# দাজ্জাল কি ইতোমধ্যেই আবির্ভূত হয়েছে? - হাদিসের বিস্ময়কর যেসব নিদর্শন আমরা খেয়াল করিনি!

- Language: bn
- Published: 2026-10-03
- Canonical: https://blog.towardseternity.com/bn/blog/dajjal-ki-itomdhzei-abirvuut-hzeche-hadiser-bismzkr-zesb-nidrsn-amra-khezal-krini
- Source video: https://www.youtube.com/watch?v=lrAr6lT_4gw
- Channel: Towards Eternity

This is the cleaned transcript of the source video. The speech is unaltered.

---

দাজ্জাল আসলে কে? মাহদি কি ইতোমধ্যেই আবির্ভূত হয়েছেন? ইয়াজুজ ও মাজুজ? দাব্বাতুল আরদ? নবী ঈসা (আ.)-এর আসমান থেকে অবতরণ— আরও কত কিছু। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শেষ যুগের বহু ঘটনা একটির পর একটি জানিয়ে গিয়েছেন। তবে এসব হাদিসের কিছু বর্ণনা আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে অনেক দূরের মনে হতে পারে। যেমনটা বলা যায়, দাজ্জালের এক দিন এক বছরের মতো আর আরেক দিন এক মাসের মতো হবে—এর অর্থ কী? ভেসে চলা মেঘের মতোই দ্রুত হবে কি তবে পৃথিবীজুড়ে তার ভ্রমণ? মাত্র ৪০ দিনে প্রতিটি শহরে তার প্রবেশ? তার বাহন—যার দুই কানের মাঝের দূরত্ব হবে ৪০ হাত? অথবা আকাশকে বৃষ্টি নামাতে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা আর পৃথিবীকে তার গুপ্ত সম্পদ উন্মোচন করতে বলা' ইত্যাদি ইত্যাদি? এসবের প্রকৃত অর্থ কী হতে পারে?

আজকের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এসব অসম্ভব বলেই মনে হতে পারে। আর এর ফলেই অনেকেই ওর ধোকায় পড়ে যাবে , আবার কেউ কেউ হাদিসের নির্ভরযোগ্যতাকেই প্রশ্ন করতে শুরু করবে। কিন্তু যদি আমরা এখানে কোনো প্রতীকী ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়ে থাকি? যদি এসব বর্ণনা সুন্দর এক রূপকধর্মী ভাষায় সহজ করে বলা সম্ভব হয় তো? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— যদি আমরা যে ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর অপেক্ষায় আছি, তার কিছু ইতোমধ্যেই ঘটে থাকে তো? যদি আমরা যে যুগে এখন বাস করছি, সেই যুগই ইতোমধ্যে গড়ে উঠছে এইসব ঘটনারই পরিপ্রেক্ষিতে, কিন্তু আমরা এখনও তা কি বুঝে উঠতে পেরেছি?

এই ভিডিওতে আমরা এইসব কঠিন প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাব না। আমাদের লক্ষ্য খুবই সহজ: সব প্রশ্ন ও সংশয় দূর করা এবং পরিষ্কার ও সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া। ভিডিওর শেষে আপনি দেখতে পাবেন, কীভাবে এই নিদর্শনগুলো আজকের বাস্তবতার সঙ্গে অসাধারণভাবে মিলে যায়। আর আপনি দেখবেন, কীভাবে আমাদের নবী ﷺ এক সত্যিকারের মু'জিযা হিসেবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগাম জানিয়েছিলেন। হাদিসগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার জন্য প্রস্তুত হন। চলুন, এই মৌলিক হাদিসটি দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করি: “আদম (আ.)-এর সৃষ্টি থেকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত, দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড় আর কোনো ফিতনা নেই।” একটু ভাবুনতো। কেউ যদি আপনার জীবন বা আপনার সম্পদ কেড়ে নেয়, তাহলে সে কেবল আপনার ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ারই ক্ষতি করছে। কিন্তু কেউ যদি আপনার ঈমান কেড়ে নেয়, তাহলে আপনি চিরস্থায়ী সুখ হারাবেন এবং দীর্ঘস্থাই আগুনের মুখোমুখি হবেন। তাই মানবজাতির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ফিতনা কেবলমাত্র এক বিশাল ঈমানহীনতার আন্দোলনই হতে পারে। এই ভিডিওজুড়ে আমরা অন্যান্য হাদিসের সূত্রগুলো ব্যবহার করে ধীরে ধীরে সম্ভাবনার পরিধি সংকুচিত করব। আমরা যে প্রতিটি দিক উন্মোচন করব, তা ধাঁধার একেকটি টুকরোর মতো কাজ করবে, যা পুরো চিত্রটি সম্পূর্ণ করতে সাহায্য করবে, যাতে আমরা পরিপূর্ণরূপে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলতে পারি। এখন এই দুটি পরিস্থিতি তুলনা করুন এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: কোনটি আপনার জন্য বড় হুমকি?

