Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

আমাকে আক্রমণ করে ভয়ানকভাবে মারধর করা হয়েছিল! - আমিনা ব্লেকের ইসলাম গ্রহণের গল্প

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

কোন বিষয়টি আপনার বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বাধ্য করেছে? আপনাকে সবচেয়ে বড় কোন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে? আপনি ছিলেন সেসময়ের একমাত্র হিজাবি ড্রাইভার, তাইনা? আমার বন্ধু আমাকে জানাজার জন্য ডেকেছিল। আমি এর আগে কখনো শেষকৃত্যে যাইনি, কখনো কোনো মৃত ব্যক্তিকে দেখিনি। আমাকে আক্রমণ করে আর খুব খারাপভাবে মারধর করে। সেসময় আমার যে গাড়ি ছিল সেটা তারা চুরি করে। তারা আমার টাকা কেড়ে নেয়। স্রষ্টা, আমি জানিনা আপনি আছেন অথবা আপনি নেই কিনা কিন্তু যদি আপনি থাকেন আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। অসাধারণ!... প্রথমে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, উস্তাদা আমিনা ব্ল্যাক কে? আপনি কি আমাদের আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলবেন?

পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি, আচ্ছা, আমার অতীতের জীবনটা হলো আমি চেস্টারে এক ১৭ বছর-বয়সী কিশোরির গর্ভে জন্মগ্রহণ করি, জায়গাটা লিভারপুলের পাশে। সে আমাকে দত্তক দিতে চেয়েছিল, তাই আমাকে একটি পরিবার সন্তান হিসেবে দত্তক নেয়, তারা শেফফিল্ডে থাকত। তাই আমি শেফফিল্ডে চলে যাই, সেখানেই আমি থাকতাম এখনো সেখানেই থাকি। আমি একজন দত্তক সন্তান, একমাত্র সন্তান। আমার বাবা ছিলেন শেফফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক, আর আমার মা ছিলেন একজন কবি ও শিল্পী। দূর্ভাগ্যবশত, তাদের কেউই এখন আর বেঁচে নেই। আর তাই, হ্যাঁ, আমি এককথায় দারুণভাবে বেড়ে উঠেছি, পড়ালেখায় খুবই মনোযোগী। কিন্তু, আমি ছিলাম খুব অশান্ত বাচ্চা, সত্যি বলতে, একটা টমবয় ছিলাম। আমি ঘোড়া আর গাড়ি, লরি, বাস পছন্দ করতাম আর মেয়েলি কিছু একেবারেই পরতাম না। বিশ্বাসের দিক থেকে আপনার জীবন কেমন ছিল?

আপনি কীসে বিশ্বাস করতেন?

আমার বিশ্বাস, আমি একজন খ্রীষ্টান হিসেবে বড় হয়েছি, এটা করা হয়েছিল আমার জন্মদাত্রী মায়ের অনুরোধে, আমাকে সানডে স্কুলে পাঠানো হয় যা আমার পছন্দের জায়গা ছিল। কিন্তু আমি খুব অল্প বয়স , কৈশোর থেকেই সবসময় খ্রীষ্টধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করতাম। কিন্তু আমার নবীদের কাহিনী আর বাইবেলের গল্পগুলো ভালো লাগত। আমরা সানডে স্কুলে বসতাম, আর টিচার আমাদের খুবই সুন্দর করে ঈসা (আ), মুসা (আ) আর ইব্রাহীম (আ) এর গল্প শোনাত। আর একজন শিশু হিসেবে আমি সেগুলো উপভোগ করতাম। কিন্তু যখন আমার বয়স, আনুমানিক, ১৫ বা ১৬ হয়, তখন থেকেই আমি বাইবেল নিয়ে প্রশ্ন করতাম কিন্তু এর সত্যতা বা এর ভিত্তির ধরন সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পেতাম না। সেই পর্যায়ে, আমি আসলেই, স্রষ্টায় বিশ্বাস করতাম, কিন্তু আমি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বলে চিহ্নিত করতে পারিনি। কী আপনাকে আপনার বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং সেটা কখন?

