'নূহ (আঃ) এর নৌকাঃ কুরআন বনাম বাইবেল | ইসলাম কী খ্রিস্টধর্মের ব্যাখ্যা সমর্থন করে?
প্রকাশের তারিখ
যখন অন্ধকার মেঘ আকাশ ঢেকে দিচ্ছিল, মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করছিল, একটি জায়গার খোঁজে। কিন্তু যে আশ্রয় তারা পেল, তা তাদের আসন্ন দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছিল না। দিগন্তের প্রান্তে, এক বিশাল ঘূর্ণিঝড় এগিয়ে আসছিল, অন্ধকার ভেদ করে। প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত সবকিছুকে প্লাবিত করে দিচ্ছিল, এমনকি গাছপালা আর পাহাড়ও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শক্তির বিরুদ্ধে টিকতে পারেনি। এবং পানির নিচে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও, একটি নৌকা পানির উপর ভাসছিল। এ মহাবিপর্যয়ের কোনো প্রভাব তার উপর পড়ছিল না। মনে হচ্ছিল, যেন এক অদৃশ্য হাত এটিকে যত্নসহকারে রক্ষা করছে এবং তাতে থাকা লোকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা ভাগ্যের খেলা ছিল না। যেই দিব্য মহাশক্তি এই মহাপ্লাবন পৃথিবীতে এনেছিলেন, তিনি তাঁর নবীকে এই নৌকা তৈরি করতে আদেশ দিয়েছিলেন, এবং তিনি এটি এবং এর যাত্রীদের রক্ষা করছিলেন। এই নৌকাটি ছিল বেঁচে থাকা মানুষদের জন্য আশা, এবং এক নতুন শুরুর সুসংবাদ। এটি ছিল নবী নূহ (আ.) এর নৌকা। এটি সম্ভবত মানব ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক পরিচিত গল্প যা অসংখ্য চলচিত্রের বিষয়বস্তু হয়েছে। আপনি ভাবতে পারেন যে পুরো বিশ্ব এই গল্পটি আপনার মতই জানে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য রয়েছে। খ্রিষ্টান ও ইসলামিক বর্ণনার মধ্যে। আজ আমরা এই গল্পটি দেখব কুরআন ও বাইবেলের দৃষ্টিকোণ থেকে, এবং তাদের মধ্যে সাদৃশ্য ও পার্থক্য তুলনা করব। নূহ (আ.) কেমন সংগ্রামের সম্মুখীন হয়েছিলেন?
এই ভয়ংকর মহাপ্লাবনের কারণ কী ছিল? ঘটনাগুলো এতদূর কীভাবে পৌঁছালো? নৌকায় থাকা লোকেরা কিভাবে এই বিশাল বিপর্যয় থেকে বাঁচল? এবং যখন সব শেষ হয়ে গেল, তখন কী ঘটল?
যদি প্রস্তুত থাকেন, তাহলে শুরু করি। নূহ (আ.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন মেসোপটেমিয়া নামক অঞ্চলে। তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত, সুপরিচিত এবং নৈতিকভাবে আদর্শবান ব্যক্তি, যিনি বহু বছর ধরে তার জাতির মাঝে বসবাস করছিলেন। কিন্তু যে সমাজে তিনি ছিলেন, তা তাঁর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল এটি ছিল এমন এক জাতি যেখানে শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ করত, যেখানে মানুষ নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছেছিল, যেখানে মন্দ ও অহংকার তাদের হৃদয় দখল করেছিল। তারা তাদের জাতির প্রজ্ঞাবান লোকদের মূর্তি তৈরি করছিল, যারা অতীতে মৃত্যুবরন করেছিলো। তারপর তাদের প্রতি ভালোবাসা উপাসনায় রূপান্তরিত হয়েছিল, এবং এক পর্যায়ে তারা তাদের প্রকৃত সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে গিয়েছিল। এই জাতির কাছেই নূহ (আ.) নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি দিনরাত তাদের সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন তাদের ভুল কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখতে, এবং তাদের তা ছেড়ে দিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার বিখ্যাত নৌকা তৈরির প্রক্রিয়া বাইবেলে উল্লেখ নেই। এই অংশের খুটিনাটি সাধারণত কুরআনে পাওয়া যায়। সুরা আল-আ'রাফের ৫৯তম আয়াতে আল্লাহ বলেন নবী নূহ তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তার জাতিকে অন্ধকার ও দুর্নীতির অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে। অন্যদিকে, তার জাতি কখনো অহংকার দেখিয়ে, আবার কখনো কানে আঙুল দিয়ে এড়িয়ে চলে যেত। তারা তাদের নবীকে পথভ্রষ্ট বলত এবং তাকে অপমানজনক কথা বলে ভীত করার চেষ্টা করত। তারা তাদের মিথ্যা বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। তারা নূহের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করল, এই মনে করে যে তিনি কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে এটি করছেন। কিন্তু নূহের উত্তর ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তবুও তারা ক্রমাগত নূহকে অসম্মান করার চেষ্টা করছিল। তারা নবী নূহ এবং তার অনুসারীদের নিয়ে উপহাস করছিল। তার জাতির সব দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও, তিনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র ছিলেন, এবং তিনি চেয়েছিলেন তাদের আসন্ন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক মানুষই নূহের উপর ঈমান এনেছিল, অন্যরা পথভ্রষ্টই রয়ে গেল এবং দিন দিন তাদের নির্যাতন বাড়াতে লাগলো পরিস্থিতি সহ্য করার মতো আর ছিল না। বছরের পর বছর ধরে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি যতই চেষ্টা করুন না কেন তার জাতি মূর্তিপূজার পথ থেকে সরে আসবে না। শেষ চেষ্টা হিসেবে, তিনি তার প্রতিপালককে স্মরণ করে এই দোয়া করলেন। নবী নূহ, যিনি বহু বছর ধরে তার জাতির জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি, যিনি সকল নির্যাতন ও যন্ত্রণা সহ্য করেছিলেন, তিনি এখন প্রতীক্ষা করছিলেন তার ও তার জাতির মাঝে আল্লাহর রায়ের। আমরা শিগগিরই তা জানব। কিন্তু তার আগে গল্পের এই অংশটি বাইবেলে কীভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা দেখা যাক। তখন পৃথিবী ঈশ্বরের দৃষ্টিতে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল, এবং তা ছিল হিংসায় পরিপূর্ণ। ঈশ্বর দেখলেন পৃথিবী কীভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, কারণ পৃথিবীর সব মানুষ নিজেদের বিপথগামী করেছে। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ঈশ্বরের অনুতাপের ঘটনাগুলোর সূত্রপাত হয়েছিল যখন কিছু সত্তা, যাদের বলা হয় ‘ঈশ্বরের পুত্র’, মানব নারীদের বিয়ে করতে চেয়েছিল। এই বিবাহগুলোর মাধ্যমে, পৃথিবীতে মন্দ বৃদ্ধি পেল এবং মানুষ অত্যাচারীতে পরিণত হল। তখন প্রভু বললেন, "আমি পৃথিবীর মুখ থেকে মুছে ফেলব মানুষ জাতিকে, যাদের আমি সৃষ্টি করেছি, কিন্তু কুরআনে আল্লাহর অনুতাপের কোনো উল্লেখ নেই। বরং বাস্তবত, এমন কিছু কখনো হতে পারে না। কারণ অনুতাপ আসে ভুল করা বা ভবিষ্যদ্বাণী করতে না পারার দুর্বলতা থেকে। আর ইসলামিক বিশ্বাসে আল্লাহর ধারণা সম্পূর্ণ ও নিখুঁত, সেহেতু এমন ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তার সঙ্গে কখনো সম্পর্কযুক্ত হতে পারেনা অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর। আল্লাহর আদেশ এসে গেল তাহলে সেই আদেশ কী ছিল?
আল্লাহ নূহকে সম্বোধন করে বললেন, অন্যদিকে বাইবেলে, আল্লাহ নূহকে এইভাবে আদেশ দেনঃ আর এই নৌকা সম্পর্কে আরও অনেক বিশদ বিবরণ দেয়ার পর, বাইবেল অনুযায়ী, ঈশ্বর বললেন, খ্রিস্টান বর্ণনা অনুযায়ী, নৌকায় উঠেছিল শুধু নূহের পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ইসলামিক বর্ণনায়, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল অল্প, তবুও সব বিশ্বাসীরা নৌকায় উঠতে পারবে। তবে তার পরিবারের সবাই নৌকায় উঠতে সক্ষম হয়নি, যা ছিল নূহের জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি। নূহ (আঃ) নৌকা তৈরি করতে শুরু করলেন আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া আদেশ অনুযায়ী। যখন মূর্তিপূজকরা তাঁকে নৌকা তৈরি করতে দেখল তারা তাঁকে উপহাস করা শুরু করল। তারা এসব বলছিল, সত্যই, যেখানে নৌকা তৈরি হচ্ছিল, সেখানে সমুদ্র ছিল না। তাহলে এই নৌকা কীভাবে চলবে?
