# নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবনী - প্রথম এআই-ভিজ্যুয়ালাইজড সীরাহ সিরিজ! - ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ) | পর্ব ১

- Language: bn
- Published: 2026-08-26
- Canonical: https://blog.towardseternity.com/bn/blog/life-of-prophet-muhammad-the-worlds-first-ai-visualized-sirah-series-o-messenger-ep-1
- Source video: https://www.youtube.com/watch?v=DW-00ckCAPI
- Channel: Towards Eternity

This is the cleaned transcript of the source video. The speech is unaltered.

---

চলুন ফিরে যাই, মানব ইতিহাসের সেই যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে। প্রায় ১৪০০ বছর আগের সেই আরব উপদ্বীপে। ১১ পর্বের এই সিরিজে আমরা এমনভাবে প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জীবন অন্বেষণ করব, যা আপনি আগে হয়তোবা কখনো শোনেননি। কখনো কখনো আমরা নিজেদের খুঁজে পাব সেই ওহী নাযিলের শুরুর দিনগুলোতে। দারুল আরকামে (আরকামের ঘর) মুসলিমদের সেই গোপন মজলিসগুলোতে। দারুল আরকামে (আরকামের ঘর) মুসলিমদের সেই গোপন মজলিসগুলোতে আবার কখনোবা আমরা শিহরিত হয়ে উঠবো যখন দেখবো উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে মক্কার মূর্তিপূজারিদের দিকে নির্ভীকভাবে হেঁটে যেতে। "যে মুহাম্মদ-কে হত্যা করবে, আমি তাকে একশোটা লাল ও কালো উট পুরস্কার দেব।" "আর যারা মুহাম্মদ-এর আনুগত্য করবে, তাদের এই পরিণতিই ঘটবে।" "এটাকে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করো।" এমন মুহূর্ত আসবে যখন আমরা ভীষণভাবে ব্যাথিত হবো আর আমাদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যাবে। কখনো আমরা আতঙ্কিত বোধ করব, আবার কখনো আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়বো। কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমাদের অন্তর প্রশান্তিতে ভরে থাকবে। নবী (সা.)-এর গল্প থেকেই, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পথ খুঁজে নিতে হয়, ভীষণ হতাশাগ্রস্থ পরিস্থিতিতেও, আমরা শিখব কীভাবে আমাদের নিজেদের জীবনের বন্ধ দুয়ারগুলো অতিক্রম করতে হয়। আমরা শুধু ঘটনাগুলো দেখে সামনে এগিয়ে যাব না। বরং আমরা এগুলোর পেছনের গভীর তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করব। এই যাত্রা আপনাকে সম্পূর্ণ নতুন এক পথে নিয়ে যাবে এবং আপনি নিজেকে নতুন করে চিনতে পারবেন। এটি আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দার জীবনের গল্প। একজন মানুষ যিনি তাঁর উম্মতের জন্য সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, যিনি মুনাফিকদের দ্বারা বারবার বিশ্বাসঘাতকতা ও অপবাদের শিকার হয়েছেন। এমন সময় পার করেছেন যখন তিনি মাসের পর মাস অভুক্ত থেকেছেন, আবার এমনও সময় গেছে যখন প্রিয়জনদের হারিয়ে নিজ হাতে তাদের দাফন করেছেন। তিনি সর্বদা মানুষকে আলোর দিকে, হেদায়েতের দিকে ডেকেছেন, অথচ বিনিময়ে তাঁকে পাথর ছুড়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। " নিজের পরিবারের জন্য এত অমঙ্গল এবং অনিষ্ট বয়ে আনতে আমি তোমার মতো এমন আর কাউকে দেখিনি।" তিনি অসংখ্যবার হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও নিজের লক্ষ্য বিচ্যুত হননি। এবং পরিশেষে, আল্লাহ তাঁর অনুগত বান্দার প্রতি দেওয়া ওয়াদা পূরণ করেছেন। আমরা এখন ২৩ বছরের এক অভূতপূর্ব জীবনের বাস্তব গল্প শুরু করছি। আমরা সাক্ষী হব এক অসাধারণ মানুষের জীবনের, যিনি একাকী এই দাওয়াত শুরু করেছিলেন, সারা বিশ্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, অথচ, আজ ২০০ কোটিরও বেশি অনুসারী তাঁর পেছনে রয়েছে। আপনি যদি প্রস্তুত থাকেন, তবে চলুন শুরু করি। সাল্লি আলা মুহাম্মদ (মুহাম্মদ সা.-এর ওপর দরূদ পাঠ করুন)। এই ভিডিও সিরিজটি নির্ভরযোগ্য ইসলামিক উৎসগুলো থেকে নেওয়া শত শত রেফারেন্সের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। পুরোটা এআই (AI) ভিজ্যুয়াল যোগ্য ইসলামিক স্কলারদের পরামর্শ নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, এবং সম্পূর্ণটাই ইসলামিক নীতিমালার আলোকেই তৈরি করা হয়েছে। সেই রাত, যখন মক্কার তপ্ত পরিবেশ শীতল হয়ে এসেছিল। দিনটি ছিল সোমবার, ৫৭১ খ্রিস্টাব্দ। মক্কার সেই শান্ত অলিগলিগুলো মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছে। আবদুল মুত্তালিব দীর্ঘদিন ধরে এই মুহূর্তটির প্রতীক্ষায় ছিলেন। অবশেষে, তিনি সেই আনন্দ সংবাদ পেলেন। আমিনা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। উত্তেজনায় তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিল। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করার পর থেকে, তাঁর পুত্রবধূ আমিনার গর্ভের সেই সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও যত্ন আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। সেই রাতের কথা কল্পনা করুন। আবদুল মুত্তালিব দ্রুত বাড়ি ফিরে এলেন, মমতার সাথে নবজাতক নাতিকে কোলে তুলে নিলেন, এবং কাবার দিকে হেঁটে গেলেন। তিনি তাঁর রবের শুকরিয়া আদায় করলেন, দোয়া করলেন এবং শিশুটির নাম রাখলেন 'মুহাম্মদ'। "আপনি কেন এই নাম পছন্দ করলেন?" "কারণ আমি চাই আল্লাহ তা’য়ালা এবং মানুষ সকলেই তাঁর প্রশংসা করুক।" এই নামটি আমিনা স্বপ্নে জেনেছিলেন। যখন তিনি আবদুল মুত্তালিবের সাথে এটি শেয়ার করলেন, তখন থেকেই তিনি এই নামটাই রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। স্বামী আবদুল্লাহর রেখে যাওয়া আমানতকে নিরাপদে জন্ম দিতে পেরে আমিনা অন্তরে গভীর শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করছিলেন। তৎকালীন মক্কায়, নবজাতক শিশুদের ধাত্রীদের কাছে পাঠানোর একটি সাধারণ প্রথা ছিল। সেই মহিলারা শিশুদের দুধপান করাতেন এবং তাদের দেখাশোনা করতেন। যাতে শিশুরা কিছু সময়ের জন্য মক্কার প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে দূরে থাকতে পারে। অবশ্যই, একজন মায়ের জন্য তাঁর নবজাতক সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াটা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। কিন্তু এর পেছনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। প্রথম কারণটি ছিল শিশুর স্বাস্থ্য। যেমনটা আমরা বলেছিলাম, মক্কার জলবায়ু নবজাতকদের জন্য খুব একটা অনুকূল ছিল না। আর দ্বিতীয় কারণটি ছিল শিশুর ভাষা ও বাকপটুতা তৈরি করতে সাহায্য করা। সেই সময়ে, বাগপটুতা এবং কার্যকরি যোগাযোগ দক্ষতা ছিল আরব সমাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু। শিশুদের বনু সাদ গোত্রের এলাকায় পাঠানো হতো, যেখানে তারা মরুভূমি ও উন্মুক্ত প্রান্তরে স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠতে পারত এবং আরবী ভাষার বিশুদ্ধতম ও সুন্দরতম রূপটি দেখতে দেখতে শিখতে পারত। সেই অঞ্চলের ধাত্রীরা সাধারণত সম্পদশালী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিশুদের খুঁজতেন। কারণ এই সম্পর্কের মাধ্যমে, তাঁরা শিশুর পরিবারের সাথে একটি আত্মিক বন্ধন তৈরি করতেন, আর যতক্ষণ বাবা জীবিত থাকতেন, ততক্ষণ ধাত্রীরা তাঁদের কাছ থেকে সম্মান এবং আর্থিক সহায়তা পেতেন। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-ও ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন মক্কার একজন রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু তিনি ছিলেন বৃদ্ধ। আর নবীজির পিতা তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। আর যেহেতু তিনি একজন এতিম ছিলেন, তাই ধাত্রীদের কেউই আমিনার সন্তানকে গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছিল না। এখন তাহলে কী হবে?

কেউ কি তাঁকে নিয়ে যাবে না? তাঁকে কি এই রুক্ষ আবহাওয়ার শহরেই বড় হতে হবে?

