“আমি ভয় পাচ্ছিলাম, ইসলাম সত্যও হতে পারে” - নাস্তিকতা থেকে ইসলামের পথে
প্রকাশের তারিখ
প্রতিবার যখন বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেতাম, আমার লক্ষ্য থাকত এত বেশি পান করব যে, যেন কিছুই মনে না থাকে। আমি পান করতাম, করতাম, আর করতাম। রাতে বিছানায় গেলে শুধু আশা করতাম, যেন ঘুম থেকে আর নাই জাগি। এই জীবনের কোনো উদ্দেশ্য আমি দেখতে পেতাম না। যদি এটাই সব হয়, তাহলে খেলা বন্ধ করো, সব বন্ধ করো। আমি এর অংশ হতে চাই না। ধর্ম আমার কাছে উত্তর ছিল না। আমার মামা, মায়ের ভাই, আমাকে ফোন করে বললেন, “তোমার মা হাসপাতালে, আর অবস্থা গুরুতর।” আপনি জানেন, হার্ট মনিটরটা একেবারে ফ্ল্যাটলাইন হয়ে গেল, আর ডাক্তার এসে বললেন, আমাদের আর কিছুই করার নেই। মনে আছে, আমি সেখানেই বসে পড়েছিলাম। আমি হাত তুলে বললাম, যে-ই আমাকে শুনছেন, যে-ই আমাকে দেখছেন, আমাকে পথ দেখান। কী হয়েছিল জানি না, যেন হঠাৎ কিছু একটা খুলে গেল, আর আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ আমি বুঝলাম, তিনি এখন যা বলছেন, তা সত্য। যেখান থেকেই এটা এসেছে, তা সত্য। যার মানে ইসলাম সত্য। আর আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। এখন যদি তুমি এটা না করো, হয়তো আর কখনোই করআঃ হবেনা। আমি ভাবলাম, আমাকে করতেই হবে। আমি বললাম। আমি বললাম, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ। আসসালামু আলাইকুম, ভাই সাইমন ওয়ালগ্রেন, আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। টুয়ার্ড ইটারনিটি-এর পক্ষ থেকে আপনাকে পেয়ে আমরা খুব আনন্দিত। ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। সাইমন ওয়ালগ্রেন কে?
অনুগ্রহ করে আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলবেন? আমি মূলত সুইডেনের, সেখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আর সত্যি বলতে, আমি নাস্তিক হিসেবে বড় হয়েছিলাম। জীবনের এক পর্যায়ে, আমি আমার খুব প্রিয় একজন মানুষকে হারাই। সেটাই আমাকে জাগিয়ে তোলে। আর শেষ পর্যন্ত সেটাই আমাকে ইসলাম ধর্মের দিকে নিয়ে যায়। ইসলামের আগে আপনার জীবন কেমন ছিল? আপনি কি আমাদের সেই দিনগুলোতে নিয়ে যাবেন?
আমার জন্য এটা ছিল এক ধরনের পরিবর্তনের পথ। আমি যখন ১১-১২ বছরের দিকে, কিশোর বয়সে প্রবেশ করতে শুরু করি, আমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সেটা আমার জন্য একটা মোড় ঘোরানো সময় ছিল, কারণ আমি তখন মায়ের সঙ্গে থাকছি, আর বাবা চলে গেছেন। স্টেবিলিটি অনেকটাই হারিয়ে গেল। আপনি জানেন, একজন ছেলের জীবনে যখন কোনো পুরুষ আদর্শ থাকে না, তখন ভেতরে কিছু একটা ভেঙে যায়। নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে হয়। পথ দেখানোর মতো কেউ থাকে না। আর আমি জানতাম না কী করব। দুঃখজনকভাবে, বিচ্ছেদের পর আমার মা আরও খারাপ হয়ে গেলেন। তিনি অনেক মদ্যপান শুরু করলেন। অনেক পার্টি করতে শুরু করলেন, বাড়িতে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষ নিয়ে আসতেন। কল্পনা করুন। আমি সস্থি হারিয়েছি। আর নিজের ঘরেও নিরাপদ বোধ করতাম না। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন অপরিচিত মানুষ। সবকিছু খুব, খুব অস্বাভাবিক লাগত। আর আমি আবারও নিজেকে ব্যস্ত রাখতাম, পার্টি আর এসবের মাধ্যমে। মনে হতো যেন আমি আগেই অন্ধকারে ছিলাম, কিন্তু অন্ধকারেরও নানা গভীরতা আছে, নানা স্তর আছে। আর মনে হতো আমি শুধু আরও নিচের স্তরে নেমে যাচ্ছি। এটা চলতেই থাকল। তখন অবশ্য বুঝতাম না, কিন্তু আমি ডিপ্রেশনে ছিলাম। খুব গভীর ডিপ্রেশনে। একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছালাম যে, প্রতিদিন রাতে বিছানায় গেলে, শুধু আশা করতাম, আশা করতাম যেন আর না জাগি। এই জীবনের কোনো উদ্দেশ্য আমি দেখতে পেতাম না। যদি এটাই সব হয়, তাহলে খেলা বন্ধ করো, সব বন্ধ করো। আমি এর অংশ হতে চাই না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা খুব কঠিন ছিল। আমি যখন হাই স্কুলে ছিলাম, শেষ বছরে, আমার মা অন্য শহরের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হন, আর তিনি আমার বোনকে নিয়ে সেখানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আমাকেও তাঁর সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি তখন শেষ বছরে। যদি যাই, তাহলে আবার নতুন করে শুরু করতে হতো। আর মনে রাখবেন, আমি একা থাকতে ঘৃণা করতাম। আমার কেউ ছিল না, শুধু আমি আর একটি বিড়াল। আর বিলগুলোও আমাকে নিজেই দিতে হতো। আমি স্কুলে পড়তাম, আবার তিনটি চাকরিও করতাম। এটা সত্যিই খুব কঠিন ছিল। প্রতিবার বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেতাম, মদ না খেয়ে থাকা বা...
আমার লক্ষ্য থাকত এত বেশি পান করব, যেন কিছুই মনে না থাকে। এটাই তখন আমার লক্ষ্য। আর আমি পান করতাম, করতাম, করতাম। স্কুল শেষ করার পর, আমি ফুল-টাইমের চেয়েও বেশি কাজ শুরু করি। শুধু নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য। তারপর আমার মামা, মায়ের ভাই, আমাকে ফোন করে বললেন, “তোমার মা হাসপাতালে, আর অবস্থা গুরুতর।” ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী অনুভব করব। অবশ্যই আমি খুব চিন্তিত ছিলাম। কারণ তিনি আমার মা, আমি তাঁকে ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের অতীতের পুরো ইতিহাসের কারণে সবকিছু খুব জটিল ছিল। আর একটা বিষয় বারবার ভাবছিলাম, আশা করি, তাঁর সঙ্গে কথা বলার আরও সময় পাব। অনেক কিছু আছে যা আমাদের মিটিয়ে নেওয়া দরকার। অনেক কথা আছে যা আমাকে বলতে হবে। ঠিক তো?
তারপর আমরা সেখানে গাড়ি চালিয়ে গেলাম। আমি, তাঁর মা, আমার মামা আর তাঁর স্ত্রী। আমরা সেখানে গেলাম। আর তিনি কোমায় ছিলেন। তিনি হাসপাতালের বিছানায় ছিলেন। সবকিছু যেন অবাস্তব লাগছিল। আর ডাক্তার এসে বললেন, আমাদের আর কিছু করার নেই। মনে আছে, আমি তাঁর হাত ধরেছিলাম। হাতটা ঠান্ডা ছিল। সেটা শুধু... একজন নাস্তিক হিসেবে এটা খুব কঠিন। অথবা খুব সহজ, যখন মৃত্যুর এত কাছে থাকতে হয় না, তখন বলা সহজ যে কোন কিছু নেই... মৃত্যুর পর কিছু নেই। ঠিক তো? আপনি শুধু মারা যান, আর সব শেষ। কিন্তু যখন আপনার সামনে আপনার বাবা-মায়ের একজন প্রায় মৃত অবস্থায় থাকে, তখন সেটা বিশ্বাস করা কঠিন। আমার মনে তখন কত বিপরীতধর্মী চিন্তা চলছিল, বুঝতে পারছেন?
আর তাঁকে যা যা বলতে চেয়েছিলাম। আমি তাঁর ওপর খুব রাগান্বিত ছিলাম, একই সঙ্গে তাঁকে মিস করছিলাম, একই সঙ্গে এত বিরোধী অনুভূতি ছিল। আপনি জানেন, হার্ট মনিটরটা একেবারে ফ্ল্যাটলাইন হয়ে গেল। আর আমি সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি সত্যিই...
আর অদ্ভুত বিষয় হলো, আমি জানতাম না যে— শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, আমি জানতাম না আমি তাঁকে এত ভালোবাসি। আর আমার মনে হয়, এটা আমাকে খুব গভীরভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিল, মৃত্যু কতটা কাছে। যখন আপনার কোনো প্রিয়জন খুব বয়স্ক হয়, আর মারা যায়, তখন সেটা কিছুটা বোঝা যায়, তারা ভালো জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু তিনি মাত্র ৪১ বছরের ছিলেন, আর তাঁর মদের সমস্যা ছিল, জুয়ার সমস্যাও ছিল। তাঁর জীবন ছিল খুব কষ্টের, তিনি খুব খারাপ ঘরে বড় হয়েছিলেন, অনেক পারিবারিক সহিংসতা ছিল। এটা কোনো জীবন ছিল না। সেটাই ছিল আমার প্রয়োজনীয় জাগরণের ডাক। অবশ্যই শোকের সেই সময় পার করা ভীষণ আশাহীন আর অন্ধকার মনে হয়েছিল। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাকে সেটা পার করতেই হতো। লোকেরা সবসময় বলে, ভোরের ঠিক আগে অন্ধকার সবচেয়ে গভীর হয়। আমি ঠিক সেই অবস্থাতেই ছিলাম। ভোরের ঠিক আগে। আর আমার চাকরি ছিল। সবকিছু ছিল। বিল দিতে হতো। তাই ভাবলাম, এখন পাগল হয়ে গেলে চলবে না। আমাকে শুধু টিকে থাকতে হবে। সে সময়ে সুইডেনে মেডিটেশন খুব জনপ্রিয় ছিল। নতুন নতুন অ্যাপ ইত্যাদি ইত্যাদি ছিল। তাই ভাবলাম, হয়তো মেডিটেশন, হয়তো এটা আমাকে শান্ত করতে পারে। তাই আমি মেডিটেশন শুরু করলাম। মনে আছে, কিছুদিন এটা করেছি। তারপর একবার খুব স্পষ্ট মনে আছে, এটা খুব অদ্ভুত ছিল, কারণ আমি কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু তবুও আমি বসে বসে ভাবছিলাম, যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে। যদি বাইরে সত্যিই কিছু থাকে, যদি এই জীবনের কোনো উদ্দেশ্য থাকে, আর আমরা যদি শূন্য থেকে না এসে থাকি, তাহলে অন্তত আমি চেষ্টা করতে পারি সেই কিছুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে। যখনই এটা মনে করার চেষ্টা করি, আমার চিন্তার ধারাটা দেখতে চাই, কিন্তু আসলে কোনো চিন্তার ধারা ছিল না। শুধু মনে হলো, “ঠিক আছে, প্রার্থনা করে দেখি।” যেন হঠাৎ কিছু একটা মনে এলো। মনে আছে, আমি বসে ছিলাম। আমি দু'হাত তুলে ধরলাম। যেমনটা আপনি দোয়া করার সময় করেন। খুব অদ্ভুত লাগছিল। হাত তুললাম, তারপর বললাম, যে-ই আমাকে শুনছেন, যে-ই আমাকে দেখছেন, আমাকে পথ দেখান, যা সঠিক ও সত্য, আর যা আমার জন্য উত্তম, সেদিকে। সেই মুহূর্তে আমি আর পরোয়া করছিলাম না আমি কী পছন্দ করি। কারণ আমি চেষ্টা করে দেখেছি। আপনি ইচ্ছা করেই “গড” শব্দটি এড়িয়ে গিয়েছিলেন?