নবি নূহ এসব কথায় কোনো গুরুত্ব দিলেন না, এবং আল্লাহ যা আদেশ দিয়েছেন তাতে মনোযোগ দিলেন তিনি ভালো করেই জানতেন, তাঁর প্রভু, অসীম শক্তির অধিকারী সবকিছু করতে সক্ষম। এবং তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ করেন না তাই তিনি নির্মাণ চালিয়ে যেতে লাগলেন। অবশেষে যখন আমার ফরমান এসে পৌঁছাল এবং যমীন হতে পানি উথলে উঠতে লাগল, আমরা বললামঃ নৌকার অবতরণের স্থানে জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য, তাকে প্রতিটি জীবের এক জোড়া নৌকায় তুলতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। একই রকম আদেশ বাইবেলেও রয়েছে, তবে এক চমকপ্রদ পার্থক্যসহ। এই আদেশ দুটি ভিন্ন অনুচ্ছেদে বর্ণিত, কিন্তু প্রাণীর জোড়ার সংখ্যা দুই জায়গায় দুই রকম। তবে সপ্তম অধ্যায়ে, আদেশ এভাবে দেওয়া হয়েছে প্রথম অনুচ্ছেদে, এক জোড়া প্রাণী। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে, সাত জোড়া প্রাণী। নূহ তার প্রভুর আদেশমতো সবকিছু ঠিকঠাক করলেন। এবং এখন সময় এসে গেছে। মহাপ্লাবনের আগমন সূচিত করতে, আল্লাহ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে পানি উৎসারিত করে দিলেন। বাইবেল অনুযায়ী তখন নূহের বয়স ছিল ৬০০ বছর। কিন্তু কুরআনের বর্ণনায়, উক্ত ঘটনার সময় পর্যন্ত তিনি তার জাতির মধ্যে ৯৫০ বছর ধরে অবস্থান করেছিলেন। বাইবেল বলে, সেটি ছিল সেই বছরের দ্বিতীয় মাসের ১৭তম দিন। নূহ (আঃ)-এর সঙ্গে, বিশ্বাসীরা ও প্রাণীদের জোড়া নৌকায় উঠে পড়ল। তারপর আকাশে অন্ধকার মেঘ জমল, এবং ভয়ঙ্কর এক বৃষ্টি নিয়ে এল। যখন পানি বাড়তে লাগল, জমিতে স্থির হয়ে থাকা নৌকাটি ধীরে ধীরে ভেসে উঠতে লাগল। নূহের জাতি, যারা তাকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করেছিল এবং তার পুরো নবুয়তের সময়ে তাকে কষ্ট দিয়েছিল, তারা হতভম্ব হয়ে বুঝতে পারল তাদের কৃতকর্মের ভয়ানক মূল্য দেওয়ার সময় এসে গেছে তারা পালানোর জায়গা খুঁজতে লাগল, কিন্তু তা ব্যর্থ ছিল। যেন আকাশ ছিদ্র হয়ে গেছে, পানি প্রচণ্ডভাবে নেমে আসছিল এবং জমির প্রস্রবণগুলো ফেটে গিয়েছিল। আল্লাহ এই বিশাল বন্যা পাঠাচ্ছিলেন এক জাতির উপর, যারা বহু বছর ধরে তাঁর নবীকে অত্যাচার করেছে। এক জাতি যারা দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিল। এই ঘটনা এক শিক্ষা হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গল্প হয়ে থাকবে বাইবেল অনুযায়ী, নূহ এর সব সন্তান নৌকায় ছিল কিন্তু কুরআন বলে, তাঁর এক ছেলে নৌকায় উঠেনি কারণ সে নূহের প্রতি বিশ্বাস আনেনি। কুরআনে, তার নাম উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু তার ও নূহের মধ্যে কথোপকথন এইভাবে বর্ণিত হয়েছে একজন পিতার সেই পরিস্থিতিতে থাকা কল্পনা করুন। আর তিনি কেবল বলেননি, “আমার ছেলে।” তিনি বলেছেন, “আমার প্রিয় পুত্র।” তিনি তার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা ও মমতা দেখিয়েছেন। সব দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার পরেও, তিনি দেখলেন তার সন্তানের এমন আচরণ, এবং তারপর তাকে ডুবে যেতে। নূহের জন্য এটা কতটা বিধ্বংসী হতে পারে কল্পনা করুন। যখন আকাশের ঝড় আরও প্রবল হতে লাগল, নৌকার যাত্রীরা যেই জাহাজে ছিল, তা ছিল বাঁচার একমাত্র উপায়, আর তা আল্লাহর রহমতে পাহাড়সম ঢেউ প্রতিহত করছিল। বিশ্বাসীদের ভরা এই নৌকার নেতা হিসেবে, নূহ ঝড় চলাকালীনও তাঁর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। বন্যা বহুদিন স্থায়ী হয়েছিল। নৌকার দোল খাওয়া ডেকে প্রতিটি দিন ছিল ঈমানদারদের জন্য এক ধৈর্যের পরীক্ষা। যদিও তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এই দীর্ঘ অপেক্ষায়, তাদের ঈমান তাদের শক্তি দিয়েছিল সহ্যের ও অগ্রসর হওয়ার। অবশেষে আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠল এবং বন্যার সেই ভয়ঙ্কর রাগ থেমে গেল আল্লাহ নিরাপদে নৌকাটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপন করলেন। কুরআনে এই মুহূর্তটি এইভাবে বর্ণিতঃ আর বাইবেল এই বিষয়ে যা বলে, তা হলো, কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বন্যা কি পুরো পৃথিবীতে হয়েছিলো?
, নাকি এটি কেবল নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলকে প্রভাবিত করেছিল?