আমিনা অসহায়ভাবে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলেন কীভাবে ধাত্রীরা এক এক করে শিশুদের নিয়ে মক্কা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে, হালিমা ও হারিস নামক এক দম্পতি অন্যদের তুলনায় বেশ দেরিতে এসে পৌঁছালেন। কারণ তাঁদের সওয়ারি পশুটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও বয়স্ক, তাই তাঁদের পালাক্রমে চড়তে হয়েছিল। ফলে তাঁরা সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি। হালিমা অনেক খোঁজাখুঁজি করলেন, কিন্তু মক্কায় এমন কাউকে পেলেন না যিনি তাঁর সন্তানকে লালন-পালনের জন্য দেবেন। এখানে আসার পথে পোহানো সব কষ্টের ওপর বাড়তি কষ্ট যোগ হলো এই যে, এখন তাঁকে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে যেতে হবে। তদুপরি তাঁদের অঞ্চলে তখন দুর্ভিক্ষ চলছিল। নিজেদের অন্নসংস্থান করাটাও তাঁদের জন্য খুব কঠিন হয়ে পড়েছিল। একের পর এক আসা এসব বিপদ তাঁকে ভীষণ মর্মাহত করে তুলল। যখন তিনি এসব দুশ্চিন্তায় মগ্ন ছিলেন, হঠাৎ তাঁর সাথে একজনের দেখা হয়ে গেল। তিনি ছিলেন আবদুল মুত্তালিব। কিছুক্ষণ কথা বলার পর, তিনি তাঁর নাতির (মুহাম্মদ সা.) পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারলেন। এরপর হালিমা তাঁর স্বামী হারিসের মতামত জানতে চাইলেন। "আমি দুধ পান করানোর জন্য কোনো শিশু খুঁজে পাইনি।" "আর আমি অন্যদের সামনে খালি হাতে বাড়ি ফিরে যেতে চাই না।" "তাঁকে (মুহাম্মদ সা.) সাথে নিয়ে যেতে আমার কোনো অসুবিধে নেই।" "হয়তো আল্লাহ তাঁর উসিলায় আমাদের উপর বরকত ও কল্যাণ বর্ষণ করবেন।" কত বড় নিয়ামতটি ঠিক তাঁর সামনে হাজির হয়েছিল, তা সম্পর্কে আসলে তিনি একেবারে কল্পনাও করতে পারেননি। কিন্তু হালিমা তখনো জানতেন না যে তিনি ঠিক কত বড় এক অমূল্য রত্ন খুঁজে পেয়েছেন। অন্যদিকে, আমিনা (রা.)-এর পরিস্থিতির কথা চিন্তা করুন। তিনি ইতিমধ্যে তাঁর প্রিয় স্বামীকে হারিয়েছেন। এমনকি একবারের জন্যও নিজের সন্তানকে তাঁর বাবার কোলে তুলে দিতে পারেননি। আর এখন, এই সবকিছুর ওপর তাঁকে তাঁর সন্তান থেকেও বিচ্ছিন্ন হতে হচ্ছে। কিন্তু তাঁর কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। চোখভরা জল নিয়ে, তিনি আবদুল্লাহর আমানত, তাঁর কলিজার টুকরা মুহাম্মদকে হালিমার হাতে তুলে দিলেন। তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য তাঁর পুত্রের কাছ থেকে দূরে থাকতে যাচ্ছেন। তিনি তাঁর গায়ের ঘ্রাণ নিতে পারবেন না কিংবা তাঁকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন না। সন্তানের প্রথম হাঁটা দেখার কিংবা তার মুখ থেকে বের হওয়া প্রথম কথা শোনার সৌভাগ্য তাঁর হবে না। একজন মায়ের জন্য তাঁর সন্তান থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে থাকাও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি এই দীর্ঘ বিচ্ছেদ মেনে নিলেন। তাঁর অন্তর ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে হালিমা ও তাঁর পরিবারের জন্য শুরু হতে যাচ্ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক জীবন। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনে, তাঁদের ঘর বরকত ও প্রাচুর্যে ভরে উঠল। এমন সব অলৌকিক ঘটনা ঘটতে শুরু করল যা কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না। তাঁদের সেই বৃদ্ধ ও দুর্বল সওয়ারি পশুটি হঠাৎ করেই শক্তিশালী ও দ্রুতগামী হয়ে উঠল। হালিমার স্তনে দুধ খুব সামান্য ছিল। কিন্তু যখন তিনি নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে দুধপান করাতে শুরু করলেন, তাঁর স্তন দুধে পরিপূর্ণ হয়ে উপচে পড়তে লাগল। হালিমার নিজের নবজাতক সন্তান আবদুল্লাহ আগে অস্থির থাকত আর খুদায় কাঁদত। কিন্তু যখন সে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে একত্রে দুধ পান করা শুরু করল, সেও শান্ত হয়ে গেল। এলাকায় দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টির কারণে তাঁদের যে পশুগুলো ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফিরে আসত, সেগুলো এখন পর্যাপ্ত খাবার খুঁজে পাচ্ছিল এবং প্রচুর দুধ দিচ্ছিল। তাঁদের ঘর বরকতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, অথচ আশেপাশের এলাকাগুলো তখনো দুর্ভিক্ষের কবলে ধুঁকছিল। এই সময়ে নবীজি (সা.) খুব চমৎকারভাবে বেড়ে উঠছিলেন; শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক--সব দিক থেকেই। অবশেষে, বরকতময় চারটি বছরের সমাপ্তি ঘটল। সেই সময়টি ঘনিয়ে এল। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় হলো। হালিমা তাঁর চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। তিনি তাঁকে ছেড়ে দিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বারবার চুমু খেলেন। কিন্তু তাঁর কাছে আর কোনো উপায় ছিল না। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর, আমিনা এবং তাঁর পুত্র অবশেষে আবার এক হলেন। এখন আমিনা যখনই তাঁর হাত ধরতে চাইতেন, মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পাশেই থাকতেন। তাঁরা একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, যেন তাঁরা আলাদা থাকা প্রতিটি দিনের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা আর কখনো বিচ্ছেদ চাননি। এই পুনর্মিলন সেই দীর্ঘ ও কঠিন বছরগুলোর কষ্ট লাঘব করতে সাহায্য করল। একত্রে দেড় বছর কাটানোর পর, তাঁরা মদিনায় গেলেন আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করতে এবং তাঁর পিতার কবর জিয়ারত করতে। যখন তাঁরা কবরের কাছে পৌঁছালেন, আমিনার চোখে গভীর শোক ফুটে উঠল। তাঁর মন ও প্রাণ স্বামীর সাথে কাটানো সেই দিনগুলোর স্মৃতি আর ব্যাকুলতায় ভরে উঠল। যেন তিনি এইমাত্র তাঁকে হারিয়েছেন--এমন এক বেদনা নিয়ে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন এতিম হয়ে। বাবার ছায়া ছাড়াই তিনি এই পৃথিবীতে চোখ মেলেছিলেন। বাবার ভালোবাসা ও যত্নের সেই উষ্ণতা তিনি কখনো অনুভব করতে পারেননি। নিজের ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে তিনি সবসময় তাঁর বাবার হাত ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই হাত কখনো ছিল না। আর সেই মুহূর্তে, তিনি আবারও তাঁর পিতার অভাব গভীরভাবে অনুভব করলেন। একই সাথে, তাঁর মায়ের এমন বুকফাটা আর্তনাদ তিনি সইতে পারছিলেন না। আর তাই, মা ও ছেলে দুজনেই একত্রে কাঁদতে লাগলেন। অন্তত তাঁর মা তো তাঁর পাশে ছিলেন। সেইটুকুই ছিল তাঁর সান্ত্বনা। কিন্তু আমিনার জন্যও এই পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছিল। শীঘ্রই তিনি তাঁর স্বামীর সাথে মিলিত হতে যাচ্ছেন। পুত্রের সাথে তাঁর এই পুনর্মিলন খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না। মক্কায় ফেরার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বয়স ছিল তখন মাত্র ছয় বছর। যখন তাঁরা 'আবওয়া' নামক স্থানে পৌঁছালেন, তাঁর অসুস্থতা আরও বেড়ে গেল। তিনি প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। কিন্তু দুটি বিষয় তাঁকে আরও বেশি পীড়া দিচ্ছিল। এক - তাঁর সন্তানকে একাকী ফেলে যাওয়ার চিন্তা, আর দুই - এটা জানা যে এত অল্প বয়সে মুহাম্মদকে এখন বাবা ও মা--উভয়কে ছাড়াই জীবন অতিবাহিত করতে হবে। জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো যখন ঘনিয়ে এল, তিনি তাঁর পুত্রের দিকে তাকালেন। তাঁর চেহারার সেই করুণ চাহনি যেন শব্দের চেয়েও বেশি কিছু বলছিল। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের ঠিক আগে, তিনি তাঁর পুত্রের উদ্দেশ্যে এই কথাগুলো বললেন। প্রত্যেক জীবকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। প্রতিটি নতুন জিনিসই একসময় পুরনো হয়ে যায়। আর যাদের বয়স বাড়ছে, তারা একসময় অবশ্যই মৃত্যুবরণ করবে। এই পৃথিবীর সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী এবং একসময় শেষ হয়ে যাবে। হ্যাঁ, আমিও মারা যাব। কিন্তু আমার নাম চিরকাল স্মরণ করা হবে। কারণ আমি এক পবিত্র ও পুণ্যবান সন্তান জন্ম দিয়েছি, এমন একজন, যে আমাকে সুনামের সাথে স্মরণ করবে। কয়েক মুহূর্ত পরেই তাঁর কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেল এবং তাঁর শরীর নিথর হয়ে পড়ল। সেখানে কেবল নবীজি (সা.)-এর কান্নার শব্দ অবশিষ্ট রইল। এক অবর্ণনীয় ব্যথায় তাঁর কোমল হৃদয়টি পুড়ে যাচ্ছিল। যে সফরটি শুরু হয়েছিল বাবার কবর জিয়ারত করার জন্য, তা শেষ হলো মাকে দাফন করার মধ্য দিয়ে। পিতা হারানোর পর এখন মাতাকেও হারানো। কে জানে কত বছর ধরে মায়ের সেই শেষ কথাগুলো তাঁর কানে প্রতিধ্বনিত হবে। অন্য বাচ্চারা যখনই "মা" বলে ডাকত, তখনই ব্যথায় তাঁর চোখ মাটির দিকে নুয়ে আসত। তাঁর অশ্রুসিক্ত চোখে, তিনি সবসময় তাঁর প্রিয়তম মানুষের শেষ মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করতেন। সেই কঠিন সময়ে তাঁর দেখাশোনা করার জন্য উম্মে আয়মান তাঁর পাশে ছিলেন। তিনি ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)-এর মনকে শান্ত করার এবং তাঁর চোখের পানি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। সেদিন থেকে উম্মে আয়মান সবসময় তাঁকে ভালোবাসা ও যত্ন দেওয়ার জন্য পাশে ছিলেন, এবং মায়ের অভাব পূরণ করতে তিনি সাধ্যমতো সবকিছুই করেছিলেন। তিনি তাঁর সাথে ছিলেন এবং ২৫ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া পর্যন্ত তাঁর সেবা করেছেন। এমনকি ইসলাম প্রচার শুরু হওয়ার পর, তিনি এই দ্বীনের জন্য বড় ধরনের আত্মত্যাগ করতে দ্বিধা করেননি। নবীজি (সা.)-এর জীবনে তাঁর স্থান ছিল অত্যন্ত বিশেষ, এবং তিনি তাঁকে মায়ের মতোই স্নেহ করতেন, যে কারণে নবীজি (সা.) পরবর্তীতে তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন: "তিনি আমার মায়ের পর আমার দ্বিতীয় মা।" যখন তাঁরা মক্কায় ফিরে এলেন, তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে নিজের তত্ত্বাবধানে নিলেন। তিনি তাঁকে সবসময় নিজের কাছে রাখতেন। এমনকি তাঁর নাতি সাথে না থাকলে তিনি খেতেও বসতেন না। যেহেতু আবদুল মুত্তালিব ছিলেন তাঁর গোত্রের নেতা, তাই কাবার সামনে তাঁর বসার জন্য একটি গদি বা বিশেষ আসন রাখা হতো। এমনকি তাঁর নিজের ছেলেদেরও সেখানে বসার অনুমতি ছিল না। কিন্তু তাঁর ছয় বছর বয়সী নাতি মুহাম্মদ (সা.) সেখানে বসতেন। তিনি তাঁর নাতি ছাড়া আর কাউকে সেখানে বসতে দিতেন না। অন্যরা যখনই তাঁকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করত, তিনি বলতেন: আমার ছেলেকে বিরক্ত করো না। আল্লাহর কসম, একদিন তাঁর অনেক সম্মান এবং সুখ্যাতি হবে। খুব অল্প বয়সেই তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন কীভাবে তাঁর দাদা মক্কা শাসন করছেন। সেখানে দেখা বিষয়গুলো তাঁকে একজন ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে গড়ে তুলছিল। মাঝে মাঝে আবদুল মুত্তালিব তাঁকে বিশেষ কিছু দায়িত্ব এবং কাজও দিতেন। দাদার প্রতি নাতির ছিল গভীর শ্রদ্ধা, আর নাতির প্রতি দাদার ছিল অসীম মমতা। তাঁরা একে অপরের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। যাহোক, এই আত্মিক বন্ধনও খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র দুই বছর পরেই তিনি তাঁর দাদাকেও হারালেন। তিনি যার সাথেই মায়ার বাঁধনে জড়াচ্ছিলেন, আল্লাহ যেন একে একে তাঁদের সবাইকে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। যেন তাঁকে এই বার্তাই দেওয়া হচ্ছিল: "আমিই তোমার একমাত্র আশ্রয়।" সারা জীবন ধরে তিনি তাঁর অনেক প্রিয় সঙ্গীকেও হারাতে যাচ্ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই তিনি তাঁর সাত সন্তানের মধ্যে ছয়জনকেই হারাবেন। এই সিরিজের প্রতিটি পর্বে যেমনটি আপনি দেখবেন, তিনি অন্তহীন প্রতিকূলতা ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করবেন। আর যেহেতু তিনি নিজে সব ধরনের বেদনা ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, তাই তিনি তাঁর উম্মতের প্রতিটি সমস্যা ও কষ্ট গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। এভাবেই তিনি আমাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা এবং পথপ্রদর্শক হয়ে উঠবেন। তিনি যদি একটি সহজ জীবনযাপন করতেন এবং আল্লাহ যদি তাঁকে কোনো কষ্ট বা পরীক্ষা না দিতেন, তবে তিনি কীভাবে সমগ্র মানবতার জন্য আদর্শ হতে পারতেন?

