কুরআনে বর্ণিত ৭টি ফিউচার টেকনোলোজি যা বিজ্ঞানীদেরও হতবাক করে দেয়!
প্রকাশের তারিখ
মাত্র এক শতাব্দী আগেও, ভিডিও কল বিষয়টা কল্পনাও করা যেতো না। কিন্তু আমি যদি আপনাকে বলি, কুরআন ১৪০০ বছর আগে এই প্রযুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছিলো!
শুধু তা-ই নয়, উড়োজাহাজের মাধ্যমে মানুষকে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে নিয়ে যাওয়া, অন্ধত্ব নিরাময় এবং অন্যান্য অনেক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছিলো। কুরআন এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। এটি সব যুগের জন্য সূক্ষ্ম উপায়ে লুকানো বার্তা ও নিদর্শনে পরিপূর্ণ। এখন পর্যন্ত আমরা এর অনেক বৈজ্ঞানিক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে ভ্রুণতত্ত্বীয় বিকাশের পর্যায়, গভীর সমুদ্রের অন্ধকার থেকে শুরু করে, বায়ুমন্ডলের স্তর পর্যন্ত। কুরআনে অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো আবিষ্কার হওয়ার কয়েক শতাব্দী আগেই। কিন্তু যদি আরো কিছু থাকে? যদি এটা কেবল শুরুটা হয়, আর এখনো অনেক কিছু আবিষ্কার করা বাকি থেকে গিয়েছে?
যদি ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সূত্রও কুরআনের আয়াতগুলোর মধ্যে লুকোনো থাকে?
আপনি প্রস্তুত থাকলে তবে চলুন, একটা একটা করে দেখা যাক। সূরা আন'আম-এ আমরা এই আয়াতটি দেখতে পাই, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না, বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু, এমনকোন বস্তু নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। অর্থ, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না, বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু এমনকোন বস্তু নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। সুতরাং, এই আয়াত অনুসারে, সবকিছুই কুরআনে আছে। কিন্তু পূর্ণ বিবরণ বা নামসহ নয়। বরং ইঙ্গিত, সারসংক্ষেপ ও মৌলিক নীতির মাধ্যমে। বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত বদিউজ্জামান বলেন, এই আবিষ্কারগুলোর কিছু লুকানো আছে নবীগণের গল্প ও তাঁদের মুজিযাগুলোতে। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তাঁদের গল্পের মাধ্যমে আমাদের কিছু বিষয় জানিয়েছেন। তিনি মানবজাতিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চূড়া কল্পনা করতে শিখিয়েছেন, এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, একদিন অনুরূপ আবিষ্কার হবে। এখন, আমরা কুরআনে থাকা নবীদের ৭টি মুজিযা এবং এর মধ্যে লুকানো নিদর্শনগুলো দেখব। আমরা যতই শেষের দিকে এগিয়ে যাব, এই নিদর্শনগুলো আপনাকে আরও বেশি অবাক করবে। সূরা আন-নামলের ৩৮-৪০ নম্বর আয়াতে, সত্যিই একটি আকর্ষণীয় ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। আয়াত অনুসারে, সুলাইমান (আ.) শেবার রাণীর সিংহাসন চান। যা তাঁর কাছে খুব দূরবর্তী একটি দেশ থেকে আনা হবে। পবিত্র কিতাবের জ্ঞান থাকা একজন বলেন, তিনি চোখের পলকে তা আনতে পারবেন। এবং সাথে সাথেই সিংহাসন সুলাইমান (আ.) এর সামনে হাজির হয়। সুতরাং ইয়েমেনে থাকা সিংহাসন হয় শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়, অথবা দামেস্কে চিত্র হিসাবে দেখা যায়। যেটি মূলত হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। একই সঙ্গে তারা সিংহাসনের চারপাশে থাকা মানুষদের দেখতে পারছিল। এবং তাদের কণ্ঠস্বরও শুনতে পারছিলো। কুরআন এখানে অসাধারণ নিদর্শন দেখায়। ১৪০০ বছর আগে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, গ্রন্থটি বর্ণনা করে, কিভাবে বস্তু বা তাদের চিত্র দ্রুত অনেক দূরে পরিবহন করা যায় অথবা পাঠানো যায়। এবং এটি একটি বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে দেখানো হয়। আর আমরা আজ দেখছি, আমরা প্রকৃতপক্ষে ছবি ও শব্দ পাঠাতে পারি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের মাধ্যমে। কুরআনের এই ঘটনাটি, সরাসরি সম্প্রচার, প্রজেক্টর, ক্যামেরা কিংবা আধুনিক হলোগ্রাম থেকে পাওয়া ছবির মতোই নয় কি?