পরিস্থিতি ১: এক অতিমানবীয়, কাল্পনিক দানব হঠাৎ আপনার সামনে এসে বলে, “আমি দাজ্জাল। এখন নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে অস্বীকার করো।” আর যে তা মানতে অস্বীকার করবে, তাকে সে সরাসরি হত্যা করবে। পরিস্থিতি ২: দাজ্জাল আমাদের মতোই একজন মানুষ। সে অবিশ্বাস ছড়াতে শক্তিশালী আদর্শিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। আর সে এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাকে আকর্ষণীয়, আধুনিক ও সুন্দর হিসেবে তুলে ধরে। মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে সে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে। স্বাভাবিকভাবেই, দ্বিতীয় পরিস্থিতিটি লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজের অজান্তেই ঈমান হারানোর পথে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে প্রথম পরিস্থিতিটি কাউকে খুব একটা প্রতারিত করতে পারবে না, কারণ সেটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এমনকি সম্ভবত দাজ্জাল নিজেও তার প্রকৃত পরিচয় বুঝতে পারবে না। সে হবে নিজের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন সাধারণ মানুষ। সে যদি জানত যে সে-ই দাজ্জাল, তাহলে হয়তো সে নিজেই ইসলাম গ্রহণ করে ফেলত। তাই আমাদের বুঝতে হবে, হাদিসে যে বর্ণনাগুলো এসেছে সেগুলো আসলে প্রতীকী অর্থও বহন করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর শব্দগুলো এমনভাবে বেছে নিয়েছেন যাতে সময় এলে মানুষ এসব ঘটনাকে চিনতে পারে। যেমন, হাদিস অনুযায়ী দাজ্জাল পৃথিবীতে ৪০ দিন অবস্থান করবে। আর সে সময়ে, মক্কা ও মদিনা ছাড়া সে প্রতিটি শহরে প্রবেশ করবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে সারা পৃথিবী ভ্রমণ দিনের হিসেবে সম্ভব নয়, বরং বছরের ব্যাপার ছিল। মানুষ উট ও ঘোড়ায় চলাচল করত; একটি মরুভূমি পার হতেই সপ্তাহ লেগে যেত। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে হাদিসের এই বিবরণ পুরোপুরি অবাস্তব বলেই মনে হতো। কিন্তু গত শতাব্দীর দিকে তাকালে পুরো চিত্রটাই বদলে যায়। আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা পুরো পৃথিবীর চিত্রটাই বদলে দিয়েছে। ট্রেন ও বিশাল রেলপথের নেটওয়ার্ক পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। বিমান সম্ভব করে দিল দুই দিনেরও কম সময়ে সারা পৃথিবী ঘুরে আসা। তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বৈশ্বিক যোগাযোগের কথা ভাবুন। গত শতাব্দীতে একটি মাত্র মতাদর্শও সংবাদপত্র কিংবা রেডিওর মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারত। “সরকারের আদেশে, ইবাদতের বাইরে সব ধরনের ধর্মীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ।” “যে কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই বিধি লঙ্ঘন করলে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।” আর আজ, একটি আদর্শিক আন্দোলন পৃথিবীর প্রতিটি শহরে এবং প্রতিটি স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারে। ঠিক এভাবেই দাজ্জাল তার ধারণা ছড়াতে পারে, তার ফিতনা ছড়িয়ে মাত্র ৪০ দিনের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এই প্রযুক্তির অস্তিত্বের বহু আগেই, আমাদের নবী ﷺ তাৎক্ষণিক যোগাযোগের এই যুগের দিকে নিখুঁতভাবে ইঙ্গিত করেছিলেন। এ কি গভীর এক মু'জিযা নয়?

তিনি যেন ১৪ শতাব্দী পেরিয়ে তাকিয়ে আজকের বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে ভবিষ্যতের গোপন বিষয় দেখিয়েছিলেন। আর এ কারণেই দাজ্জালের বাহনের বর্ণনাটি এত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে বলা হয়েছে, তার দুই কানের মাঝের দূরত্ব হবে ৪০ হাত। গত শতাব্দীতে মানবজাতি এক বিশাল পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছে— পশুর পিঠে চলাচল থেকে বিশাল ইস্পাতের যন্ত্র নির্মাণ পর্যন্ত। বিমান, ট্রেন, গাড়ি— ইত্যাদি ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষাদানের ভঙ্গির অসাধারণ সৌন্দর্যটি লক্ষ করুন। কারণ সাহাবিরাই ছিলেন তাঁর প্রথম ও সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষার্থী, তাই তিনি তাঁর ভাষাকে পুরোপুরি তাদের যুগের বোধগম্যতার উপযোগী করেছিলেন। আমরা যদি একটি আধুনিক গাড়ি সেই যুগে নিয়ে যেতাম, তখনকার মানুষ সেটিকে কীভাবে দেখত?