যেখানে বাইবেল স্পষ্ট করে বলে যে এটি পুরো পৃথিবীকে ঢেকেছিল, সেখানে কুরআন এই বিষয়টি অনির্ধারিত রেখেছে। কেউ কেউ এটিকে বিশ্বজনীন বন্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, আবার অন্যরা বলছেন এটি একটি আঞ্চলিক ঘটনা ছিল। কিন্তু যখন বিষয়টি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে এবং তাঁর একটি মহান মু’জিযা নিয়ে, তখন কতটুকু এলাকা প্রভাবিত হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন হয়ে যায়। কারণ যিনি অসীম শক্তির অধিকারী, তাঁর জন্য উভয়টিই সমান সহজ। কিন্তু আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত এই ঘটনার অন্তর্নিহিত বার্তার দিকে নৌকা পাহাড়ে অবতরণ করার পরের ঘটনাগুলো, বাইবেলে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, আপনার যদি জেনেসিসের ৬ নম্বর অধ্যায়ের কথা মনে থাকে সেখানে বলা হয়েছিল ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করে অনুতপ্ত হয়েছিলেন, এবং তাই তিনি তাদের ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখানে, অষ্টম অধ্যায়ে, দেখা যায় যেন, তিনি ক্রোধের মুহূর্তে বন্যা আনলেন। সবশেষে, এক সুগন্ধ দ্বারা তিনি শান্ত হলেন এবং বুঝলেন তিনি ভুল করেছেন। আরেকটি আশ্চর্যজনক বাইবেলীয় বর্ণনায় ৯ম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, হাম, কনআনের পিতা, তার বাবাকে নগ্ন দেখে ফেলল এবং বাইরে গিয়ে তার দুই ভাইকে বলল। এই ঘটনা সংক্ষেপে বললে, নূহের এক ছেলে হাম, তার ভাইদের বলেন বাবার অবস্থা দেখে কিছু করতে। তারা এসে একটি কাপড় দিয়ে তাদের বাবাকে ঢেকে দেয়। কিন্তু এরপর ঘটে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। চলুন দেখি। তিনি আরও বললেন— প্রথমত, লক্ষ্য করুন একজন নবীর ব্যাপারে মদ্যপান করে নগ্ন হয়ে যাওয়া এমন ঘটনা মেনে নেওয়া কতটা অশোভন ব্যাপার। দ্বিতীয়ত, এই অনুচ্ছেদে, হাম তার ভাইদের ডেকে বাবার লজ্জাজনক অবস্থার সমাধান করতে বলেন যা প্রকৃতপক্ষে কোনো ভুল কাজ নয়, বরং একটি ইতিবাচক কাজ। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে, অভিশাপ হামকে করা হয়নি বরং তার ছেলে কনআনের উপর দেওয়া হয়, যার এই ঘটনায় কোনো ভূমিকা ছিল না। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় যে, একজন নবী, যিনি ন্যায়ের প্রতীক ও আদর্শ, তিনি এমন কাজ করতে পারেন। আরো অবাক করার বিষয় হলো, ঈশ্বর এমন কাজকে মানবজাতির জন্য একটি উত্তম উদাহরণ হিসেবে দেখাতে চাইবেন। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো মধ্যযুগে এই অভিশাপকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা। এই কথাগুলো খেয়াল করুন, ১৫শ শতক ও এর পর থেকে একটি বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যে এই অভিশাপই নাকি কৃষ্ণবর্ণের কারণ। এই বাইবেলীয় অংশটি ব্যবহার করা হয়েছিল আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্বকে ন্যায়সঙ্গত করার জন্য। শুনতে অমানবিক মনে হলেও, এটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। লিখেছেন তিনি যেসব শৃঙ্খলাবদ্ধ আফ্রিকানদের দেখেছিলেন, তারা এতটাই দুর্দশাগ্রস্থ ছিল এসব পড়তেও আমার অস্বস্তি লাগে। আবার, ১৮৬২ সালে লিখেছিলেন, অবশ্য, বাইবেলের পাঠ্যাংশে সরাসরি বলা হয়নি যে কৃষ্ণাঙ্গত্ব এই অভিশাপের কারণে হয়েছে। আর আজকের খ্রিস্টান ধর্মগুরুরা বলেন, এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরুপে ভুল। আর অবশ্যই কোনো ধর্মকে তার অনুসারীদের ভুলের কারণে বিচার করা উচিত নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্মীয় মূলগ্রন্থ আসলে কী বলছে। আমরা কথা বলছি একজন মহান নবী, নূহ নবীকে নিয়ে, যিনি তার জাতির জন্য অত্যন্ত আন্তরিক ও দৃঢ় সংগ্রাম করেছিলেন। কিন্তু বাইবেলে যেভাবে তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে, তা তাঁর সম্পর্কে কল্পনাও করা যায় না। অপরদিকে ইসলাম, এই ধরনের কোনো বর্ণনাকেই রাসূলদের জন্য গ্রহণ করে না, এবং ইসলাম এবং ইসলাম এই বিষয়টিও মানে না যে, আল্লাহ এমন বর্ণনা মানবজাতির জন্য ওহি হিসেবে পাঠাবেন। এমন একটি ওহি যেখানে বিরোধ ও অশোভন বক্তব্য বিদ্যমান থাকে, আবার নৌকায় নেওয়া প্রাণীদের জোড়ার সংখ্যা মনে করুন। বাইবেলের জেনেসিস গ্রন্থে দুটি ভিন্ন সংখ্যা দেওয়া হয়েছে। এটি একটি বিরোধিতা। আর বাইবেলের কাহিনিতে সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে অন্য যেসব বক্তব্য এসেছে। তাঁকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যিনি কিছু বিষয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেননি, বা যিনি রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন, সবশেষে আবার তিনি অনুতপ্ত হয়েছেন তার কাজের জন্য। এ ধরনের বক্তব্য আল্লাহ সম্পর্কে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তিনি সব ধরনের ত্রুটির ঊর্ধ্বে। কিন্তু কুরআনে আমরা দেখি, এই কাহিনি বর্ণিত হয়েছে একটি নিখুঁত রূপে। কোনো বিরোধিতা বা অশোভন বক্তব্য ছাড়া। এবং আল্লাহকে বর্ণনা করা হয়েছে তাঁর মর্যাদার যথোপযুক্তভাবে। তাহলে এই সব বিবেচনায় কি এটা বলা যায় না, আল্লাহ কুরআন পাঠিয়ে পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোর ভুল ব্যাখ্যাগুলো সংশোধন করেছেন?
ঠিক এই কাহিনির মতোই ভুল বর্ণনাগুলোর সঠিক সংস্করণ দিয়ে দিয়েছেন? আর আমরা কি এও বলতে পারি না যে, কুরআন নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ সংশোধন করেছেন বাইবেলের মিথ্যা বিশ্বাস যেটা শতাব্দী ধরে চলেছে?
