# মুসা (আঃ) - কুরআন বনাম বাইবেল - কোন গ্রন্থে রয়েছে সবচেয়ে নিখুঁত বর্ণনা? ~ টোয়ার্ডস ইটার্নিটি 

- Language: bn
- Published: 2026-08-26
- Canonical: https://blog.towardseternity.com/bn/blog/moses-in-islam-vs-christianity-shocking-discoveries-reveal-the-truth
- Source video: https://www.youtube.com/watch?v=Vhqz7KA5mI0
- Channel: Towards Eternity

This is the cleaned transcript of the source video. The speech is unaltered.

---

এক সকালে দুঃস্বপ্নের মতো বাস্তবতায় ঘুম ভাঙল মিসরের মানুষের। একটির পর একটি ঘর থেকে ভেসে আসছিল চিৎকার। সেনারা দরজা ভেঙে ঢুকছিল, আর মায়েদের কোলে থাকা শিশুদের জোর করে কেড়ে নিচ্ছিল। ‘দয়া করে ওকে ধরবেন না! ওর বয়স মাত্র এক দিন!’ মায়েরা কাকুতি-মিনতি করছিল আর কাঁদছিল, কিন্তু কেউ শুনছিল না। বাবারা ছিল অসহায়, আর ভাইয়েরা আতঙ্কিত। এক গণহত্যা চলেছিল সেদিন, যার আদেশ দিয়েছিল ফেরাউন। নিপীড়িত ঈমানদার জাতির ছেলে সন্তান ছিল তারা। তখনো যাদের নামও রাখা হয়নি। সেসময় এক মা কোলে নিজের শিশুকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, কাঁপছিলেন। আতঙ্কে দিশেহারা তিনি, এবার বোধহয় তার পালা। কিন্তু আল্লাহ সেই শিশুকে এই গণহত্যা থেকে রক্ষা করেন সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত উপায়ে এবং বদলে দেন মিসরের ভবিষ্যৎ। তো ঠিক কী কারণে ফেরাউন এই নিষ্ঠুর আদেশ দিল?

কেন সে এসব শিশুকে এত ভয় পাচ্ছিল, যারা তখনো হাঁটতেও জানত না?

এক দুঃস্বপ্ন। সে ভেবেছিল তার ষড়যন্ত্র নিখুঁত, কিন্তু আল্লাহর ছিল নিজস্ব পরিকল্পনা, যা কেউ কল্পনাও করেনি। আর এখান থেকেই শুরু মুসা (আ.) এবং ফেরাউনের সংঘাত। ইতিহাসের পাতার এক অন্যতম মহাকাব্যিক অধ্যায় এটি। এমন এক নবীর গল্প, যিনি পৃথিবীর অর্ধেকের চেয়ে বেশি মানুষের কাছে সমাদৃত। কিন্তু ইসলামে তার গল্প অন্য ধর্মের বর্ণনাসমূহের থেকে আলাদা। আজ আমরা তার জীবনের ঘটনাগুলো দেখব কুরআন ও বাইবেলের আলোকে এবং মিল-অমিলসমূহ তুলনা করব। আমরা আরো দেখব, কোন বর্ণনা ইতিহাসের নথির সঙ্গে বেশি মিলে। মুসা (আ.)-এর জীবনী, যিনি অনেকের কাছে মোজেয নামেও পরিচিত, তার অলৌকিক ঘটনাসমূহ, প্রাসাদে কাটানো বছরগুলো, যাদুকরদের সঙ্গে তার প্রতিযোগিতা, ফেরাউনের নৃশংস নির্যাতনের শাসনব্যবস্থা ও তার চূড়ান্ত পতন। আপনি প্রস্তুত থাকলে শুরু করা যাক। জেরুজালেম থেকে আসা এক বিশাল দাবানল ঘিরে ফেলল মিসরকে, ঘরবাড়ি ও মানুষ পুড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ইসরায়েলিদের কোন ক্ষতি হচ্ছিল না। সেখানেও আগুন ছিল, কিন্তু তারা জ্বলছিল না। ফেরাউন আতঙ্কে জেগে উঠলো, তার ঘাম বের হচ্ছিল, হাঁপাচ্ছিল। এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। সে সঙ্গে সঙ্গে আদেশ দিল, ‘দ্রুত স্বপ্নবিশারদদের ডেকে নিয়ে আসো!’ সে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই স্বপ্নের অর্থ জানতে চাইছিল। স্বপ্নবিশারদরা আসার পর তাকে জানালো, ‘বনি ইসরাইলের মধ্যে একটি শিশু জন্ম নেবে, আর সে-ই ফেরাউনের শাসনের ইতি টানবে।’ সে মনস্থির করে ফেলেছে, সেই শিশুকে হত্যা করতে হবে। তাই বনি ইসরাইলরা পরদিন সকালে এক গণহত্যার সম্মুখীন হয়। গল্পের এই অংশটি ইসলামী সূত্রে এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্টে বলা হয়েছে, গণহত্যার কারণ ছিল ফেরাউনের আশঙ্কা, একদিন বনি ইসরাইলিরা রুখে দাঁড়াবে এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। ফেরাউন ছিল এক আত্মকেন্দ্রিক, উদ্ধত ও নিষ্ঠুর শাসক, যে নিজেকেই ঈশ্বর দাবি করত। নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য সে যেকোনো কিছুই করতে পারত। সে বিশ্বাস করত, ছেলেশিশুদের হত্যা করলে তার সাম্রাজ্য নিরাপদ থাকবে। কিন্তু সে জানত না, প্রতিটি ফাঁদের জবাবেই আল্লাহর নিজস্ব পরিকল্পনা থাকে। ফেরাউন যে শিশুকে মরিয়া হয়ে খুঁজছিল, আল্লাহ তাকেই পৌঁছে দিলেন তার প্রাসাদে। তার নিজের হাতেই লালন-পালন করার জন্য। মানুষ যতই বুদ্ধিমান হোক না কেন, যখন আল্লাহ তার অন্তর্দৃষ্টি কেড়ে নেন, সে চোখের সামনে যা থাকে, তা-ও দেখতে পারে না। কিন্তু তা ঠিক কিভাবে ঘটতে যাচ্ছে?

মুসা (আ.)-এর মা ইউহানিব আতঙ্কে প্রার্থনা করছিলেন, তিনি জানতেন না কী করবেন। আর আল্লাহ তার সাহায্যে এগিয়ে এলেন পবিত্র অনুপ্রেরণার মাধ্যমে। আর আমি মূসার মায়ের প্রতি নির্দেশ পাঠালাম, ‘তুমি তাকে দুধ পান করাও। অতঃপর যখন তুমি তার ব্যাপারে আশঙ্কা করবে, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করবে। আর তুমি ভয় করবে না এবং চিন্তা করবে না। নিশ্চয় আমি তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত করব’। একবার ভেবে দেখুন, আপনি কি নিজের সন্তানকে ঝুড়িতে রেখে নদীতে ভাসিয়ে দিতে পারবেন?