যখন আমি বাইবেলে অসঙ্গতি খুঁজে পাই, আমি আসলে এটা ভিকারের কাছ থেকেই জেনেছিলাম, তিনি ছিলেন খুবই ভালো খুবই সৎ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এটা কী? কেন আমি স্রষ্টায় বিশ্বাস করব? কেন আমি বাইবেলে বিশ্বাস করব? তিনি বললেন, শোনো, তুমি তোমার অন্তরকে বিশ্বাস করবে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, এর প্রমাণ কী?

তাই আমি তাঁকে এই প্রশ্নগুলো করি। তোমাকে তোমার অন্তরের প্রতি বিশ্বাস আনতে হবে। এটা একটা অনুভূতি। আমি ভাবলাম, হ্যাঁ, আমি স্রষ্টায় বিশ্বাস করি, কিন্তু সত্যি বলতে এই পাঠ, এই বইতো প্রমাণ করতে পারে না যে এটাই স্রষ্টার বাণী আর এতে অসঙ্গতি আছে, প্রকৃতপক্ষে, আমার মতে, এটি যদি স্রষ্টার বাণীই হতো, তাহলে এতে কোনো অসঙ্গতি থাকত না, এটি নিখাদ হতো। তখনই আমার মনে হলো যে আমি এটি অনুসরণ করতে পারব না। ইসলাম সম্পর্কে আপনার কেমন ভাবনা ছিল?

হ্যাঁ, আমি সবসময় মুসলিমদের সাথে মিশতাম, এমনকি ছোটবেলায়ও, আমার বাবা, একজন অধ্যাপক হওয়ায়, তার মুসলিম শিক্ষার্থীও ছিল। আর তাই ইসলামের সাথে আমার প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল একজন মেয়ের মাধ্যমে যার সাথে আমি নাইটক্লাবে যেতাম ১৭ বা ১৮ বছর বয়সে। সম্ভবত আমার বয়স ছিল ১৮, আর আমি ১৬ বছর বয়সেই বাড়ি ছেড়েছিলাম। মানে, আমি ঠিক এতটাই অবাধ্য ছিলাম। আমি নিজের জন্য কাউন্সিলের ফ্ল্যাট আর কাউন্সিলের প্রপার্টি পেয়েছিলাম, খুব অল্প পরিমাণ প্রপার্টি যা হয়েছিল আমি ভুল মানুষদের সাথে মিশেছিলাম, আর কিছু খারাপ প্রকৃতির লোক যে ফ্ল্যাটে আমি থাকতাম সেখানে আমাকে আক্রমণ করতে লোক পাঠায়। তারা আমাকে আক্রমণ করে আর খুব খারাপভাবে মারধর করে। সেসময় আমার যে গাড়ি ছিল সেটা তারা চুরি করে। তারা আমার টাকা কেড়ে নেয় আর সত্যি বলতে সুবহান আল্লাহ আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলেন যখন তারা কিছু করতে বাধ্য হয় তা না হলে আপনার জীবন কখনোই বদলাবে না। আপনার জীবনে বদলে দেবার জন্য এমন ঝামেলা হবেই। আর তাই এই আক্রমণের পর, আমি আমার ফ্ল্যাট ফিরে যেতে খুব ভয় পেতাম এমন অবস্থায় আমি আমার মুসলিম বন্ধুর কাছে যাই, যার সাথে আমি নাইটক্লাবে যেতাম। সে বলল: ''যেওনা, আসো আমার বাড়িতে থাকো।'' তাই আমি ওর বাড়িতে থাকতে গেলাম। তার বাড়িতে কেবল একটাই বই ছিল। এবং সেটি হলো আল-কুরআন এবং কুরআন এর ইংরেজি ও আরবি সংস্করণ ছিল। আর আমি অল্পেই বিরক্ত কিশোরি ছিলাম, তাই তাকে বললাম, আমার বিরক্ত লাগছে আমি এই বইটা দেখতে চাই, একটু কি দেখতে পারি?

সে বলল ঠিক আছে। যাও, তোমার হাত ধুয়ে আসো তারপর তুমি বইটা নিয়ে দেখতে পারবে। আমি বইটা খুললাম আর দেখলাম, সুবহানআল্লাহ, আমি সেসব গল্প দেখলাম যা আমার সানডে স্কুলের দিনগুলোয় দেখেছি আর ভালোবেসেছি। আমার মনে হল, বাহ, এটাতো আমি জানি, কারণ স্কুলে। পশ্চিমের স্কুলে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয়, আপনাকে ইসলাম, খ্রীষ্টধর্ম দুইটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় হিসেবে শেখানো হয়। আল্লাহ ও গডের মধ্যে কোনো একচেটিয়া বা তুলনা নেই। মুসলিমদের ক্ষেত্রে আল্লাহ, খ্রীষ্টানদের ক্ষেত্রে গড। এটা অনেকটা এমন, ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন স্রষ্টা আর এটাই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আমি আমার বন্ধুকে প্রশ্ন করতে শুরু করি, এই বইটা কী? কেন এর সাথে খ্রীষ্টধর্মের এত মিল?

