আরও ভালো ছেলে হব।" আমি তখন হাউমাউ করে কাঁদছি। আর মা আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "এদুয়ার্দো, তুমি কি মাতাল?" আমি বললাম, "না মা, আমি মাতাল নই। হঠাৎ আমার কেবল উপলব্ধি হচ্ছে যে আমি ভালো ছেলে নই আর আমি-" বদলানোর চেষ্টা করব। এই উপলব্ধি নিয়ে আমার ঘরে ফিরে গেলাম আর কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। এই পরিবর্তনশীল শক্তিশালী ধর্ম থেকে আর কী শিখতে পারি?

আমি যেন ধীরে ধীরে এর কাছাকাছি যেতে শুরু করলাম। এই ধর্মকে নিজের জীবনে অনুভব করতে করতেই এর পরিবর্তনের শক্তি ইতিমধ্যেই আমার হৃদয়কে কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দিচ্ছিল। আমার ক্ষত আর মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক দুটোই সারিয়ে তুলছিল। আর কী আমাকে এত ভালোভাবে বদলে দিতে পারে? আর কিসে আমাকে আরও ভালো মানুষ করে তুলতে পারে?

আমি ওসামাকে আরও ভালোভাবে জানতে শুরু করলাম। তার গল্প সম্পর্কে যত জানছিলাম, তাকে ততই আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। যদিও আমার আশপাশের সব বন্ধুই এতে প্রচণ্ড বিরক্ত ছিল। বন্ধুরা আমাকে বারবার বলত, "এই ছেলেটা খুব বিরক্তিকর। ওর সঙ্গে ঘুরো না। তুমি তো জনপ্রিয়দের দলে আছো। ওর সঙ্গে থাকলে তোমার সামাজিক মর্যাদা কমে যাবে।" আমি বলতাম, "কিন্তু ছেলেটাকে আমার ভালো লাগে। কেন জানিনা কিন্তু ভালো লাগে।" একদিন সে আমাকে ফোন করে বলল, "ভাই, আমার বোন বিদেশী শিক্ষার্থী হিসেবে মন্ট্রিলে একা আছে। আজ তার জন্মদিন বলে সে খুব মন খারাপ করে আছে আর উদযাপন করার মতো কেউ নেই। ভাবছিলাম আমরা ওর জন্য ছোট কিছু আয়োজন করতে পারি।" আমি বললাম, "হ্যাঁ, কোন সমস্যা নেই। তুমি আমার বন্ধু। আমি ব্যবস্থা করছি। বাবার মেক্সিকান ব্রাজিলিয়ান রেস্তোরাঁয় ওকে ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দেব। ওর জন্য কিছু আয়োজন করব। ও খুশি হবে।" তারপর সরাসরি চলে আসি সেই দিনে। রেস্তোরাঁয় প্রথমবার তার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হলো। তখন দেখলাম সে হিজাব পরেছে আর সেটা আমাকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তার উপর সে তার স্বামীকেও সঙ্গে এনেছিল, যার নাম ছিল সিমু মোহাম্মদ। তিনি ছিলেন লম্বা দাড়িওয়ালা একজন দায়ী। অর্থাৎ মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করাই ছিল তার কাজ। মনে আছে, এতে আমি বেশ বিরক্ত হয়েছিলাম কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। কারণ ওসামা যেমন বলেছি, তখন আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। সে তখন আমার সেরা বন্ধুই ছিল। তাই বন্ধুত্বের খাতিরে বিষয়টা সহ্য করেছিলাম। ভেবেছিলাম এটাই হয়তো তাদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমি জানতাম না যে তাদের আরও পরিকল্পনা ছিল। তবে আল্লাহরও একটি পরিকল্পনা ছিল। তারা আমাকে বলল, "এদুয়ার্দো, আপনি আমাদের এত আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করেছেন। আমাদেরও এর প্রতিদান দেওয়া উচিত। তাই আমরা আপনাকে শেরব্রুকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, যেটি মন্ট্রিঅল থেকে প্রায় ১.