আপেক্ষিক দৃষ্টিতে এটি ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আল্লাহর দেওয়া সুসংবাদ তার অন্তরে প্রশান্তি এনে দিয়েছিল। তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করলেন এবং শিশুটিকে ঝুড়ির ভেতর রেখে নদীতে ছেড়ে দিলেন। তিনি তার কন্যা মরিয়মকেও পাঠালেন, দূর থেকে অনুসরণ করতে। আর সেই সত্ত্বা, যিনি প্রতিটি ঢেউয়ের গতিপথ নির্ধারন করেন, শিশুটিকে নদীর বুকে করে পৌঁছে দিলেন ফেরাউনের রাজপ্রাসাদে। আর যিনি তাকে খুঁজে পেলেন, তিনি আর কেউ নন - ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া। আসিয়ার কোনো দিন সন্তান হয়নি। যখন তিনি ঝুড়ির ভেতর সুন্দর একটি শিশুকে দেখলেন, তার হৃদয় এমনভাবে ধকধক করতে শুরু করল, যা আগে কখনো হয়নি। আর ফির‘আউনের স্ত্রী বলল, ‘এ শিশুটি আমার ও তোমার চক্ষু শীতলকারী হবে, তাকে হত্যা করো না। আশা করা যায়, হয়তো সে আমাদের জন্যে কল্যাণকর অথবা আমরা তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি’। তারা জানতই না সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে ওল্ড টেস্টামেন্টের বুক অফ এক্সোডাস অনুযায়ী, শিশুটিকে ফেরাউনের স্ত্রী খুঁজে পায়নি, পেয়েছিল তার মেয়ে। অতএব, ফেরাউন শিশুটিকে রাখার অনুমতি দিল। কিন্তু একটি সমস্যাও দেখা দিল। শিশুটি কাঁদছিল, তার খাবারের প্রয়োজন ছিল। যত মহিলাই আনা হলো, সে কারো কাছ থেকে দুধ পান করল না। অবশেষে তার বোন, যে গোপনে সব দেখছিল, এসে বলল, ‘আমি কি তোমাদের এমন এক পরিবারের খোঁজ দেব, যারা ওর যত্ন নেবে?’ তারপর তারা তাকে অনুসরণ করল এবং মুসা (আ.)-এর মায়ের কাছেই পৌঁছাল। এরপর তিনি আবার নিজের শিশুকে দুধ খাওয়ালেন। তিনি তার ছেলের সঙ্গে পুনর্মিলিত হলেন। কেউই সেই মহিলার আসল পরিচয় জানত না। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ সময় তার সন্তানের সঙ্গে থাকতে পারলেন। আল্লাহ তার কাছে করা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন। এরপর সময় হলো আল্লাহর আরেক প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার। ‘...

এবং আমি তাকে রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত করব।’ এখন আমরা বহু বছর পরের অধ্যায়ে চলে যাই, যখন শুরু হলো ফেরাউনের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম। অনেক বছর কেটে গেল। প্রাসাদে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন। কিন্তু তিনি কখনো বাইরের দুনিয়া থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। তিনি দেখতেন, প্রাসাদের দেয়ালের বাইরে মানুষের কী অবস্থা চলছে। প্রাসাদের ভিতর তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলেন। সামরিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে মানুষকে পরিচালনা, সোশ্যাল স্কিলস থেকে পার্সোনাল এথিকস - নানা ক্ষেত্রে তিনি শিক্ষা পেয়েছিলেন এবং দক্ষতা ও চারিত্রিক হয়েছিলেন। বিবেকের কারণে চারপাশের হাজারো খারাপ উদাহরণও তার কাছে শিক্ষায় পরিণত হয়েছিল। দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশে বেড়ে উঠেও তিনি পাপ থেকে দূরে ছিলেন। কখনো কখনো তিনি প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যেতেন এবং দেখতেন, তার জাতি— ইসরাইলিরা কেমন অন্যায়ের শিকার হচ্ছে। তিনি নিজের চোখে নির্যাতন প্রত্যক্ষ করতেন। এই অভিজ্ঞতাগুলোই চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছিল। হঠাৎ একদিন এক ভয়াবহ ঘটনা তাকে মিসর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করল। অল্পের জন্যে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। টানা আট দিন তিনি মরুভূমি আর অনুর্বর জমি পাড়ি দিলেন কোনো খাবার ছাড়াই। অবশেষে তিনি মাদিয়ানের ভূমিতে পৌঁছান এবং সেখানে আট থেক নয় বছর অবস্থান করেন ইসলামী সূত্র অনুযায়ী, তিনি নবী শুয়াইব (আ.)-এর সাথে বসবাস করেছিলেন এবং তার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী, তিনি যেত্রো নামের এক যাজকের সাথে ছিলেন। উভয় বর্ণনাতেই দেখা যায়, তিনি ক্রমাগত শিক্ষা ও বিকাশ লাভ করছিলেন। এবার আসা যাক ফেরাউনের সঙ্গে তার ইউনিক সংঘাতের সূচনায়, যখন তিনি প্রথম ওহি পেলেন, আর যখন তিনি প্রথমবার এই অত্যাচারী শাসকের মুখোমুখি হলেন। আমরা এখন সেই রাতে, যখন নবী মুসা (আ.)-এর জীবন পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। প্রচণ্ড অন্ধকার, ঠাণ্ডা এবং নিস্তব্দ একটি রাত। মুসা (আ.) তার পরিবারসহ মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছিলেন, কিন্তু তারা জানতেন না তারা কোথায় যাচ্ছেন। তারা ঠাণ্ডায় কাঁপছিলেন এবং অন্ধকারে সংশয় নিয়ে হাঁটছিলেন। হঠাৎ তিনি এমন কিছু দেখলেন, যা তার চোখ ধাঁধিয়ে দিল— দূরে একটি জ্বলন্ত গাছ। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আগুন গাছটিকে পোড়াচ্ছিল না। না বাতাস সেটিকে নিভিয়ে দিতে পারছিল, না ধোঁয়া আকাশে উঠছিল। তার ভেতরে এক অদ্ভুত আকর্ষণ জাগতে শুরু করল, এবং তিনি অনুভব করলেন, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। তার পরই সেই শব্দ শোনা গেল— ‘হে মূসা, নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, সৃষ্টিকুলের রব’। কুরআন বাইবেল উভয় যায়গায়ই বলা হয়েছে, মুসা (আ.) তার দাওয়াতি দায়িত্ব লাভ করেছিলেন এক রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডের সময়— যা ওল্ড টেস্টামেন্টে ঝোপের মধ্যে, আর কুরআনে একটি গাছে দেখা গিয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। "আমি তোমার পিতার প্রভু, আব্রাহামের প্রভু, আইজ্যাকের প্রভু, এবং জ্যাকবের প্রভু..." এবং তাকে বলা হলো, ‘তোমার লাঠি মাটিতে ছুড়ে দাও।" কিন্তু যখন তিনি দেখলেন, সেটি সাপের মতো নড়ছে, তিনি পেছনে না তাকিয়েই পালালেন। আল্লাহ্‌ বললেন, ‘হে মূসা, সামনে এগিয়ে আসো এবং ভয় পেয়ো না, নিশ্চয় তুমি নিরাপদদের অন্তর্ভুক্ত’। তিনি যখন সাপটিকে তুললেন, তা আবার লাঠিতে পরিণত হলো। এবার তাকে হাত তার বগলের নিচে রাখতে বলা হলো। তিনি যখন হাত বের করলেন, তা উজ্জ্বল সাদা আলোতে ঝলমল করছিল। এগুলো সেই দুই শ্রেষ্ঠ মু'জিযা, যা তিনি ফেরাউনের সামনে দেখাবেন। তবে দুই গ্রন্থের ভিতরে এই মু'জিযাগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে একটি বিরাট মতপার্থক্য ছিল। কুরআনের মতে, প্রত্যেক নবীর ন্যায়ই মুসা (আ.)-এর দায়িত্ব ছিল এক বিভ্রান্ত জাতিকে ঈমানের দিকে আহ্বান করা এবং জালিমদের সংশোধনের চেষ্টা করা। তাই এসব মুজিজা দেয়া হয়েছিল, যাতে তারা ঈমান আনে। কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্টে এই মু'জিযাগুলোর উদ্দেশ্য ভিন্ন ছিল। এসবের উদ্দেশ্য ছিল কেবল ইসরাইলি শিশুদের মিসর ছাড়তে রাজি করানো। কেউ আসলেই ঈমান আনল কি না, তা মূল বিষয় নয়। নবী মুসা (আ.)-এর সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছিল। একবার কল্পনা করে দেখুন, আপনি দাঁড়াতে যাচ্ছেন এমন এক শাসকের সামনে, যে নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করে। আর আপনি তাকে বলবেন, সে আল্লাহর একজন গোলাম মাত্র, অন্য সকলের মতো এবং তাকে রবের সামনে সেজদা করতে হবে। তিনি এমন এক জালিমের মুখোমুখি হবেন, যার প্রতিটি আদেশই ছিল আইন, যে ইচ্ছা করলেই কাউকে হত্যা করতে পারত। তার ওপর তিনি নিয়ে যেতে যাচ্ছেন সেই মানুষদের, যাদের ফেরাউন বহু বছর ধরে দাসত্বে আবধ্য করে রেখেছিল। তিনি তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করবেন। তো, এই পবিত্র দায়িত্বের প্রতি নবী মূসা (আ.) কিভাবে সাড়া দিলেন?