তখন সে আমাকে তার প্রতিবেশীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় আর সে আমাকে বলে, আমাকে একটু সময় দিন, আমি আপনাকে উত্তর এনে দিচ্ছি। তিনি তার শেখের কাছে গিয়েছিলেন। আর শেখ তাকে কিছু স্তবক, কিছু আয়াত দেন যেগুলো ছিল আমার প্রশ্নের সাথে প্রাসঙ্গিক, এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। আমার মনে হলো, আরে, এটা অসাধারণ। তিনি এর সাথে কিছু একটা যোগ করেন, যা ছিল এর মূল উৎস, এটি মরুভূমিতে একজন নিরক্ষর ব্যক্তির উপর নাযিল হয়েছিল, ১৪০০ বছর আগে। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। কী অসাধারণ!

সেই ভাই, আমাদের একটা ভিডিও দিয়েছিল, আল-রিসালাহ দ্যা মেসেজ এটা ছিল আড়াই বা তিন ঘণ্টার মতো লম্বা, আমার মনে নেই। আল্লাহ তা'আলা আমাকে সঠিক সময়ে সেই ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। যখন ঘরের এক কোণে রাখা টিভিতে ছবির একেবারে শেষ দিকে, বেলাল (রা) কাবার উপর দাঁড়িয়ে আযান দিচ্ছিলেন। আমি সেই আযান শুনলাম, আর মনে হলো আমার সমস্ত সত্তা একটা চাদরের মতো উষ্ণ, কোমল অনুভবে ডুবে গেল অবশ্যই, এটি (ঈমানের মাধুর্য) তাই আমি এটি অনুভব করেছিলাম। (ঈমানের মাধুর্য) আমার মনে আছে আমি আমার বন্ধুর দিকে ফিরে বলেছিলাম, আমি মুসলিম হতে চাই আর এখনই হতে চাই। এ ব্যাপারে আপনার পরিবার ও ঘনিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

আচ্ছা। এটা ছিল ৯/১১'র আগের ঘটনা, আমার মনে হয় ব্যাপারটা সহজ ছিল কেননা তখনো ব্রিটিশ সমাজে বহুসংস্কৃতিবাদের উপাদান বিদ্যমান ছিল। মুসলিম হবার পর, আমার মনে আছে আমি আমার মা-বাবাকে বলেছিলাম খুব অগোছালো করে, আমার মনে হয় অনেক নওমুসলিম এটা করে। আমার বাবা ভেবেছিলেন, আমি একটা পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আর আমার মা, চিন্তিত ছিলেন আমি যদি নিপীড়িত হই, যদি অন্যদের সাথে কাজ করতে না পারি। তারা চিন্তিত ছিল কিন্তু অন্যান্য লোক তাদের সন্তান, বা পরিবারের কোনো সদস্য মুসলিম হলে বর্তমানে যেমন চিন্তা করে সেরকম কিছু নয়। কিন্তু আপনার বাবা আপনাকে গুরুত্ব দেননি। সে আমাকে প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু যখন সে বুঝতে পারল ইসলাম আমার অন্তরে গেঁথে গেছে, আমাকে অনেক সংবেদনশীল করেছে, আমার একরোখা স্বভাব কমে গেছে, আমাকে অনেক দয়ালু, অনেক সুন্দর মানুষে পরিণত করেছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমার মনে হয় তারা বুঝতে পেরেছিল ইসলাম আসলেই আমার জন্য কতটা কল্যাণকর, ক্ষতিকর নয়। মুসলিম হবার পর আপনাকে সবচেয়ে বড় কোন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল?

একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, আমার মনে হয়, জ্ঞান অর্জন করা আমি খুব, খুব চাইতাম জ্ঞান অর্জন করতে। আমি মুসলিম হওয়া নিয়ে খুবই উৎসাহী ছিলাম আর,মুসলিম হবার পর, আমি শুধু জানতাম লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। এমনই ছিল ব্যাপারটা। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দা' ইয়া কারণ আমি এই নতুন জিনিস অর্জন করেছি, আমার মনে হয়েছে, আমার জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যদি আমি ইসলামের এই চমৎকার বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাই, তাহলে আমাকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আর সেটাই ছিল আমার পথচলার পরবর্তী ধাপ। আপনি কার কাছ থেকে এই জ্ঞান পেয়েছিলেন? আর আপনার অনুসন্ধান কীসে পরিণত হয়েছিল?

আচ্ছা, আমার অনুসন্ধান ছিল মূলত আত্মিক অনুসন্ধান, কিন্তু আমি সেটা ওই মুহূর্তে বুঝতে পারিনি। একাকীত্বের অস্বাভাবিকতা নিয়ে যদি বলি, অনেক মুসলিম নওমুসলিমরা এই অনুভূতি আর একাকীত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে খুব নেতিবাচকভাবে বলবে এবং গত কয়েক বছরে আমি উপলদ্ধি করেছি এটা এমনকিছু যার নকশা আল্লাহ তা'আলা তৈরি করেছেন, এবং এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া খুবই জরুরী। কেন?

কেননা যখন আপনি মুসলিম হবেন বা যখন আপনি নিজের আধ্যাত্মিকতার সাথে একাত্ম হবেন, তখন আপনি এই দিকটা বুঝবেন , প্রথমে, আপনি অন্যদের কাছে সাহায্য চাইবেন। আমিও আমার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করি, আমাকে প্রার্থনা করা শেখাও। আমি মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম প্রার্থনা করার জন্য। আমি জিজ্ঞেস করেই যেতাম, আমি সত্যিই হতাশ হতাম কেউই আমাকে প্রার্থনা করা শেখাতে পারছেনা দেখে। সবাই বলছিল ইনশাআল্লাহ। কিছুই হবে না। আর এটা সেই পর্যায়ে গিয়ে থেমেছিল যখন আমি উপলদ্ধি করেছি, আমি লোকজনকে জিজ্ঞেস করব না, সেটি আমার পাথেয় নয়। আমার পাথেয় হলো আল্লাহ তা'আলার কাছে সাহায্য চাওয়া। আর একটা ফোন বক্সে এক ভদ্রলোক বসে ছিল, খুব লম্বা চওড়া মিশ্র জাতির লোক। সে ফোন বক্স থেকে আমাকে দেখছিল, হঠাৎ সে ফোন বক্স খুলে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করে, আপনি মুসলিম?

এরপর বলেন, এখানে অপেক্ষা করুন। এমন আকারের লোক আপনাকে অপেক্ষা করতে বললে আপনি সত্যিই অপেক্ষা করবেন। আমিও অপেক্ষা করলাম। সে ফোন তুলে একটা নম্বরে ডায়াল করল, এরপর সে ফোনটা হাতে নিয়ে ফোন বক্স থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ইনি হলেন ট্রেসি আপা উনার সাথে কথা বলুন। আর তিনি সুবাহানআল্লাহ কেবল আমার পরামর্শক ও শিক্ষকই ছিলেন না। তিনি আমার মাঝে উস্তাদা হবার বীজ বপন করেছিলেন। তিনি আমাকে প্রার্থনা করা শেখালেন। তিনি আমাকে ঈমানের আরকান শেখালেন। তিনি আমাকে মুসলিম হবার সঠিক পথ দেখালেন। তিনি আমাকে হিজাব সম্পর্কে বললেন। সত্যি বলতে তিনি ছিলেন আল্লাহ তা'আলার কাছে আমার দোয়ার উত্তর। সুবাহানআল্লাহ, অসাধারণ। ইসলামিক চর্চার ব্যাপারটা কেমন ছিল যেমন দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আর পুরো এক মাস রোজা রাখা? এগুলো কি আপনার জন্য কঠিন ছিল?