৫ ঘণ্টার দূরত্বে একটি শহর। তার উপর আমরা আপনাকে আমাদের ওয়ালিমায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, যেটি হচ্ছে মরক্কোতে আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠান। আপনি আমাদের এত সম্মানের সঙ্গে আপ্যায়ন করেছেন, তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।" আমি ওসামার দিকে তাকিয়ে বললাম, "হ্যাঁ, অবশ্যই। চলো যাই।" কয়েক সপ্তাহ পর আমরা শেরব্রুকে গেলাম। আমি তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক, মাত্র ১৬ বছরের এক কিশোর। জীবনে প্রথমবার বাড়ির বাইরে রাত কাটাচ্ছি আর পুরো পরিস্থিতিটা নিয়ে ভীষণ অস্বস্তিতে ছিলাম। তবুও ওসামা আমার বন্ধু বলে বন্ধুত্বের খাতিরে থেকে গেলাম। ওসামার বাবা আমাকে বিমানবন্দর থেকে নিতে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেকে কখনো ওসামার বাবা হিসেবে পরিচয় দেননি। তিনি বললেন, "আমি আপনার সেবা করতে এসেছি। আপনাকে নিজের ছেলের মতোই দেখাশোনা করব।" তিনি খুব সাধারণ পোশাক পরে ছিলেন। গাড়িটাও ছিল সাধারণ। তার আচরণ ছিল অসাধারণ মার্জিত। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিলাম আর পুরোপুরি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার বিস্ময় আরও বেড়ে গেল যখন দেখলাম ওসামার বাবা হাঁটু গেড়ে মালিকে ফুল লাগাতে সাহায্য করছেন। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে রাঁধুনিকেও কাজে সাহায্য করছেন। অথচ বিয়ের অনুষ্ঠান প্রস্তুতির জন্য তার বিশাল একটি টিম কাজ করছিল। কারণ অনুষ্ঠানটা তাদের বাড়ির প্রাঙ্গণেই হচ্ছিল। আমি দেখছিলাম এই মানুষটির ভেতর থেকে কী অসাধারণ বিনয় প্রকাশ পাচ্ছে। অথচ স্পষ্টই বোঝা যায় তিনি যথেষ্ট সম্পদশালী একজন মানুষ। তারপরও কী বিনয়ের সঙ্গে সেবকের মতো আচরণ করছেন। এটা একজন সত্যিকারের পুরুষ কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমার ধারণাই ভেঙে দিল। সাফল্য সম্পর্কে আমার ধারণাটাও বদলে গেল। তবুও আমার মনে ভীষণ সন্দেহ আর আতঙ্ক কাজ করছিল। ভাবছিলাম আমি এদের আসল উদ্দেশ্য বুঝে ফেলেছি। ওনারা শুধু আমার সচেতন ভাবটাকে কমিয়ে দিতে চাইছে, যাতে আমি ঘুমিয়ে পড়লে আমার গলা কেটে দিতে পারে। এই ভয় আর সন্দেহের কারণে এক মুহূর্তও স্বস্তিতে থাকতে পারছিলাম না। নিজেকে বললাম, "বোকামি করো না।" এর মধ্যে তারা বারবার জোর করছিল যেন আমি মাস্টার বেডরুমে গিয়ে ঘুমাই। কারণ আমি ছিলাম তাদের সম্মানিত অতিথি। শেষ পর্যন্ত আমি বললাম, "আমার রাত জাগার অভ্যাস আছে। আমি সোফাতেই শোব। তাতে আমার কোন সমস্যা নেই।" এভাবেই শেষ পর্যন্ত সেই তর্কে আমি জিতলাম। আর আমি তখন শুধু টিভির দিকে তাকিয়ে চ্যানেল পাল্টাচ্ছিলাম। ঠিক কতটা বাজে মনে নেই। তবে রাত প্রায় ৩টা হবে। আমি শুনলাম এই ভাইটি ঘুম থেকে উঠছেন। আর যখনই আমি বুঝলাম যে তিনি ঘুম থেকে উঠতে শুরু করেছেন, আমার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল। তারপর যেই শুনলাম, "আল্লাহু আকবার", আমি যেন হিম হয়ে গেলাম। ভয়ে আমার অবস্থা খারাপ। কারণ আমরা তো সবাই জানতাম আল্লাহু আকবরের পর কী হয়। টিভিতে তো সারাক্ষণই দেখানো হয়। এরপর বিস্ফোরণ ঘটে। আমার মনে হচ্ছিল এই লোকটা বুঝি কোন আধ্যাত্মিক আচার করছে। তারপর এসে আমার গলা কেটে তার ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে আমাকে উৎসর্গ করবে বা সে যাই বিশ্বাস করুক না কেন। আমি জানতাম না আসলে কী, তবে ভালো কিছু নয়। কারণ আল্লাহু আকবার কথাটার সঙ্গে আমার মনে খুব নেতিবাচক ধারণা জড়িয়ে ছিল। আমি একেবারেই নড়তে পারছিলাম না। নিজেকেই বললাম, "এদুয়ার্দো, তুমি এখানে কেন এলে?