কুরআনে তার দোয়া রয়েছে— ‘আমার রব, আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন, আর আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে’। আর আমার পরিবার থেকে আমার জন্য একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন। আমার ভাই হারূনকে। তার দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন এবং তাকে আমার কাজে শরীক করুন’। আর আল্লাহ তার দোয়ার জবাব দিলেন, ‘হে মূসা, তুমি যা চেয়েছ তা তোমাকে দেয়া হল’। তিনি আর একা রইলেন না। তার জিহ্বার জড়তা দূর করা হলো, এবং তার ভাই হারুন (আ.)-কেও নবুয়ত দান করা হলো। অবশ্যই, এমন এক মিশন কেউ একা নিতে চাইবে না। তো ওল্ড টেস্টামেন্ট অনুযায়ী নবী মুসা (আ.) এই দায়িত্বে কিভাবে সাড়া দেন?

মুসা (আ.) স্রষ্টাকে বললেন, ‘প্রভু, আপনার বান্দাকে ক্ষমা করুন। আমি কখনো সাবলীল ছিলাম না, না অতীতে, না তখন থেকে, যেদিন থেকে আপনি আপনার বান্দার সাথে কথা বলছেন। আমার কথা বলার ধারা ও জিহ্বা ধীর।’ অন্য এক জায়গায় এই বর্ণনাও পাওয়া যায়— ‘কিন্তু মুসা বললেন, প্রভু, আপনার বান্দাকে ক্ষমা করুন। দয়া করে অন্য কাউকে পাঠান।’ আল্লাহ তখন তাকে জানালেন, হারুনকে (আ.)-কে তার সাহায্যকারী করা হবে, যিনি তার পাশে দাঁড়াবেন এবং তাকে সাহায্য করবেন। এভাবেই তার মিশন শুরু হলো। ওল্ড টেস্টামেন্টে আরেকটি বিষয় আছে, যা সব সময় প্রশ্ন তোলে। কাহিনির পরের অংশে, মিসর ছাড়ার আগে, মুসা (আ.) ও তার জাতিকে এক অদ্ভুত নির্দেশ দেওয়া হলো। ‘প্রত্যেক নারী তার প্রতিবেশী এবং আশপাশের বাকি নারীদের কাছ থেকে প্রচুর রূপা-সোনা এবং পোশাক চাইবে, যা তোমরা তোমাদের পুত্র-কন্যাদের পরিধান করাবে। এভাবে তোমরা মিসরীয়দের সম্পদ লুট করে নিয়ে যাবে।" কিন্তু এক মিনিট— আল্লাহ কি সত্যিই চুরির নির্দেশ দিতে পারেন?

যদি একজন নবী পাঠানোর মূল কারণই হয় ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, তাহলে প্রথম নির্দেশেই এমন কিছু কিভাবে থাকতে পারে? অবশ্যই, এটা এমন এক বিষয়, যা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। আগানো যাক। মুসা (আ.)-এর ফেরাউনের সাথে সাক্ষাতে যাওয়ার আগে আমি দুটি কিতাবের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যের কথা আলোচনা করতে চাই, তা হলো ‘ফেরাউন’ শব্দের ব্যবহার। এই শব্দের আদি অর্থ ছিল ‘প্রাসাদ’। এটি শাসকদের উপাধি হিসেবে ব্যবহার হতে শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতাব্দীর পর থেকে, অষ্টাদশ রাজবংশের সময়ে, যে সময়কালে নবী মুসা (আ.) - জীবিত ছিলেন। কিন্তু তার কয়েক শতাব্দী আগেও মিসরে আরেকজন নবীর বসবাস ছিল। মনে আছে?

জী, নবী ইউসুফ (আ.), যিনি আরেকটি নামে পরিচিত, জোসেফ মজার ব্যাপার হলো, তার সময়ের শাসককে উল্লেখ করতে ওল্ড টেস্টামেন্টে ‘ফেরাউন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু কুরআন উল্লেখ করেছে ‘আল-মালিক’, অর্থাৎ ‘রাজা’। কিন্তু ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ইউসুফ (আ.)-এর সময়ে শাসকদের জন্য তখনো ‘ফেরাউন’ উপাধি ব্যবহার শুরু হয়নি। কখনো কখনো একটি শব্দের নির্বাচনই আপনার জ্ঞানের গভীরতা স্পষ্ট করে দেয়। যাই হোক, আগানো যাক। আরেকটি গুরুত্বপূর্ন তথ্য— ওল্ড টেস্টামেন্টে, যখন মুসা (আ.) তার পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করছিলেন, সেখানে লেখা আছে, ‘পথে এক বিশ্রামস্থলে, মুসার সাথে প্রভু সাক্ষাৎ করলেন এবং তাকে প্রায় হত্যা করতে যাচ্ছিলেন।’ কিন্তু কুরআন অনুসারে, মুসা (আ.) তখনই নবুয়ত পেয়েছিলেন। তিনি এখন আল্লাহর সমর্থন, সাহায্য ও উৎসাহপ্রাপ্ত একজন রাসূল। আর কুরআনে এ ধরনের কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। অবশেষে দরজাগুলো খুলে গেল। ভাই হারুনকে পাশে নিয়ে নবী মুসা (আ.) প্রবেশ করলেন ফেরাউনের প্রাসাদে। তিনি বহু বছর মিসরের বাইরে ছিলেন। এবং তখন ঘরের প্রতিটি চোখ ছিল তার দিকেই নিবদ্ধ। মুসা (আ.) বললেন, ‘হে ফির‘আউন, আমি সকল সৃষ্টির রবের পক্ষ থেকে রাসূল।’ সমীচীন যে, আমি আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া বলব না। আমি তোমাদের রবের নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। সুতরাং তুমি বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।’ এরপর মুসা ও হারুন (আ.) ফেরাউনের কাছে গিয়ে বললেন, ‘ইসরাইলের উপাস্য প্রভু এটাই বলেছেন: আমার কওমকে মুক্ত করো, যাতে তারা মরুভূমিতে আমার উদ্দেশ্যে উৎসব করতে পারে।’ ফেরাউন বলল, ‘কে এই প্রভু , যার আদেশ আমি মানব আর ইসরাইলকে যেতে দেব?