শৈশবে তাঁর চারপাশের মানুষের কাছ থেকে তিনি যে মমতা ও ভালোবাসা পেয়েছিলেন, তা ছিল বিভিন্ন আয়নায় সূর্যের প্রতিফলনের মতো। কিন্তু সেই মমতার প্রকৃত মালিক আল্লাহ সেই আয়নাগুলো একে একে সরিয়ে নিচ্ছিলেন। অন্য কথায়, তিনি তাঁর প্রিয়জনদের একে একে কেড়ে নিচ্ছিলেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে সমস্ত ভালোবাসার প্রকৃত উৎসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন, এবং শেখাচ্ছিলেন যে প্রতিটি নেয়ামত কেবল তাঁর পক্ষ থেকেই আসে। কেবল তিনিই প্রকৃত চিরস্থায়ী; আর তিনি চাইলে মানুষকেও অমরত্ব দান করতে পারেন। তিনি যদি চান, তবে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া সেই প্রিয়জনরা আবারো এক চিরন্তন জগতে, জান্নাতে মিলিত হতে পারে। এভাবেই আল্লাহ তাঁর অন্তরে পরকালের বিশ্বাসের ভিত্তি স্থাপন করছিলেন, যা তিনি পরবর্তীতে ওহীর মাধ্যমে প্রকাশ করবেন। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এত অল্প বয়সে কিসের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন তা নিয়ে যখন আপনি চিন্তা করবেন, তখন আপনি আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য হবেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি আল্লাহ কর্তৃক সুনিপুণভাবে পরিকল্পিত ছিল। আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি কষ্ট ও পরীক্ষা তাঁকে আরও বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে উঠতে সাহায্য করেছিল। কারণ ভবিষ্যতে তাঁর ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্ব অর্পণ করা হবে। শৈশবে তিনি শহরের চার দেয়ালের মাঝে বেড়ে উঠেননি, বরং উন্মুক্ত মরুপ্রান্তরে বেড়ে উঠেছেন তিনি। এই কারণেই তাঁর মাঝে ছিল এক মুক্ত স্বাধীন চেতনা। তিনি শারীরিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন এবং তাঁর ভাষা জ্ঞান ছিল অত্যন্ত উন্নত। এমনকি পরবর্তীতে যে ঘরগুলোতে তিনি বেড়ে উঠেছেন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি অন্তত পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন পরিবারে থেকে বড় হয়েছেন। এই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে বিভিন্ন ধরণের মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকতে হয়। আর তিঁনি তাঁর দাদার সাথে থাকার সময়ে, প্রত্যক্ষ করেছিলেন কীভাবে একটি শহর শাসন করতে হয়। নিজের বাবা-মা না থাকলেও, তিনি বড় হয়েছিলেন তিনজন মা এবং তিনজন বাবা সমতুল্য অভিভাবকের কাছে, যাঁদের প্রত্যেকের ছিল অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব। নিজের মা ছাড়াও তাঁর ছিলেন ধাত্রী মা হালিমা, আর পিতার ভূমিকায় ছিলেন হালিমার স্বামী হারিস। তাঁকে এতটাই ভালোবাসা ও যত্ন দেওয়া হয়েছিল যে, পরবর্তী জীবনে...

আবার দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিলেন এক অসাধারণ বাবা। এবং সবশেষে, তাঁর চাচা আবু তালিব তাঁকে পিতৃসুলভ স্নেহে নিজের ছায়াতলে আগলে রাখতেন। আর চাচার স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আসাদ তাঁকে ঠিক নিজের সন্তানদের মতোই যত্ন ও উষ্ণতা দিয়ে আগলে রাখতেন, তাঁকে এতটাই ভালোবাসা ও যত্ন দেওয়া হয়েছিল যে, পরবর্তী জীবনে...

তিনি এই তিন নারীকেই "আমার মায়ের পর আমার দ্বিতীয় মা" হিসেবে উল্লেখ করতেন। 'টোয়ার্ডস ইটারনিটি'-র পক্ষ থেকে আমরা এআই (AI) ভিজ্যুয়ালাইজড এই আর এখন, আমরা অন্যান্য নবীগণ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের জীবনী নিয়ে নতুন সিরিজ তৈরি করতে চাই। যেহেতু আমরা একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, তাই আমরা কেবল আপনাদের সহযোগিতার মাধ্যমেই এই ভিডিওগুলো তৈরি করতে পারি। আপনারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন, এই সিরিজে কোনো বিজ্ঞাপন নেই। আপনি যদি এই মহৎ কাজের অংশীদার হতে চান, তবে 'টুওয়ার্ডস ইটারনিটি'-তে দান করুন এবং এই সুবর্ণ সুযোগটি হাতছাড়া করবেন না। তাঁর জীবনের কোনো কিছুই আকস্মিক বা কাকতালীয় ছিল না। ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর জীবনের প্রতিটি অংশ তাঁকে নবুওয়াতের সেই গুরুভার দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করছিল। কারণ তাঁর সামনের দিনগুলো ছিল অত্যন্ত প্রতিকূলতায় ভরা। ওহীর সেই গুরু দায়িত্বে পরিপূর্ণ। সেই বয়কটের বছরগুলো, যেখানে তাঁকে অনাহারে রাখা হয়েছিল যাতে তিনি তাঁর মিশন বা উদ্দেশ্য থেকে সরে আসেন। মক্কার কুরাইশদের সেই অমানবিক নির্যাতন। "আমি যদি তাঁকে তা করতে দেখি, তবে আমি তাঁর ঘাড় মাড়িয়ে দেব অথবা তাঁর মুখ ধুলোয় মিশিয়ে দেব।" (আবু জাহেলের উক্তি) মদিনার মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র। তায়েফের সেই পাষণ্ড জনতার আক্রমণ। এবং খন্দকের যুদ্ধের সেই দিনগুলো, যখন প্রায় পুরো আরব তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। বিরামহীন সেই সব যুদ্ধ যা তাঁকে লড়তে হয়েছিল। আর অসংখ্য মানুষ যারা তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। এসব কিছু সহ্য করার জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল এক মজবুত ভিত্তি এবং অটল মনোবল। আর এই কারণেই নবুওয়াতের আগের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় এত নিখুঁতভাবে সাজানো হয়েছিল। তাঁর বয়স এখন আট বছর। তিনি এখন এমন এক পরিবারে বসবাস করছেন যেখানে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ও যত্ন পেয়েছিলেন। তাঁর চাচা আবু তালিবের ঘর। তবে যদিও এটি তাঁর আপন চাচার বাড়ি ছিল, তবুও নিজের মা-বাবার কাছে থাকার অনুভূতি আর অন্য কোথাও থাকার অনুভূতিতো আর এক হয় না। আপনি আপনার মা-বাবার কাছে কোনো আবদার যতটা সহজে করতে পারেন, চাচা চাচীর কাছে ততটা সহজে করতে পারা যায় না। তাছাড়া, আপনার মনে এই ভয়ও থাকতে পারে যে চাচাতো ভাই-বোনেরা ঈর্ষান্বিত হতে পারে। এই সব চিন্তা আপনাকে অনেক কিছু করা থেকে বিরত রাখাটাই স্বাভাবিক। তারচেয়েও বড়ো কথা হলো, ওটি কোনো ধনী পরিবার ছিল না। অনেক সময় তাঁদের পেট না ভরেই খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে যেতে হতো। তাই অল্প বয়স থেকেই তিনি দারিদ্র্যের কষ্ট কেমন হয় তা অনুভব করেছিলেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, তাঁর চাচা এবং চাচী তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং নিজের সন্তানের মতোই পরম মমতায় লালন-পালন করেছিলেন। এমনকি মাঝে মাঝে নিজের সন্তানদের চেয়েও তাঁকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। আবু তালিব তাঁকে ছাড়া কোথাও যেতেন না। তিনি সবসময় তাঁকে সাথে রাখতেন, কখনোই চোখের আড়াল হতে দিতেন না। মাঝে মাঝে তিনি তাঁর সাথে বন্ধুর মতো গল্প করতেন। আর খাওয়ার টেবিলে তাঁকে না দেখলে তিনি ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করতেন-- "আমার মুহাম্মদ কোথায়?

যাও তাঁকে ডেকে আনো।" নবী মুহাম্মদ (সা.) অন্য সব শিশুর মতো ছিলেন না। গুরুজনদের আগে তিনি কখনো খাবার শুরু করতেন না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কৃতজ্ঞ এবং চিন্তাশীল। যখন তিনি দেখলেন তাঁর চাচা পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তিনি তখন কেবল বসে বসে তা দেখে থাকতে পারলেন না। অন্যান্য শিশুদের মতো দিন অতিবাহিত করার পরিবর্তে, তিনি কাজ করতে এবং পরিবারকে সাহায্য করতে চাইলেন। তাই, তিনি তাঁর চাচার কাছে গেলেন এবং তাঁর ভেড়া ও ছাগল পালনের দায়িত্ব চাইলেন। এতে করে আবু তালিবকে এই কাজের জন্য অন্য কাউকে আর ভাড়া করতে হবে না। তাঁর বয়সের তুলনায় এটি ছিল এক বিস্ময়কর পরিপক্ক বালকের মতো অনুরোধ। তাঁর চাচা এবং চাচি তাঁকে কখনোই বোঝা মনে করতেন না, এবং তাঁরা চাননি যে তিনি দীর্ঘ সময় বাইরে কাটান-- আরবের তপ্ত প্রখর রোদের নিচে। কিন্তু নবীজি (সা.) যেকোনোভাবে তাঁদের রাজি করালেন। আর তিনি পশুদের দেখাশোনা করা শুরু করলেন। মেষপালক হওয়ার জন্য অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। এর মাধ্যমে তিনি ধৈর্য ধরতে, দায়িত্ব নিতে, এবং তাঁর কাছে অর্পিত আমানতের যত্ন নিতে শিখলেন। তিনি এটিকে শহরের কোলাহল থেকে দূরে থাকার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখলেন, যেখানে তিনি একাকী রাত কাটাতেন, আকাশের তারা এবং পৃথিবীর সৃষ্টির বিস্ময় নিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন হতেন। যখন তাঁর বয়স ১২ বছর হলো, তখন আবু তালিবকে একটি বাণিজ্যিক কাফেলায় যোগ দিতে হলো। আর্থিক সংকটের কারণে আবু তালিবকে সেই কাফেলায় যেতেই হলো। কুরাইশরা এটি আয়োজন করছিল এবং গন্তব্য ছিল দামেস্ক। কিন্তু যখন নবীজি (সা.) এ কথা শুনলেন, তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হলেন। তিনি আর কোনো বিচ্ছেদ সহ্য করতে চাইছিলেন না। তাঁর চাচা, যিনি সবসময় তাঁর পাশে ছিলেন, তিনি হয়তো মাসের পর মাস দূরে থাকবেন। তিনি তাঁর ভালোবাসা, সুরক্ষা এবং স্বস্তি ছাড়া একা হয়ে পড়বেন। তাই তিনি সত্যিই চাচার সাথে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওই বয়সে এমন দীর্ঘ যাত্রা ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। যদি নবীজি (সা.)-এর কোনো ক্ষতি হয়ে যায়?

যদি আবু তালিব তাঁর ভাইয়ের রেখে যাওয়া আমানত রক্ষা করতে না পারেন? সবাই একমত হলেন যে তাঁর যাওয়া উচিত হবে না। কিন্তু তাঁরা যাই বলুক না কেন, চাচার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল যেকোনো ভয়ের চেয়েও শক্তিশালী। কয়েক দিনের বিষণ্ণতার পর, তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি আবু তালিবের কাছে গেলেন এবং অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বললেন: "চাচাজান, আপনি আমাকে কোথায় রেখে যাচ্ছেন? কার কাছে?

এখানে তো আমার মা বাবা কেউ নেই।" এই হৃদস্পর্শী শব্দগুলো তাঁর মনের সমস্ত অনুভূতি এবং অন্তরে বয়ে চলা সব কষ্টকে ফুটিয়ে তুলল। আবু তালিবের হৃদয় তা সহ্য করতে পারল না। তাই তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো এবং এখন কাফেলা রওনা দেওয়ার সময় হলো। তিনি তাঁর চাচি এবং ভাই-বোনদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এই সফরটি ছিল তাঁর ব্যবসায়িক জীবনের সূচনালগ্ন। এই সফর থেকে তিনি যে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, তা আগামী বছরগুলোতে তাঁকে অনেকবেশী সাহায্য করেছিল। তিনি ধীরে ধীরে কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁর চারপাশটা ছিল অনৈতিকতা আর কদাচারে ঘেরা। এই পর্বের পরবর্তী অংশে, আমরা সেই সময়ের প্রথাগুলো কতটা কলুষিত এবং কুৎসিত ছিল তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। সেই যুগ যেটিকে আমরা 'জাহিলিয়াত' বা অন্ধকারের যুগ বলে জানি। এই সবকিছুই মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে। এমন এক পরিবেশে তিনি কীভাবে সুরক্ষিত ছিলেন?

অন্য কথায়, নবুয়ত লাভের আগে তিনি কি কখনো কোনো পাপে লিপ্ত হয়েছিলেন?

