# খন্দকের যুদ্ধ: মদিনার ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা! - এআই ভিজ্যুয়ালাইজড - ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) | পর্ব ৮

- Language: bn
- Published: 2026-08-26
- Canonical: https://blog.towardseternity.com/bn/blog/battle-of-the-trench-jews-of-madina-betrayed-the-prophet-ai-visualized-o-messenger-ep-8
- Source video: https://www.youtube.com/watch?v=QbV9WR28GCg
- Channel: Towards Eternity

This is the cleaned transcript of the source video. The speech is unaltered.

---

দিগন্তে ধুলোর মেঘ উঠতে দেখা যাচ্ছিল— যা ছিল আসন্ন ঝড়ের স্পষ্ট লক্ষণ। প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে, আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন স্থান থেকে জড়ো হওয়া দশ হাজার যোদ্ধার বিশাল এক বাহিনী মদিনার উপকণ্ঠে এসে পৌঁছেছিল। “দশ হাজার সৈন্যের এই বাহিনী নিয়ে আমরা তাদের জন্মদিনকেই অভিশপ্তদিন করে দিতে বাধ্য করব!” মুশরিকরা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিল। কিন্তু সামনে যা দেখল, তাতে তারা স্তব্ধ হয়ে গেল। শহরের দিকে যাওয়ার একমাত্র পথটি প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এক খন্দক কেটে আটকে দেওয়া হয়েছে। খন্দকটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও গভীর— যেন অতিক্রম করা অসম্ভব এমন এক প্রাচীর। সহজ জয়ের যে আত্মবিশ্বাস তারা নিয়ে এসেছিল, তা মুহূর্তেই ভয় ও অনিশ্চয়তায় রূপ নিল। এমন এক প্রতিরক্ষা কৌশলের সামনে পড়ে শত্রুরা কী করবে বুঝতেই পারছিল না, কারণ জীবনে কখনও তারা এ ধরনের কৌশল এর আগে দেখেনি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হলো কীভাবে?

এবং মুসলিমরা কীভাবে এই বিশাল বাহিনীর মোকাবিলার জন্য এমন পরিকল্পনা করতে পারল? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— এরপর কী ঘটতে চলেছিল?

বিশ্বাসঘাতকতা, গোপন পরিকল্পনা এবং অলৌকিক ঘটনা। চলুন আমরা একসাথে প্রত্যক্ষ করি খন্দকের যুদ্ধের সেই মহাকাব্যিক ইতিহাস। এই ভিডিও সিরিজটি নির্ভরযোগ্য ইসলামী উৎসের শত শত তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা তৈরি সমস্ত দৃশ্যপট যোগ্য মুসলিম আলেমদের পরামর্শে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তা ইসলামী নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তিস্বরূপ বনু নাদির ইহুদি গোত্রকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ শাম অঞ্চলে (সিরিয়া) চলে যায়, আর কেউ কেউ আবার খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। খায়বারে অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় ইহুদিদের সংখ্যা বেশি ছিল। সংখ্যায় বেশি হওয়ায় তারা একে অপরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহ দিতে শুরু করল। এই আত্মবিশ্বাস থেকেই তারা পরিকল্পনা করতে লাগল রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাহাবিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার। কিন্তু তারা জানত, একা একা এটি সম্ভব নয়। তাই তারা উনিশ জনের একটি প্রতিনিধি দল পাঠাল যাতে করে কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রকে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উসকে দেওয়া যায়। প্রথমে তারা কুরাইশদের কাছে গেল, তারপর গাতাফান ও বনু সুলাইম গোত্রের কাছে, এরপর আরও অনেক আরব গোত্রের কাছে গেল। এই কারণেই এই যুদ্ধকে আহযাবের যুদ্ধও বলা হয়— অর্থাৎ সম্মিলিত বাহিনীর যুদ্ধ। কারণ বড়-ছোট বহু গোত্র একত্রিত হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য একত্রিত হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিনিধি দলের প্রথম গন্তব্য ছিল মক্কা। উহুদের যুদ্ধের শেষটা মনে আছে?

আবু সুফিয়ান তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এক বছর পর বদরে আবার সাক্ষাৎ করার কথা। আল্লাহর রাসূল ﷺ সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। পরের বছর তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে বদরের দিকে অগ্রসর হলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি কাউকেই পেলেন না। কুরাইশরা তাঁর মুখোমুখি হওয়ার সাহসই করেনি। বদরের যুদ্ধে তারা ভয়াবহ পরাজয়ের শিকার হয়েছিল। আর সেই থেকেই আবু সুফিয়ানের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছিল। “তাহলে স্বাগতম। মুহাম্মদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে আমাদের সাহায্য করবে সে আমাদের প্রিয়।” ইসলাম দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে তা কুরাইশরা বুঝতে পারছিল, তারা আর একা ইসলামকে মোকাবিলা করতে পারবে না। তাই এই প্রস্তাব গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না। আবু সুফিয়ান দেখতে চাইলেন ইহুদি প্রতিনিধি দল সত্যিই কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা এই কাজে কতটা আন্তরিক ও দৃঢ়— তা যাচাই করার জন্য তিনি তাদের একটা পরীক্ষা নিতে চাইলেন। সে বললো: “হে ইহুদিরা, বলো তো—আমাদের ও মুহাম্মদের বিরোধে কার ধর্ম উত্তম?

আমাদের ধর্ম উত্তম, নাকি তার ধর্ম?” সে বললো, “যদি আমাদের আল্লাহর সামনে সত্য বলতে হয়, তবে তোমরা তাঁর চেয়ে সত্যের অধিক নিকটে রয়েছ।” অথচ মনে মনে তারা জানত বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। তবুও প্রতিশোধের তাড়নায় তারা মিথ্যা বলতে দ্বিধা করল না। ইহুদি প্রতিনিধিদল কুরাইশদের সাথে একটি চুক্তি করল এবং তাদের প্রথম মিত্র নিশ্চিত করল। কিন্তু তাতেও তাদের সন্তুষ্টি ছিল না। আরও সমর্থন পেতে তারা গাতাফান গোত্রের কাছে গেল, যারা মক্কা ও নাজদের মাঝখানে বাস করত। আর তাদের রাজি করাতেও বেশি সময় লাগেনি। এরপর বনু সুলাইমও তাদের সাথে যোগ দিতে সম্মত হলো। শুধু কেবল ইহুদি প্রতিনিধিরাই নয়; কুরাইশরা নিজেরাও অবিরাম চেষ্টা করছিল আরও গোত্রকে রাজি করাতে। এরপর তারা আহাবিশ গোত্র এবং তাদের মিত্র গোত্রগুলোর সমর্থনও পেল। তাদের সব দল একত্রিত হলে, মোট বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪,০০০ জন। আর মদিনার আশপাশের গোত্রগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করার পর, কুরাইশরাও অক্লান্তভাবে আরও গোত্রকে রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল। “১০, ০০০ সৈন্য নিয়ে আমরা তাদের জন্মদিনকেই অভিশপ্ত দিন করে দিতে বাধ্য করবো।” এদিকে এসব ঘটনার মধ্যেই একটি সংবাদ এলো নবী ﷺ-এর কাছে, খুযা‘আ গোত্রের পক্ষ থেকে। “সে আসছে!