না, আমি শব্দটি ব্যবহার করতে পারিনি। -কেন?
-কারণ শব্দটা খুবই ট্যাবু ছিল। “গড” শব্দটার সঙ্গে অনেক আবেগের বোঝা জড়িত ছিল। আমার মনে আমি আকাশে থাকা দাড়িওয়ালা কোনো লোকের সঙ্গে কথা বলছিলাম না। আকাশে। তাই শব্দটা ব্যবহার করতে পারিনি। অবশ্যই, তখনও ধর্ম সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই অপরিণত ছিল। আমি সেই শব্দটি ব্যবহার করতে চাইনি, কারণ আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম, আমি কোনো ধর্ম বেছে নিতে চাই না। ধর্ম নামে আমার কাছে কোন উত্তর ছিল না। আমি এটাকে মানুষ নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় মনে করতাম। গণনিয়ন্ত্রণ, ব্রেইনওয়াশিং, আর আপনি জানেন, রূপকথার গল্পে ঢুকে পড়া— ঈশ্বরে বিশ্বাস করা। আর মজার বিষয় হলো, আমি হাত তুললাম, আর বললাম, “যে-ই আমাকে দেখছেন ও শুনছেন।” আর এটা আল্লাহর একটি নাম। তাই আমি “গড” বলিনি, কিন্তু আল্লাহকেই ডেকেছিলাম। আস-সামী, আল-বাসীর, যিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। আর আমি বলেছিলাম, যে-ই আমাকে শুনছেন ও দেখছেন। আমি একা ছিলাম। তাই এটা ছিল অসাধারণ এক ব্যাপার। এরপর কিছুই ঘটেনি। আসলে কিছু ঘটেছিল, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম কিছু একটা হঠাৎ সামনে আসবে। একটা সংকেতের মতো কিছু আশা করছিলাম, কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। তখন আমার দুটি কাজ ছিল। আমি ছিলাম মিউজিক প্রডিউসার। আর একই সঙ্গে কেয়ারটেকার হিসেবেও কাজ করতাম। মজার বিষয় হলো, মিউজিকের যে কাজটা করতাম, সেখানে আমি একজন মুসলিমের সঙ্গে কাজ করতাম। একজন আলবেনিয়ান। আমরা পার্টি করতাম, এসব করতাম। আবারও বলছি, নামমাত্র মুসলিম। আর অন্য কাজটায়, কেয়ারটেকার হিসেবে, খুব বিরলভাবে, যে পরিবারের সঙ্গে কাজ করতাম, তারা ছিল কট্টর খ্রিস্টান। গভীরভাবে খ্রিস্টান, আর এটা খুবই বিরল। তখন, এই প্রার্থনার আগে যখন আমি কাজ করতাম, ভাবতাম, “তারা যা করে করুক, আমার কিছু যায় আসে না।” কিন্তু এখন ভাবলাম, আমি একটু খোলা মনে দেখি। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ না করি। আমি শুধু প্রশ্ন করি। ভালো না লাগলে জিজ্ঞেস করব, তাই না?
তাই খ্রিস্টান মানুষদের কাছে অনেক প্রশ্ন করা শুরু করলাম। যেমন, ঈশ্বর কে? আমরা এখানে কেন?
আর আমার মুসলিম বন্ধুকেও একইভাবে প্রশ্ন করলাম। একটা বিষয় যোগ করতে চাই, ভুলে গিয়েছিলাম, এই মুসলিম বন্ধু, আমি ওই দোয়া, ওই প্রার্থনা করার ঠিক পরেই, সে দাড়ি রাখতে শুরু করল, নামাজ পড়তে শুরু করল। আমরা গান বানাচ্ছিলাম, আর সে বলত, “মিউজিক বন্ধ করো, আমাকে নামাজ পড়তে হবে।” সে এসব কাজ শুরু করেছিল। সে ধার্মিক হয়ে গেল। তাই আমি তাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। আর খুব মজার ছিল, কারণ যুক্তি দিয়ে ভাবলে, আমি ভাবছিলাম, ঠিক আছে, এখন আমি খোলা মনে আছি, যদি কোনো ধর্ম বেছে নিই, তাহলে খ্রিস্টান হওয়াই উচিত। আপনি যেমন বললেন, সুইডিশ পতাকায় ক্রস আছে। মানে, এটা যেন আমার রক্তেই আছে। আর সবচেয়ে সহজ। জীবন বদলাতে হবে না। পার্টিতে যেতে পারব, গুনাহ করতে পারব, সমস্যা নেই। তখন আমি এমনটাই ভাবতাম। যদি কিছু হতেই হয়, তাহলে আমি খ্রিস্টান হতে চাইতাম। কিন্তু যখনই আমি তাকে এই মূল বিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম, “ঈশ্বর কে?” এটা আমার কাছে অর্থবহ লাগত না। আমি বুঝতে পারতাম না। কারণ আমি যাকেই জিজ্ঞেস করেছি, প্রত্যেকে ভিন্ন উত্তর দিয়েছে। আর ভাবলাম, যদি এটা সত্য হয়, তাহলে উত্তর একই হওয়া উচিত। যেমন এক যোগ এক সমান দুই, আর আগামীকালও সেটা দুই-ই থাকবে। আপনি যাকেই জিজ্ঞেস করুন, উত্তর হবে দুই। ভিন্ন ভিন্ন উত্তর হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমি ভিন্ন উত্তর পেলাম। আর মনে হলো, এক বিভ্রান্তি—নাস্তিকতা—থেকে আরেক বিভ্রান্তিতে যেতে পারি না। মুসলিম বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে আমি খুব অনিচ্ছুক ছিলাম। কারণ ভাবতাম, ইসলাম?
অসম্ভব। এটা তো আরবদের ধর্ম। এটা এমন কিছু, যেখানে আমি আমার বন্ধুদের অপরাধী হিসেবে দেখতাম—আমার বোঝাপড়া ছিল এমন। কিন্তু আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আর একটি প্রশ্ন আমার জন্য সবকিছু বদলে দিল। ঈশ্বর কে? আমার তিনটি প্রশ্ন ছিল। আর এটা খুবই আকর্ষণীয়, কারণ এই তিনটি প্রশ্নই আপনাকে সত্য অনুসন্ধানের দিকে নিয়ে যাবে। আমরা কোথা থেকে এসেছি? আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমরা এখানে কী করছি? এই তিনটি প্রশ্ন। আর আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, এই তিনটি প্রশ্ন মূলত নাস্তিকতাকে ভেঙে দেয়। কারণ নাস্তিকতার কাছে এর কোনো উত্তর নেই। আর এগুলো আমাদের পুরো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই আপনি যখন এই প্রশ্নগুলো করেন না, যখন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থাকে না, তখন শূন্যতা অনুভব করা অস্বাভাবিক নয়। তাই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ঈশ্বর কে?
সে বলল, কুরআনে একটি সূরা আছে, যা এটা ব্যাখ্যা করে। খুব ছোট সূরা, চার আয়াত। সে আরবিতে তা তিলাওয়াত করল, তারপর অনুবাদ করল। আল্লাহ এক। দুই, তিন, চার, পাঁচ, দশ নন। তিনি এক। আমি ভাবলাম, ঠিক আছে, ভালো শোনাচ্ছে, অর্থবহ। তিনি আস-সামাদ, (চিরন্তন আশ্রয়স্থল)। সে ব্যাখ্যা করল, এর অর্থ সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী, আর তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। আমি ভাবলাম, এটাই সত্য। হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি জানি, সেই যা-ই হোক, আমার তার প্রয়োজন আছে। কারণ সারাজীবন আমি শূন্য ছিলাম। আমার কিছু দরকার, কিন্তু শূন্য কিছু দিয়ে শূন্য কাপ ভরতে পারি না। তাই আমার এমন কিছু দরকার যা পাত্রটা চিরদিন পূর্ণ রাখবে। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, আর তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। তাঁর কোনো সন্তান নেই। কোনো বাবা-মা নেই। কিছুই নেই। আর তাঁর মতো কিছুই নেই। কী হয়েছিল জানি না। যেন হঠাৎ কিছু একটা খুলে গেল। আর আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ আমি বুঝলাম, সে এখন যা বলছে, তাই সত্য। যেখান থেকেই এটা এসেছে, তা সত্য। যার মানে ইসলামই সত্য। আর আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সেই উপলব্ধির পর, সত্যিই আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমি জানতাম, আমি সত্যটাই চাই। আমি বসার ঘরে বসেছিলাম। আমি সত্য চাইছিলাম। কিন্তু যখন সত্য ইসলাম হয়ে দাঁড়াল, তখন...
“এটা কী?” তাই ইসলাম সম্পর্কে আরও প্রশ্ন করতে শুরু করলাম, আর সবকিছু অর্থবহ লাগতে লাগল। সেই সময় থেকে, সে আমাকে বলার পর, প্রায় এক বছর শুধু প্রশ্ন করেই গেছি। একটা সময় ছিল, আমরা তখনও এই মিউজিকের কাজ করছিলাম, আর সে ছাড়তে চাইত, এটা অনেক বলত। সে বলত, “আমি এটা করতে পারি না।” আমরা যে মিউজিক করতাম, তা খুব খারাপ ছিল। খুব খারাপ ধরনের মিউজিক। খুব খারাপ মানুষদের সঙ্গে দেখা হতো, অনেক মাদক, মদ—সবই খারাপ। আর সে অবশ্যই এর অংশ হতে চাইত না। তাই সে আমাকে এই কাজটা নিজে সামলাতে শেখাচ্ছিল। আর আমরা বিভিন্ন সফরে যেতাম মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে, মিউজিকের গুরুত্বপূর্ণ লোকজন, এমন নানা কাজ। অবশ্যই এসব সফরের সময় তাকে নামাজ পড়তে হতো। তাই আমরা মসজিদে যেতাম। সুইডেনের কিছু শহরে, কোথাও ছোট একটি ঘর থাকে, এমন কিছু। কিন্তু একবার আমরা একটি সফরে গেলাম। পথে সে বলল, “ওহ, আমাকে নামাজ পড়তে হবে।” আর আমরা এক অসাধারণ মসজিদে গেলাম। আমি দেখলাম। ভাবতে লাগলাম, “আরে...” মনে রাখবেন, ওই সময়েও আমি মেডিটেশন করতাম, প্রতিদিন সকালে নিজের ছোট্ট রুটিনে প্রার্থনা করতাম। আর ভাবলাম, “আমার এই বন্ধু' মনে হয় সে যেন ভীষণ সুখী মানুষ। প্রতিবার মসজিদ থেকে ফিরে এলে, তার মুখ যেন আলোয় ভরে যায়।” ভাবলাম, “জানতে ইচ্ছে করে, এটা কেমন অনুভূতি।” তাই তাকে বললাম, তার নাম মানসুর। “মানসুর, আমি কি তোমার সঙ্গে মসজিদে যেতে পারি?
শুধু দেখতে চাই এটা কী, হয়তো নামাজেও যোগ দিতে পারি, কিন্তু আমি মুসলিম হব না। শুধু ফ্রি ট্রায়াল।” যেমন ফ্রি ট্রায়াল ডাউনলোড করেন। সে বলল, “ঠিক আছে, সমস্যা নেই।” তো আমিও একদিন মসজিদে ঢুকলাম। খুব সুন্দর ছিল। ওটা এমন ধরনের মসজিদ ছিল যেখানে মানুষ...