আমি এ প্রভুকে চিনি না, আর আমি ইসরাইলকে যেতে দেব না।’ কুরআনে আল্লাহর পরিচয় এসেছে এভাবে— ‘সমস্ত জগতের রব’ এবং ‘তোমার রব’, যা সবার অন্তর্ভুক্ত। এগুলো সার্বজনীন নাম। কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্টে ব্যবহৃত হয়েছে ‘ইসরাইলের প্রভু’, যা কেবল এক জাতির জন্য সীমাবদ্ধ মনে হয়। যখন ফেরাউন মুসা (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার রব কে?’ তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী উত্তর দিলেন। কুরআনে বর্ণিত উত্তরগুলো ছিল সরাসরি, যা ছিল মিসরের মিথ্যা উপাসনাব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক জোরালো চ্যালেঞ্জ। তারপর তার বার্তা প্রমাণ করার মুহূর্ত এলো। তিনি তার লাঠি মাটিতে ছুঁড়ে দিলেন, আর সঙ্গে সঙ্গেই তা এক বিশাল সাপে পরিণত হলো। রাজপ্রাসাদের লোকজন ভয়ে থমকে গেল, তাদের চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। তারপর তিনি তার হাত জামার ভেতরে ঢোকালেন, আর যখন বের করলেন, তখন তা ঝলমল করছিল, বিশুদ্ধ সাদা, দীপ্তিময় আলোর মতো। ওই যুগে জাদুবিদ্যা মানুষদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষন করতো। তাই তারা যখন এমন মুজিজা দেখল, সবাই অভিভূত হয়ে গেল। কিন্তু ফেরাউনের ছিল অসম্ভবরকম তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, আর ছিল প্রবল ম্যানিপুলেট করার ক্ষমতা। সে খুব ভালোভাবেই জানত কিভাবে ভিড়কে প্রভাবিত করতে হয়। তাই সে নানা কথা ছুঁড়ে দিতে শুরু করল, মানুষের মনোযোগ ঘোরাতে, দৃষ্টি সরাতে। "আমরা তোমাকে শৈশবে আমাদের মাঝে লালন পালন করেছি আর তুমি এখন অকৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত।" এরপর হঠাৎ প্রসঙ্গহীনভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কী’?

সে জাতিগত অহংকার উসকে দিতে চাইছিল। সে জানত, মানুষ এত সহজে মেনে নেবে না যে তাদের পূর্বপুরুষরা ভুল করতে পারে। কিন্তু মূসা (আ.) তৎক্ষণাৎ বিষয়টা বুঝে গেলেন। তিনি উত্তর দিলেন, ‘তাদের জ্ঞান আমার রবের কাছে, সবই এক কিতাবে লিখে রাখা আছে। আমার রব কখনো ভুল করেন না, ভুলে যান না।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রসঙ্গটা শেষ করে দিলেন। কিন্তু ফেরাউন থামল না। সে মূসা (আ.)-কে পাগল বলে উপহাস করল। সে মুজিজাগুলো দেখে বলল, ‘এ তো এক বিজ্ঞ যাদুকর। এবং ভিড়কে ভুল পথে চালিত করার চেষ্টা করছে। তারপর সে তার পরিষদের দিকে ফিরল এবং তাদের উসকে দিতে লাগল। ‘সে তোমাদেরকে তার যাদুর মাধ্যমে তোমাদেরই দেশ থেকে বের করে দিতে চায়। তোমরাই বলো, আমাদের কী করা উচিত?’ কিন্তু আসল সত্য হলো, মূসা (আ.) শুধু চেয়েছিলেন বনি ইসরাইলকে মিসর থেকে বের করে নিতে। তিনি কখনো মিসরীয়দের তাদের দেশ থেকে উৎখাত করতে চাননি। কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্টে মূসা (আ.)-এর কোনো মুজিজা বা এই প্রথম সাক্ষাতে ফিরআউনের ধোঁকাবাজির উল্লেখ নেই। তবে এতে তার একটি চালাকি বর্ণনা করা হয়েছে, যেটি হলো বনি ইসরাইলের ওপর কাজের চাপ আরো বাড়িয়ে দেওয়া। আর যদি তারা সামলাতে না পারত, তাহলে তাদের নির্যাতন করা হতো। তার পরিকল্পনা ছিল, তাদের বোঝানো যে মূসা (আ.) শুধু তাদের জীবনে আরো বিপদ ডেকে এনেছে। ফেরাউনের কথা ছিল জাদুর মতো। সে ছিল এক প্রকৃত প্রতারক। মাত্র কয়েকটি কথাতেই সে পুরো আলাপের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারত, আর মানুষকে যা খুশি তাই বিশ্বাস করাতে পারত। তবুও, প্রাসাদ ইতিমধ্যে কেঁপে উঠেছিল। ফেরাউন তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক ডাকল, পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করার জন্য। পরিকল্পনা স্পষ্ট ছিল। সে মিসরের চারদিক থেকে জাদুকর জড়ো করবে এবং সবার সামনে এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করবে। সে ভেবেছিল, এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারবে যে মূসা (আ.) আসলে আর কিছুই নয়, শুধু একজন জাদুকর। কিন্তু সে বুঝতেই পারেনি যে আসলে সে নিজেই মঞ্চ সাজিয়ে দিচ্ছে যাতে গোটা মিসর সত্যিকারের নবুয়তের মুজিজা প্রত্যক্ষ করে। শিগগিরই পুরো জাতি সেই বার্তা শুনবে এবং নিজের চোখে প্রমাণ দেখবে। ফেরাউন মূসা (আ.)-কে সাক্ষাতের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করতে বলল। নবী বুদ্ধিমান ছিলেন, তিনি বললেন, ‘তোমাদের সাথে সাক্ষাতের নির্ধারিত সময় হল উৎসবের দিন। আর সেদিন পূর্বাহ্নেই যেন লোকজনকে সমবেত করা হয়’। কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্টে এ ধরনের কোনো জাতীয় প্রতিযোগিতার উল্লেখ নেই। জাদুকরদের সাথে মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল প্রাসাদের ভেতরেই। কিন্তু কুরআনের বর্ণনায় একটি দারুণ বিষয় আছে। এতে সেই দিনকে বলা হয়েছে ‘ইয়াওমুয-যীনাহ’, অর্থাৎ ‘সৌন্দর্য ও শোভাময়তার দিন’। আর যখন আমরা প্রাচীন মিসরের উৎসবগুলোর দিকে তাকাই, তখন আমরা একটি জাতীয় উৎসব পাই, যা এর সাথে পুরোপুরি মিলে যায়: ওপেট ফেস্টিভাল। একটি তৎকালীন জাতীয় ছুটির দিন, যা প্রতি বছর পালন করা হতো। ঘরবাড়ি সাজানো হতো, নারী-পুরুষ পরিপাটি পোশাক পরত, মন্দিরগুলো সাজানো হতো, মূর্তিগুলো অলংকৃত করা হতো, এবং সেই প্রতিমাগুলো সাজানো রাস্তায় শোভাযাত্রায় বহন করা হতো। অন্য কথায়, এ সম্পর্কে কোনোভাবেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জানার কথা নয়, তবুও কুরআন সেই দিনকে এত বিস্ময়করভাবে বর্ণনা করেছে। কুরআন নাযিল হওয়ার কয়েক শতাব্দী আগে প্রাচীন মিসরীয় ভাষাই হারিয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীতে আর কেউ তা পড়তে জানত না। ইতিহাসে অনেক পরে তা পুনরায় পাঠোদ্ধার করা হয়, আমাদের সময়ের কাছাকাছি এসে। তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনোভাবেই মিসরীয় উৎস থেকে তথ্য নিতে পারার কথা নয়। আমরা আগের একটি ভিডিওতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আপনি চাইলে সেটা দেখে নিতে পারেন। আজ আমরা সে বিষয়ে আলোচনায় যাবনা। তবে ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখ না থাকলেও, কুরআনে এমন অনেক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা সেই সময়কে একেবারে সঠিকভাবে তুলে ধরে। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, জাদুকরদের সাথে প্রতিযোগিতা হয়েছিল এক উৎসবের দিনে, মধ্য সকালে। আর এই সময়টায় রয়েছে এক চমকপ্রদ তাৎপর্য। প্রাচীন মিসরীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জাদুবিদ্যাকে সবচেয়ে শক্তিশালী ধরা হতো উৎসবের দিনগুলোতে এবং ভোর কিংবা মধ্য সকালে। অর্থাৎ, মূসা (আ.) তাদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন ঠিক সেই সময়টাতেই, যখন তারা নিজেদেরকে সবচেয়ে শক্তিশালী ভাবত। আরো মজার বিষয় হলো, কুরআন প্রাচীন মিসর সম্পর্কে এই হারিয়ে যাওয়া তথ্যটি এক অসাধারণ উপায়ে ফুটিয়ে তুলেছে। আর এসব বিবরণের কিছুই কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্টে নেই। ওল্ড টেস্টামেন্টে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ নেই - ফেরাউনের একজন কর্মকর্তার নাম। প্রতিযোগিতার দিন আসার আগে, এক জায়গায় দেখা যায় ফেরাউন তার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলছে। সেখানে আমরা একটি মজার বাক্য শুনতে পাই। ফিরআউন বলল, ‘হে পারিষদবর্গ, আমি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। অতএব হে হামান!