তাদের চোখে, উজ্জ্বল হেডলাইটগুলো জ্বলজ্বলে চোখের মতো দেখাত, সামনের গ্রিলটি একটি বিশাল মুখের মতো মনে হতো, আর পাশের আয়না অথবা খোলা দরজাগুলোও একজোড়া কানের মতোই দেখাতে পারে। সপ্তম শতাব্দীর একজন পর্যবেক্ষকের চোখে দেখা আধুনিক এক যন্ত্রের এটি যেন নিখুঁত এক বর্ণনা। আমরা সবাই জানি, আজকের কিছু আধুনিক পরিবহনের দুই পাশের মধ্যকার দূরত্ব সহজেই ৪০ হাত পর্যন্ত পৌঁছায়, যা প্রায় ২০ মিটার। তাই হাদিসের এই বিবরণে কোনো ভুল ছিল না। বরং এটি হাদিসে ইঙ্গিত করা প্রযুক্তির যুগের এক স্পষ্ট নিদর্শন। যখন সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল ﷺ, তিনি পৃথিবীতে কত দিন অবস্থান করবেন?” রাসূলুল্লাহ ﷺ উত্তর দিলেন, “৪০ দিন। এক দিন হবে এক বছরের মতো, এক দিন এক মাসের মতো, এক দিন এক সপ্তাহের মতো, আর বাকি দিনগুলো তোমাদের স্বাভাবিক দিনের মতো।” এ কেমন সময়ের হিসাব?

মহান তাফসির ও হাদিসবিশারদ বদিউজ্জামান এ বিষয়টি বোঝাতে দুটি গভীর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি ফিতনার বিস্তারের গতির দিকে গুরুত্ব দেন। শুরুতে দাজ্জাল ভয়াবহ দ্রুতগতিতে কাজ করবে। তার প্রথম দিন এমন এক অন্ধকার সময়কে বোঝায়, যেখানে বহু বছরের আত্মিক ধ্বংস অতি অল্প সময়েই ঘটে যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে তার গতি কিছুটা ধীর হয়ে আসবে, তবুও সে অবিশ্বাস্য পরিমাণ কাজ করে যাবে, যেন পুরো এক মাসের বিশাল কর্মকাণ্ডকে এক দিনের মধ্যেই গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। তৃতীয় পর্যায়েও সে অত্যন্ত শক্তিশালী থাকবে, এক দিনের মধ্যেই এক সপ্তাহের সমান ব্যাপক ক্ষতি করবে। শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক দৈনন্দিন গতিতে নেমে আসবে। তবে বদিউজ্জামানের দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি দেখায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই গভীর কথাগুলোর মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের আরেকটি মু'জিযা রয়েছে। তাঁর মতে, এই হাদিসে আসলে এক বিস্ময়কর ভৌগোলিক জ্ঞানও নিহিত রয়েছে। এক মুহূর্ত ভেবে দেখুন। পৃথিবীর কোথায় একটি দিন এক বছর দীর্ঘ হয়?

এটি ঘটে উত্তর মেরুর আশেপাশে, রাশিয়ার সাইবেরিয়ার ঠিক উত্তরে। সেখানে টানা ছয় মাস দিনের আলো থাকে, তারপর আসে টানা ছয় মাসের অন্ধকার। পুরো বছরটাই যেন একটি দিন ও একটি রাত। আর এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। আপনি একটু দক্ষিণে নামলে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে থাকে। সেসব অঞ্চলে এমন জায়গাও আছে, যেখানে এক দিন ও এক রাত এক মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হয়, আর আরও দক্ষিণে তা এক সপ্তাহের মতো। আরও দক্ষিণে পৃথিবীর অন্য অংশের দিকে গেলে এই অস্বাভাবিকতা শেষ হয়ে যায়। দিন-রাতের চক্র আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। অর্থাৎ এই অঞ্চলটিই দাজ্জালের আন্দোলনের উৎপত্তিস্থল—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আর সেখান থেকেই তা পৃথিবীর অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়বে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত শতাব্দীতে ঠিক এই উত্তরাঞ্চলই পরিণত হয়েছিল এক বিশাল অবিশ্বাসী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে। তারা রাষ্ট্রের পুরো শক্তি ব্যবহার করেছিল, স্কুল ও মিডিয়াকেও কাজে লাগিয়েছিল চরম নাস্তিকতা ছড়িয়ে দিতে। সব মসজিদ ও গির্জার ৯৫ শতাংশেরও বেশি সম্পূর্ণ ধ্বংস বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ধর্মীয় বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়, আর ধর্মীয় শিক্ষা পুরোপুরি বেআইনি করা হয়। হাজার হাজার ধর্মীয় স্কলারদেরকে নির্বাসিত করা হয়েছিল সাইবেরিয়ার বরফশীতল শ্রমশিবিরে, আর অনেকে তার চেয়েও ভয়াবহভাবে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন। দশকের পর দশক লক্ষ লক্ষ শিশুকে বড় করা হয়েছে এমন প্রচণ্ড প্রোপাগান্ডার মধ্যে, যেখানে বলা হতো ধর্ম মিথ্যা। এমনকি তারা প্রতিষ্ঠা করেছিল ‘লীগ অব মিলিট্যান্ট এথিইস্টস’, রাষ্ট্রসমর্থিত একটি সরকারি সংগঠন। এই সংগঠন লক্ষ লক্ষ নাগরিককে ঈমানের বিরুদ্ধে সক্রিয় যোদ্ধায় পরিণত করেছিল। ‘ডাউন উইথ শেইম’ নামে একটি আন্দোলনও শুরু হয়েছিল। মানুষ সত্যিই সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে রাস্তায় মিছিল করত, তাদের গায়ে থাকত শুধু একটি ব্যানার, যাতে লেখা থাকত—‘লজ্জা দূর হোক’। এক সময় এই রাষ্ট্র বিয়ের প্রচলিত ধারণাটিও বাতিল করে দিয়েছিল। নগ্নতা-ভিত্তিক ক্লাব সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হয়, আর প্রচলিত গণস্নানাগারগুলোকে আইন করে নারী-পুরুষের জন্য একত্রে উন্মুক্ত করা হয়, যেখানে পুরুষ ও নারীকে একসঙ্গে নগ্ন অবস্থায় থাকার অনুমতি দেওয়া হতো। তারা এমন এক সমাজ চেয়েছিল, যেখানে কেউ নামাজ পড়বে না, কেউ আখিরাতে বিশ্বাস করবে না, আর কেউ আল্লাহর বিধান অনুসরণ করবে না। আর জানেন কী হলো?

