# নবী (সাঃ)-কে ২ মাইল পাথর ছোঁড়া হলো (তায়িফ) - এআই ভিজ্যুয়ালাইজড - ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ) | পর্ব ৪

- Language: bn
- Published: 2026-08-26
- Canonical: https://blog.towardseternity.com/bn/blog/no-food-no-mercy-to-prophets-family-ai-visualized-o-messenger-ep-4
- Source video: https://www.youtube.com/watch?v=jx9syOUU1Ms
- Channel: Towards Eternity

This is the cleaned transcript of the source video. The speech is unaltered.

---

কল্পনা করুন—এক দুর্ভিক্ষের কথা। যেখানে আপনি আর আপনার স্বজনরা অবরোধে বন্দী— আর বাইরে থাকা মানুষগুলো ছিলো একেবারেই নির্লিপ্ত। শিশুরা ক্ষুধায় কাঁদছে, মায়েরা ভেঙে পড়ছে— কারণ তাদের শান্ত করার মতো কিছুই তাদের হাতে নেই। চারিদিকে কোথাও নেই একমুঠো খাবার, না নিজের জন্য, না সন্তানদের জন্য। যেদিকে তাকান কেবল—ক্লান্ত মুখ, নিস্তেজ চোখ। দিনের পর দিন বেঁচে থাকতে খেয়েছেন শুধু কেবল গাছের পাতা— আর মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো চামড়ার টুকরো। নিজের ক্ষুধা মেটাতেই হিমশিম অবস্থা, তার উপর অন্যেরাও সবাই ছিলেন ক্ষুধার্ত। একসাথে— দুই দুইটা অসহনীয় যন্ত্রণা। নবুওয়তের সপ্তম বছরে এই জুলুম নেমে এসেছিল— মক্কার শিবে আবি তালিব উপত্যকায়। এই সিরিজ নির্মিত হয়েছে বিশ্বস্ত ইসলামী সূত্রের শতাধিক রেফারেন্সের ভিত্তিতে। সব এআই ভিজ্যুয়াল প্রস্তুত করা হয়েছে যোগ্য মুসলিম আলেমদের পরামর্শে—এবং ইসলামী নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে। সেই দিনগুলোতে মক্কা দেখেছিল—ক্ষুধায় কাতর মুসলিমদের। কিন্তু তা কতদিন?

দুই দিন? তিন দিন? এক সপ্তাহ? এক মাস? না কী তেমন কিছুই না। টানা দীর্ঘ তিন তিনটা বছর। বছরের পর বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর সাহাবারা— এমন কষ্ট সহ্য করলেন যা আমরা একদিনও সহ্য করতে পারতাম না। এই সময়টাই পরে পরিচিত হয়—“বয়কটের বছর” নামে। কিন্তু আসলে কি ঘটেছিলো? যখন মনে হচ্ছিল পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হচ্ছে—হঠাৎ এই বিপর্যয় কেন?

চলুন পেছনে ফিরে দেখা যাক। নবুওয়তের সপ্তম বছরে— মক্কার মুশরিকরা ইসলামের বিস্তার থামাতে কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিল না। নির্যাতন, চাপ—সব কিছুর পরও মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তাদের সব কৌশল ভেস্তে গিয়েছিলো। তার ওপর— আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদেরও ফিরিয়ে আনতে পারেনি তারা। আর হামজা ও উমর ইসলাম গ্রহণ করায় কুরাইশরা আরও বিচলিত হয়ে পড়ল। তারা বুঝতে পারলো—এভাবে চললে ইসলাম শিগগিরই মক্কায় প্রভাব বিস্তার করবে। এই সবকিছুর ইতি টানতে কুরাইশ নেতারা শপথ করল— “গোপনে হোক বা প্রকাশ্যে—আমরা অবশ্যই মুহাম্মদকে হত্যা করব।” “সে ঠিক বলেছে। আমরা একমত।” এসব দেখে আবু তালিবের উদ্বেগ বেড়ে গেল। তিনি বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিবকে একত্র করলেন, আর বললেন, নবী ﷺ–এর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে রক্ষা করতে হবে। বানু মুত্তালিবের অনেকে তখনও মুসলিম হয়নি, তবু আহ্বান শোনামাত্রই তারা ছুটে এলেন। কারণ তখন, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রক্তের সম্পর্ক ছিল অটুট। কেউ বাইরের লোককে নিজ আত্মীয়ের ক্ষতি করতে দিত না। এটা পুরো গোত্রের জন্যে লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াত। অতএব বানু হাশিম ও বানু মুত্তালিব—সবাই শিবে আবি তালিবে একত্রিত হলো, এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে নিজেদের সুরক্ষায় নিল। এই উপত্যকায় তাঁকে হত্যা করা সহজ নয় বুঝতে পেরে, কুরাইশরা সবাই দারুন নাদওয়ায় জড়ো হলো—নতুন পরিকল্পনায়। আর তারা কঠোর সিদ্ধান্তে ঐক্যবদ্ধ হলো, ইসলামের শত্রুদের অন্তরে আর দয়া অবশিষ্ট নেই। তারা নির্মমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। চুক্তিতে লেখা হলো— “কেউ বানু হাশিম বা বানু মুত্তালিবদের মেয়েকে বিয়ে করতে পারবে না, আর তাদের কাছে নিজেদের মেয়েদেরকে বিয়েও দেবে না। তাদের কাছে কিছু বিক্রি করা হবে না, তাদের কাছ থেকে কিছু কেনাও হবে না। কেউ তাদের ঘরে যাবে না, তাদের সাথে বসবে না, দেখা করবে না— এমনকি কথা পর্যন্ত বলবে না।” যতক্ষণ না তারা নবী ﷺ–কে হত্যার জন্য তাদের হাতে তুলে দেয় , কোনো শান্তির প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে না। একবিন্দু পরিমাণও দয়া দেখানো হবে না। শর্তগুলো লিখে রাখা হলো— আর “পবিত্রতার” ছাপ দিতে তা কাবার ভেতরে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, শিশু— সবাইকে শিবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ, খাদিজা (রা.), আবু তালিব, সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.), হামজা (রা.), আলী (রা.)—বানু হাশিমের প্রায় প্রত্যেকেই সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। সবাই—শুধু একজন ছাড়া: আবু লাহাব। সে-ও বানু হাশিমের ছিল, কিন্তু নিজ গোত্র থেকে সরে দাঁড়াল। তার অন্তর এতটাই অন্ধকার হয়েছিল যে আত্মীয়দের মৃত্যুই সে কামনা করত। মক্কায় আসা কাফেলাদের থামিয়ে সে বলত, “হে ব্যবসায়ীরা!

মুহাম্মদের পরিবারের জন্য দাম এমন বাড়াও, যেন তারা তোমাদের কাছ থেকে একটাও জিনিস কিনতে না পারে। তোমরা জানো, আমি ধনী, আর এক কথার মানুষ। আর এতে তোমাদের কোনো ক্ষতি হবে না—সব দায় আমি নেব।” সে সব ক্ষতির দায় নেওয়ার অঙ্গীকার করল। ব্যবসায়ীরা তার ওপর ভরসা করে দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। অবশেষে বানু হাশিমের লোকেরা খালি হাতে ফিরে যেত, ক্ষুধায় কাঁদতে থাকা তাদের সন্তানদের কাছে। তাদের সবকিছু প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। খাবারের দাম দ্বিগুণ হলেও, তাদের কিনতেই হতো। আর যাদের সামর্থ্য ছিল, তারা নিঃশেষ করে দিত নিজের সম্পদ। নবী ﷺ, আবু তালিব ও খাদিজা (রা.) নিজেদের সবকিছুই উৎসর্গ করেছিলেন। একবার ভাবুন তো— খাদিজা একসময় ছিলেন মক্কার অন্যতম ধনীদের একজন। অথচ, আজ তিনি বিনা দ্বিধায় নিজের সব সম্পদ বিলিয়ে দিচ্ছেন। একদিকে খাদিজা (রা.) মানুষকে ক্ষুধা থেকে বাঁচাতে নিজের সব সম্পদ দিয়ে দিচ্ছেন, আর অন্যদিকে আবু লাহাব তার সম্পদ ঢালছিল তাদের অনাহারে মারতে। বাইরে থেকে দেখলে—দুটোই এক। দু’জনেই তো খরচ করছে। কিন্তু নিয়তই গড়ে দেয় সব পার্থক্য। এই খরচের ভেতরেই— একজন নিজের জান্নাতে তুবা গাছ রোপণ করছিলেন, আর অন্যজন নিজের জাহান্নামে যাক্কুমের গাছ রোপণ করছিল। আবু বকর (রা.)-ও ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু নির্যাতিত মুসলিম দাসদের মুক্ত করতে, তিনি নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন নিজের সম্পদ। আর সারা জীবনই তিনি বারবার আল্লাহর পথে নিজের সবকিছু কুরবানি করে গেছেন। এভাবেই তারা আল্লাহর দ্বীনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কেউ জীবন দিয়ে, কেউ সম্পদ দিয়ে— কেউ কথা দিয়ে, কেউ যৌবন দিয়ে, আর কেউ কষ্টের সামনে নিজের ধৈর্য আর সংগ্রাম দিয়ে। সুরা তাওবায় আল্লাহ বলেন— “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন এবং তাদের সম্পদ কিনে নিয়েছেন—জান্নাতের বিনিময়ে।” তারাই ছিল সেই মানুষ—যারা এই ওয়াদায় সম্মানিত হয়েছিল। সেই সময় আবু তালিব আরও বেশি চেষ্টা করছিলেন সম্ভাব্য সব বিপদ থেকে নিজ ভাতিজাকে রক্ষা করতে। প্রতি রাতে তিনি নবী ﷺ–কে বলতেন নিজ বিছানায় শুতে, যেখানে সবাই তাঁকে দেখতে পায়। কিন্তু সবাই ঘুমিয়ে গেলে, চুপিচুপি তিনি ভাতিজাকে সেখান থেকে তুলে নিজ পাশে এনে দিতেন— কেউই তা টের পেত না। আর নবী ﷺ–এর জায়গায় অন্য কাউকে শুইয়ে দিতেন। এভাবেই তিনি চাইতেন— যেন কোনোভাবেই তাঁর কোন ক্ষতি কেউ করতে না পারে। আবু তালিব ছিলেন তাঁর চাচা, আবু লাহাবও ছিল চাচা। কিন্তু একজন তাঁকে আগলে রাখছিলেন, অন্যজন চাইছিল তাঁর মৃত্যু। একজন রাতদিন চেষ্টা করছিলেন ভাতিজাকে নিরাপদ রাখতে, আর অন্যজন চালিয়ে যাচ্ছিল জুলুম। এই বৈপরীত্য—শেষ পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকল। অবরুদ্ধ থাকাকালীন সময়ে বানু হাশিম নিজেদের সবকিছু ত্যাগ করেছিল। তবু ক্ষুধা ঠেকাতে সেটাও যথেষ্ট হলো না। কিন্তু সব কষ্টের মধ্যেও তারা হার মানেননি। আগামী সব প্রজন্মের জন্য, তারা দেখিয়ে দিল, একটি লক্ষ্যে নিজেকে উৎসর্গ করলে, কীভাবে দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর কুরাইশদের আচরণ ছিল তার সম্পূর্ণ উল্টো। তারা দেখিয়ে দিল—কুফরিতে নিষ্ঠুরতা আর নির্দয়তায় মানুষ কত দূর যেতে পারে। সেই কঠিন দিনগুলোর এক দিনে, এক ব্যক্তি সামান্য সামর্থ্যে কিছু আটা কিনতে পেরেছিল, আর গোপনে তা নিয়ে এলো উপত্যকার মুখে। লোকটি ছিল হাকিম ইবনে হিযাম, খাদিজা (রা.)–এর ভাগ্নে। কুরাইশদের নিষ্ঠুরতায় ব্যথিত হয়ে সে যতটুকু সম্ভব সাহায্য করতে বেরিয়েছিলন। হাকিমের মতো আরও কেউ কেউ এই জুলুমে কাতর ছিল, কিন্তু মুশরিকদের চাপে অধিকাংশই সাহস পায়নি তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারেননি। বরং সাহায্য তো দূরের কথা, উপত্যকায় কেউ ঢুকলেই ধমক খেতে হতো—ভুলে ঢুকে গেলেও। হাকিম চুপিচুপি ঢুকতে চাইল, কিন্তু আবু জাহেল তাকে দেখে ফেলল, আর খাবার ঢোকাতে দিল না। “সেখানেই থাম!” এমনকি গলা চেপে ধরল। ঠিক তখন কুরাইশের এক নেতা আবু আল-বাখতারি এই দৃশ্যটা দেখল। আবু জাহলের কাজ দেখে সে ক্ষেপে উঠল। সে বলল, “তুমি কীভাবে তাকে থামাচ্ছ, তার ফুফুর কাছে তার প্রাপ্য খাবার সে কি পৌঁছে দিতে পারবে না?