বেশ কিছু ঘটনা আছে যা আমাদের এটি বুঝতে সাহায্য করে। তবে আমি তার মধ্য থেকে দুটি ঘটনা শেয়ার করব। একবার মক্কায় একটি আয়োজন চলছিল যেখানে অনেক যুবক আনন্দ-ফুর্তি করার পরিকল্পনা করছিল। তাঁর বন্ধুরা নবীজি (সা.)-কেও সেখানে আমন্ত্রণ জানাল। এবং তিনিও তাঁদের সাথে যোগ দিতে চাইলেন। কিন্তু তিনি যদি যেতেন, তবে তা কোনো না কোন পাপের দিকে নিয়ে যেতে পারত। সেই সময় তিনি মেষপালক হিসেবে কাজ করছিলেন। তাই তিনি এক বন্ধুকে তাঁর পশুপালের দেখাশোনা করতে বলে মক্কার দিকে রওনা হলেন। তিনি সেখানে বসলেন এবং চারপাশ দেখতে শুরু করলেন। এর কিছু পরেই, মুখে ভোরের সূর্যের উষ্ণতা অনুভব করে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। অর্থাৎ তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কিছু সময় পর, একই ঘটনা আবারও ঘটল। তিনি সেখানে গেলেন, বসলেন, চারপাশের আয়োজন দেখতে চাইলেন, কিন্তু আবারও তিনি গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়লেন। তিনি যদি সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন, তবে হয়তো তিনি এমন কিছুর সাক্ষী হতেন বা জড়িয়ে পড়তেন যা পরবর্তীতে তাঁর নবী হিসেবে মর্যাদার সাথে সাংঘর্ষিক হতো। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছিলেন। এছাড়াও, তৎকালীন সমাজের অধিকাংশ মানুষের বিপরীতে, তিনি কখনো মূর্তিপূজা করেননি বা তাদের প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শনও করেননি। তিনি ২৫ বছর বয়সের কাছাকাছি পৌঁছলেন। এবং সেই সময়ের মধ্যে তিনি ব্যবসায়িক সততার জন্য সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। মক্কাবাসীরা তাঁর উত্তম চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করত এবং তাঁকে 'মুহাম্মাদ আল-আমিন' উপাধি দিয়েছিল, যার অর্থ "বিশ্বস্ত মুহাম্মাদ"। বহু মানুষ পরম নিশ্চিন্তে তাদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর কাছে আমানত রেখে যেতো। "ও মুহাম্মাদ!

আপনি কি আমার অর্থ এবং উটটির দেখাশোনা করবেন?" এমনকি তিনি নবুয়ত ঘোষণার পরেও, যারা তাঁর বিরোধিতা করেছিলো, তারাও তাঁর কাছে আমানত হিসেবে রাখা জিনিসগুলো ফিরিয়ে নেয়নি। কারণ তারা তখনও তাঁকে বিশ্বাস করত। সমস্যা শুধু এটাই ছিল যে, তাঁর প্রচারিত বাণী তাদের স্বার্থের অনুকূলে ছিল না। সেই সময় একটি বড় বাণিজ্যিক কাফেলা দীর্ঘ সফরের জন্য রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এটি ছিল খুওয়াইলিদের কন্যা খাদিজা (রা.)-এর কাফেলা। খাদিজা (রা.) সারা মক্কায় সুপরিচিত ছিলেন, কেবল একজন অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী হিসেবেই নয়, বরং তাঁর পবিত্রতা এবং মহৎ চরিত্রের জন্যেও। তিনি দুবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর উভয় স্বামীই ইন্তেকাল করেন। যেহেতু ব্যবসায়ীদের মাঝে নবীজি (সা.)-এর অত্যন্ত প্রশংসা ছিল, তাই তিনি নবীজিকে তাঁর কাফেলার নেতৃত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানান। পুরো মক্কায় তাঁর মতো দ্বিতীয় আর কেউ ছিল না। এবং নবীজি (সা.) তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করেন। খাদিজা (রা.) তাঁর সঙ্গী হিসেবে গোলাম মাইসারাকে পাঠালেন। যাতে সে তাঁকে সাহায্য করতে পারে এবং নিবিড়ভাবে তাঁর আচরণ ও স্বভাব পর্যবেক্ষণ করে যেন তাঁকে এসে রিপোর্ট করতে পারে। রওনা হওয়ার মুহূর্ত থেকেই মাইসারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করতে লাগল। এই যুবকটির মধ্যে তিনি যা কিছু দেখছিলেন, তা কেবল তাঁর মুগ্ধতাই বাড়িয়ে দিচ্ছিল। পুরো সফর জুড়ে, নবীজি (সা.) অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন যেন কারও প্রতি কোনো অন্যায় না হয়। তিনি ছিলেন এক অনন্য চরিত্রের অধিকারী। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, নিষ্ঠাবান এবং সর্বদা আত্মমর্যাদার সাথে চলতেন। সফরের সময় তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকেও গভীর নজর রাখতেন। যা সেই সমাজে খুবই আকাঙ্ক্ষিত ছিল কিন্তু খুব কমই দেখা যেত। অবশেষে মাইসারার ফিরে আসার এবং খাদিজা (রা.)-এর সাথে সবকিছু শেয়ার করার সময় এল যা সে প্রত্যক্ষ করেছিল। "আমি তাঁর মতো মহান মানুষ আর কখনোই দেখিনি।" "আমরা যেখানেই গিয়েছি, মানুষ নির্দ্বিধায় তাঁকে বিশ্বাস করেছে।" যখন মাইসারা নবীজি (সা.)-এর এই সব সুন্দর গুণাবলি খাদিজা (রা.)-কে বললেন, তখন তিনি তাঁর প্রতি এক বিশেষ টান অনুভব করতে লাগলেন। ততদিন পর্যন্ত তিনি পুনরায় বিবাহের কথা কখনো ভাবেননি। কিন্তু এখন, তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। সাধারণত বিবাহের প্রস্তাব পুরুষের পক্ষ থেকেই আসত। কিন্তু নবীজি (সা.)-এর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা এতই গভীর ছিল যে, তিনি নিজেই বিবাহের প্রস্তাব পাঠানোর কথা ভাবতে শুরু করলেন। তবে সেখানে একটি বয়সের ব্যবধান ছিল। নবীজি (সা.)-এর বয়স ছিল ২৫ এবং খাদিজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০। তিনি কি এই প্রস্তাব গ্রহণ করবেন?

খাদিজা (রা.) এখন কী করবেন?

নাফিসা বিনতে মুনয়া নামে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বান্ধবী ছিলেন। খাদিজা (রা.) তাঁর মনের কথাগুলো বান্ধবীর সাথে শেয়ার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। নাফিসার কাজ কী হবে তা একদম পরিষ্কার ছিল। তিনি নবীজি (সা.)-এর কাছে যাবেন এবং জানার চেষ্টা করবেন যে খাদিজা (রা.)-এর প্রতি তাঁরও কোনো অনুভূতি আছে কিনা। খাদিজা (রা.) 'আত-তাহিরা' বা "পবিত্র নারী" হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন পুরো কুরাইশ বংশের অন্যতম সম্মানিত এবং ধনী নারী। তাঁর গোত্রের অনেক পুরুষ তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তাদের সবাইকেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আসলে, পরবর্তীকালে আবু জাহেল যে নবীজি (সা.)-এর প্রতি এত ঘৃণা পোষণ করত, তার অন্যতম কারণ ছিল যে সে নিজেও খাদিজা (রা.) কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। অবশ্যই, 'আত-তাহিরা' হিসেবে পরিচিত একজন নারী এমন কলুষিত এবং অহংকারী হৃদয়ের কাউকে কখনো গ্রহণ করতে পারেন না। তিনি এখন তাঁর জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেয়েছেন। নাফিসা নবীজি (সা.)-এর কাছে গেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন: "হে মুহাম্মাদ, আপনার বিয়ে করতে বাধা কোথায়?" তিনি বললেন, "বিয়ে করার মতো যথেষ্ট অর্থ আমার কাছে নেই।" "যদি সেই ব্যবস্থা হয়ে যায় এবং আপনাকে সম্পদ, সৌন্দর্য, মর্যাদা এবং একজন উপযুক্ত জীবনসঙ্গিনীর প্রস্তাব দেওয়া হয়," "তবে কি আপনি রাজি হবেন?" নবীজি (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, "তিনি কে?" "খুওয়াইলিদের কন্যা খাদিজা।" তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?" "সেটি আমার ওপর ছেড়ে দিন।" তখন নবীজি (সা.) বললেন, "যদি তেমন হয়, তবে আমি রাজি।" নাফিসা ফিরে গেলেন এবং এই কথোপকথন খাদিজা (রা.)-কে জানালেন। তাঁর হৃদয় আনন্দে ভরে উঠল। ভবিষ্যতের একজন নবীর স্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়া কতই না সৌভাগ্যের বিষয়। এর কিছুদিন পরই, তাঁরা দুজনে দেখা করলেন এবং এই বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন। খাদিজা (রা.) তাঁকে বললেন: "আমার চাচা আমর ইবনে আসাদের কাছে যান এবং আমাকে বিবাহের জন্য তাঁর অনুমতি প্রার্থনা করুন।" আবু তালিব, যিনি সবসময় নবীজি (সা.)-এর কাছে পিতার মতো ছিলেন, তিনি আবারও তাঁকে সমর্থন করতে এগিয়ে এলেন। এবার তাঁর বিবাহের আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য। আর সেই আনন্দঘন দিনে, ২০টি উটের মোহরানার বিনিময়ে এই বরকতময় বিবাহ সম্পন্ন হলো। মক্কায় গড়ে উঠছিল এক সুন্দর ও প্রশংসিত ঘর। দুটি হৃদয় নিবিড়ভাবে জুড়ে গিয়েছিল এবং প্রতিটি দিন, তাঁদের একে অপরের প্রতি বন্ধন ও ভালোবাসা কেবল আরও শক্তিশালী হতে থাকল। পুরো মক্কায় তাঁদের মতো সুখী এবং অনুকরণীয় ঘর আর একটিও ছিল না। সময়ের সাথে সাথে আল্লাহ এই ঘরকে সন্তান দিয়ে ধন্য করলেন। প্রথমে এলেন কাসিম, এরপর যায়নাব, এরপর রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম এবং ফাতিমা। নবুয়ত লাভের পর আবদুল্লাহর জন্ম হয়। কিন্তু কাসিম দুই বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। এবং আবদুল্লাহ মাত্র তিন মাস বয়সে--উভয়েই অসুস্থতার কারণে মারা যান। যেকোনো বাবা-মায়ের জন্য এটি কতই না অসহ্য এবং অবর্ণনীয় এক যন্ত্রণা। আর এই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাঁদের দুবার যেতে হয়েছিলো। তাঁরা প্রতিটি অনুভূতি একসাথে ভাগ করে নিচ্ছিলেন। সুখের অতি সুন্দর মুহূর্তগুলো থেকে শুরু করে বেদনার অত্যন্ত হৃদয়বিদারক মুহূর্ত পর্যন্ত। কিন্তু প্রতিটি বিপদে তাঁরা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। আর এর মাধ্যমেই তাঁরা শক্তি, শান্তি এবং ধৈর্য খুঁজে পেয়েছিলেন। তিনি একবার খাদিজা (রা.) সম্পর্কে বলেছিলেন: "আল্লাহ আমাকে তাঁর চেয়ে উত্তম আর কাউকেই দান করেননি। যখন সবাই আমাকে অস্বীকার করেছিল, তখন সে আমার ওপর বিশ্বাস এনেছিল। যখন মানুষ আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, তখন সে বলেছিল যে আমি সত্য বলছি। যখন মানুষ তাদের সম্পদ গুটিয়ে নিয়েছিল, তখন সে তাঁর সম্পদ দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছিল। এবং আল্লাহ তাঁর মাধ্যমেই আমাকে সন্তান দান করেছেন।" এমনকি ওহী বহনকারী ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-ও, খাদিজা (রা.)-এর নিষ্ঠা এবং ত্যাগে অভিভূত হয়েছিলেন। তিনি নবীজি (সা.)-কে বলেছিলেন: "যখন খাদিজা আপনার কাছে আসে, তখন তাঁকে তাঁর রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম জানাবেন।" খাদিজা (রা.) ছিলেন ঠিক এমনই এক অনন্য নারী। চলুন, আবারও মূল গল্পে ফিরে যাই। এই পর্যন্ত নবীজি (সা.)-এর জীবনযাত্রা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। শৈশবের শুরুর সময়টুকু তিনি বনু সা'দ গোত্রে কাটিয়েছিলেন যেখানে তিনি বড় হয়েছেন, এবং সেখানে তিনি মরুভূমির জীবনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে ছিনেন। পরবর্তীতে মায়ের সাথে তিনি মদিনায় তাঁর আত্মীয়দের সাথে দেখা করতে যান এবং সেখানে কিছুদিন তাঁর মামাদের কাছে অবস্থান করেন। সেখানেই তিনি প্রথম সত্যিকারের শহর জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। আর এখন, অনেক বছর ধরে তিনি মক্কায় বসবাস করছিলেন' 'জাহিলিয়াত' বা মূর্খতার যুগের চরম অন্ধকার ও বিশৃঙ্খলার ঠিক কেন্দ্রস্থলে। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকরতম রূপে। বছরের পর বছর ধরে তিনি অসংখ্য অন্যায় এবং নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করছিলেন। ৩৫ বছর বয়সে তাঁর মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন শুরু হয়। তাঁর জীবনে এবং তাঁর হৃদয়ের অবস্থার উভয় ক্ষেত্রেই। এই পরিবর্তনগুলো ছিল এক শক্তিশালী নতুন সূচনার লক্ষণ। নবুয়তের আগমনের সাথে সাথে, মক্কার প্রতিটি ভিত্তি তার গোড়া থেকেই কেঁপে উঠবে। এবং কোনো কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। একটি ছোট মেয়ে তার বাবার সাথে মরুভূমির মাঝখানে ছিল। সবার থেকে অনেক দূরে। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে তার বাবা একটি গর্ত খুঁড়ছিলেন, আর সে বোঝার চেষ্টা করছিল কেন তিনি এমনটা করছেন। সে তার বাবার কাছ থেকে কখনো কোনো ভালোবাসা পায়নি। কিন্তু সেদিন সে খুব খুশি ছিল। কারণ এই প্রথমবার তারা কিছু একটাতো করছে একসাথে। কেবল তারা দুজন। এক পর্যায়ে, সে তার বাবাকে গর্ত খুঁড়তে সাহায্য করারও চেষ্টা করল। গর্তটি যত গভীর হতে লাগল, তার কৌতূহলও তত বাড়ছিল। তারা কি কোনো খেলা খেলবে?