আমার নামাজ আদায়ের পথে এগিয়ে চলা ছিল এককথায় অতুলনীয় আবারো বলছি, আমি তখনো শিখছিলাম- কিভাবে প্রার্থনা করতে হয়। আমাকে ট্রেসি একটা ছোট বই পড়তে দিয়েছিল, প্রার্থনা করা শেখার জন্য। আমি তখনো সেই প্রক্রিয়ায় ছিলাম, কিন্তু প্রার্থনা করছিলাম না। এখন, সেই একই সময়ে, আমার বাবার এক বন্ধু সিঁড়ি থেকে পড়ে যান। তার হার্ট অ্যাটাক হয়, মুসলিম পরিবার। সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে, উনার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ রূহের মাগফিরাত করুন। আমি যখনি সেই বন্ধুর বাড়িতে যেতাম, সেই চাচা দেখা করতেন তিনি রান্নাঘরে গিয়ে ওযু করতেন। তিনি তাদের রুমের গ্যাস ফায়ারের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন। একারণে, আমি সবসময় বুঝতে পারতাম যে উনি প্রার্থনা করছেন। আমার বন্ধু আমাকে জানাজার জন্য ডেকেছিল। আমি এর আগে কখনো শেষকৃত্যে যাইনি, কখনো কোনো মৃত ব্যক্তিকে দেখিনি। পাকিস্তানি সংস্কৃতিতে, এটা খুবই ভিন্ন ছিল। তারা সেই মরদেহ একটা কফিনে রেখেছিল, বাড়ির একটি কক্ষে, জানাজার নামাজের জন্য প্রস্তুত হবার আগ পর্যন্ত উনার মুখ খোলা রাখা হয়েছিল, সে আমাকে বলল, এসো, আমার বাবাকে দেখো সে সবসময় ভাবত যে তুমি এসে তাকে দেখবে। আমি খুবই, খুবই, বিচলিত ছিলাম। সে বলল না, না, কোনো সমস্যা নেই। কোনো সমস্যা নেই। আমি কফিনের ভেতর তাকালাম। আর সেখানে বসে আমি দেখলাম, আল্লাহর কসম করে বলছি সেই ভাই, ওখানে শুয়ে হাসছিলেন। দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর হাসি, আর তার মুখে নূর (আলো) জ্বলজ্বল করছিল। আর সেই মুহূর্তে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে মনে করিয়ে দিলেন। এবং দেখিয়ে দিলেন যে এই ভাই নামাজ আদায় করতেন। আমি তখনি যোগসূত্রটা বুঝে যাই। এই হাসি সেই নামাজের ফল সেই সময় থেকে, আমি এক ওয়াক্ত নামাজও বাদ দিই না। আপনি ছিলেন সেসময়ের একমাত্র হিজাবি ড্রাইভার, তাইনা?

ছোটবেলা থেকেই, আমি বড় যানবাহন পছন্দ করতাম আর আমি একটা ফার্মে কাজ করতাম, সেচ্ছাসেবক হিসেবে, সেখানে ট্রাক্টর আর এরকম সব জিনিস ছিল, আমি সেগুলো ভালোবাসতাম। আর তাই আমি গাড়ি চালানোর জন্য যথেষ্ট বড় হবার পর, যুক্তরাজ্যে, বাস চালানোর জন্য আপনার বয়স ২১ হতে হবে। আমি তখনই মুসলিম ছিলাম আর হিজাবও পরতাম, কিন্তু আমার মনে হল, কেন হিজাব আমাকে একটা বাস চালাতে দিবে না?

আলহামদুলিল্লাহ, আমি সাহস নিয়ে বাস স্টেশনে যাই অনেক জোর করার পর তারা আমাকে আবেদনের ফরম দেয়। সে পর্যায়ে যাবার পথে আমার তিনটা বাধা ছিল। প্রথমত, তুমি নারী আর খুবই কমবয়সী তরুণী। দ্বিতীয়ত, তুমি একজন হিজাবধারী মুসলিম নারী, তাই তোমাকে যথেষ্ট দূর্ভোগ পোহাতে হবে। এছাড়াও, আপনাকে অবশ্যই মুসলিম কমিউনিটির বাধার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যেমন হারাম নীতি তারা এসে বলবে, তুমি হিজাব পরে, এসব কী করছো তুমি ছেলেদের সাথে মিশছো আর এসব কাজ করছো? আসলে, আমার গ্রুপে বাকি যারা প্রশিক্ষণার্থী ছিল তারা সবাই পুরুষ। আর একমাত্র আমিই সে পরীক্ষায় প্রথমবারের মতো পাশ করি। আপনি কিভাবে আপনার ঈমান ধরে রেখেছিলেন এবং অন্য লোকরা যাতে ইসলাম ছেড়ে না যায় তার জন্য কী করা উচিত?