কিন্তু কুরআনে এমন কিছুর উল্লেখ কিভাবে থাকতে পারে? যখন ১৪০০ বছর আগে বিষয়টি সম্পূর্ণ অকল্পনীয় ছিল? আমরা আবারো আরেকটি স্পষ্ট প্রমাণ পাই যে, কুরআন কোনো মানুষের বাণী হতে পারে না। কুরআনে আমরা দেখি, সুলাইমান (আ.) পশুদের ভাষা জানতেন। তাদের সাথে যোগাযোগও করতে পারতেন। সূরা আন-নামলের ১৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, তিনি পিঁপড়াদের ভাষা বুঝতেন। ২২ নম্বর আয়াতে আছে, তিনি পাখিদের ভাষা বুঝতেন। তাহলে এখানে কেমন নিদর্শন দেওয়া হয়েছে?
আসলে পশুদের ভাষা বোঝা ইঙ্গিত দেয় যে, ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো বুঝতে পারবে, পশুরা কিভাবে যোগাযোগ করে এবং তারা কী করতে সক্ষম। সবশেষে, আমরা জানি, সুলাইমান (আ.) তাদের ভাষা জানতেন। তাদের ক্ষমতা আবিষ্কার করেছিলেন এবং কাজকর্মে তাদের ব্যবহার করতেন। যখন আপনি এটি নিয়ে ভাববেন, যদি আমরা পশুদের সক্ষমতা সম্পূর্ণ বুঝতে পারি, তবে তাদের দিয়ে নিত্যদিনের অনেক ক্ষেত্রে কাজ করাতে পারব। এটা আসলে এমন কিছু, যা আমরা ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছি। চিঠি ও বার্তা পাঠানোর জন্য, কবুতর ব্যবহার করা হয়েছে। টিয়া পাখিদের কথা বলা শেখানো হয়েছে। পোশাক তৈরির জন্য কিভাবে রেশম কীট ব্যবহার করতে হয়, আমরা তা বের করেছি। একইভাবে আমরা একটি উপায়ে কুকুরের ভাষা শিখেছি এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের শক্তিশালী ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করি। কিছু প্রজাতির ইঁদুর মাইন শনাক্তকরণেও ব্যবহৃত হয়, কারণ তাদের নাক অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমরা ডলফিনের উন্নত সোনার (Sonar) ক্ষমতা ব্যবহার করি, সাবমেরিন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি, সামুদ্রিক মাইন খুজে বের করতে। তাই, সুলাইমান (আ.)-এর পশুদের ভাষা বোঝা এবং নির্দিষ্ট কাজের জন্য তাদের ব্যবহারের অলৌকিক ঘটনা দেখায়, আমরা হয়তো পশুদের আরো বেশি ক্ষমতা আবিষ্কার এবং ভবিষ্যতে তাদের থেকে উপকৃত হওয়ার নতুন উপায় খুঁজে বের করতে পারি। পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। আমরা যদি তাদের ভাষা বুঝতে ও তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তাহলে তাদের সাথে মিলে যা অর্জন করতে পারি তা আমাদের কল্পনার বাইরে হতে পারে। সুলাইমান (আ.)-এর আরেকটি অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। তিনি বাতাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। এর মাধ্যমে তিনি খুব অল্প সময়ে দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণ করতে পারতেন। সূরা সাবাতে আল্লাহ বলেন, "আর সুলাইমানের জন্য আমি বাতাসকে অনুগত করে দিয়েছিলাম, যা সকালে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করত।" এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে, যে যাত্রায় সাধারণত একমাস লাগতো, তা দিনের কিছু অংশে সম্পন্ন করা যেত। এটা কি বিমানের মতো ভবিষ্যত প্রযুক্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত নয়?