সরে দাঁড়াও—ওকে যেতে দাও, যেখানে তার যেতে চাইছে।” আবু জাহেল জেদ ধরলে, সে মাটি থেকে একটা হাড় তুলে আবু জাহেলের মাথায় আঘাত করলে তার মাথা ফেটে যায়। তারপর তাকে মাটিতে ফেলে বেশকটা লাথি মেরে চলে গেলেন। এভাবেই সময় সময়, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী—দু’পক্ষই গোপনে কিছু খাবার পৌঁছে দিত শিবে আবি তালিবে। কিন্তু তা প্রয়োজনানুযায়ী যথেষ্ট ছিল না। মুশরিকরা নাকি কেনাবেচার সুযোগ দিত শুধুমাত্র হজের মৌসুমে— মাত্র একটা মাস। আমি বলছি ‘নাকি’—কারণ তখনও কুরাইশরা নানা উপায়ে মুসলিমদের রসদ আটকে দিত। ব্যবসায়ীদের ভয় দেখানো হতো—কিছু বিক্রি করবে না...

“ওদের কাছে কিছু বিক্রি করবে না—বুঝলে?” ...অথবা তাদের সব পণ্যই কিনে নেওয়া হতো, যেন মুসলিমদের জন্য কিছুই না থাকে। বানু হাশিমের সঙ্গে কেউ ব্যবসা করত না— তাই আয়-রোজগারের পথও ছিল না। যা ছিল, তাদের সবই আগেই খরচ হয়ে গেছে। শিশুরা ক্ষুধায় চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। কিন্তু কালো হৃদয়ের সেই হিংস্র জালিমরা এই কান্নায় কান দিল না—বরং কেউ কেউ যেন তাতেই আনন্দ পেত। সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন এই কষ্টের এক প্রত্যক্ষ সাক্ষী। এক রাতে ক্ষুধায় ঘুম না আসায় তিনি বাইরে বের হলেন। পরে তিনি ঘটনাটা এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন “কাঁটার মধ্যে আমি উটের চামড়ার একটা টুকরো পেলাম। আমি সেটাকে নিয়ে রোদে শুকালাম, আর দিনের পর দিন ওই চামড়ার টুকরো খেয়েই বেঁচে ছিলাম।” কেউ বাঁচত পশুর চামড়া খেয়ে, আর কেউ খেত গাছের পাতা। এভাবেই তিন দীর্ঘ বছর ক্ষুধায় আর কষ্টে গড়িয়ে গেল। এরপরও কোনো সমাধান এল না। কিন্তু তখনও কিছু মানুষ ছিল—যাদের বিবেক মরে যায়নি। বরং তাদের কেউ কেউ শুরু থেকেই অস্থির ছিল। চুক্তির শর্তগুলো লিখেছিল মানসুর ইবনে ইকরিমাহ। আর বলা হয়ে থাকে, সেদিনের পর থেকে সে যে হাতে লিখেছিল, সেই হাত আর ব্যবহার করতে পারত না। এটা ঘটলে কিছু লোক বলল— “মানসুরের ওপর গজব নেমে এসেছে।” “কারণ আমরা বানু হাশিমের ওপর জুলুম করেছি।” কিন্তু কুরাইশদের ভয়—তাদের মুখ সিল করে দিল। তারা অপেক্ষা করল—কেউ আগে এগিয়ে আসুক। অবশেষে প্রথম পদক্ষেপ নিল—পাঁচজন। আবু আল-বাখতারি, মুতি‘ম ইবন ‘আদি, হিশাম ইবন ‘আমর, জুহাইর ইবন আবি উমাইয়া, আর জম‘আ ইবন আল-আসওয়াদ। তারা গোপনে জড়ো হয়ে পরিকল্পনা করল। পরদিন কাবায় ভিড় হলে—তারা যাবে। প্রত্যেকে থাকবে ভিন্ন ভিন্ন কর্নারে— যেন একে অন্যকে চেনে না—এমন ভান করে। একই দাবির পক্ষে উঠবে ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠ— আর সবাইকে বলবে—এই নিষ্ঠুর দলিল ছিঁড়ে ফেলতে। পরদিন তারা কাবায় গেল। ভিড়ের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল—ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। সবার আগে কথা বলল জুহাইর। “হে কুরাইশবৃন্দ!

আমরা যা করছি—এটা কি কোনো মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য? আমরা যখন নিয়ামতে মত্ত, তখন বানু হাশিমকে এই দুর্দশায় ফেলে রাখা—বিবেক কাঁপায় না?

এই চুক্তি ভাঙতেই হবে!” তারপর জম‘আ ইবন আল-আসওয়াদ বলল— “জুহাইর ঠিক বলেছে। যেদিন ওই দলিল লেখা হয়েছিল—আমরা তখনও একমত ছিলাম না। এবার সময় এসেছে—এই জুলুমের ইতি টানাতেই হবে” তারপর একে একে—যে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখান থেকেই জুলুমের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। ভিড় আরও জমলো—প্রতিবাদের আওয়াজও আরো তীব্র হলো। আবু জাহেল বলতে চাইলো—সব সাজানো, কিন্তু এবার কেউ তার কথা শুনল না। এই ঘটনাই চুক্তির “মর্যাদা” ভেঙে দিল— আর বয়কট ভাঙার পথে মোড় ঘুরিয়ে দিতে মারাত্মক প্রভাবিত করলো। কিন্তু যে ঘটনা বয়কটকে চূড়ান্তভাবে শেষ করল তা ছিল আরও বেশী আশ্চর্যের। আল্লাহর আদেশে কাবার ভেতরে ঝোলানো দলিলের ওপর পাঠানো হলো—এক ক্ষুদ্র কীট। সেই কীট পুরো দলিলটাই খেয়ে ফেলল— শুধু “বিসমিকাল্লাহুম্মা” (হে আল্লাহ, আপনার নামেই) ছাড়া। জিবরাইল (আ.) নবী ﷺ–কে খবর দিলেন। আর তিনি সঙ্গে সঙ্গেই চাচা আবু তালিবকে জানালেন। আবু তালিব খবর শুনেই বানু হাশিমের যুবকদের একত্র করলেন, এবং কুরাইশ নেতাদের কাছে গেলেন। তারপর তাদের সামনে দিলেন এক প্রস্তাব— “আমার ভাতিজা আমাকে যা বলেছে, আল্লাহ তোমাদের কাবায় ঝোলানো দলিলে এক কীট পাঠিয়েছেন। আল্লাহর নাম ছাড়া সে সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। জুলুমের কথা, সম্পর্ক ছিন্নের কথা, অপবাদ—সবই সে গিলে নিয়েছে। যাও—নিজ চোখে দেখে এসো। ভাতিজার কথা সত্য হলে—আজই এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করো। আর যদি সে মিথ্যা বলে থাকে— আমি নিজ হাতে তাকে তোমাদের হাতে তুলে দেব। তোমরা চাইলে হত্যা করবে, চাইলে ছেড়ে দেবে— সিদ্ধান্ত তোমাদের।” কুরাইশরা প্রথমে বিশ্বাস করলতে পারলোনা— কিন্তু বুকের ভেতর ভয় ঢুকে গেল—সত্যও তো হতে পারে। আর আবু তালিব বলেছিলেন— খবর মিথ্যা হলে তিনি ভাতিজাকে তুলে দেবেন। তাই তারা তড়িঘড়ি করে কাবার দিকে ছুটলো। বরাবরের মতো—কাবার দরজা ছিল তালাবদ্ধ। তারা তালা খুলে ঢুকল, দেয়ালে ঝোলানো দলিলটার দিকে তাকাল। আর দেখল—আল্লাহ আবারও তাঁর রাসূল ﷺ–কে মিথ্যা প্রমাণীত হতে দিলেন না। নিজ চোখে তারা দেখল—আবু তালিব যা বলেছিলেন, তাই সত্যি। তবু এতটা স্পষ্ট হয়েও— তারা এটাকে মু‘জিজা মানতে রাজি হলো না। বরং বলল—“এটাতো জাদু ছাড়া আর কিছুই নয়।” তারপর ঘোষণা হলো—চুক্তি বাতিল, বয়কটও উঠে গেছে। আজ থেকে অবরোধ উঠে গেলো। কিন্তু শেষপর্যন্ত কি হল?