তুমি কি বোকা?

তুমি তো জানো এরা বিপজ্জনক। আর এখন এখানে তুমি আটকে গেছো। আর একটু পরেই তোমাকে মেরে ফেলা হবে।" মনে আছে আমি বিশেষভাবে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম, তিনি যেন আমাকে এই অসম্ভব পরিস্থিতি থেকে বাঁচান। আমি প্রার্থনা করে ঈশ্বরের সাহায্য চাইছিলাম। সিমু মোহাম্মদের ছায়াটা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। মেছের কর্মর শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম আর তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন। আমার মনে আছে তার হাতটা খুব স্পষ্ট, বড় আর ভারী মনে হচ্ছিল। আমার সামনে এগিয়ে এলো। তারপর তিনি একটা কম্বল নিয়ে আমাকে ঢেকে দিলেন। লাইট বন্ধ করলেন, টিভি বন্ধ করলেন আর আবার ঘুমাতে চলে গেলেন। সেই মুহূর্তেই আমার হৃদয় নিশ্চিত হয়ে গেল, এই মানুষগুলো কোনভাবেই খারাপ হতে পারে না। আমার মা সবসময় বলতেন, "তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও তুমি আসলে কেমন মানুষ, তাহলে নিজেকে দেখো। যখন তোমাকে কেউ দেখছে না, সেটাই তোমার প্রকৃত সত্তা।" আর এখানে এই ভাইটি রাতের গভীরে যখন কেউ তাকে দেখছে না, তখন ঘুম থেকে উঠে নিজের রবের সঙ্গে কথা বলছেন, তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করছেন। আর সেই সংযোগই তাকে অনুপ্রাণিত করছে নিজের অতিথির প্রতি আরও ভালো আচরণ করতে। যদিও আগেই তিনি আমাকে প্রথম শ্রেণীর ভিআইপির মতো আপ্যায়ন করেছিলেন। তখন আমি নিজের উপর ভীষণ লজ্জা অনুভব করলাম। কারণ জানতাম আমাকে কুসংস্কারপ্রবণ হতে শেখানো হয়নি। জানতাম আমাকে বর্ণবাদী হতেও শেখানো হয়নি। আর জানতাম আমি এর চেয়েও ভালো মানুষ হতে পারি। আমি ভেতর থেকে সম্পূর্ণ কিন্তু শব্দটা হবে লজ্জিত হয়ে পড়েছিলাম। এটাই ছিল ১ম বার যখন আল্লাহ ইসলামের প্রতি আমার হৃদয় নরম করে দিলেন এবং মুসলিমদের প্রতিও। পরদিন সিমু মোহাম্মদ বললেন, তিনি জুমার নামাজ পড়তে যাচ্ছেন, যেটি শুক্রবার মুসলিম পুরুষদের জন্য ফরজ নামাজ। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি তার সঙ্গে যেতে চাই কিনা। আমি বললাম, অবশ্যই আমি আপনার সঙ্গে যেতে চাই। সেটাই ছিল আমার জীবনে ১মবার কোন মসজিদে যাওয়া। আর মনে আছে আমি পুরোপুরি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম সবাইকে এমন শান্ত ও সংযত অবস্থায় দেখে। সেই সাধারণ পরিবেশে মানুষ নিজেদের কপাল, মুখ, শরীরের সবচেয়ে সম্মানিত অংশ মাটিতে রেখে নিজেদের রবের ইবাদত করছিল। জীবনে ১মবার নামাজ পড়লাম আর মনে আছে ভেতর থেকে যেন নতুন প্রাণ পেলাম। আমি জানতাম না কী করছি, কিন্তু আল্লাহ আমাকে এমন একটি পরিবেশে নিয়ে এসেছিলেন যেখানে আমার ভেতরে সত্যিই মনে হচ্ছিল আমি যেন আবার জীবনে ফিরে আসছি। কোন ছবি ছিল না, কোন চেয়ার ছিল না, কোন বেঞ্চও ছিল না। সেখানে এমন কোন কিছুই ছিল না যা মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাবে। মনোযোগ কার দিকে?

