# সিজার ও অন্যান্য রাজাদের কাছে নবিজির চিঠি! - বিস্ময়কর প্রতিক্রিয়া - ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ) | পর্ব ৯

- Language: bn
- Published: 2026-08-26
- Canonical: https://blog.towardseternity.com/bn/blog/epic-conquest-of-khaybar-visualized-by-ai-alis-heroic-fight-o-messenger-ep-9
- Source video: https://www.youtube.com/watch?v=ebeAyx_E7pc
- Channel: Towards Eternity

This is the cleaned transcript of the source video. The speech is unaltered.

---

আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে নির্বাচন করেছিলেন চারজন সাহাবীকে। দিহিয়া আল-কালবি, হাতিব ইবনে আবি বালতাআ, আমির ইবনে উমাইয়া এবং আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাইফা। তাদের প্রত্যেকেই রওনা হতে যাচ্ছিলেন হাতে একটি চিঠি নিয়ে। কিন্তু এই চিঠিগুলো কাদের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল?

সেই সময়ের প্রধান শক্তিগুলোর শাসকদের উদ্দেশ্যে। বাইজেন্টাইন সম্রাট, হাবশার রাজা, মিশরের শাসক এবং পারস্যের কিসরা। প্রতিটি চিঠি তার নিজ নিজ প্রাপকের জন্য বিশেষভাবে আলাদা আলাদা করে লেখা হয়েছিল, ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে। তিনি এমনকি একটি সিলমোহরের আংটি তৈরি করিয়েছিলেন এবং সব চিঠিতে সেটি দিয়ে সিল মেরেছিলেন। এই ভিডিও সিরিজটি নির্ভরযোগ্য শত শত বিশ্বস্ত ইসলামী উৎস ও রেফারেন্সের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। সব এআই ভিজুয়াল প্রস্তুত করা হয়েছে যোগ্য মুসলিম আলেমদের পরামর্শক্রমে এবং তা ইসলামিক নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সময়টা ছিল প্রায় ছয়শ উনত্রিশ সালের শুরুতে। হিজরতের পর সাত বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। আল্লাহর রাসূলের দায়িত্ব ছিল ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া সমগ্র বিশ্বের কাছে। কারণ তিনি শুধু কুরাইশ বা আরবের জন্য প্রেরিত কোন নবী ছিলেন না। তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। তাই চিঠিগুলো লেখা হলো এবং সাহাবীদের দূত হিসেবে নিয়োগ করা হলো, আর তারা সেগুলো পৌঁছে দিতে রওনা হলেন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাসূল পাঠালেন দিহিয়া আল কালবিকে। “প্রাসাদে আপনাকে স্বাগতম।” তিনি পৌঁছালে গভর্নর তাকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং তারপর সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সামনে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো। সম্রাট চিঠিটি গ্রহণ করলেন এবং তা উচ্চস্বরে পড়ে শোনাতে বললেন। “চলুন, এটি শোনা যাক।” তিনি শুনতে শুনতে স্মরণ করতে লাগলেন তাদের পবিত্র গ্রন্থে যা লেখা ছিল। সেখানে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল ভবিষ্যতে আগমনকারী এক নবীর এবং তার গুণাবলীও বর্ণনা করা হয়েছিল। আর এখন নবুয়তের দাবি করা একজন তাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এ কি সেই ব্যক্তি হতে পারেন যার জন্য তারা অপেক্ষা করছিল?

এটি তাকে সত্যিই গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল। “অনুগ্রহ করে বিশ্রাম নিন। আপনি নিশ্চয়ই যাত্রাপথে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।” এরপর তিনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেন। প্রথমত, তিনি একটি চিঠি লিখলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে, বাইজেন্টিয়ামের প্যাট্রিয়ার্ক দাগাতির আল উসকুফকে। তিনি তার পরামর্শে আস্থা রাখতেন। তাই পুরো পরিস্থিতি তাকে বুঝিয়ে বললেন এবং তার মতামত জানতে চাইলেন। আর দ্বিতীয়ত, তিনি তার লোকদের আদেশ দিলেন। যাও এবং দেখো ওখানে এই ব্যক্তির গোত্রের কেউ আছে কিনা। সে নিজেকে নবী বলে দাবি করে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্যাট্রিয়ার্ক তার উত্তর পাঠালেন। কিন্তু তিনি কী লিখেছিলেন?

একটু পরেই সে কথায় আসছি। কিন্তু তার আগে চলুন সম্রাটের কথোপকথনটি দেখি এক পরিচিত নাম আবু সুফিয়ানের সঙ্গে। হ্যাঁ, আবু সুফিয়ান ঘটনাক্রমে সেই অঞ্চলে ব্যবসার জন্য এসেছিলেন। সৈন্যরা যখন তাকে বাজারে দেখলো তারা তাকে তার সঙ্গীদের সহ সম্রাটের সামনে নিয়ে গেল। তাদের ইলিয়া গিরজায় নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর হেরাক্লিয়াস তাদের দরবারে ডাকলেন। মহারাজ। তার চারপাশে উপস্থিত ছিলেন সব জ্যেষ্ঠ রোমান কর্মকর্তা ও ধর্মীয় নেতারা। সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন- “তোমাদের মধ্যে বংশের দিক থেকে কে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সেই ব্যক্তির, যে নিজেকে নবী বলে দাবি করছেন?” “আমি তার সবচেয়ে নিকট আত্মীয়।” “তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো, আর তার সঙ্গীদের তার পেছনে দাঁড় করাও। আমি তাকে সেই ব্যক্তির সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করব। সে যদি আমার কাছে মিথ্যা বলে, তোমরা সঙ্গে সঙ্গে তা বলে দেবে।” এই ব্যবস্থার ফলে আবু সুফিয়ান মিথ্যা বলতে পারলেন না। এরপর হেরাক্লিয়াস তাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন। “তোমাদের মধ্যে তার পারিবারিক মর্যাদা কেমন?” “তিনি আমাদের মধ্যে সর্বোচ্চ এক সম্ভ্রান্ত বংশের।” “এর আগে কি কখনো তোমরা তাকে মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত করতে পেরেছিলে?” “না।” “কারা তাকে অনুসরণ করে?

অভিজাতরা নাকি দরিদ্ররা?” “দরিদ্র ও দুর্বলরাই তাকে অনুসরণ করে।” “তার অনুসারীরা কি বাড়ছে নাকি কমছে?” “তারা বাড়ছে।” আবু সুফিয়ান বুঝতে পারছিলেন না এই প্রশ্নগুলোর পেছনের কারণ। কিন্তু প্রতিটির পিছনেই ছিল এক গভীর উদ্দেশ্য। “তোমরা কি কখনো তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছ?” “হ্যাঁ, করেছি।” “ফলাফল কি ছিল?” “কখনো তিনি জয়ী হয়েছেন, কখনো আমরা জয়ী হয়েছি।” “তিনি তোমাদের কি করতে নির্দেশ দেন?” “তিনি আমাদের নির্দেশ দেন কেবল আল্লাহর ইবাদত করতে এবং তার সঙ্গে কাউকে শরীক না করতে। তিনি তাদের ইবাদত করতে নিষেধ করেন, যাদের ইবাদত আমাদের পূর্বপুরুষরা করত। তিনি আমাদের নামাজ আদায় করতে, সত্য কথা বলতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, পবিত্র জীবন যাপন করতে এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে।” “তুমি যেসব বিষয় বর্ণনা করেছ তার সবই কিন্তু একজন নবীর গুণাবলী। তোমার কথা যদি সত্যি হয় তবে খুব শীঘ্রই সে আমার তবে খুব শীঘ্রই সে আমার পায়ের নিচের জমিনেরও শাসক হবে। আমি আগেই জানতাম একজন নবী আবির্ভূত হবেন। কিন্তু কখনো ভাবিনি তিনি তোমাদের জাতি থেকে হবেন। আর ঠিক সেটাই ঘটল। হেরাক্লিয়াস তখন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, ইঞ্জিল ও তাওরাতে ঘোষিত সেই নবী হলেন নবী মুহাম্মদ। তিনি কথা শেষ করতেই ঘরের ভেতর স্বর উঁচু হতে শুরু করল। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করলেন, আর শব্দ ক্রমশ আরও জোরে বাড়তে লাগল। আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীদের দ্রুত বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। “এই বিষয়টি এত বড় হয়ে উঠেছে যে, রোমান সম্রাটও তাকে ভয় পাচ্ছে।” হেরাক্লিয়াস পরে ইসলাম গ্রহণ করবেন কিন্তু তার সিংহাসন টলে যাবে এই ভয়ে তিনি তার ঈমান গোপন রাখবেন। কিন্তু তার বন্ধু প্যাট্রিয়ার্ককে পাঠানো চিঠিটির কি হয়েছিল?

উত্তর এসে গিয়েছিল। তার চিঠিতে দাগাতির লিখেছিলেন যে, আল্লাহর রাসূল সত্যিই একজন নবী। এরপর সম্রাট দিহিয়াকে বললেন প্যাট্রিয়ার্কের কাছেও যেতে এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দিতে। প্যাট্রিয়ার্কের উত্তর এবং এরপর তার উপর যা ঘটেছিল তা সত্যিই ছিল বিস্ময়কর। আপনি আমার নবীর কাছে ফিরে যান। আমার সালাম পৌঁছে দিন এবং তাকে বলুন আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আর আমি - সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ঈসা আল্লাহর বান্দা। - এরপর প্যাট্রিয়ার্ক তার কক্ষে গেলেন। কালো পোশাক খুলে ফেললেন এবং পরিধান করলেন তার সাদা আনুষ্ঠানিক বস্ত্র। তিনি তার লাঠি হাতে নিলেন এবং লোকদের সামনে দাঁড়ালেন যারা গির্জায় সমবেত হয়েছিল। এখন - সময় কেবল সত্য ঘোষণা করার। - হে রোমবাসী, আমরা একটি চিঠি পেয়েছি আহমদ নামক এক নবীর কাছ থেকে। সেখানে তিনি আমাদের আহ্বান জানিয়েছেন মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আহমদ তার বান্দা ও রাসূল। - এ কথা শুনে জনতা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠলো। - এ কি করে সম্ভব?