নিশ্চয়ই তারা নামাজ পড়ত, কিন্তু তখন কোনো নামাজ হচ্ছিল না। তাই কোনো মানুষ ছিল না। মূলত ফাঁকা ছিল, কিন্তু বিশাল। তারপর আমরা অজুর জায়গায় গেলাম, যেখানে নিজেকে ধোয়া হয়। সে বলল, “ঠিক আছে, নামাজের আগে আমাদের নিজেদের ধুতে হবে।” আমি কল চালাতে যাচ্ছিলাম। সে বলল, “একটু দাঁড়াও, সাইমন। তোমাকে একটা কথা বলতে হবে।” আর এটাই ছিল প্রথমবার, সে সরাসরি কথা বলল। “দেখো, এটা সিরিয়াস। তুমি এখন যা করতে যাচ্ছ, এটা একজন মুসলিমের কাজ। তুমি নিজেকে ধুবে, তুমি নামাজ পড়বে। তুমি তোমার মাথা মাটিতে রাখবে সেই সত্তার জন্য, যিনি ঊর্ধ্বে। তোমাকে হৃদয় ও জিহ্বা দিয়ে স্বীকার করতে হবে যে তুমি মুসলিম। কারণ তুমি মুসলিম নও অথচ নামাজ শুরু করবে এবং এসব করবে—এটা অর্থবহ নয়। এটা একজন মুসলিমের কাজ। এ কারণেই আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন।” আর আমি বুঝলাম, ঠিক আছে, এখন ব্যাপারটা সত্যি। আমি আর দেরি করতে পারি না। আর আমি সবসময় এটা বলি। প্রতিবার গল্পটা বলার সময়, ইসলামে একটা ধারণা আছে। শয়তানের কুমন্ত্রণা, শয়তানের ফিসফিসানি। আর শয়তানের ফিসফিসানি সবচেয়ে শক্তিশালী হয় ঠিক তখন, যখন কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আর ওয়াল্লাহি, আমি সেটা অনুভব করেছি। আমি বর্ণনা করতে পারব না। মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো, আমার জ্বর এসেছে, ৪০ ডিগ্রি জ্বর। আমি কাঁপছিলাম। মনে হচ্ছিল বমি করব। আমি গুঞ্জন শুনছিলাম। যেন হাজার হাজার মাছি আমার চারপাশে...
আমি মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। শুধু “ভন ভন” শব্দ। আমি ভাবছিলাম, “কী হচ্ছে?” আর সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, “তোমার বন্ধুরা কী বলবে?
তারা কী বলবে, ওরা, আর ওরা...” এই কথোপকথন আমার বন্ধুর সঙ্গে অনেকবার হয়েছিল। “আমি যদি মুসলিম হই, বন্ধুরা কী বলবে, সবকিছু কী হবে।” আর আমার বন্ধু সবসময় বলত, “দেখো সাইমন, তোমাকে যতদিন ধরে চিনি, তুমি কখনো পরোয়া করনি। পার্টিতে গিয়ে তুমি পাগলের মতো আচরণ করো। মানুষ কী ভাববে, তা পরোয়া করো না। কিন্তু এখন ইসলাম নিয়ে কথা উঠলে, এখন তুমি পরোয়া করছ?” এটা একরকম মজারই ছিল। যাই হোক, সেই মুহূর্তে আমি এটা অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল, “আমি শুধু পালাতে চাই। এখান থেকে বেরিয়ে যেতে চাই।” কিন্তু কিছু একটা ছিল, আমি বর্ণনা করতে পারব না, এই অন্ধকারে যেন কোনো আলো, কোনো কণ্ঠস্বর বা কিছু আমাকে বলছিল, “এখন যদি তুমি এটা না করো, হয়তো আর কখনো করবে না। আর তোমার পরিণতিও তোমার মায়ের মতো হতে পারে। তোমার জীবন হবে দুঃসহ, তুমি মারা যাবে, আর তুমি আফসোস করবে। তুমি জানো, এটা সত্য।” আমি ভাবলাম, আমাকে করতেই হবে। তাই আমি বললাম। আমি বললাম, “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।” আমি করেই ফেললাম। এভাবেই। যা কিছু অনুভব করছিলাম, বমি আসা—সব চলে গেল। মনে হলো কেউ যেন আমার মাথার ওপর তাজা পানি ঢেলে দিল, আর আমি যেন নতুন হয়ে গেলাম। সবকিছু চলে গেল। আর বুঝলেন, যে শূন্যতার কথা এতক্ষণ বলছিলাম?
জীবনে প্রথমবার সেটা আর ছিল না। সেটা ছিল না। এটা কীভাবে বোঝাব? মনে করুন, আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ে হাঁটছেন। পিঠে বড় ব্যাকপ্যাক, আপনি ক্লান্ত, তারপর আপনি সেটা নামিয়ে রাখলেন। সেই ভারটা নেমে গেল। তারপর আমরা নামাজের ঘরে গেলাম। আমি মাথা মাটিতে রাখলাম, আমার প্রথম নামাজ পড়লাম, আসরের নামাজ। আর আমি অনুভব করলাম, “আমি ঘর খুঁজে পেয়েছি। এটাই আমার জায়গা। এটাই আমি খুঁজছিলাম।” তাহলে আপনার চারপাশের মানুষ আপনার ইসলাম গ্রহণে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?
সবচেয়ে কঠিন ছিল সম্ভবত বন্ধুদের সঙ্গে, কারণ তাদের সঙ্গেই আমি সময় কাটাতাম। মনে আছে, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম আর বললাম, “দেখো, আমি আসলে মুসলিম হয়েছি।” আর তারা ছিল এমন বন্ধু, “বেস্ট ফ্রেন্ড, সারাজীবনের ভাই।” আর যখন আমি এটা বললাম, তারা আমাকে ফোন করাই বন্ধ করে দিল। ফোন ধরা বন্ধ করে দিল। সবাই চলে গেল। তারা যেন... ডিলিট করে দিল। আমি ভাবলাম, “কী হলো? ‘ভাই’ বলা, এসব কোথায় গেল?
কী হলো?” তাই হ্যাঁ, আমি সেই সব বন্ধুদের হারালাম। এমনকি তাদের কেউ কেউ মুসলিমও ছিল। কিন্তু তারা বুঝল, “দেখো, তুমি যদি সত্যিকারের মুসলিম হও, আমরা তোমার সঙ্গে থাকতে পারব না।” আর এটা কঠিন ছিল। সূরা আল-বাকারার একটি সুন্দর আয়াত, আমার প্রিয় আয়াতগুলোর একটি। “হয়তো তোমরা কোনো কিছু পছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য খারাপ। আর হয়তো কোনো কিছু অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য ভালো। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।” আর এভাবেই আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। যদি আমি মুসলিম হয়ে তাদের সঙ্গে সেই পার্টিগুলোতে যেতাম?
আমি জানি না, হয়তো পড়ে যেতাম। আমি একবার আমার পরিবারকে বলেছিলাম, এ নিয়ে দুটো মজার গল্প আছে। আমি পরিবারের সঙ্গে বসেছিলাম, আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। আর বললাম, “দেখো সবাই, আমি মুসলিম হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তারা যেন বলল, “হ্যাঁ?” তারা কী বলবে বুঝতে পারছিল না। আর তারা বলল, “তুমি সন্ত্রাসী হয়ে যাবে না তো?
তুমি তো আর...” কারণ তখন সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে পুরো বিষয়টা খুব তীব্র ছিল। সবকিছু খুব জোরালোভাবে চলছিল। তাই তারা বলছিল, “তুমি সেখানে গিয়ে মানুষকে গুলি করবে না তো?” তারা এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করছিল। এটা সেই মজার বিষয়গুলোর একটি। আরেকটি ঘটনা আমার কর্মস্থলে, মিউজিক স্টুডিওর কথা মনে আছে তো। তখন আমি সেখানে প্রায় বসের মতো ছিলাম, আর যখন মুসলিম হলাম, ভাবলাম, “ঠিক আছে, এখন বুঝলাম আমার বন্ধু কেন ছাড়তে চেয়েছিল এসব। আমিও ছাড়ব।” কিন্তু কাউকে না কাউকে দায়িত্বতো হস্তান্তর করতে হবে। আর একদিন বড় মিটিং ছিল, বসদের সঙ্গে, সবাই ছিল। নামাজের সময় হয়ে গেল। তখন আমি একটু অদ্ভুত ছিলাম। ভাবলাম, পরোয়া করি না। সবার সামনে আমি জায়নামাজ বের করলাম, সামনেই মিটিং ছিল, লাঞ্চ ব্রেকের মতো ছিল। আর সবার সামনে নামাজ পড়তে শুরু করলাম। আমি ভাবলাম, পরোয়া করি না। তারপর কয়েক দিন পর, মনে হয় আমার বস মিটিং করতে চাইলেন। আমরা অফিসেও মিটিং করিনি। তিনি সহকর্মীদের আশেপাশে থাকতে চাননি, তাই আমাদের এক ক্যাফেতে যেতে হলো, যেখানে কেউ আমাদের দেখবে না বা শুনবে না, তিনি আমাকে কী জিজ্ঞেস করতে চান। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি ঠিক আছ?
মানে, মাথা ঠিক আছে?” আমি বললাম, “কি? আমি ভালো আছি। একদম ঠিক আছি।” “তুমি কি ডিপ্রেশনে আছ? তোমার কি সাহায্য দরকার?” আমি বললাম, “না!” “না, কারণ আমরা তোমাকে এসব করতে দেখেছি, আর জানি না, সেখানে কিছু মানুষ কথা বলছে, তাই আমরা উদ্বিগ্ন। তাই এই জরুরি মিটিং, তোমার আমাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য দরকার কি না দেখার জন্য। একই ব্যাপার, খুব গুরুত্বপূর্ণ— তুমি যেন এক্সট্রিম না হয়ে যাও। তুমি মুসলিম হতে পারো, কিন্তু সন্ত্রাসী হয়ো না, এটা-ওটা করো না।” আর আমি যেন হতবাক হয়ে গেলাম। আমার নিজের মানুষই আমাকে বলছে আমি পাগল হয়ে গেছি। তাহলে সেই একাকিত্ব আপনি কীভাবে সামলালেন?
আমার অনেক ভাই ছিল। মুসলিম হওয়ার পর এটাই ছিল অসাধারণ বিষয়গুলোর একটি। মনে আছে, একবার, সম্ভবত মুসলিম হওয়ার পরের দিন, কারণ প্রথম দিন আমরা মসজিদে নামাজ পড়েছিলাম, তারপর ক্যামেরা নিতে গিয়েছিলাম, আর সে বলল, “দেখো, আসলে একটা ইসলামি লেকচার আছে। চলো সেখানে যাই।” আর আমি অন্য মুসলিমদের সঙ্গে দেখা করলাম। আমি অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলাম, আর নার্ভাস ছিলাম, আমি নতুন, ভুল কিছু বলতে চাই না। আরবি জানতাম না, আসসালামু আলাইকুম কীভাবে বলতে হয়, কোনো ধারণা ছিল না। আমি ঢুকলাম, আর তারা খুব খুশি হলো। তারা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওহ, সাইমন!
এখানে আসো!” আমি ভাবলাম, “এই লোক কে?” “এসো, এখানে বসো, না না, এখানে বসো। খাবার খাও, এটা নাও।” আর তারা আমাকে উপহার দিল, আমি ভাবছিলাম, “কী হচ্ছে?” আর আমি অনুভব করলাম, কল্পনা করুন— অপরিচিত মানুষ, তারা আমার সম্পর্কে কিছুই জানে না, কিন্তু তারা আমাকে ভালোবাসে। আমার পরিবারের মানুষ ছিল যারা আমাকে কখনো ফোন করত না। কিন্তু এই মানুষরা আমাকে চেনেও না, শুধু নাম জানে, তবু ভালোবাসে। এটা শুধু ইসলামেই পাওয়া যায়। তাই এটা আমাকে সত্যিই সাহায্য করেছিল। একটা সাপোর্ট সিস্টেম থাকা। আর সত্যি বলতে, জীবনে প্রথমবার আমার সাপোর্ট সিস্টেম ছিল। কারণ আগে ব্যাপারটা ছিল এমন—আপনি একা, সবকিছু নিজেই সামলান, ঠিক তো?