আল্লাহর দিকে। তারপর ওসামার ভাই অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে আমাকে একজন খ্রিষ্টান হিসেবে এমন অনুভব করালেন, যেন তার কাছে আমিও একজন সম্মানিত মানুষ। কারণ তিনি বললেন, ঈসা আলাইহিস সালামের নাম কুরআনে উল্লেখ হয়েছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামের তুলনায় বহুবার। তিনি আরও বললেন, আমাদের কুরআনে মারিয়াম নামে একটি পূর্ণ সূরা আছে। আর আমরা মুসলিমরা আসলে খ্রিষ্টানদের সম্মান করি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, বাইবেলের মূল বাণীও আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহীর অংশ ছিল। কিন্তু ইতিহাসের ধারায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়েছে। তবে কোন অংশ পরিবর্তিত হয়েছে আর কোন অংশ অপরিবর্তিত আছে, আমরা তা নিশ্চিতভাবে জানি না। তাই পুরো গ্রন্থটির প্রতি আমাদের সম্মান দেখাতে হয়। আমি ভাবলাম অবাক ব্যাপার। এরা আমাদের সম্মান করে। এরা আমাদের আক্রমণ করছে না। সারাদিন আমি শুধু শুনতাম খ্রিষ্টানরা মুসলিমদের সমালোচনা করতে। আর এখানে মুসলিমরা খ্রিষ্টানদের নিয়ে এত সম্মানের সঙ্গে কথা বলছে। তখন থেকেই এই মানুষগুলোর প্রতি আমার ভালো লাগা আরও গভীর হতে লাগল। আর এই জীবন ব্যবস্থার প্রতিও। মরক্কো থেকে ফিরে আসার পর ইসলামের প্রতি আমার আগ্রহ যেন ১০ গুণ বেড়ে গেল। তাই যখনই আমার আশেপাশে বা কাছাকাছি কেউ থাকত, মুসলিম বা ইসলাম নিয়ে খারাপ কথা বললেই আমি সরাসরি তার প্রতিবাদ করতাম। কেউ কুরআন নিয়ে বাজে কথা বলতে শুরু করলেই বলতাম, শেষ কবে কোরআন খুলে পড়েছ?

কখনও না। তাহলে চুপ করো। মুসলিমদের পক্ষে দাঁড়ানোর ধরণটা তখনও ছিল খুব আক্রমণাত্মক ও নির্ভীক। কিছু মানুষ এমনও জিজ্ঞেস করত, এদুয়ার্দো, তুমি কি মুসলিম হয়ে গেছ? তোমার কী হয়েছে?