আবু সুফিয়ান এক বিশাল বাহিনী নিয়ে এদিকে অগ্রসর হচ্ছে!” “কতজন?” — “হাজার হাজার।” “তুমি কি তাদের নিজের চোখে দেখেছ?” “ওয়াদিতে তাদের গোয়েন্দা দলকে দেখেছি— তারা দ্রুতই এগোচ্ছে।” নবী করিম ﷺ তাৎক্ষণিকভাবে সাহাবিদের সমবেত করলেন পরামর্শের জন্য। সবারই ছিল নিজ নিজ মতামত। অবশেষে এমন একটি প্রস্তাব এলো যা সবকিছু বদলে দেবে। “হে আল্লাহর রাসূল, পারস্যে আমরা যখন অশ্বারোহী শত্রুদের আক্রমণের ভয় পেতাম তখন আমরা শহরের চারদিকে খন্দক খনন করতাম নিজেদের রক্ষার জন্য।” এই প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত সাহাবি সালমান আল-ফারসি (রাঃ)। রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর সাহাবিরা এর আগে কখনো এমন কৌশলের কথা শোনেননি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এই পরিকল্পনাকে যুক্তিসঙ্গত মনে করলেন এবং তা অনুমোদন দিলেন। তারা এমন একটি খন্দক খনন করতে যাচ্ছিলেন যা এতটাই প্রশস্ত ও গভীর হবে যে, ঘোড়াও তা অতিক্রম করতে পারবে না। কিন্তু সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ ﷺ বের হলেন খন্দকটি ঠিক কোথায় খনন করা যেতে পারে তা নির্ধারণ করতে। মদিনার এক পাশে ছিল বিস্তীর্ণ আগ্নেয় পাথরের প্রান্তর। আর অন্য পাশে ছিল বিশাল খেজুর বাগান। কোনো বাহিনীই এই দুই পথ দিয়ে সহজে অগ্রসর হতে পারত না। আর দক্ষিণ দিকে ছিল একটি বিশাল পাহাড়, যা সেই দিক থেকেও প্রবেশকে অসম্ভব করে তুলেছিল। এক অর্থে বলা যায়, আল্লাহ নিজেই মদিনাকে প্রাকৃতিক সুরক্ষায় ঘিরে রেখেছিলেন। শুধু একটি দিকই খোলা ছিল। আর ঠিক সেখানেই খনন করা হবে সেই দীর্ঘ খন্দক। যা শত্রুদের শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেবে। কিন্তু এই কাজ শেষ করার জন্য তাদের হাতে ছিল দশ দিনেরও কম সময়। তাই তাঁরা সবাইমিলে নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে খনন কাজে লেগে গেলেন। এবং তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল ﷺ। হাতে কোদাল ও শাবল নিয়ে তিনি নিজেও সাহাবিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করছিলেন। আর একই সঙ্গে তাদের উৎসাহও দিচ্ছিলেন। তীব্র গরম ও ক্ষুধা সত্ত্বেও তারা সারাদিন বিরামহীনভাবে খনন করে যাচ্ছিল। কখনও কখনও সাহাবিরা বলতেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি একটু বিশ্রাম নিন। আমরাই কাজটা শেষ করে নিতে পারব। আপনার নিজেকে কষ্ট দেওয়ার প্রয়োজন নেই।” তিনি চাইলে কাজ না করেও থাকতে পারতেন। কারণ তিনি তো ছিলেন আল্লাহর রাসূল ﷺ, আর এতে কারোরই কোন আপত্তি থাকতো না। কিন্তু তিনিই তো বলেছেন, “একটি জাতির নেতা সেই ব্যক্তি, যে তাদের সেবা করে।” তাঁর কাছে বসে বসে দেখা কাজ করার চেয়েও কঠিন ছিল। তিনি জানতেন, কষ্ট ও পরিশ্রমের মাধ্যমেই আল্লাহর বরকত ও রহমত নেমে আসে। তাই তিনি সবার চেয়ে বেশিই পরিশ্রম করছিলেন। সেই বছর আরব ভূমি ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত ছিল। ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করার জন্য অনেক মুসলিম নিজেদের পেটে পাথর বেঁধে রাখতেন। এভাবে তারা এক ধরনের মিথ্যা তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে ক্ষুধার কষ্ট কিছুটা কমানোর চেষ্টা করতেন। একদিন কিছু সাহাবি গভীর কষ্টে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর কাছে এলেন এবং তাদের দুর্দশার কথা জানাতে চাইলেন। কিন্তু সামনে যা দেখলেন তাতে তাদের কথা গলায় আটকে গেল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাঁর পেটের কাপড় খুললেন, একটি নয়, দুটি পাথর মাটিতে পড়ে গেল। “আপনিও কী ক্ষুধার কারণে পেটে পাথর বেঁধেছেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ?” তিনিও তাদের মতোই কষ্ট সহ্য করছিলেন, বরং তাদের চেয়েও বেশি। একদিন জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে সেই অবস্থায় দেখে আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি বাড়ি ফিরে তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “আমি আল্লাহর রাসূল ﷺ–কে দেখেছি ক্ষুধায় অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এত কষ্ট অন্য কেউ হলে হয়তো অজ্ঞানই হয়ে যেত।” “আমাদের ঘরে কি কিছু খাবার আছে?” তার স্ত্রী বললেন, “আল্লাহর কসম, এই ছোট একটি ছাগল আর কয়েক মুঠো যব ছাড়া আমাদের কাছে আর কিছুই নেই।” জাবির ছাগলটি জবাই করলেন আর তাঁর স্ত্রী যব গুঁড়ো করে আটা বানালেন। মাংস একটি হাঁড়িতে মাটির চুলায় রান্না বসিয়ে দিলেন। জাবির যখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে দাওয়াত দিতে, তখন তাঁর স্ত্রী বললেন, “দয়া করে আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সামনে বিব্রত করবেন না।” অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, অনেক মানুষকে যেন দাওয়াত না দেওয়া হয়। কারণ তাদের যা খাবার তা মাত্র কয়েকজনেরই হবে। জাবির নবীজীর কাছে গিয়ে বললেন তারা সামান্যই কিছু খাবার প্রস্তুত করেছেন। তারপর তিনি অনুরোধ করলেন যেন তিনি কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন কিছু বললেন যা জাবির কখনও কল্পনাও করেননি। তিনি খাদ খননরত সব সাহাবিকে ডেকে বললেন: “তোমাদের ভাই আমাদেরকে ভোজের দাওয়াত দিয়েছেন!” যা নিয়ে জাবিরের স্ত্রী আশঙ্কা করেছিলেন, ঠিক সেটাই ঘটল কয়েকজনের জন্য প্রস্তুত করা খাবার এখন পুরো সাহাবিদের একটি বড় দলকে খাওয়াতে হবে। জাবির যখন বাড়ি ফিরে এসে স্ত্রীকে সব বললেন, তখন তাঁর স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, “রাসূলুল্লাহ ﷺ কি জিজ্ঞেস করেছিলেন আমাদের কাছে কত খাবার আছে?” জাবির বললেন, “হ্যাঁ।” “তাহলে কোনো সমস্যা হবে না।” তিনি বিশ্বাস করতেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন কিছু জানেন যা তারা জানেন না। জাবির দিশেহারা হয়ে গেলেন কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাদের বাড়িতে পৌঁছালেন, তিনি খাবার ও রুটির উপর বরকতের জন্য দোয়া করলেন। এরপর তিনি সাহাবিদের দশজন করে ভেতরে প্রবেশ করতে বললেন। তারপর নিজ হাতে চুলা থেকে রুটি বের করলেন তিনি রুটির উপর মাংসের টুকরো রাখতেন এবং নিজ হাতে প্রতিটি সাহাবিকে দিতেন। ধীরে ধীরে সবাই তৃপ্ত হতে শুরু করল। তবুও আশ্চর্যের বিষয়, মাংস বা রুটির কোনো ঘাটতি হলো না। সবকিছু আগের মতোই রয়ে গেল। জাবির ও তাঁর স্ত্রী এই দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। পরে সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে জাবির (রাঃ) বলেছিলেন, “আল্লাহর কসম, এক হাজার মানুষ এসে পেট ভরে খেয়েছিল।” তবুও আমাদের হাঁড়ি তখনও ফুটছিল, আর আমাদের খামির থেকে রুটি হয়েই যাচ্ছিল।” এক হাজার মানুষ এই অলৌকিক ঘটনাটি দেখেছিল। এবং পরবর্তীতে এই ঘটনা বারবার আলোচনা হলেও, তাদের একজনও কখনও তা অস্বীকার করেনি। একবার চিন্তা করে দেখুন— যারা সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তারা কি সবাই মিলে মাআযাল্লাহ, একই মিথ্যার উপর একমত হতে পারতেন যা কখনও ঘটেইনি?

সাহাবিদের জন্য এসব অলৌকিক ঘটনা ছিল স্পষ্ট বাস্তবতা। অনেক সময় আল্লাহ তাঁর রাসূলের (সাঃ) হাতের মাধ্যমে এমন বরকত দান করতেন। এমনও দেখা গেছে, বদর ও তাবুকের মতো যুদ্ধের সময়ে, বিয়ের ভোজে এমনকি দুর্ভিক্ষের সময়ও এ ধরনের মুজিজা বারবার দেখা গেছে। কখনও ১৮০ জনের সামনে, কখনও ৪০০ জনের সামনে, আর কখনও কখনও ১৫০০ জনের সামনেও। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিরা যখন খন্দক খনন করছিলেন, তখন তারা এক বিশাল, শক্ত পাথরের মুখোমুখি হলেন। কিন্তু যতই চেষ্টা করলেন, তারা সেটি ভাঙতে পারলেন না। তাই তারা দ্রুত আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে জানালেন। নবী ﷺ এলেন এবং সালমান আল-ফারসি (রা.)-এর কুড়াল নিলেন। তারপর বললেন: “বিসমিল্লাহ” এবং প্রবল আঘাত করলেন পাথরে। এক আঘাতেই পাথরের এক-তৃতীয়াংশ চূর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন: “আল্লাহু আকবার!

আমাকে শামের চাবি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি এখনই তার লাল প্রাসাদ দেখছি।” তিনি দ্বিতীয়বার আঘাত করলেন, আরেক তৃতীয়াংশ ভেঙে গেল। তিনি আবার তাকবীর দিলেন: “আল্লাহু আকবার! আমাকে পারস্যের চাবি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি মাদায়েনের সাদা প্রাসাদ দেখছি।” তিনি তৃতীয়বার আঘাত করলেন এবং বললেন: “আল্লাহু আকবার! আমাকে ইয়েমেনের চাবি দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি এখনই সানআর ফটক দেখছি।” শেষ আঘাতে পাথরটা পুরোপুরি চূর্ণ হয়ে গেল। এই সুসংবাদ শুনে মুমিনদের ঈমান আরও দৃঢ় হয়ে গেলো। কিন্তু মুনাফিকরা কী করল?

তারা ঠাট্টার সুরে বলল: “সে আমাদেরকে কিসরা ও কায়সারের ধনসম্পদের কথা বলে, অথচ আমাদের কেউ তো নিরাপদে প্রয়োজন সারারও সুযোগ পাচ্ছে না!” তারা সবাইকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছিল। একবার ভেবে দেখুন। যখন এই প্রতিশ্রুতিগুলো দেওয়া হয়েছিল, মদিনা তখন শত্রু গোত্রগুলোর দ্বারা ঘিরে ছিল। সবাই একত্র হয়েছিল মুসলিমদের পুরো জনপদ নিশ্চিহ্ন করতে। মুসলিমরা তখনও কুরাইশদেরকে পুরোপুরি পরাজিতও করতে পারেনি। তাদের আত্মরক্ষার জন্য খন্দক খনন করতে হচ্ছিলো। তারা ছিল ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত, আর ক্লান্ত-অবসন্ন। তবুও, যে সত্তা আসলে সেই প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করবেন—তিনি আল্লাহ, আসমান ও জমিনের রব। আর নবী ﷺ-এর বলা প্রতিটি কথাই ছিল সত্য। এবং একে একে, সেই প্রতিশ্রুত বিজয়গুলো সত্যি হয়ে এসেছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই, উমর ও উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালেই। মুশরিক বাহিনীকে হতভম্ব করে দেওয়া সেই খন্দক, কেবল ছয় দিনের মধ্যেই শেষ করা হয়েছিল। এর প্রস্থ ছিল প্রায় ৯ মিটার, মানে প্রায় পাঁচজন মানুষের দৈর্ঘ্যের সমান। আর গভীরতা ছিল এর প্রায় অর্ধেক। এতটাই প্রশস্ত ছিল যে সবচেয়ে দক্ষ ঘোড়সওয়ারও লাফিয়ে পার হতে পারত না। প্রায় ৬ কিলোমিটার জুড়ে খন্দকের পথে, মাত্র একটুখানি জায়গা ছিল— যেটা এতটাই সরু যে কেবল একজন ঘোড়সওয়ার পার হতে পারে। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে ১০,০০০ মুশরিকের এক বাহিনী এসে পৌঁছে গেলো। তারা এমন এক যুদ্ধকৌশলের মুখোমুখি হয়েছিল যা তারা আগে কখনও দেখেনি। আর এটা তাদের জন্য ছিল বিশাল বড় এক ধাক্কা। “থামো!

থামো! ঘোড়াগুলোকে থামাও!” “এটা কী? কী হচ্ছে এসব?” “থামো! ঘোড়াগুলোকে থামাও!” তারা ভেবেছিল খুব সহজেই মদিনায় ঢুকে পড়বে, রাস্তায় রক্ত ঝরাবে, আর মুসলিমদের একে একে শেষ করে দেবে। -“থামো!