এখানে কয়েকটা ভিন্ন জিনিস বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, নওমুসলিমদের মেন্টরশিপ দরকার। তাদের একটার পর একটা সাহায্য দরকার একটি সহজ ও সঠিক পথে থাকার জন্য। মানুষ মনে করে, আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এটি দান করেছেন। মুসলিম হবার হেদায়াত দান করেছেন, এর ফলে তুমি আপনা আপনিই ঈমান ও তাকওয়া লাভ করবে। কিন্তু আপনি পারবেন না। এটা অনেকটা নবজাতক শিশু জন্মের পরই দৌড়ানোর মতো। এটা কখনো এমনিই ঘটবে না, আপনাকে সেই সহায়তা পেতে হবে। আমার মতে, আরেকটি পর্যায়ে এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে মুসলিম হয়ে ওঠা আসলে একটি কার্যপ্রক্রিয়া, এই পুরো প্রক্রিয়া জুড়ে, আমাদের সঠিক কাঠামো থাকতে হবে, হতে পারে সামাজিক কাঠামো অথবা আবেগিক কাঠামো বা মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো, মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করার জন্য। আপনি কি মনে করেন যে বর্তমান বিশ্বে ইসলামভীতি বাড়ছে?

এবং এটি ঘটা বন্ধ করার জন্য, কী করা উচিত? ইসলামভীতি অবশ্যই বর্তমান বিশ্বে বেড়েই চলেছে। এর জন্য মিডিয়া সবচেয়ে বড় প্লাটফর্ম। আমাদের, উম্মত হিসেবে একসাথে কাজ করতে হবে, আল্লাহ তা'আলা বলেন নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করতে। কারণ আপনি আলাদা হলে, আমরা দূর্বল হয়ে যাব। আমাদের অন্তত এই বিষয় নিয়ে একসাথে কাজ করতে হবে আর বিজ্ঞতা সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের আল্লাহ তা'আলার বাণী আল্লাহ তা'আলার নির্দেশনার মধ্য দিয়ে, জ্ঞান ও বিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে, একটি পাল্টা-ব্যাখ্যা তৈরির জন্য যা এই বিশ্ব বুঝতে পারবে। এখন আমরা সেটা কিভাবে করব?

এটা আমাদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। কিন্তু আমরা চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না কেননা যখনই আপনি চুপ হয়ে যাবেন, তখনই শূণ্যস্থান তৈরি হবে আর সেই শূণ্যস্থান অন্য কিছু দিয়ে পূর্ণ হবে। আর বর্তমানে সেটি নেতিবাচকতা দিয়ে পূর্ণ। আমরা প্রতিনিধি। তাহলে কেন আমরা ইসলামকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করছি না?

কারণ এটি একটি বিশুদ্ধ বিশ্বাস যা অনেক মানুষই খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি রাসুলুল্লাহ (সা) এর একটি ঘটনা বলছি কেননা তখনো মিডিয়া ছিল, এখনকার মতো। মিডিয়া সবসময়ই আছে। সবসময় কথা বলে। যখন রাসুলুল্লাহ (সা) মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন মিডিয়া বলতে শুরু করে, তিনি আমাদের সবাইকে হত্যা করবেন। আমাদের সবার প্রাণ নেবেন। রক্তের বন্যা বয়ে যাবে। সবাই মুসলিমদের নিয়ে আতঙ্কে ছিল, কেননা তারা মুসলিমদের উপর অত্যাচার চালিয়েছিল। তারাই আগে খারাপ আচরণ করেছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা) মক্কায় প্রবেশ করার পর, সব মানুষকে একত্র করলেন এবং প্রশ্ন করলেন, তোমরা আমার কাছে কী প্রত্যাশা কর? তোমরা আমার কাছে কী প্রত্যাশা কর?