এই আত্মিক ভাইরাস সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল, এবং আজ আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যাকে এই ভাইরাস গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। বছরের পর বছর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ধর্মকে সরিয়ে দেওয়া হলো, বিজ্ঞান থেকেও তা বিচ্ছিন্ন করা হলো, এবং তৈরি হলো একটি নতুন ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা আপনাকে এমনভাবে প্রভাবিত করে, যাতে আপনি মহাবিশ্বকে দেখেন শুধু বস্তুবাদী দৃষ্টিতে, এমনকি আপনি ধর্মবিশ্বাসী হলেও। দুই শতাব্দী আগেও পৃথিবীতে অবিশ্বাসী মানুষ প্রায় ছিলই না। কিন্তু আজ প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ নিজেদের অবিশ্বাসী হিসেবে পরিচয় দেয়, অর্থাৎ প্রায় প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন। অবশ্যই চূড়ান্ত সত্য এবং সবকিছুর প্রকৃত ব্যাখ্যা শুধু আল্লাহই একমাত্র ভালো জানেন। তবে এর পরেও কি আরও ধ্বংসাত্মক কোনো আন্দোলন হতে পারে?

সত্যি বলতে, এ প্রশ্ন গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, দাজ্জালকে ৭০ হাজার ইহুদি সমর্থন করবে। আমরা যে ঘটনাগুলো একটু আগে আলোচনা করেছি, সেগুলোর দিকে তাকান। সেই নাস্তিকতাবাদী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তরে ইহুদি ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি ছিল বেশ দৃশ্যমান। এটি কেবল একটি উদাহরণ মাত্র। উদাহরণস্বরূপ, প্রকাশ্যে হোক বা আড়ালে, তারা স্থান করে নিয়েছিল বিশ্ব রাজনীতি গড়ে তোলা প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। আর আরবি ভাষায় এটি সুপরিচিত যে ৪০, ৭০, ৭০ হাজার, ৮০ বা ৮০ হাজারের মতো সংখ্যা সব সময় হুবহু গাণিতিক সংখ্যা বোঝায় না। বরং অনেক সময় এগুলো বিপুল পরিমাণ বোঝানোর প্রচলিত রীতি। অর্থাৎ আমরা এমন একটি দৃশ্য আশা করতে পারি না, যেখানে ঠিক ৭০ হাজার মানুষ প্রকাশ্যে একসঙ্গে স্লোগান দিয়ে সমর্থন জানাবে। এ ধরনের ব্যবস্থা প্রত্যেক ব্যক্তিকে এক নির্মম সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সতর্ক করে বলেছেন: “তার সঙ্গে—অর্থাৎ দাজ্জালের সঙ্গে— একটি জান্নাত ও একটি জাহান্নাম থাকবে। কিন্তু তার জাহান্নামই হবে জান্নাত, আর তার জান্নাতই হবে জাহান্নাম।” এর প্রকৃত অর্থ কী?