বলছি থামো!” -“ হচ্ছেটা কি এসব?” কিন্তু তবুও, আবু সুফিয়ান পিছু হটার কোনো ইচ্ছাই রাখল না। প্রস্তুতির পরের ধাপে, তারা খন্দকের ওপার থেকে তীরের এক ঝড় বইয়ে দিল। ভয়ংকর শিসধ্বনিতে তীরগুলো বাতাস চিরে এগোচ্ছিল, আর মুসলিমদের ওপর ঝরে পড়ছিল। কিন্তু খন্দকটা তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল। যতই চেষ্টা করুক, তারা কোনোভাবেই সেটা পার হতে পারল না। আপনার মনে আছে—খন্দকের একটা জায়গা বাকিগুলোর মতো অতটা প্রশস্ত ছিলোনা। কিছু লোক সেখান দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পার হওয়ার আগেই তাদের মাটিতে লুটিয়ে দেওয়া হলো। তবে আমর ইবনে আব্দ ওয়ুদ্দ সফলভাবে ঢুকে পড়েছিল। আরব জুড়ে সে ছিল সবচেয়ে প্রসিদ্ধ আর ভয়ংকর যোদ্ধাদের একজন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত বর্মে ঢাকা, সে স্বজোরে ঘোড়ার লাগাম টানল এবং মুসলিম বাহিনীর ঠিক সামনে এসে থামল। “কে আমার সাথে যুদ্ধ করবে?” আলী (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে অনুমতি দিন—আমি তার সাথে লড়ি।” আলীর দৃঢ়তা দেখে নবী ﷺ দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ, তাকে আপনার সাহায্য দান করুন।” তারপর আলী (রা.) ময়দানে এগিয়ে গেলেন। “দেখো, আলী…

আলী যাচ্ছে।” “জুলফিকার।” “তুমি কে?” “আমি আলী, আবু তালিবের পুত্র।” “আমি তোমার রক্ত ঝরাতে চাই না। তোমার বাবা ছিল আমার বন্ধু।” “আল্লাহর কসম, আমি তো তোমার রক্ত ঝরাতেই চাই।” আমর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে তলোয়ার বের করল এবং ঘোড়ায় চড়ল। কিন্তু আলী (রা.) বললেন: “আমি পায়ে হেঁটে, আর তুমি ঘোড়ায়— এভাবে আমি কীভাবে তোমার সাথে লড়ব? নেমে এসো, আমার সামনে এসো!” তাই আমর নেমে এল এবং আলী (রা.)-এর সামনে দাঁড়াল। “চলো!

দেখা যাক তোমার কেমন দক্ষতা।” আলী তাকে দু’টি পথ পছন্দ করতে বললেন: “ইসলাম গ্রহণ করো, অথবা ফিরে যাও।” কিন্তু আমর দুটোই প্রত্যাখ্যান করল। দ্বৈরথ শুরু হলো— আমর প্রথম আঘাত করল। আলী ঢাল দিয়ে তা প্রতিহত করলেন। কিন্তু তলোয়ার ঢাল কেটে ভেতরে ঢুকে তার ডগা আলীর মাথায় আঘাত করল। মাটির ভেতর থেকে ধুলোর এক মেঘ উঠল এবং দু’জনকে ঢেকে ফেলল, ফলে ভেতরে কী হচ্ছে— কেউই আর তা দেখতে পেল না। এক মুহূর্তের জন্য, কেউ বুঝতে পারছিলোনা কী ঘটেছে। অবশেষে এক আওয়াজ শোনা গেল। “আল্লাহু আকবার!” আমরের মাথা মাটিতে গড়িয়ে পড়েছিল। সেই তাকবীর ছিল আলী (রা.)-এর। নবী ﷺ এবং সাহাবারা যখন শুনলেন, তারা বুঝে গেলেন—আলী আমরকে পরাজিত করেছেন। আর সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলেন, “আল্লাহু আকবার!” আরও দুই-তিনজন লোকও খন্দক পার হয়ে আলীর ওপর হামলা করতে এসেছিল। কিন্তু মৃত্যুভয়ে তারা ফিরে গেল। শত্রুরা তাদের হামলা থেকে কিছুই অর্জন করতে পারল না। তাই তারা খন্দকের ওপারের অবস্থানেই থাকতে বাধ্য হলো। তাদের করার মতো আসলে আর কিছুই ছিল না। কয়েকদিন ধরে, দুই পক্ষই দূর থেকে একে অন্যের দিকে তীর ছুঁড়তে থাকল। কিন্তু এতে যুদ্ধটা আরও দীর্ঘ হতে লাগল। আর যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছিল, কুরাইশদের অবস্থা ততই খারাপ হচ্ছিল। কারণ আবহাওয়াও প্রতিদিন আরও কঠিন হয়ে উঠছিল। দিনে ছিল তীব্র গরম, আর রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা। রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রায় ৫০০ সাহাবিকে মদিনায় পাঠিয়ে দিলেন শহরকে নিরাপদ রাখতে। রাতের তীব্র শীতে তিনি নিজেই পাহারা দিতেন খন্দকের সবচেয়ে সরু স্থানে কারণ তিনি আশঙ্কা করছিলেন শত্রুরা সেখান দিয়ে পার হতে পারে। আয়িশা (রা.) পরে বলেছিলেন, যখন নবী ﷺ ঘরে ফিরতেন তখন শহরের চারপাশের ফসল বেশিরভাগই ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গিয়েছিল, শত্রু সেনাবাহিনীর পশুগুলোর খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। “কোন খাবার নেই আর। আমরা খুব কমই আনতে পেরেছি।” এইভাবে চলতে থাকলে তাদের পশুগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করবে। তারা ভেবেছিল মাত্র এক-দু’দিন যুদ্ধ করলেই হয়তোবা সহজেই জয়লাভ করতে পারবে, তাই তারা সঙ্গে এনেছিল খুব সামান্য খাদ্যসামগ্রী। পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তবে তারা বেশিদিন টিকতে পারবে না। আবু সুফিয়ান পরিস্থিতিটি বুঝতে পেরেছিলো। তাই সে তার সৈন্যদের তীর নিক্ষেপ আরও বাড়ানোর নির্দেশ দিলো। তীরবৃষ্টি এত তীব্র ছিল যে মুসলিমদের জন্য নড়াচড়া করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এরপর কুরাইশদের একদল অশ্বারোহী সৈন্য মুসলিমদের বিপরীত দিকে এসে পৌঁছাল এবং তাদের দিকে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। তাদের আক্রমণ এত তীব্র ও অবিরাম ছিল যে মুসলিমদের সূর্যাস্ত পর্যন্ত এক মুহূর্ত বিরতি ছাড়াই খন্দকে নিজেদের রক্ষা করতে হয়েছিল। এর ফলে রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবিরা সময়মতো আসরের নামাজ আদায় করতে পারেননি। এতে আল্লাহর রাসূল এতটাই ব্যথিত হলেন যে তিনি মুশরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে দোয়া করে বললেন— “আল্লাহ তাদের ঘরবাড়ি এবং তাদের কবরকে আগুনে ভরে দিন, যেমনটা তারা আমাদের আসরের নামাজ পড়তে বাধা দিয়েছে!” এরপর তিনি কাজা নামাজ আদায় করলেন, এবং তাঁর সাহাবিরাও তাই করলেন। আল্লাহর রাসূল তো তায়েফে যারা তাঁকে পাথর মেরেছিল তাদের বিরুদ্ধেও অভিশাপ দেননি। তবুও নামাজের গুরুত্ব এতটাই মহান ছিল যে যারা তাদের নামাজ থেকে বিরত রেখেছিল তাদের বিরুদ্ধে তিনি এমন দোয়া করেছিলেন। খন্দকের কাছে যুদ্ধ তখনও তীব্রভাবে চলছিল। কিন্তু কেবল মুশরিক বাহিনীই ছিল না একমাত্র হুমকি। শুরু থেকেই যে বিষয়টি রাসূলুল্লাহ ﷺ আশঙ্কা করছিলেন, তা এবার সত্যি হয়ে গেল। হিজরতের পর যে মদিনার চুক্তি করা হয়েছিল মনে আছে?

সেই চুক্তি অনুযায়ী মদিনার সব গোত্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যদি কখনও শহরের ওপর আক্রমণ হয় তবে সবাই মিলে তা প্রতিরক্ষা করবে। কিন্তু বনু কুরাইযা সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, তারা বরং শত্রুদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিল এবং চরম এক বিশ্বাসঘাতকতা করল। ”দুর্গগুলো…

দুই দিক থেকেই হুমকির ভয় ছিলো। আগেই জানতাম আমরা সেটা। তারা চুক্তি ভঙ্গ করবেই। তারা মদিনার দক্ষিণে মজবুত দুর্গে বসবাস করত। সেখান থেকেই তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ সঙ্গে সঙ্গে সা'দ ইবন মু'আয (রাঃ)-কে পাঠালেন কয়েকজন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্যে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো না। তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল মুসলিমদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে। এখন শুধু বাইরে থেকেই তীর আসছিল না, দক্ষিণ দিক থেকেও ইহুদি বাহিনী মুসলিমদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছিল। কুরাইযার ইহুদিরা মদিনার ভেতরেই বাস করত, অর্থাৎ মুসলিমরা এখন দুই দিকের আগুনের মধ্যে পড়ে গেল। আর পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে, মুনাফিকরা আবারও ফিতনা ছড়াতে শুরু করল এবং বলল— “আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই দেননি।” আল্লাহ সেই দিনের কথা সূরা আহযাবে বর্ণনা করেছেন। “স্মরণ করো, যখন তারা তোমাদের ওপর আক্রমণ করেছিল উপর দিক থেকেও, নিচের দিক থেকেও, আর ভয়ে চোখ স্থির হয়ে গিয়েছিল এবং হৃদয় কণ্ঠে এসে পৌঁছেছিল, এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা করতে শুরু করেছিলে। সেই সময়ই মুমিনদের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল এবং তাদের প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।” সবকিছুই যেন মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আল্লাহ তাদের জন্য একটি পথ খুলে দিলেন। একটি মাত্র সুযোগ, যা বদলে দিবে পুরো যুদ্ধের গতিপথ । গাতাফান গোত্রের আশজা শাখার নেতা নুয়াইম ইবন মাসউদ গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু কাউকে জানাননি। তিনি গোপনে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে নিজের ঈমান ঘোষণা করলেন। শাহাদাহ গ্রহণ করে মুসলিম হওয়ার পরই তিনি বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল…