তুমি তো পুরো বদলে গেছ। আর আমি রোজাও রাখতে শুরু করলাম। আপনাদের বলে রাখি, ইসলাম গ্রহণের আগেই আমি রোজা রাখতাম। আমি 2বার রোজা রেখেছিলাম। তাই সবাই কিছুটা আন্দাজ করতে পারছিল এবং অনেকেই ধারণা করছিল যে আমি একদিন ইসলাম গ্রহণ করব। যেদিন আমি ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম, তার আগে আমার কোন ধারণাই ছিল না এমনটা ঘটতে যাচ্ছে। এরপর আমি ম্যালকম এক্সের জীবনের গল্প জানতে পারি। ম্যালকম এক্সই আমাকে ইসলাম গ্রহণের সাহস দিয়েছিলেন, কারণ তার জীবন কাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী ও গভীর এক স্মরণবাণী। জীবনের লক্ষ্য নিরাপত্তা খোঁজা নয়, আরাম খোঁজাও নয়, বরং সত্যকে খুঁজে পাওয়া। আর তিনি পুরো জীবন জুড়ে অসাধারণ নির্ভীকতার সঙ্গে সেটাই করেছিলেন। ফলে আমার কাছে তিনি হয়ে ওঠেন সাহসিকতার এক আদর্শ প্রতীক। আধুনিক যুগে সত্যিকারের পুরুষত্ব কেমন হওয়া উচিত তার এক উদাহরণ। সিনেমাটা দেখা শেষ করেই আমি ওসামাকে ফোন করে বললাম, "ওসামা ভাই, আমি এখন মুসলিম।" ওসামা বলে উঠল, "আল্লাহু আকবার।" তাকবীর। সে আনন্দে চিৎকার করছিল আর আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছিল যেন আমি ইতিমধ্যেই মুসলিম। সে বলছিল, "মাশাআল্লাহ।" এর আগে কখনো তাকে এসব কথা বলতে শুনিনি, কারণ সে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় ভাষার ব্যাপারে খুব সচেতন ছিল। সে জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি শাহাদাহ নিয়েছ?" তারপর বলল, "এটা তো দারুণ ব্যাপার। আরও বলো।" আমি বললাম, "কী নিয়েছি?" "শাহাদাহ।" আমার মনে হয়েছিল এটা বুঝি কোন খাবারের নাম। সার্মার মতো কিছু একটা। আমি বললাম, "ওটা আবার কী?

আমি তো এখন মুসলিম হয়ে গেছি। তুমি কী বলছ?" সে বলল, "না, তোমাকে শাহাদাহ নিতে হবে।" আমি বললাম, "সেটা কী?" সে বলল, "এর মানে হলো তোমাকে ঈমানের সাক্ষ্য দিতে হবে।" তাই ফোনেই তার সঙ্গে আমি শাহাদাহ পাঠ করলাম। এরপর ওসামা বলল, "আমি তোমাকে মসজিদে নিয়ে যাব। আইসিকিউ ইসলামিক সেন্টার অফ কুইবেকের মসজিদে।" আর মনে আছে সেখানে শাহাদাহ দেওয়ার সময় আমি এমন এক পরিবেশে ছিলাম, চারদিকে শুধু বাঙালি, পাকিস্তানি, ভারতীয় আর আরবদের দেখছিলাম। আর আমার জন্য সেটা ছিল বিশাল এক সাংস্কৃতিক ধাক্কা। নিজেকে মনে মনে বলছিলাম, " এডওয়ার্ডো, তুমি কি সত্যিই জানো কোথায় এসে পড়েছ?

এরা তো তোমার পরিচিত ধরনের মানুষ নয়। বড় বড় দাড়ি, পাগড়ি, কেউ কুফিয়া পরেছে, আরবদের ঐতিহ্যবাহী মাথার পোশাক। কেউ থوب পরেছে, এটিও আরবদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক।" আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন একেবারে ভুল জায়গায় এসে পড়েছি। আর পরিস্থিতিটা আরও তীব্র হয়ে উঠল যখন শাহাদাহের পর সবাই এসে আমাকে জড়িয়ে ধরতে আর চুমু দিতে শুরু করল। মনে আছে, আমি পুরোপুরি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ এর আগে আমি কোন পুরুষকে জড়িয়ে ধরিনি। ঠিক আছে?