নিজের জায়গায় থাকুন, মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন না—ব্যস। কিন্তু তাদের সঙ্গে এমন ছিল, আপনি প্রশ্ন করেন, “ভাই, এটা কীভাবে করব? ওটা কীভাবে করব?” আর তারা আপনাকে বলে দেয়, বুঝলেন। তাই মনে করি সেই ভ্রাতৃত্ব, সেই কমিউনিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কি কখনো এমন কোনো অসাধারণ ঘটনা অনুভব করেছেন, যেখানে আল্লাহর সঙ্গে বিশেষ সংযোগ অনুভব করেছেন? অনেক, অনেক বার। একটি বিষয় সবসময় আমাকে বিস্মিত করে, তা হলো দোয়ার শক্তি। ওয়াল্লাহি, আমি গুনে শেষ করতে পারব না, কতবার আমি কোনো কিছুর জন্য দোয়া করেছি, আর ঠিক সেটাই ঘটেছে। অকল্পনীয় উপায়ে। ২০১৯ সালে আমি মিসর থেকে ফিরলাম। আমার কোনো টাকা ছিল না। টাকা শেষ হয়ে গেল, কাজ শুরু করতে হলো। আমি ভাবলাম, “আবার সুইডেন?
আহ্!” আর আমার মাথায় তখনও ছিল, আমাকে এখান থেকে সরতে হবে। কিন্তু আরেকটি বিষয়ও ছিল। আমি বিয়ে করতে চাইছিলাম। আমি এই জীবন অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করতে চাইছিলাম। তারপর সেখানে আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হলো। ২০২০ সালে আমরা বিয়ে করলাম। ৬ মার্চ। পরের দিনই লকডাউন, কোভিড। আমরা লকডাউনের সময়ে ছিলাম, আর ভাবছিলাম, “কোথাও যেতে হবে। অ্যাপার্টমেন্টে বসে থাকতে খুব বিরক্ত লাগছে।” তার এক বন্ধু বা কেউ আমাদের দুবাই সম্পর্কে বলেছিল। আমার মনে দুবাই ছিল শুধু পার্টির জায়গা। যেখানে, বুঝলেন... আমি শুধু সেটাই শুনেছিলাম। আমি ভাবলাম, “দুবাই?
আমি তো মুসলিম দেশ চাই, দুবাই যেতে পারি না।” তারপর আমরা ভাবলাম, “এটাই একমাত্র জায়গা যা খোলা আছে।” তাই বললাম, ঠিক আছে, চল যাই। এটাই তো একমাত্র জায়গা। আমরা সেখানে গেলাম, নামলাম, আর আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এটা যেন আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর জিনিস। আমি মুসলিম মানুষ দেখলাম। খুব সুন্দর, খুব পরিষ্কার ছিল। দুবাই সম্পর্কে আমার ধারণা সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল। আমরা সেখানে ঘুরলাম। সবকিছু খুব সস্তা ছিল। খুব সুন্দর হোটেলে থাকলাম। চারদিকে ঘুরলাম। আমি স্ত্রীকে বললাম, “তুমি কি মুসলিম দেশে থাকতে চাও?” “হ্যাঁ।” “আমিও। আমরা এখন সফরে আছি, আর মুসাফিরের দোয়া কবুল হয়। তাই চল, আমরা অনেক দোয়া করি যেন এখানে থাকতে পারি।” কীভাবে?
জানি না। তবে কোনো না কোনোভাবে। বাড়ি ফিরলাম। প্রথম যে ফোনটা পেলাম, “তোমাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।” কোভিডের কারণে। “আমরা এই অফিস বন্ধ করে দিচ্ছি। তুমি আর সবাই বাদ।” আমি বললাম, “কি?” আর তখন আমাদের প্রথম সন্তান আমার স্ত্রীর গর্ভে। আমি ভাবলাম, “আমি চাকরি হারাচ্ছি, কী হচ্ছে? আমি দোয়া করেছিলাম! কিন্তু উল্টোটা ঘটছে।” কিন্তু মনে রাখবেন, ভোরের আগে অন্ধকার সবচেয়ে গভীর। তাই ভাবলাম, “ঠিক আছে, কী করব?” আমার আর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কারণ আমার তেমন কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না। আর কোভিডের সময় চাকরি পাওয়া?
অসম্ভব। সবাই তখন কর্মী ছাটাই করছিল। আমরা সন্তান প্রত্যাশা করছি, “আমি কীভাবে তাদের দেখাশোনা করব?” তারপর আমি মসজিদে গেলাম, সেখানে একজন রিভার্ট ছিলেন। সুইডিশ। তাঁর পিএইচডি আছে। তিনি মদিনার ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন। তিনি বললেন, “সাইমন, তোমাকে একটা কথা বলার আছে। তোমার জীবন কেমন চলছে?
সবকিছু ঠিক আছেতো?” আমি বললাম, “ভাই, আমি চাকরি হারিয়েছি। কী করব জানি না।” তিনি বললেন, “দেখো, দুবাইয়ের কিছু মানুষ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।” আমি বললাম, “ঠিক আছে?” “একটা বড় সংস্থা আছে, চ্যারিটি সংস্থা, তারা অনেক প্রজেক্ট করে। তাদের একটি প্রজেক্ট হলো মানুষকে ইসলাম পড়ার স্কলারশিপ পেতে সাহায্য করা। যেমন মানুষকে মদিনায় পাঠানো ইত্যাদি। কিন্তু তাদের একটি বিশেষ প্রজেক্ট আছে। তারা আগে কখনো এটা করেনি। এ পর্যন্ত তারা শুধু আরবদের সঙ্গে কাজ করেছে। প্রথমবারের মতো তারা ইউরোপ থেকে কাউকে নিতে চায়। তারা আমার সঙ্গে কথা বলেছে, আর আমি তোমার কথা ভেবেছি।” আমি বললাম, “কি?” “হ্যাঁ, তারা স্কলারশিপ দেবে, সবকিছুর খরচ দেবে। তুমি যেতে পারবে।” আমি বললাম, “সত্যি?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ!
এক মাসের মতো সময়, শুধু ব্যাগ গুছাও!” এটা ছিল সেই মুহূর্তগুলোর একটি— কল্পনা করুন, আমি দোয়া করেছিলাম, কীভাবে সেখানে যাব, জানতাম না। আমার টাকা ছিল না। ওই সফরে সব সঞ্চয় শেষ করেছি। ফিরে এসে চাকরি নেই, বরখাস্ত। এখন কী করব? তাই আমি সবসময় মানুষকে বলি, দোয়াকে কখনো ছোট করে দেখবেন না। এটাই আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আর ইসলামে, একটি আন্তরিক দোয়া সবসময় কবুল হয়। এটা কবুল বা পূর্ণ হওয়ার তিনটি পথ আছে। হয় এই জীবনে আপনি যা চান তা পাবেন, অথবা আল্লাহ তা আখিরাতের জন্য জমা রাখবেন। তিনি এই দুনিয়ায় আপনাকে দেবেন না, বরং আখিরাতে আপনাকে কিছু দেবেন, অথবা তিনি আপনাকে আরও উত্তম কিছু দেবেন। আপনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আপনার পরিচিতদের মধ্যে বা পরিবারের কেউ, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কেউ কি ইসলাম গ্রহণ করেছেন?
মুসলিম হওয়ার কিছুদিন পর আমি বাবার সঙ্গে এ নিয়ে অনেক কথা বলেছি। মনে আছে, আমি তাঁকে ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ সম্পর্কে বলেছিলাম। আল্লাহতে বিশ্বাস, তাঁর রাসূলগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, ফেরেশতাগণ, ইয়াওমুল আখির, কদর। তিনি বললেন, “আমি এগুলো বিশ্বাস করি।” আমি বললাম, “কি?” “হ্যাঁ, আমার কাছে অর্থবহ লাগে।” “তাহলে আপনি মূলত মুসলিম। আপনি যদি এগুলো বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি মুসলিম।” তিনি বললেন, “ঠিক আছে।” আমি বললাম, “আপনি কি শাহাদা নিতে চান?” তিনি বললেন, “অবশ্যই!” আমি বললাম, “ঠিক আছে!” আমি এটা আশা করিনি। তারপর তিনি ইংল্যান্ডে চলে গেলেন। সেখানে এক মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো, সে বধির ছিল, খ্রিস্টান ছিল। এরপর যখন ফিলিস্তিন ও গাজা নিয়ে এই ঘটনা ঘটল, অবশ্যই সব ভিডিও ইত্যাদি দেখল। তারা আমাকে ফোন করল, আর সে বলল, “আমিও মুসলিম হতে চাই।” আমি এসব ভিডিও দেখেছি। আর ফিলিস্তিনিদের কাছে যা আছে, আমি সেই বিশ্বাস চাই। তাই সে মুসলিম হলো, আলহামদুলিল্লাহ। আর গত বছর সম্প্রতি আমি বাবার মাকে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি খুব বৃদ্ধ, প্রায় ৯৫ বছর বয়স। জীবনের শেষ দিকে, খুব অসুস্থ। আমি তাঁকেও বললাম ইসলাম কী এবং সবকিছু সম্পর্কে। আলহামদুলিল্লাহ, তিনিও গ্রহণ করেছেন। পরিশেষে, যদি পৃথিবীর সব অমুসলিমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকত, কয়েক মুহূর্তে আপনি তাদের কী বলতে চাইতেন?
একটি আয়াত নিয়ে আমি ভাবি, “কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাউত।” “প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” আর এটাই আমাকে জাগিয়ে তুলেছিল। আমার মনে হয় মানুষ এই প্রশ্নকে ভয় পায়, কারণ তারা জানে না এর পরে কী আসে। এটা এমন এক বাস্তবতা, যার মুখোমুখি হতে মানুষ খুব ভয় পায়। আর আমি তাদের এটাই বলতাম: মৃত্যু নিয়ে ভাবুন। খারাপভাবে নয়। মৃত্যুকে নতুন এক শুরু হিসেবে ভাবুন। যদি মৃত্যু আপনার জন্য নতুন শুরু হয়, আরেকটি জীবন হয়? সেই জীবনের জন্য আপনি কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন? আপনি কি প্রস্তুত মনে করেন, নাকি না? মৃত্যু নিয়ে ভাবা এই তিনটি প্রশ্ন সামনে আনবে। আমরা এখানে কেন? আমরা কোথায় যাব? আর কে আমাদের এখানে এনেছেন?
আপনি সুইডিশ মানুষদের কী বলতে চান, যেমনটা আপনি বলেছেন, তারা ইসলামের দিকে বেশি ঝুঁকছে, কিন্তু হয়তো ইসলাম গ্রহণে দ্বিধায় আছে। আপনি তাদের কীভাবে উৎসাহ দেবেন?