আর কুরআন তাও সংশোধন করেছে, যিশু সম্পর্কে খ্রিস্টধর্মে যে ভ্রান্ত বিশ্বাস প্রবেশ করেছিল, তাঁর সৃষ্টিকর্তা হওয়ার মিথ্যাকে অস্বীকার করে ঘোষণা দেন, তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত মহান রাসূলদের একজন। আমরা সবাই চলছি একটি নির্দিষ্ট পথে একটি বিশাল জাহাজে ভর করে, যার নাম পৃথিবী, আর আমাদের সমুদ্র হলো এই বিশাল মহাকাশ। ইতিহাস জুড়ে, নূহ (আঃ) এর মত হাজার নবী রাসুল এই জাহাজে মানবতাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঈসা (আঃ)-ও তাদেরই একজন ছিলেন। তাঁরা সকলে মানুষকে সত্যের কাছে আনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যখন যিশু (আঃ)-এর নিয়ে আসা প্রকৃত বিশ্বাস বিকৃত হয়ে গেল, তখন এই জাহাজ তুলে দেওয়া হলো শেষ নেতার হাতে। এই তুলনাগুলোর আলোকে, আপনি কি মনে করেন না যে এই শেষ নেতা হচ্ছেন রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ), আর আমাদের কম্পাস হচ্ছে পবিত্র কুরআন?
এই ভয়ংকর মহাপ্লাবনের কারণ কী ছিল? ঘটনাগুলো এতদূর কীভাবে পৌঁছালো? নৌকায় থাকা লোকেরা কিভাবে এই বিশাল বিপর্যয় থেকে বাঁচল? এবং যখন সব শেষ হয়ে গেল, তখন কী ঘটল?
যদি প্রস্তুত থাকেন, তাহলে শুরু করি। নূহ (আ.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন মেসোপটেমিয়া নামক অঞ্চলে। তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত, সুপরিচিত এবং নৈতিকভাবে আদর্শবান ব্যক্তি, যিনি বহু বছর ধরে তার জাতির মাঝে বসবাস করছিলেন। কিন্তু যে সমাজে তিনি ছিলেন, তা তাঁর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল এটি ছিল এমন এক জাতি যেখানে শক্তিমানরা দুর্বলদের শোষণ করত, যেখানে মানুষ নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছেছিল, যেখানে মন্দ ও অহংকার তাদের হৃদয় দখল করেছিল। তারা তাদের জাতির প্রজ্ঞাবান লোকদের মূর্তি তৈরি করছিল, যারা অতীতে মৃত্যুবরন করেছিলো। তারপর তাদের প্রতি ভালোবাসা উপাসনায় রূপান্তরিত হয়েছিল, এবং এক পর্যায়ে তারা তাদের প্রকৃত সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে গিয়েছিল। এই জাতির কাছেই নূহ (আ.) নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। তিনি দিনরাত তাদের সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন তাদের ভুল কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখতে, এবং তাদের তা ছেড়ে দিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার বিখ্যাত নৌকা তৈরির প্রক্রিয়া বাইবেলে উল্লেখ নেই। এই অংশের খুটিনাটি সাধারণত কুরআনে পাওয়া যায়। সুরা আল-আ'রাফের ৫৯তম আয়াতে আল্লাহ বলেন নবী নূহ তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তার জাতিকে অন্ধকার ও দুর্নীতির অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে। অন্যদিকে, তার জাতি কখনো অহংকার দেখিয়ে, আবার কখনো কানে আঙুল দিয়ে এড়িয়ে চলে যেত। তারা তাদের নবীকে পথভ্রষ্ট বলত এবং তাকে অপমানজনক কথা বলে ভীত করার চেষ্টা করত। তারা তাদের মিথ্যা বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। তারা নূহের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করল, এই মনে করে যে তিনি কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে এটি করছেন। কিন্তু নূহের উত্তর ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তবুও তারা ক্রমাগত নূহকে অসম্মান করার চেষ্টা করছিল। তারা নবী নূহ এবং তার অনুসারীদের নিয়ে উপহাস করছিল। তার জাতির সব দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও, তিনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র ছিলেন, এবং তিনি চেয়েছিলেন তাদের আসন্ন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক মানুষই নূহের উপর ঈমান এনেছিল, অন্যরা পথভ্রষ্টই রয়ে গেল এবং দিন দিন তাদের নির্যাতন বাড়াতে লাগলো পরিস্থিতি সহ্য করার মতো আর ছিল না। বছরের পর বছর ধরে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি যতই চেষ্টা করুন না কেন তার জাতি মূর্তিপূজার পথ থেকে সরে আসবে না। শেষ চেষ্টা হিসেবে, তিনি তার প্রতিপালককে স্মরণ করে এই দোয়া করলেন। নবী নূহ, যিনি বহু বছর ধরে তার জাতির জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি, যিনি সকল নির্যাতন ও যন্ত্রণা সহ্য করেছিলেন, তিনি এখন প্রতীক্ষা করছিলেন তার ও তার জাতির মাঝে আল্লাহর রায়ের। আমরা শিগগিরই তা জানব। কিন্তু তার আগে গল্পের এই অংশটি বাইবেলে কীভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা দেখা যাক। তখন পৃথিবী ঈশ্বরের দৃষ্টিতে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল, এবং তা ছিল হিংসায় পরিপূর্ণ। ঈশ্বর দেখলেন পৃথিবী কীভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, কারণ পৃথিবীর সব মানুষ নিজেদের বিপথগামী করেছে। বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ঈশ্বরের অনুতাপের ঘটনাগুলোর সূত্রপাত হয়েছিল যখন কিছু সত্তা, যাদের বলা হয় ‘ঈশ্বরের পুত্র’, মানব নারীদের বিয়ে করতে চেয়েছিল। এই বিবাহগুলোর মাধ্যমে, পৃথিবীতে মন্দ বৃদ্ধি পেল এবং মানুষ অত্যাচারীতে পরিণত হল। তখন প্রভু বললেন, "আমি পৃথিবীর মুখ থেকে মুছে ফেলব মানুষ জাতিকে, যাদের আমি সৃষ্টি করেছি, কিন্তু কুরআনে আল্লাহর অনুতাপের কোনো উল্লেখ নেই। বরং বাস্তবত, এমন কিছু কখনো হতে পারে না। কারণ অনুতাপ আসে ভুল করা বা ভবিষ্যদ্বাণী করতে না পারার দুর্বলতা থেকে। আর ইসলামিক বিশ্বাসে আল্লাহর ধারণা সম্পূর্ণ ও নিখুঁত, সেহেতু এমন ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তার সঙ্গে কখনো সম্পর্কযুক্ত হতে পারেনা অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর। আল্লাহর আদেশ এসে গেল তাহলে সেই আদেশ কী ছিল?