এই তিন বছরে রাসূলুল্লাহ ﷺ বাইরের মুসাফিরদের মাঝেই শুধু বার্তা পৌঁছাতে পেরেছিলেন। খোলাখুলি ইসলামের দাওয়াত দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবু ধৈর্য আর সংগ্রামে তিনি বহু হৃদয়ে ঈমানের বীজ বুনে দিলেন। আর তাঁর নিষ্ঠা দেখে— অনেকে প্রকাশ্যে এসে ঈমানের ঘোষণা দিলেন। এই পরিস্থিতিতে এখন ভাবুনতো—এ সব দেখে কুরাইশরা কী ভাবছিল? নবী ﷺ যিনি একসময় মক্কার সম্মানিতদের একজন ছিলেন, আজ তাঁকে বলা হচ্ছিল—মিথ্যাবাদী, জাদুকর। তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সম্পদ-সম্মানের সব প্রস্তাব। আর সহ্য করেছিলেন—নির্যাতনের ভয়াবহতম রূপ। কেউ কি মিথ্যার জন্য এতটা সহ্য করতে পারে?

মিথ্যা সবসময় কোনো লাভের সুতোয় বাঁধা থাকে। কিন্তু নবী ﷺ–এর জীবনে— ছিল শুধু কষ্ট, আর শুধু পরীক্ষা। মিথ্যা ফাঁস হওয়ার ভয়ে মিথ্যাবাদীতো সুযোগ খুঁজতে থাকে, আর এই মানুষটা বেছে নিয়েছিলেন—ত্যাগ আর সংগ্রাম। দুনিয়ার লাভ যদি লক্ষ্য হতো, অন্য পথেই তো সহজে সুউচ্চ মর্যাদা পেয়ে যেতেন। কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই—আল্লাহর দ্বীন পৌঁছে দেওয়া। মানুষকে চিরস্থায়ী সুখের পথে ধাবিত করা। এবার খাদিজা (রা.)–এর দিক থেকেও দেখুন— তিনি কেন এসব বেছে নিলেন? কেন নিজের সব সম্পদ এই পথে ঢেলে দিলেন? যদি তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর মধ্যকার সত্যটা দেখতে না পেতেন— তবে কি তাঁকে স্বেচ্ছায় এতসব কষ্ট সহ্য করতে হতো?

তিনি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে আপন মানুষ। অন্য সবার চেয়ে তিনি তাঁকে বেশ ভালভাবেই চিনতেন জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি। যদি—মা‘আযাল্লাহ—তিনি মিথ্যা বলতেন, তবে তিনিই সবার আগে কি বুঝতেন না? আর তাঁর মনে সামান্য সন্দেহও যদি থাকতো, তিনি কি কখনই এমন কষ্টের পথে থাকতেন?

আর শুধু খাদিজাই (রা.) নন— সারা জীবন তাঁর বন্ধু-শত্রু সবাই তাঁর প্রতিটি কথায়-কাজে সচেতন দৃষ্টি রাখতেন। কিন্ত তারা কখনই বিন্দু পরিমাণ মিথ্যার চিহ্নও পায়নি। আমরা এমন এক মানুষের কথা বলছি— যাকে এত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল যে এক গ্লাস পানি শেষ করতে তিনি কয় চুমুক দিলেন— তাও লিখে রাখা হতো। যেমন কোনো গ্রামের লোকের পক্ষে বছরের পর বছর রাজা সেজে থাকা—ধরা না পড়ে—অসম্ভব, ঠিক তেমনি কারও পক্ষে আল্লাহর রাসূল সেজে থাকা ছিল সত্যিই অসম্ভব। তিনি ছিলেন সর্বোচ্চ চরিত্র ও নৈতিকতার মানুষ। একটা মিথ্যা দিয়ে কি কেউ সত্যিই সবচেয়ে সত্যবাদী বলে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে চরিত্র সবচেয়ে দৃঢ় আর সরল। এমন ভূমিকা কি টানা ২৩ বছর একবারও ভুল না করে, ধরা না পড়ে—নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব?

তাঁর মধ্যে মিথ্যাবাদীর সামান্যতম চিহ্নও পাওয়া যায়নি। এই কারণেই যারা সত্য দেখেছিল তারা ঈমান এনেছে, আর যারা চোখ থাকতেও অন্ধ থেকেছে, তারাই কেবল শত্রুতা করে গেছে। অবরুদ্ধ অবস্থা শেষ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ অবশেষে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু নতুন এক পরীক্ষা ঠিক তখনই শুরু হলো। নবীর প্রিয় চাচা আবু তালিব ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ চাচার অবস্থা শুনে ভেতর থেকে কেঁপে উঠলেন। আবু তালিব সবসময় তাঁকে আগলে রেখেছেন, মক্কার বাড়তে থাকা আক্রোশ আর হুমকির সামনে কখনও পিছু হটেননি। কিন্তু এবার তিনি নাফেরার পথে চলে যাচ্ছেন। আর এখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। এটা নবী ﷺ–এর জন্য ছিল সবচেয়ে হৃদয়ভাঙা কষ্টের, কারণ তিনি জানতেন, চিরস্থায়ী সুখের একমাত্র চাবিকাঠি হচ্ছে ঈমান। তাই তিনি চাচার শয্যাপাশে থাকলেন, আর দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিলেন তাঁকে আল্লাহ্‌র পথে আনার জন্য। এদিকে মক্কার মুশরিকরাও চিন্তিত হয়ে উঠল। কারণ আবু তালিব যদি ইন্তিকাল করেন, তাহলে তাদের আর রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর মধ্যে মধ্যস্থতা করার আর কেউ থাকবে না। তাই তারা চাইছিল, মৃত্যুর আগেই বিষয়টা মিটে যাক। তারা বারবার আবু তালিবের কাছে আসত, আর অনুরোধ করত— তিনি যেন ভাতিজাকে বলেন যেন প্রচার ছেড়ে দেয়। তাদের কথা শুনে, একদিন আবু তালিব রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে ডেকে বললেন— “হে আমার ভাতিজা, তোমার কওম তোমার কাছে এসেছে। তারা তোমার কাছে একটি দাবি রাখছে, আর বদলে কিছু দিতে প্রস্তুত।” রাসূলুল্লাহ ﷺ জবাব দিলেন— “তাহলে চাচা, আমি তাদের কাছে যা চাই, তা শুধু একটি মাত্র বাক্য—একটি শব্দ। সেই এক কথায় তারা আরব-অনারব সবার ওপর কর্তৃত্ব পাবে।” সবার মনে তীব্র কৌতূহল জাগল। সেই একটা কথা আসলে কী?

আবু জাহেল এগিয়ে এসে কঠোর ভাষায় বলল, “বলো সেই কথাটা কী, আর ওই এক কথার বদলে, আমরা তোমাকে দশগুন দেব!” তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করলেন সেই সত্য— যার জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলূন (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই), আর তাঁকে ছাড়া যাদের পূজা করেন— সেই মূর্তিগুলো নিজ হাতে ভেঙে ফেলূন।” যদিও তারা বলেছিল—“এক কথার বদলে দশগুণ দেব,” এই এক কথাই তাদের কাছে অসহ্য ভারী হয়ে দাঁড়াল। তারা একদমই পছন্দ করল না। “হে মুহাম্মদ! তুমি কি এই সব দেবতাকে এক দেবতায় নামিয়ে আনতে চাও?

তোমার কথা শুনে তো আমরা হতভম্ব!” এভাবেই তারা যা চেয়েছিল তা না পেয়ে ফিরে চলে গেল। কুরাইশরা চলে গেলে আবু তালিব বললেন “হে আমার ভাতিজা, আল্লাহর কসম, তুমি তাদের কাছে যা চেয়েছ, তার মধ্যে আমি সত্য আর ইনসাফের বিরুদ্ধে কিছুই দেখছি না।” এ কথা শুনে নবী করিম ﷺ আশা করে ছিলেন— হয়তো চাচা ঈমান আনবেন। তিনি বললেন, “হে আমার চাচা, অন্তত আপনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলুন, যাতে আখিরাতে আমি আপনার জন্য সুপারিশ করতে পারি।” কিন্তু দুঃখজনকভাবে, চাচা সেই উত্তরটা দিলেন না যা নবীর হৃদয়কে প্রশান্ত করে। বরং বললেন, “হে আমার ভাতিজা, আমি চলে যাওয়ার পর লোকেরা যেন তোমাকে আর আমাদের পূর্বপুরুষদের অপমান না করে— আর কুরাইশ যেন মনে না করে, আমি শুধু মৃত্যুভয়ে কালেমা পাঠ করেছি। এই ভয় না থাকলে, আমি নিশ্চয়ই তোমার কথা মেনে নিতাম।” এভাবেই ইসলাম একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থেকেও, শুধু কেবল মানুষের কথার ভয়েই আবু তালিব থেমে গেলেন। আর অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে—তিনি ঈমান আনলেন না। তারপরও রাসূলুল্লাহ ﷺ বারবার তাঁকে বলতেন— “হে আমার চাচা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলুন, প্লিজ!

যাতে আখিরাতে আমি আপনার জন্য সুপারিশ করতে পারি।” কিন্তু তিনি বোঝানোর চেষ্টা করতেই, আবু জাহেল আর আব্দুল্লাহ ইবন উমাইয়া সেখানে এসে পড়ে। “হে আবু তালিব!