[সুইডিশ ভাষায়] ঠিক আছে, আমার প্রিয় দেশবাসী। আমি জানি না, আপনি পুরো ভিডিওটি দেখেছেন কি না। কিন্তু আমি আপনাকে যা বলতে চাই, তা হলো: সত্য খুঁজতে ভয় পাবেন না, তা যেখানেই থাকুক না কেন। আর শুধু আপনি ইসলাম সম্পর্কে পড়লেই, এর মানে এই নয় যে আপনি অবশ্যই মুসলিম হয়ে যাবেন। আর শুধু আপনি মুসলিম হলেই, এর মানে এই নয় যে আপনি আরব হয়ে যাবেন। আপনি এখনও সুইডিশ, আমিও সুইডিশ, আমি এখনও সেই জায়গারই মানুষ, যেখান থেকে আমি এসেছি, আর এটি শুধু, আমি কে—তা বদলায়নি, বরং আমি কেমন—তা বদলেছে। আমি আরও সুখী হয়েছি, আরও ভালো মানুষ হয়েছি, আমি এমন হিদায়াত পেয়েছি, যা আগে আমার জীবনে কখনো ছিল না। প্রতিদিন সকালে জেগে ওঠার একটি কারণ এখন আমার আছে। আর আমি জানি, আপনাদের অনেকেই ঘুম থেকে উঠে শূন্যতা অনুভব করেন, অথবা আপনারা কিছু খুঁজছেন। তাই সত্য খুঁজতে ভয় পাবেন না। আলো খুঁজুন। তা যেখানেই থাকুক না কেন, আর যখন তা খুঁজে পাবেন, খোলা মনে থাকুন এবং তা গ্রহণ করুন। আর যদি আপনার কোনো প্রশ্ন থাকে, প্রশ্ন করুন।
অনুগ্রহ করে আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলবেন? আমি মূলত সুইডেনের, সেখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা। আর সত্যি বলতে, আমি নাস্তিক হিসেবে বড় হয়েছিলাম। জীবনের এক পর্যায়ে, আমি আমার খুব প্রিয় একজন মানুষকে হারাই। সেটাই আমাকে জাগিয়ে তোলে। আর শেষ পর্যন্ত সেটাই আমাকে ইসলাম ধর্মের দিকে নিয়ে যায়। ইসলামের আগে আপনার জীবন কেমন ছিল? আপনি কি আমাদের সেই দিনগুলোতে নিয়ে যাবেন?
আমার জন্য এটা ছিল এক ধরনের পরিবর্তনের পথ। আমি যখন ১১-১২ বছরের দিকে, কিশোর বয়সে প্রবেশ করতে শুরু করি, আমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সেটা আমার জন্য একটা মোড় ঘোরানো সময় ছিল, কারণ আমি তখন মায়ের সঙ্গে থাকছি, আর বাবা চলে গেছেন। স্টেবিলিটি অনেকটাই হারিয়ে গেল। আপনি জানেন, একজন ছেলের জীবনে যখন কোনো পুরুষ আদর্শ থাকে না, তখন ভেতরে কিছু একটা ভেঙে যায়। নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে হয়। পথ দেখানোর মতো কেউ থাকে না। আর আমি জানতাম না কী করব। দুঃখজনকভাবে, বিচ্ছেদের পর আমার মা আরও খারাপ হয়ে গেলেন। তিনি অনেক মদ্যপান শুরু করলেন। অনেক পার্টি করতে শুরু করলেন, বাড়িতে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষ নিয়ে আসতেন। কল্পনা করুন। আমি সস্থি হারিয়েছি। আর নিজের ঘরেও নিরাপদ বোধ করতাম না। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন অপরিচিত মানুষ। সবকিছু খুব, খুব অস্বাভাবিক লাগত। আর আমি আবারও নিজেকে ব্যস্ত রাখতাম, পার্টি আর এসবের মাধ্যমে। মনে হতো যেন আমি আগেই অন্ধকারে ছিলাম, কিন্তু অন্ধকারেরও নানা গভীরতা আছে, নানা স্তর আছে। আর মনে হতো আমি শুধু আরও নিচের স্তরে নেমে যাচ্ছি। এটা চলতেই থাকল। তখন অবশ্য বুঝতাম না, কিন্তু আমি ডিপ্রেশনে ছিলাম। খুব গভীর ডিপ্রেশনে। একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছালাম যে, প্রতিদিন রাতে বিছানায় গেলে, শুধু আশা করতাম, আশা করতাম যেন আর না জাগি। এই জীবনের কোনো উদ্দেশ্য আমি দেখতে পেতাম না। যদি এটাই সব হয়, তাহলে খেলা বন্ধ করো, সব বন্ধ করো। আমি এর অংশ হতে চাই না। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা খুব কঠিন ছিল। আমি যখন হাই স্কুলে ছিলাম, শেষ বছরে, আমার মা অন্য শহরের এক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হন, আর তিনি আমার বোনকে নিয়ে সেখানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আমাকেও তাঁর সঙ্গে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি তখন শেষ বছরে। যদি যাই, তাহলে আবার নতুন করে শুরু করতে হতো। আর মনে রাখবেন, আমি একা থাকতে ঘৃণা করতাম। আমার কেউ ছিল না, শুধু আমি আর একটি বিড়াল। আর বিলগুলোও আমাকে নিজেই দিতে হতো। আমি স্কুলে পড়তাম, আবার তিনটি চাকরিও করতাম। এটা সত্যিই খুব কঠিন ছিল। প্রতিবার বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেতাম, মদ না খেয়ে থাকা বা...
আমার লক্ষ্য থাকত এত বেশি পান করব, যেন কিছুই মনে না থাকে। এটাই তখন আমার লক্ষ্য। আর আমি পান করতাম, করতাম, করতাম। স্কুল শেষ করার পর, আমি ফুল-টাইমের চেয়েও বেশি কাজ শুরু করি। শুধু নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য। তারপর আমার মামা, মায়ের ভাই, আমাকে ফোন করে বললেন, “তোমার মা হাসপাতালে, আর অবস্থা গুরুতর।” ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী অনুভব করব। অবশ্যই আমি খুব চিন্তিত ছিলাম। কারণ তিনি আমার মা, আমি তাঁকে ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের অতীতের পুরো ইতিহাসের কারণে সবকিছু খুব জটিল ছিল। আর একটা বিষয় বারবার ভাবছিলাম, আশা করি, তাঁর সঙ্গে কথা বলার আরও সময় পাব। অনেক কিছু আছে যা আমাদের মিটিয়ে নেওয়া দরকার। অনেক কথা আছে যা আমাকে বলতে হবে। ঠিক তো?
তারপর আমরা সেখানে গাড়ি চালিয়ে গেলাম। আমি, তাঁর মা, আমার মামা আর তাঁর স্ত্রী। আমরা সেখানে গেলাম। আর তিনি কোমায় ছিলেন। তিনি হাসপাতালের বিছানায় ছিলেন। সবকিছু যেন অবাস্তব লাগছিল। আর ডাক্তার এসে বললেন, আমাদের আর কিছু করার নেই। মনে আছে, আমি তাঁর হাত ধরেছিলাম। হাতটা ঠান্ডা ছিল। সেটা শুধু... একজন নাস্তিক হিসেবে এটা খুব কঠিন। অথবা খুব সহজ, যখন মৃত্যুর এত কাছে থাকতে হয় না, তখন বলা সহজ যে কোন কিছু নেই... মৃত্যুর পর কিছু নেই। ঠিক তো? আপনি শুধু মারা যান, আর সব শেষ। কিন্তু যখন আপনার সামনে আপনার বাবা-মায়ের একজন প্রায় মৃত অবস্থায় থাকে, তখন সেটা বিশ্বাস করা কঠিন। আমার মনে তখন কত বিপরীতধর্মী চিন্তা চলছিল, বুঝতে পারছেন?
আর তাঁকে যা যা বলতে চেয়েছিলাম। আমি তাঁর ওপর খুব রাগান্বিত ছিলাম, একই সঙ্গে তাঁকে মিস করছিলাম, একই সঙ্গে এত বিরোধী অনুভূতি ছিল। আপনি জানেন, হার্ট মনিটরটা একেবারে ফ্ল্যাটলাইন হয়ে গেল। আর আমি সত্যিই খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি সত্যিই...
আর অদ্ভুত বিষয় হলো, আমি জানতাম না যে— শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, আমি জানতাম না আমি তাঁকে এত ভালোবাসি। আর আমার মনে হয়, এটা আমাকে খুব গভীরভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিল, মৃত্যু কতটা কাছে। যখন আপনার কোনো প্রিয়জন খুব বয়স্ক হয়, আর মারা যায়, তখন সেটা কিছুটা বোঝা যায়, তারা ভালো জীবন কাটিয়েছে। কিন্তু তিনি মাত্র ৪১ বছরের ছিলেন, আর তাঁর মদের সমস্যা ছিল, জুয়ার সমস্যাও ছিল। তাঁর জীবন ছিল খুব কষ্টের, তিনি খুব খারাপ ঘরে বড় হয়েছিলেন, অনেক পারিবারিক সহিংসতা ছিল। এটা কোনো জীবন ছিল না। সেটাই ছিল আমার প্রয়োজনীয় জাগরণের ডাক। অবশ্যই শোকের সেই সময় পার করা ভীষণ আশাহীন আর অন্ধকার মনে হয়েছিল। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাকে সেটা পার করতেই হতো। লোকেরা সবসময় বলে, ভোরের ঠিক আগে অন্ধকার সবচেয়ে গভীর হয়। আমি ঠিক সেই অবস্থাতেই ছিলাম। ভোরের ঠিক আগে। আর আমার চাকরি ছিল। সবকিছু ছিল। বিল দিতে হতো। তাই ভাবলাম, এখন পাগল হয়ে গেলে চলবে না। আমাকে শুধু টিকে থাকতে হবে। সে সময়ে সুইডেনে মেডিটেশন খুব জনপ্রিয় ছিল। নতুন নতুন অ্যাপ ইত্যাদি ইত্যাদি ছিল। তাই ভাবলাম, হয়তো মেডিটেশন, হয়তো এটা আমাকে শান্ত করতে পারে। তাই আমি মেডিটেশন শুরু করলাম। মনে আছে, কিছুদিন এটা করেছি। তারপর একবার খুব স্পষ্ট মনে আছে, এটা খুব অদ্ভুত ছিল, কারণ আমি কোনো কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু তবুও আমি বসে বসে ভাবছিলাম, যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে। যদি বাইরে সত্যিই কিছু থাকে, যদি এই জীবনের কোনো উদ্দেশ্য থাকে, আর আমরা যদি শূন্য থেকে না এসে থাকি, তাহলে অন্তত আমি চেষ্টা করতে পারি সেই কিছুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে। যখনই এটা মনে করার চেষ্টা করি, আমার চিন্তার ধারাটা দেখতে চাই, কিন্তু আসলে কোনো চিন্তার ধারা ছিল না। শুধু মনে হলো, “ঠিক আছে, প্রার্থনা করে দেখি।” যেন হঠাৎ কিছু একটা মনে এলো। মনে আছে, আমি বসে ছিলাম। আমি দু'হাত তুলে ধরলাম। যেমনটা আপনি দোয়া করার সময় করেন। খুব অদ্ভুত লাগছিল। হাত তুললাম, তারপর বললাম, যে-ই আমাকে শুনছেন, যে-ই আমাকে দেখছেন, আমাকে পথ দেখান, যা সঠিক ও সত্য, আর যা আমার জন্য উত্তম, সেদিকে। সেই মুহূর্তে আমি আর পরোয়া করছিলাম না আমি কী পছন্দ করি। কারণ আমি চেষ্টা করে দেখেছি। আপনি ইচ্ছা করেই “গড” শব্দটি এড়িয়ে গিয়েছিলেন?
না, আমি শব্দটি ব্যবহার করতে পারিনি। -কেন?