উত্তরটি পরিষ্কার। দাজ্জাল এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলবে, যেখানে আপনার দৈনন্দিন বেঁচে থাকা তার প্রতি আনুগত্যের ওপর নির্ভর করবে। আপনি যদি তার বস্তুবাদী প্রবাহে যোগ দেন এবং তার ঈমানহীন ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন, তাহলে সে আপনার জন্য তার ‘জান্নাতের’ দরজা খুলে দেবে। আপনি আরাম, সম্পদ আর উচ্চ মর্যাদা দিয়ে পুরস্কৃত হবেন। কিন্তু আপনি যদি আল্লাহর পক্ষ বেছে নেন, তাহলে দাজ্জালের ‘জাহান্নাম’ আপনাকে সাদরে গ্রহণ করে, আপনাকে পাঠায় কঠোর শ্রমশিবিরে, কারাগারে কিংবা মৃত্যুদণ্ডের দিকে। কিন্তু বাস্তবে দাজ্জালের জান্নাতই প্রকৃত জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়। আর মুমিনদের ওপর সে যে দুনিয়াবি জাহান্নাম চাপিয়ে দেয়, সেটিই আসলে প্রকৃত ও চিরস্থায়ী জান্নাতের দরজা খুলে দেবে। আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “কিয়ামতের নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি হলো, পুরুষের সংখ্যা কমে যাবে এবং নারীর সংখ্যা এত বেড়ে যাবে যে, ৫০ জন নারীর দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মাত্র একজন পুরুষ থাকবে।” বাস্তবতার দিকে তাকালে, গত শতাব্দীতে আমরা ঠিক এমন চিত্রই দেখেছি। বিশ্বযুদ্ধগুলোতে ভয়াবহ সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। আর নিহতদের অধিকাংশই ছিল পুরুষ। যে পুরুষ জনগোষ্ঠী বেঁচে ছিল, তাদের অনেকেই ছিল শিশু, বয়স্ক অথবা আহত যুদ্ধফেরত সৈনিক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ পুরুষ, যারা নারীদের দায়িত্ব নিতে সক্ষম, তারা অতি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছিল। আর একবার আবারও ইতিহাসের গতিপথ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কথার সত্যতা দেখিয়েছে। আর এরআগেই আমরা যেমনটা দেখেছি, হাদিসের ৫০ সংখ্যাটিও হুবহু গাণিতিক সংখ্যা হিসেবে নেওয়া জরুরি নয়। এটি বড় একটি সংখ্যা বোঝানোর প্রচলিত রীতি। এবার এই হাদিসগুলো থেকে আরেকটি সূত্র শেয়ার করি। এবার আপনি অনুমান করার চেষ্টা করুন, এটি আসলে কিসের ইঙ্গিত। তারপর সে—অর্থাৎ দাজ্জাল—“আকাশকে বৃষ্টি নামানোর আদেশ দেবে, আর বৃষ্টি নেমে আসবে। সে অনুর্বর ভূমির পাশ দিয়ে যাবে এবং বলবে, ‘তোমার গুপ্ত সম্পদ বের করে আনো,’ তারপর সে চলে যাবে, আর সেই সম্পদগুলো মৌমাছির ঝাঁকের মতো তার পিছু নেবে।” এবার আজকের পৃথিবীর দিকে তাকান। এর অর্থ কী হতে পারে?

১৯৪০-এর দশকের কাছাকাছি সময়ে মানবজাতি ক্লাউড সিডিং প্রযুক্তি আবিষ্কার করে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা শিখলেন, কীভাবে কৃত্রিমভাবে মেঘকে সক্রিয় করে প্রয়োজনমতো বৃষ্টি নামানো যায়। এ যেন আকাশকে বৃষ্টি ঝরানোর নির্দেশ দেওয়ার মতোই। আর এটি সত্যিই কাজ করল। ঠিক একই সময়ে আধুনিক খনিশিল্পেও ঘটে এক বিরাট বিপ্লব। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ট্রিলিয়ন ডলারের তেল, গ্যাস ও মূল্যবান ধাতু প্রয়োজনমতো মাটির নিচ থেকে বের করে আনা শুরু হলো। আপনি কি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন?

যখনই কেউ এসব হাদিসকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে, তখন সেগুলোর আড়ালে থাকা মু'জিযাগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের পক্ষ থেকে এসব জানার কোনো উপায়ই ছিল না। নিশ্চয়ই এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকেই তাঁকে জানানো হয়েছিল। এখানেই আসে একটি বড় প্রশ্ন। এত রহস্য কেন? রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি সুনির্দিষ্ট নাম ও তারিখ বলে দিতেন, তাহলে কি সবার জন্য বুঝতে আরও সহজ হতো না? আমি পাল্টা আপনাকে একটি প্রশ্ন করি। এই হাদিসগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল? আমাদের নবী ﷺ কেন আমাদের সতর্ক করেছিলেন?

যাতে তাঁর উম্মাহ সব সময় সতর্ক থাকে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ কেবল একটি নির্দিষ্ট শতাব্দীর পথপ্রদর্শক ছিলেন না। কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের জন্যই তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। তিনি চেয়েছিলেন, প্রতিটি যুগে মাহদি ও দাজ্জালের তাৎপর্য অনুভূত হোক। তিনি যদি দাজ্জাল ও মাহদির সুনির্দিষ্ট পরিচয় বলে দিতেন এবং একটি নির্দিষ্ট সময় ও তারিখ জানিয়ে দিতেন, তাহলে কেবল একটি প্রজন্মই গুরুত্ব দিত। আর অন্য সব যুগের মানুষ সতর্ক থাকতে চাইতো না। তিনি চেয়েছিলেন পুরো উম্মাহ সতর্ক, সজাগ ও প্রস্তুত থাকুক। তাই তিনি এমন এক অসাধারণ পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন, যাতে প্রতিটি প্রজন্ম নিজেদের যুগকে হাদিসের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে পারে, “এটাই কি সেই সময়?” দাজ্জালের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আমাদের সতর্ক রাখে। আর মাহদির আশায় থাকা আমাদের অনুপ্রাণিত রাখে। ভয় ও আশার এই সুন্দর ভারসাম্যই এসব হাদিসের প্রতীকী ভাষার গভীর রহস্য। এ থেকেই বোঝা যায় কেন ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় দাজ্জালের আবির্ভাবের জন্য ভিন্ন ভিন্ন স্থানের কথা বলা হয়েছে। এক বর্ণনায় খোরাসান, আরেকটিতে ইরাক ও শামের মধ্যবর্তী এলাকা, আবার অন্যটিতে ইসফাহানের ইহুদিদের কথা এসেছে। কেন?

কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “কিয়ামতের আগে প্রায় ৩০ জন দাজ্জাল আসবে।” ফিতনার নেতা কেবল একজন নয়। এমন অনেকেই থাকবে। অর্থাৎ দাজ্জাল সম্পর্কিত সব নিদর্শনকে একজন মাত্র ব্যক্তির মধ্যে জোর করে মিলিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ একটি হাদিসে এক দাজ্জালের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হতে পারে, আর অন্য একটি বর্ণনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকজনের কথা বলা হতে পারে। আর গত শতাব্দীর দিকে ফিরে তাকালেও, আপনি বুঝতে পারবেন, আমরা যে ধর্মবিরোধী ব্যবস্থার কথা বলেছি তা ঠিক এক বিশাল অক্টোপাসের মতো কাজ করেছিল। তার মাথা ও মস্তিষ্ক ছিল রাশিয়ায়, কিন্তু তার শুঁড় পৌঁছে গিয়েছিল পাশের মুসলিম দেশগুলোতে। উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও আজারবাইজানের মতো দেশগুলো তীব্র নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। তাদের মসজিদগুলো জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ইসলামী পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, আর ইসলামীক স্কলারদের পরিকল্পিতভাবে গ্রেপ্তার, নির্বাসিত কিংবা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও জনসংখ্যার বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল মুসলিম, তবুও আজান পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল, এবং মানুষকে গোপনে নিজেদের ধর্ম শিখতে হতো। এখন এক মুহূর্তের জন্য এ পর্যন্ত আলোচনা করা সব সূত্র মনে মনে আবার সাজিয়ে দেখুন। দুনিয়াবি জান্নাত ও জাহান্নামের ভ্রম, ঈমানের ওপর আঘাত, অল্প সময়ে বহু বছরের আত্মিক ধ্বংস—ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন ভাবুন। একজন ব্যক্তি লক্ষ লক্ষ মানুষের চিন্তাকে বিষিয়ে তুলছে। নতুন প্রজন্ম এমনভাবে বেড়ে উঠছে, যেখানে বিজ্ঞান শিক্ষাও নাস্তিকতাবাদী প্রোপাগান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এমন এক পৃথিবীতে শুধু একজন মানুষকে সরিয়ে দিলেই কি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে?

আমার তা মনে হয় না। দাজ্জাল ব্যক্তির চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘দাজ্জালিজম’, অর্থাৎ তার রেখে যাওয়া মতাদর্শগুলো। দাজ্জাল ব্যক্তি নিজে হয়তো খুব সহজেই একটি সাধারণ ভাইরাস বা প্রচলিত কোনো রোগে মারা যেতে পারে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া একটি মতাদর্শকে মুছে ফেলা এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে সত্য গ্রহণে রাজি করানো?

এত বিশাল কাজই কেবল এক মহান নবীর প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত হতে পারে। তাই হাদিসে যখন নবী ঈসা (আ.)-এর হাতে দাজ্জালের বিনাশের কথা বলা হয়, তখন এটিকে কেবল একটি সাধারণ দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি দুই বিশাল চিন্তাধারার সংঘর্ষ। নবী ঈসা (আ.) তাঁর মুমিনদের জোটসহ কুরআনের হীরকতুল্য তরবারি হাতে নিয়ে দাজ্জালবাদের পুরো মতাদর্শকে চূর্ণ করে দেবেন। ইনশাআল্লাহ, তারা সেই মতাদর্শকে এমনভাবে সমূলে দাফন করবে যাতে তা আর কখনো মাথা তুলতে না পারে। এই যুক্তি অনুযায়ী, হাদিসের কথাগুলো সত্য হতে দাজ্জাল ও ঈসা (আ.)-কে একই সময়ে জীবিত থাকাটা কিন্তু জরুরি নয়। এখন আপনার মনে হতে পারে, ভাই, তাহলে কি শেষ যুগ সম্পর্কিত হাদিসের কিছুই আক্ষরিক নয়?

অবশ্যই আছে। উদাহরণ হিসেবে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয়ের কথাই বলি। এটি ঠিক যেভাবে বোঝা হয়, সেভাবেই ঘটবে। আর যেহেতু এটি সম্পূর্ণ আক্ষরিক, ঘটনাটি ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ঈমান আনা বা না আনার পরীক্ষা স্বাধীন পছন্দের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এই ঘটনা এতটাই স্পষ্ট হবে যে তখন ‘পছন্দ’ করার সুযোগটাই আর থাকবে না। এ যেন আকাশে দীর্ঘ সময় ধরে তারকা দিয়ে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ লেখা থাকল, যা পুরো পৃথিবী দেখতে পেল। তখন আর বিশ্বাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে না; আপনি দেখতে বাধ্য হবেন। যেমন ফেরাউন সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে একেবারে শেষ মুহূর্তে ঈমান আনার চেষ্টা করেছিল, সেই মুহূর্তে ঈমান আনা কোনো উপকারেই আসবে না। দাজ্জালের কপালে ‘কাফির’ শব্দটি, যা নিরক্ষর মানুষও পড়তে পারবে...

ইয়াজুজ ও মাজুজ...