সেটা কেমন হবে?

কী হতে যাচ্ছে তা যখন সে কেবল ভেবেই যাচ্ছিলো, হঠাৎ সে একটি ধাক্কা অনুভব করল এবং নিজেকে গর্তের ভেতরে আবিষ্কার করল। তার বাবা, যিনি তাকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। এরপর তিনি দ্রুত তাঁর মেয়ের ওপর মাটি ফেলতে শুরু করলেন। ছোট্ট মেয়েটি, যে জানতও না কেন সে ওই গর্তে পড়ে আছে, সে এক বাস্তব দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যাঁর কাছ থেকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পাওয়ার আশা করেছিল, তাঁর হাতেই সে জীবন্ত কবরস্থ হচ্ছিল। তার ছোট্ট নিরীহ চেষ্টা আর মরিয়া চিৎকারগুলো তার বাবার পচে যাওয়া বিবেককে নাড়া দিতে পারল না। সে ওখানেই মারা যেতে বসেছিল। ঠিক ওভাবেই। এবং সে হয়ে উঠল ওই ভূখণ্ডের নিষ্ঠুরতা আর নির্মমতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। এই ভয়াবহ দৃশ্যটি, যা আমাদের কল্পনা করাও প্রায় অসম্ভব, তা ঘটেছিল তখনকার আরব উপদ্বীপে-- ইসলাম আসার আগে, জাহেলিয়াতের যুগে (অজ্ঞতার যুগ)। সেই সময়ে কন্যা সন্তানদের লজ্জা এবং দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। কিছু বাবা বলতেন: "একদিন সে বিয়ে করবে আর আমাদের উত্তরাধিকার পরপুরুষের হাতে তুলে দেবে।" এই বিকৃত বিশ্বাসগুলো চড়া মূল্য দিতে হতো কিছু মেয়ের জীবনের বিনিময়ে। অথবা ভালো কোনো ক্ষেত্রেও, তাদের সারা জীবন কাটত বাবার ভালোবাসা একবিন্দু অনুভব না করেই। কিন্তু এটা এখানেই থেমে থাকেনি। এমনকি যখন কোনো মেয়ে বড় হতো এবং তার বিয়ে হতো, তখনও তাকে মূল্যহীন মনে করা হতো। যদি তার স্বামী মারা যেত এবং সে এতিম সন্তানদের নিয়ে একা হয়ে পড়ত, তবে যেকোনো পুরুষ এসে তাদের ঘরের মালিকানা দাবি করতে পারত। আর এটি দয়া দেখানোর জন্য করা হতো না। ওই লোকটি ঘরের সবকিছু দখল করে নিত। টাকা, সম্পত্তি, এমনকি ওই পরিবারকেও। উত্তরাধিকারের ন্যায্য অংশ না দেওয়ার পাশাপাশি, তারা তাদের সাথে দাসের মতো আচরণ করত। তাদের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ--সবই চুরি হয়ে যেত। তাদেরকে খেলনার চেয়ে বেশি দামী মনে করা হতো না। কিন্তু সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় ছিল এই যে, সেই এতিম শিশুদের কিংবা তাদের বিধবা মায়ের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। একজন বাবা কীভাবে নিজের নবজাতক সন্তানের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে?

আর তা কেবল কন্যা সন্তানদের ক্ষেত্রেই ছিল না। কিছু মানুষ তাদের সন্তানদের এই ভেবে হত্যা করত-- যে তাদের ভরণপোষণ করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। সেই যুগের একজন মায়ের অনুভূতি একবার কল্পনা করে দেখুন। আপনি ধৈর্য ধরে আপনার সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেছেন। হয়তো আপনি কত স্বপ্ন বুনেছিলেন। আর এখন সেই সন্তানকে আপনার কোল থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে হত্যা করার জন্য। তাও তাদের নিজের বাবার হাতে। তাঁদের অন্তর পুড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তাঁরা ছিলেন পুরোপুরি নিরুপায়। এ নিয়ে তাঁদের কিছুই করার ছিল না। আসলে, তাঁরা কী অনুভব করছেন তা নিয়ে কি কারও কোনো মাথাব্যথা ছিল?

অন্যদের চোখে তাঁদের কোনো মূল্যই ছিল না। এবং অনাচার কেবল এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গোত্রগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাত লেগেই থাকত। যদি কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের কেউ খুন হতো, তবে সেখানে অনুসরণ করার মতো কোনো আইন বা বিচার ছিল না। প্রতিপক্ষ গোত্রের যে কেউ তখন মহাবিপদে পড়ে যেত। যেকোনো সময়, কোনোরূপ সতর্কতা ছাড়াই তারা খুন হয়ে যেতে পারে। একটি নিষ্পাপ শিশু, যার চারপাশের পরিস্থিতির সাথে কোনো সম্পর্কই নেই-- সেও হয়তো তার বাবাকে হারিয়ে ফেলত। আর বড় হতো পিতৃহীন অবস্থায়, অন্য গোত্রের প্রতি ঘৃণা এবং প্রতিশোধের তীব্র লালসা নিয়ে। আর এভাবেই হত্যার সিলসিলা চলতেই থাকত। কেউ তা থামাতে সক্ষম ছিল না। সেখানে কোনো ন্যায়বিচার ছিল না। মানুষের হৃদয় পাথরে পরিণত হয়েছিল। মানুষ তাদের প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়েছিল। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল যা তারা চায় তা হাসিল করা। মদ্যপান, জুয়া, মিথ্যা, চুরি, ব্যভিচার আর জুলুম। অনৈতিকতার প্রতিটি রূপ এই ভূখণ্ডকে শাসন করছিল। যদিও সেখানে সূর্য উজ্জ্বলভাবে কিরণ দিত, কিন্তু আধ্যাত্মিক পরিবেশ ডুবে ছিল ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে। অন্ধকার যত ঘনীভূত হয়, আমরা ঠিক ততটাই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি যে আলোর দ্যুতি কতটা প্রখর। তাই আল-কুরআন সর্বপ্রথম এই মানুষদের ওপর তার আলো ছড়াবে এবং তাদের অজ্ঞতার এই অন্ধকার থেকে টেনে বের করে আনবে। নবুয়তের সিলসিলার শেষ কড়িটি আবির্ভূত হবে ঠিক এই ভূখণ্ডেই। এবং সম্বোধন করবে গোটা বিশ্বকে। মক্কার একটি প্রধান ভৌগোলিক সুবিধাও ছিল। এটি আরব উপদ্বীপের একেবারে কেন্দ্রে কৌশলগতভাবে অবস্থিত ছিল। যা একে অন্য সব অঞ্চল থেকে আলাদা করে তুলেছিল। সেখানে বড় বড় বাণিজ্যিক মেলা অনুষ্ঠিত হতো। যা আরবের প্রতিটি কোণ থেকে কাফেলা এবং গোত্রগুলোকে টেনে আনত। এটি ছিল বিশাল এক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুর মতো। এখান থেকে শুরু হওয়া যেকোনো বার্তা দ্রুত চারপাশের গোত্রগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারত। মাত্র পাঁচ বা ছয় মাসের মধ্যে তা এমনকি পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যগুলোতেও পৌঁছে যেতে পারত। এই অঞ্চলের অন্য কোথাও এই পর্যায়ের প্রভাব ছিল না। শুনতে অবাক মনে হতে পারে, কিন্তু এই আরব উপদ্বীপ তার পার্শ্ববর্তী রাজ্য ও সাম্রাজ্যগুলোর আক্রমণের হুমকি থেকে নিরাপদ ছিল। সব দিক থেকেই এটি ছিল শেষ নবীর আগমনের জন্য এক আদর্শ প্রেক্ষাপট। আর তাই আল্লাহ মক্কাকেই বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর রাসূলের এই পৃথিবীতে আগমনের স্থান হিসেবে এমন এক শহর যেখানে সব পথের মিলন ঘটেছে। এই সব কারণ ছাড়াও, মক্কার জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল। আরবদের কাছে তাঁদের পূর্বপুরুষরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। আর এই শহরটি সেই মানুষটির প্রতিনিধিত্ব করত যাকে তাঁরা তাঁদের আদিপিতা মনে করতেন-- ইব্রাহিম (আঃ)। তিনি ছিলেন সেই নবীদের একজন যারা কাবা ঘর নির্মাণ করেছিলেন। তাঁদের পূর্বপুরুষের তৈরি এই ইবাদতখানার প্রতি তাঁদের ছিল গভীর শ্রদ্ধা। কিন্তু আপনি যদি তাঁদের জিজ্ঞাসা করতেন যে তাঁদের জীবনে ইব্রাহিম (আ.)-এর শিক্ষার কী অবশিষ্ট ছিল, তবে উত্তর হতো-- কিছুই না। ছিল কেবল 'হজ' নামক সেই পবিত্র রীতি। আর সেটিও তখন স্রেফ একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। হজের আসল মর্মার্থকেই তারা মূলত বিকৃত করে ফেলেছিল জাহিলিয়াত বা সেই অন্ধকার যুগের মানুষেরা। এমনকি এমন লোকও ছিল যারা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে কাবা তাওয়াফ করত। কেউ কেউ হাততালি দিয়ে এবং নেচে নেচে তাওয়াফ করত। এই পবিত্র স্থানের মূল উদ্দীপনা এবং তাৎপর্য থেকে তাঁরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন এমন একজন নবী-- যিনি মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। আর এখন, তাঁর নিজের হাতে গড়া সেই কাবার চারপাশ ৩৬০টি মূর্তিতে ঘেরা। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল লাত, মানাত, উয্‌যা এবং হুবাল। যদিও তারা আল্লাহতে বিশ্বাস করতো, কিন্তু তাঁকে কেবল নামেই স্বীকার করেছিল। আল্লাহর সকল নাম, গুণাবলি, তাঁর কার্যক্রম এবং মহাবিশ্বের ওপর তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য - সবই মূর্তির প্রতি আরোপিত ছিল। কিন্তু সেই শহরের সবাই কি মূর্তিপূজা করত?

মুহাম্মদ (সা.) কি তাঁদের একজন ছিলেন?