আমি যদি কখনো কোনোভাবে উপকারে আসতে পারি, তাহলে আমাকে শুধু হকুম করবেন।” যে ব্যক্তি সদ্য ঈমানের স্বাদ পেয়েছে সে কোনভাবেই চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। নবী ﷺ তার দৃঢ়তা দেখে তিঁনি এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছিলেন। তিনি বললেন, “শত্রুদের কাছে ফিরে যাও এবং তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য যা করা যায় করো।” নুয়াইম নিঃশব্দে শত্রুর তিনটি দলের মাঝেই ঢুকে পড়লেন এমনভাবে যেন তিনি কখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। প্রথমে তিনি বনু কুরাইযার কাছে গেলেন এবং তাদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করলেন। “যদি কুরাইশ ও গাতাফান মুসলিমদের পরাজিত করতে না পারে, তাহলে তারা নিজেদের ঘরে ফিরে যাবে এবং তোমাদের একা রেখে দেবে। তখন মুহাম্মদ ﷺ সহজেই তোমাদের শাস্তি দিতে পারবেন। যদি তোমরা তা না চাও, তবে কুরাইশ ও গাতাফানের কাছে বলো তারা যেন তাদের কিছু লোককে জিম্মি হিসেবে দেয়। তাহলেই কেবল তারা তোমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারবে না। কারণ তারা কখনোই নিজেদের লোকদের হারানোর ঝুঁকি নেয় না। এরপর নুয়াইম কুরাইশদের কাছে গেলেন এবং বললেন: “বনু কুরাইযা মুসলিমদের ওপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত, আর তারা তাদের সঙ্গে গোপনে একটি চুক্তি করেছে। চুক্তি ভঙ্গ করার জন্য ক্ষমা পাওয়ার বিনিময়ে তারা মুসলিমদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে— কুরাইশদের ৭০ জন লোককে তারা ধরে এনে হস্তান্তর করবে, যাতে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাই যদি ইহুদিরা তোমাদের কাছে তোমাদের কোনো লোককে জিম্মি হিসেবে চায়, তবে এমন কিছুতে কখনোই রাজি হবে না।” এরপর তিনি গাতাফানের কাছে গেলেন এবং একইভাবে তাদের সতর্ক করলেন। ইহুদিরা জিম্মি চাইলে, তারা যেন কাউকেই না দেয়। নুয়াইম নিজেই গাতাফান গোত্রের ছিলেন বলে, কেউ তার ওপর সন্দেহ করেনি। আর তারা সঙ্গে সঙ্গেই তার পরামর্শ গ্রহণ করল। নুয়াইম যা বলেছিলেন, তারই অনুসরণ করে, বনু কুরাইযা কুরাইশ ও গাতাফানের কাছে জিম্মি দাবি করল নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। এতে মুশরিকরা নিশ্চিত হয়ে গেল নুয়াইম সত্য কথাই বলেছিল। এবং স্বাভাবিকভাবেই, তারা কাউকেই হস্তান্তর করতে অস্বীকার করল। পরে আবু সুফিয়ান সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে বলেছিল— “ওরা যদি আমার কাছে একটা ছাগলের বাচ্চাও চাইত, তবুও আমি তা দিতাম না।” এভাবেই পরিকল্পনাটি সফল হলো। অবিশ্বাসে তাদের জোটে এখন ভাঙ্গন ধরলো। অবরোধ অনেক দীর্ঘ হয়ে গিয়েছিল, এবং তাদের ঐক্য ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল। মুসলিমরাও আর শত্রুপক্ষের বাহিনীও দু’পক্ষই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর শীত দু’পক্ষকেই ধৈর্যের একেবারে শেষপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছিল। তবে তাদের মধ্যে একটি পার্থক্য ছিল। মুসলিমরা শক্তি পেত আসমান-জমিনের রব আল্লাহর কাছ থেকে, যিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। অন্যদিকে ওরা ভরসা করত প্রাণহীন মূর্তির ওপর, পাথরের ওপর—যার কোনো ক্ষমতাই নেই। আল্লাহর রাসূল জানতে চাইলেন শত্রু বাহিনী কী করছে এবং তাদের পরিকল্পনা কী। সেই রাতে, তিনি তাদের শিবিরে কাউকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। উনার চারপাশে পাহারায় থাকা অল্প কিছু মুসলিমকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন: “কে আমাকে এদের খবর এনে দিতে পারবে, আর কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে আমার সঙ্গী করবেন?” ভাবতে পারেন—কী বিরাট সম্মান!

কে না চাইবে এটা? কিন্তু রাতটি এতটাই কঠোর ছিল যে কেউই সাড়া দিল না। হুজাইফা ইবন আল-ইয়ামান, যিনি সেই রাতে উপস্থিত ছিলেন, পরে বলেছিলেন— “আমরা নিজেদের গায়ে ভারি কাপড় জড়িয়ে নিয়েছিলাম, হিম শীতের কারণে, ক্ষুধা আর রাতের আতঙ্কে— শুধু যেখানে ছিলাম সেখানেই পড়ে থাকার চেষ্টা করছিলাম। “আমি জীবনে কখনো এত অন্ধকার রাত বা এত ভয়ংকর ঝড় আর কখনো দেখিনি। এতটাই অন্ধকার ছিল যে আমরা নিজেদের আঙুলের ডগাও দেখতে পাচ্ছিলাম না। আর বাতাস গর্জন করছিল যেন বজ্রের মতো।” যখন কেউ সাড়া দিল না, আল্লাহর রাসূল ﷺ হুজাইফাকে ডাকলেন। “যাও, শত্রু সম্পর্কে আমাকে খবর এনে দাও।” হুজাইফা বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। এমন জমাট শীতে তিনি কীভাবে যাবেন?

তখন নবী ﷺ তাঁর জন্য দোয়া করলেন। “হে আল্লাহ, তাকে সামনে থেকে রক্ষা করুন, পেছন থেকে, ডান দিক থেকে, বাম দিক থেকে, উপর থেকে এবং নিচ থেকে।” হুজাইফা বললেন, “সেই মুহূর্তেই আমার ভেতরের সব ভয় দূর হয়ে গেল। আর শীতও আমাকে ছেড়ে দিল।” তারপর নবী ﷺ আমাকে বললেন— “হুজাইফা, আমার কাছে ফিরে আসা পর্যন্ত এমন কিছু করবে না যাতে তারা সতর্ক হয়ে যায়। তীর ছুঁড়বে না, পাথর নিক্ষেপ করবে না, আর বর্শা বা তরবারি দিয়ে আঘাতও করবে না।” এরপর হুজাইফা চুপিচুপি কুরাইশদেরর শিবিরে ঢুকে পড়লেন। সেখানে তিনি কুরাইশদের নেতা আবু সুফিয়ানকে দেখলেন, আগুনের কাছে বসে নিজেকে গরম করছে। হুজাইফা তার ঠিক পেছনে চলে গেলেন। তার ধনুক-তীর প্রস্তুতই ছিল। তাদের নেতা সেখানেই ছিল। একটি তীরেই তিনি সেরা আঘাতটাই হানতে পারতেন। কিন্তু তিনি স্মরণ করলেন আল্লাহর রাসূল ﷺ কী বলেছিলেন, এবং নিজেকে সংযত রাখলেন। এর পেছনে আসলে আল্লাহরই হিকমত ছিল। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে রক্ষা করছিলেন যাকে তিনি পরে ইসলামের পথ দেখাবেন যেন সে কাফের অবস্থায় মারা না যায়। এরপর হুজাইফা ভিড়ের আরও ভেতরে এগিয়ে গিয়ে তাদের মধ্যেই মিশে গেলেন। আবু সুফিয়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার মনে সন্দেহ জাগল। এত অন্ধকার ছিল যে কাউকেই চেনা যাচ্ছিল না, তাই সে সতর্কতা নিল। “তোমার পাশের লোকটির বাহু ধরে তার নাম জিজ্ঞেস করো।” হুজাইফা প্রায় ধরা পড়েই যাচ্ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর হৃদয়ে একটি বুদ্ধি ঢেলে দিলেন। যখন সবাই শুধু পাশের লোকটিকেই ধরল, তিনি দ্রুত ডান পাশের লোকটির এবং বাম পাশের লোকটির দুজনেরই বাহু ধরে কঠোরভাবে জিজ্ঞেস করল— “তুমি কে?” তারা দুজনই নিজেদের নাম বলল, আর কেউই তাকে লক্ষ্য করল না। “হে আমার সদস্যবৃন্দ!

এই প্রচণ্ড বাতাস আমাদের সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের ঘোড়া ও উট মরতে শুরু করেছে। এখনই সবকিছু গুটিয়ে নাও এবং আমরা চলে যাবো!