তুমি কি আব্দুল-মুত্তালিবের দীন থেকে ফিরে যাবে?” কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ বারবার উনাকে ডাকতে থাকলেন—বারবার লাগাতার। সবশেষে আবু তালিব বললেন— “তিনি আব্দুল-মুত্তালিবের দীনেই থাকবেন।” আর তারপরই তিনি ইন্তিকাল করলেন। তাঁর বয়স ছিল আশির কোঠায়। নবী ﷺ–এর ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল—যেন হঠাৎ এক তীব্র শূন্যতা। আবু তালিবের সহায়তার মূল্য ছিল অপার। আট বছর বয়স থেকে তিনি চাচার আশ্রয়েই বড় হয়েছেন। সব চাপের মাঝেও আবু তালিব সবসময় তাঁর পাশে ছিলেন, সবসময় মমতা আর করুণা দেখিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ভালোবাসা ছিল ভাতিজা মুহাম্মদের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে নয়। তাই তিনি কালেমা পাঠ না করেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। নবী ﷺ–এর বুকে তাই জমে রইল এক ভীষণ ভারী শোক। তিনি কিছুদিন ঘরেই থাকলেন, বাইরে বেরই হলেন না। আবু তালিবের ইন্তিকালের মাত্র তিন দিন পর, আমাদের মাতা খাদিজা (রা.)–ও ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চাচার শোক তখনও নবী ﷺ–এর অন্তরে সতেজ, তার ওপর প্রিয় স্ত্রীর অসুস্থতা তাঁকে আবারও ভীত করে তুললো। জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গিনী। বয়কটের দীর্ঘ বছরগুলো তাঁকে ভীষণ দুর্বল আর ক্লান্ত করে ফেলেছিল। তাঁর বয়স ছিল তখন ৬৫ বছর। নবী ﷺ তাঁর একেবারে কাছেই ছিলেন, তাঁর ব্যথা লাঘব করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁকে স্বস্তি দিতে যা সম্ভব—সবই করছিলেন; কিন্তু দিন দিন, তাঁর অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছিল। স্পষ্ট হয়ে উঠছিল—এই অসুস্থতা কোন পরিণতির দিকে যাচ্ছে। এগুলো ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গিনীর শেষ দিনগুলো— যিনি ২৫ বছর ধরে তাঁর পাশে পাশে হেঁটেছিলেন। খাদিজা (রা.) তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো, শ্রেষ্ঠ বছরগুলো কাটিয়েছেন নবীজীর সাথেই। এ ছিল এমন এক দাম্পত্য— যেখানে অনুশোচনার একটা মুহূর্তও ছিল না। সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে সান্ত্বনা দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন। সুখে-দুঃখে—তিনি তাঁকে সবসময় পাশে পেয়েছেন। খাদিজা ছিলেন তাঁর নিরাপদ আশ্রয়— যার কাছে তিনি বারবার ফিরে যেতেন। প্রথম ওহির রাতে তিনি বলেছিলেন: “আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও।” আর আজ—ঢেকে দেওয়ার পালা ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর। নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ—খাদিজা (রা.), ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে, ৬৫ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। পরবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেন: “নিজ যুগের শ্রেষ্ঠ নারী ছিলেন মারইয়াম ঈসা (আ.)–এর মা, আর এ যুগের শ্রেষ্ঠ নারী খাদিজা।” এই দুটো ক্ষতি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর ওপর এতটাই ভারী হয়েছিল, যে তিনি নিজেই ওই বছরকে নাম দিয়েছিলেন—“শোকের বছর”। মনে হচ্ছিল—তাঁর দুটো ডানাই যেন ভেঙে গেছে। আবু তালিবের সমর্থন ছাড়া, কুরাইশরা আরও খোলামেলা ভাবে অপমান আর নির্যাতন চালানোর সুযোগ পেয়ে গেল, আগের চেয়েও বেশি। দিনে দিনে নির্যাতন আরও কঠোর হতে লাগল, আর নবী ﷺ মক্কায় আর নিজের দাওয়াতের কাজ স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে পারছিলেন না। দশ বছরের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কুরাইশরা বদলায়নি। আর মুসলিমরা যতক্ষণ সংখ্যালঘু থাকবে, তাদের মনোভাব বদলাবে এমন সম্ভাবনাও খুব কম ছিল। তিনি খুঁজছিলেন নতুন এক পথ। এমন এক নতুন ভূমি—যেখানে ইসলাম সহজে ছড়াবে, আর পৌঁছাবে আরও বহু মানুষের কাছে। অবশেষে সেই সময় এসে গেল। যে দিনগুলোকে নবী ﷺ বলেছেন— “আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন।” হাদিসে তিনি বলেছেন: “পরীক্ষায় সবচেয়ে কঠিনভাবে আক্রান্ত হন প্রথমে নবীরা, আর তারপর যারা তাদের পরের সবচেয়ে উত্তম, তারপর তার পরের উত্তমরা নিজ নিজ দ্বীনি দৃঢ়তা অনুযায়ী।” মানুষ কল্পনা করতে পারে—ঝুম বৃষ্টিতে আটকে যাওয়ার কথা, যেখানে বৃষ্টি নামে বন্যার মতো। কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারে না— পাথরের ঝড়ে আটকে যাওয়ার ভয়াবহতা। অসংখ্য পাথর ছুটে এসে যন্ত্রণায় শরীরে আঘাত করছে, আর আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। ভাবলেও কি গা শিউরে ওঠে না?

এই কঠিন পরীক্ষাই নেমে আসতে যাচ্ছে এবার, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর ওপর। তিনি এমন নির্যাতনের মুখোমুখি হবেন—যার তুলনা নেই। সবই তাঁর উম্মতের জন্য। তিনি এমন কষ্ট সহ্য করবেন—যা আগে কখনও করেননি। রক্তে ভিজে যাবেন, আর সেই দিনকে বলবেন— “আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন।” এই বেদনাময় সফর হয়েছিল—তায়েফের পথে। প্রথম বিপ্লবের পর দশ বছর কেটে গেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ সম্ভাব্য সব পথেই চেষ্টা করেছেন। তবুও মুসলিমদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০ জনের মতো। কেউ মক্কায়, কেউ হাবশায়, আর কেউ অন্য গোত্রে— তারা ছিল একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন। কুরাইশদেরর শত্রুতার পরিবেশে, একসাথে শান্তিতে থাকা একেবারেই অসম্ভবই মনে হচ্ছিল। মক্কার জনসংখ্যার তুলনায় তারা এক-দশমাংশও ছিল না। আর পুরো আরব উপদ্বীপে তারা ছিল আরও ক্ষুদ্র এক সংখ্যালঘু। কিন্তু লক্ষ্য কখনও শুধু ওই অঞ্চল ছিল না— লক্ষ্য ছিল পুরো পৃথিবী। দশ বছরের চেষ্টা সত্ত্বেও কুরাইশরা একটুও বদলায়নি। আর মুসলিমরা যতক্ষণ সংখ্যালঘু থাকবে, তাদের মনোভাব বদলাবে—এমন আশা খুব কমই ছিল। তাই তিনি খুঁজছিলেন নতুন এক যাত্রাপথ— এমন এক নতুন ভূমি, যেখানে ইসলাম সহজে ছড়াবে এবং পৌঁছাবে আরও বহু মানুষের কাছে। এই নতুন ভূমি হবে মক্কার খুব কাছাকাছি, আর তা কুরাইশদের সাথেও ছিল দৃঢ়ভাবে যুক্ত। এতে তাদের জন্য ইসলাম গ্রহণ করা আরও সহজ হতে পারত। আর ঠিক এই কারণেই নবী ﷺ বেছে নিলেন তায়েফ। মক্কা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরের এক শহর। যে শহরটি বিখ্যাত ছিল আঙুরের বাগান আর মনোরম উদ্যানের জন্য। এবং কুরাইশদের সাথে ছিল শক্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ক। তাই যদি তায়েফ ইসলাম গ্রহণ করত, তাহলে মক্কায় ইসলাম ছড়ানোও আরও সহজ হয়ে যেত। এই আশায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পোষ্যপুত্র যায়েদকে সঙ্গে নিলেন, এবং পায়ে হেঁটেই তায়েফের পথে রওনা হলেন। তায়েফে তখন ক্ষমতার আসনে ছিল তিন ভাই— আব্দ ইয়ালিল, মাসউদ ও হাবিব। রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রথমে এই তিন প্রভাবশালীর সাথেই দেখা করতে চাইলেন। তাই তিনি তাদের কাছে গেলেন। তিনি তাদের জানালেন—তিনি আল্লাহর রাসূল। তারপর তিনি তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন, এবং এই দ্বীন ছড়িয়ে দিতে তাদের সহযোগিতা চাইলেন। এটা ছিল তাদের জন্য বিশাল এক সুযোগ। কারণ তারা ঈমান আনলে ভালো হতো কারণ, এ অঞ্চলের বহু মানুষ তাদের অনুসরণ করে, তারপর কুরাইশদেরর জন্যও ইসলাম গ্রহণ করা সহজ হয়ে যেতে পারত। তারা হতে পারত সব বন্ধ দরজা খোলার চাবি। কিন্তু তারা সেই সুযোগকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে দিল। কিন্তু তারা সেই সুযোগকে পদদলিত করল— অহংকারে রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে বিদ্রূপ করতেও শুরু করল। তারা কুরাইশরা যা বলেছিল, তার চেয়েও ভয়ংকর কথা বলতে লাগলো। “আল্লাহ যদি সত্যিই আপনাকেই নবী হিসেবে বেছে নিয়ে থাকেন, তাহলে আমার তো কাবার পর্দা ছিঁড়ে ফেলাই উচিত!” এটা ছিল ভীষণ জঘন্য কঠোর এক ভাষা। আরবদের কাছে এর মানে ছিল— অপমানের একেবারে তলানিতে নেমে যাওয়া। “আল্লাহ কি আর কাউকেই পাননি নবী বানানোর মতো আপনাকে ছাড়া?” “আল্লাহর কসম, আমি আপনার সাথে আর কথা বলব না— কারণ আপনি যদি সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নবী হন—যেমনটা দাবি করছেন— তাহলে আপনাকে অস্বীকার করে আমি নিজেকেই বড় বিপদে ফেলব। আর আপনি যদি আল্লাহর নামে মিথ্যা বলেন— নিজেকে আল্লাহর রাসূল দাবি করেন— তাহলে আপনার সাথে কথা বলার কোনোই কারণ নেই।” তাদের হৃদয় অন্ধকারে ঢেকে ছিল । আর তারা যাই বলছিল, তা নবী ﷺ–এর হৃদয়ে গভীর আঘাত করে যাচ্ছিল। তিনি সেখানে দশ দিন ছিলেন—বাড়ি বাড়ি গেছেন, তায়েফের নেতাদের সাথে কথা বলেছেন। নিজের দাওয়াতের উদ্দেশ্য বুঝিয়েছেন—কিন্তু সবার জবাব ছিল একই। আর নেতারা যখন ঈমান আনতে অস্বীকার করল, তাদের লোকজনও দূরে সরে রইল। এমনকি তারা এমন পর্যায়েও পৌঁছাল— যেখানে তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে আর সহ্যই করতে পারছিল না। তারা ভয় পেল যদি যুবকদের মন বদলে যায়। তাই বলল: “আমাদের ভূমি থেকে বেরিয়ে যান!