একটু চিন্তা করুন। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন আমরা নির্ণয় করতে পারি, কিভাবে বাতাসকে ব্যবহার করব। সঠিক উপকরণ দিয়ে উড়োজাহাজ তৈরি করি। আর ঠিক আয়াতে থাকা নিদর্শনের মতো, আমরা এখন খুব অল্প সময়ে দীর্ঘ যাত্রা সম্পন্ন করি। এমনকি আমরা একই দিনে একাধিক দেশেও থাকতে পারি। যে যাত্রায় একসময় পুরো মাস লাগতো, এখন তা কয়েক ঘন্টায় করা সম্ভব। আরেকটি মুজিযা হলো, ইবরাহিম (আ.) কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। তবুও আগুন তাঁকে পোড়াতে পারেনি। জালিম শাসক নমরুদ তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। এবং তার লোকদের বিশাল আগুন প্রস্তুতের আদেশ দেয়। কিন্তু যখন ইব্রাহিম (আ.)–কে আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন ঘটলো এক বিষ্ময়কর ঘটনা, আগুন তাঁর একটুও ক্ষতি করতে পারল না। অবশ্যই, এটি একটি অলৌকিক ঘটনা ছিল, যা বিশেষভাবে এই মহান নবীর জন্য ঘটেছিল। তবে একই সাথে, আমরা এই অলৌকিক ঘটনায় ভবিষ্যতের নির্দশনও দেখতে পাই। শুধু যে ইবরাহিম (আঃ)–ই আগুনে পুড়েননি, না তা নয়, তাঁর পোশাকেও আগুনের কোনো আঁচ লাগেনি। এবং আবারও এ ঘটনা মানবজাতিকে একটা লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। ভবিষ্যতে আগুন-প্রতিরোধী উপকরণ তৈরি করা যেতে পারে। যা মানুষকে আগুন থেকে রক্ষা করবে। এবং প্রকৃতপক্ষে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, আগুন-প্রতিরোধী পোশাক তৈরি হতে শুরু করে, বিশেষ করে, অগ্নিনির্বাপন কর্মীদের জন্য। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে, নোমেক্স ও কেভলারের মতো বিশেষ উপকরণ আবিষ্কৃত হয়। নোমেক্স - ৩৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এবং এতে আগুন ধরার আশঙ্কা খুবই কম। অন্যদিকে কেভলার ৪৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম। এই উদ্ভাবনগুলোর কারণে অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা এখন আরও কার্যকরভাবে আগুন দমন করতে পারে। জরুরি উদ্ধার অভিযানে এগুলো তাদের অনেক সময় ধরে সুরক্ষিত থাকতে সাহায্য করে। সূরা বাকারাতে আছে, মুসা (আ.) তাঁর লাঠি দিয়ে একটি পাথরে আঘাত করেন, এবং হঠাৎ করে ১২টি ঝর্ণা বেরিয়ে আসে। একবার কল্পনা করুন, একটি লাঠির স্পর্শে অনুর্বর মরুভূমির মাঝে একটি শুষ্ক প্রাণহীন পাথর, পরিণত হয় অফুরন্ত পানির উৎসে। ১২টি ঝর্ণা প্রবাহিত হতে শুরু করে, এবং তৃষ্ণার্ত মানুষ অবশেষে সেখান থেকে পানি পান করে। কিন্তু এই অলৌকিক ঘটনায় আর কি বার্তা লুকানো ছিলো?
এটি আসলে দেখিয়েছিল, ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করা সম্ভব। অন্য কথায়, এটি আজকের দিনে ব্যবহৃত খনন প্রযুক্তির দিকে ইঙ্গিত করে। এই পদ্ধতির সূচনা উনবিংশ শতাব্দীতে। এর আবিষ্কারের পর থেকে, ড্রিলিং মেশিন আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি, তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। সুতরাং একটি লাঠির আঘাতে, একটি পাথর থেকে পানি বের হতে দেখে মানুষ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি কল্পনা করতে অনুপ্রাণিত হয়েছে। আয়াতটিতে ড্রিলিং মেশিন আবিষ্কার হওয়ার অনেক আগে থেকেই এর ইঙ্গিত ছিলো। সূরা আল-ইমরানে আছে, ঈসা (আ.), যিনি যিশু নামেও পরিচিত, "আর আমি আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রুগীকে সুস্থ করবো এবং মৃতকে জীবিত করবো। এগুলো ঈসা (আ.)-এর সবচেয়ে পরিচিত কিছু অলৌকিক ঘটনা। এখন আমরা তাদের মধ্যে একটি বিষয় লক্ষ্য করি, জন্মগত অন্ধত্ব নিরাময়। আজকের দিনে, জিন থেরাপি ও স্টেম সেল চিকিৎসার মতো উন্নতি প্রযুক্তির সাহায্যে কয়েক প্রকার জন্মগত অন্ধত্বের চিকিৎসা সম্ভব। আবার বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কুষ্ঠ রোগের কোন নিরাময় ছিলো না। কিন্তু আজ নির্দিষ্ট ওষুধের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ২ বছর সময়কালের মধ্যে এর চিকিৎসা করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, আজকাল, কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল ছাড়া, কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বেদিউজ্জামান ব্যাখ্যা করেছেন, এই আয়াতটি বার্তা দেয় সবচেয়ে পুরনো রোগ ও মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যারও সমাধান থাকতে পারে। রোগ যাই হোক না কেন, নিরাময় সম্ভব। অনুসন্ধান করতে থাকুন, আপনি খুঁজে পাবেন। শেষ ও সবচেয়ে আশ্চর্যজনক নিদর্শন হলো, সুলাইমান (আ.)