কখনোই না। ইব্রাহিম (আ.)-এর চলে যাওয়ার শতবর্ষ পরও, সেখানে অল্প কিছু মানুষ ছিলেন-- যাঁরা তাঁর রেখে যাওয়া 'হানিফ' (একেশ্বরবাদী) বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাঁরা ছিলেন বিরল সেই ব্যক্তি যাঁরা কেবল আল্লাহকে বিশ্বাস করতেন এবং সব ধরনের মূর্তিপূজা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই বিশ্বাস ছিল এক আধ্যাত্মিক ঢালের মতো যা তাঁদের ওহী আসার পূর্ব পর্যন্ত সব রকম পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করেছিল। আর আল্লাহর রাসূল ছিলেন তাঁদেরই একজন। তিনি মূর্তিপূজা একদমই পছন্দ করতেন না। কিন্তু তিনি অন্যের কাজে বাধা দিতেন না কিংবা কাউকে থামানোর চেষ্টাও করতেন না। সত্যি বলতে, তরুণ বয়সে এই নীরব থাকাটা তাঁর জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ তা না হলে ইসলাম প্রচার শুরুর সময় মানুষ হয়তো বলত, "মুহাম্মদ, আমরা তোমাকে তোমার যৌবন থেকেই চিনি।" "তুমি তো সবসময়ই আমাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে।" কিন্তু তাঁরা তা বলতে পারেনি। কারণ তিনি কখনোই তাঁদের বিশ্বাসের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেননি। যাই হোক, ঠিক যে মুহূর্তে তাঁর নবুয়তের মিশন শুরু হলো, তিনি তাঁদের পরম স্পষ্টতার সাথে সতর্ক করতে শুরু করবেন: আল্লাহ একটি আত্মাকে পথ দেখালে, সেই একটি আলোকিত আত্মাই নিদ্রামগ্ন বাকি সবাইকে জাগিয়ে তোলার জন্যে যথেষ্ট। এখন, চলুন সেই জাগরণের শুরুর সময়টিতে ফিরে যাই। ৩৫ বছর বয়সী আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সেই গল্পে। একদিন, কাবার চারপাশে হঠাৎ উচ্চস্বরে চিৎকার শুরু হলো। "হাজরে আসওয়াদ কাবার গায়ে স্থাপন করার অধিকার আমাদেরই!" বনু আদি, বনু তামিম ও বনু উমাইয়া-এর মতো গোত্রসমূহ - সবাই প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল যে তারা বাকীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তর্ক এতটাই তুঙ্গে পৌঁছাল যে কিছু পরিবার লড়াই করার, এমনকি একে অপরকে হত্যা করার শপথ নিতে শুরু করল। একে অপরের দিকে নানারকম হুমকি ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এই সব বিশৃঙ্খলার মূল কারণ কী ছিল?

সমস্যার মূল কারণ ছিল - কার ভাগ্যে 'হাজরে আসওয়াদ' (পবিত্র কালো পাথর) স্থাপনের সম্মান জুটবে। চলুন কয়েক দিন আগে ফিরে যাই। বছরের পর বছর ধরে কাবা শরীফ পুরনো এবং জীর্ণ হয়ে পড়েছিল। "আমাদের লজ্জা হওয়া উচিত।" "আমাদের আদিপিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর রেখে যাওয়া এক পবিত্র স্থাপনা--" "অথচ এর আজ এই দশা!" মক্কার বয়োজ্যেষ্ঠরা একত্রিত হলেন এবং একমত পোষণ করলেন যে কিছু একটা করতেই হবে। সেই সময় তারা জেদ্দার কাছে শুয়াইবা বন্দরে আসা একটি জাহাজের খবর পেলো। সেটিতে ঠিক তেমন নির্মাণ সামগ্রীই ছিল-- যেমনটা তাঁরা খুঁজছিলেন। তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নিল সেগুলো কিনে কাবা শরীফকে নতুন করে পুনঃনির্মাণ করবে। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাঁরা একটি যৌথ তহবিল গঠন করলো-- এবং কাবার জন্য যে যার সাধ্যমতো অবদান রাখলো। কিন্তু যদিও সেটি ছিল জাহিলিয়াত বা মূর্খতার যুগ, তা সত্ত্বেও সুদের মাধ্যমে উপার্জিত একটি মুদ্রাও সেই তহবিলে যোগ করা হয়নি। তাঁরা ঐশী শাস্তির ভয় পাচ্ছিল। এমন এক পবিত্র কাজের জন্য তারা এমন কোনো অর্থ ব্যবহার করতে চায়নি - যাতে দরিদ্রদের কষ্ট এবং চোখের জল মিশে ছিল। অবশেষে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগৃহীত হলো। এবং সবাই মিলে কাবা পুনঃনির্মাণ করলো। এখন কেবল একটি কাজ বাকি। এমন এক জিনিস, যা পুরো পরিস্থিতিকে উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তা হলো - হাজরে আল-আসওয়াদ বা কালো পাথরকে তার স্থানে পুনরায় স্থাপন করা। শতাব্দী আগে নবী ইব্রাহিম (আ.) এটি কাবাঘরে প্রথম স্থাপন করেছিলেন। এবং তখন থেকেই এটি অপরিবর্তিত ছিল। আর এখন, কোনো গোত্রই এই সম্মানটুকু অপর গোত্রের হাতে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। প্রত্যেকেই জিদ ধরল যে তারাই এ কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি যোগ্য-- এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করতে লাগল। "এই সম্মান কেবল আমাদেরই প্রাপ্য!" "না, এই সম্মান আমাদের!" পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেল যে কেউ কেউ লড়াই করার শপথ পর্যন্ত নিল। "আমার প্রাণ কেড়ে নেওয়া ছাড়া তোমরা এই সম্মান লাভ করতে পারবে না!" চার-পাঁচ দিন ধরে এর কোনো সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল না। সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হওয়া একটি কাজ এভাবে গুরুতর বিবাদে রূপ নিতে দেখে-- সবাই খুব হতাশ হয়ে পড়ছিল। তখন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটি দাঁড়িয়ে বললেন: "হে কুরাইশগণ, যেহেতু তোমরা এই বিষয়ে একমত হতে পারছ না," "সেহেতু এই মুহূর্তে কাবার ওই প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রথম যে ব্যক্তি প্রবেশ করবেন, তিনিই তোমাদের বিচারক হবেন।" "তিনিই তোমাদের এই বিবাদের মীমাংসা করে দেবেন।" সবাই এই প্রস্তাবে রাজি হলো এবং চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগলো। কে আসবেন এই পথ ধরে?

কিছুক্ষণ পর, অবশেষে প্রবেশদ্বারে একজনের ছায়া দেখা গেল। তাঁকে দেখামাত্রই উপস্থিত সবার মনে এক বিশাল স্বস্তি নেমে এল। "ইনি তো আল-আমিন!" "ইনি তো মুহাম্মদ!" "তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন, আমরা তা-ই মেনে নেব।" যিনি প্রবেশ করেছিলেন, তিনি ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা.)। তারা সবাই তাঁকে বিশ্বাস করতো এবং নিশ্চিত ছিল-- যে তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত দেবেন যা সবাইকে সন্তুষ্ট করবে। এরপর তারা পরিস্থিতিটি তাঁকে বুঝিয়ে বললো। "একটি গুরুতর মতভেদ আমাদের বিভক্ত করে ফেলেছে এবং আমরা কী করব বুঝতে পারছি না।" "এই বিবাদ আমাদের ধ্বংস করার আগেই আমরা এর সমাধানের জন্য আপনার দিকনির্দেশনা চাইছি।" প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল নিয়ে, তারা তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতীক্ষা করতে লাগলো। তো, তিনি কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করবেন?

তিনি বললেন, "আমাকে একখণ্ড কাপড় এনে দাও।" তিনি কী করতে চাচ্ছিলেন সে সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণাই ছিল না। প্রথমে তিনি হাজরে আসওয়াদকে কাপড়ের মাঝখানে রাখলেন। এরপর প্রতিটি গোত্র থেকে-- একজনকে সামনে এসে কাপড়ের এক প্রান্ত ধরতে বললেন। সবাই মিলে পাথরটিকে কাবার কাছে নিয়ে এলো। আর সবশেষে, নবীজি (সা.)-- নিজের হাতে হাজরে আসওয়াদ-কে তুলে তার নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করলেন। এভাবেই দিনের পর দিন ধরে চলা বিবাদের অবসান ঘটল। এবং একটি সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী সংঘাত পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলো। এই ঘটনা আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিল। সবাই আবারও দেখল তিনি কতটা বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন। তাঁর জীবনের আগের অংশগুলোতেও আমরা এই গুণের কথা বলেছি। যখনই কেউ 'আল-আমিন' (বিশ্বস্ত) বলত, মানুষ ঠিক বুঝতে পারত কার কথা বলা হচ্ছে। তিনি কেবল আমাদের নবীজি (সা.)-ই হতে পারেন। সারা জীবন তাঁর চরিত্রের প্রতিটি পরতে এই গুণের প্রকাশ দেখা গিয়েছে। ব্যবসায় বিশ্বস্ত, পরিবারে বিশ্বস্ত, কথার বরখেলাপ না করায় বিশ্বস্ত-- আবালবৃদ্ধবনিতা সবার কাছেই তিনি ছিলেন পরম আস্থার স্থল। এই বৈশিষ্ট্য মানুষের হৃদয়ে এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, তাঁকে এই গুণে গুণান্বিত করা ছিল আল্লাহর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। কারণ যখন তাঁকে নবুয়ত দেওয়ার সময় এলো, তখন মানুষ চাইলেও তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত করতে পারেনি। আর যদি তারা চেষ্টাও করে, তবে তা হবে পুরোপুরি ভিত্তিহীন এক দাবী। মক্কায় আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর প্রতি মানুষের বিশ্বাস যখন উত্তরোত্তর বাড়ছিল, তখন তাঁর নিজের ভেতরেও কিছু পরিবর্তন শুরু হলো। দিন দিন তিনি নির্জনতা পছন্দ করতে শুরু করলেন। তাই তিনি লোকালয় থেকে নিজেকে কিছুটা সরিয়ে নিতে শুরু করলেন। যে কাবা ছিল একসময় ইব্রাহিম (আ.)-এর পবিত্র একেশ্বরবাদের প্রতীক, তা এখন মূর্তিতে ঘেরা। সব ধরনের অনৈতিকতা, অবিচার আর নিষ্ঠুরতা - এবং অমানবিক সব আচরণ শহরটিকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। মক্কায় ঘটে যাওয়া এই সব কর্মকাণ্ডের সাথে তাঁর অন্তরের জগত ক্রমেই সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছিল। তিনি এগুলো আর সইতে পারছিলেন না। তাই তিনি জীবন বদলে দেওয়ার মতো এক সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সমাজ থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিলেন এবং নিয়মিত জাবালে নূর-এ (নূর পাহাড়ে) যেতে শুরু করলেন। কিন্তু কী করতেন তিনি সেখানে?

তিনি নির্জনতা খুঁজতেন। তাঁর আত্মা যেন হাপিয়ে উঠেছিল। নির্জনতাকে তাঁর কাছে প্রিয় করে তোলা হয়েছিল। তিনি একা থাকতে চেয়েছিলেন। এই মহাবিশ্ব আর তাঁর নিজের ভাবনার সাথে। তিনি তাঁর রবের ইবাদত করতেন, তাঁর কাছে প্রার্থনা করতেন এবং মহাবিশ্ব নিয়ে নিভৃতে চিন্তা করতেন। আর এই সবকিছুর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান ছিল হেরা গুহা। আল্লাহ তাঁকে আসন্ন ওহীর জন্য প্রস্তুত করছিলেন। সেই নূরের জন্য, যা অবশেষে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছিল। জাবালে নূর-এর চূড়ায় উঠার ৬২১ মিটারের পথটি ছিল খাড়া এবং অত্যন্ত দুর্গম। তাঁর শারীরিক সক্ষমতার প্রতি এক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু কোনো কিছুই তাঁকে আরোহণ করা থেকে থামাতে পারেনি। যে বিষয়টি এই যাত্রাকে তাঁর জন্য অনেক সহজ করে দিয়েছিল - তা হলো তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ভালোবাসা ও সমর্থন। তিনি কখনোই তাঁকে ভুল বোঝেননি। তিনি সবসময় তাঁর পাশে ছায়ার মতো ছিলেন। এই নিভৃত যাত্রা তাঁর ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে থাকে। আর ওই গুহাটিই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে কাছের সঙ্গী। এদিকে, পুরো মহাবিশ্ব যেন প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা - এমন এক নূরের জন্য যা সমস্ত অন্ধকারকে ভেদ করে বেরিয়ে আসবে। জমিনের নীচে, আকাশের বুকে এবং প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণুতে লুকিয়ে আছে অসংখ্য গূঢ় রহস্য। কিন্তু মানুষ ছিল বেখবর। প্রতিটি সৃষ্টি ছিল আল্লাহর লেখা এক একটি চিঠির মতো। কিন্তু কেবল অল্প কজনই জানতেন সেগুলো কীভাবে পড়তে হয়। দীর্ঘকাল ধরে সেই চিঠিগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো কোনো ওহী ছিল না। সৃষ্টিজগত এমন এক আত্মার জন্য ব্যাকুল ছিল যে তাদের বার্তা পড়তে পারবে। প্রতীক্ষা যেন অসহ্য হয়ে উঠেছিল। আর তখনই সেই অনন্য রজনী ঘনিয়ে এল। সালটি ছিল ৬১০ খ্রিস্টাব্দ। রমজান মাসের এক সোমবার। আর সেই রাতটি?