কারণ আমি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” হুজাইফা তথ্য নিয়ে ফের রওনা হলেন। তখনও তিনি কোনো শীত অনুভব করছিলেন না। কিন্তু আল্লাহর রাসূলের ﷺ কাছে পৌঁছাতেই শীত আবার ফিরে এলো। তিনি নবী ﷺ-কে দেখলেন— তিনি গভীর বিনয়ে তাঁর রবের কাছে নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন। আর যখন তিনি তাঁর কাছে সুসংবাদ পৌঁছে দিলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুব স্বস্তি অনুভব করলেন। অবশেষে শত্রুরা পিছু হটতে চলেছে। তারপর এক রাতে আল্লাহ এমন এক প্রবল বাতাস পাঠালেন যে মরুর বালি উড়ে আকাশে উঠল, এবং মুশরিকদের তাঁবুগুলো ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ঝড় তাদের মুখে বালি ছুঁড়ে মারল, আর তাদের ঘোড়া ও উটগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ল, চারদিকে ছুটোছুটি করতে লাগল। সবকিছু একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। শত্রু বাহিনী বুঝতেই পারছিল না কী ঘটছে। দুর্দশা আর আতঙ্কে তারা পিছু হটতে শুরু করল, এবং পেছনে ফিরে তাকানো ছাড়াই পালিয়ে গেল। সূরা আল-আহযাব সেই মুহূর্তটি এভাবে বর্ণনা করে: “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন বাহিনী তোমাদের ওপর চড়াও হয়েছিল, আর আমরা তাদের ওপর পাঠিয়েছিলাম এক প্রবল বাতাস এবং এমন এক বাহিনী—যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। আর তোমরা যা করো আল্লাহ তা প্রত্যক্ষকারী।” অবরোধ শেষ হয়ে গেল, এবং শত্রুদের তাড়িয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু যারা মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তারা তো এখনো মদিনার ভেতরেই আছে। তাদের বিশ্বাসঘাতকতা উপেক্ষা করা যায়না। আল্লাহর রাসূল ﷺ খন্দক থেকে মাত্রই ফিরে এসেছিলেন, এবং তখনও তাঁর বর্ম খুলেননি, এমন সময় হঠাৎ জিবরীল (আলাইহিস সালাম) তাঁর সামনে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি অস্ত্র নামিয়ে রেখেছেন?” রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, আমরা নামিয়ে রেখেছি।” তখন জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বললেন: “কিন্তু আমরা এখনো নামাইনি। তাই তাদের দিকে রওনা হন।” যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। পরবর্তী লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল: বনু কুরাইযা। ইহুদিরাও জানত তাদের বিশ্বাসঘাতকতা অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য ছিলো। তারা বলল: “আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ এখনই আমাদের দিকে আসবে।” এবং তারা তাদের মজবুত দুর্গগুলোর ভেতরে আশ্রয় নিল। সে দেয়ালগুলোর আড়ালে নিজেকে নিরাপদ মনে করে, তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভয়ংকর অপমানজনক কথা ছুঁড়ে মারতে লাগল। আত্মসমর্পণের কোনো ইচ্ছাই তাদের ছিল না। তারা ভরসা করছিল মদিনার মুনাফিকদের দেয়া প্রতিশ্রুতির ওপর। মুনাফিকরা গোপনে তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিল— “মদিনা ছেড়ে যাবে না। আমরা সব রকমভাবে তোমাদের সাহায্য করব।” কিন্তু একটি বিষয় ইহুদিরা ভুলে গিয়েছিল— মুনাফিকরা কখনোই তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। তাদের মধ্যে থেকে দুইজন সজোরে বলে উঠলো, “এই লোকটাই যার সম্পর্কে ইবন হাইয়্যাবান আমাদের বলেছিল। তার সাথে যুদ্ধ করো না।” এরা কারা ছিল?

আর তারা যে ইবন হাইয়্যাবানের কথা বলছিল, সেই বা কে ছিল? সে কী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল?

ইবন হাইয়্যাবান ছিলেন এক ইহুদি আলেম, যিনি মদিনায় এসেছিলেন নবীজীর এর নবুয়ত পাওয়ার আগেই। তিনি বলেছিলেন: “নবীর আগমন খুবই সন্নিকটে। আর এটাই সেই স্থান, যেখানে তিনি হিজরত করবেন।” নবীর দাওয়াত শুরু হওয়ার অনেক আগেই, তিনি বনু নাদিরকে তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন। তারপর তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। যখন তিনি এসব কথা বলেছিলেন, দুই ভাই—উসাইদ ও সা’লাবাহও সেখানে ছিল এবং স্পষ্টভাবে তা শুনেছিল। আর এখন, তারা সেই দুই ভাইয়ের ডাক অগ্রাহ্য করল। বনু কুরাইযা তাদের দুর্গের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। মুনাফিকদের কাছ থেকে যে সাহায্য তারা আশা করেছিল, তা-ও আর আসছিল না। এবং অবশেষে তারা বুঝতে পারল— অবরুদ্ধতা সহজে শেষ হবে না। তাই অসহায় হয়ে তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে আলোচনা করতে চাইল। “আল্লাহর কসম, আমরা আত্মসমর্পণ করব না যতক্ষণ না আপনি আমাদের শর্ত মানেন!” কিন্তু তাঁর জবাব ছিল কঠোর ও দৃঢ়। “না। তোমাদের সামনে আর কোনো পথ নেই— নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করো এবং আমার রায় মেনে নাও।” অন্য কোনো উপায় নেই বুঝতে পেরে, অবশেষে ইহুদিরা আত্মসমর্পণ করল। বনু কুরাইযা এতদিন একের পর এক অপরাধ করেই গিয়েছিল। প্রথমে তারা চুক্তি ভেঙেছিল এবং শত্রুদেরর সাথে যোগসাজশ করেছিল। তার ওপর আবার ক্ষমা চাওয়ার বদলে, তারা নবী ﷺ -কে অপমানজনক কথা বলে আঘাত করেছিল। তাদের সব বিশ্বাসঘাতকতার পরও, আল্লাহর রাসূল ﷺ তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করেছিলেন যার ইতিহাসে কোন তুলনা হয় না। তিনি নির্দেশ দিলেন— শাস্তি কার্যকর করা হবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, রাগ বা প্রতিশোধের বশে নয়। কারণ ইসলামী আইনে, ব্যক্তিগত আবেগ মিশিয়ে শাস্তি দেওয়া যায় না। শুনতে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু যখন তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছিল, তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন তাদেরকে খাবার, পানি এবং দুধ দিতে। দিনটি ভীষণ গরম ছিল, আর তিনি চাননি তাদেরকে সেই প্রখর রোদে শাস্তি দেওয়া হোক। তিনি বললেন: “সূর্যের তাপকে তরবারির তাপের সাথে একত্র করো না।” সুবহানাল্লাহ (আল্লাহ পবিত্র)। খন্দকের যুদ্ধ ছিল মুসলিমদের জন্য মোড়-ঘোরানো এক অধ্যায়। তিনটি ইহুদি গোত্রকেই মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, এবং মুশরিকরা আর হুমকি হিসেবে রইল না। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন: “এই যুদ্ধের পর, আমরাই তাদের ওপর আক্রমণ করব, আর তারা আমাদের ওপর আক্রমণ করতে আসবে না।” আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল। মুশরিকরা আর কখনোই তাদের শক্তি ফিরিয়ে আনতে পারেনি, অন্যদিকে মুসলিমরা প্রতিদিন আরও শক্তিশালী হতে থাকল সমগ্র আরব উপদ্বীপ জুড়ে। হিজরতের ৫ম বছরে, নবী ﷺ সংবাদ পেলেন যে, বনু আল-মুস্তালিক গোত্র মদিনার বাড়তে থাকা শক্তিকে হুমকি হিসেবে দেখছে, এবং তারা তাদের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ সংবাদ শুনে সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় ৭০০ সাহাবিকে একত্র করলেন। আর সূর্যোদয়ের পর, তারা সেই স্থানে পৌঁছাল, যেখানে বনু আল-মুস্তালিক শিবির স্থাপন করেছিল। গোত্রটি ছিল পুরোপুরি অপ্রস্তুত। এরপর আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর বাহিনীকে যুদ্ধসজ্জায় সাজালেন, এবং এক আকস্মিক আঘাতে এই হুমকিটি নির্মূল করে দিলেন। শত্রুরা সম্পূর্ণ পরাজিত হলো। কিন্তু বাহিনীর ভেতরেই ছিল আরও ভয়ংকর এক শত্রু। মদিনায় ফেরার পথে, অপ্রত্যাশিত সমস্যার সূচনা হতে যাচ্ছিল। সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল মুনাফিকদের প্রধান, আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সালুল। যদি নবী ﷺ বাইরে থাকা কালে সে মদিনায় থেকে যেত, তাহলে সে গোলযোগ ও অশান্তি ছড়াতে পারত। এই কারণেই আল্লাহর রাসূল ﷺ এই অভিযানে তাকে সঙ্গে নিয়েই এসেছিলেন। তিনি যখন মুসলিমদের সঙ্গে থাকতেন, তখন তিনি প্রশংসা করতেন এবং সমর্থন দিতেন—নবীজীকে। কিন্তু যখন তিনি একা থাকতেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে, তখন তিনি ইসলামবিরোধী কথা বলতেন এবং ঈমানদারদের উপহাস করতেন। তার সম্পর্কে এবং তার মতো লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: “যখন তারা মুমিনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’; কিন্তু যখন তারা তাদের শয়তানদের সঙ্গে গোপনে মিলিত হয়, তখন বলে, ‘আমরা তো তোমাদেরই সঙ্গে আছি; আমরা তো কেবল ঠাট্টা করছিলাম।’” প্রতি শুক্রবার তিনি মসজিদে নববীতে আসতেন এবং মুসলিমদের মাঝে বসতেন। তিনি নবী ﷺ-এর খুতবা শুনতেন, আর খুতবা শেষ হলে, হঠাৎ দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতেন: “সম্মানিত উপস্থিতি!

রাসূলকে সবাই সাহায্য করো, যাকে আল্লাহ তোমাদের মধ্যে পাঠিয়েছেন!

তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের সম্মানিত করেছেন, তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং বিজয় দিয়েছেন। অতএব তাঁর কথা শোনো, সম্মান করো এবং তাঁর আনুগত্য করো।” তিনি প্রতি শুক্রবারই এটা করতেন। অন্তত উহুদের দিনের আগ পর্যন্ত' যেদিন তিনি ৩০০ জনকে নিয়ে বাহিনী থেকে সরে পড়েছিলেন। সাধারণত তাকে যখন কোনো সামরিক অভিযানে যেতে বলা হতো, তিনি যেতেন না। পিছিয়ে থাকার জন্য তিনি সব সময়ই কোনো না কোনো অজুহাত বের করতেন। কিন্তু এবার তিনি যোগ দিলেন, কারণ তিনি তেমন কোনো প্রকৃত বিপদ দেখতে পাচ্ছিলেননা। আর আসলে তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদের লোভে ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি খুঁজছিলেন এমন একটি সুযোগ যার মাধ্যমে তিনি মুসলিমদের মধ্যে অশান্তি ও বিভেদ সৃষ্টি করতে পারেন, যারা দিনে দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। আর সে সুযোগ তার হাতে আসবে দু’বার। তো, তাহলে এই ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রথমটি কী ছিল?

অভিযান থেকে ফেরার পথে, মুসলিম বাহিনী একটি কূপের পাশে শিবির স্থাপন করল। সবাই পালা করে পানি তুলছিল। কিন্তু একটি ছোট ঝগড়াই মুনাফিকদের জন্য একটি সুযোগ হয়ে দাঁড়াল। মুহাজিরদের (অভিবাসী) জাহজাহ ইবনে মাসউদ এবং আনসারদের (সাহায্যকারী) সিনান ইবনে ওয়াবার একই কূপ থেকে পানি তুলছিল, হঠাৎ তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। তারপর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হলো, এবং জাহজাহ রাগে সিনানের দিকে এগিয়ে গেল। এটা দেখে সিনান চিৎকার করে বলল: “হে মুহাজিরগণ (অভিবাসীরা)! তোমরা কোথায়?