আপনি তো পরিত্যাগ - করলেন আপনার পূর্বপুরুষদের ধর্ম। - তারা দাখাতীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাকে প্রহার করতে করতে শহীদ করে ফেললো। আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন। আরেকজন শাসক যার কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল তিনি ছিলেন আবিসিনিয়ার রাজা নাজাশি। আমির ইবনে উমাইয়া চিঠিটি পৌঁছে দেন। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যখন মুসলমানরা সেই কঠিন সফরে আবিসিনিয়ায় গিয়েছিলেন, নাজাশি তাদেরকে - অসীম দয়ার সঙ্গে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। - আমার ভূখণ্ডে তোমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। আল্লাহর রাসূলের পাঠানো চিঠিটি তিনি হাতে নিলেন। সম্মানের নিদর্শন হিসেবে তা নিজের চোখের উপর রাখলেন, চুমু খেলেন এবং কপালে স্পর্শ করালেন। এরপর তিনি তার এক সেবককে বললেন চিঠিটি উচ্চস্বরে পড়তে। চিঠিটা শোনার পর তিনি সিংহাসন থেকে নেমে এলেন। বিনীতভাবে - মাটিতে বসে শাহাদাত পাঠ করলেন। - আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ। আমার পক্ষে যদি তার কাছে যাওয়া সম্ভব হতো - তবে আমি অবশ্যই চলে যেতাম। - দূত আমির ইবনে উমাইয়ার আরও একটি অনুরোধ - ছিল। - আমি চাই আপনি সেসব মুসলমানকে মদিনায় পাঠিয়ে দিন যারা এখনো আবিসিনিয়ায় অবস্থান করছেন। নাজাশি কখনোই দেখতে পাবেন না আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে। কিন্তু বহু বছর ধরে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন তাদের যারা তাকে দেখেছিল। আর এখন তিনি তাদের ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন যাতে তারা তার সঙ্গে পুনর্মিলিত হতে পারে। পারস্যের শাসক কিসরা পারভেজ। তিনিও একটি চিঠি পেয়েছিলেন আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে। আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাইফা পারস্যে পৌঁছালেন এবং ব্যক্তিগতভাবে নবীজির ইসলামের দাওয়াত কিসরার কাছে পৌঁছে দিলেন। - কিসরা তার লেখককে দিয়ে তা পড়ালেন। - বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। পরম করুণাময় অতিশয় দয়ালু আল্লাহর নামে। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে পারস্যবাসীর নেতা খোশুর উদ্দেশ্যে। কিসরা হঠাৎ ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো এবং চিঠিটি পড়া শেষ করতেও দিল না। দেখো তো এই লোককে। এই লোকটি যে আমার একজন প্রজা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার এক দাস। সে দুঃসাহস দেখায় আমাকে চিঠি - লেখার এবং তাতেও নিজের নাম আমার আগে রাখার। - এই বলে সে চিঠিটি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল। এই সংবাদ যখন পৌঁছালো আল্লাহর রাসূলের কাছে, তিনি হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন যেন তাদেরও ছিন্নভিন্ন করা হয়। অর্থাৎ তাকে এবং তার রাজ্যকে যেন পুরোদরে টুকরো টুকরো করে দেওয়া হয়। আল্লাহ তার রাসূলের এই দোয়া কবুল করলেন এবং খুব বেশি দিন যেতে না যেতেই কিসরা পারভেজকে তারই ছেলে সিরওয়াই ছুরি কাটাতে হত্যা করল। চিঠিটির মতোই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল সে। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনি কোন মাসে কোন দিনে নিহত হবে তাও আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন এবং তা ঠিক সেইভাবেই ঘটেছিল। আর তার সাম্রাজ্য তা ছিন্নভিন্ন করেছিলেন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খেলাফতের সময় মিশরে যাওয়ার জন্য নির্বাচিত দূত ছিলেন হাতিব ইবনে আবি বালতা। তিনি নবীজির চিঠি পৌঁছে দিতে রওনা হলেন সেই শাসক মুকাউকিসের কাছে। যেহেতু মুকাউকিস তখন আলেকজান্দ্রিয়ায় ছিলেন, হাতিব সেখানে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং চিঠিটি পেশ করলেন। বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আল্লাহর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মুকাউকিসের উদ্দেশ্যে, যিনি কিবতিদের নেতা। শান্তি বর্ষিত হোক তার উপর যে হিদায়াত অনুসরণ করে। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন। আপনি নিরাপদ থাকবেন আর আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন। কিন্তু আপনি যদি এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন তবে কিবতিদের গুনাহও আপনার উপর বর্তাবে। বলুন, "হে আহলে কিতাব!

এসো এমন এক কথায় একত্র হই যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে খুবই সাধারণ। আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করব না এবং তার সঙ্গে কাউকে শরীক করব না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে একে অন্যকে প্রভু হিসেবে গ্রহণ করব না। " কিন্তু তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলুন সাক্ষী থাকো আমরা মুসলিম। চিঠি পড়া শেষ হলে মুকাউকিস দূত হাতিব ইবনে আবি বালতার প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক আতিথ্য প্রদর্শন করলেন। কিন্তু তখন তিনি কিছুই বললেন না। পরে সেদিন রাতে তিনি হাতিবকে তার কাছে ডেকে পাঠালেন। দীর্ঘ ও বিশদ কথোপকথনের পর মুকাউকিস বললেন "আমি জানতাম আরেকজন নবী আসবেন। কিন্তু আমি ধারণা করেছিলাম তিনি শাম অঞ্চল থেকে আবির্ভূত হবেন। কারণ পূর্ববর্তী অধিকাংশ নবী সেখান থেকেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। তবে আমি গ্রন্থসমূহে এ কথাও পেয়েছি যে সর্বশেষ নবী আরব ভূমি থেকে আবির্ভূত হবেন। যা কষ্ট আর দারিদ্রের দেশ। আমরা তার গুণাবলী আল্লাহর কিতাবে লিখিত পেয়েছি। আর এটি তার আবির্ভাবের ঠিক সেই সময়। কিন্তু আমি যদি কিবতিদের বলি তাকে অনুসরণ করতে তারা আমার কথা শুনবে না। আর আমি আমার সিংহাসনও ছাড়তে পারি না। সেই নবী বহু ভূখণ্ডের উপর শাসন কায়েম করবেন। আর তারপরে তার সঙ্গীরা এসে পৌঁছাবে আমাদের শহরের চত্বর পর্যন্ত এবং এখানেই বসতি স্থাপন করবে। অবশেষে তারা এখানকার মানুষদের পরাজিত - করবে। - তিনি দৃষ্টির আড়ালে ঠেলে দিলেন এই সত্যটিকে যে, আখিরাতের প্রতিদান উভয় দিক থেকেই অনন্ত এবং অনেক উত্তম। সূরা আল-কাসাসে আল্লাহ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, আমরা যা কিছু পেয়েছি তা প্রকৃতপক্ষে তারই দেওয়া এবং তিনি বলেন, "আর তোমাদের যা কিছু দেওয়া হয়েছে তা তো কেবল ভোগের সামগ্রী এবং এই দুনিয়ার জীবনের সাজসজ্জা মাত্র। কিন্তু আল্লাহর কাছে যা আছে তা অনেক বেশি উত্তম এবং অধিক স্থায়ী। তবু কি তোমরা বুদ্ধি বিবেচনা ব্যবহার করবে না?

" সুতরাং চিঠিগুলো শাসকদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। আর এভাবেই ইসলামের বার্তা নতুন নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছে দেওয়ার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তবে এই সাহসী পদক্ষেপগুলোর জন্য উপযুক্ত পরিস্থিতি সহজেই অর্জিত হয়ে যায়নি। এর পেছনে ছিল এমন এক সন্ধি যার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল বিপুল ধৈর্য। মক্কার মুশরিকদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হুদাইবিয়ার সন্ধি। চিঠিগুলো পাঠানোর প্রায় আট থেকে দশ মাস পূর্বে সবকিছু শুরু হয়েছিল একটি স্বপ্ন দিয়ে। সেই রাতে আল্লাহর রাসূল একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন যা সমগ্র মদিনার উপর গভীর প্রভাব ফেলবে। স্বপ্নে তিনি তার সাহাবীদের সঙ্গে কাবা জিয়ারত করছিলেন এবং তারা ছিলেন পুরোপুরি নিরাপদ। তারা একসঙ্গে মক্কায় গিয়েছিলেন। সকালে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন তার স্বপ্নের কথা সাহাবীদের জানালেন, তারা এত বেশি আনন্দ অনুভব করলেন ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সবাই শুনছেন, আল্লাহর রাসূল একটি স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্নে আমরা মক্কায় ওমরা পালন - করছিলাম। - কিন্তু শুধু একটি স্বপ্নে এত বড় প্রভাব ফেলল কেন?

কারণ নবীদের স্বপ্ন ওহীরই একটি রূপ। তাই এটিকে এমন কিছু হিসেবে দেখা হয়েছিল যা অবশ্যই ঘটবে। আর সবাই মক্কায় ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। দীর্ঘ ছয় বছরের বিচ্ছেদের পর তারা অবশেষে মক্কায় ফিরে যেতে পারবেন এবং আল্লাহর ঘর জিয়ারত করতে পারবেন। সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। এক সোমবার চোদ্দশ মুসলমান অত্যন্ত উচ্ছ্বাস নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হলেন। তারা সঙ্গে নিয়েছিলেন সত্তরটি কুরবানির উট এবং কেবল সেই তরবারিগুলো যা পথিকেরা আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করত। তাদের উদ্দেশ্য যুদ্ধ ছিল না, বরং ওমরাহ পালন করা। দূর থেকেই স্পষ্ট বোঝা জরুরি ছিল যে তাদের যুদ্ধের কোন ইচ্ছাই দেখা যাচ্ছে না। একবার ভাবুন তো, তারা এগিয়ে যাচ্ছিলেন সেই লোকদের দিকে যাদের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ চলেছিল ছয় বছর ধরে, যুদ্ধের কোন প্রস্তুতি ছাড়াই। কি অসাধারণ সাহস!

সব উত্তম গুণের মতো তাদের সাহসও উৎসারিত হয়েছিল ঈমান থেকেই। তারা যখন জুলহুরাইফা অঞ্চলে পৌঁছালেন তখন জোহর পড়লেন। নামাজের পর আল্লাহর রাসূল দুটি সাদা কাপড় পরিধান করলেন, ওমরাহের নিয়ত করলেন এবং ইহরামে প্রবেশ করলেন। তারপর তিনি তলবিয়া পাঠ শুরু করলেন। "লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। " সাহাবীরাও একই উদ্দীপনায় তার সঙ্গে সুর মেলালেন। তারা ক্রমশ মক্কার আরও কাছে পৌঁছে যাচ্ছিলেন। তাদের উত্তেজনা ছিল চরমে। এদিকে এই সংবাদ কুরাইশদের কাছে পৌঁছে গেল। যখন তারা শুনল চোদ্দশ মুসলমান মক্কার দিকে রওনা হয়েছে, তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। আপনি কি শুনেছেন? মুসলমানরা মক্কার দিকে এগিয়ে আসছে। চোদ্দশ জন মুসলমান। - এটা কিভাবে সম্ভব?