-এর মুজিযা। জ্বীনদের তাঁর অধীনে নিয়ে আসা এবং ভালোর জন্য কাজ করানো। আল্লাহর ইচ্ছায়, সুলাইমান (আ.) জ্বীনদের সমুদ্রে ডুব দিতে বলেছিলেন। যাতে তারা মূল্যবান রত্ন খুঁজে বের করে অসাধারন কাঠামো নির্মান করতে, এবং তাঁর জন্য বিভিন্ন কঠিন কাজ করতে পারে। বেদিউজ্জামান বলেছেন, এই মুজিযাগুলোতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, তা হলো, জ্বীনদের আসলে নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের সাহায্যকারী বানানো যেতে পারে। কিন্তু অবশ্যই, এটা জাদুবিদ্যা, ভবিষ্যৎ বলা, বা ইসলামিক নীতিবিরোধী অন্য কোন প্রথার মাধ্যমে হবে না। তিনি বলেন, কুরআনের লুকানো কিছু রহস্যের মাধ্যমে এটি সম্ভব হতে পারে। অবশ্যই, আমরা এখনো জানি না এটি কিভাবে সম্ভব হবে। আজকের দিনেও এটি রহস্য হিসেবে রয়ে গেলেও ভবিষ্যতে এটি বাস্তবে পরিণত হতে পারে। এই মুহুর্তে, আপনি হয়তো ভাবছেন, “কুরআনে কেন এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই?” কারণ কুরআনের প্রধান উদ্দেশ্য বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি সম্পর্কে সরাসরি ব্যাখ্যা দেওয়া নয়। অবশেষে, এটি এই বিষয়গুলোর পাঠ্যপুস্তকও নয়। কুরআনের প্রধান বিষয়গুলো হলো তাওহীদ, আল্লাহর একত্ববাদ, পরকাল, নবুয়ত, বিচার ও ইবাদত। তবে, যেহেতু প্রযুক্তিগত আবিষ্কারগুলোও আল্লাহর পক্ষ থেকে আশির্বাদ, এবং সেগুলো মানবজীবনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে, তাই কুরআন সেগুলোকেও পুরোপুরি উপেক্ষা করে না। সুতরাং, সর্বজ্ঞানী হিসেবে, আল্লাহ সেগুলো ইশারা ও নিদর্শনের মাধ্যমে উল্লেখ্য করেছেন। এছাড়া এর পেছনে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারন রয়েছে। প্রথমত, যদি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো সরাসরি কুরআনে উল্লেখ্য করা হতো, আর কেবল শেষ এক-দুই শতাব্দীকে উদ্দেশ্য করে হতো, তাহলে পূর্ববর্তী ১২ শতাব্দীর মানুষ তা পুরোপুরি বুঝতে পারত না। কেউ কেউ একে অবাস্তবও মনে করত। আর সেটা কুরআনের সার্বজনীনতা বৈশিষ্টের বিরোধী হতো। ভাবুন তো, মাত্র ১০০ বছর আগেও যদি আপনি বলতেন, মানুষ ভিডিও কলে কথা বলতে পারবে, তাহলে কেউই সেটা বিশ্বাস করত না। এ কারণেই কুরআনে এই আবিষ্কারগুলোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে আলামতের মাধ্যমে। সরাসরি বা খোলাখুলিভাবে নয়। যদি সব প্রযুক্তি আর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার খোলাখুলিভাবে বলা হতো, তাহলে কি সেটা পরীক্ষার মূল দর্শনেরই বিপরীত হতো না?
আমরা জানি, জীবন একটা পরীক্ষা, আর সবকিছু যদি স্পষ্ট করে দেয়া হতো, তাহলে অবিশ্বাস করার কোনো সুযোগ থাকত না। সবাই তখন বাধ্য হয়ে ঈমান আনত। আর এতে মানুষের ইচ্ছা আর স্বাধীনতার মূলভাবটাই হারিয়ে যেতো। কারণ তখন আর বোঝা যেত না কার ঈমান সত্যিকারের, আর কে শুধুই বিশ্বাস করছে বাধ্য হয়ে বা নিরুপায় হয়ে। তাই এসব বিষয় এমনভাবে বলা হয়েছে, যাতে সংখ্যালঘু মানুষ চিন্তা করে, খুঁজে দেখে, আর নিজে সিদ্ধান্ত নেয়। সবশেষে, এই পুরো বিষয় থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষা আমরা নিতে পারি, কুরআনে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যেসব আলামত আছে, তা আমাদেরকে একেবারে স্পষ্ট একটা বার্তা দেয়। এই শব্দগুলো কোনো মানুষের কথা হতে পারে না। কোনো মানুষ নিজ কর্তৃত্বে এমন কথা বলতে পারে না, যা সব যুগ, সব স্থান, আর সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হয়। একজন সাধারণ মানুষের কথা কখনোই প্রত্যেক জাতি আর সময়ের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষা আর হিকমত বহন করতে পারে না। এই শব্দগুলো শুধুই সেই সত্তার হতে পারে— যিনি সব কিছুকে শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি সময়ের ঊর্ধ্বে, আর যিনি সবকিছু জানেন, আর তিনি হলেন - আল্লাহ আমরা হয়তো কুরআনের বিস্ময়গুলোর খুব অল্পই আবিষ্কার করতে পেরেছি। আর যত নতুন আবিষ্কার হবে, আমরা হয়তো আরো অনেক লুকানো মুজিযা খুঁজে পাবো, এই চিরন্তন কিতাবে। আর তখন অনেকে আরো বেশি ঈমানদার হয়ে উঠবে, আবার অনেকেই সত্য অস্বীকার করতে, নতুন অজুহাত খুঁজতে থাকবে।
শুধু তা-ই নয়, উড়োজাহাজের মাধ্যমে মানুষকে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে নিয়ে যাওয়া, অন্ধত্ব নিরাময় এবং অন্যান্য অনেক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছিলো। কুরআন এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। এটি সব যুগের জন্য সূক্ষ্ম উপায়ে লুকানো বার্তা ও নিদর্শনে পরিপূর্ণ। এখন পর্যন্ত আমরা এর অনেক বৈজ্ঞানিক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে ভ্রুণতত্ত্বীয় বিকাশের পর্যায়, গভীর সমুদ্রের অন্ধকার থেকে শুরু করে, বায়ুমন্ডলের স্তর পর্যন্ত। কুরআনে অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো আবিষ্কার হওয়ার কয়েক শতাব্দী আগেই। কিন্তু যদি আরো কিছু থাকে? যদি এটা কেবল শুরুটা হয়, আর এখনো অনেক কিছু আবিষ্কার করা বাকি থেকে গিয়েছে?