দাব্বাতুল আরদের আবির্ভাব এবং কীভাবে তা প্রত্যেক মানুষের প্রকৃত ঈমান প্রকাশ করবে। এগুলো এবং আরও বহু কৌতূহলোদ্দীপক হাদিসের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা রিসালে-ই নূর সংকলনে আলোচনা করা হয়েছে। আপনি যদি মূল উৎসে আরও গভীরে যেতে চান এবং আরও জানতে চান, তাহলে আমাদের My Risale অ্যাপটি ডাউনলোড করতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং বিজ্ঞাপনমুক্ত। আমরা সেখানে আপনার অপেক্ষায় থাকব। আজ আমরা দেখি, এসব হাদিস নিয়ে মানুষ দুটি চরম অবস্থানে চলে যায়। একদল সন্দেহ করে এবং বলে—এসবের কোনো অর্থ নেই। শেষ পর্যন্ত তারা বর্ণনাগুলোই প্রত্যাখ্যান করে। আর কারও কারও অহংকার তাদের ঈমানের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে হাদিসের পুরো সংকলনই অস্বীকার করে বসে। অন্যদিকে আরেকদল এসব হাদিসকে একেবারে আক্ষরিকভাবে নেয়। ফলে তারা শ্রোতাদের আরও বেশি বিভ্রান্ত করে। আর স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের বিরোধীরা ঠিক এই কারণেই এসব নির্দিষ্ট বর্ণনাকে সামনে আনতে ভালোবাসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসের ২ শতাংশেরও কম অংশ যা এত কঠিন মনে হতে পারে। বাকি হাদিসগুলো স্পষ্ট, এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শক্তিশালী দিকনির্দেশনা ও গভীর প্রজ্ঞা প্রদান করে। আর জানেন, সত্যিই বিস্ময়কর বিষয় কী?

সমগ্র মানব ইতিহাসে আর কোনো ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মতো শিক্ষা দেননি। সাধারণত ইতিহাসে কেউ বিখ্যাত হয়ে উঠলে, তা একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই হয়—যেমন আইন। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রগুলোতে তাদের তেমন অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি থাকে না। সেখানে দেওয়ার মতো তাদের খুব বেশি কিছু থাকে না। কিন্তু হাদিসের গ্রন্থগুলোর দিকে তাকালে, আমরা দেখি, সেখানে অসংখ্য বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যেমন—আইন, ব্যবসা, অর্থনীতি, পারিবারিক জীবন, সন্তান লালন-পালন, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি, স্বাস্থ্য, নৈতিকতা, আত্মিক উন্নতি এবং নফসের শৃঙ্খলা। এমনকি প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসাও এর অন্তর্ভুক্ত। আপনি যদি হাদিসের গ্রন্থগুলো দেখেন, তাহলে এর চেয়েও অনেক বেশি বিষয় খুঁজে পাবেন। তাই আমরা শুধু কোনো বিষয়ের গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে পারছি না বলে, সেটিকে কেটে বাদ দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা কোনো যুক্তিবাদী মানসিকতার পরিচয় হতে পারে না। বিশেষ করে যখন দেখবেন, কত সতর্কতা ও নির্ভরযোগ্যতার সঙ্গে এসব হাদিস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংরক্ষিত হয়েছে। বরং এগুলো এমন বহুস্তরীয় যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে, যার নজির ইতিহাসে নেই। কোনো হাদিস এই কঠোর পরীক্ষাগুলো পার না হলে তাকে কখনোই সহিহ হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। ১.

বর্ণনাকারীদের অবিচ্ছিন্ন সূত্র: প্রত্যেক বর্ণনাকারীর পরিচয় আমাদের জানতে হবে। একজন একজন করে জানতে হবে, কে কার কাছ থেকে শুনেছে তা স্পষ্ট থাকতে হবে, এভাবে শৃঙ্খলটি রাসূলুল্লাহ ﷺ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। ২. বর্ণনাকারীদের সততা: শৃঙ্খলের প্রত্যেক ব্যক্তি অত্যন্ত সৎ হিসেবে পরিচিত হতে হবে, আল্লাহভীরু ও দৃঢ় ঈমানের অধিকারী হতে হবে, এবং মিথ্যা বলা বা খারাপ আচরণের কোনো ইতিহাস থাকা চলবে না। ৩. নিখুঁত স্মৃতিশক্তি: তাদের স্মৃতি হতে হবে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, অথবা লিখিত নথি এত নিখুঁত হতে হবে, যাতে শব্দ ভুলে যাওয়া বা গুলিয়ে ফেলার সুযোগ না থাকে। ৪. কোনো বিরোধ থাকবে না: বর্ণনাটি এমন কিছুর বিরোধী হতে পারবে না, যা আরও নির্ভরযোগ্য বা প্রসিদ্ধ বর্ণনাকারীরা বর্ণনা করেছেন। ৫.