আমার জন্য তুমি ইট পোড়াও, আর আমার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরী কর। যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই। আর নিশ্চয় আমি মনে করি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত’।" আপনি কী জানেন, কুরআনের এই আয়াতই অনেক দিন ধরে ইসলামের বিরুদ্ধে অবজেকশান হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে? জানেন কিভাবে? হামান নামটি ওল্ড টেস্টামেন্টেও এসেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন সময় ও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। এটা ব্যবহার করে কেউ কেউ দাবি করত, নাউযুবিল্লাহ, কুরআন নাকি দুটি ভিন্ন গল্প গুলিয়ে ফেলেছে। কিন্তু পরবর্তীতে ইতিহাসবিদরা প্রমাণ করেন যে, কুরআনের এই আয়াতই আসলে একটি মিরাকল। কারণ ফেরাউনের নির্দেশনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, হামান নির্মাণকাজ ও পাথরের খনি বিষয়ক বিভাগের দায়িত্বে ছিল। তাহলে এই হামান আসলে কে?

আমাদের খুঁজতে থাকা উত্তর পাওয়া গেছে একটি প্রাচীন মিসরীয় শিলালিপিতে, যা ভিয়েনার হফ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। প্রাচীন মিসরের সকল শিলালিপির তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকরা নতুন সাম্রাজ্যের সময়কার ব্যক্তিদের নামের একটি ডিকশনারি তৈরি করেছিলেন, এবং সেখানে হামান নামটিও পাওয়া যায়। আর জানেন তার পদবী কী ছিল?

‘পাথরের খনিশ্রমিকদের প্রধান’, ঠিক যেমনটা কুরআন তাকে বর্ণনা করেছে, এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের হাজার বছরেরও আগে। এবার গল্পে ফিরে আসা যাক। মিসরের সর্বত্র থেকে মানুষ জড়ো হয়েছিল চত্বরে, এবং মূসা (আ.) সমস্ত জনতার সামনে আল্লাহ প্রদত্ত মুজিজা দেখাতে চলেছিলেন। তখন জাদুকররা তার কাছে এসে বলল, "হে মূসা, তুমি আগে নিক্ষেপ করবে, নাকি আমরা শুরু করবো?" মূসা (আ.) বললেন, ‘বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর তাদের যাদুর প্রভাবে মূসার কাছে মনে হল যেন তাদের রশি ও লাঠিগুলো জীবন্ত সাপের মতো ছুটোছুটি করছে। তখন মূসা তার অন্তরে কিছুটা ভীতি অনুভব করল। কিন্তু আল্লাহ্‌ তার সাথে রয়েছে। আমি বললাম, ‘তুমি ভয় পেয়ো না, নিশ্চয় তুমিই বিজয়ী হবে’। ‘আর তোমার ডান হাতে যা আছে, তা ছুড়ে দাও। তারা যা করেছে, এটি সেগুলোকে গ্রাস করে ফেলবে। কারণ তাদের বানানো জিনিস শুধু জাদুর ছাড়া আর কিছু নয়, আর যাদুকররা যাই করুন না কেন, তারা কখনো সফল হবে না’। তখন মূসা তার লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। জাদুকররা ভয়ে কাঁপতে লাগল। লাঠিটি এক বিশাল সাপে পরিণত হলো এবং তা তাদের বানানো মিথ্যা ছোট ছোট সাপগুলো গিলে ফেলতে শুরু করল। তারা দক্ষ জাদুকর, তাই তারা ভালো করেই জানত কোনটা জাদু আর কোনটা সত্য। তারা সিজদায় পড়ে গেল এবং ঈমানের ঘোষণা দিল। সেদিন সকালে তারা ঘর থেকে বের হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে, কিন্তু এখন তারা তার পুরোপুরি উল্টো পরিস্থিতিতে। প্রতিযোগিতার আগে জাদুকররা ফেরাউনকে জিজ্ঞেস করেছিল, তারা জিতলে কী পুরস্কার পাবে?

সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা তার নিকটতমদের মধ্যে থাকবে। এটি এক সুবর্ণ সুযোগ তাদের জন্যে। কারণ ফেরাউন এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যা তার নিজের মিথ্যে জান্নাত এবং জাহান্নাম যারা তাকে খুশি করত তারা ভোগ-বিলাসে থাকত, আর যাকে ইচ্ছে করত তাকে রাখত সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়। ফির‘আউন বলল, ‘কী, আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে?

নিশ্চয় সে-ই তোমাদের প্রধান, যে তোমাদেরকে যাদু শিখিয়েছে। সুতরাং আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছে শূলবিদ্ধ করবই। আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে, আমাদের মধ্যে কার আযাব বেশী কঠোর এবং বেশী স্থায়ী। তারা বলল, ‘যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তার শপথ, তার উপর আমরা তোমাকে কিছুতেই প্রাধান্য দেব না সুস্পষ্ট প্রমাণের বাইরে, যা আমাদের কাছে এসেছে। সুতরাং তুমি যা ফয়সালা করতে চাও, তাই করো।" তুমিতো কেবল এ দুনিয়ার জীবনের উপর কর্তৃত্ব করতে পার। "নিশ্চয় আমরা আমাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছি, যাতে তিনি আমাদের অপরাধসমূহ এবং যে যাদু তুমি আমাদেরকে করতে বাধ্য করেছ, তা ক্ষমা করে দেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরস্থায়ী’। ঈমান তাদের অন্তরে প্রবেশ করতেই তারা হয়ে গেল সত্যিকারের বীর। এবং সেদিনই তারা সবাই শহীদি মর্যাদা লাভ করেন। এটি এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। অনেক মিসরীয়, যারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিল, তারাও ঈমান নিয়ে নিল। তারা তাদের পুরনো ভ্রান্ত বিশ্বাস ছেড়ে দিল এবং একমাত্র সত্য ইলাহ আল্লাহর ইবাদতে ফিরে এলো। ওল্ড টেস্টামেন্টের কাহিনীতে, যিনি লাঠি নিক্ষেপ করেছিলেন, তিনি মূসা (আ.) নন, বরং হারুন (আ.)। তবে একই গ্রন্থে আগের অংশে এই মুজিজা মূসা (আ.)-কেই দেওয়া হয়েছিল। এখানে যেন ক্যারেক্টার দুটির মাঝে এক ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে আরো একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য হলো, এই ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটেনি। এমনকি জাদুকরদের ঈমান আনার কথাও নেই। এছাড়াও ওল্ড টেস্টামেন্টে মানুষের আখিরাত বাঁচানোর দিকেও জোর দেওয়া হয়নি, বরং বনি ইসরাঈলকে দুনিয়াবি সাময়িক বিপদ থেকে রক্ষার দিকে জোর দেওয়া হয়েছে। সেদিনের পর ফেরাউন আরো ভয়ংকর হয়ে উঠল। সে আবার ছেলেশিশুদের মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে শুরু করল। আর বনি ইসরাঈলদের আরো কঠিন শ্রমে বাধ্য করে সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হলো। উভয় বর্ণনাতেই বনি ইসরাঈল নবী মূসা (আ.)-এর কাছে অভিযোগ করে বলেছিল, ‘তুমি আমাদের কাছে আসার পূর্বে আমাদেরকে কষ্ট দেয়া হয়েছে এবং তুমি আমাদের কাছে আসার পরেও।’ কিন্তু এই দুই বর্ণনাতে তার উত্তর ছিল ভিন্ন। কুরআনের মতে, একজন নেতা হিসেবে তিনি তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন এভাবে - ‘আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের শত্রুকে ধ্বংস করবেন এবং যমীনে তোমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করবেন, অতঃপর তিনি দেখবেন তোমরা কীভাবে আমল কর।’ দুঃখজনকভাবে আজ আমরা স্পষ্টই দেখতে পাই, তাদের বংশধরেরা কিভাবে বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে এবং সেই ক্ষমতা দিয়ে কী করছে। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে আর কিছু বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ওল্ড টেস্টামেন্টের মতে, নবী মূসা (আ.) জনগণকে বরং তিনি নিজেই জনগণের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তাই তিনি আল্লাহর সাথে একপ্রকার অভিমানী ভঙ্গিতে কথা বলেছিলেন। ‘মূসা প্রভুর কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, "কেন প্রভু, কেন তুমি এই জাতির ওপর কষ্ট নামালে?