যেখানে ইচ্ছে চলে যান—কিন্তু আর কখনও ফিরে আসবেন না। আপনার নিজের লোক, নিজের গোত্র—যখন আপনার কথা মানেনি, তখন আপনি দৌড়ে আমাদের কাছে এসেছেন! আল্লাহর কসম, আমরাও যতটা পারি আপনার থেকে দূরে থাকব, আর আপনি যা চান—তা কখনও গ্রহণ করব না।” একটা গোত্র কি করে এতটা নির্মম হতে পারে?

কিন্তু এটাই তাদের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা ছিল না। তারা সন্ত্রাসী আর সব বয়সের শিশুদের জড়ো করল, এবং রাস্তার দু’পাশে তাদের সারি করে দাঁড় করাল। তাদের হাত ছিল পাথরে ভর্তি। সেই অন্ধকার দিনে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন এক দৃশ্যের মুখোমুখি হলেন— যা তিনি কল্পনাও করেতে পারেননি। আর অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা নির্দয়ভাবে, পাথর ছুঁড়তে শুরু করল। পাথর, থুতু, গালি আর হাসি ভয়ংকর এক মুহূর্ত। তারা পিছনে দৌড়াচ্ছিল, আর অবিরাম পাথর ছুঁড়েই যাচ্ছিল। সেদিন নবীজী কী ধরনের কথা শুনেছিলেন—আমরা জানি না, কারণ সেগুলো এতটাই যন্ত্রণাদায়ক ছিল যে, তিনি আর কখনও তা উচ্চারণও করতে চাননি। জায়েদ নিজের শরীর দিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলো না। চারদিক থেকে কেবল পাথর মারা হচ্ছিলো। তিনি চিৎকার করে বললেন: “হে তায়েফবাসী!

তোমরা কি বুঝতে পারছ—যাকে পাথর মারছ, তিনি একজন নবী?” নিজের গায়ে যে পাথর লাগছিল, তা নিয়ে তার কোনো ভাবনাই ছিল না— কিন্তু যেগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে আঘাত করছিল, সেগুলোতে তাঁর হৃদয় ছিঁড়ে দিচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ আর যায়েদ—দুজনেই রক্তে ভিজে গেলেন। “হে আল্লাহর রাসূল!

আপনি কি ঠিক আছেন?” কিছুক্ষণ পর ব্যথা এতটাই অসহ্য হলো যে, নবী ﷺ–কে বসে পড়তে হলো। একবার কেবল কল্পনা করুন— পঞ্চাশ বছরের একজন মানুষ এমন আঘাত সহ্য করছেন। তিনি তো আর তরুণ নন। হাঁটার মতো শক্তিও আর অবশিষ্ট ছিল না। তবু জালিমরা থামেনি। এমনশোচনীয় অবস্থায় তারা তাঁকে আবার দাঁড় করাল, আর আবারও তারা পাথর বর্ষণ করল। তারা হাসছিল—এসব যেন উপভোগ করছিল। তাঁর পা দুটো রক্তে ঢেকে গেল। প্রতিটি পাথরই ছিল যন্ত্রণার, প্রতিবার তিনি পড়ে গেলে, তায়েফবাসী তাঁকে তুলে দাঁড় করাত, একই ঘটনা বারবার ঘটতে থাকল শুধু আরও পাথর মারার জন্য। এভাবেই চলল আড়াই কিলোমিটার জুড়ে, মানে তিন হাজারেরও বেশি পদক্ষেপ। ভাবা যায়? জায়েদের মাথা ফেটে গেল, তবু তাঁর শুধু মনে হচ্ছিল, “আহ্‌!

এই পাথরগুলো যদি কেবলই আমার গায়েই লাগত!” অবশেষে, রাস্তার প্রায় শেষদিকে, তারা একটি আঙুর-বাগান পেলেন, আর দ্রুত তার ভেতরে ঢুকে আশ্রয় নিলেন। এভাবেই কেবল তারা অবশেষে পালাতে পারলেন। তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ ক্লান্ত, আর শরীর জুড়ে ছিলো শুধু রক্ত। প্রতিবার জায়েদ ইবন হারিসা (রা.)–র রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর দিকে তাকালেই তাঁর হৃদয় ভেঙে যাচ্ছিল। আর ভাঙবে না-ই বা কেন? আপনার নবী সামনে রক্তে ভেজা, আর আপনি কিছুই করতে পারছেন না। আমার অসহায়ত্ব,আর তা মানুষের চোখে আমার অপমান। আঙুর-বাগানের ধারে এসে তারা একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পেলেন। তারা ক্ষত ধুয়ে নিলেন, নিজেদেরকে পরিষ্কার করলেন। জানেন, সেখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ আর কী করলেন?

তিনি জানতেন—সত্যিকারের প্রশান্তি তাই তিনি ওযু করলেন, আর দুই রাকাত নামাজ পড়লেন, আর আকাশের দিকে হাত তুললেন। এতো কষ্ট, এতো নির্যাতন—সব উজাড় করে দিলেন নিজের রবের কাছে। “হে আল্লাহ! শুধু তোমার কাছেই আমি আমার দুর্বলতার অভিযোগ করছি, আমার অসহায়ত্বের, আর মানুষের চোখে আমার অপমানের।” হে আল্লাহ! তুমি তো সবচেয়ে দয়ালু, তুমি তো নিপীড়িতদের রব। “হে আল্লাহ! তুমি আমাকে কার হাতে সোপর্দ করছ? একজন অপরিচিতের হাতে, যে আমাকে শত্রু হিসেবে বেছে নিয়েছে? নাকি এমন কোনো নিকট আত্মীয়ের হাতে, যাকে তুমি আমার ওপর ক্ষমতা দিয়েছ? হে আল্লাহ!

যতক্ষণ তুমি আমার ওপর রাগান্বিত নও, ততক্ষণ আমার কোনো ভয় নেই। তবে তোমার আশ্রয় আমার জন্য আরও প্রশস্ত—আর আরও সহজ।” এমন মুহূর্তেও তিনি ভাবলেন শুধু আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার কথা। তিনি বিদ্রোহ করেননি। বরং নিজের মধ্যেই খুঁজছিলেন দোষত্রুটি। এই দুনিয়া তো কেবল একটা পরীক্ষারই জায়গা। আর প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তিনি আশ্রয় নিতেন শুধু তাঁর রবের কাছে। আল্লাহর বান্দা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করতেন সর্বোচ্চভাবে। সূরা আল-বাকারায় বলা হয়েছে: “হে ঈমানদাররা, ধৈর্য আর নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই, আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” তাই নবীজী ঠিক সেটাই করেছিলেন। তিনি ধৈর্য আর নামাজ দিয়ে আল্লাহর সাহায্য চাইছিলেন। কারণ তিনি জানতেন—বড় সাহায্য আসে কেবল ধৈর্যের ফলেই। নামাজ শেষ হতেই তাঁরা দেখলেন—কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাকে পাঠিয়েছিলেন সেই বাগানের মালিকগন, যেখানে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু বাগানের মালিক কারা?

মক্কার দুই ভাই—উতবা আর শাইবা। তারা সবকিছু দেখেছিলেন এতক্ষনধরে, আর আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর জন্য তাদের মনে দয়া জেগেছিল। তাই তারা তাদের দাস আদ্দাসকে আঙুরের একটি থালা পাঠাল। “আদ্দাস, এই আঙুরগুলো ওদের কাছে নিয়ে যাও।” ভাবুন—সেই অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর আঙুর কতটা প্রয়োজন ছিল!

তবু সেই অবস্থাতেও তিনি একটি কথাও ভুললেন না এই বাগান-আঙুরের আসল মালিক সবকিছুকেই। তিনি বললেন: “বিসমিল্লাহ”— আর খেতে শুরু করলেন। আদ্দাস শুনেই চমকে উঠল। সে বলল: “আল্লাহর কসম, এই এলাকার লোকেরা এসব কথা জানে না—বলে না!” রাসূলুল্লাহ ﷺ তার বিস্ময় দেখে তার নাম জিজ্ঞেস করলেন। তারপর বললেন: “হে আদ্দাস, তুমি কোথাকার?” সে বলল: “আমি নিনেভাহর।” রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “তাহলে তুমি তো ইউনুস ইবনে মাত্তার শহরের মানুষ!” আদ্দাস এবার আরও বেশী চমকে উঠল আর বললো, “আপনি ইউনুস ইবনে মাত্তাকে কীভাবে চেনেন?” তার চোখে আলো দেখে নবী ﷺ বললেন, “ইউনুস ইবনে মাত্তা একজন নবী। আর নবীরা—আমার ভাই।” সে যা দেখল, যা শুনল—তার হৃদয় যেন খুলে গেল। তার দৃঢ় বিশ্বাস হলো— আল্লাহর রাসূল ﷺ সত্য দ্বীন নিয়েই এসেছেন। সে বলল: “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।” ঠিক তখনই—একজন মানুষের হেদায়েত সেদিনের সব কষ্টের ওপর একটা ঠান্ডা পরশ হয়ে নামল। সম্মানে আঘাত, অপমানের তীর, দীর্ঘ পথের সেই অতুলনীয় যন্ত্রণা— একজনের শাহাদাহ সব ব্যথাকে হালকা করে দিল। পরে রাসূলুল্লাহ ﷺ এভাবে বর্ণনা করেছিলেন, “আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে একজন মানুষও যদি হিদায়াত পায়, তবে তা তোমার জন্য উত্তম—অনেক লাল উটের চেয়েও।” অর্থাৎ—সে যুগের সবচেয়ে দামী সম্পদের থেকেও বেশি মূল্যবান। রাসূলুল্লাহ ﷺ আর যায়েদ ইবনে হারিসা ফিরে চললেন মক্কার দিকে। নবী ﷺ ছিলেন গভীর চিন্তায়। তিনি জানতেন—মক্কায় ফিরে সবকিছু সহজ হবে না। তায়েফের খবর শুনলে কুরাইশদের চাপ আরও বাড়াবে— এটা তিনি নিশ্চিতই ছিলেন। এই চিন্তা নিয়েই পথ চলতে চলতে— জিবরীল (আ.) মেঘের ভেতর থেকে অবতীর্ণ হলেন এবং বললেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ শুনেছেন আপনার কওম আপনাকে কী বলেছে। তিনি আপনার কাছে পাঠিয়েছেন পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাকে। তাদের ব্যাপারে আপনি যা চাইবেন, তাকে তাই আদেশ করতে পারবেন।” তারপর পাহাড়ের ফেরেশতা বললেন—রাসূলুল্লাহ ﷺ চাইলে, আবু কুবাইস আর কুয়াইকাআন— দুই পাহাড় একসাথে চেপে ধরে সে এদের চূর্ণ করে দিতে পারে। কিন্তু নবী ﷺ বললেন, “না। আমি এটা চাই না। আমি শুধু চাই—পরাক্রমশালী আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন এক প্রজন্ম বের করুন, যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে আর তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।” এখন কল্পনা করুন, আড়াই কিলোমিটার পথ পাথরের আঘাত খেয়ে, রক্তে ভেজা, নিঃসহায় এক মানুষ। আমাদের সামনে যদি এমন সুযোগ রাখা হতো— আমাদের কতজন রাগ গিলে ফেলতে পারতাম?