-কারণ শব্দটা খুবই ট্যাবু ছিল। “গড” শব্দটার সঙ্গে অনেক আবেগের বোঝা জড়িত ছিল। আমার মনে আমি আকাশে থাকা দাড়িওয়ালা কোনো লোকের সঙ্গে কথা বলছিলাম না। আকাশে। তাই শব্দটা ব্যবহার করতে পারিনি। অবশ্যই, তখনও ধর্ম সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই অপরিণত ছিল। আমি সেই শব্দটি ব্যবহার করতে চাইনি, কারণ আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম, আমি কোনো ধর্ম বেছে নিতে চাই না। ধর্ম নামে আমার কাছে কোন উত্তর ছিল না। আমি এটাকে মানুষ নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় মনে করতাম। গণনিয়ন্ত্রণ, ব্রেইনওয়াশিং, আর আপনি জানেন, রূপকথার গল্পে ঢুকে পড়া— ঈশ্বরে বিশ্বাস করা। আর মজার বিষয় হলো, আমি হাত তুললাম, আর বললাম, “যে-ই আমাকে দেখছেন ও শুনছেন।” আর এটা আল্লাহর একটি নাম। তাই আমি “গড” বলিনি, কিন্তু আল্লাহকেই ডেকেছিলাম। আস-সামী, আল-বাসীর, যিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন। আর আমি বলেছিলাম, যে-ই আমাকে শুনছেন ও দেখছেন। আমি একা ছিলাম। তাই এটা ছিল অসাধারণ এক ব্যাপার। এরপর কিছুই ঘটেনি। আসলে কিছু ঘটেছিল, কিন্তু আমি ভেবেছিলাম কিছু একটা হঠাৎ সামনে আসবে। একটা সংকেতের মতো কিছু আশা করছিলাম, কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। তখন আমার দুটি কাজ ছিল। আমি ছিলাম মিউজিক প্রডিউসার। আর একই সঙ্গে কেয়ারটেকার হিসেবেও কাজ করতাম। মজার বিষয় হলো, মিউজিকের যে কাজটা করতাম, সেখানে আমি একজন মুসলিমের সঙ্গে কাজ করতাম। একজন আলবেনিয়ান। আমরা পার্টি করতাম, এসব করতাম। আবারও বলছি, নামমাত্র মুসলিম। আর অন্য কাজটায়, কেয়ারটেকার হিসেবে, খুব বিরলভাবে, যে পরিবারের সঙ্গে কাজ করতাম, তারা ছিল কট্টর খ্রিস্টান। গভীরভাবে খ্রিস্টান, আর এটা খুবই বিরল। তখন, এই প্রার্থনার আগে যখন আমি কাজ করতাম, ভাবতাম, “তারা যা করে করুক, আমার কিছু যায় আসে না।” কিন্তু এখন ভাবলাম, আমি একটু খোলা মনে দেখি। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ না করি। আমি শুধু প্রশ্ন করি। ভালো না লাগলে জিজ্ঞেস করব, তাই না?
তাই খ্রিস্টান মানুষদের কাছে অনেক প্রশ্ন করা শুরু করলাম। যেমন, ঈশ্বর কে? আমরা এখানে কেন?
আর আমার মুসলিম বন্ধুকেও একইভাবে প্রশ্ন করলাম। একটা বিষয় যোগ করতে চাই, ভুলে গিয়েছিলাম, এই মুসলিম বন্ধু, আমি ওই দোয়া, ওই প্রার্থনা করার ঠিক পরেই, সে দাড়ি রাখতে শুরু করল, নামাজ পড়তে শুরু করল। আমরা গান বানাচ্ছিলাম, আর সে বলত, “মিউজিক বন্ধ করো, আমাকে নামাজ পড়তে হবে।” সে এসব কাজ শুরু করেছিল। সে ধার্মিক হয়ে গেল। তাই আমি তাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। আর খুব মজার ছিল, কারণ যুক্তি দিয়ে ভাবলে, আমি ভাবছিলাম, ঠিক আছে, এখন আমি খোলা মনে আছি, যদি কোনো ধর্ম বেছে নিই, তাহলে খ্রিস্টান হওয়াই উচিত। আপনি যেমন বললেন, সুইডিশ পতাকায় ক্রস আছে। মানে, এটা যেন আমার রক্তেই আছে। আর সবচেয়ে সহজ। জীবন বদলাতে হবে না। পার্টিতে যেতে পারব, গুনাহ করতে পারব, সমস্যা নেই। তখন আমি এমনটাই ভাবতাম। যদি কিছু হতেই হয়, তাহলে আমি খ্রিস্টান হতে চাইতাম। কিন্তু যখনই আমি তাকে এই মূল বিশ্বাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম, “ঈশ্বর কে?” এটা আমার কাছে অর্থবহ লাগত না। আমি বুঝতে পারতাম না। কারণ আমি যাকেই জিজ্ঞেস করেছি, প্রত্যেকে ভিন্ন উত্তর দিয়েছে। আর ভাবলাম, যদি এটা সত্য হয়, তাহলে উত্তর একই হওয়া উচিত। যেমন এক যোগ এক সমান দুই, আর আগামীকালও সেটা দুই-ই থাকবে। আপনি যাকেই জিজ্ঞেস করুন, উত্তর হবে দুই। ভিন্ন ভিন্ন উত্তর হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমি ভিন্ন উত্তর পেলাম। আর মনে হলো, এক বিভ্রান্তি—নাস্তিকতা—থেকে আরেক বিভ্রান্তিতে যেতে পারি না। মুসলিম বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে আমি খুব অনিচ্ছুক ছিলাম। কারণ ভাবতাম, ইসলাম?
অসম্ভব। এটা তো আরবদের ধর্ম। এটা এমন কিছু, যেখানে আমি আমার বন্ধুদের অপরাধী হিসেবে দেখতাম—আমার বোঝাপড়া ছিল এমন। কিন্তু আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আর একটি প্রশ্ন আমার জন্য সবকিছু বদলে দিল। ঈশ্বর কে? আমার তিনটি প্রশ্ন ছিল। আর এটা খুবই আকর্ষণীয়, কারণ এই তিনটি প্রশ্নই আপনাকে সত্য অনুসন্ধানের দিকে নিয়ে যাবে। আমরা কোথা থেকে এসেছি? আমরা কোথায় যাচ্ছি? আমরা এখানে কী করছি? এই তিনটি প্রশ্ন। আর আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, এই তিনটি প্রশ্ন মূলত নাস্তিকতাকে ভেঙে দেয়। কারণ নাস্তিকতার কাছে এর কোনো উত্তর নেই। আর এগুলো আমাদের পুরো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই আপনি যখন এই প্রশ্নগুলো করেন না, যখন এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থাকে না, তখন শূন্যতা অনুভব করা অস্বাভাবিক নয়। তাই আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ঈশ্বর কে?
সে বলল, কুরআনে একটি সূরা আছে, যা এটা ব্যাখ্যা করে। খুব ছোট সূরা, চার আয়াত। সে আরবিতে তা তিলাওয়াত করল, তারপর অনুবাদ করল। আল্লাহ এক। দুই, তিন, চার, পাঁচ, দশ নন। তিনি এক। আমি ভাবলাম, ঠিক আছে, ভালো শোনাচ্ছে, অর্থবহ। তিনি আস-সামাদ, (চিরন্তন আশ্রয়স্থল)। সে ব্যাখ্যা করল, এর অর্থ সবকিছু তাঁর মুখাপেক্ষী, আর তিনি কারও মুখাপেক্ষী নন। আমি ভাবলাম, এটাই সত্য। হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি জানি, সেই যা-ই হোক, আমার তার প্রয়োজন আছে। কারণ সারাজীবন আমি শূন্য ছিলাম। আমার কিছু দরকার, কিন্তু শূন্য কিছু দিয়ে শূন্য কাপ ভরতে পারি না। তাই আমার এমন কিছু দরকার যা পাত্রটা চিরদিন পূর্ণ রাখবে। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, আর তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। তাঁর কোনো সন্তান নেই। কোনো বাবা-মা নেই। কিছুই নেই। আর তাঁর মতো কিছুই নেই। কী হয়েছিল জানি না। যেন হঠাৎ কিছু একটা খুলে গেল। আর আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ আমি বুঝলাম, সে এখন যা বলছে, তাই সত্য। যেখান থেকেই এটা এসেছে, তা সত্য। যার মানে ইসলামই সত্য। আর আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। সেই উপলব্ধির পর, সত্যিই আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। আমি জানতাম, আমি সত্যটাই চাই। আমি বসার ঘরে বসেছিলাম। আমি সত্য চাইছিলাম। কিন্তু যখন সত্য ইসলাম হয়ে দাঁড়াল, তখন...
“এটা কী?” তাই ইসলাম সম্পর্কে আরও প্রশ্ন করতে শুরু করলাম, আর সবকিছু অর্থবহ লাগতে লাগল। সেই সময় থেকে, সে আমাকে বলার পর, প্রায় এক বছর শুধু প্রশ্ন করেই গেছি। একটা সময় ছিল, আমরা তখনও এই মিউজিকের কাজ করছিলাম, আর সে ছাড়তে চাইত, এটা অনেক বলত। সে বলত, “আমি এটা করতে পারি না।” আমরা যে মিউজিক করতাম, তা খুব খারাপ ছিল। খুব খারাপ ধরনের মিউজিক। খুব খারাপ মানুষদের সঙ্গে দেখা হতো, অনেক মাদক, মদ—সবই খারাপ। আর সে অবশ্যই এর অংশ হতে চাইত না। তাই সে আমাকে এই কাজটা নিজে সামলাতে শেখাচ্ছিল। আর আমরা বিভিন্ন সফরে যেতাম মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে, মিউজিকের গুরুত্বপূর্ণ লোকজন, এমন নানা কাজ। অবশ্যই এসব সফরের সময় তাকে নামাজ পড়তে হতো। তাই আমরা মসজিদে যেতাম। সুইডেনের কিছু শহরে, কোথাও ছোট একটি ঘর থাকে, এমন কিছু। কিন্তু একবার আমরা একটি সফরে গেলাম। পথে সে বলল, “ওহ, আমাকে নামাজ পড়তে হবে।” আর আমরা এক অসাধারণ মসজিদে গেলাম। আমি দেখলাম। ভাবতে লাগলাম, “আরে...” মনে রাখবেন, ওই সময়েও আমি মেডিটেশন করতাম, প্রতিদিন সকালে নিজের ছোট্ট রুটিনে প্রার্থনা করতাম। আর ভাবলাম, “আমার এই বন্ধু' মনে হয় সে যেন ভীষণ সুখী মানুষ। প্রতিবার মসজিদ থেকে ফিরে এলে, তার মুখ যেন আলোয় ভরে যায়।” ভাবলাম, “জানতে ইচ্ছে করে, এটা কেমন অনুভূতি।” তাই তাকে বললাম, তার নাম মানসুর। “মানসুর, আমি কি তোমার সঙ্গে মসজিদে যেতে পারি?
শুধু দেখতে চাই এটা কী, হয়তো নামাজেও যোগ দিতে পারি, কিন্তু আমি মুসলিম হব না। শুধু ফ্রি ট্রায়াল।” যেমন ফ্রি ট্রায়াল ডাউনলোড করেন। সে বলল, “ঠিক আছে, সমস্যা নেই।” তো আমিও একদিন মসজিদে ঢুকলাম। খুব সুন্দর ছিল। ওটা এমন ধরনের মসজিদ ছিল যেখানে মানুষ...
নিশ্চয়ই তারা নামাজ পড়ত, কিন্তু তখন কোনো নামাজ হচ্ছিল না। তাই কোনো মানুষ ছিল না। মূলত ফাঁকা ছিল, কিন্তু বিশাল। তারপর আমরা অজুর জায়গায় গেলাম, যেখানে নিজেকে ধোয়া হয়। সে বলল, “ঠিক আছে, নামাজের আগে আমাদের নিজেদের ধুতে হবে।” আমি কল চালাতে যাচ্ছিলাম। সে বলল, “একটু দাঁড়াও, সাইমন। তোমাকে একটা কথা বলতে হবে।” আর এটাই ছিল প্রথমবার, সে সরাসরি কথা বলল। “দেখো, এটা সিরিয়াস। তুমি এখন যা করতে যাচ্ছ, এটা একজন মুসলিমের কাজ। তুমি নিজেকে ধুবে, তুমি নামাজ পড়বে। তুমি তোমার মাথা মাটিতে রাখবে সেই সত্তার জন্য, যিনি ঊর্ধ্বে। তোমাকে হৃদয় ও জিহ্বা দিয়ে স্বীকার করতে হবে যে তুমি মুসলিম। কারণ তুমি মুসলিম নও অথচ নামাজ শুরু করবে এবং এসব করবে—এটা অর্থবহ নয়। এটা একজন মুসলিমের কাজ। এ কারণেই আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন।” আর আমি বুঝলাম, ঠিক আছে, এখন ব্যাপারটা সত্যি। আমি আর দেরি করতে পারি না। আর আমি সবসময় এটা বলি। প্রতিবার গল্পটা বলার সময়, ইসলামে একটা ধারণা আছে। শয়তানের কুমন্ত্রণা, শয়তানের ফিসফিসানি। আর শয়তানের ফিসফিসানি সবচেয়ে শক্তিশালী হয় ঠিক তখন, যখন কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আর ওয়াল্লাহি, আমি সেটা অনুভব করেছি। আমি বর্ণনা করতে পারব না। মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো, আমার জ্বর এসেছে, ৪০ ডিগ্রি জ্বর। আমি কাঁপছিলাম। মনে হচ্ছিল বমি করব। আমি গুঞ্জন শুনছিলাম। যেন হাজার হাজার মাছি আমার চারপাশে...