এজন্যই কি তুমি আমাকে পাঠিয়েছিলে? যেদিন থেকে আমি ফেরাউনের কাছে তোমার নামে কথা বলতে গিয়েছি, সে এই জাতির ওপর আরো কষ্ট নামিয়েছে, আর তুমি তোমার জাতিকে একেবারেই উদ্ধার করোনি।" একজন নবীর কাছ থেকে যে ধৈর্য ও আচরণের ম্যাচিউরিটি আশা করা হয়, তার তুলনায় এই প্রতিক্রিয়া আবেগপ্রবণ এবং কিছুটা শিশুসুলভ নয় কী?

মূসা (আ.) ধৈর্যসহকারে বারবার ফেরাউনকে ঈমানের পথে আহ্বান করতে থাকলেন। কিন্তু ফেরাউন সত্য অস্বীকার করতে থাকায়, আল্লাহ তার জাতির ওপর বিভিন্ন আজাব পাঠালেন— বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, পানি রক্তে পরিণত হওয়া, খরা ও দুর্ভিক্ষ। আজও আমরা এসব দুর্যোগের লিখিত ইতিহাস দেখতে পাই তৎকালীন একজন মিসরীয়র লেখনীতে। একটি ডকুমেন্ট যার নাম আইপিউয়ার প্যাপাইরাস, যা বর্তমানে ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ দ্য নেদারল্যান্ডসে সংরক্ষিত রয়েছে। একবার পড়ে দেখা যাক। এর কিছু লাইন সত্যিই অবাক করার মতো। ‘নিশ্চয়ই, নদী রক্তে রূপান্তরিত হয়েছে, তবু মানুষ তা পান করছে। মানুষ মানুষকে এড়িয়ে চলছে, এবং পানি খুজে ফেরে।’ এর অর্থ, সবাই একে অপরকে এড়িয়ে চলছে, এবং পানির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। ‘সত্যিই, যা গতকাল দেখা যেত, তা আজ নেই। ভূমি শূন্য হয়ে গেছে, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যেন খড় কেটে ফেলা মাঠের মতো। উচ্চ মিসর বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। রাজপ্রাসাদের আয় উপার্জন শূন্য হয়ে গেছে। যেখানে গম-যব, হাঁস-মুরগি আর মাছ আসার কথা ছিল। সব পশু কাঁদছে, গরু বিলাপ করছে। চারপাশের সব শস্য নষ্ট হয়ে গেছে। ৯ দিন ধরে কেউ প্রাসাদ থেকে বের হতে পারেনি, কেউ তার প্রতিবেশীর মুখও দেখতে পারেনি। চার দিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। "প্লেগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো দেশে।’ কিন্তু এসব বিপর্যয়ের কোনোটিই ফেরাউন বা তার জাতিকে বদলাতে পারেনি। এবার মিসর ছেড়ে যাওয়ার সময় এসে গেছে। আল্লাহর আদেশে, নবী মূসা (আ.) বনি ইসরাইলকে একত্র করলেন এবং রাতের অন্ধকারে তাদের গোপনে শহর থেকে বের করে নিলেন। ভোর হতেই ফেরাউন বুঝতে পারল তারা পালিয়ে গেছে। একটিও চিহ্ন রেখে যায়নি। ফেরআউন বুঝতে পারল তারা পালিয়ে গেছে। সে দ্রুত তার সেনাবাহিনীকে জড়ো করলো এবং তাদের পিছু নিলো দুই দিন পর তারা সমুদ্রের কাছে পৌঁছল। তারা বুঝতে পারছিল না কী করবে। হঠাৎ সেসমে দিগন্তে তারা সৈন্যদের এগিয়ে আসতে দেখল: ফেরাউন ও তার সৈন্যরা। ভয় ছড়িয়ে পড়ল ভিড়ের মধ্যে। তারা আতঙ্কে বলল ‘হে মুসা, আমরা তো ধরা পড়ে গেছি!’ তাদের সামনে ছিল সৈন্যের মতো ভয়ঙ্কর সমুদ্র, আর পেছনে, সমুদ্রের মতো অসীম সৈন্যদল।" তারা পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছিল। মূসা বলল, ‘কক্ষনো নয়; আমার সাথে আমার রব রয়েছেন। নিশ্চয় অচিরেই তিনি আমাকে পথনির্দেশ দেবেন’। "অতঃপর আমি মূসার প্রতি ওহী পাঠালামঃ তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর।" ফলে তা বিভক্ত হয়ে গেল। প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড়সদৃশ হয়ে গেল।" তারা দ্রুত সমুদ্রের মধ্য দিয়ে অন্য পাড়ে পৌঁছতে শুরু করল। তারপর ফেরাউন ও তার সেনারাও সমুদ্রে প্রবেশ করল, তারা একদমই জানত না যে তারা এক ফাঁদে হেঁটে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগের স্বপ্ন এখন বাস্তব হতে চলেছে। যখন বনি ইসরাইল অন্য পাশে পৌঁছলো,সমুদ্র ধীরে ধীরে বন্ধ হতে লাগল। আর আমি বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করিয়ে নিলাম। আর ফির‘আউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য প্রকাশ ও সীমালঙ্ঘনকারী হয়ে তাদের পিছু নিল। অবশেষে যখন সে ডুবে যেতে লাগল, তখন বলল, ‘আমি ঈমান এনেছি যে, সে সত্তা ছাড়া কোন ইলাহ নেই, যার প্রতি বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে। আর আমি এখন তাকওয়া অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভুক্ত’। তাকে বলা হলো, "এখন ঈমান এনেছ?

অথচ ইতঃপূর্বে তুমি নাফরমানী করেছ, আর তুমি ছিলে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত।" সেই দিন পর্যন্ত, তাকে বিশ্বাসের অনেক সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এক বিপর্যয়ের পর আরেকটি বিপর্যয় তার ওপর আনা হলো। আর প্রতিবারই সে তার কাজের প্রতি অনুতপ্ত হওয়ার ভান করত এবং মূসা (আ.)-কে অনুরোধ করত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে, যাতে এই কষ্ট তাদের থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পরিস্থিতি ঠিক হতেই,সে আবার আগের রুপে ফিরে যেত। এ ধরনের ভেজাল বিশ্বাসে তার কোনো লাভ হলো না। ফেরাউন ও তার সৈন্যরা পুরোপুরি ধ্বংস হলো। আর কুরআনে গল্পের এই অংশটি বর্ণনা করার সময় একটি চমকপ্রদ বাক্য ব্যবহার করা হয়, অতঃপর আসমান ও যমীন তাদের জন্য কাঁদেনি। কিন্তু কেন কুরআন এমন কিছু বলবে?