যদি ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সূত্রও কুরআনের আয়াতগুলোর মধ্যে লুকোনো থাকে?
আপনি প্রস্তুত থাকলে তবে চলুন, একটা একটা করে দেখা যাক। সূরা আন'আম-এ আমরা এই আয়াতটি দেখতে পাই, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না, বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু, এমনকোন বস্তু নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। অর্থ, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না, বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু এমনকোন বস্তু নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই। সুতরাং, এই আয়াত অনুসারে, সবকিছুই কুরআনে আছে। কিন্তু পূর্ণ বিবরণ বা নামসহ নয়। বরং ইঙ্গিত, সারসংক্ষেপ ও মৌলিক নীতির মাধ্যমে। বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত বদিউজ্জামান বলেন, এই আবিষ্কারগুলোর কিছু লুকানো আছে নবীগণের গল্প ও তাঁদের মুজিযাগুলোতে। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তাঁদের গল্পের মাধ্যমে আমাদের কিছু বিষয় জানিয়েছেন। তিনি মানবজাতিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চূড়া কল্পনা করতে শিখিয়েছেন, এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, একদিন অনুরূপ আবিষ্কার হবে। এখন, আমরা কুরআনে থাকা নবীদের ৭টি মুজিযা এবং এর মধ্যে লুকানো নিদর্শনগুলো দেখব। আমরা যতই শেষের দিকে এগিয়ে যাব, এই নিদর্শনগুলো আপনাকে আরও বেশি অবাক করবে। সূরা আন-নামলের ৩৮-৪০ নম্বর আয়াতে, সত্যিই একটি আকর্ষণীয় ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। আয়াত অনুসারে, সুলাইমান (আ.) শেবার রাণীর সিংহাসন চান। যা তাঁর কাছে খুব দূরবর্তী একটি দেশ থেকে আনা হবে। পবিত্র কিতাবের জ্ঞান থাকা একজন বলেন, তিনি চোখের পলকে তা আনতে পারবেন। এবং সাথে সাথেই সিংহাসন সুলাইমান (আ.) এর সামনে হাজির হয়। সুতরাং ইয়েমেনে থাকা সিংহাসন হয় শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়, অথবা দামেস্কে চিত্র হিসাবে দেখা যায়। যেটি মূলত হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। একই সঙ্গে তারা সিংহাসনের চারপাশে থাকা মানুষদের দেখতে পারছিল। এবং তাদের কণ্ঠস্বরও শুনতে পারছিলো। কুরআন এখানে অসাধারণ নিদর্শন দেখায়। ১৪০০ বছর আগে অবতীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও, গ্রন্থটি বর্ণনা করে, কিভাবে বস্তু বা তাদের চিত্র দ্রুত অনেক দূরে পরিবহন করা যায় অথবা পাঠানো যায়। এবং এটি একটি বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে দেখানো হয়। আর আমরা আজ দেখছি, আমরা প্রকৃতপক্ষে ছবি ও শব্দ পাঠাতে পারি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের মাধ্যমে। কুরআনের এই ঘটনাটি, সরাসরি সম্প্রচার, প্রজেক্টর, ক্যামেরা কিংবা আধুনিক হলোগ্রাম থেকে পাওয়া ছবির মতোই নয় কি?
কিন্তু কুরআনে এমন কিছুর উল্লেখ কিভাবে থাকতে পারে? যখন ১৪০০ বছর আগে বিষয়টি সম্পূর্ণ অকল্পনীয় ছিল? আমরা আবারো আরেকটি স্পষ্ট প্রমাণ পাই যে, কুরআন কোনো মানুষের বাণী হতে পারে না। কুরআনে আমরা দেখি, সুলাইমান (আ.) পশুদের ভাষা জানতেন। তাদের সাথে যোগাযোগও করতে পারতেন। সূরা আন-নামলের ১৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে, তিনি পিঁপড়াদের ভাষা বুঝতেন। ২২ নম্বর আয়াতে আছে, তিনি পাখিদের ভাষা বুঝতেন। তাহলে এখানে কেমন নিদর্শন দেওয়া হয়েছে?