নিজের বাবাকেও খুব একটা জড়িয়ে ধরতাম না। আর এখন বড় বড় দাড়িওয়ালা মানুষ এসে আমাকে জড়িয়ে ধরছে আর কপালে চুমু দিচ্ছে। তখন মনে হচ্ছিল এটা যেন আমার পুরুষত্বের উপরই আঘাত। কিন্তু ভাইরা এত আন্তরিক, চোখে পানি, মুখে আনন্দ। বুঝতে পারছিলাম এখানে বিশেষ কিছু ঘটছে যার গভীরতা সেই মুহূর্তে আমি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। শাহাদাহ দেওয়ার পর এক ভাই আমার কাছে এলেন, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ভাই, আমি আপনাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পরামর্শ দেব আর চাই আপনি আমাকে কথা দিন এটা কখনো ভুলবেন না। ইসলামকে দেখবেন, মুসলিমদের দেখে ইসলামকে বিচার করবেন না। ইসলামকে দেখবেন, মুসলিমদের দেখে ইসলামকে বিচার করবেন না।" কেন জানিনা, তখনই বুঝেছিলাম তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলছেন। আমি সেই পরামর্শ হৃদয়ে ধারণ করেছিলাম আর সেটা বহুবার আমার ঈমানকে রক্ষা করেছে। আর আমার ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী বিষয়টি বলতে গেলে তা ছিল আমার দোয়া। পূর্ণভাবে কবুল হওয়ার সেই মুহূর্ত, যেখানে আমি আল্লাহর কাছে ৩টি জিনিস চেয়েছিলাম। আমার কাছে একজন বিদেশীকে পাঠান যে আমাকে সত্যের পরিচয় দেবে, যাতে আমি এমন এক গোষ্ঠীর অংশ হতে পারি যারা সত্যের উপর আছে। আর সেই গোষ্ঠী থেকেই যেন সারাজীবনের জন্য একজন সঙ্গী পাই। ওসামাই ছিল সেই বিদেশী যে সেই বার্তা নিয়ে আমার জীবনে এসেছিল। ইসলামের বার্তার মাধ্যমে সে আমাকে সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। আর শেষ পর্যন্ত আমি একজন মরক্কান নারীকে বিয়ে করি। এগুলো বানিয়ে বলা যায় না। ইসলামী জীবনধারা গ্রহণ করা আপনার জন্য কতটা কঠিন ছিল?

হারাম থেকে বেঁচে থাকা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া—এসব? সত্যি বলতে, আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করি তখনই রাতারাতি খুব ধার্মিক মানুষ হয়ে যাইনি। পরের সপ্তাহেই আমি সমুদ্র সৈকতে ছিলাম। বিমানে ওঠার আগে ছাপিয়ে নেওয়া নামাজ শেখার কয়েকটি কাগজ সঙ্গে ছিল। সেগুলো দেখে সৈকতেই নামাজ পড়া শিখছিলাম। গায়ে শার্ট নেই, শর্টস পরা, কানে দুল, মাথায় টুপি। বুঝতে পারছেন?

আমি সত্যিই সংগ্রাম করছিলাম। তবে যতটা পারি চেষ্টা করছিলাম। বিশেষ করে আমার আগের জীবনযাপন থেকে মুসলিম হয়ে ওঠা মানে আক্ষরিক অর্থেই যেন আবার নতুন করে বাঁচতে শেখা। আপনি যদি ডানহাতি হন তবে বাম হাত দিয়ে সবকিছু করা শেখার মতো বা উল্টোটা। শুরুতে স্বাভাবিক বোধ হয় না। কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল যখন আমি নিজের পরিবেশ বদলাতে শুরু করি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত হই, যেখানে এমন মানুষদের কাছে থাকতে পেরেছিলাম যারা আমার জন্য মেন্টরের ভূমিকা পালন করতেন। তবুও বিষয়টা কঠিন ছিল, কারণ অনেক মুসলিমের সঙ্গে আমার মানসিকতা মিলত না। আর মনে রাখতে হবে এটা ছিল 9/11 এর ঠিক পরের সময়। তাই অনেক মুসলিম খুব আত্মরক্ষামূলক ও ক্ষমাপ্রার্থী ভঙ্গিতে থাকতেন, বিশেষ করে নিজেদের ধর্ম নিয়ে। আর আমার জন্য খুব কঠিন ছিল মুসলিমদের সঙ্গে গভীর বন্ধন তৈরি করা। তবে ভুল বুঝবেন না, ইসলাম নিয়ে আমার কখনো সন্দেহ ছিল না। আমি সবসময়ই এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু আমার বড় সন্দেহ ছিল এই যাত্রাপথ চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি আমার থাকবে কিনা। কারণ পরিবেশের দিক থেকে বিষয়টা খুব কঠিন ছিল। আমি যেন হারামের প্রবল স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটছিলাম। পরে বুঝলাম এই স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা যায় না। আপনাকে পথটাই বদলাতে হবে। আর আলহামদুলিল্লাহ, আমি সেটাই করেছি। ইসলাম গ্রহণের পর আপনার আশপাশের আর কেউ কি মুসলিম হয়েছে?