প্রাচীন মিসরের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা এর চমকপ্রদ উত্তর খুঁজে পাব। সেই সময় বিশ্বাস করা হতো, যখন কোনো ফেরাউন মারা যাবে, তখন আকাশ ও পৃথিবী তার জন্য কাঁদবে। এই ধারণটি পাওয়া যায় পঞ্চম রাজবংশের পিরামিড টেক্সটসমূহে। তারা বলে, ‘আকাশ তোমার জন্য কাঁদে, পৃথিবী তোমার জন্য কাঁপে।’ যখন এই গ্রন্থগুলো ছিল নাগালের পুরোপুরি বাহিরে, কুরআন আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক সেই শব্দগুলো তুলে ধরেছে, যা তারা ব্যবহার করত। আবারও, এর কোনো উল্লেখ ওল্ড টেস্টামেন্টে নেই। আরেকটি বিষয় যেটি সেখানে নেই তা হলো কী ঘটেছিল ফেরাউনের দেহাবশেষের সাথে?

কুরআনের সূরা ইউনুসের ৯২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি ফেরাউনের দেহকে সংরক্ষণ করবেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিদর্শন ও শিক্ষা হিসেবে। আর সত্যিই চমকপ্রদভাবে দুটি আবিষ্কার পুরোপুরি এই আয়াতের সাথে মিলে যায়। প্রথমটি হলো, ১৮৯৬ সালে মিসরে আর্কিওলজিক্যাল রিসার্চের সময়, গেবেলিয়েন এলাকায় সমুদ্র তীরে ছয়টি দেহ পাওয়া যায়, থেবস থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দক্ষিণে। এক অকল্পনীয় ঘটনা। কারণ দেহগুলো কয়েক শতাব্দী আগের পুরনো অথচ সেগুলো এখনো অক্ষত। এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো: এগুলো এমন অবস্থায় পড়ে রয়েছিল, যা ঠিক সেজদা করার মত। এই দেহগুলো সংগ্রহ করা হয় এবং এখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ সেগুলো দেখতে যায়। যদিও এগুলো মমি করা হয়নি, তবুও তারা এমন বিরল অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে তাদের দেহ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি হলো ফেরাউনের দেহসংক্রান্ত প্রথম তত্ত্ব, দ্বিতীয় বিষয়টি কুরআনের আয়াতকে পুরোপুরি অকাট্য করে তোলে। কী সেটি?

উনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মিসরের নানান স্থানে ফেরাউনদের বিভিন্ন মমি আবিষ্কার করতে শুরু করেন। আজ, সব ফেরাউন, যারা মূসা (আ.)-এর সময় জীবিত ছিল বলে বিশ্বাস করা হয়, তারা সারা বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। তাহলে, কয়েক শতাব্দী পরে নয়, যদি তার দেহ সমুদ্রতীরে পাওয়া যেত ঘটনাটির পরপরই, প্রাসাদের মানুষরা অবশ্যই সেটি নিয়ে মমি বানাত, যেমন তারা অন্যান্য ফেরাউনের জন্য করেছে। সুতরাং, হয় ১৮৯৬ সালে পাওয়া ছয় দেহের মধ্যে একটি ফেরাউনের, অথবা তার দেহ সেই সময়ই পাওয়া যায় ও মমি বানানো হয়, যাই হোক না কেন, তা সংরক্ষিত হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রদর্শিত হয়েছে, ঠিক যেমনটি কুরআন বলেছে। অবশ্যই, যখন কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল, তখন কেউ জানত না প্রাচীন মিসরীয়রা কিভাবে দেহ মমি করে সংরক্ষণ করত। ইসরায়েলিরা ফেরাউনের নিষ্ঠুরতা থেকে একটি অলৌকিক মাধ্যমে রক্ষা পেয়েছিল এবং স্বাধীনতার পথে তাদের প্রথম ধাপ নিয়েছিল। মরুভূমিতে একটি নতুন জীবন শুরু করেছিল তারা। কিন্তু তারা এমন এক জাতি যারা যুগে যুগে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল আল্লাহর পথনির্দেশনা। সুতরাং আল্লাহ নবী মূসা (আ.)-কে একা সিনাই পর্বতে ওহি দেওয়ার জন্য ডেকে পাঠালেন। এটি কোনো সাধারণ সাক্ষাৎ ছিল না। আকাশ ও পৃথিবীর প্রভুর পক্ষ থেকে, একটি মহানতম ঐশ্বরিক গ্রন্থ, তাওরাত, সেই দিন দেওয়া হবে। প্রথমে, আল্লাহ এই সাক্ষাৎ ৩০ দিনের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। সুতরাং নবী মূসা (আ.) তার লোকদের জানান এবং সাক্ষাতের জন্য যান। কিন্তু যখন মূসা (আ.) তাদের ছেড়ে যান, পরীক্ষার অংশ হিসেবে, আল্লাহ সেই সময়ের সাথে আরো ১০ দিন যোগ করলেন। যখন তিনি প্রতিশ্রুত সময়ে ফিরে এলেন না, তার লোকদের মনে সন্দেহ দানা বাধতে শুরু করল। তিনি ছিলেন কালিমুল্লাহ, যিনি সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলতেন। একটি অত্যন্ত গভীর ও রহস্যময় অভিজ্ঞতা সেই পর্বতে ঘটল। আর পরিশেষে আল্লাহ তাকে সেই অঙ্গীকারপত্র পাথরের ফলকে লিখে দিলেন। নবী মূসা (আ.) তার লোকদের কাছে ফিরে যেতে পেরে খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি নেমে এলেন, তার জাতি গভীর হতাশাজনক অবস্থায় ছিল। সেই একই মানুষ, যারা আল্লাহর অনেক অলৌকিক দৃষ্টান্ত দেখেছে, তারা তখন স্বর্ণের বাছুরের মূর্তিকে উপাসনা করছিল। তিনি এত ক্রুদ্ধ হলেন যে ফলকগুলো মাটিতে ফেললেন, যেন বলছেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমরা এমন ওহী পাওয়ার যোগ্য নও।’ তিনি পর্বতে যাওয়ার আগে, হারুন (আ.)-কে দায়িত্ব অর্পন করে যান। কিন্তু যখন দেখলেন তার ভাই তাদের থামাতে পারছেন না, মূসা (আ.) তার দাড়ি ধরে এসবের কৈফিয়ত জানতে চান কিন্তু এই মূর্তি আসলে কে তৈরি করেছিল?

ওল্ড টেস্টামেন্টে উত্তরটি অনেক চাঞ্চল্যকর: নবী হারুন (আ.) নিজেই। কিন্তু তিনি তো একজন নবী, যাকে পাঠানো হয়েছিল আল্লাহর সাথে মানুষের শিরক বন্ধ করতে। লাখো মানুষের মধ্যে থেকে আল্লাহর নির্বাচিত একজন কিভাবে এমন একটি পাপ করতে পারেন, যা সাধারণ একজন বিশ্বাসীর পক্ষেও সাহস করা অসম্ভব? দুঃখজনকভাবে, এটি একটি স্পষ্ট মিথ্যাচার যেটি করেছিল তারা, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ওল্ড টেস্টামেন্ট পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখতো কিন্তু কুরআন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলছে। মূর্তি তৈরি করেছিলেন একজন মানুষ, যার নাম সামিরি এর মাধ্যমে কুরআন কেবল আল্লাহর একজন নবীকে এমন ভয়াবহ অভিযোগ থেকে মুক্তই করলো না, বরং আরেকটি আর্কিওলজিক্যাল মিরাকল প্রকাশ করলো তো, কী সেই মিরাকল?