- কিন্তু তারা তো সশস্ত্র নয়। আমরা বুঝতে - পারছি না কেন তারা আসছে। - তাহলে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। এখনই ব্যবস্থা নিন। তাদের কারণ যাই হোক, আমরা তাদেরকে অনুমতি দিতে পারি না। মুশরিকরা অনুভব করল এটি যুদ্ধের ব্যাপার নয়। এটি ভিন্ন কিছু। কিন্তু তবুও তারা সিদ্ধান্ত নিল মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। তাই তারা দুইশ জন অশ্বারোহীর একটি দল গঠন করল খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে। যখন আল্লাহর রাসূল জানতে পারলেন কুরাইশদের প্রস্তুতির কথা, তিনি তার পথ পরিবর্তন করলেন। তিনি অন্য এক পথ দিয়ে মক্কায় প্রবেশের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু একটি বিষয় তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল, তার উট কাসওয়া। মনে আছে মদিনায় হিজরতের একেবারে শেষে সে একটি মাঠে বসে পড়েছিল এবং আর এগোতে রাজি হয়নি। আর এখন তারা যখন মক্কার সীমানার কাছে পৌঁছালেন, সে আবার বসে পড়ল। তাকে উঠানোর জন্য যতই চেষ্টা করা হোক না কেন তারা ব্যর্থ হলেন। সাহাবীরা বিরক্ত হয়ে পড়লেন এবং বললেন- - আল কাসওয়া একগুঁয়ে হয়ে গেছে। - আল্লাহর রাসূল জবাব দিলেন, "সে একগুঁয়ে হয়ে যায়নি। কারণ একগুঁয়েমি তার স্বভাব নয়। বরং তাকে থামিয়ে দিয়েছেন তিনিই, যিনি হাতিকেও থামিয়ে দিয়েছিলেন। " অর্থাৎ সেই আব্রাহার হাতি যে কাবায় পৌঁছাতে চেয়েছিল। আল্লাহ তার সৃষ্টিকে যেদিকে পরিচালিত করেন তাতেই হিকমত রয়েছে এবং তিনি যেখান থেকে তাদের ফিরিয়ে রাখেন তাতেও কল্যাণ রয়েছে। এরপর তারা হুদাইবিয়া নামক স্থানের একটি কূপের পাশে শিবির স্থাপন করলেন। তাদের মাতৃভূমি, তাদের স্মৃতি, তাদের ঘরবাড়ি এবং প্রিয়জনেরা এখন খুব কাছেই। - কিন্তু সবার মনে একটিই প্রশ্ন ছিল- - কবে আমাদের মক্কায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে?

আমি জানিনা। তবে আল্লাহর রাসূলই সর্বাধিক জানেন। মুশরিকরা যখন পরিস্থিতির কথা জানতে পারল, তারা সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের কাছাকাছি একটি শিবির গড়ে তুলল। এখন উভয় পক্ষের মধ্যে দূতদের যাতায়াত শুরু হবে। মুসলমানদের প্রথম দূত কুরাইশদের কাছে গিয়ে বললেন যে তারা কেবল ওমরাহ পালনের জন্য এসেছেন এবং আল্লাহর রাসূল একটি সন্ধি করতে চান। মুশরিকরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। তবে কুরাইশদের একজন ব্যক্তি বুদাইল ইবনে ওয়ারকা এই প্রস্তাবটিকে যুক্তিসঙ্গত মনে করলেন এবং আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তিনি বললেন- "হে মুহাম্মদ, কুরাইশ আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে - এবং আপনাকে কাবা জিয়ারত করতে বাধা দেবে। " - আল্লাহর রাসূল তাকে জানালেন তারা শুধু ওমরাহ পালনের জন্যই এসেছেন। তারপর তিনি বললেন, "নিশ্চয়ই যুদ্ধ কুরাইশদেরই নিঃশেষ করে দিয়েছে। তারা যদি চায় আমরা শান্তি নিয়ে আলোচনা করতে পারি। কিন্তু এখন তাদের সরে দাঁড়াতে দিন। আর আমার ও আল্লাহর ঘরের মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়াতে নিষেধ করে দিন। আমাদের ওমরাহ পালন করতে দিন এবং আমাদেরকে কুরবানি আদায় করতে দিন। " দূতরা যাতায়াত করতে থাকলেন কিন্তু কোন সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলেন না। অবশেষে আল্লাহর রাসূল উসমান ইবনে আফফানকে দূত হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মক্কার এক সম্মানিত ব্যক্তি এবং সেখানেই তার আত্মীয়স্বজনও ছিল। ফলে এ কাজের জন্য তিনিই - ছিলেন সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। - আমি এসেছি আল্লাহর রাসূলের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে জানাতে এবং আপনাদেরকে শান্তি ও ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে। যে আপনাকে পাঠিয়েছে তাকে গিয়ে বলে দিন যে, সে কখনোই মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না এবং - কাবা তাওয়াফও করতে পারবে না। - তবে আপনি চাইলে তাওয়াফ করতে পারেন। উসমান দীর্ঘ তেরো বছর ধরে কাবা দেখেননি। নবুয়তের ষষ্ঠ বছরে তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। আর হিজরতের পর তিনি ফিরে এসেছিলেন মদীনায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। এত প্রতীক্ষার পরও তার উত্তর ছিল স্পষ্ট না। যদি আল্লাহর রাসূলকে তাওয়াফ করতে দেওয়া না হয় তবে আমিও তা তাওয়াফ করব না। এই জবাবে মুশরিকরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে গেল এবং তারা সিদ্ধান্ত নিল উসমানকে মক্কায় আটকে রাখবে। উসমান চলে যাওয়ার পর তিন দিন কেটে গেল। তবু তার কোনো সংবাদ পাওয়া গেল না। অতঃপর মুসলমানদের মধ্যে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। - উসমানকে হত্যা করা হয়েছে। - তারা তো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। আল্লাহর রাসূলের সামনে একটি পথ বাকি ছিল। উসমানের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া। তিনি সাহাবীদের একত্র করলেন তাদের মতামত গ্রহণ করতে। তারা শপথ করতে যাচ্ছিলেন যে, যাই ঘটুক না কেন তারা তার পাশে থেকে লড়বেন। যদিও তাদের যুদ্ধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না তবুও তাদের প্রত্যেকেই এগিয়ে এলেন এবং নবীজির হাত ধরে শপথ করলেন। আমরা মৃত্যু পর্যন্ত কুরাইশদের বিরুদ্ধে লড়ব এবং কখনোই শত্রুর সামনে থেকে পালাব না। এই বীরত্বপূর্ণ ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে পরিচিত হবে বাইয়্যাতে রিদওয়ান নামে। শুধু একজন মানুষই বাকি রইলেন যিনি তখনও বাইয়াত গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। যার পরিণতি তখনও অজানা ছিল। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার ডান হাত তুলে বললেন, "এটি আমার হাত। " তারপর তিনি বাম হাত তুলে বললেন, "আর এটি উসমানের হাত। " এরপর তিনি তার ডান হাত বাম হাতের উপর রাখলেন। এরপর তিনি মুসলমানদের দিকে ফিরে বললেন, "তোমরা সাক্ষী থাকো এই বাইয়াত উসমানের পক্ষ থেকেও। " এতে সাহাবীদের আনন্দ - উদ্দীপনা আরও বেড়ে গেল। - আমাদের উচিত উসমানকে মুক্ত করা। না হলে - মুহাম্মদের লোকেরা মক্কায় আক্রমণ করবে। - যখন কুরাইশরা শুনল উসমানের প্রতিশোধ নেওয়ার শপথের কথা, তারা ভয় পেয়ে গেল এবং দ্রুত তাকে মুক্ত করে দিল। তার ফিরে আসা সব মুসলমানের জন্য অনেক বড় আনন্দ বয়ে আনল। বিশেষ করে আল্লাহর রাসূলের জন্য। তাকে জীবিত ও সুস্থ দেখে সবার হৃদয়ে শান্তি ও স্বস্তি নেমে এল। এই দৃঢ় অবস্থানের মুখোমুখি হয়ে মুশরিকরা পিছু হটতে বাধ্য হল। তারা শান্তি চুক্তির জন্য সুহাইলকে আল্লাহর রাসূলের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। রাসূলুল্লাহ তাকে দেখে বললেন, "যে আসছে সে সুহাইল। এখন তোমাদের ব্যাপার সহজ হয়ে গেল। কুরাইশ যখনই শান্তি চায়, তারা সব সময় এই লোকটিকেই পাঠায়। এখন কুরাইশদের চিন্তা শুধু চুক্তি নিয়েই। " সুহাইল নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)ের সামনে এসে বললেন, "হে মুহাম্মদ, আমি কুরাইশের পক্ষ থেকে আপনার সঙ্গে একটি চুক্তি করতে এসেছি। " এটি তো শুরু থেকেই নবীজিরও কাম্য ছিল। তাই তিনি প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেন। এরপর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ডাকা হলো লিখে রাখার জন্য চুক্তির শর্তাবলী। রাসূলুল্লাহ তাকে নির্দেশ দিলেন, "হে আলী, লিখো বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। " সুহাইল সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি - জানিয়ে বলল - "আমি এ বাক্যটি কখনো শুনিনি। আর রাহমান অর্থও জানি না। আমরা যেটি জানি এবং আমাদের চুক্তিতে ব্যবহার করি তা হলো বিসমিকাল্লাহুম্মা। অর্থাৎ, হে আল্লাহ, আপনার নামেই। তার বদলে সেটাই লিখুন। " নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, "বিসমিকাল্লাহুম্মা ও ভালো। " অতঃপর সেভাবেই তা লেখা হলো। এরপর রাসূলুল্লাহ বললেন, "হে আলী, লিখো। এগুলো হলো মুহাম্মদ, আল্লাহর রাসূল এবং সুহাইল ইবনে আমর এর মধ্যকার শান্তি চুক্তির শর্তাবলী। " সুহাইল - আবারও আপত্তি করল। - "আল্লাহর কসম!

যদি আমরা মানতাম, আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আমরা আপনাকে কাবা জিয়ারত করতে বাধা দিতাম না। আর আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধও করতাম না। বরং লিখুন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ। " রাসূলুল্লাহ এটিও মেনে নিয়ে বললেন, "হে আলী, এটি মুছে ফেলে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ লিখো। " আলী হতবাক হয়ে গেলেন। অন্য সাহাবীরাও এমন পরিস্থিতিতে ভীষণভাবে - বিচলিত হয়ে উঠলেন। আলী বললেন - "আল্লাহর কসম! আমি কখনোই আল্লাহর রাসূল উপাধিটি মুছে পারি না। আমি নিজে এই কাজ করতে পারব না। " রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় এটি লেখা আছে?