আসলে পশুদের ভাষা বোঝা ইঙ্গিত দেয় যে, ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো বুঝতে পারবে, পশুরা কিভাবে যোগাযোগ করে এবং তারা কী করতে সক্ষম। সবশেষে, আমরা জানি, সুলাইমান (আ.) তাদের ভাষা জানতেন। তাদের ক্ষমতা আবিষ্কার করেছিলেন এবং কাজকর্মে তাদের ব্যবহার করতেন। যখন আপনি এটি নিয়ে ভাববেন, যদি আমরা পশুদের সক্ষমতা সম্পূর্ণ বুঝতে পারি, তবে তাদের দিয়ে নিত্যদিনের অনেক ক্ষেত্রে কাজ করাতে পারব। এটা আসলে এমন কিছু, যা আমরা ইতিমধ্যে শুরু করে দিয়েছি। চিঠি ও বার্তা পাঠানোর জন্য, কবুতর ব্যবহার করা হয়েছে। টিয়া পাখিদের কথা বলা শেখানো হয়েছে। পোশাক তৈরির জন্য কিভাবে রেশম কীট ব্যবহার করতে হয়, আমরা তা বের করেছি। একইভাবে আমরা একটি উপায়ে কুকুরের ভাষা শিখেছি এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের শক্তিশালী ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করি। কিছু প্রজাতির ইঁদুর মাইন শনাক্তকরণেও ব্যবহৃত হয়, কারণ তাদের নাক অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমরা ডলফিনের উন্নত সোনার (Sonar) ক্ষমতা ব্যবহার করি, সাবমেরিন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি, সামুদ্রিক মাইন খুজে বের করতে। তাই, সুলাইমান (আ.)-এর পশুদের ভাষা বোঝা এবং নির্দিষ্ট কাজের জন্য তাদের ব্যবহারের অলৌকিক ঘটনা দেখায়, আমরা হয়তো পশুদের আরো বেশি ক্ষমতা আবিষ্কার এবং ভবিষ্যতে তাদের থেকে উপকৃত হওয়ার নতুন উপায় খুঁজে বের করতে পারি। পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। আমরা যদি তাদের ভাষা বুঝতে ও তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তাহলে তাদের সাথে মিলে যা অর্জন করতে পারি তা আমাদের কল্পনার বাইরে হতে পারে। সুলাইমান (আ.)-এর আরেকটি অলৌকিক ক্ষমতা ছিল। তিনি বাতাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। এর মাধ্যমে তিনি খুব অল্প সময়ে দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণ করতে পারতেন। সূরা সাবাতে আল্লাহ বলেন, "আর সুলাইমানের জন্য আমি বাতাসকে অনুগত করে দিয়েছিলাম, যা সকালে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিক্রম করত।" এই আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে, যে যাত্রায় সাধারণত একমাস লাগতো, তা দিনের কিছু অংশে সম্পন্ন করা যেত। এটা কি বিমানের মতো ভবিষ্যত প্রযুক্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত নয়?
একটু চিন্তা করুন। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন আমরা নির্ণয় করতে পারি, কিভাবে বাতাসকে ব্যবহার করব। সঠিক উপকরণ দিয়ে উড়োজাহাজ তৈরি করি। আর ঠিক আয়াতে থাকা নিদর্শনের মতো, আমরা এখন খুব অল্প সময়ে দীর্ঘ যাত্রা সম্পন্ন করি। এমনকি আমরা একই দিনে একাধিক দেশেও থাকতে পারি। যে যাত্রায় একসময় পুরো মাস লাগতো, এখন তা কয়েক ঘন্টায় করা সম্ভব। আরেকটি মুজিযা হলো, ইবরাহিম (আ.) কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। তবুও আগুন তাঁকে পোড়াতে পারেনি। জালিম শাসক নমরুদ তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। এবং তার লোকদের বিশাল আগুন প্রস্তুতের আদেশ দেয়। কিন্তু যখন ইব্রাহিম (আ.)–কে আগুনে নিক্ষেপ করা হলো, তখন ঘটলো এক বিষ্ময়কর ঘটনা, আগুন তাঁর একটুও ক্ষতি করতে পারল না। অবশ্যই, এটি একটি অলৌকিক ঘটনা ছিল, যা বিশেষভাবে এই মহান নবীর জন্য ঘটেছিল। তবে একই সাথে, আমরা এই অলৌকিক ঘটনায় ভবিষ্যতের নির্দশনও দেখতে পাই। শুধু যে ইবরাহিম (আঃ)–ই আগুনে পুড়েননি, না তা নয়, তাঁর পোশাকেও আগুনের কোনো আঁচ লাগেনি। এবং আবারও এ ঘটনা মানবজাতিকে একটা লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। ভবিষ্যতে আগুন-প্রতিরোধী উপকরণ তৈরি করা যেতে পারে। যা মানুষকে আগুন থেকে রক্ষা করবে। এবং প্রকৃতপক্ষে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, আগুন-প্রতিরোধী পোশাক তৈরি হতে শুরু করে, বিশেষ করে, অগ্নিনির্বাপন কর্মীদের জন্য। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে, নোমেক্স ও কেভলারের মতো বিশেষ উপকরণ আবিষ্কৃত হয়। নোমেক্স - ৩৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এবং এতে আগুন ধরার আশঙ্কা খুবই কম। অন্যদিকে কেভলার ৪৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম। এই উদ্ভাবনগুলোর কারণে অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা এখন আরও কার্যকরভাবে আগুন দমন করতে পারে। জরুরি উদ্ধার অভিযানে এগুলো তাদের অনেক সময় ধরে সুরক্ষিত থাকতে সাহায্য করে। সূরা বাকারাতে আছে, মুসা (আ.) তাঁর লাঠি দিয়ে একটি পাথরে আঘাত করেন, এবং হঠাৎ করে ১২টি ঝর্ণা বেরিয়ে আসে। একবার কল্পনা করুন, একটি লাঠির স্পর্শে অনুর্বর মরুভূমির মাঝে একটি শুষ্ক প্রাণহীন পাথর, পরিণত হয় অফুরন্ত পানির উৎসে। ১২টি ঝর্ণা প্রবাহিত হতে শুরু করে, এবং তৃষ্ণার্ত মানুষ অবশেষে সেখান থেকে পানি পান করে। কিন্তু এই অলৌকিক ঘটনায় আর কি বার্তা লুকানো ছিলো?
এটি আসলে দেখিয়েছিল, ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন করা সম্ভব। অন্য কথায়, এটি আজকের দিনে ব্যবহৃত খনন প্রযুক্তির দিকে ইঙ্গিত করে। এই পদ্ধতির সূচনা উনবিংশ শতাব্দীতে। এর আবিষ্কারের পর থেকে, ড্রিলিং মেশিন আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি, তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। সুতরাং একটি লাঠির আঘাতে, একটি পাথর থেকে পানি বের হতে দেখে মানুষ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি কল্পনা করতে অনুপ্রাণিত হয়েছে। আয়াতটিতে ড্রিলিং মেশিন আবিষ্কার হওয়ার অনেক আগে থেকেই এর ইঙ্গিত ছিলো। সূরা আল-ইমরানে আছে, ঈসা (আ.), যিনি যিশু নামেও পরিচিত, "আর আমি আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রুগীকে সুস্থ করবো এবং মৃতকে জীবিত করবো। এগুলো ঈসা (আ.)-এর সবচেয়ে পরিচিত কিছু অলৌকিক ঘটনা। এখন আমরা তাদের মধ্যে একটি বিষয় লক্ষ্য করি, জন্মগত অন্ধত্ব নিরাময়। আজকের দিনে, জিন থেরাপি ও স্টেম সেল চিকিৎসার মতো উন্নতি প্রযুক্তির সাহায্যে কয়েক প্রকার জন্মগত অন্ধত্বের চিকিৎসা সম্ভব। আবার বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত কুষ্ঠ রোগের কোন নিরাময় ছিলো না। কিন্তু আজ নির্দিষ্ট ওষুধের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ২ বছর সময়কালের মধ্যে এর চিকিৎসা করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, আজকাল, কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল ছাড়া, কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বেদিউজ্জামান ব্যাখ্যা করেছেন, এই আয়াতটি বার্তা দেয় সবচেয়ে পুরনো রোগ ও মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যারও সমাধান থাকতে পারে। রোগ যাই হোক না কেন, নিরাময় সম্ভব। অনুসন্ধান করতে থাকুন, আপনি খুঁজে পাবেন। শেষ ও সবচেয়ে আশ্চর্যজনক নিদর্শন হলো, সুলাইমান (আ.)