গোপন ত্রুটি না থাকা, যাকে ‘ইল্লাহ’ বলা হয়: বক্তব্য ও সনদ—দুটিই সম্পূর্ণভাবে এমন সব সূক্ষ্ম ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে, যা কেবল হাদিসশাস্ত্রের গভীর বিশেষজ্ঞরাই শনাক্ত করতে পারেন। ইতিহাসে ২০ হাজারেরও বেশি হাদিস বর্ণনাকারীর তথ্য রয়েছে। তাদের জীবনকাহিনি নিয়ে বিশাল নথিপত্র সংরক্ষিত আছে, যেখানে তাদের চরিত্র ও স্মৃতিশক্তির বিবরণও রয়েছে। তাদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্যই প্রতিটি সূক্ষ্ম তথ্য পর্যন্ত নথিবদ্ধ করা হয়েছে। ইতিহাসে সত্যিই এর মতো কিছু দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত, প্রতিটি মিথ্যা বর্ণনা ছেঁকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এভাবে বলা যায়। যে বাইবেলকে ২০০ কোটি খ্রিস্টান গ্রহণ করে, সেটিকে যদি হাদিসশাস্ত্রের কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষা করা হতো, তাহলে সেটি উত্তীর্ণ নম্বরও পেত না। শুরু থেকেই এই ব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে গড়ে উঠেছিল। শত শত সাহাবি হাদিস মুখস্থ রাখার পাশাপাশি, ৫২ জন সাহাবি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবদ্দশাতেই সক্রিয়ভাবে হাদিস লিখে রাখতেন। এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ হলো ‘সাহিফাতুস সাদিকাহ’, প্রায় এক হাজার হাদিসের একটি সংকলন, যা সরাসরি লিখেছিলেন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমর। হিজরি ৫০ থেকে ১৫০ সালের মধ্যে, প্রায় ৪০০ জন ভিন্ন ভিন্ন বিশেষজ্ঞ এসব বর্ণনা সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। তবে এসবেরও ঊর্ধ্বে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সাহাবিদের চরিত্র। আমরা এসব কথা পেয়েছি এমন মানুষের কাছ থেকে, যারা নিজেদের জীবন আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন। তারাই এই পুরো ব্যবস্থার ভিত্তি। মিথ্যা বলার কোনো কারণই তাদের ছিল না। বরং তারা এই বিখ্যাত হাদিসের ভয়াবহ সতর্কতার ভার অনুভব করতেন: “যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা রচনা করে, সে যেন জাহান্নামে নিজের আসন ঠিক করে নেয়।” এত কঠোর সতর্কতার কারণে, তারা প্রতিটি শব্দ নিয়ে অসাধারণ সতর্ক ছিলেন। তবে এখানে আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করতে হবে। যখন আমরা কোনো হাদিসকে দুর্বল বলি, তখন সেটি দুর্বল বলা যায় কেবল সহিহ হাদিসের নিখুঁত মানদণ্ডের তুলনায়। বাস্তবে, সেটি এখনও অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে লেখা প্রায় যেকোনো ঐতিহাসিক লেখার তুলনায়। এর ঐতিহাসিক মূল্য এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী। উদাহরণ হিসেবে ইস্তাম্বুল সম্পর্কিত বিখ্যাত হাদিসটি নিন: “তোমরা অবশ্যই কনস্টান্টিনোপল বিজয় করবে। কতই না উত্তম হবে তার সেনাপতি, আর কতই না উত্তম হবে সেই সেনাবাহিনী।” প্রযুক্তিগতভাবে হাদিসটি দুর্বল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ, তবু ইতিহাস সেই বিজয় প্রত্যক্ষ করেছে। আর ‘দুর্বল’ এই শ্রেণিবিভাগ এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে মুছে দেয়নি। তাই আপনি যদি ইসলামের মৌলিক আকিদা নিয়ে আলোচনা না করেন অথবা কঠোর শরয়ি বিধান নির্ধারণ না করেন, তাহলে দুর্বল হাদিসকে তুচ্ছ করার কোনো যথার্থ কারণ নেই। এখন হাদিস প্রত্যাখ্যানের পুরো প্রবণতার দিকে তাকালে, আমাদের খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করতে হয়। আপনি হাদিস অস্বীকার করে আসলে কী লাভ করেন?

কিছুই না। কিন্তু আপনি যে হাদিসগুলো প্রত্যাখ্যান করছেন, সেগুলো যদি সত্য হয়—তাহলে দায় অত্যন্ত ভয়াবহ। আর আখিরাতের কথাও ভাবুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সামনে দাঁড়াতে ভীষণ লজ্জা লাগবে না আপনার? আপনি কী বলবেন? “উম... জানেন কী? হ্যাঁ, আপনি আমাদের জন্য আপনার পুরো জীবন ত্যাগ করেছিলেন। আপনাকে পাথর মারা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে, অপবাদ দেওয়া হয়েছে। আপনি অসংখ্যবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন এবং সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু সত্যি বলতে, আপনার কথাগুলো আমার কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।” আপনি কি সত্যিই এমন কথা বলতে পারবেন? আর কীভাবে শত শত সাহাবিকে মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত করবেন?

আমাদের দাবির ভার না বুঝে এভাবে কথা বলা উচিত নয়। আর শেষে, শেষ কথাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছ থেকেই শুনি: “আমি যেন তোমাদের কাউকে এমন অবস্থায় না পাই, যে নিজের আসনে হেলান দিয়ে বসে আছে, আর আমার কোনো আদেশ বা নিষেধ তার কাছে পৌঁছালে সে বলে, ‘আমি জানি না। আল্লাহর কিতাবে যা পাই, আমরা শুধু সেটাই অনুসরণ করি।’”