এসো আমাকে রক্ষা করো!” মুহূর্তের মধ্যে আনসার ও মুহাজিররা যারা ভ্রাতৃত্বের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই ফিতনা (বিভেদ) ছড়ানোর জন্য একদম উপযুক্ত সুযোগ পেয়ে গেল, এবং সে এটাকে কাজে লাগাতে যা যা পারল, সবই করল। “হে আনসার! এই মুহাজিররা তোমাদের মাধ্যমেই শক্তি ও সম্মান পেয়েছে, আর এখন তারা তোমাদের সঙ্গে এমন অহংকার ও অসম্মানজনক আচরণ করছে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের শহরে আশ্রয় দিয়েছ, বাসস্থান দিয়েছ। তোমরা তাদের সাথে তোমাদের সম্পদ আর খাবার ভাগ করে খেয়েছ। তোমরা যে অপমান এখন সহ্য করছ, তার জন্য দায়ী কিন্ত তোমরাই।” “আল্লাহর কসম!

আমরা যখন মদিনায় ফিরব, তখন সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি সবচেয়ে নীচকে বের করে দেবে।” এখানে সে রাসূল ﷺ ও মুহাজিরদেরই বোঝাচ্ছিল— মা‘আযাল্লাহ (আল্লাহ রক্ষা করুন)। এই উসকানিমূলক কথাগুলো আগেই টানটান পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে দিল। আল্লাহর রাসূল ﷺ যখন ঘটনা শুনলেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সাহাবিদের কাছে গেলেন। তিনি কঠোরভাবে বললেন: “জাহেলিয়াতের যুগের মতো হানাহানি কেন?” আর যখন দেখলেন—এত ছোট্ট একটা বিষয়ে আনসার ও মুহাজিররা বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে, তখন তিনি বললেন: “এই জাহেলিয়াতের মতো আচরণ ছেড়ে দাও, কারণ এটা ভীষণ নোংরা!” তিনি এত কঠোর সতর্কতা দিয়েছিলেন, কারণ এসবের পেছনে ছিল একধরনের গোত্রগর্ব, বর্ণবাদ এবং বস্তুগত শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার। কিন্তু ইসলামে শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়ার মাধ্যমে, অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় করে সচেতন থাকা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, এবং তাঁর নির্দেশ মান্য করার মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই কথাগুলো সাহাবাদের হৃদয় গভীরভাবে স্পর্শ করল। এবং সিনান জাহজাহকে ক্ষমা করে দিল। এভাবে যারা নিজেদের গোত্র নিয়ে গর্ব করে যেতে থাকে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল ﷺ পরে বলেছিলেন: “যে ব্যক্তি গোত্রবাদে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। যে ব্যক্তি গোত্রবাদের জন্য লড়াই করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর যে ব্যক্তি গোত্রবাদের ওপর মৃত্যুবরণ করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নিলেন। দিনের সবচেয়ে প্রচণ্ড গরম সময়ে, তিনি মুসলিম বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন মদিনার দিকে রওনা হতে। সে দিন পর্যন্ত তারা কখনোই এত দহনকারী গরমে রওনা হয়নি। কিন্তু নবীজীর এই নির্দেশের পেছনে ছিল এক বিশেষ প্রজ্ঞা। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর সাহাবারা আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কথাবার্তা নিয়ে আলোচনায় না জড়াক। তারা বিকেলে রওনা হলো, এবং ফজরের প্রথম আলো ফোটার আগ পর্যন্ত থামল না। তারা এতটাই ক্লান্ত ও নির্ঘুম হয়ে পড়েছিল যে, দাঁড়িয়ে থাকাটাও যেন কঠিন হয়ে গেল। যেখানে ছিল সেখানেই লুটিয়ে পড়ল, এবং সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়লো। এভাবে তাদের মন অন্যদিকে চলে গেল, এবং বিষয়টি আরও বড় হয়ে ওঠা থেকে বন্ধ করা গেলো। এই ঘটনার মাধ্যমে, আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদেরকে একটি চিরস্থায়ী শিক্ষা দিলেন। একজন মুসলিমের উচিত সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখা। কখনো অলস বসে থাকা নয়। কারণ কাজ না করা আর অলসতা হারাম আনন্দের দরজা খুলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত গুনাহে নিয়ে যায়। তো শেষপর্যন্ত, এই ঘটনার পরও কি মুনাফিকদের নেতা গোলযোগ থামিয়েছিল?

অবশ্যই না। সে তখনও আরেকটি সুযোগ খুঁজছিল ফিতনা ছড়ানোর জন্য। এবং খুব দ্রুতই সে দ্বিতীয় সুযোগটি পেয়ে গেল। এবার সে সাহস করবে অপবাদ দিতে নবী ﷺ -এর নিজের পরিবারকেই। বাহিনী যখন মদিনার দিকে ফিরে চলছিল, তারা দূরে দুইজনকে দেখতে পেল, যারা তাদেরকে ধরে ফেলতে চেষ্টা করছিল। তাদের একজন উটে চড়ে ছিল, আর অন্যজন উটের পাশে হাঁটছিল, উটের লাগাম ধরে। উটের ওপর থাকা ব্যক্তি ছিলেন আমাদের মা—আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)। আর যিনি উটটি চালিয়ে আনছিলেন, তিনি ছিলেন সাফওয়ান ইবন আল-মু‘আত্তাল। আবদুল্লাহ ইবন উবাই এই দৃশ্যটিকে বিকৃত করে নবীজীর পবিত্র ও সম্মানিত স্ত্রী সম্পর্কে একটি ভয়ংকর অপবাদ রটাবে। “আল্লাহর কসম, সে তার থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি, আর সেও তার থেকে নির্দোষ ছিল না।” অর্থাৎ—মা‘আযাল্লাহ (আল্লাহ না করুন)— তাদের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছিল—এই ইঙ্গিত করছে। আর এই কথাগুলো বলেই, সে গুজব ও ফিতনা রটানো শুরু করে দিল। ওই ভয়াবহ অপবাদটা বাহিনীর মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। একজন থেকে আরেকজনের কাছে পৌঁছাতে থাকল। কিন্তু এর পেছনের সত্যটা আসলে কী ছিল?

চলুন—শুরুটা কোথা থেকে হয়েছিল—সেখানে ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ যখনই কোনো অভিযানে যেতেন, তিনি তাঁর স্ত্রীদের মধ্য থেকে একজনকে সঙ্গে নিতেন। এবার তাঁর সঙ্গে যিনি গিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন আমাদের মা—আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)। সাহাবারা যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তখন কিছুটা দূরে চলে গিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয়তা সারতে। ফিরে এসে দেখলেন, তারা রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু ঠিক তখনই তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর হারটি কোথায় হারিয়ে গেছে। তিনি ভাবলেন, বাহিনী তাঁকে ছাড়াতো আর রওনা হবে না, তাই তিনি আগের সেই জায়গায় ফিরে গেলেন হারটি খুঁজতে। কিন্তু হারটি পেতে তাঁর কিছুটা সময় লাগল। আর ততক্ষণে বাহিনী রওনা হয়ে কিছু দূর এগিয়ে গেছে, তিনি যে অনুপস্থিত, তা কেউ টেরই পায়নি। তখন অবশ্য নারীদের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তারা পর্দাবদ্ধ উটের পিঠে বসানো তাঁবুর মতো বাহনে ভ্রমণ করতেন—যাকে বলা হতো হাওদাহ্‌। আমাদের মা আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) খুব একটা ভারি ছিলেন না বলে, যারা হাওদাহহ্‌ উঠিয়েছিল, তারা বুঝতেই পারেনি তিনি ভেতরে নেই। আর তারা রওনা হয়ে গেল। আমাদের মা ফিরে এসে দেখলেন বাহিনী চলে গেছে। মরুভূমিতে একা ভ্রমণ করা বিপজ্জনক ছিল, তাই তিনি যেখানে ছিলেন, সেখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন, “যখনি তারা বুঝতে পারবে আমি নেই, তখনি তারা আমাকে নিতে ফিরে আসবে।” কিছুক্ষণ পর তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। তিনি যখন ঘুমাচ্ছিলেন, দূর থেকে একজন ধীরে ধীরে কাছে এলেন। তিনি ছিলেন সাফওয়ান ইবন আল-মু‘আত্তাল। সাফওয়ান ছিলেন বাহিনীর ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র সংগ্রহ করার দায়িত্বে। যা কিছু পড়ে যেত বা ভুলে যাওয়া হতো, তিনি পিছনে থেকে সেগুলো তুলতেন এবং পরের শিবিরে পৌঁছে দিতেন। সেদিনও বাহিনী চলে যাওয়ার পর এলাকাটা দেখতে তিনি এসেছিলেন, আর দেখলেন—মাটিতে কেউ একজন ঘুমিয়ে আছে। তিনি যখন বুঝতে পারলেন যে, এটা আমাদের মা আয়েশা, তখন তিনি বললেন: “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন— (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর, এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব)।” তার কণ্ঠস্বর শুনে আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। একটি কথাও না বলে, সাফওয়ান তার উটটি বসিয়ে দিলেন, তারপর একটু সরে দাঁড়ালেন— যাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে ও পর্দার সঙ্গে উঠতে পারেন। এরপর তিনি উটের লাগাম ধরলেন এবং বাহিনীর শিবিরের দিকে রওনা দিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর তারা অবশেষে বাহিনীর বাকি অংশের সঙ্গে মিলিত হলো। আবদুল্লাহ ইবন উবাই যখন এটা দেখল, সে এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিল— নবী ﷺ এবং তাঁর দাওয়াতকে ক্ষতি করার জন্য। অপবাদটি একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়াতে লাগল। আর অল্প সময়ের মধ্যেই, পুরো মদিনা শহরে ভাইরাল হয়ে গেলো। দুঃখজনকভাবে, শীর্ষস্থানীয় তিনজন সাহাবিও এ অপবাদ বিশ্বাস করে ফেললেন এবং তা নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। মদিনাজুড়ে ফিতনা ছড়িয়ে পড়লেও, আমাদের মা আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এসবের কিছুই জানতেন না। কারণ অভিযান থেকে ফিরার পরপরই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কিছুদিন বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। কী বলা হচ্ছে তিনি জানতেন না বলে, তিনি অপবাদ অস্বীকার করতে বা নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। স্পষ্টতই—এটাও ছিলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আরেকটি পরীক্ষা। ঠিক যেমনটা উহুদের যুদ্ধে হয়েছিল। মনে আছে, যখন এক মুশরিক চিৎকার করে বলেছিল: “আমি মুহাম্মদকে মেরেছি!” অথচ বাস্তবে আল্লাহর রাসূল ﷺ একটি গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন। সেবার সাহাবাদের পরীক্ষা হয়েছিল— কে যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকতে পারে, আর কে পিছিয়ে পড়বে। কিন্তু এবার পরীক্ষাটা ছিল একেবারে আলাদা। এটা ছিল—কে এমন গুজব ছড়াতে অংশ নেবে যা তারা নিজের চোখে দেখেনি, আর কে তা থেকে দূরে থাকবে। আল্লাহ আয়েশাকে (রাদিয়াল্লাহু আনহা) পুরোপুরি অজ্ঞাত রেখেছিলেন— কী বলা হচ্ছে সে সম্পর্কে। সময় গড়াতে গড়াতে, যারা বলতো যে, “প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত, এটা কেবল একটা মিথ্যা অপবাদ”—তারা যেমনটা একদিকে, আর অন্যদিকে যারা এটাকে ছড়াতে সাহায্য করেছিল, তাদের সবারি একে একে মুখোশ খুলে গেল। এটা ছিল অত্যন্ত কঠিন এক পরীক্ষা— যা কেবল আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর মতো দৃঢ় একজন নারীর পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব ছিল। আমাদের মা এখনও কিছুই জানতেন না। কিন্তু তিনি লক্ষ্য করতে শুরু করলেন— রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আচরণে পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো আর একই ভালোবাসা ও যত্ন দেখাচ্ছিলেন না। তিনি তাঁর নামও আর উচ্চারণ করতেন না। বরং আয়েশার অবস্থা জানতে চাইলে, তিনি তাঁর মাকে জিজ্ঞেস করতেন, “আপনার রোগী কেমন আছে?” এই দূরত্বপূর্ণ আচরণটা আয়েশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) হৃদয়ে ভীষণ আঘাত হয়ে বসেছিল। তিনি বুঝতেই পারছিলেন না, কেন আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করছেন। প্রায় ২০ দিন পর, তিনি বিছানা ছেড়ে বের হওয়ার মতো সুস্থ হলেন, এবং মিস্তাহ ইবন উসাসার মায়ের সঙ্গে বাইরে গেলেন। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) যখন নিজের সম্পর্কে গুজবের কথা শুনলেন, তিনি এমন ধাক্কা খেলেন যে কষ্টে কেঁপে কেঁপে উঠলেন, মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং অজ্ঞান হয়ে গেলেন। এরপরের দিনগুলোতে, তিনি এত বেশি কেঁদেছিলেন যে আগের চেয়েও আরও বেশী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি যখন বাবার বাড়ি পৌঁছালেন, তিনি বললেন: “আমার মা, লোকেরা আমার সম্পর্কে কী বলছে?