লাইলাতুল কদর, মহিমান্বিত এক রজনী। যে রাতে সমস্ত অন্ধকার অবশেষে দূর হতে চলেছে। নবীজি (সা.)-এর বয়স তখন ৪০ বছর। তিনি হেরা গুহায় গভীর ধ্যান, প্রার্থনা ও ইবাদতে নিমগ্ন ছিলেন। এক গভীর নিস্তব্ধতা সবকিছুকে ঢেকে রেখেছিল। সেই রাতে চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার কেবল প্রদীপের মতো জ্বলজ্বল করা চাঁদের আলোটুকু ছাড়া। তিনি জানতেনও না কী ঘটতে চলেছে। আর তখনই সেই মহামিলনের মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। হঠাৎ একটি আলোয় গুহাটি ভরে গেল। সেই আলো এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। তারপর সেই আলোর ভেতর থেকে এক অবয়ব প্রকাশিত হলো। তিনি ছিলেন ওহী নিয়ে আসা ফেরেশতা, জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম)। তিনি মানুষের রূপ ধরে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নির্দেশ নিয়ে এসেছেন। তাঁর জন্য, যিনি হতে যাচ্ছেন পৃথিবীর শেষ নবী। নবীজি (সা.) বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন আসলে কী ঘটছে। এরপর এলো সেই প্রথম নির্দেশ। প্রথম সুসংবাদ। জিবরাঈল (আ.) বললেন, "পড়ুন।" নবীজি উত্তর দিলেন, "আমি তো পড়তে জানি না।" ফেরেশতা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন এবং সজোরে চাপ দিলেন। এরপর তাঁকে ছেড়ে দিয়ে আবারও বললেন, "পড়ুন।" কিন্তু নবীজি (সা.) একই উত্তর দিলেন। জিবরাঈল (আ.) তাঁকে আবারও সজোরে চেপে ধরলেন এবং পুনরাবৃত্তি করলেন, "পড়ুন।" কিন্তু তাঁর হাতে পড়ার মতো কিছুই লেখা ছিল না। নবীজি ﷺ আবারও উত্তর দিলেন যে তিনি পড়তে জানেন না। তখন জিবরাঈল (আ.) তৃতীয়বারের মতো তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। এতই সজোরে যে নবীজি ﷺ অনুভব করলেন তাঁর আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে, সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে তিনি বললেন, "আমি কী পড়ব?" তখন জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন: আউযুবিল্লাহ - ইক্বরা বিস্‌মি রাব্বিকাল্লাযি খালাক্ব। (পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।) খালাক্বাল ইংসানা মিন আলাক্ব। (তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবদ্ধ রক্ত থেকে।) ইক্বরা ওয়ারোব্বুকাল আকরাম। (পাঠ করুন, আপনার রব মহিমান্বিত।) আল্লাযি আল্লামা বিল ক্বালাম। (যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।) আল্লামাল ইংসানা মা লাম ইয়া'লাম। (তিনি মানুষকে তা শিখিয়েছেন যা সে জানত না।) গুহাটি তখন কেবল ওহীর পবিত্র বাণীতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। "পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।" "সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড হতে।" "পড়ুন, আর আপনার রব মহামহিমান্বিত।" "যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।" এগুলোই ছিল ওহীর সেই প্রথম আয়াতগুলো-- যা আমাদের নবীজি (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। তিনি এমন কেউ ছিলেন না যিনি পড়তে বা লিখতে জানতেন। কিন্তু সেই মুহূর্ত থেকে তিনি সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দেবেন - প্রকৃতপক্ষে 'পড়া' বা জানার আসল অর্থ কী। হৃদয়ে কুরআনকে ধারণ করে, তিনি হয়ে উঠবেন এই মহাবিশ্ব নামক গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকারী। সৃষ্টিজগতের প্রতিটি নিপুণ শৈল্পিক কাজের মাঝে-- তিনি উন্মোচন করবেন সেই মহান শিল্পী আল্লাহর স্বাক্ষর। এখন থেকে বোঝা যাবে যে একটি ফুলের সৌন্দর্য আসলে আল্লাহর অন্যতম নাম আল-জামিল, "পরম সুন্দর"-এরই এক প্রতিচ্ছবি। সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা - হবে তাঁর আর-রহমান "পরম দয়ালু" নামের বহিঃপ্রকাশ। মায়ের গ্রহণ করা খাবার যখন তাঁর সন্তানের জন্য নির্মল পুষ্টিকর দুধে পরিণত হয়, তখন তা প্রতিফলিত করবে তাঁর 'আর-রাজ্জাক' নামটি - রিযিকদাতা মানুষ সম্পর্কে কিছুই না জেনেও যখন মৌমাছি ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায় এবং মধু তৈরি করে যার মাধ্যমে মানুষ শেফা বা আরোগ্য লাভ করে - তখন সেটিকে দেখা হবে তাঁর আশ-শাফি, "আরোগ্যদাতা" নামের এক মহিমা হিসেবে। মানুষ বিশ্বাস করত যে এই মহাবিশ্ব উদ্দেশ্যহীন, সংযাগ আর আকস্মিকতায় ভরপুর। তারা পৃথিবীকে কেবল দুঃখ আর লোকসানের জায়গা হিসেবে দেখত, আর ভাবত যে মৃতরা চিরতরে হারিয়ে গেছে, তারা আর কক্ষনো ফিরবে না। কিন্তু এখন, অজ্ঞতার সেই অন্ধকার ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করবে। মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্যগুলো উন্মোচিত হতে শুরু করবে। এর রুদ্ধ দ্বারগুলো একে একে খুলে যাবে। তিনি এখন আল্লাহর রাসূল। মুহাম্মদ, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সেই মুহূর্তটি একবার কল্পনা করে দেখুন, তিনি অত্যন্ত আতঙ্কিত ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। তিনি কেবল চেয়েছিলেন যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরে যেতে। তিনি হেরা গুহা থেকে বেরিয়ে এলেন। ভয়ে তাঁর বুক দুরুদুরু কাঁপছিল। তিনি পাহাড় থেকে দ্রুত নেমে সোজা সেই স্থানে যেতে শুরু করলেন যেখানে তিনি নিরাপদ বোধ করবেন। খাদিজার কাছে। তিনিই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি তাঁকে সত্যিই বুঝতে পারতেন। তাঁর সান্ত্বনার বাণী নবীজির খুব প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল তাঁর মমতাময়ী হৃদয়ের। অবশেষে তিনি বাড়ি পৌঁছালেন। তিনি ঘামে ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন এবং কথা বলার শক্তিটুকুও পাচ্ছিলেন না। তাঁর ঠোঁটে ছিল কেবল একটিই বাক্য। "আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও। আমাকে ঢেকে দাও।" তখন আমাদের মা খাদিজা (রা.) কী করলেন?

তিনি ঠিক তা-ই করলেন যা নবীজি চেয়েছিলেন। তিনি এমন কিছু করেননি যাতে আল্লাহর রাসূল আরও বিচলিত হন। তিনি তাঁকে শুয়ে পড়তে সাহায্য করলেন, চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন এবং ঠিক তাঁর পাশেই বসে রইলেন। এরপর নবীজি তাঁকে সব ঘটনা খুলে বলতে শুরু করলেন। "হে খাদিজা, আমি ভয় পাচ্ছি," তিনি বললেন। "আমি ভয় পাচ্ছি আমার বড় কোনো অনিষ্ট হতে পারে।" আমাদের মা আতঙ্কিত হয়ে কোন প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। তিনি নবীজির দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেননি। তাঁর কথাগুলো ছিল ঠিক তেমনই, যা নবীজির হৃদয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল। "কখনোই নয়। আল্লাহর কসম, আল্লাহ কখনোই আপনার কোনো ক্ষতি করবেন না।" সবকিছু শান্ত করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল। এরপর তিনি বললেন-- "আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখেন।" "আপনি গরিব আর অসহায়দের সাহায্য করেন।" "অতিথিদের উদারভাবে আপ্যায়ন করেন," "এবং বিপদগ্রস্ত ব্যাক্তিদের পাশে দাঁড়ান।" তাঁর প্রতিটি শব্দ নবীজিকে পরম শান্তি দিচ্ছিল। এজন্যই নবীজির সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল খাদিজা (রা.)। তো, এরপর কী হতে যাচ্ছিল?

এবার খাদিজা (রা.)-এর পালা প্রশ্ন করার এবং উত্তর খুঁজে বের করার। তিনি তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকার কাছে নিয়ে গেলেন আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লামকে। কিন্তু কে ছিলেন এই ওয়ারাকা?

ওয়ারাকা ইবনে নাওফাল ছিলেন একজন ধর্মীয় স্কলার। পূর্বের আসমানি কিতাবসমূহ সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। তিনি খ্রিস্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম এবং নবুয়ত সম্পর্কে জানতেন। একজন ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধ খ্রিস্টান পণ্ডিত। তিনি হয়তো তাঁদের সাহায্য করতে পারবেন। অবশেষে তাঁরা ওয়ারাকার বাড়িতে পৌঁছালেন। তাঁরা তাঁকে সবকিছু খুলে বলতে শুরু করলেন। ওয়ারাকা অবাক বিস্ময়ে উৎফুল্ল হয়ে উঠছিলেন। শুনতে শুনতে তাঁর বিস্ময় ক্রমশ বেড়েই চলছিল। দেখে মনে হচ্ছিল তাঁদের চোখের সামনেই তিনি যেন যুবক হয়ে উঠছেন। তিনি আল্লাহর এক পবিত্র নাম উচ্চস্বরে উচ্চারণ করে বললেন, "কুদ্দুস, কুদ্দুস!" পুরো ঘটনা শোনার পর এবার তিনি বলতে শুরু করলেন। "আপনি যে ফেরেশতাকে দেখেছেন তিনি 'রুহুল কুদ্দুস' (পবিত্র আত্মা)--" "যাঁকে আল্লাহ নবী মূসা (আ.)-এর কাছে পাঠিয়েছিলেন।" "তিনিই 'নামূস আল-আকবর' (মহা বার্তাবাহক জিবরাঈল)।" "এবং আপনিই এই উম্মতের নবী।" তিনি বলতে থাকলেন, কিন্তু এবারের কথাগুলো— আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। "আহা!