তিনি আল কুরআনের সুরা ইউসুফের বাণী উল্লেখ করেন তিনি বলেন আল্লাহ তা'আলা সবচেয়ে করুণাময়, সবচেয়ে দয়ালু। এবং তিনি সেই ভুল ব্যাখ্যা ভেঙ্গে দেন। আজ, আমরা যদি ইতিবাচক ব্যাখ্যা দিতে পারি তাহলে, মিডিয়া ও রাজনীতিবিদরা কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে তাতে কিছুই আসে যায় না কেননা ইতিবাচকতা ইতোমধ্যে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করেছে। মানুষকে ইসলামের পথে ডাকার সবচেয়ে ভালো উপায় কোনটি বলে আপনি মনে করেন?

মানুষকে ইসলামের পথে ডাকার অনেক ভিন্ন উপায় আছে, তারা জীবনের কোন ধাপে আছে তার উপর নির্ভর করে যখন আপনি ইসলামিক জীবন-যাপন করবেন, সৎ কাজ করবেন, তখন আপনি একজন বিশ্বস্ত মানুষ হবেন, আপনি হবেন মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে ভালো মানুষদের একজন। আপনি ইসলামের কথা বলার চেয়েও বেশি ইসলামিক কাজ করছেন। এবং আমরা রাসুলুল্লাহ (সা), ইউসুফ (আ) এবং অন্য সব নবীদের ইসলাম চর্চা দেখেছি, মানুষের মাঝে বিশ্বস্ততা গড়ে তোলার প্রাথমিক ধাপ দেখেছি। আপনি যদি মানুষের কাছে বিশ্বস্ত হতে না পারেন আপনার সেরাটা হতে না পারেন তাহলে কিভাবে আপনি আশা করবেন যে মানুষ আপনার কথা শুনবে আপনি কিভাবে তাদের সত্যের বার্তা দিবেন? যদি আপনি নিজেই প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ ব্যবহার না করেন, আমাদের মহানবী (সা) এর, কী আপনাকে সবচেয়ে অনুপ্রাণিত করে?

ও, এটা একটা গভীর, গভীর প্রশ্ন। এর উত্তর সবকিছুই। সবকিছুই। আমি যতবার রাসুলুল্লাহ (সা) এর বিষয়ে কোনো কিছু পড়ি বা জানতে পারি। আমি তাঁকে তত বেশি ভালোবাসি। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ব্যাপার আছে যা জানার পর, আমি কেঁদেছিলাম সুবাহানআল্লাহ এটি আসলেই একটি চমৎকার ঘটনা রাসুলুল্লাহ (সা) তখন দূর্বল হয়ে পড়ছিলেন। জীবনের প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিলেন। তিনি তাঁর দু'জন সাহাবীর সাথে হাঁটছিলেন, তখন তিনি বললেন, আমার ভাইদের মনে পড়ছে ''আমার ভাইদের মনে পড়ছে'' আর তাঁর সাহাবীরা বললেন: হে রাসুলুল্লাহ (সা), আমরা আপনার সাথেই আছি। আমরা আপনার সাথেই আছি। তিনি বললেন। না, তিনি বললেন। তোমরা আমার সাথী, তিনি বললেন। আমার ভাই তারা যারা আমাকে বিশ্বাস করবে, কিন্তু তারা আমার সাথে কখনোই সাক্ষাৎ করবে না। আপনাকে যদি মাত্র এক মিনিটে বিশ্বের সব অমুসলিমদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হয়, তখন আপনি তাদের কী বলতে চাইবেন?

আমি বলবো কুসংস্কারকে একপাশে রেখে, আপনার অন্তর খুলে দিন আর শান্তিপূর্ণ অন্তরের কথা ভাবুন আপনার অন্তর, আপনার হৃদয় আর আর শূন্যস্থানকে আপনি কিভাবে শান্তিপূর্ণ করতে চান। অনেক লোকেরই আত্মিক শূন্যস্থান ইতিবাচক কিছু দিয়ে পরিপূর্ণ হয়েছে। আমি সবসময় মানুষকে, আমার অমুসলিম বন্ধুরা যখন জিজ্ঞেস করে তাদের বলি, তোমার অন্তর খুলে দাও আর তোমার কুসংস্কারকে একপাশে রেখে প্রকৃত অর্থেই সত্যকে খোঁজো আর প্রার্থনা কর স্রষ্টা, আমি জানি না আপনি আছেন অথবা আপনি নেই কিনা, কিন্তু যদি আপনি থাকেন, তাহলে আমাকে সত্যের দিকনির্দশ দিন, তখনই দেখবে কী ঘটে।