আর আপনি আমাকে জানাননি কেন?” এবং তারপর তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। তার মা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। ঠিক সেই সময়, আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছাদের ওপর কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। মেয়ের কান্না শুনে তিনি নিচে নেমে এলেন, তার পাশে বসে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। তার অন্তর ছিল মেয়ের নিষ্পাপতার ব্যাপারে দৃঢ় ঈমানে পূর্ণ। কিন্তু পুরো ঘরটাই গভীর শোকে ভরে ছিল এই ভয়ংকর অপবাদের কারণে। এটা ছিল এমন এক কঠিন পরীক্ষা, যা একজন নারী কখনোই সহ্য করতে পারে না। তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইলেও, ইতোমধ্যেই সবাই অপবাদটা শুনে ফেলেছিল, আর কেউ কেউ তো তা বিশ্বাসও করে ফেলেছিল— অথচ তাদের কেউই নিজ চোখে কিচ্ছু দেখেনি। তারা শুধু অন্যদের কথা পুনরাবৃত্তি করতে যোগ দিয়েছিল। বাহ্যিকভাবে দেখলে, মনে হবে এটা যেন কেবল সাধারণ কিছু কথাবার্তা। দেখতে তুচ্ছই মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে—এর ভার, আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা— ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এই ঘটনাই দেখিয়ে দিল— জিহ্বা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। আর কেন ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া সাতটি মহাপাপের অন্তর্ভুক্ত। মাত্র একটিমাত্র কথায় অগণিত পরিবারের শান্তি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) দোষী—এমন সামান্যতম লক্ষণও ছিল না, তবুও মুনাফিকরা সমালোচনা থামাচ্ছিলই না। তারা লাগাতার বলেই যাচ্ছিল। সেই দিনগুলো আয়েশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) জন্য জীবনের সব কষ্টের চেয়েও কঠিন ছিল। “আমার চোখের পানি থামছিলো না, ঘুমও আসতো না। আমি এত কেঁদেছিলাম যে মনে হতো, কান্নায় আমার কলিজা ফেটে যাবে।” তাকে এমন অবস্থায় দেখে এক আনসারী নারী অনুমতি চাইল তার সঙ্গে থেকে কাঁদার জন্য। আয়েশা সম্মতি দিলে, তারা দু’জন একসঙ্গে কাঁদল। অপরদিকে, আবদুল্লাহ ইবন উবাই যে এই অপবাদটা শুরু করেছিল এবং এত কষ্টের কারণ হয়েছিল সে এমন পরিস্থিতি দেখে সন্তুষ্টই ছিল। তার উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গিয়েছিল। ভয়ংকর এক মিথ্যা দিয়ে সে মুসলিমদের কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যেখানে যেত, সে এই প্রসঙ্গটা নিয়েই কথা বলতে থাকত, আরও বেশি ছড়ানোর জন্য যা পারত সবই করত। রাসূলুল্লাহ ﷺ খুব ভালোভাবেই জানতেন— তাঁর প্রিয় আয়েশা এই অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ। কিন্তু এত নির্মম ও ধোঁকাবাজ অপবাদ মানুষের মধ্যে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে— এ দৃশ্য তাঁর হৃদয়ে ভার হয়ে বসেছিল। আর সেই কষ্টকর দিনগুলোতে, কোনো প্রমাণ ছাড়া তিনি আমাদের মা আয়েশাকে কোনভাবেই রক্ষা করতে পারতেন না। তিনি যদি তা করতেন, মুনাফিকরা তাঁকে অভিযুক্ত করত— তিনি স্ত্রীকে ভালোবাসেন বলেই পক্ষপাত করছেন। আর তা একজন নবীর ইনসাফবোধের সঙ্গে মানাত না। আর তথাকথিত ঐসব মুসলিমদের সংখ্যাও কম ছিল না। তাই রাসূলুল্লাহর আর কোনো উপায় ছিল না— অপেক্ষা করা ছাড়া। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু এই আল্লাহর পরীক্ষার অংশ হিসেবে, সেই ওহী পুরো এক মাস পর্যন্ত আর আসেনি। এই দীর্ঘ অপেক্ষাই কি প্রমাণ করে না যে, তিনি সত্যিই আল্লাহর রাসূল?

এবং ওহী কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই তাঁর কাছে আসত? যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজ নফস (ইচ্ছা/স্বভাব) থেকে কোন কথা বলতেন, যদি মা‘আযাল্লাহ (আল্লাহ না করুন) তিনি কুরআনের আয়াত বানিয়ে নিতেন, তাহলে কি তিনি পুরো এক মাস এত কষ্ট সহ্য করতেন?