আল্লাহ নূহকে সম্বোধন করে বললেন, অন্যদিকে বাইবেলে, আল্লাহ নূহকে এইভাবে আদেশ দেনঃ আর এই নৌকা সম্পর্কে আরও অনেক বিশদ বিবরণ দেয়ার পর, বাইবেল অনুযায়ী, ঈশ্বর বললেন, খ্রিস্টান বর্ণনা অনুযায়ী, নৌকায় উঠেছিল শুধু নূহের পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ইসলামিক বর্ণনায়, যদিও তাদের সংখ্যা ছিল অল্প, তবুও সব বিশ্বাসীরা নৌকায় উঠতে পারবে। তবে তার পরিবারের সবাই নৌকায় উঠতে সক্ষম হয়নি, যা ছিল নূহের জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্টগুলোর একটি। নূহ (আঃ) নৌকা তৈরি করতে শুরু করলেন আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া আদেশ অনুযায়ী। যখন মূর্তিপূজকরা তাঁকে নৌকা তৈরি করতে দেখল তারা তাঁকে উপহাস করা শুরু করল। তারা এসব বলছিল, সত্যই, যেখানে নৌকা তৈরি হচ্ছিল, সেখানে সমুদ্র ছিল না। তাহলে এই নৌকা কীভাবে চলবে?
নবি নূহ এসব কথায় কোনো গুরুত্ব দিলেন না, এবং আল্লাহ যা আদেশ দিয়েছেন তাতে মনোযোগ দিলেন তিনি ভালো করেই জানতেন, তাঁর প্রভু, অসীম শক্তির অধিকারী সবকিছু করতে সক্ষম। এবং তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ করেন না তাই তিনি নির্মাণ চালিয়ে যেতে লাগলেন। অবশেষে যখন আমার ফরমান এসে পৌঁছাল এবং যমীন হতে পানি উথলে উঠতে লাগল, আমরা বললামঃ নৌকার অবতরণের স্থানে জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য, তাকে প্রতিটি জীবের এক জোড়া নৌকায় তুলতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। একই রকম আদেশ বাইবেলেও রয়েছে, তবে এক চমকপ্রদ পার্থক্যসহ। এই আদেশ দুটি ভিন্ন অনুচ্ছেদে বর্ণিত, কিন্তু প্রাণীর জোড়ার সংখ্যা দুই জায়গায় দুই রকম। তবে সপ্তম অধ্যায়ে, আদেশ এভাবে দেওয়া হয়েছে প্রথম অনুচ্ছেদে, এক জোড়া প্রাণী। দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে, সাত জোড়া প্রাণী। নূহ তার প্রভুর আদেশমতো সবকিছু ঠিকঠাক করলেন। এবং এখন সময় এসে গেছে। মহাপ্লাবনের আগমন সূচিত করতে, আল্লাহ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে পানি উৎসারিত করে দিলেন। বাইবেল অনুযায়ী তখন নূহের বয়স ছিল ৬০০ বছর। কিন্তু কুরআনের বর্ণনায়, উক্ত ঘটনার সময় পর্যন্ত তিনি তার জাতির মধ্যে ৯৫০ বছর ধরে অবস্থান করেছিলেন। বাইবেল বলে, সেটি ছিল সেই বছরের দ্বিতীয় মাসের ১৭তম দিন। নূহ (আঃ)-এর সঙ্গে, বিশ্বাসীরা ও প্রাণীদের জোড়া নৌকায় উঠে পড়ল। তারপর আকাশে অন্ধকার মেঘ জমল, এবং ভয়ঙ্কর এক বৃষ্টি নিয়ে এল। যখন পানি বাড়তে লাগল, জমিতে স্থির হয়ে থাকা নৌকাটি ধীরে ধীরে ভেসে উঠতে লাগল। নূহের জাতি, যারা তাকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করেছিল এবং তার পুরো নবুয়তের সময়ে তাকে কষ্ট দিয়েছিল, তারা হতভম্ব হয়ে বুঝতে পারল তাদের কৃতকর্মের ভয়ানক মূল্য দেওয়ার সময় এসে গেছে তারা পালানোর জায়গা খুঁজতে লাগল, কিন্তু তা ব্যর্থ ছিল। যেন আকাশ ছিদ্র হয়ে গেছে, পানি প্রচণ্ডভাবে নেমে আসছিল এবং জমির প্রস্রবণগুলো ফেটে গিয়েছিল। আল্লাহ এই বিশাল বন্যা পাঠাচ্ছিলেন এক জাতির উপর, যারা বহু বছর ধরে তাঁর নবীকে অত্যাচার করেছে। এক জাতি যারা দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিল। এই ঘটনা এক শিক্ষা হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গল্প হয়ে থাকবে বাইবেল অনুযায়ী, নূহ এর সব সন্তান নৌকায় ছিল কিন্তু কুরআন বলে, তাঁর এক ছেলে নৌকায় উঠেনি কারণ সে নূহের প্রতি বিশ্বাস আনেনি। কুরআনে, তার নাম উল্লেখ করা হয়নি, কিন্তু তার ও নূহের মধ্যে কথোপকথন এইভাবে বর্ণিত হয়েছে একজন পিতার সেই পরিস্থিতিতে থাকা কল্পনা করুন। আর তিনি কেবল বলেননি, “আমার ছেলে।” তিনি বলেছেন, “আমার প্রিয় পুত্র।” তিনি তার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা ও মমতা দেখিয়েছেন। সব দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার পরেও, তিনি দেখলেন তার সন্তানের এমন আচরণ, এবং তারপর তাকে ডুবে যেতে। নূহের জন্য এটা কতটা বিধ্বংসী হতে পারে কল্পনা করুন। যখন আকাশের ঝড় আরও প্রবল হতে লাগল, নৌকার যাত্রীরা যেই জাহাজে ছিল, তা ছিল বাঁচার একমাত্র উপায়, আর তা আল্লাহর রহমতে পাহাড়সম ঢেউ প্রতিহত করছিল। বিশ্বাসীদের ভরা এই নৌকার নেতা হিসেবে, নূহ ঝড় চলাকালীনও তাঁর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। বন্যা বহুদিন স্থায়ী হয়েছিল। নৌকার দোল খাওয়া ডেকে প্রতিটি দিন ছিল ঈমানদারদের জন্য এক ধৈর্যের পরীক্ষা। যদিও তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এই দীর্ঘ অপেক্ষায়, তাদের ঈমান তাদের শক্তি দিয়েছিল সহ্যের ও অগ্রসর হওয়ার। অবশেষে আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠল এবং বন্যার সেই ভয়ঙ্কর রাগ থেমে গেল আল্লাহ নিরাপদে নৌকাটি একটি পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপন করলেন। কুরআনে এই মুহূর্তটি এইভাবে বর্ণিতঃ আর বাইবেল এই বিষয়ে যা বলে, তা হলো, কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বন্যা কি পুরো পৃথিবীতে হয়েছিলো?
, নাকি এটি কেবল নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলকে প্রভাবিত করেছিল?
যেখানে বাইবেল স্পষ্ট করে বলে যে এটি পুরো পৃথিবীকে ঢেকেছিল, সেখানে কুরআন এই বিষয়টি অনির্ধারিত রেখেছে। কেউ কেউ এটিকে বিশ্বজনীন বন্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, আবার অন্যরা বলছেন এটি একটি আঞ্চলিক ঘটনা ছিল। কিন্তু যখন বিষয়টি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে এবং তাঁর একটি মহান মু’জিযা নিয়ে, তখন কতটুকু এলাকা প্রভাবিত হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন হয়ে যায়। কারণ যিনি অসীম শক্তির অধিকারী, তাঁর জন্য উভয়টিই সমান সহজ। কিন্তু আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত এই ঘটনার অন্তর্নিহিত বার্তার দিকে নৌকা পাহাড়ে অবতরণ করার পরের ঘটনাগুলো, বাইবেলে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, আপনার যদি জেনেসিসের ৬ নম্বর অধ্যায়ের কথা মনে থাকে সেখানে বলা হয়েছিল ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করে অনুতপ্ত হয়েছিলেন, এবং তাই তিনি তাদের ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখানে, অষ্টম অধ্যায়ে, দেখা যায় যেন, তিনি ক্রোধের মুহূর্তে বন্যা আনলেন। সবশেষে, এক সুগন্ধ দ্বারা তিনি শান্ত হলেন এবং বুঝলেন তিনি ভুল করেছেন। আরেকটি আশ্চর্যজনক বাইবেলীয় বর্ণনায় ৯ম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, হাম, কনআনের পিতা, তার বাবাকে নগ্ন দেখে ফেলল এবং বাইরে গিয়ে তার দুই ভাইকে বলল। এই ঘটনা সংক্ষেপে বললে, নূহের এক ছেলে হাম, তার ভাইদের বলেন বাবার অবস্থা দেখে কিছু করতে। তারা এসে একটি কাপড় দিয়ে তাদের বাবাকে ঢেকে দেয়। কিন্তু এরপর ঘটে এক বিস্ময়কর ব্যাপার। চলুন দেখি। তিনি আরও বললেন— প্রথমত, লক্ষ্য করুন একজন নবীর ব্যাপারে মদ্যপান করে নগ্ন হয়ে যাওয়া এমন ঘটনা মেনে নেওয়া কতটা অশোভন ব্যাপার। দ্বিতীয়ত, এই অনুচ্ছেদে, হাম তার ভাইদের ডেকে বাবার লজ্জাজনক অবস্থার সমাধান করতে বলেন যা প্রকৃতপক্ষে কোনো ভুল কাজ নয়, বরং একটি ইতিবাচক কাজ। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে, অভিশাপ হামকে করা হয়নি বরং তার ছেলে কনআনের উপর দেওয়া হয়, যার এই ঘটনায় কোনো ভূমিকা ছিল না। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় যে, একজন নবী, যিনি ন্যায়ের প্রতীক ও আদর্শ, তিনি এমন কাজ করতে পারেন। আরো অবাক করার বিষয় হলো, ঈশ্বর এমন কাজকে মানবজাতির জন্য একটি উত্তম উদাহরণ হিসেবে দেখাতে চাইবেন। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো মধ্যযুগে এই অভিশাপকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা। এই কথাগুলো খেয়াল করুন, ১৫শ শতক ও এর পর থেকে একটি বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে যে এই অভিশাপই নাকি কৃষ্ণবর্ণের কারণ। এই বাইবেলীয় অংশটি ব্যবহার করা হয়েছিল আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্বকে ন্যায়সঙ্গত করার জন্য। শুনতে অমানবিক মনে হলেও, এটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। লিখেছেন তিনি যেসব শৃঙ্খলাবদ্ধ আফ্রিকানদের দেখেছিলেন, তারা এতটাই দুর্দশাগ্রস্থ ছিল এসব পড়তেও আমার অস্বস্তি লাগে। আবার, ১৮৬২ সালে লিখেছিলেন, অবশ্য, বাইবেলের পাঠ্যাংশে সরাসরি বলা হয়নি যে কৃষ্ণাঙ্গত্ব এই অভিশাপের কারণে হয়েছে। আর আজকের খ্রিস্টান ধর্মগুরুরা বলেন, এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরুপে ভুল। আর অবশ্যই কোনো ধর্মকে তার অনুসারীদের ভুলের কারণে বিচার করা উচিত নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্মীয় মূলগ্রন্থ আসলে কী বলছে। আমরা কথা বলছি একজন মহান নবী, নূহ নবীকে নিয়ে, যিনি তার জাতির জন্য অত্যন্ত আন্তরিক ও দৃঢ় সংগ্রাম করেছিলেন। কিন্তু বাইবেলে যেভাবে তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে, তা তাঁর সম্পর্কে কল্পনাও করা যায় না। অপরদিকে ইসলাম, এই ধরনের কোনো বর্ণনাকেই রাসূলদের জন্য গ্রহণ করে না, এবং ইসলাম এবং ইসলাম এই বিষয়টিও মানে না যে, আল্লাহ এমন বর্ণনা মানবজাতির জন্য ওহি হিসেবে পাঠাবেন। এমন একটি ওহি যেখানে বিরোধ ও অশোভন বক্তব্য বিদ্যমান থাকে, আবার নৌকায় নেওয়া প্রাণীদের জোড়ার সংখ্যা মনে করুন। বাইবেলের জেনেসিস গ্রন্থে দুটি ভিন্ন সংখ্যা দেওয়া হয়েছে। এটি একটি বিরোধিতা। আর বাইবেলের কাহিনিতে সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে অন্য যেসব বক্তব্য এসেছে। তাঁকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যিনি কিছু বিষয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেননি, বা যিনি রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন, সবশেষে আবার তিনি অনুতপ্ত হয়েছেন তার কাজের জন্য। এ ধরনের বক্তব্য আল্লাহ সম্পর্কে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তিনি সব ধরনের ত্রুটির ঊর্ধ্বে। কিন্তু কুরআনে আমরা দেখি, এই কাহিনি বর্ণিত হয়েছে একটি নিখুঁত রূপে। কোনো বিরোধিতা বা অশোভন বক্তব্য ছাড়া। এবং আল্লাহকে বর্ণনা করা হয়েছে তাঁর মর্যাদার যথোপযুক্তভাবে। তাহলে এই সব বিবেচনায় কি এটা বলা যায় না, আল্লাহ কুরআন পাঠিয়ে পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোর ভুল ব্যাখ্যাগুলো সংশোধন করেছেন?
ঠিক এই কাহিনির মতোই ভুল বর্ণনাগুলোর সঠিক সংস্করণ দিয়ে দিয়েছেন? আর আমরা কি এও বলতে পারি না যে, কুরআন নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহ সংশোধন করেছেন বাইবেলের মিথ্যা বিশ্বাস যেটা শতাব্দী ধরে চলেছে?
আর কুরআন তাও সংশোধন করেছে, যিশু সম্পর্কে খ্রিস্টধর্মে যে ভ্রান্ত বিশ্বাস প্রবেশ করেছিল, তাঁর সৃষ্টিকর্তা হওয়ার মিথ্যাকে অস্বীকার করে ঘোষণা দেন, তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত মহান রাসূলদের একজন। আমরা সবাই চলছি একটি নির্দিষ্ট পথে একটি বিশাল জাহাজে ভর করে, যার নাম পৃথিবী, আর আমাদের সমুদ্র হলো এই বিশাল মহাকাশ। ইতিহাস জুড়ে, নূহ (আঃ) এর মত হাজার নবী রাসুল এই জাহাজে মানবতাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঈসা (আঃ)-ও তাদেরই একজন ছিলেন। তাঁরা সকলে মানুষকে সত্যের কাছে আনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যখন যিশু (আঃ)-এর নিয়ে আসা প্রকৃত বিশ্বাস বিকৃত হয়ে গেল, তখন এই জাহাজ তুলে দেওয়া হলো শেষ নেতার হাতে। এই তুলনাগুলোর আলোকে, আপনি কি মনে করেন না যে এই শেষ নেতা হচ্ছেন রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ), আর আমাদের কম্পাস হচ্ছে পবিত্র কুরআন?