আলী তা দেখিয়ে দিলে তিনি নিজ হাতে আল্লাহর রাসূল উপাধিটি মুছে দিলেন এবং আলীকে বললেন, তার বদলে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ লিখতে। বিষয়গুলো ঠিকঠাক এগোচ্ছিল না। কিন্তু চুক্তির প্রথম ধারাতেই সাহাবীরা সত্যিকারের ধাক্কা খেলেন। মুসলমানরা এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই ফিরে যাবে। আগামী বছর তারা উমরাহ পালন করবে। তবে তারা খাপে রাখা তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। এবং তাদের অবস্থান শুধু তিন দিনের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে। আল্লাহর রাসূল যখন এতে সম্মতি দিলেন, সাহাবীদের মধ্যে প্রবল হতাশা নেমে এল। কেন?

কেউই তা বুঝতে পারছিলেন না। এরপর দ্বিতীয় ধারা লেখা হলো। দুই পক্ষ দশ বছর একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। তৃতীয় ধারা, মদিনা থেকে কেউ নিজ ধর্ম ত্যাগ করে মক্কায় ফিরে গেলে তাকে মুসলমানদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে না। কিন্তু মক্কা থেকে কেউ মুসলিম হয়ে এলে তাকে কুরাইশদের কাছে ফেরত দিতে হবে। এটি মুসলমানদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। - সাহাবীরা বললেন - "সুবহানাল্লাহ! আমাদের কাছে একজন মুসলিম হয়ে এলে আমরা কিভাবে তাকে মুশরিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারি?

" রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), যিনি সব কিছুর পরও শান্তি চেয়েছিলেন, জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, আমাদের ছেড়ে তাদের কাছে কেউ চলে গেলে আল্লাহ তাকে আমাদের থেকে দূরে রাখুন। আর তাদের দিক থেকে যারা আমাদের কাছে আসবে অথচ আমরা ফিরিয়ে দেব, আল্লাহ তো তাদের সবাইকেই জানেন। তিনি অবশ্যই তাদের জন্য স্বস্তি ও মুক্তির পথ সৃষ্টি করবেন। " চার, আরব গোত্রগুলো যে পক্ষই চায়, তার সঙ্গে মৈত্রী করতে স্বাধীন থাকবে। এবং চুক্তি এ ধরনের আরও শর্ত নিয়ে চলতে থাকল। আর এই কঠিন শর্তগুলোর উপরেও এমন একটি ঘটনা ঘটল, যা তাদের হতাশাকে আরও বাড়িয়ে দিল। চুক্তি লেখা হয়ে গিয়েছিল কিন্তু তখনও স্বাক্ষর হয়নি। ঠিক সেই মুহূর্তে পায়ের শৃঙ্খল টেনে টেনে এক ব্যক্তি মুসলমানদের মাঝে এসে পড়লেন। তিনি ছিলেন আবু জানদাল। কুরাইশদের দূত সুহাইলের ছেলে। তার বাবা তাকে চার বছর ধরে বন্দী করে রেখেছিল। শুধু এই কারণে যে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কোনোভাবে পালাতে সক্ষম হলেন এবং চরম কষ্ট সহ্য করে মুসলমানদের কাছে পৌঁছে গেলেন। তিনি এলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে, তার বাবার জুলুম ও নির্যাতন থেকে আশ্রয় চাইতে। তিনি আর্তনাদ করে বলছিলেন, "হে মুসলমান, আমাকে সাহায্য করুন। " এই দৃশ্য দেখে সোহাইলের মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল। সে - বলল, - "হে মুহাম্মদ, এটাই হবে আমাদের চুক্তির একেবারে প্রথম শর্ত। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। " রাসূলুল্লাহ আবু জান্দালকে ফেরত দিতে চাননি। তিনি সোহাইলকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি তাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন চুক্তিতে তখনও স্বাক্ষর হয়নি এবং অনুরোধ করলেন তার ছেলের উপর যেন সে শর্ত প্রয়োগ না করা হয়। কিন্তু সোহাইল কঠোরভাবে তা প্রত্যাখ্যান করল। "আমি কখনোই চুক্তিতে স্বাক্ষর করব না। - যদি না আমার ছেলেকে ফেরত পাই। " - ঠিক সেই মুহূর্তে আবু জান্দাল হৃদয়বিদারক - কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, - "হে মুসলমান, আমি মুসলিম হয়ে আপনাদের কাছে আসার পরও আপনারা কি আমাকে মুশরিকদের কাছে ফেরত দেবেন?

আমি কত কষ্ট সহ্য করেছি তা কি - আপনারা দেখছেন না?

" - নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আবু জান্দালের দিকে তাকিয়ে বিষন্ন কন্ঠে বললেন, "আরও কিছুটা ধৈর্য ধরুন। আপনি যে জুলুমের মুখোমুখি হচ্ছেন তা আর একটু সহ্য করুন। এই কষ্টগুলোর প্রতিদান আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করুন। আল্লাহ অবশ্যই আপনার জন্য মুক্তি এবং বেরিয়ে আসার পথ খুলে দেবেন এবং অন্য অসহায় মুসলমানদের জন্যও। আমরা তাদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারি না। " এই সান্ত্বনাময় কথাগুলোর সঙ্গে তিনি আবু জান্দালকে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি দিচ্ছিলেন আসন্ন এক মুক্তির সুসংবাদ। আবু জান্দাল এবং মক্কার অন্য সব নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য এক মুক্তির পথ। এমন এক পথ যা শেষ পর্যন্ত মুশরিকদেরকে সেই শর্তে অনুতপ্ত করে তুলবে যা তারা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। আর তখনই হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রথম ফলাফল প্রকাশ পেতে শুরু করবে। আপাতদৃষ্টিতে শর্তগুলো যেন সম্পূর্ণরূপে মুসলমানদের বিরুদ্ধেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আল্লাহর রাসূল ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছিলেন সেই মহান বিজয়গুলো যা এই শান্তির পরে আসতে চলেছে। কিন্তু সাহাবীরা গভীরভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তারা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না কেন এই কঠিন শর্তগুলো মেনে নেওয়া হলো। সেই দিন পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ প্রায়ই সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং তাদের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল সেদিন তিনি কারো সঙ্গে পরামর্শ করলেন না। যদিও কেউই তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তিনি জানতেন আল্লাহর পরিকল্পনা ভিন্ন এবং কাজটি এভাবেই সম্পন্ন হতে হবে। আর এখন ইহরাম থেকে বেরিয়ে মদিনায় ফিরে যাওয়ার সময় আল্লাহর রাসূল সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন মাথা মুন্ডন করতে এবং নিজেদের পশু জবাই করতে। সাধারণত সাহাবীরা তার নির্দেশ পালনে একে অন্যের আগে যেতে চাইতেন। কিন্তু এবার বিষয়টি ছিল পুরোপুরি উল্টো। নবীজি তিনবার নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করলেও কেউই দাঁড়ালেন না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তিনি তার স্ত্রী উম্মে সালামার তাবুতে গেলেন এবং যা ঘটেছে তা তাকে জানালেন। উম্মে সালামা তাকে একটি পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আপনি যদি চান তারা আপনার নির্দেশ অনুসরণ করুক। তবে বাইরে যান আর কাউকে কিছুই বলার দরকার নেই। আপনার পশু জবাই করুন এবং আপনার নাপিতকে মাথা মুন্ডনের জন্য ডাকুন। সাহাবীরা যখন এটি দেখবেন তখন তারাও আপনাকে অনুসরণ করবেন। " রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই পরামর্শ গ্রহণ করলেন। তিনি নিজের পশু জবাই করলেন এবং মাথা মুন্ডন করালেন। সাহাবীরা যখন এটি দেখলেন তখন তারাও একই কাজ করলেন। একটু পর এক দমকা হাওয়া এলো এবং তাদের কাটা চুল কাবার দিকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। সাহাবীরা অনুভব করলেন আল্লাহ, যিনি কোন হাওয়ার ঝাপটাও অকারণে বইতে দেন না, আসলে তাদের সান্ত্বনাই দিচ্ছেন। তাই তারা এটিকে তাদের উদ্দেশ্যকৃত উমরাহ কবুল হওয়ার একটি নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করলেন। আসলে সাহাবীদের এই দেরি অবাধ্যতার কারণে ছিল না। অবশ্যই নয়। তাহলে এর পিছনে কারণ কী ছিল?

তারা অপেক্ষা করছিলেন এই আশায় যে হয়তো কোন ওহী নাযিল হবে এবং নবীজি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন। কারণ তারা এমন ঘটনাও দেখেছেন যেখানে আল্লাহ কোরআনে তার রাসূলকে সতর্ক করেছেন বা সংশোধন করেছেন। তাই তারা কেবল এই ভেবেই কিছুটা থেমেছিলেন যে হয়তো নতুন কোন ওহী আসতে পারে। কিন্তু নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইহরাম থেকে বেরিয়ে আসা মাত্রই তারাও ইহরাম থেকে বেরোতে শুরু করলেন। এখন মদিনায় ফিরে যাওয়ার সময়। তারা তাদের যাত্রা শুরু করেছিলেন অপরিসীম আনন্দ নিয়ে। কিন্তু এখন তারা ফিরে যাচ্ছিলেন গভীর বিষন্নতায়। তারা ছিলেন উদ্বিগ্ন এবং গভীরভাবে মর্মাহত। তাদের মনোবল পুনরুজ্জীবিত করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল কোন একটা কিছু ঘটা। আর তখনই তাদের রব পাঠালেন সেই সুসংবাদ যার জন্য তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল এবং দূর করে দিলেন তাদের সব সংশয় ও হতাশা। হঠাৎই আল্লাহর রাসূলের উপর ওহীর আলামত প্রকাশ পেতে শুরু করল এবং সম্পূর্ণ সূরা আল-ফাতহ একসাথে নাযিল হলো। "নিশ্চয়ই আমি আপনাকে এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার রাসূলের স্বপ্নকে সত্যরূপে বাস্তবায়িত করেছেন। আল্লাহ চাইলে আপনারা অবশ্যই নিরাপদে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবেন। আর অবশ্যই মাথা মুন্ডিত করে এবং চুল ছাঁটিয়ে ভয়হীন অবস্থায়। তিনি জানতেন যা তোমরা জানতে না। তাই এর আগে তিনি তোমাদের নিকটবর্তী এক বিজয় - দান করেছেন। " ওমর জিজ্ঞেস করলেন, - "হে আল্লাহর রাসূল, এই চুক্তি কি সত্যিই - একটি বিজয়?

" - তিনি জবাব দিলেন, "হ্যাঁ, আল্লাহর কসম!