-এর মুজিযা। জ্বীনদের তাঁর অধীনে নিয়ে আসা এবং ভালোর জন্য কাজ করানো। আল্লাহর ইচ্ছায়, সুলাইমান (আ.) জ্বীনদের সমুদ্রে ডুব দিতে বলেছিলেন। যাতে তারা মূল্যবান রত্ন খুঁজে বের করে অসাধারন কাঠামো নির্মান করতে, এবং তাঁর জন্য বিভিন্ন কঠিন কাজ করতে পারে। বেদিউজ্জামান বলেছেন, এই মুজিযাগুলোতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, তা হলো, জ্বীনদের আসলে নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের সাহায্যকারী বানানো যেতে পারে। কিন্তু অবশ্যই, এটা জাদুবিদ্যা, ভবিষ্যৎ বলা, বা ইসলামিক নীতিবিরোধী অন্য কোন প্রথার মাধ্যমে হবে না। তিনি বলেন, কুরআনের লুকানো কিছু রহস্যের মাধ্যমে এটি সম্ভব হতে পারে। অবশ্যই, আমরা এখনো জানি না এটি কিভাবে সম্ভব হবে। আজকের দিনেও এটি রহস্য হিসেবে রয়ে গেলেও ভবিষ্যতে এটি বাস্তবে পরিণত হতে পারে। এই মুহুর্তে, আপনি হয়তো ভাবছেন, “কুরআনে কেন এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই?” কারণ কুরআনের প্রধান উদ্দেশ্য বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি সম্পর্কে সরাসরি ব্যাখ্যা দেওয়া নয়। অবশেষে, এটি এই বিষয়গুলোর পাঠ্যপুস্তকও নয়। কুরআনের প্রধান বিষয়গুলো হলো তাওহীদ, আল্লাহর একত্ববাদ, পরকাল, নবুয়ত, বিচার ও ইবাদত। তবে, যেহেতু প্রযুক্তিগত আবিষ্কারগুলোও আল্লাহর পক্ষ থেকে আশির্বাদ, এবং সেগুলো মানবজীবনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে, তাই কুরআন সেগুলোকেও পুরোপুরি উপেক্ষা করে না। সুতরাং, সর্বজ্ঞানী হিসেবে, আল্লাহ সেগুলো ইশারা ও নিদর্শনের মাধ্যমে উল্লেখ্য করেছেন। এছাড়া এর পেছনে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারন রয়েছে। প্রথমত, যদি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলো সরাসরি কুরআনে উল্লেখ্য করা হতো, আর কেবল শেষ এক-দুই শতাব্দীকে উদ্দেশ্য করে হতো, তাহলে পূর্ববর্তী ১২ শতাব্দীর মানুষ তা পুরোপুরি বুঝতে পারত না। কেউ কেউ একে অবাস্তবও মনে করত। আর সেটা কুরআনের সার্বজনীনতা বৈশিষ্টের বিরোধী হতো। ভাবুন তো, মাত্র ১০০ বছর আগেও যদি আপনি বলতেন, মানুষ ভিডিও কলে কথা বলতে পারবে, তাহলে কেউই সেটা বিশ্বাস করত না। এ কারণেই কুরআনে এই আবিষ্কারগুলোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে আলামতের মাধ্যমে। সরাসরি বা খোলাখুলিভাবে নয়। যদি সব প্রযুক্তি আর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার খোলাখুলিভাবে বলা হতো, তাহলে কি সেটা পরীক্ষার মূল দর্শনেরই বিপরীত হতো না?
আমরা জানি, জীবন একটা পরীক্ষা, আর সবকিছু যদি স্পষ্ট করে দেয়া হতো, তাহলে অবিশ্বাস করার কোনো সুযোগ থাকত না। সবাই তখন বাধ্য হয়ে ঈমান আনত। আর এতে মানুষের ইচ্ছা আর স্বাধীনতার মূলভাবটাই হারিয়ে যেতো। কারণ তখন আর বোঝা যেত না কার ঈমান সত্যিকারের, আর কে শুধুই বিশ্বাস করছে বাধ্য হয়ে বা নিরুপায় হয়ে। তাই এসব বিষয় এমনভাবে বলা হয়েছে, যাতে সংখ্যালঘু মানুষ চিন্তা করে, খুঁজে দেখে, আর নিজে সিদ্ধান্ত নেয়। সবশেষে, এই পুরো বিষয় থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষা আমরা নিতে পারি, কুরআনে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যেসব আলামত আছে, তা আমাদেরকে একেবারে স্পষ্ট একটা বার্তা দেয়। এই শব্দগুলো কোনো মানুষের কথা হতে পারে না। কোনো মানুষ নিজ কর্তৃত্বে এমন কথা বলতে পারে না, যা সব যুগ, সব স্থান, আর সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হয়। একজন সাধারণ মানুষের কথা কখনোই প্রত্যেক জাতি আর সময়ের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষা আর হিকমত বহন করতে পারে না। এই শব্দগুলো শুধুই সেই সত্তার হতে পারে— যিনি সব কিছুকে শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি সময়ের ঊর্ধ্বে, আর যিনি সবকিছু জানেন, আর তিনি হলেন - আল্লাহ আমরা হয়তো কুরআনের বিস্ময়গুলোর খুব অল্পই আবিষ্কার করতে পেরেছি। আর যত নতুন আবিষ্কার হবে, আমরা হয়তো আরো অনেক লুকানো মুজিযা খুঁজে পাবো, এই চিরন্তন কিতাবে। আর তখন অনেকে আরো বেশি ঈমানদার হয়ে উঠবে, আবার অনেকেই সত্য অস্বীকার করতে, নতুন অজুহাত খুঁজতে থাকবে।