আমি মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। শুধু “ভন ভন” শব্দ। আমি ভাবছিলাম, “কী হচ্ছে?” আর সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, “তোমার বন্ধুরা কী বলবে?
তারা কী বলবে, ওরা, আর ওরা...” এই কথোপকথন আমার বন্ধুর সঙ্গে অনেকবার হয়েছিল। “আমি যদি মুসলিম হই, বন্ধুরা কী বলবে, সবকিছু কী হবে।” আর আমার বন্ধু সবসময় বলত, “দেখো সাইমন, তোমাকে যতদিন ধরে চিনি, তুমি কখনো পরোয়া করনি। পার্টিতে গিয়ে তুমি পাগলের মতো আচরণ করো। মানুষ কী ভাববে, তা পরোয়া করো না। কিন্তু এখন ইসলাম নিয়ে কথা উঠলে, এখন তুমি পরোয়া করছ?” এটা একরকম মজারই ছিল। যাই হোক, সেই মুহূর্তে আমি এটা অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিল, “আমি শুধু পালাতে চাই। এখান থেকে বেরিয়ে যেতে চাই।” কিন্তু কিছু একটা ছিল, আমি বর্ণনা করতে পারব না, এই অন্ধকারে যেন কোনো আলো, কোনো কণ্ঠস্বর বা কিছু আমাকে বলছিল, “এখন যদি তুমি এটা না করো, হয়তো আর কখনো করবে না। আর তোমার পরিণতিও তোমার মায়ের মতো হতে পারে। তোমার জীবন হবে দুঃসহ, তুমি মারা যাবে, আর তুমি আফসোস করবে। তুমি জানো, এটা সত্য।” আমি ভাবলাম, আমাকে করতেই হবে। তাই আমি বললাম। আমি বললাম, “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ।” আমি করেই ফেললাম। এভাবেই। যা কিছু অনুভব করছিলাম, বমি আসা—সব চলে গেল। মনে হলো কেউ যেন আমার মাথার ওপর তাজা পানি ঢেলে দিল, আর আমি যেন নতুন হয়ে গেলাম। সবকিছু চলে গেল। আর বুঝলেন, যে শূন্যতার কথা এতক্ষণ বলছিলাম?
জীবনে প্রথমবার সেটা আর ছিল না। সেটা ছিল না। এটা কীভাবে বোঝাব? মনে করুন, আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ে হাঁটছেন। পিঠে বড় ব্যাকপ্যাক, আপনি ক্লান্ত, তারপর আপনি সেটা নামিয়ে রাখলেন। সেই ভারটা নেমে গেল। তারপর আমরা নামাজের ঘরে গেলাম। আমি মাথা মাটিতে রাখলাম, আমার প্রথম নামাজ পড়লাম, আসরের নামাজ। আর আমি অনুভব করলাম, “আমি ঘর খুঁজে পেয়েছি। এটাই আমার জায়গা। এটাই আমি খুঁজছিলাম।” তাহলে আপনার চারপাশের মানুষ আপনার ইসলাম গ্রহণে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?
সবচেয়ে কঠিন ছিল সম্ভবত বন্ধুদের সঙ্গে, কারণ তাদের সঙ্গেই আমি সময় কাটাতাম। মনে আছে, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম আর বললাম, “দেখো, আমি আসলে মুসলিম হয়েছি।” আর তারা ছিল এমন বন্ধু, “বেস্ট ফ্রেন্ড, সারাজীবনের ভাই।” আর যখন আমি এটা বললাম, তারা আমাকে ফোন করাই বন্ধ করে দিল। ফোন ধরা বন্ধ করে দিল। সবাই চলে গেল। তারা যেন... ডিলিট করে দিল। আমি ভাবলাম, “কী হলো? ‘ভাই’ বলা, এসব কোথায় গেল?
কী হলো?” তাই হ্যাঁ, আমি সেই সব বন্ধুদের হারালাম। এমনকি তাদের কেউ কেউ মুসলিমও ছিল। কিন্তু তারা বুঝল, “দেখো, তুমি যদি সত্যিকারের মুসলিম হও, আমরা তোমার সঙ্গে থাকতে পারব না।” আর এটা কঠিন ছিল। সূরা আল-বাকারার একটি সুন্দর আয়াত, আমার প্রিয় আয়াতগুলোর একটি। “হয়তো তোমরা কোনো কিছু পছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য খারাপ। আর হয়তো কোনো কিছু অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য ভালো। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।” আর এভাবেই আল্লাহ আমাকে রক্ষা করেছেন। যদি আমি মুসলিম হয়ে তাদের সঙ্গে সেই পার্টিগুলোতে যেতাম?
আমি জানি না, হয়তো পড়ে যেতাম। আমি একবার আমার পরিবারকে বলেছিলাম, এ নিয়ে দুটো মজার গল্প আছে। আমি পরিবারের সঙ্গে বসেছিলাম, আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। আর বললাম, “দেখো সবাই, আমি মুসলিম হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তারা যেন বলল, “হ্যাঁ?” তারা কী বলবে বুঝতে পারছিল না। আর তারা বলল, “তুমি সন্ত্রাসী হয়ে যাবে না তো?
তুমি তো আর...” কারণ তখন সিরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে পুরো বিষয়টা খুব তীব্র ছিল। সবকিছু খুব জোরালোভাবে চলছিল। তাই তারা বলছিল, “তুমি সেখানে গিয়ে মানুষকে গুলি করবে না তো?” তারা এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করছিল। এটা সেই মজার বিষয়গুলোর একটি। আরেকটি ঘটনা আমার কর্মস্থলে, মিউজিক স্টুডিওর কথা মনে আছে তো। তখন আমি সেখানে প্রায় বসের মতো ছিলাম, আর যখন মুসলিম হলাম, ভাবলাম, “ঠিক আছে, এখন বুঝলাম আমার বন্ধু কেন ছাড়তে চেয়েছিল এসব। আমিও ছাড়ব।” কিন্তু কাউকে না কাউকে দায়িত্বতো হস্তান্তর করতে হবে। আর একদিন বড় মিটিং ছিল, বসদের সঙ্গে, সবাই ছিল। নামাজের সময় হয়ে গেল। তখন আমি একটু অদ্ভুত ছিলাম। ভাবলাম, পরোয়া করি না। সবার সামনে আমি জায়নামাজ বের করলাম, সামনেই মিটিং ছিল, লাঞ্চ ব্রেকের মতো ছিল। আর সবার সামনে নামাজ পড়তে শুরু করলাম। আমি ভাবলাম, পরোয়া করি না। তারপর কয়েক দিন পর, মনে হয় আমার বস মিটিং করতে চাইলেন। আমরা অফিসেও মিটিং করিনি। তিনি সহকর্মীদের আশেপাশে থাকতে চাননি, তাই আমাদের এক ক্যাফেতে যেতে হলো, যেখানে কেউ আমাদের দেখবে না বা শুনবে না, তিনি আমাকে কী জিজ্ঞেস করতে চান। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি ঠিক আছ?
মানে, মাথা ঠিক আছে?” আমি বললাম, “কি? আমি ভালো আছি। একদম ঠিক আছি।” “তুমি কি ডিপ্রেশনে আছ? তোমার কি সাহায্য দরকার?” আমি বললাম, “না!” “না, কারণ আমরা তোমাকে এসব করতে দেখেছি, আর জানি না, সেখানে কিছু মানুষ কথা বলছে, তাই আমরা উদ্বিগ্ন। তাই এই জরুরি মিটিং, তোমার আমাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য দরকার কি না দেখার জন্য। একই ব্যাপার, খুব গুরুত্বপূর্ণ— তুমি যেন এক্সট্রিম না হয়ে যাও। তুমি মুসলিম হতে পারো, কিন্তু সন্ত্রাসী হয়ো না, এটা-ওটা করো না।” আর আমি যেন হতবাক হয়ে গেলাম। আমার নিজের মানুষই আমাকে বলছে আমি পাগল হয়ে গেছি। তাহলে সেই একাকিত্ব আপনি কীভাবে সামলালেন?
আমার অনেক ভাই ছিল। মুসলিম হওয়ার পর এটাই ছিল অসাধারণ বিষয়গুলোর একটি। মনে আছে, একবার, সম্ভবত মুসলিম হওয়ার পরের দিন, কারণ প্রথম দিন আমরা মসজিদে নামাজ পড়েছিলাম, তারপর ক্যামেরা নিতে গিয়েছিলাম, আর সে বলল, “দেখো, আসলে একটা ইসলামি লেকচার আছে। চলো সেখানে যাই।” আর আমি অন্য মুসলিমদের সঙ্গে দেখা করলাম। আমি অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলাম, আর নার্ভাস ছিলাম, আমি নতুন, ভুল কিছু বলতে চাই না। আরবি জানতাম না, আসসালামু আলাইকুম কীভাবে বলতে হয়, কোনো ধারণা ছিল না। আমি ঢুকলাম, আর তারা খুব খুশি হলো। তারা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওহ, সাইমন!
এখানে আসো!” আমি ভাবলাম, “এই লোক কে?” “এসো, এখানে বসো, না না, এখানে বসো। খাবার খাও, এটা নাও।” আর তারা আমাকে উপহার দিল, আমি ভাবছিলাম, “কী হচ্ছে?” আর আমি অনুভব করলাম, কল্পনা করুন— অপরিচিত মানুষ, তারা আমার সম্পর্কে কিছুই জানে না, কিন্তু তারা আমাকে ভালোবাসে। আমার পরিবারের মানুষ ছিল যারা আমাকে কখনো ফোন করত না। কিন্তু এই মানুষরা আমাকে চেনেও না, শুধু নাম জানে, তবু ভালোবাসে। এটা শুধু ইসলামেই পাওয়া যায়। তাই এটা আমাকে সত্যিই সাহায্য করেছিল। একটা সাপোর্ট সিস্টেম থাকা। আর সত্যি বলতে, জীবনে প্রথমবার আমার সাপোর্ট সিস্টেম ছিল। কারণ আগে ব্যাপারটা ছিল এমন—আপনি একা, সবকিছু নিজেই সামলান, ঠিক তো?
নিজের জায়গায় থাকুন, মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন না—ব্যস। কিন্তু তাদের সঙ্গে এমন ছিল, আপনি প্রশ্ন করেন, “ভাই, এটা কীভাবে করব? ওটা কীভাবে করব?” আর তারা আপনাকে বলে দেয়, বুঝলেন। তাই মনে করি সেই ভ্রাতৃত্ব, সেই কমিউনিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কি কখনো এমন কোনো অসাধারণ ঘটনা অনুভব করেছেন, যেখানে আল্লাহর সঙ্গে বিশেষ সংযোগ অনুভব করেছেন? অনেক, অনেক বার। একটি বিষয় সবসময় আমাকে বিস্মিত করে, তা হলো দোয়ার শক্তি। ওয়াল্লাহি, আমি গুনে শেষ করতে পারব না, কতবার আমি কোনো কিছুর জন্য দোয়া করেছি, আর ঠিক সেটাই ঘটেছে। অকল্পনীয় উপায়ে। ২০১৯ সালে আমি মিসর থেকে ফিরলাম। আমার কোনো টাকা ছিল না। টাকা শেষ হয়ে গেল, কাজ শুরু করতে হলো। আমি ভাবলাম, “আবার সুইডেন?