এটি অবশ্যই একটি বিজয়। " এই কথাগুলো সাহাবীদের হৃদয়ে গভীর স্বস্তি এনে দিল। তবে এটি কিভাবে বিজয়ে পরিণত হবে তা তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারবেন। এখন তাদের করার ছিল কেবল অপেক্ষা আর দেখিতে থাকা। দীর্ঘ যাত্রার পর তারা মদিনায় ফিরে এলেন। আল্লাহর রাসূল মক্কার লোকদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিলেন তার একটি ছিল যে দশ বছর যুদ্ধ হবে না। হুদাইবিয়াকে প্রথমে ইসলামের জন্য একটি পরাজয় মনে করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি নিয়ে আসতে যাচ্ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত সব ফলাফল। এমন ফলাফল যা কুরাইশরা কোনোভাবে কল্পনাও করতে পারেনি। এমনকি মুসলমানরাও কল্পনা করতে পারেননি। শীঘ্রই কুরাইশরা এই চুক্তির জন্য অনুতপ্ত হবে এবং এর একটি শর্ত বাতিল করতে চাইবে। ধাপে ধাপে সবকিছু ঘটতে যাচ্ছিল ঠিক আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী। অপ্রত্যাশিত শত্রু, অপ্রত্যাশিত বিজয়। আপনার মতে কোন বিজয়টি বড়?

তরবারির বিজয় নাকি কলমের বিজয়?

যদিও তরবারির বিজয় অর্জন করা বেশি কঠিন, তবু কলমের বিজয় অনেক বেশি মহান। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটি জানতেন আর সেই কারণেই তিনি সেই চুক্তি মেনে নিয়েছিলেন। হুদাইবিয়া ইতিহাসের সবচেয়ে মহান বিজয়গুলোর একটিতে পরিণত হবে যা কলমের মাধ্যমে অর্জিত। অল্প সময়ের মধ্যে এই চুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিজয়ের প্রকৃত বীজগুলো অঙ্কুরিত হতে শুরু করবে। আর তাদের প্রথমজন ছিল আবু বাসির, যিনি মক্কা থেকে মদিনায় পালিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না যে, এই পলায়ন শুধু তার নিজের জন্য নয় বরং আরও বহু মুসলমানের জন্য মুক্তির পথ হয়ে উঠবে। আবু বাসির ছিলেন সাকিফ গোত্রের লোক। তিনি ছিলেন এক সাহসী মানুষ, যিনি তরুণ বয়সেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যখন তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না মক্কার কঠোর পরিস্থিতি, তখন তিনি পালানোর একটা উপায় বের করলেন এবং মদিনায় ভাইদের সঙ্গে যোগ দিতে রওনা হলেন। কিন্তু মুশরিকদের তাকে যেতে দেওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিল না। তিন দিন পর কুরাইশরা আবু বাসিরকে ফিরিয়ে আনতে দুজন লোক পাঠালো। তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে এসে বলল, "আমরা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি আমাদের সঙ্গে আপনার স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা। " এরপর তারা তাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানাল। চুক্তির কারণে আল্লাহর রাসূলকে আবু বাসিরকে ফিরিয়ে দিতেই হলো। তিনি তাকে বললেন, "হে আবু বাসির, তুমি তো জানো আমরা কুরাইশদের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছি এবং তাদেরকে কথা দিয়েছি। আমাদের ধর্মে আমরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারি না। আল্লাহ অবশ্যই তোমার জন্য মুক্তি ও বেরিয়ে আসার পথ খুলে দেবেন এবং অন্য অসহায় মুসলমানদের জন্যও যারা মুশরিকদের মাঝে আটকে আছে। " আবু বাসির - জিজ্ঞেস করলেন, - "হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আমাকে মুশরিকদের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছেন যাতে তারা আমাকে আবারও নির্যাতন করে আর দ্বীন থেকে ফিরিয়ে - দেয়?

" - একবার সেই অসহায় অবস্থাটা ভাবুন। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। তো এরপর আল্লাহর রাসূল কি বললেন?

"তুমি যাও। আল্লাহ অবশ্যই তোমার এবং তোমার মতো অন্যদের সবার জন্য পথ খুলে দেবেন। " এরপর তিনি তাকে আশ্বাসি লোকদের হাতে তুলে দিলেন। কুরাইশদের পাঠানো সেই দুই ব্যক্তি আবু বাসিরকে নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হলো। কিন্তু আবু বাসিরের হার মানার বা মক্কায় ফিরে যাওয়ার কোন ইচ্ছাই ছিল না। যখন তারা জুল হুলাইফায় পৌঁছাল, তখন কিছুক্ষণ বিশ্রামের জন্য থামল। আবু বাসির ক্রমাগত পালানোর সুযোগ খুঁজছিলেন। প্রথমে তিনি বন্ধুসুলভ আচরণ করে তাদের আস্থা অর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাই তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন। তিনি তাদের - একজনকে বললেন, - "আমার মনে হয় আপনার এই তরবারিটি বেশ - ধারালো। " "হ্যাঁ, এটি খুবই ধারালো। " - এরপর আবু বাসির খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস - করলেন, - "আমি কি এটি একটু দেখতে পারি?