৩০ দিন তো দূরের কথা—৩০ মিনিটেই একটা আয়াত বানিয়ে (মা‘আযাল্লাহ) তিঁনি বিষয়টা শেষ করে দিতে পারতেন। কিন্তু সমস্ত কষ্টের মধ্যেও তিনি ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করলেন— ওহি নাযিল হওয়ার জন্য। আল্লাহর রাসূল ﷺ আয়েশার বাবা-মায়ের বাড়িতে গেলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বললেন: “হে আয়েশা, তোমার সম্পর্কে এমন-এমন কথা আমার কাছে পৌঁছেছে যে বলার ভাষা আমার নেই। যদি তুমি নির্দোষ হও, আল্লাহ তোমার নির্দোষতা প্রকাশ করবেন। আর যদি তুমি কোনো গুনাহ করে থাকো, তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও এবং তাঁর কাছে তাওবা করো।” “আল্লাহর কসম, আমি জানি—লোকেরা যা বলছে তা আপনি শুনেছেন। আর সেটা আপনার মনে গেঁথে আছে, এবং আপনি সেটাকেই মনে হয় সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। এখন আমি যদি বলি—আমি নির্দোষ, আর আল্লাহ জানেন আমি নির্দোষ, তবুও কী আমাকে বিশ্বাস করবেন না। আর আমি যদি মিথ্যে জেনেও স্বীকার করি যে আমি অপরাধী, আর আল্লাহ জানেন আমি নির্দোষ— তাহলে আপনি আমাকে বিশ্বাস করবেন। আল্লাহর কসম, আমার ও আপনাদের জন্য আমি কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাচ্ছিনা ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর পিতার কথাটি ছাড়া— যখন তিনি বলেছিলেন: ‘সুতরাং উত্তম ধৈর্যই আমার জন্য সর্বোত্তম। আপনারা যা বলছেন, তার ব্যাপারে আমি কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই।’” আর ঠিক সেটাই তিনি করলেন। তিনি ধৈর্য ধরলেন, আর চোখে অশ্রু নিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে তাঁর সাহায্য চাইতে লাগলেন। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কথা শেষ করা মাত্রই হঠাৎ আল্লাহর রাসূল ﷺ -এর ওপর এক ভিন্ন অবস্থা নেমে এলো। তাঁর পবিত্র কপাল থেকে ঘামের ফোঁটা ঝরতে লাগল। এটাই ছিল ইঙ্গিত— দীর্ঘ অপেক্ষার দিনগুলো অবশেষে শেষ হয়েছে। আল্লাহর বার্তা—ওহী— নাযিল হচ্ছিল। কিন্তু আমাদের মা আয়েশার মনে একটুও দুশ্চিন্তা ছিল না। তিনি নিশ্চিত ছিলেন— আল্লাহ তাঁর ইনসাফ প্রকাশ করবেনই, আর খুব শিগগিরই সবার সামনে তাঁর নির্দোষতা স্পষ্ট হবেই। ওহী শেষ হলে রাসূল ﷺ-এর মুখে বড় এক উজ্ঝল হাসি ফুটে উঠল। তিনি আয়িশা (রা.)-এর দিকে ফিরে বললেন— “হে আয়িশা,” “আল্লাহ তোমার নির্দোষতা ঘোষণা করেছেন!” নাযিল হওয়া আয়াতগুলোতে আল্লাহ বলেছেন: “নিশ্চয়ই যারা অপবাদ রটিয়েছে, তারা তোমাদেরই একদল লোক। তোমরা একে তোমাদের জন্য মন্দ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকেই গুনাহ থেকে নিজ পাপের অংশ অর্জন করেছে, আর তাদের মধ্যে যে এতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে, তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” যে শোক বহুদিন ধরে ঘরটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, অবশেষে তা কেটে গেল। আল্লাহর রাসূল ﷺ , আয়েশা ও তাঁর বাবা-মা— সবাই স্বস্তির গভীর নিশ্বাস ফেললেন। পুরো এক মাসের কষ্ট ও অপেক্ষার পর, অবশেষে নাযিল হওয়া আয়াতগুলো আয়েশার নির্দোষতা নিশ্চিত করল। আর এর মাধ্যমে, মদিনাজুড়ে যে ফিতনা ছড়িয়েছিল, তা অবশেষে শেষ হয়ে গেল। সত্য অবশেষে প্রকাশ পেল। নিশ্চয়ই এখন আয়েশা শান্তি ও স্বস্তিতে আছেন। আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর)। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-কে অভিযোগ থেকে মুক্ত ঘোষণা করা এবং যে ব্যক্তি এটি শুরু করেছিল তার শাস্তির কথা উল্লেখ করা আয়াতের পর, আরও কিছু আয়াত নাযিল হয়েছিল। এবার, যারা অপবাদ ছড়িয়েছিল তাদের সম্পর্কে। “যখন তোমরা এক মুখ থেকে আরেক মুখে এ কথা ফেরি করছিলে, আর মুখে বলছিলে আর মুখে এমন কথা বলছিলে যার কোনো ধারনাই তোমাদের ছিল না, একেবারে হালকা মনে করছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুতর।” কারণ অপবাদ ছিল একটি গুনাহ, কারও সম্মান ও অধিকারে আঘাত— তাই তাদেরকে এর শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল। যে তিনজন সাহাবি গুজবটি বিশ্বাস করে তা পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, আর এরফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে এটা ছড়াতে সাহায্য করেছিলেন, তাদেরকে নবী ﷺ -এর সামনে ডাকা হলো। “আল্লাহর রাসূল ﷺ আপনাদের ডাকছেন।” তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন, অন্তরজুড়ে ছিলো অনুশোচনায় ভরা। রাসূল ﷺ তাদের ওপর রাগ করলেন না, বিদ্বেষও রাখলেন না। কিন্তু অপবাদ— আর তাতে অংশ নেওয়ার শাস্তি ইসলামে স্পষ্ট ছিল। প্রকাশ্যে প্রত্যেকে পেল আশিটি করে বেত্রাঘাত। এই শাস্তি শুধু তাদের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মদিনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠেছিল। যারা সেটা দেখেছিল, তারা এরপর আর কখনও না জেনে কোনো কথা বলত না। শুধু এই ঘটনাই নয় বরং, বড় বড় অপরাধের ক্ষেত্রেও ইসলাম দিয়েছে স্পষ্ট আইন ও শাস্তি যাতে মানুষ অপরাধে নিরুৎসাহিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিরোধ। ফলে সমাজে অপরাধ ছিল অবিশ্বাস্যভাবে কম। আর এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রক্ষা করছেন আরও ভয়াবহ শাস্তি থেকে, আখিরাতের শাস্তি থেকে। এ আইন প্রয়োগের সময়ও কারও প্রতি জুলুম করা হয়নি। সবাই ছিল সমান। শক্তিশালী-দুর্বল, ধনী-গরিব, স্বাধীন-দাস, কারও জন্য ছিল না বাড়তি ছাড়। যেমন, মদিনায় একবার চুরির ঘটনা ঘটেছিল। বনু মাখজুম গোত্রের লোকেরা এক নারী চোরের জন্য সুপারিশ করতে চাইল, আর তারা রাসূল ﷺ-কে অনুরোধ করল, যেন শাস্তি দেয়া না হয়। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা দিলেন “ওহে লোকসমাজ!

তোমাদের আগের জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে, কারণ তাদের অভিজাতরা চুরি করলে তারা শাস্তি দিত না। আর দুর্বল কেউ চুরি করলে তখনই শাস্তি কার্যকর করত।” “আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করত, আমি তারও হাত কেটে দিতাম।” তো তবে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কী হলো? যে মানুষ এত বড় গোলযোগ বাধিয়েছিল— সে কি শাস্তি পাবে না? আর সে তো শুধু এই এক ঘটনাতেই থেমে থাকেনি। উহুদের যুদ্ধ মনে আছে?

তার প্রতারণামূলক কথায় মুসলিম বাহিনীর প্রায় ৩০০ জন যুদ্ধ শুরুর আগেই ফিরে গিয়েছিল। সে মুশরিক আর ইহুদিদের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করত, সবসময় মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। মুমিনদের মধ্যে ফিতনা ছড়াত, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ভাঙতে চেষ্টা করত। রাসূল ﷺ এসব সবই জানতেন। তবু তিনি ধৈর্য ধরলেন— নীরব থাকলেন। একদিন উমর (রা.) আর সহ্য করতে পারলেন না। আব্দুল্লাহ ইবন উবাই যে ফিতনাগুলো সৃষ্টি করছিল। তিনি রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে অনুমতি দিন' আমি এই মুনাফিকের মাথা কেটে দিই!” কিন্তু রাসূল ﷺ-এর জবাবেই ছিল হিকমাহ। তিনি বললেন— “ওকে ছেড়ে দাও। না হলে মানুষ বলবে— মুহাম্মদ নিজের সঙ্গীদেরই হত্যা করছেন। আপনার কি মনে আছে, নবী ﷺ-এর হিজরতের আগে কিন্ত ইবনে উবাই মদিনার রাজা হতে যাচ্ছিল। তার জন্য মুকুট পর্যন্ত বানানো হয়েছিল। মানুষের কাছে তার প্রভাব ছিল বিশাল। তাই অনেকেই তাকে এখনও বিশ্বাস করত। সে এত কৌশলে মুনাফিকি লুকাত, অনেকে তাকে সৎ মুসলিমই ভাবত। যার ওপর ভরসা করা যায়— এমন একজন। তাই যদি তাকে হত্যা করা হতো, মানুষ বলত— “মুহাম্মদ নিজের সাথীদেরই মেরে ফেলেন!” যে গোত্রগুলো ইসলাম গ্রহণের কথা ভাবছিল, তারাও ভয় পেয়ে বলত— “কাল চাইলে আমাদেরও মেরে দেবে!” এই ভয় দূর করতেই রাসূল ﷺ ধৈর্যকে বেছে নিলেন। আর কয়েক বছর পর তিনি এর ফলও পেয়ে ছিলেন, অপবাদের ঘটনার চার বছর পরে। হিজরির নবম বছরে ইবনে উবাই অসুস্থ হয়ে পড়ে মারা গেল। তার ছেলে আবদুল্লাহ ছিল একজন সৎ ও একনিষ্ঠ মুসলিম। সে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর কাছে এসে বলল: “হে আল্লাহর রাসূল, অনুগ্রহ করে আমাকে আপনার একটা জামা দিন, যাতে আমি তা আমার বাবার কাফন হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।” তারপর সে নবী ﷺ কে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন জানাযার নামাজ পড়ান এবং তার বাবার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন। ভাবতে পারেন—একজন ছেলের জন্য এটা কতটা কঠিন ছিল?

তার বাবা ছিল ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রুদের একজন— যেদিন থেকে নবী ﷺ মদিনায় পা রেখেছিলেন, সেদিন থেকেই। তবু আশ্চর্যের বিষয় হলো— রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে ফিরিয়ে দেননি। তিনি নিজেরই জামা আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের কাফন হিসেবে দিয়ে দিলেন। যখন তাকে জানানো হলো যে জানাযার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন, তখন তিনি গিয়ে জানাযার নামাজ পড়ালেন। এমনকি দাফনের জন্য তিনি তার কবর পর্যন্তও হেঁটে গেলেন। সাহাবিরা কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ কেন এমন একজন মানুষের জানাযা পড়ালেন, যে তার পুরো জীবনটাই ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে কাটিয়েছে? তিনি কেন এত দয়া দেখালেন এমন একজনকে, যে প্রতিটি সুযোগে মুসলিমদের ক্ষতি করতে চেয়েছিল?

এর নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিল— ভেতরে ছিল হয়তোবা গভীর কোন প্রজ্ঞা। আর নিঃসন্দেহে ছিলও তাই। “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কেন তাকে আপনার পরনের জামা দিতে গেলেন?” এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে, নবী ﷺ বললেন: “আমার জামা আর আমার নামাজ— কিছুই তাকে আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারবে না। তবে আমি আশা করি, এর মাধ্যমে তার গোত্রের এক হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করবে।” আর সত্যিই, এই কাজটি আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়েরের আশপাশের লোকদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কিছু সূত্রে পাওয়া যায়, সেই দিন নবী ﷺ-এর ধৈর্য ও দয়ার কারণে, প্রায় ১,০০০ মানুষ খাঁটি অন্তরে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। সুবহানাল্লাহ। বছরের পর বছর, মুসলিমরা কাবা জিয়ারতের জন্য আকুল ছিল। আর এখন, অবশেষে সেই সময় এসে গেল। “আমরা কি সত্যিই মক্কায় যাচ্ছি?” “হ্যাঁ।” এটি এমন এক সফর হতে যাচ্ছিল, যার শুরু হবে নবীজীর দেখা একটি স্বপ্নের মাধ্যমে। কিন্তু এই সফরের সমাপ্তি হবে এমনভাবে, যা কেউ কল্পনাও করেনি। “তাহলে, তোমরা এখানেই আমাদের বন্দি হয়ে থাকবে!” আর মুসলিমরা নিজেদেরকে দেখবে এমন একটি চুক্তি মেনে নিতে, যেটা তারা কখনোই মেনে নিতে চাইতো না। সেই চুক্তিটা কী ছিল?

আর সেই বিস্ময়কর সফরে আসলে কী ঘটেছিল? ইনশাআল্লাহ, পরের পর্বে আমরা সবই দেখব। সঙ্গেই থাকুন।