সেই দিনটির জন্যে আমি যদি বেঁচে থাকতাম এবং যুবক হতাম —" "যেদিন আপনার স্বজাতি আপনাকে নিজ দেশ থেকে বের করে দেবে।" বিস্মিত হয়ে নবীজি ﷺ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, "আমার নিজের লোকেরাই আমাকে বের করে দেবে?" তিনি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ ৪০ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত— তাঁর একজনও শত্রু ছিল না, ছিল না কারও সাথে কোনো বিবাদ। সবাই তাঁকে চিনত এবং মন থেকে বিশ্বাস করত। ওয়ারাকা বললেন, "আপনার মতো বার্তা নিয়ে যে-ই এসেছেন -" "তিনিই তাঁর নিজ জাতির বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।" "আর আমি যদি সেদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তবে আপনাকে সাহায্য করার জন্য সব কিছু করবো।" সে রাতটি এভাবেই কাটল। সব কথোপকথন শেষ করে তাঁরা বাড়ি ফিরলেন। পরদিন জিবরাঈল (আ.) পুনরায় আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সামনে আবির্ভূত হলেন। এবং তাঁকে মক্কার বাইরে 'আবু দুব' নামক এক উপত্যকায় নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনি তাঁর গোড়ালি দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন এবং স্বচ্ছ পানির ঝরনা বইতে শুরু করল। এরপর তিনি নবীজিকে ওযু করার নিয়ম শেখালেন। তার কিছুক্ষণ পর তিনি তাঁকে নামাজ পড়ার পদ্ধতি দেখালেন। আর সেই উপত্যকায় আল্লাহর রাসূল ﷺ - জীবনের প্রথম দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। প্রথম দিনে মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ সত্যটি শেখানো হয়েছিল: বিশ্বাস বা ঈমান। আর পরের দিন দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ সত্যটি শেখানো হলো: সালাত (নামাজ) জী হ্যাঁ, আসন্ন সব কঠিন পরিস্থিতির বিরুদ্ধে নামাজই আল্লাহর রাসূলের নিকট এক আধ্যাত্মিক ঢাল এবং অন্যতম প্রধান অবলম্বন। এখন যেহেতু নামাজ তাঁর জীবনেরই একটা অংশ হয়ে গেছে - যার ফলে, নবুয়তের এই গুরু দায়িত্বভার আরও দ্বিগুণ শক্তির সাথে বহন করতে পারবেন। বাড়ি ফেরার পর নামাজের এই নির্দেশটি তিনি প্রথম যার সাথে শেয়ার করলেন— তিঁনি ছিলেন আমাদের মা খাদিজা (রা.)। নবীজি নামাজের ইমামতি করলেন আর মা খাদিজা জামাতের সাথে তাঁর পেছনে নামাজ আদায় করলেন। তিনি শ্রেষ্ঠ সম্মানের এই প্রথম স্থানটি অন্য কাউকে নিতে দেননি। এরপর তাঁদের সন্তানরাও নামাজে যোগ দিলেন। একসাথে তাঁরা তাঁদের একমাত্র রবের সামনে নামাজে দাঁড়ালেন— তাঁরই উদ্দেশ্যে রুকু এবং সিজদাহ করলেন। তাঁরা তাঁদের হৃদয়কে পরম প্রশান্ত এবং আত্মাকে পুনর্জীবিত করছিলেন। তাঁরা আল্লাহর দেওয়া অগণিত নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করছিলেন। আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল যে - পুরো মক্কার মধ্যে এটিই সবচেয়ে সুন্দর আর প্রশান্তিময় ঘর। যখন উনারা নামাজ আদায় করছিলেন, একটি শিশু পেছন থেকে নিঃশব্দে তাঁদের লক্ষ্য করছিল। তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। আর তাঁর নাম ছিল আলী। তিনি ছিলেন নবীজি ﷺ-এর চাচা আবু তালিবের পুত্র। তিনি যা দেখছিলেন তা তাঁর কাছে অপরিচিত মনে হলেও ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। নামাজ শেষ হওয়ার পর তিনি আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, " কি করছিলেন এটা?" তখন নবীজি (সা.) তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আলী তৎক্ষণাৎ এই আহ্বান গ্রহণ করেননি। তিনি প্রথমে তাঁর বাবার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অনেক চিন্তাভাবনার পর তিনি ভাবলেন, "আল্লাহ যখন আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তখন তো তিনি বাবা আবু তালিবের অনুমতি নেননি।" "তবে আল্লাহর ইবাদত করতে কেন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতে যাবো?" আর এই উপলব্ধি থেকেই তিনি নবীজি ﷺ-এর কাছে ফিরে এলেন এবং ঈমান ঘোষণা করলেন। এভাবেই আলী হলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম শিশু। প্রথম দিকে আল্লাহর রাসূল ﷺ প্রকাশ্যে তাঁর নবুয়তের ঘোষণা দেননি। তিনি সবাইকে দাওয়াত দিচ্ছিলেন না দিয়ে কেবল অল্প কিছু মানুষকেই জানাচ্ছিলেন। তিনি এটি গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু বিভিন্নভাবে এই খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো, এবং কুরাইশ নেতাদের কানে গিয়ে পৌঁছাল। সময় এসেছিল 'ইল্লিয়্যিন' (সর্বোচ্চ স্তরের মানুষ) এবং 'আসফালা সাফিলিন' (সর্বনিম্ন স্তরের মানুষ)-দের আলাদা হওয়ার। অন্যভাবে বলতে গেলে—উৎকৃষ্টের সাথে নিকৃষ্টের পার্থক্য করার সময়। আবু বকর এবং আবু লাহাবের হৃদয়ের আসল প্রকৃতি ও সম্ভাবনা— শীঘ্রই তা পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পালা। সেই সময় আবু বকর ইয়েমেনের এক ব্যবসায়িক সফর থেকে সবেমাত্র ফিরেছেন। তিনি ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তি। একজন সফল ব্যবসায়ী এবং 'হানিফ' (একত্ববাদী) পন্থীদের একজন। তিনি বহু বছর ধরে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, এবং বয়সে তাঁর চেয়ে মাত্র দুই বছরের ছোট ছিলেন। আবু জাহেল এবং কুরাইশদের কয়েকজন নেতা তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন। আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন: "আমি না থাকা অবস্থায় মক্কায় কী ঘটেছে?" "গুরুত্বপূর্ণ কোনো খবর কি আছে?" "এক বিরাট ব্যাপার ঘটেছে।" "আবু তালিবের ইয়াতিম ভাইপো মুহাম্মদ ﷺ নিজেকে নবী দাবি করেছেন।" "আমরা ভেবেছিলাম ইয়েমেন থেকে আপনি ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো হবে।" "এখন, আপনার বন্ধুর কাছে যান এবং যা করা দরকার তা করুন।" তারা ভেবেছিল আবু বকর হয়তো নবীজিকে এই পথ থেকে সরিয়ে আনতে পারবেন। কিন্তু আবু বকরের হৃদয়ে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর মানসিক অবস্থায় এক পরিবর্তন এসেছিল। আর তিনি যা শুনলেন, তা যেন তাঁর ভাবনাগুলোকেই সত্য প্রমাণ করল। স্বপ্ন বিশারদরা তাঁকে যা বলেছিলেন, তিনি এখন তার গভীর অর্থ বুঝতে পারলেন। তাঁর স্বপ্ন অনুযায়ী, মক্কায় একজন নবীর আগমন ঘটবে। আর তিনি তাঁকে অনুসরণ করবেন। এখন সবকিছু যেন মিলে গেল। তিনি কুরাইশ নেতাদের কথাগুলো নিয়ে ভাবলেন। তিনি বহু বছর ধরে আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে চিনতেন। তাঁরা ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি তাঁকে পূর্ণ বিশ্বাস করতেন এবং নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি কখনোই মিথ্যা বলতে পারেন না। তাঁর মুখ দিয়ে কোনোদিন একটিও অসত্য শব্দ বের হয়নি। সবকিছুর ঊর্ধ্বে, তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তাঁর হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি গভীর ভয় ছিল। তাঁর ছিল এক স্বচ্ছ বিচারবুদ্ধি। আর তিনি কখনোই অবিবেচনাপ্রসূত, অর্থহীন বা ক্ষতিকর কিছু করবেন না। আবু বকর তাঁর আগন্তুকদের সামনে নিজের আবেগ প্রকাশ করলেন না। কিন্তু তিনি রোমাঞ্চিত ছিলেন। তাঁরা চলে যাওয়ার পরপরই তিনি নবীজি ﷺ-এর বাড়ির দিকে ছুটলেন। আসলে কী ঘটছে তা জানার জন্য তিনি অত্যন্ত কৌতূহলী ছিলেন। "হে আবুল কাসিম (কাসিমের পিতা), এ কি সত্য যে আপনি নবুয়ত দাবি করেছেন?" "আপনি কি নিজেকে স্বজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছেন—" "এবং আপনার পূর্বপুরুষদের ধর্মকে অস্বীকার ও নিন্দা করেছেন?" নবীজি (সা.) জানতেন যে— তাঁর এই অনুগত বন্ধু কখনোই সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না। তাই তিনি তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। বহু বছর পর নবীজি ﷺ সেই মুহূর্তটির বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবে: "যাকেই আমি ঈমানের দাওয়াত দিয়েছি, প্রথমে তার মনে কিছুটা দ্বিধা ছিল।" "কিন্তু আবু বকর কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন।" আবু বকর একদম শুরু থেকেই বিশ্বাস করেছিলেন— এবং তিনি ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তিদের একজন। আর বাকি জীবন তিনি কখনোই নবীজি ﷺ-কে একা ফেলে যাননি— কিংবা এই আদর্শকে ত্যাগ করেননি। আবু বকরের ইসলাম গ্রহণ এক শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল। দিনের পর দিন মুসলমানদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল। কারণ তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। পরদিন থেকেই তিনি তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধুদের কাছে ইসলামের কথা বলতে শুরু করলেন। ইসলামী ইতিহাসে যেসব নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে— তাঁদের অনেকেই আবু বকরের প্রচেষ্টায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উসমান ইবনে আফফান, তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ, জুবায়ের ইবনুল আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং উসমান ইবনে মাজউন। এমন আরও অনেক প্রখ্যাত সাহাবী তাঁর মাধ্যমেই ঈমান এনেছিলেন। একই সময়ে মহিলারাও ইসলাম প্রচারের প্রচেষ্টা শুরু করেন। নবী পত্নী খাদিজা, তাঁর কন্যা জয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা, তাঁর চাচা আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল ফজল, ওমরের বোন ফাতিমা, এবং আবু বকরের কন্যা আসমা। তাঁদের প্রত্যেকেই সেই সত্যের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন যা তাঁদের আত্মাকে জাগিয়ে দিয়েছিল। মহিলারা ভাবছিলেন কীভাবে অন্য মহিলাদের কাছে ঈমানের এই দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া যায়, আর পুরুষরা ভাবছিলেন অন্য পুরুষদের কথা। তাঁরা তাঁদের আত্মার সমস্ত ক্ষতের একমাত্র প্রতিকার খুঁজে পেয়েছিলেন: ঈমান। তাঁরা স্থির থাকেন কী করে?

তাঁরা স্বার্থপর হতে পারতেন না। তাঁদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ ছিল যাদের এটি প্রয়োজন— অথচ তারা তখনও তা উপলব্ধি করতে পারেনি। এই নূর বা আলো তাঁদের প্রত্যেকের কাছে পৌঁছাতে হতো। কিন্তু তাঁরা যে পথে পা বাড়িয়েছিলেন তা যতটা সহজ মনে হচ্ছিল আসলে তা ছিল না। এর অর্থ ছিল পুরো মক্কা শহরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আর এর জন্য যে মূল্য দিতে হবে তা মোটেও সস্তা ছিল না। এই বিশ্বাস বা ঈমানকে গ্রহণ করার জন্য অনেক সাহসের প্রয়োজন ছিল। নিজেদের ভয়াবহ সব কুপ্রথা নিয়ে, জাহিলিয়াতের নেতারা এই পরিবর্তন মোটেও পছন্দ করত না, এবং তারা এর তীব্র বিরোধিতা করত। মুসলমানদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছিল অত্যন্ত কঠিন এবং যন্ত্রণাদায়ক সব দিন। সময় এসেছিল এটা প্রমাণ করার—কার আত্মা হীরা আর কার আত্মা কয়লার মতো। "আমি শুধু চাই তুমি মুহাম্মদ ﷺ-কে অস্বীকার করো এবং এই মূর্তির পূজা করো।" "মুহাম্মদ ﷺ-কে যারা অনুসরণ করবে, তাদের কপালে এটাই ঘটবে!" "এটাকে সতর্কবার্তা হিসেবে মনে রেখো!" পরবর্তী পর্বে আপনারা দেখবেন মুসলমানদের কত কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, এবং ইসলাম আজ যে অবস্থায় পৌঁছেছে তা কতটা ত্যাগ আর তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত। আমাদের নবীজি (সা.)-এর জীবন ছিল— মানব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সন্ধিক্ষণ। এমনকি আজও, যারা খোলা মনে তাঁর কথা শোনে এবং এর শিক্ষা নিয়ে ভাবেন— তাঁদের জন্য এটি এক নতুন শুরুর অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে। ইনশাআল্লাহ, যখন আপনি ১১ পর্বের এই সিরিজটি শেষ করবেন, তখন সিরিজটি দেখার আগের 'আপনি' আর পরের 'আপনি'র মধ্যে— এক স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করবেন। আপনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করবেন। আর আপনার বন্ধুদের সাথে এই ভিডিওটি শেয়ার করতে ভুলবেন না। যতবার তারা এটি দেখবে, ইনশাআল্লাহ আপনিও সেই সওয়াবের একটি অংশ পাবেন। দেখা হবে আগামী পর্বে।