যখন মূসা (আ.) পাহাড়ে অবস্থান করছিলেন সামিরি নামের লোকটি এগিয়ে আসে। সে লোকদের বলে, ‘আমাকে তোমাদের প্রভুর মূর্তি তৈরি করতে দাও।’ পরে তারা তাকে তাদের সমস্ত সোনা দিয়ে দেয়। সামিরি সেগুলো গলিয়ে স্বর্ণের বাছুরে রূপ দেয়। কিন্তু সে এখানেই থেমে থাকেনি। সে এটিতে একটি ছিদ্রও করল, এবং সেই ছিদ্র থেকে একটি অদ্ভুত শব্দ বের হচ্ছিল, যেন বাছুরটি আওয়াজ করছে। সবচেয়ে মজার বিষয় কী জানেন?

এই সামিরি নামটি ওল্ড টেস্টামেন্টে কোথাও পাওয়া যায় না। কিন্তু প্রাচীন মিসরীয় উৎস অনুসারে, স্মেরিউ নামে ৯ জন পুরোহিতের একটি দল ছিল, যাদের স্মের বা সেম পুরোহিত নামেও ডাকা হতো। এই পুরোহিতরা "ওপেনিং দ্য মাউথ" নামের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিত, যেখানে তারা দেখানোর চেষ্টা করতো, মূর্তি এমনকি মৃত ব্যক্তি যেন কথা বলছে। তারা একপ্রকার ইলিউশন সৃষ্টি করতো। এখন ভেবে দেখুন, একটি স্বর্ণের বাছুর, যা শব্দ করে ডাকছে আর যে এটি তৈরি করেছে তার নাম স্মেরিউর মতো শোনাচ্ছে। এগুলো কি খুব সুন্দরভাবে মিলে যায় না?

মূসা (আ.)-এর প্রচেষ্টায় ইসরাইলিরা আবার সঠিক পথে ফিরে আসে। কিন্তু এটি তাদের প্রথম অকৃতজ্ঞ হওয়ার ঘটনা ছিল না, এবং শেষটিও হবে না। তারা মরুভূমিতে ৪০ বছর ধরে ঘুরে বেড়াবে। যদি কখনো তারা মূসা (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর আদেশ শুনত, তারা তাকে বলত, ‘তুমি কি আমাদের ঠাট্টা করছ?’ আবার কখনো আল্লাহ তাদের কাছে আকাশ থেকে সবচেয়ে মূল্যবান খাদ্য পাঠাতেন, কিন্তু তারা তখনো অভিযোগ করে বলত, ‘আমরা কি সারাদিন এটিই খেতে থাকবো?

আমরা ভিন্ন কিছু চাই।’ একটা সময় আসে, যখন আল্লাহ তাদের একটি নিপীড়ক জাতি দেখান এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার আদেশ দেন। কিন্তু তারা তাদের নবীর কাছে বলল, ‘আপনি ও আপনার প্রভু যান লড়াই করুন। আমরা এখানে বসে থাকব।’ তারা এমনকি ‘আমাদের প্রভু’ পর্যন্ত বলতে পারল না, তারা বলল, "তোমার প্রভু।’ তাদের অবাধ্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মূসা (আ.) আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, ‘প্রভু, আমার কারো ওপর কোনো কর্তৃত্ব নেই শুধু নিজের ও আমার ভাইয়ের ওপর ছাড়া।’ ইসরাইলিদের স্বপ্ন ও চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল জেরুজালেমের ভূমিতে পৌঁছে সেখানে বসতি গড়া। মূসা (আ.) জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল সেটি। তিনি তার সমস্ত জীবন সেই ভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তার কওমের ক্রমাগত অবাধ্যতা ও কাপুরুষতার কারণে তিনি তার জীবনের দীর্ঘসময়ের কাম্য সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই মারা যান। খুবই হৃদয়বিদারক, এমন এক ব্যথা, যা শব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যদিও আমরা এই ভিডিওতে পুরো গল্পের ছোট একটি অংশ তুলে ধরেছি, একটি বিষয় আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট: ওল্ড টেস্টামেন্টের যে ভার্সন বর্তমানে রয়েছে তা পরিবর্তিত এবং বিকৃত। এবং এতে এমন সব দাবি ও বর্ণনা রয়েছে, যা আল্লাহ বা তার নবীদের সাথে কখনোই যায় না। আল্লাহ কি সত্যিই চুরির আদেশ দেবেন?

কোনো নবী কি স্বর্ণের মূর্তি তৈরি করবে এবং মানুষকে সেটি পূজার জন্য আহ্বান জানাবে?

অন্যদিকে, দেখুন একবার কুরআন আমাদের কী জানান দেয়ঃ একের পর এক অলৌকিক ঘটনা যা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে এটি সত্যিই আল্লাহর বাণী। এখন পর্যন্ত আমরা যা আলোচনা করেছি সেগুলো নিয়ে একটু চিন্তা করুন। যেখানে ওল্ড টেস্টামেন্টে সব মিসরীয় শাসককে সম্বোধন করা হয়েছে "ফেরাউন" হিসেবে, কুরআন সঠিক যুগের জন্য প্রতিটি শাসকের তাঁর সঠিক উপাধি ব্যবহার করেছে। কুরআন "সৌন্দর্য ও শোভাময়তার দিন" নামে একটি দিবসের উল্লেখ করেছে, আর এটি সেই প্রাচীন মিসরে উদযাপিত একটি সত্যিকারের উৎসবের বর্ণনার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। এখানে হামানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এক্স্যাক্টলি যে ভূমিকায় তাকে ইতিহাসেও খুঁজে পাওয়া যায়, পাথর খনন ও নির্মাণকাজ পরিচালনা। এ কিতাব মিসরে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়গুলো একে একে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করেছে। এই আয়াত, ‘না আকাশ, না মাটি তাদের জন্য কাঁদে’ হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন মিসরীয় বিশ্বাসের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। কুরআন বলেছে, ফেরাউনের দেহ সংরক্ষিত হবে। সামিরির নাম উল্লেখ করে, কুরআন সেই সময়ের একটি পুরোহিত দলের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। সাতটি অলৌকিক ঘটনা। ওই সময়ের স্পষ্ট ও বিস্তারিত চিত্র ফুটিয়ে তোলে আল্লাহ আমাদের দেখিয়েছেন যে তিনি ঘটে যাওয়া প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। এমনকি তিনি দুই মানুষের মধ্যকার কথোপকথনও হুবহু তুলে ধরেছেন, যার অর্থ স্পষ্ট, তার জ্ঞানের বাইরে কোন কিছুই নেই। সকল বিষয়ে তিনি পূর্ণ অবগত। সুতরাং, এই সমস্ত সুস্পষ্ট প্রমাণের পর, যদি কেউ এখনো সত্য অস্বীকার করে চোখ বন্ধ করে রাখে, তাহলে আমাদের আজকের গল্পের ফেরাউনের সাথে তাদের পার্থক্যই বা কী?

তো আমরা ইতিহাসের পাতায় কোন পক্ষে অবস্থান করছি? আমরা কি সেই জাদুকরদের মতো, যারা সত্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস স্থাপন করল? নাকি আমরা সেই ফেরাউনের অনুসারী, সত্য যার সামনে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার পরও সে অস্বীকার করল? আমরা কি সেই মায়ের মতো, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নির্দেশের উপর তিনি তার নিজ শিশুকে একটি ঝুড়িতে রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেন? নাকি আমরা সেই বনী ইসরায়েলীদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের হৃদয় সত্য অনুসন্ধানে অক্ষম, এবং আল্লাহর নবীর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল? গন্তব্য আমাদের হয় চিরস্থায়ী সুখ বা চিরস্থায়ী ক্ষতি, চিরস্থায়ী জান্নাত কিংবা চিরস্থায়ী জাহান্নাম। সিদ্ধান্ত এখন আপনার হাতে।