" "অবশ্যই - দেখুন। " - আবু বাসির ঠিক তখনই পেয়ে গিয়েছিলেন সেরা সুযোগটি। তরবারিটি হাতে পেয়েই তিনি লোকটিকে আক্রমণ করে হত্যা করলেন। এ দৃশ্য দেখে অন্য লোকটি প্রাণপণে দৌড়ে আবার মদিনায় ফিরে গেল। সে সরাসরি আল্লাহর রাসূলের কাছে গিয়ে - বলল, - "আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে। আমাকেও - প্রায় মেরে ফেলা হচ্ছিল। " - সে সেখানে থাকতেই আবু বাসিরও এসে পৌঁছালেন। - তিনি বললেন, - "হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাকে তাদের হাতে তুলে দিয়ে আপনার অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন। আর এখন আল্লাহ আমাকে তাদের হাত থেকে রক্ষা - করেছেন। " - রাসূলুল্লাহ বললেন, "এই ব্যক্তি তো যুদ্ধের এক স্ফুলিঙ্গ। যদি তার সঙ্গে কয়েকজন মানুষ থাকতো তবে এমন প্রায় কিছুই থাকতো না যা সে করতে পারতো না। " তবুও চুক্তির কারণে আবু বাসির মদিনায় অবস্থান করতে পারলেন না। তাই তিনি চলে গেলেন এবং ইশ উপত্যকায় বসতি স্থাপন করলেন, যা ছিল মক্কা থেকে শামের পথের উপর। এই স্থানই হয়ে উঠলো তার নতুন আশ্রয়। মক্কায় বন্দী মুসলমানরা এবং যারা ঈমান গোপন রেখেছিলেন, যখন এই খবর শুনলেন, তারা একজন একজন করে পালাতে শুরু করলেন এবং আবু বাসিরের চারপাশে জড়ো হলেন। আর তাদের মধ্যে প্রথমজন ছিলেন আবু জানদাল। তার কথা মনে আছে। তিনি ছিলেন সোহাইল ইবনে আমরের ছেলে। হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরের পর তিনি আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। কিন্তু তাকে আবার মুশরিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল। আর এখন তিনি আবারও পালানোর একটি উপায় বের করেছিলেন। আর যখন তিনি জানতে পারলেন আবু বাসির কোথায় আছেন, তিনি সেখানে এসে হাজির হলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সংখ্যা দাঁড়ালো সত্তর জনে এবং আশপাশের গোত্রের অন্যরা তাদের সঙ্গে যোগ দিলে সংখ্যা পৌঁছালো তিনশতে। এইভাবে আবু বাসির তার চারপাশে এক শক্তিশালী দল গড়ে তুলেছিলেন। কুরাইশরা নিজেদের ভূখণ্ডে তাদের বন্দী করে রাখত এবং নির্যাতন করত। কিন্তু এখন আবু বাসির ও তার সঙ্গীরা মুশরিকদের তাদের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত করতেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কুরাইশদের জন্য শামে পাঠানো বাণিজ্য কাফেলাগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর আবু বাসির ও তার সঙ্গীদের শিবির ছিল ঠিক সেই পথেই। তারা বাণিজ্য পথ কেটে দিতে শুরু করলেন এবং কুরাইশদের কাফেলাগুলোর উপর হানা দিতে লাগলেন। তাদের এসব আক্রমণের মধ্য দিয়ে তারা মুশরিকদের দুর্বল করতে শুরু করলেন। কুরাইশরা নিজেদের হাতেই এই বিপদ নিজেদের উপর ডেকে এনেছিল। তারা এমন এক অবস্থায় পৌঁছে গেল যেখানে তারা আর আবু বাসিরের দলকে সামলাতে পারছিল না। যদি তারা সেই শর্তটি না দিত, যেখানে বলা হয়েছিল আমাদের দিক থেকে কেউ তোমাদের কাছে এলে তাকে ফিরিয়ে দেবে হুদাইবিয়ার সন্ধিতে, তাহলে এমন একটি দল কখনোই গঠিত হতো না। এখানেই সেই চুক্তির প্রথম ফলাফলগুলো যা দেখতে পুরোপুরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে মনে হচ্ছিল, তা অর্জিত হতে শুরু করল। মদিনার লোকদের কথা বললে কেউই মক্কায় ফিরে যেতে চাইত না। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে তাদের এবং মক্কার মধ্যে কোন সংঘর্ষ হয়নি। কিছুদিনের জন্য পরিস্থিতি শান্ত ছিল। কিন্তু কুরাইশরাই একমাত্র শত্রু ছিল না। ইহুদিরাও ছিল এক বড় আপদ। মদিনা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তারা খাইবারে একত্রিত হয়েছিল। আপনার যদি মনে থাকে তারা আরব গোত্রগুলোকে একত্র করেছিল, মদিনার দিকে এনেছিল এবং খন্দকের যুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল। ইহুদিরা একে অপরকে মদিনা আক্রমণে উৎসাহিত করছিল এবং পারস্পরিক উদ্দীপনা বাড়াতে ভাষণ দিচ্ছিল। আল্লাহর রাসূল খাইবারে কিছু তৎপরতার সংবাদ পেলেন। তাই তিনি কিছু সাহাবীকে পাঠালেন তথ্য সংগ্রহের জন্য। ইহুদিরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রতিদিনই খাইবার এমন এক হুমকিতে পরিণত হচ্ছিল যা শীঘ্রই সামলানো কঠিন হয়ে যাবে। এই বিপদকে চিরতরে শেষ করে দিতে হতো। যদি কুরাইশও তখনও মুসলমানদের জন্য হুমকি হয়ে থাকতো, তাহলে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করা আরও অনেক কঠিন হয়ে যেত। এইভাবে তার বিস্ময়কর পরিকল্পনার মাধ্যমে আল্লাহ তার রাসূলকে সেই স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং তাকে উমরাহর দিকে পরিচালিত করেছিলেন। আর শেষ পর্যন্ত হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হলো। আর এর ফলে শত্রুর সংখ্যা দুই থেকে একে নেমে এলো। এখন মুসলমানরা খাইবারের দিকে অগ্রসর হতে পারতেন। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সাহাবীদের অবিলম্বে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন। মুসলিম বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে সমবেত হলো। তাদের সংখ্যা দাঁড়ালো ষোলশ, যার মধ্যে দুইশ জন ছিলেন অশারোহী। এরা কেবল তারাই ছিলেন যারা মদিনা থেকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বের হয়েছিলেন। পরে দাউদ গোত্রের আরও চারশ জন তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন। আর তাদের মধ্যেই ছিলেন প্রসিদ্ধ আবু হুরাইরা। এটি ছিল হিজরতের সপ্তম বছর। মুসলিম বাহিনীর পতাকা বহন করছিলেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু। আর ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বাহিনীর ডান দিকের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। এরপর তারা রাজী নামক এক স্থানে পৌঁছে সেখানে শিবির করলেন। এটি ছিল খাইবার ও গাতাফান এলাকার মধ্যবর্তী একটি কৌশলগত স্থান। রাসূলুল্লাহ কেন সেই স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন তার কারণ ছিল। খাইবার ইহুদিরা গাতাফানের কাছে সাহায্য চেয়েছিল আর তারা তা মেনে নিয়েছিল। প্রয়োজন হলে তারা এসে খাইবার দুর্গের ভেতর থেকে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়বে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নবীজি এই পরিস্থিতির কথা জেনে গিয়েছিলেন। আর এই সহায়তা ঠেকাতে তিনি গাতাফানকে একটি প্রস্তাব দিলেন। যদি তারা ইহুদিদের সাহায্য না করতে রাজি হয় তবে বিজয়ের পর এক বছরের জন্য খাইবার খেজুর ফসল তারা পাবে। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। তাই সেখানে বাহিনী মোতায়েন করে আল্লাহর রাসূল বন্ধ করে দিলেন গাতাফান থেকে ইহুদিদের দিকে যাওয়ার যে কোন সহায়তার পথ। এরপর রাসূলুল্লাহ তার বাহিনী নিয়ে রাজী থেকে খাইবার দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি পৌঁছালে তখন ছিল রাত। যেহেতু রাতের বেলায় আক্রমণ করা তার অভ্যাস ছিল না, তাই তিনি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। সূর্যোদয়ের পর সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে ইহুদিরা নিজেদের ক্ষেতের দিকে যেতে দুর্গ থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু সামনে মুসলিম বাহিনীকে দেখেই তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। - তারা চিৎকার করে উঠল - মুহাম্মাদ আর তার বাহিনী এখানে। এরপর আতঙ্কিত হয়ে তারা নিজেদের দুর্গে আশ্রয় নিতে ছুটে পালাল। তাদের অধিকাংশের কল্পনাতেও ছিল না যে, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের অবরোধ করবেন। অবশ্য তাদের দুর্গ ছিল মজবুত। তাদের লোকসংখ্যা ছিল অনেক আর অস্ত্রও ছিল প্রচুর। তারা মনে করেছিল এমন সুরক্ষিত জায়গাকে রাসূলুল্লাহ কখনো অবরোধ করার সাহস করবেন না। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ তাদের কল্পনার মতো মোটেও হলো না। প্রথমে রাসূলুল্লাহ তাদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানালেন। তারা যদি তা প্রত্যাখ্যান করে তবে মুসলমানদের জিজিয়া দিতে হবে। আর তিনি ঘোষণা করলেন এই দুই পথের একটিতেও যদি শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হয় তবে যুদ্ধ হবে। খাইবার ইহুদিরা এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার জন্য ভেতরে ফিরে গেল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তারা মুসলমানদের দিকে তীর ছোড়া শুরু করল। তারা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। সব ইহুদি যোদ্ধা তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ নাতাতে জড়ো হলো। আর তারা নিজেদের মালপত্র ও পরিবারগুলোকে অন্য দুর্গগুলোতে সরিয়ে নিল। দশ হাজার ইহুদি সৈন্য মাত্র এক হাজার ছয়শ সাহাবীর উপর তীরবৃষ্টি বর্ষণ করছিল। সেদিন প্রায় পঞ্চাশ জন মুজাহিদ আহত হয়েছিলেন। প্রতিদিন সকালে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এবং মুজাহিদরা নাতাত দুর্গের নিকটবর্তী উঁচু ভূমিতে উঠে যেতেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত ইহুদিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেন। আর সন্ধ্যায় তারা রাজীতে ফিরে আসতেন। এই সময়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তীব্র মাথাব্যথায় আক্রান্ত হলেন। আর এর ফলে তিনি দুইদিন বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে পারলেন না। প্রথমে তিনি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দায়িত্ব দিলেন এবং তাকে ইহুদিদের বিরুদ্ধে পাঠালেন। কিন্তু বিজয় অর্জিত হলো না। পরদিন তিনি পতাকা দিলেন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। কিন্তু বিজয় তার জন্যও নির্ধারিত ছিল না। এতে করে ইহুদিদের সাহস আরও বেড়ে গেল। তাই তারা তাদের দরজা খুলে দিল এবং মুখোমুখি লড়াই শুরু করল। এভাবেই যুদ্ধ চলতে থাকলো সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু মুসলমানরা যতই চেষ্টা করুক না কেন, তারা কোন ভালো ফল অর্জন করতে পারলেন না। অবরোধের একদিন আল্লাহর রাসূল বললেন, আগামীকাল আমি এই পতাকা এমন একজনের হাতে দেব যাকে আল্লাহ ও তার রাসূল ভালোবাসেন আর সেও ভালোবাসে আল্লাহ ও তার রাসূলকে। আল্লাহ তার মাধ্যমে বিজয় দান করবেন। সাহাবীদের মধ্যে কৌতূহলের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল। সবাই ভাবতে শুরু করল - এই সম্মান কাকে দেওয়া হবে?

- অবশ্যই এমন প্রশংসা পেতে কে না চাইবে? ডজন ডজন সাহাবী সে রাতটি কাটালেন এই আশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু - পরে বলতেন - সেদিনের মতো নেতৃত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমি - আর কখনো করিনি। - ফজরের নামাজের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পতাকাটি আনার নির্দেশ দিলেন। সব চোখ নিবদ্ধ ছিল তার হাতে থাকা পতাকার দিকে। সব কান অপেক্ষা করছিল তিনি কি বলবেন তা শোনার জন্য। আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলেন আলী কোথায়?

বিজয়ী এখন স্পষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু সে সময় আলীর চোখে প্রচণ্ড ব্যথা ছিল। আর তখন তিনি চোখ খুলতে পারছিলেন না। সাহাবীরা বললেন হে আল্লাহর রাসূল, - তার চোখে খুব ব্যথা। - তবু এর মধ্যেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন তবুও তাকে ডাকো। তাকে আসতে বলো। খবর পেয়ে আলী সাহাবীদের সহায়তায় নবীজির কাছে এসে পৌঁছালেন। রাসূলুল্লাহ যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, তার যন্ত্রণাদায়ক চোখ তাৎক্ষণিকভাবে ভালো হয়ে গেল। সেদিন থেকে আলী আর কখনো চোখের ব্যথায় কষ্ট পাননি। রাসূলুল্লাহ এই দোয়াটিও করেছিলেন, হে আল্লাহ, তার থেকে গরম ও ঠান্ডার কষ্ট দূর করে দিন। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু পরে বলেছিলেন, সেদিন থেকে আমি আর কখনো গরম বা ঠান্ডায় কষ্ট পাইনি। তাকে প্রায়ই দেখা যেত গ্রীষ্মে শীতের পোশাক পরতে এবং শীতে গ্রীষ্মের পোশাক পরতে। আল্লাহর রাসূল পতাকাটি আলীর হাতে তুলে দিলেন এবং তাকে একটি বর্ম পরিয়ে দিলেন। এরপর তিনি নির্দেশ দিলেন, আল্লাহ আপনাকে বিজয় না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করুন এবং পেছনে ফিরবেন না। আলী পতাকাটি নিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে জিজ্ঞেস - করলেন - হে আল্লাহর রাসূল, আমি তাদের বিরুদ্ধে কোন - উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করব?

- উত্তর ছিল স্পষ্ট। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। শান্তভাবে অগ্রসর হোন যতক্ষণ না তাদের দুর্গের কাছে পৌঁছান। তারপর তাদের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিন। তারা যদি গ্রহণ করে তবে তাদের কর্তব্যগুলো জানিয়ে দিন। আল্লাহর কসম!