আহ্!” আর আমার মাথায় তখনও ছিল, আমাকে এখান থেকে সরতে হবে। কিন্তু আরেকটি বিষয়ও ছিল। আমি বিয়ে করতে চাইছিলাম। আমি এই জীবন অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করতে চাইছিলাম। তারপর সেখানে আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হলো। ২০২০ সালে আমরা বিয়ে করলাম। ৬ মার্চ। পরের দিনই লকডাউন, কোভিড। আমরা লকডাউনের সময়ে ছিলাম, আর ভাবছিলাম, “কোথাও যেতে হবে। অ্যাপার্টমেন্টে বসে থাকতে খুব বিরক্ত লাগছে।” তার এক বন্ধু বা কেউ আমাদের দুবাই সম্পর্কে বলেছিল। আমার মনে দুবাই ছিল শুধু পার্টির জায়গা। যেখানে, বুঝলেন... আমি শুধু সেটাই শুনেছিলাম। আমি ভাবলাম, “দুবাই?
আমি তো মুসলিম দেশ চাই, দুবাই যেতে পারি না।” তারপর আমরা ভাবলাম, “এটাই একমাত্র জায়গা যা খোলা আছে।” তাই বললাম, ঠিক আছে, চল যাই। এটাই তো একমাত্র জায়গা। আমরা সেখানে গেলাম, নামলাম, আর আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এটা যেন আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর জিনিস। আমি মুসলিম মানুষ দেখলাম। খুব সুন্দর, খুব পরিষ্কার ছিল। দুবাই সম্পর্কে আমার ধারণা সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল। আমরা সেখানে ঘুরলাম। সবকিছু খুব সস্তা ছিল। খুব সুন্দর হোটেলে থাকলাম। চারদিকে ঘুরলাম। আমি স্ত্রীকে বললাম, “তুমি কি মুসলিম দেশে থাকতে চাও?” “হ্যাঁ।” “আমিও। আমরা এখন সফরে আছি, আর মুসাফিরের দোয়া কবুল হয়। তাই চল, আমরা অনেক দোয়া করি যেন এখানে থাকতে পারি।” কীভাবে?
জানি না। তবে কোনো না কোনোভাবে। বাড়ি ফিরলাম। প্রথম যে ফোনটা পেলাম, “তোমাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।” কোভিডের কারণে। “আমরা এই অফিস বন্ধ করে দিচ্ছি। তুমি আর সবাই বাদ।” আমি বললাম, “কি?” আর তখন আমাদের প্রথম সন্তান আমার স্ত্রীর গর্ভে। আমি ভাবলাম, “আমি চাকরি হারাচ্ছি, কী হচ্ছে? আমি দোয়া করেছিলাম! কিন্তু উল্টোটা ঘটছে।” কিন্তু মনে রাখবেন, ভোরের আগে অন্ধকার সবচেয়ে গভীর। তাই ভাবলাম, “ঠিক আছে, কী করব?” আমার আর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কারণ আমার তেমন কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না। আর কোভিডের সময় চাকরি পাওয়া?
অসম্ভব। সবাই তখন কর্মী ছাটাই করছিল। আমরা সন্তান প্রত্যাশা করছি, “আমি কীভাবে তাদের দেখাশোনা করব?” তারপর আমি মসজিদে গেলাম, সেখানে একজন রিভার্ট ছিলেন। সুইডিশ। তাঁর পিএইচডি আছে। তিনি মদিনার ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন। তিনি বললেন, “সাইমন, তোমাকে একটা কথা বলার আছে। তোমার জীবন কেমন চলছে?
সবকিছু ঠিক আছেতো?” আমি বললাম, “ভাই, আমি চাকরি হারিয়েছি। কী করব জানি না।” তিনি বললেন, “দেখো, দুবাইয়ের কিছু মানুষ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।” আমি বললাম, “ঠিক আছে?” “একটা বড় সংস্থা আছে, চ্যারিটি সংস্থা, তারা অনেক প্রজেক্ট করে। তাদের একটি প্রজেক্ট হলো মানুষকে ইসলাম পড়ার স্কলারশিপ পেতে সাহায্য করা। যেমন মানুষকে মদিনায় পাঠানো ইত্যাদি। কিন্তু তাদের একটি বিশেষ প্রজেক্ট আছে। তারা আগে কখনো এটা করেনি। এ পর্যন্ত তারা শুধু আরবদের সঙ্গে কাজ করেছে। প্রথমবারের মতো তারা ইউরোপ থেকে কাউকে নিতে চায়। তারা আমার সঙ্গে কথা বলেছে, আর আমি তোমার কথা ভেবেছি।” আমি বললাম, “কি?” “হ্যাঁ, তারা স্কলারশিপ দেবে, সবকিছুর খরচ দেবে। তুমি যেতে পারবে।” আমি বললাম, “সত্যি?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ!
এক মাসের মতো সময়, শুধু ব্যাগ গুছাও!” এটা ছিল সেই মুহূর্তগুলোর একটি— কল্পনা করুন, আমি দোয়া করেছিলাম, কীভাবে সেখানে যাব, জানতাম না। আমার টাকা ছিল না। ওই সফরে সব সঞ্চয় শেষ করেছি। ফিরে এসে চাকরি নেই, বরখাস্ত। এখন কী করব? তাই আমি সবসময় মানুষকে বলি, দোয়াকে কখনো ছোট করে দেখবেন না। এটাই আপনার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। আর ইসলামে, একটি আন্তরিক দোয়া সবসময় কবুল হয়। এটা কবুল বা পূর্ণ হওয়ার তিনটি পথ আছে। হয় এই জীবনে আপনি যা চান তা পাবেন, অথবা আল্লাহ তা আখিরাতের জন্য জমা রাখবেন। তিনি এই দুনিয়ায় আপনাকে দেবেন না, বরং আখিরাতে আপনাকে কিছু দেবেন, অথবা তিনি আপনাকে আরও উত্তম কিছু দেবেন। আপনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আপনার পরিচিতদের মধ্যে বা পরিবারের কেউ, ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কেউ কি ইসলাম গ্রহণ করেছেন?
মুসলিম হওয়ার কিছুদিন পর আমি বাবার সঙ্গে এ নিয়ে অনেক কথা বলেছি। মনে আছে, আমি তাঁকে ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ সম্পর্কে বলেছিলাম। আল্লাহতে বিশ্বাস, তাঁর রাসূলগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, ফেরেশতাগণ, ইয়াওমুল আখির, কদর। তিনি বললেন, “আমি এগুলো বিশ্বাস করি।” আমি বললাম, “কি?” “হ্যাঁ, আমার কাছে অর্থবহ লাগে।” “তাহলে আপনি মূলত মুসলিম। আপনি যদি এগুলো বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি মুসলিম।” তিনি বললেন, “ঠিক আছে।” আমি বললাম, “আপনি কি শাহাদা নিতে চান?” তিনি বললেন, “অবশ্যই!” আমি বললাম, “ঠিক আছে!” আমি এটা আশা করিনি। তারপর তিনি ইংল্যান্ডে চলে গেলেন। সেখানে এক মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হলো, সে বধির ছিল, খ্রিস্টান ছিল। এরপর যখন ফিলিস্তিন ও গাজা নিয়ে এই ঘটনা ঘটল, অবশ্যই সব ভিডিও ইত্যাদি দেখল। তারা আমাকে ফোন করল, আর সে বলল, “আমিও মুসলিম হতে চাই।” আমি এসব ভিডিও দেখেছি। আর ফিলিস্তিনিদের কাছে যা আছে, আমি সেই বিশ্বাস চাই। তাই সে মুসলিম হলো, আলহামদুলিল্লাহ। আর গত বছর সম্প্রতি আমি বাবার মাকে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি খুব বৃদ্ধ, প্রায় ৯৫ বছর বয়স। জীবনের শেষ দিকে, খুব অসুস্থ। আমি তাঁকেও বললাম ইসলাম কী এবং সবকিছু সম্পর্কে। আলহামদুলিল্লাহ, তিনিও গ্রহণ করেছেন। পরিশেষে, যদি পৃথিবীর সব অমুসলিমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকত, কয়েক মুহূর্তে আপনি তাদের কী বলতে চাইতেন?
একটি আয়াত নিয়ে আমি ভাবি, “কুল্লু নাফসিন যায়িকাতুল মাউত।” “প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” আর এটাই আমাকে জাগিয়ে তুলেছিল। আমার মনে হয় মানুষ এই প্রশ্নকে ভয় পায়, কারণ তারা জানে না এর পরে কী আসে। এটা এমন এক বাস্তবতা, যার মুখোমুখি হতে মানুষ খুব ভয় পায়। আর আমি তাদের এটাই বলতাম: মৃত্যু নিয়ে ভাবুন। খারাপভাবে নয়। মৃত্যুকে নতুন এক শুরু হিসেবে ভাবুন। যদি মৃত্যু আপনার জন্য নতুন শুরু হয়, আরেকটি জীবন হয়? সেই জীবনের জন্য আপনি কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন? আপনি কি প্রস্তুত মনে করেন, নাকি না? মৃত্যু নিয়ে ভাবা এই তিনটি প্রশ্ন সামনে আনবে। আমরা এখানে কেন? আমরা কোথায় যাব? আর কে আমাদের এখানে এনেছেন?
আপনি সুইডিশ মানুষদের কী বলতে চান, যেমনটা আপনি বলেছেন, তারা ইসলামের দিকে বেশি ঝুঁকছে, কিন্তু হয়তো ইসলাম গ্রহণে দ্বিধায় আছে। আপনি তাদের কীভাবে উৎসাহ দেবেন?
[সুইডিশ ভাষায়] ঠিক আছে, আমার প্রিয় দেশবাসী। আমি জানি না, আপনি পুরো ভিডিওটি দেখেছেন কি না। কিন্তু আমি আপনাকে যা বলতে চাই, তা হলো: সত্য খুঁজতে ভয় পাবেন না, তা যেখানেই থাকুক না কেন। আর শুধু আপনি ইসলাম সম্পর্কে পড়লেই, এর মানে এই নয় যে আপনি অবশ্যই মুসলিম হয়ে যাবেন। আর শুধু আপনি মুসলিম হলেই, এর মানে এই নয় যে আপনি আরব হয়ে যাবেন। আপনি এখনও সুইডিশ, আমিও সুইডিশ, আমি এখনও সেই জায়গারই মানুষ, যেখান থেকে আমি এসেছি, আর এটি শুধু, আমি কে—তা বদলায়নি, বরং আমি কেমন—তা বদলেছে। আমি আরও সুখী হয়েছি, আরও ভালো মানুষ হয়েছি, আমি এমন হিদায়াত পেয়েছি, যা আগে আমার জীবনে কখনো ছিল না। প্রতিদিন সকালে জেগে ওঠার একটি কারণ এখন আমার আছে। আর আমি জানি, আপনাদের অনেকেই ঘুম থেকে উঠে শূন্যতা অনুভব করেন, অথবা আপনারা কিছু খুঁজছেন। তাই সত্য খুঁজতে ভয় পাবেন না। আলো খুঁজুন। তা যেখানেই থাকুক না কেন, আর যখন তা খুঁজে পাবেন, খোলা মনে থাকুন এবং তা গ্রহণ করুন। আর যদি আপনার কোনো প্রশ্ন থাকে, প্রশ্ন করুন।