আপনার পরিবারের কেউ কি পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন?

আমার একজন নতুন ইসলাম গ্রহণ করা লাতিনো বন্ধু ছিল। তার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পেরে আমি খুব খুশি ছিলাম। আমরা একসঙ্গে ভালো সময় কাটাতাম। একদিন সে নিজের বাড়ির বেসমেন্টে জন্মদিনের অনুষ্ঠান করল। সেখানে আমাদের হাই স্কুলের আরেকজন ছেলেও ছিল। সে ছিল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর সেই সময়ে আমরা এমন এক পরিবেশে ছিলাম যেটা খুব একটা হালাল ছিল না। সেখানে অনেক অনুচিত কাজও হতো। এরপর সূরা ফাতিহা পাঠ করে সে ঘোষণা দিল, সে বলতে শুরু করল যে সে তার সবচেয়ে কাছের কুইবেকার বন্ধুকে দিতে যাচ্ছে যে আমাদেরও পরিচিত বন্ধু ছিল। একজন বন্ধু তার সেরা বন্ধুকে যে সর্বোত্তম উপহার দিতে পারে সেটাই দেবে। দূর থেকে আমি দেখছিলাম আর মনে মনে বলছিলাম, "আশা করি এটা কোরআন নয়। কারণ সে যদি এই ছেলেকে কোরআন দেয় তাহলে সে হয়তো পাতাগুলো ছিঁড়ে জয়েন্ট বানিয়ে ধূমপান করবে। কারণ জীবনে তাকে কখনো নেশামুক্ত অবস্থায় দেখিনি। সে সবসময় নেশাগ্রস্ত বা মাতাল থাকতো। তাই আমি তাকে বিচার করে ফেলেছিলাম।" আমাদের সেই কুইবেকার বন্ধু তার দিকে এগিয়ে গেল, উপহারটা নিল আর যেতে গিয়েই প্রায় হোঁচট খেয়ে পড়ছিল, কারণ সে মাতাল ছিল। তারপর বলল, "ওহ, ধন্যবাদ। এটা তোমার খুব ভালো একটা কাজ।" এরপর সে উপহারটা খুলল আর দেখলাম ভেতরে কোরআন। মনে মনে বললাম, "আহা, কোরআনের কী অপচয়!" কয়েক মাস পর, হয়তো প্রায় এক বছর পর রাতের খাবার শেষে শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি মসজিদে ছিলাম। আমরা তখনই এশা নামাজ শেষ করেছি। হঠাৎ কেউ পেছন থেকে আমার কাঁধে টোকা দিল। আমি ফিরে তাকালাম। দেখি সেই ছেলেটা, যাকে আমার পেরুভিয়ান বন্ধু কোরআন উপহার দিয়েছিল। সে বলল, "আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন?" আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। কয়েক মিনিট পর বুঝলাম, যে ছেলেটা কোরানটি পেয়েছিল আমার পেরুভিয়ান বন্ধুর কাছ থেকে, সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তার নতুন অবস্থার কথা শোনার পর আমি প্রথমেই ভাইটিকে বলেছিলাম, "আমি দুঃখিত। সত্যি বলতে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, আমি আপনাকে বিচার করেছিলাম। ভেবেছিলাম আপনি ওই কোরানটা নষ্ট করবেন, পাতা ছিঁড়ে জয়েন্ট বানাবেন।" আমি সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমা চাইলাম। কারণ আবারও প্রমাণ হলো, আল্লাহ কাকে হেদায়েত দেবেন তা আপনি কখনও জানেন না। নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পুরুষত্ব ও উত্তম চরিত্রের এক আদর্শ প্রতিমূর্তি। সত্যিকার অর্থে বুঝতে আমার অনেক বছর সময় লেগেছে। তাঁর ব্যক্তিত্ব পৃথিবীতে যে গভীর প্রভাব ফেলেছে, কারণ শেখা শুরুর এই যাত্রায় ইসলাম। আপনাকে প্রায়ই বলা হয়, তাকে ভালোবাসতে হবে। কিন্তু কাউকে সত্যিকারভাবে জানতে সময় লাগে। আর একাধিক জীবনী পড়ার পর আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমি উপলব্ধি করলাম, তিনি হুজ্জাতুল ইসলাম। তিনি ইসলামের জীবন্ত প্রমাণ। তিনি নিজেই এক অলৌকিক নিদর্শন। তাঁর চরিত্রের নিখুঁত সৌন্দর্য, সততা ও নৈতিক দৃঢ়তার কারণে আর তাঁর বিনয়ের কারণেও। আল্লাহ কতবার তাকে সংশোধন করেছেন, কিন্তু তিনি কখনও তা ব্যক্তিগতভাবে নেননি। সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে সংশোধন করেছেন। আপনি যতক্ষণ আমার প্রতি সন্তুষ্ট, আমার আর কিচ্ছু চাই না। আমাকে ক্ষমা করুন। কল্পনা করুন, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই ঘরে প্রবেশ করলেন। আপনি তাঁকে প্রথমে কী বলতে চাইবেন?