আপনার মাধ্যমে যদি একজন মানুষও আল্লাহর পথে আসে তবে তা আপনার জন্য লাল উটের পাল পাওয়ার চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের চেয়েও উত্তম। এই কথাগুলো আরও স্পষ্ট করলো ইসলামী বিজয়গুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের চিরন্তন জীবনকে রক্ষা করা। আলী মুজাহিদদের সামনে বীরের মতো অগ্রসর হতে শুরু করলেন। তিনি যখন নাতাত দুর্গের প্রাচীরে পৌঁছালেন তখন মাটিতে পতাকাটি গেঁথে দিলেন। তিনি তাদের সামনে ইসলামের কথা বললেন এবং মুসলিম হতে আহ্বান - জানালেন। - হে আহলে কিতাব, ইসলামের দ্বীনে প্রবেশ করুন। - তাহলে আপনি রক্ষা পাবেন। - কিন্তু ইহুদিরা তা গ্রহণ করল না। তারা দুর্গ থেকে বেরিয়ে এল যুদ্ধ করতে। ঠিক সেই সময় একটি উচ্চ কণ্ঠধ্বনি শোনা গেল। আমি সেই ব্যক্তি যে গর্জনকারী সিংহকেও তরবারি ও বর্শা দিয়ে নামিয়ে আনি। সবাই কণ্ঠস্বরের দিকে ফিরে তাকাল। আর তারা যা দেখল তা ছিল এক ভয়ঙ্কর ভীতিপথ যোদ্ধা যে পড়েছিল দুই স্তরের বর্ম এবং হাতে ছিল দুটি তরবারি। সে ছিল মারহাব, যে খাইবারের ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী বলে পরিচিত ছিল। সে শুনেছিল তার ভাই নিহত হয়েছে। তাই সে তার সৈন্যদের নিয়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে এল। সে মুসলমানদের মনে ভয় ঢোকাতে চাইছিল এবং লড়াই করার জন্য কাউকে খুঁজছিল। তারপর আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল। আমি সেই জন যাকে তার মা হায়দার নাম দিয়েছেন। আমি অরণ্যের মহিমান্বিত সিংহদের মতো। আমি আপনাকে বাঁচতে দেব না। আমি আপনাকে পরাস্ত করবই। তিনি ছিলেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু। মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহক। দুজন মুখোমুখি হয়ে গেলেন। আলী যুদ্ধ করছিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরবারি দিয়ে। কিছুক্ষণ পর তিনি এমন এক প্রবল আঘাত হানলেন যা মারহাবের ঢাল ও তার বিস্তর বিশিষ্ট শিরস্ত্রাণ ভেঙে দিল। সেই একই আঘাত আরও গভীরে গিয়ে তাকে সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করল। ইহুদিরা যখন তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধার এই ভয়াবহ পরিণতি দেখল, তাদের হৃদয় ভয়ে ভেঙে পড়ল। ঘটনা প্রবাহের মূর্হুত ঠিক এখানেই বদলে যাবে। এই দৃশ্য দেখে আল্লাহর রাসূল মুজাহিদদের সুসংবাদ দিলেন। আনন্দিত হন। খাইবারের বিজয় এখন সহজ হয়ে গেছে। এরপর মুসলমানরা মহা সাহস নিয়ে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সাহাবীরা যুদ্ধ করতে করতে দুর্গের ফটক পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। ঠিক তখন এক ইহুদি সৈন্য আলীর ঢালে তরবারির আঘাত করল এবং তা তার হাত থেকে ছিটকে ফেলল। আলী চারপাশে তাকিয়ে দুর্গের দরজাটি দেখলেন। সেই দিনের সাক্ষীরা বলেন, আলী বিশাল সেই দরজাটি উপড়ে ফেলেছিলেন এবং সেটিকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাদের লোকদের একে একে পড়ে যেতে দেখে ইহুদিরা আর পেছনে না তাকিয়েই ভয়ে পালাতে শুরু করল। রাসূলুল্লাহর কথা সত্য হল। আল্লাহ মুসলমানদের বিজয় দান করলেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন এই ভয় দশ হাজার সদস্যের ইহুদি বাহিনীকে গ্রাস করল, তখনও তাদের শতজনও নিহত হয়নি। যেখানে সাহাবীরা শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল ছিলেন, সেখানে ইহুদিরা ভয়ে মৃত্যুর কাছ থেকে পালাতে চাইছিল। উভয় পক্ষই বিশ্বাস করত তাদের ধর্মই সত্য। কিন্তু ইহুদিরা এই দুনিয়ার জীবনের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত ছিল। কোরআনে আল্লাহ তার রাসূলের মাধ্যমে তাদের এভাবে সম্বোধন করেছেন। বলুন, যদি আল্লাহর কাছে পরকালের আবাস শুধু তোমাদের জন্যই নির্দিষ্ট হয়, অন্য সকল মানুষকে বাদ দিয়ে তবে মৃত্যু কামনা করো যদি তোমরা সত্যবাদী হও। কিন্তু তারা কখনোই তা কামনা করবে না, তাদের কৃতকর্মের কারণে। আর আল্লাহ জালিমদের সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত। আপনি অবশ্যই দেখবেন তারা জীবনের প্রতি অন্য যেকোনো মানুষের চেয়েও বেশি লালায়িত। এমনকি মুশরিকদের চেয়েও বেশি। তাদের প্রত্যেকেই কামনা করে হাজার বছর বেঁচে থাকতে। কিন্তু তারা এত দীর্ঘকাল বেঁচে থাকলেও তা তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবে না। আর তারা যা করে আল্লাহ তা সবই দেখেন। পালিয়ে যাওয়া শত্রু সৈন্যদের ধাওয়া করতে করতে আলী ও মুজাহিদরা নাতাত দুর্গে প্রবেশ করলেন। কিন্তু সেখানে তারা শিশুদের ছাড়া আর কাউকে পেলেন না। তারা তাদের স্পর্শও করলেন না। ইহুদি সৈন্যরা নাতাত পরিত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছিল। এরপর মুজাহিদরা নাঈম দুর্গের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং সেটিও জয় করলেন। এরপর সাদ ইবনে মুয়াজ দুর্গ আত্মসমর্পণ করল। দীর্ঘ অবরোধের সময় একে একে দুর্গগুলো পতন হতে দেখে ইহুদিদের সামনে শান্তি চাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় রইল না। আসলে যদিও এমন অনুরোধের জন্য তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল তবুও আল্লাহর রাসূল তা গ্রহণ করলেন। তাদের প্রাণরক্ষা করা হলো এবং তাদের পরিবার পরিজনসহ খাইবার ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো। আর প্রত্যেক পরিবার নিজেদের জিনিসপত্রের এক উটের বোঝা সঙ্গে নিতে পারত। তারা যখন চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে এলো একটি - প্রস্তাব নিয়ে। - হে আবুল কাশিম, আপনার লোকেরা এই ভূমির সঙ্গে পরিচিত নয়। আর আমরা জানি কিভাবে সর্বোত্তম ফসল ফলাতে হয়। আমাদের মধ্যে ফসল ভাগাভাগির - একটি চুক্তি করা যায় না?

- রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীরা খাইবারে স্থায়ীভাবে থাকতে পারতেন না। এছাড়া ওই জমির দেখভাল করা তাদের পক্ষে সম্ভবও ছিল না। এই কারণে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং ইহুদিদের খাইবারে থাকতে অনুমতি দিলেন প্রতিবছর ফসলের অর্ধেক ভাগ দেওয়ার শর্তে। তবে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন ইচ্ছা এই চুক্তি বাতিল করতে পারতেন। কারণ ভবিষ্যতে তারা কি করতে পারে তা নিশ্চিত ছিল না। এই শর্তটি রাখা হয়েছিল তাদেরকে অন্যায় কিছু করা থেকে বিরত রাখতে। প্রতিবছর ফসল কাটার সময় আল্লাহর রাসূল আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহকে খাইবারে পাঠাতেন। আব্দুল্লাহ ফসলকে সমান দুই ভাগে ভাগ করতেন। তারপর - ইহুদিদের পছন্দের অধিকার দিতেন এবং বলতেন। - আপনারা যে অর্ধেকটি চান সেটি নিন। - এই ন্যায় পরায়ণতা দেখে ইহুদিরা বলত। - এই ন্যায় বিচারই আসমান ও জমিনকে স্থির করে - রেখেছে। - তবুও তারা এই চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ত ছিল মাত্র বারো বছরের মতো। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সময় তারা গোলযোগ সৃষ্টি করল এবং চুক্তি ভঙ্গ করল। অতঃপর তাদের খাইবার থেকে বহিষ্কার করা হলো। খাইবার এখন বিজিত এবং চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে বিশ্রাম নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জয়নব নামের এক ইহুদি নারী একটি বিশ্বাসঘাতক পরিকল্পনা করল। সে আল্লাহর রাসূলকে বিষ প্রয়োগের চেষ্টা করবে। সে একটি ভেড়ার রসদ করে তার প্রতিটি অংশে শক্তিশালী বিষ মাখিয়ে দিল। তারপর সেটা নিয়ে এল। সাহাবীরা সবাই একসঙ্গে বসে খেতে শুরু করলেন। আল্লাহর রাসূল ভেড়ার কাঁধের অংশ থেকে এক টুকরো নিলেন। বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম বললেন এবং মুখে দিলেন। কিন্তু স্বাদ লাগা মাত্রই তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা বের করে বললেন, "তোমরা হাত সরিয়ে নাও। এই গোশত আমাকে জানিয়েছে এতে বিষ রয়েছে। " সাহাবীরা দ্রুত খাবার থেকে নিজেদের হাত সরিয়ে নিলেন। কিন্তু তাদের একজন ইতিমধ্যেই গোশতের একটি টুকরো গিলে ফেলেছিলেন। বিশর ইবনে বারা বেগুনি বর্ণ ধারণ করলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন। যে নারী এ কাজ করেছিল সেই জয়নব ধরা পড়ল এবং তাকে নবীজীর সামনে আনা হল। রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, সে কেন এমন - করেছে?

সে জবাব দিল - "আমি মনে মনে বলেছিলাম, যদি তিনি সত্যিই নবী হন তবে আল্লাহ তাকে জানিয়ে দেবেন। আর যদি তিনি নবী না হন তবে এই বিষ তাকে হত্যা - করবে। আর আমরা তার থেকে রেহাই পাব। " - রাসূলুল্লাহ সব সময়ই ব্যক্তিগতভাবে তার প্রতি করা অন্যায় ক্ষমা করে দিতেন। এক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি ওই নারীকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। আরেক বর্ণনা অনুযায়ী, তাকে হত্যা করা হয়েছিল। আলেমগণ ঘটনাটি এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। রাসূলুল্লাহ তাকে ক্ষমা করেছিলেন তার নিজের প্রতি করা অপরাধের জন্য। কিন্তু যেহেতু বিশর শহীদ হয়েছিলেন, তিনি সিদ্ধান্তটি তার পরিবারের উপর ছেড়ে দিলেন। আর তারা কিসাসের অধিকার প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সেই নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তখনও খাইবারই ছিলেন। তখন এমন একটি ঘটনা ঘটল যা তাকে অপরিসীম আনন্দ দিল। জাফর ইবনে আবি তালিবের নেতৃত্বে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলমানরা এসে পৌঁছালেন। আপনার যদি মনে থাকে, আল্লাহর রাসূল নাজাশীকে বলেছিলেন তাদের ফেরত পাঠাতে। আল্লাহর রাসূল এতটাই আনন্দিত হলেন যে তিনি বললেন, "এই দুই বিষয়ের কোনটিতে আমি বেশি আনন্দিত হব তা আমি বুঝতেই পারছি না। খাইবারের বিজয় নাকি জাফরের আগমনে?