কিন্তু তিনি ছিলেন—রহমতের নবী। তিনি নিজের ব্যথা, প্রতিশোধের ডাক—সব সরিয়ে রেখে, ভাবলেন—হয়তো একদিন তায়েফবাসীর হৃদয় খুলে যাবে। নিশ্চিত না হলেও—এই আশাটাই তাঁর কাছে যথেষ্ট ছিল। আর এই আয়াত নবী ﷺ–এর সেই দিকটাই বর্ণনা করে, “আমি আপনাকে পাঠাইনি কেবলমাত্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত করে।” আর আল্লাহও তাঁর আশা অপূর্ণ রাখলেন না। একটা সময়ে—তায়েফবাসিরাও ইসলাম গ্রহণ করল। এটি ছিল রজবের ২৭তম রজনী, নবুয়তের ১১তম বছর। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন নিজ চাচাতো বোন উম্মে হানীর ঘরে। এতসব কষ্টের পর, তিনি একটু বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলেন—শক্তি ফিরে পেতে চেয়েছিলেন। কারণ বিগত ১১ টা বছর একদমই সহজ ছিল না। নির্যাতন, অপমান, সব ধরনের যন্ত্রণা— বহিষ্কারের বছরগুলো, শোকের বছর, আর তায়েফ— তাঁর একমাত্র ভরসা ছিলেন— একমাত্র আল্লাহ। আর সেই নিঃসঙ্গ মুহূর্তে এটা তিনি আরও গভীরভাবে অনুভব করলেন। তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন—আসন্ন ঘটনার কিছুই জানতেন না। ইতিমধ্যেই জিবরীল (আ.) পেয়েছেন মহান সেই আদেশ, আর তিনি রওনা হয়েছেন আল্লাহর রাসূল ﷺ–এর দিকে। মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এক মু‘জিজা ঘটতে চলেছিল। বান্দা যখন ছিল সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে, আল্লাহ তাকে দিতে যাচ্ছিলেন সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা। এটাই তো তাঁর নিয়ম— কষ্টের সাথে আসে স্বস্তি। হঠাৎ, জিবরাঈল (আ.) আবির্ভূত হলেন, এবং আল্লাহর রাসূল ﷺ–কে জাগিয়ে দিলেন। কিন্তু এই আগমন ছিল অন্য সব আগমনের মতো নয়। আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাকে ডেকে নিচ্ছিলেন নিজের সান্নিধ্যে। যে কষ্ট তিনি সহ্য করেছেন—সব শেষে, এবার নবী ﷺ–কে ডাকা হচ্ছিল এমন এক সফরে, যা তাঁর হৃদয়ে শান্তি আর রূহে প্রশান্তি এনে দেবে। এই যাত্রার জন্য জিবরাঈল (আ.) এনেছিলেন “বুরাক” নামের একটা বাহন। তারপর তিনি নবী ﷺ–কে তার ওপর বসালেন। আর গন্তব্য—আল-মাসজিদুল আকসা, যে ভূমি যুগে যুগে নবীদের পদচিহ্নে ধন্য। এভাবেই শুরু হলো—সেই অনন্য রাতের যাত্রা। মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা— দূরত্ব প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটার। সেই যুগে এই পথ পাড়ি দিতে লাগত—প্রায় ৩০ দিন। কিন্তু এটা কোনো সাধারণ সফর ছিল না। আল্লাহর অনুমতিতে— নবী ﷺ কয়েক মুহূর্তেই সেখানে পৌঁছে গেলেন। সময় আর স্থানের মালিক যখন আল্লাহ— তখন “অসম্ভব” শব্দটা ভেঙে পড়ে। প্রকৃতির নিয়ম আমাদের জন্য— যিনি নিয়ম সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিয়মের অধীন নন। তিনি চাইলে মুহূর্তকে দিন বানান—দিনকে মুহূর্ত। মাসজিদুল আকসায় পৌঁছে আল্লাহর রাসূল ﷺ দেখলেন— এক অতুলনীয় দৃশ্য। ইতিহাসের সব নবী— সেই মুহূর্তে তাঁর সামনে উপস্থিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এগিয়ে গেলেন— আর সকল নবীকে নামাজে ইমামতি করালেন। ভাবুন—নবীরা সারিবদ্ধ…

আর সামনে আল্লাহর রাসূল ﷺ দুই রাকাআত নামাজ জামাতে আদায় করছেন। এ ছিল এক ঘোষণার মুহূর্ত—শেষ নবীই এখন পথপ্রদর্শক। কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মানবজাতির জন্য। জিব্রাইল (আ.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জাগিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত থেকে এই পর্যন্ত— এই রাতের সফরটিই “ইসরা”। এখানেই ইসরা সমাপ্ত। এবার শুরু হতে চলল—পরবর্তী ধাপ। মিরাজ। তারপর জিব্রাইল (আ.) নবী ﷺ-কে “হাজারুল মু‘আল্লাক” নামে পরিচিত এক শিলাখণ্ডের ওপর। আর সেখান থেকেই শুরু হলো আসমানের দিকে আরোহন। আল্লাহর রাসূল ﷺ সাত আসমান অতিক্রম করতে যাচ্ছেন। প্রতিটি স্তরে—ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য, সৃষ্টির বিস্ময়কর জগৎ, আর আল্লাহর কুদরতের গৌরবময় প্রকাশ। তিনি সাক্ষাৎ করবেন কিছু নবীর সাথে— যাদের তিনি “ভাই” বলে সম্বোধন করতেন। তারপর পৌঁছাবেন—কাবা কাওসাইনের সীমানায়। আর শেষে পাবেন এমন এক সম্মান— যা আগে কখনো কোনো বান্দাকে দেওয়া হয়নি। তিনি অন্য জগতে প্রবেশ করবেন এবং স্বয়ং আল্লাহ আজ্জা ওয়াজালের সাথে দেখা করবেন। মিরাজের কথা পড়তে পড়তে মনে হয়— সেই রাতে কত অসাধারণ ঘটনা ঘটেছিল!

কিন্তু তারপরই মনে পড়ে— আল্লাহর ক্ষমতার সামনে অসাধারণ বলতে কী থাকে? তিনি আকাশ সাজিয়েছেন অগণিত নক্ষত্রে— যার সংখ্যা কল্পনারও বাইরে। তিনি গ্রহগুলোকে পরিচালনা করেন নিখুঁত নিয়মে। পৃথিবী ঘোরে—তবু কিছুই ছিটকে পড়ে না, তিনি একটাকেও সংঘর্ষে যেতে দেন না। তিনি একটি তারা সৃষ্টি করেন—একটি ফুলের মতোই সহজেই। আর তিনি গ্রিহের মতো শৈল্পিকতা দিয়ে একটি ফুল তৈরী করেন। প্রতি বসন্তে তিনি মরা মাটিকে জাগিয়ে তোলেন— অসংখ্য প্রাণকে রিজিকে টিকিয়ে রাখেন একটুও বিশৃঙ্খলা ছাড়া। আর তবুও—তিনি ভুলে যান না একটি ক্ষুদ্র পোকামাকড়কেও। তার রিজিকও পৌঁছে যায়। একসাথে অগণিত প্রয়োজন—একসাথে পূরণ হয়। এক কাজ অন্য কাজ থেকে তাঁকে থামায় না। তাহলে এমন শক্তির সামনে কি-ই বা কঠিন হতে পারে? তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ-কে এই সফরে নেওয়া— তা কি তাঁর জন্য কঠিন?

কখনই না। অবশেষে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাঁকে দেখানো সবকিছু প্রত্যক্ষ করলেন, তারপর তিনি ফিরে এলেন। আবারও জিব্রাইল (আ.) ছিলেন তাঁর সাথে। তিনি আসমান থেকে নেমে এলেন মাসজিদুল হারামে। আর সেখান থেকে ফিরে গেলেন নিজের বিছানায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তবুও ইসলামের জন্য নতুন কোনো ভূমি খুঁজে পেলেন না। এখন কী করবেন তিনি?

এটা ছিল নবুয়তের ১১তম বছর। তিনি দাওয়াত কিন্ত থামাননি, আর শত্রুরাও তাদের জেদ ছাড়েনি। এরপর হজ্জের মৌসুম এলো। সে বছরও হাজারো মানুষ আরব উপদ্বীপের নানা প্রান্ত থেকে মক্কায় হজ্জ করতে এলো। এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর জন্য এক বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ দেখা করতে লাগলেন গোত্রপ্রধানদের সাথে, আর তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। আর আল্লাহ তাঁর রাসূলের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে দেবেন না। তিনি সামনে এনে দেবেন ছয়জন বিশেষ মানুষ। এই ছয়জন কী কিছুর সূচনা করবে?

সময় এলে—সবকিছু আত্মপ্রকাশ করবে। তবে মনে রাখতে হবে— এ ছয়জনকে পাওয়ার আগে পথ ছিল অনেক কঠিন। হজ্জের প্রায় এক মাসজুড়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিরলস পরিশ্রম করলেন। তিনি একের পর এক দশটিরও বেশি গোত্রের তবুতে প্রবেশ করছিলেন। তাঁবুতে তাঁবুতে ঢুকে নিজেকে পরিচয় দিতেন, মিশন বুঝাতেন। তিনি খুঁজছিলেন এমন এক আশ্রয়— যারা দাওয়াতকে সমর্থন করবে, আর হিজরতের দরজা খুলে দেবে। এদিকে তিনি প্রকাশ্যে দাওয়াতও চালিয়ে গেলেন। তিনি ডাক দিতেন: “হে আল্লাহ্‌র বান্দাগণ!

বলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তোমরা সফল হবে!” যেখানেই তিনি যেতেন—মানুষ তাঁর কণ্ঠ শুনে এগিয়ে আসত। ভিড় জমে যেত চারপাশে। তবুও—কেউ সাড়া দিল না। শুধু একটি কণ্ঠ শোনা যেত— যে তাঁকে অনুসরণ করত ছায়ার মতো। কিন্তু সমর্থনের জন্য নয়—মানুষকে দূরে সরানোর জন্য। সে তাঁবু থেকে তাঁবুতে চিৎকার করত— “মুহাম্মদ তার পূর্বপুরুষদের ধর্ম ছেড়ে দিয়েছে!” “ও মিথ্যা বানিয়ে বলছে!

ওকে বিশ্বাস করো না!” এই কণ্ঠস্বর ছিল তাঁর চাচা—আবু লাহাবের। ততদিনে তার জীবনের একটাই লক্ষ্য— নবী ﷺ-কে অস্বীকার করা, আর ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। দিন-রাত, একই আক্রমণ। অথচ বিশ্বাস করত—মৃত্যুর পর কিছুই নেই। তবু ঘৃণা তাকে এমন অন্ধ করেছিল যে নিজেকে শেষ করে দিয়েও সে এই পথ ছাড়েনি। তার এই একাগ্রতা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে— মিথ্যার জন্য যদি সে এত দৌড়াতে পারে, আমি সত্যের জন্য কতটা দৌড়াই?

এই প্রশ্নটাই বুকের ভেতর কাঁটা হয়ে থাকে। কিছু গোত্রপ্রধান নবী ﷺ-কে তুচ্ছ করত, আর তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলত। কেউ পূর্বপুরুষদের পথ ছাড়তে চাইত না, আর কেউ কেউ ভয় পেত— অন্য গোত্রগুলো তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। তিনি যে তাঁবুতেই প্রবেশ করতেন, সেখান থেকেই আসত নেতিবাচক উত্তর। তবু তিনি থামলেন না—পরের তাঁবুর দিকে এগিয়ে যেতেন। এভাবেই চলছিল। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক সাড়া এল শাইবান ইবন সা‘লাবাহ গোত্রের লোকদের কাছ থেকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন, তাদের এক নেতা কেঁপে উঠল, বলল— “আল্লাহর কসম, কুরাইশ ভাই আমার!

আপনি আমাকে ডাকছেন সর্বোচ্চ নৈতিকতা আর শ্রেষ্ঠ কর্মের দিকে। যারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলছে— তারা আপনার প্রতি শুধু অপবাদ আর বিরোধিতা করছে।” এরপর আরেক নেতা বলল: “হে, কুরাইশের ভাই, আমি আপনার কথাগুলো শুনেছি—আর সত্য বলে মেনে নিয়েছি।” এই কথাগুলো নবী ﷺ-র হৃদয় ভরে দিল—এক অপার্থিব আনন্দে। তাহলে কি ইসলামের জন্য আশ্রয় মিলল? সব কষ্ট কি তবে শেষ হতে চলেছে? কিন্তু ঠিক তখনই— আরেক নেতা বলল— “আমার মতে, পরিণতি না ভেবে আপনি যেদিকে ডাকছেন—তার পরিণতি না বিচার করে আমাদের ধর্ম ছেড়ে আপনার ধর্ম গ্রহণ করা— এটা ভুল সিদ্ধান্ত…

সম্পূর্ণ ভুল পদক্ষেপ। শেষ পর্যন্ত এটা হবে—মূর্খতা, আর দূরদর্শিতার অভাব।” এই এক কথায় বাকিদের মনও থমকে গেল। আর সুযোগটা হাতছাড়া হলো। শায়বান গোত্র ইসলামের প্রসারের ভূমি হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। তারা বুঝতে পারেনি—এই দ্বীন এগোয় না লাভ-ক্ষতি মাপা হাতের ভেতর দিয়ে, বরং এগোয় তাদের হাতেই— যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত। আর সেদিন থেকে ঘটনাপ্রবাহ ঠিক এভাবেই চলতে লাগল। দুনিয়া ও আখিরাতে যে সৌভাগ্য ও সফলতা তাদেরই জন্য, যারা ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। তিনি ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে থাকলেন। প্রতিবারই নতুন কোনো গোত্রের কাছে যেতেন এই বার্তা পৌঁছাতে। কিছু মানুষ তাঁর কথা যুক্তিসঙ্গত মনে করত তবু তারা বলত, “আমরা আগামী বছর আবার আসবো, আর তখন ইসলাম গ্রহণ করবো” তারা পিছিয়ে দিত—জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তকে। যে জন্য মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান। সময় গড়ালে অনেক সময় কিন্তু আগ্রহ মরে যায়। ওরা শাহাদাহ্‌ পাঠ থেকেও পিছিয়ে যেত। আর কেউ কেউ—পরের বছর দেখার আগেই হয়তো দুনিয়া ছেড়েই চলে যায়। আর ফেরার সুযোগই রইল না। এভাবে দিন গড়াতে গড়াতে হজ্জের মৌসুমও প্রায় শেষ হয়ে এলো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এখনো পেলেন না যা তিনি খুঁজছিলেন। তবুও, শীতের পরই আসে কিন্ত বসন্ত, আর রাতের পরে আসে সকাল। তো একদিন “আকাবা” নামক স্থানে তিনি দেখলেন ছয়জন যুবককে। প্রথমে তিনি জিজ্ঞেস করলেন—তারা কারা। তারা বলল: “আমরা খাযরাজ গোত্রের।” ইয়াসরিব—যাকে পরে বলা হবে মদিনা সেখানে এই গোত্রটি ছিল দুই বড় গোত্রের একটি। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন: “তোমরা কি ইহুদিদের প্রতিবেশী ও মিত্র?” তরুণরা জবাবে বলল: “হ্যাঁ।” তখন নবী ﷺ বললেন: “তাহলে কি আমরা কিছুক্ষণ বসে কথা বলতে পারি?” তারা রাজি হলো—এবং সবাই মিলে বসলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন, আর আহ্বান করলেন—তাওহীদ ও ইসলামের দিকে। এই ম্যাসেজটা তাদের কাছে অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগল। কারণ ইয়াসরিবে ইহুদিরা প্রায়ই বলত— শেষ নবী আসছেন…

আর তিনি এলে তারা তাঁকে অনুসরণ করবে, আর তারপর আরবদের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। সেই ছয় যুবক বুঝে ফেলল— শেষ নবী তো তাদের সামনেই দাঁড়িয়ে!

তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলো: “আল্লাহর কসম, এ তো সেই নবী— যার কথা ইহুদিরা আমাদের বলে আসছিল!” “আমরা যেন তাদের আগেই ঈমান আনতে পারি!” আর সঙ্গে সঙ্গেই— তারা শাহাদাহ পাঠ করলো। আস‘আদ ইবন জুরারা। আওফ ইবন হারিস। রাফি‘ ইবন মালিক। কুতবা ইবন আমির। উকবা ইবন আমির। জাবির ইবন আব্দুল্লাহ। আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। অগণিত তাঁবু আর হাজারো মানুষের ভিড়ের মধ্যে সাড়া দিয়েছিল শুধু এই ছয়জন যুবকই। তাঁরাই হলো মদিনার প্রথম মুসলিম। মদিনাতেও এই দাওয়াত প্রথম ছড়াল এই যুবকদের হাত ধরেই। তারা নবী ﷺ-র কাছে অনুমতি চাইলো, ইয়াসরিবে ফিরে গিয়ে নিজেদের লোকদের দাওয়াত দেওয়ার। এক বছর পর আবার দেখা হবে বলেই, তারা ইয়াসরিবের পথে রওনা হলো। তারা যখন নিজেদের শহরে ফিরে এলো, মুমিনরা তখন আর শুধু ছয়জন ব্যক্তি ছিলেন না। তারা হয়ে গিয়েছিলেন—ছয়টি পরিবার। কারণ ম্যাসেজটা পেয়ে তাদের ঘরও যেন ঈমানের আলো পেল। তারপর তারা শুরু করল—অন্যদের মাঝে ঈমানের বীজ বোনা। দিনে দিনে সংখ্যাটা বাড়তেই লাগল। এমনকি বছর শেষ হওয়ার আগেই অনেক ঘরেই ইসলাম আলোচনার বিষয় হয়ে গেল। শহরের বাতাস বদলাতে শুরু করল। আর এবার এসে গেল তাদের সেই সাক্ষাতের মুহূর্ত। ইয়াসরিবের সেই যুবকেরা তাদের কথা রেখেই মক্কায় ফিরে এলো। কিন্তু এবার তারা ছিল—বারোজন। তাহলে কি এক বছরে শুধু এতজনই ঈমান এনেছিল?

না—আরও অনেকেই ছিল। এক রাতে, গোপনে— আকাবা নামের এক সরু উপত্যকায় তারা মিলিত হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাথে। এটা ছিল নবুওয়াতের দ্বাদশ বছর। এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের কাছ থেকে ছয়টি নীতির ওপর বাই‘আত নিলেন। “আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করব না। চুরি করব না। ব্যভিচার করব না। সন্তানদের হত্যা করব না। কাউকে অপবাদ দেব না। আর সব ভালো কাজে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আনুগত্য করব।” বাই‘আত শেষে তারা ফিরে গেল ইয়াসরিবে। কিন্তু তাদের দরকার ছিল এমন একজন মানুষ— তিনি কেবল কুরআন তিলাওয়াতই নয়, তাদের ইসলামি আদব - বিধানও শিক্ষা দেবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের অনুরোধ গ্রহণ করলেন, আর ইয়াসরিবে পাঠানোর জন্য বেছে নিলেন—মু‘সআব ইবন উমরকে। মু‘সআব ছিলেন বুদ্ধিমান, সৌম্য, কোমল হৃদয়ের, আর কথায় অত্যন্ত প্রাঞ্জল। নিপুণতায় এবং অসাধারণ দক্ষতায় দাওয়াত কীভাবে পৌঁছাতে হয় তা তিনি জানতেন। মদিনায় পৌঁছে তিনি অতিথি হয়ে উঠলেন আসআদ ইবন জুরারার বাড়িতে। যেটা অতি অল্প সময়েই হয়ে উঠল শহরের ইসলামের কেন্দ্র। যে আসত—সেই শুনত তার কোমল বাক্য আর প্রাঞ্জল ভাষা, তিনি ইসলাম সম্পর্কে বোঝাতেন, আর কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করতেন। অনেকেই এই বার্তা শুনে ভিতরে ভিতরে দুর্বল হয়ে পড়ল— আর ঈমান আনল। কিন্তু সবাই না—কেউ কেউ আবার এটাকে হুমকি মনে করল। একদিন, মু‘সআব ও আস‘আদ একটি কূপের ধারে বসে ছিলেন, চারপাশে জড়ো হওয়া লোকদের ইসলাম সম্পর্কে বোঝাচ্ছিলেন। যুবকদের চোখেমুখে কৌতূহলের ছাপ দেখে এক গোত্রনেতা অস্বস্তি বোধ করল। মদিনার বড় একটা আরব গোত্র—আউস। তার এক শাখার নেতা ছিলেন সা‘দ ইবন মু‘আয। উসাইদ ইবন হুদাইর। দুজনেই ক্ষুব্ধ। উসাইদ নিজের বর্শাটা তুলে নিল, মুঠো শক্ত করে চেপে ধরল, আর তীক্ষ্ণ পদক্ষেপে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। চিৎকার করে বলল: “তোমরা এখানে কেন এসেছ?