আমার মনে হয় আমি কথা বলতেই পারব না। আমি জানি না আমি তার দিকে তাকাতেও পারব কিনা। সম্ভবত আমি তার পা চুম্বন করতে চাইব। হ্যাঁ। আল্লাহ যেন আমাদের জান্নাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেন, ইনশাআল্লাহ। আমিন। আপনার যদি পৃথিবীর সব অমুসলিমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হতো, বিশেষ করে ব্রাজিলিয়ান ও কানাডিয়ানদের সঙ্গে, মাত্র কয়েক মিনিটে আপনি তাদের কী বলতে চাইতেন?

আমি বলব, ইসলামকে একটি সুযোগ দিন। সত্যি বলতে, ইসলাম বিদ্বেষ পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়। এটা কোন আকস্মিক বৈশ্বিক ঘটনা নয়। এই প্রচারণার পেছনে কিছু মানুষ আছে যারা নিরন্তর কাজ করছে যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত থাকে মুসলিমরা কারা এবং আমরা কিসের পক্ষে দাঁড়াই তা নিয়ে। আর আমরা যেহেতু নিজেদেরকে যুক্তিবাদী ও বিবেচনাপ্রসূত সমাজ বলে গর্ব করি, তাই কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখা জরুরি এবং নিজেদেরকে সস্তা প্রচারণার দ্বারা প্রভাবিত হতে না দেওয়া। আপনিও কি ইসলাম গ্রহণ করেছেন, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না? কিংবা, হয়তো আপনি সারাজীবন মুসলিমই ছিলেন, কিন্তু নতুনভাবে শুরু করে একদম শুরু থেকে ইসলামকে জানতে আগ্রহী?

ঠিক এই কারণেই আমরা Step Islam অ্যাপটি তৈরি করেছি। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং বিজ্ঞাপনমুক্ত একটি অ্যাপ, যা আপনাকে ইসলাম শেখায় পরিষ্কার ও সাজানোভাবে। আপনি সহজেই ঈমানের মূল ভিত্তি, কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা শিখতে পারবেন, আর নিজের গতিতে এমন বাস্তবসম্মতভাবে কাজগুলো সম্পন্ন করবেন, যেন আজীবনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। শয়তানকে সুযোগ দেবেন না, যেন সে আপনাকে এটি পিছিয়ে দিতে পারে। নিচের লিংকে ক্লিক করুন, Step Islam ডাউনলোড করুন, আর আজই চিরস্থায়ী সুখের পথে আপনার প্রথম পদক্ষেপ নিন।