" - আপনার সঙ্গে লেনদেন করতে পেরে আমি আনন্দিত। - খাইবার বিজয়ের ফলে মদিনা ভরে গেল প্রাচুর্য - ও বরকতে। - আপনার সঙ্গে লেনদেন করতে পেরে আমি আনন্দিত। কিন্তু মক্কায় অবস্থা ছিল একেবারে উল্টো। এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল এবং - প্রতিদিন তারা আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছিল। - আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। এরা ছিল সেই লোকেরা যারা বছরের পর বছর সাহাবীদের নির্যাতন করেছিল, তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল এবং তাদের এমন অনাহারে রেখেছিল যে তারা পেটে পাথর বেঁধে রাখতে বাধ্য হয়েছিল। আর এখন তারা নিজেরাই পড়েছিল এই অসহায় অবস্থায়। কোরআনে আল্লাহ তার রাসূলকে বলেছিলেন, "আর আমি আপনাকে সমস্ত জগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি। " রাসূলুল্লাহর হৃদয় এতটাই করুণায় পূর্ণ ছিল যে, তিনি সহ্য করতে পারলেন না তার আত্মীয় কুরাইশদের এই অবস্থা। তাই তিনি মক্কায় পাঠালেন প্রচুর খাদ্য ও রসদ। তিনি তার শত্রুদের প্রতিও দয়া প্রদর্শন করেছিলেন। যদিও কিছু মুশরিক এই সাহায্য গ্রহণ করতে চায়নি। আবু সুফিয়ান এই রসদগুলো নিলেন এবং সেগুলো গরিবদের মধ্যে - বন্টন করলেন। তিনি বললেন - "আমার ভাতিজা এটি পাঠিয়েছে। আল্লাহ তাকে - উত্তম প্রতিদান দিন। " - উপহারের মধ্যে আবু সুফিয়ানের জন্য মদিনার খেজুরও ছিল। নবীজীর পক্ষ থেকে আত্মীয়দের প্রতি এই সহায়তা তাদের অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করে দিয়েছিল। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বীজ অঙ্কুরিত হবে এবং শিকড় গেড়ে বসবে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর এক বছর কেটে গিয়েছিল। আর বহু প্রতীক্ষিত দিনটি অবশেষে এসে পৌঁছাল। এবার ছিল উমরাতুল কাযা আদায়ের সময়। আপনার যদি মনে থাকে, সাহাবীদের মক্কায় প্রবেশ না করেই ফিরে আসতে হয়েছিল কাবা শরীফটিও না দেখে। যে উমরাহ তারা সেদিন আদায় করতে পারেননি, এবার তাই সম্পন্ন হবে। দীর্ঘ সাত বছর পর তারা অবশেষে আবার মিলিত হবেন নিজেদের মাতৃভূমির সঙ্গে এবং কাবা তাওয়াফ করবেন। আল্লাহর রাসূল তার সাহাবীদের উমরাহের জন্য প্রস্তুতি নিতে বললেন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে রাসূলুল্লাহ দুই হাজার সাহাবী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন এবং সঙ্গে ছিল সত্তরটি কোরবানির উট। রাসূলুল্লাহ যখন জুল হুলাইফাই পৌঁছালেন, যা মদিনা থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে, তিনি ইহরামে প্রবেশ করলেন। এরপর সাহাবীরাও তা অনুসরণ করলেন। আর সবাই তখন সাদা পোশাকে সজ্জিত ছিলেন। এবং এক উচ্চ সমবেত কন্ঠে তারা সবাই তালবিয়া পাঠ শুরু করলেন। - লা শারিকা লাক। - লব্বাইক আল্লাহুম্মা লব্বাইক, লব্বাইক আল্লাহুম্মা লব্বাইক, লব্বাইকা লা শারিকা লাকা লব্বাইক। কুরাইশের নেতারা মক্কা ছেড়ে পাহাড়ে উঠে গিয়েছিল যাতে তারা না দেখতে পায় নবীজি ও সাহাবীদের এই আনন্দময় দৃশ্য। তারা কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না কাবাকে ইসলামের কেন্দ্র রূপে দেখতে। আল্লাহর রাসূল তার উট কাসওয়ার পিঠে মক্কায় প্রবেশ করলেন। আর সাহাবীরা ছিলেন তার অনুসরণে। কিছু মুশরিক পুরুষ, নারী ও শিশুদের নিয়ে দারুন নাদওয়া থেকে তাদের দৃশ্য দেখছিল। আল্লাহর রাসূল যখন কাবার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেন, তিনি তার ডান কাঁধ উন্মুক্ত করলেন। এরপর তিনি সাহাবীদের বললেন, "আল্লাহ দয়া করুন সেই ব্যক্তির প্রতি যে আজ এই মুশরিকদের সামনে তাদের শক্তি ও উদ্যম প্রকাশ করবে। " মুশরিকরা আড়াল থেকে সাহাবীদের দেখছিল এবং তাদের দৃঢ় ও শক্তিশালী ভঙ্গিমা দেখে বিস্মিত হচ্ছিল। কারণ গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে মুসলমানরা মদিনায় গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। আর এভাবেই রাসূলুল্লাহ তাদের জবাব দিলেন। উমরাহর সব আনুষ্ঠানিকতা পূর্ণ হল। এরপর আল্লাহর রাসূল মাথা মুন্ডন করালেন এবং ইহরাম থেকে বেরিয়ে এলেন। আর সাহাবীরাও একই কাজ করলেন। এইভাবে যে স্বপ্নটি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছিলেন ঠিক এক বছর আগে, তা সত্যে পরিণত হল। এই উমরাহ সফরের জন্য নবীজির জন্য একটি তাবু স্থাপন করা হয়েছিল। আর সাহাবীরা তিন দিন তার চারপাশের তাবুগুলোতে অবস্থান করলেন। নামাজের সময় তারা কাবার কাছে একত্র হতেন এবং জামাতে সালাত আদায় করতেন। এই সময়ে তারা নিজেদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং ইসলামের কথা বলতেন। নিজেদের কথা ও আচরণের মাধ্যমে তারা নিজেদের চরিত্র ও আমলের মাধ্যমে সবার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছিলেন। এই তিন দিন ধরে তারা মক্কাকে ভেতর থেকে জয় করার চেষ্টা করছিলেন। কুরাইশদের বহু মানুষের অন্তরে তাদের পুরনো বন্ধুদের প্রতি ঘৃণা, রাগ এবং পক্ষপাত ধীরে ধীরে দূর হতে শুরু করেছিল। সবাই মনে মনে আকাঙ্ক্ষা করছিল কোনো পুরনো বন্ধুর সঙ্গে উষ্ণ একটি আলাপের। বস্তুত তরবারিগুলো খাপে ঢুকে পড়েছিল। আর বেরিয়ে এসেছিল কোরআনের আত্মিক তরবারি। শান্তি শুরু হওয়ার পর থেকে জিহাদ পরিচালনা করছিল সেই তরবারিটি। আর তা যেন কার্যকর হচ্ছিল। আবারও কুরাইশ তাদের বিশ্বাসের সবকিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করল এবং ইসলামের প্রতি তাদের একগুঁয়েমিও নড়বড়ে হয়ে গেল। স্মরণীয় তিনটি দিন কেটে গেল এবং এবার বিদায় নেওয়ার পালা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)ের নির্দেশে সকলেই ফিরতি সফরের প্রস্তুতি নিলেন। নিজ নিজ জিনিসপত্র গুছিয়ে মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সেই বিদায় কতটা বেদনাদায়ক ছিল তা কল্পনা করাও ছিল সত্যিই কঠিন। তবে বিচ্ছেদের কষ্ট শুধু তাদেরই ছিল না। আবু বাসির ইশ উপত্যকায় বাসা গেড়েছিলেন এক বা দুই বছর আগে। এই সময়ে তার দল মক্কাবাসীদের যে ক্ষতি করেছিল তা মুশরিকদের পুরোপুরি ক্লান্ত করে তুলেছিল। তারা বুঝতে পারল এভাবে তারা মুসলমানদের থামাতে পারবে না। আর তাছাড়া মদিনা থেকে একজনও মক্কায় ফিরে যায়নি এই বলে যে, আমি ইসলাম ছেড়ে দিয়েছি। অতএব এই শর্তে তাদের কোন লাভই হয়নি। সেই সময় তারা নিজেদের ব্যাপারে খুবই আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু যেমন সবারই একটি পরিকল্পনা থাকে, আল্লাহরও নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল। কুরাইশরা বুঝতে পারছিল না এখন তারা কী করবে। তাই তারা একটি চিঠিসহ এক দূত পাঠালো - আল্লাহর রাসূলের কাছে। সেখানে লেখা ছিল- - "আল্লাহর দোহাই এবং আমাদের আত্মীয়তা সম্পর্কের খাতিরে অনুগ্রহ করে আবু বাসির ও তার সঙ্গীদের কাছে সংবাদ পাঠান যে, এখন থেকে যারা আপনাদের কাছে মদিনায় আসবে সে নিরাপদ থাকবে। তাকে আর ফেরত পাঠানো হবে না। " রাসূলুল্লাহ এই অনুরোধ গ্রহণ করলেন এবং আবু বাসিরকে একটি চিঠি পাঠালেন। তাকে ও তার সঙ্গীদের মদিনায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে। কিন্তু সেই সময় আবু বাসির মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন। নবীজির চিঠি যখন তার কাছে পৌঁছালো, তিনি তখন শেষ নিঃশ্বাস গুনছিলেন। তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। কাঁপা হাতে তিনি চিঠিটি নিলেন এবং তা নিজের মুখমণ্ডল ও চোখের সঙ্গে স্পর্শ করালেন। তিনি গভীর আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ ছিলেন আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। কিন্তু চিঠিটি পুরো পড়া শেষ করার আগেই তিনি ইন্তেকাল করলেন। রাসূলুল্লাহর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ আর হলো না। সযত্নে তোলা রইল জান্নাত পর্যন্ত। তিনি মক্কা থেকে পালিয়েছিলেন শুধু নিজের দ্বীন পালনের জন্য। তিনি এই দুনিয়ায় নিজের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং রওনা হয়েছিলেন নিজের প্রকৃত ঘরের দিকে, আখিরাতের দিকে। আবু জান্দাল ও অন্যান্য মুসলমানরা তার জানাজার নামাজ পড়লেন এবং তাকে দাফন করলেন। এরপর তারা সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করলেন যাতে তার কবর বিস্মৃত না হয়। এরপর আবু জান্দাল ও তার সঙ্গীরা মদিনায় নবীজির কাছে চলে এলেন। হুদাইবিয়া সন্ধি সম্পর্কে আয়াতে কী বলা হয়েছিল?

এক সুস্পষ্ট বিজয় এবং তা সত্যিই তাই ছিল। কিন্তু এটি তো ছিল কেবল শুরু। কুরাইশরা একজন একজন করে তাদের লোকবল হারাতে থাকবে। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষগুলো, যারা ছিল তাদের চিন্তারও বাইরে, ইসলামের কাতারে যোগ দেবে। হুদাইবিয়া ছিল এক মহাবিজয়ের চাবিকাঠি। আর সেই নামগুলোই হয়ে উঠবে পরবর্তী অসংখ্য বিজয়ের চাবি। এবং অবশেষে সেই বরকতময় দিন ঘনিয়ে এলো। মক্কা মুক্ত হবে। বছরের পর বছর আকাঙ্ক্ষার অবসান ঘটবে। আর মক্কার মুসলমানরা নিজেদের ঘরে ফিরে যাবে। আপনি কি প্রস্তুত ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজয় প্রত্যক্ষ করতে? অসংখ্য আবেগময় দৃশ্য নিয়ে মক্কা বিজয় আমাদের অপেক্ষায় আছে পরবর্তী পর্বে। সঙ্গেই থাকুন। [প্রচণ্ড চিৎকার] আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার।