আমাদের সহজ সরল বোকা লোকদের বিভ্রান্ত করছ!

মরতে না চাইলে—এখনই চলে যাও!” কিন্তু মু‘সআব দেখালেন—অসাধারণ স্থিরতা আর মর্যাদা। তিনি বললেন: “একটু থামুন। বসুন। শুনুন। আর তারপর সিদ্ধান্ত নিন। ভালো লাগলে গ্রহণ করবেন, আর না হয়—আমাদের থামিয়ে দেবেন।” উসাইদ এমন উত্তর আশা করেনি। বর্শার কঠোরতা নামিয়ে সে বলল: “আচ্ছা ঠিক আছে।” অতঃপর সে বসে পড়লো। মু‘সআব ব্যাখ্যা করলেন, আর তিলাওয়াত করলেন পবিত্র কুরআন। সেদিন উসাইদের ভেতরটা একেবারে পাল্টে গেল। সে শাহাদাহ পাঠ করে মুসলিম হয়ে গেল। ঈমানের স্বাদ যে পায়—সে আর চুপ থাকতে পারে না। সে সেটা অন্যদের সঙ্গেও ভাগ করে দিতে চায়। উসাইদ বলল: “আমি এখনই একজনকে পাঠাচ্ছি। সে ঈমান আনলে—এই জমিনে মোটামুটি কেউই আর বাকি থাকবে না।” কুরআনের নূর এমন যে রাগ নিয়ে আসা মানুষও ফিরে যায় শান্তি নিয়ে। উসাইদ ফিরে গেল সা‘দ ইবনে মু‘আযের কাছে। কিন্তু তিনি বললেন না যে তিনি মুসলিম হয়ে গেছেন। কারণ তিনি যদি বলেন 'আমি ঈমান এনেছি' তাহলে সা‘দ রেগে যেতে পারে আর কঠোর আচরণ করতে পারে। তাই তিনি বরং বললেন সে যেন নিজে গিয়েই দেখে আসে। আর সা‘দকে পাঠিয়ে দিলেন মু‘সআবের কাছে। সা‘দ, আসআদ আর মু’সাবের সামনে এসে চিৎকার শুরু করল, “হে আসআদ!

আত্মীয়তা না থাকলে হয়তো আমি কখনোই এটা সহ্য করতাম না। তুমি গোত্রে এই ‘লজ্জা’ ঢুকিয়েছ!” মু‘সআব আগের মতোই শান্ত কণ্ঠে বললেন, “বসুন। একটু শুনুন।” সা‘দ বসল। তিনি নবী (সঃ) যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন— তার সৌন্দর্য, তার জ্যোতি আর তার মহিমার কথা তুলে ধরলেন। আর তিলাওয়াত করলেন সূরা যুখরুফ। সা’দ কোরআনের সত্যতায় ভীষণভাবে প্রভাবিত হলেন। সে এমন কথা আগে কখনও শোনেনি। সা‘দের চোখমুখ বদলে যেতে লাগল: “এই দ্বীনে ঢুকতে হলে কী করতে হবে?” মু‘সআব তাকে সব বুঝিয়ে দিলেন। আর ঠিক তখনই—আউসের নেতা সা‘দ শাহাদাহ পাঠ করলেন। একজন নেতা ঈমান আনলে—একটা গোত্র নড়েচড়ে বসে। সা‘দ সোজা নিজের গোত্রে গেল, আর সবাইকে জড়ো করল। সে জিজ্ঞেস করল: “তোমরা আমাকে কীভাবে চেন?” তারা বলল: “আপনি আমাদের নেতা—সবচেয়ে সম্মানিত।” সে বলল: “তাহলে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর ঈমান আনো। না হলে—আজ থেকে আমার সাথে তোমাদের কোনো কথা হবে না।” এই এক বাক্যেই—গোত্রের সবাই বিগলিত হয়ে পড়ল ঈমানের দিকে। বনু আবদুল আশহালের প্রায় সবাই ইসলাম গ্রহণ করল। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। কেবল একজন বাদে—যে পরে অবশ্য ঈমান আনে। আর যখন প্রভাবশালীরা ঈমান আনে— দাওয়াত তখন আর গোপনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইয়াসরিবে তখন বহু ঘরেই ইসলামের কথা ছড়িয়ে পড়ল। সেই বছরের শেষদিকে— মু‘সআব ইবন উমাইর ৭৫ জন মুসলিমকে নিয়ে মক্কায় এলেন মদিনার অগ্রগতির খবর নবী ﷺ-কে জানাতে, আর হজ আদায় করতেও। দৃষ্টি এড়াতে, মু‘সআব প্রথমে একাই নবী ﷺ-এর সাথে দেখা করলেন— আর বললেন, ইয়াসরিবে ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তারপর ঠিক হলো—রাতে আকাবায় সাক্ষাৎ। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ দিলেন এক কঠোর নির্দেশ— নির্ধারিত সময়ে কেউ ঘুমিয়ে থাকলে, তাকে জাগানো যাবে না। আর কেউ দেরি করলে, তার জন্য কেউ অপেক্ষা করবে না। কারণ যে মানুষ এক রাতের ঘুমও ত্যাগ করতে পারে না, সে সেই জমায়েতের যোগ্য নয়। তাহলে, সেই রাতে কি কেউ ঘুমিয়ে পড়েছিল?

কেউ কি দেরি করে এসেছিল? না। ৭৫ জনের সবাই কিন্তু—যথা সময়ে এসে হাজির হলেন। একজনও বাদ গেল না। আর রাসূলুল্লাহ ﷺ এসেছিলেন চাচা আব্বাসকে সঙ্গে নিয়ে। আব্বাস তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি— কিন্তু ভাতিজাকে একা যেতে দেননি। আব্বাস মদিনাবাসীদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “তোমরা তাঁর ওপর ঈমান এনেছ, আর তাঁর দাওয়াতও গ্রহণ করেছ। কিন্তু জেনে রেখ, আজ তোমরা অনেক বড় গুরুদায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছ। এটা অনেক কঠিন, আর দায়িত্বটাও অনেক বিশাল। তবে, তোমরা কি তাঁকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে?

সমস্ত আরব যদি এক ধনুকের তীরের মতো তোমাদের দিকেই ধেয়ে আসে— তোমরা কি অটল থাকতে পারবে না?” যদি তোমরা নিজেদের ভেতরেই সেই শক্তিটা খুঁজে পাও, তবে আমার আর কিছুই বলার নেই। কিন্তু যদি তাঁকে নিয়ে গিয়ে কষ্টের সময় তাঁকে ছেড়ে দাও— তাহলে এখনই ফিরে যাও। তাঁকে তাঁর ভূমিতেই থাকতে দাও— আমাদের মাঝেই সে নিরাপদে আছে।” তখন মদিনার মুসলিমদের নেতা আসআদ ইবন জুরারা এগিয়ে এলেন— আর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি নিজেদের আনুগত্য ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন—দ্বীন কঠিন, আমরা জানি। তবুও আমরা তা কবুল করেছি এবং যে-কোনো পরিস্থিতিতেই আল্লাহর রাসূল ﷺ-কে রক্ষা করবো। তারপর বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল ﷺ আপনার জন্য আপনি আমাদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকার চান, নিন; আর আপনার রবের জন্য আপনি যেই শর্ত চান, তা স্থির করুন” রাসূলুল্লাহ ﷺ কিছু আয়াত তিলাওয়াত করলেন, তারপর বললেন— “আল্লাহর ব্যাপারে শর্ত— তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে, তাঁর কোনো শরিক করবে না। নামাজ কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে। আর আমার ব্যাপারে শর্ত—তোমরা সাক্ষ্য দেবে আমি আল্লাহর রাসূল, আর আমাকে রক্ষা করবে— যেমনভাবে রক্ষা করো নিজেদের, সন্তানদের, নারীদের।” তখন আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা জিজ্ঞেস করলেন— “হে আল্লাহর রাসূল ﷺ, আমরা যদি তা করি তবে আমাদের বিনিময় কী হবে?” রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন— “জান্নাত।” মাত্র ৬০ কিংবা ৭০ বছরের এই জীবন— ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে কাটানোর বিনিময়ে, এক চিরস্থায়ী জান্নাত। আর, এটাই হবে মুসলমানদের জীবনের সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে লাভজনক বাণিজ্য। তাদের হৃদয় ভরে উঠল আনন্দে আর সাহসে। তারা বলে উঠলেন: “তাহলে এটাই তো সবচেয়ে লাভজনক বাণিজ্য!” আর তারা সারাটা জীবন তাদের কথার ওপর অটল রইল। সেই রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ যেন দেখতে পেলেন— এক নগরীর দূয়ার খুলে যাচ্ছে। এটাই ছিল—এক মহাযাত্রার সূচনা। এখন বাকি রইলো কেবল, মক্কা ত্যাগের জন্য আল্লাহর অনুমতি। আর আল্লাহ্‌র সেই আদেশ খুব শিগগিরই আসবে। আর ইসলামের ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই বরকতময় যাত্রা শুরু হয়ে যাবে। পথে আসবে সব কঠিন পরীক্ষা— আর সাহসের সাথে পাড়ি দেয়া সেই সংগ্রাম। আর গভীর ঈমান ও আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসায় সহ্য করা নানান কঠিন পরীক্ষা। আমরা দেখব এক এমন যাত্রা— যার প্রতিটি পদক্ষেপেই লুকিয়ে থাকবে অমূল্য শিক্ষা। আর এসবই থাকবে পরের এপিসোডে। সাথেই থাকুন।
