"কুরআনকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম!" ~ ইমোশনাল রিভার্ট স্টোরি
প্রকাশের তারিখ
আমার শৈশব ছিল খুবই দুঃসহ। আমার মায়ের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমার সৎ মা আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচণ্ড নির্যাতন করতেন। আমার একবার জরুরি ফোন করার ছিল। তাই আমরা তড়িঘড়ি করে ফোনবুথে গেলাম, সেটি ছিল একটি নির্জন জায়গায়। সেখানে একজন যুবক কথা বলছিলেন। আমি তাকে ফোন ছাড়তে বললাম। আমাকে ফোন করতে হবে। সে বললো, না। সে আমার সাথে বিরক্তিকর কিছু ভাষা ব্যাবহার করেছিলো। তাই আমি তাকে মারলাম। আমি তাকে মারলাম খুব বাজেভাবে। এরপর আমি গ্রেপ্তার হলাম। আর এরপর আমার সাত বছরের জেলও হলো। যখন আমি বিচারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, তখন আমি ইসলাম গ্রহণ করি। আমি ঐ তিন বছর ৯ মাস ইসলাম অধ্যয়ন করলাম। প্রতিদিন প্রতিদিন এটাই আমার কাজ ছিল। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার কারাগারে প্রথম শ্বেতাঙ্গ ইমামও আমি হলাম। সে কারণে আমাকে মৃত্যুর সম্মুখীনও হতে হয়েছে। কমিউনিটিতে আমি খুব পরিচিত ছিলাম, কিন্তু একজন ব্যতিক্রম ছিলেন। একবার তিনি আমার পিছু নিলেন আর ছুরি দিয়ে আঘাত করলেন। এটি আমার হাড় ভেদ করে তিন মিলিমিটারের জন্য আমার হার্টে লাগেনি। একটা প্রশ্ন, আপনি বললেন, আঘাতকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সৎ মাকেও কি ক্ষমা করে দিয়েছেন?
হ্যাঁ, কিন্তু... আসসালামু আলাইকুম, ভাই ইউশা ইভানস... আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে পেয়ে আমরা আনন্দিত। ইউশা ইভানসের পরিচয় দিয়ে শুরু করতে চাই। আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলবেন কি? ইউশা ইভানস কে? এই প্রশ্নটি আমি নিজেকে বহুবার করেছি। আমি দক্ষিণ ক্যারোলাইনার গ্রিনভিলে বড় হয়েছি। খ্রিস্টান হিসেবে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, গির্জায় বড় হয়েছি। ইচ্ছা ছিল যুবমন্ত্রী হওয়ার, মানে, খ্রিস্টান মন্ত্রী। বুঝলেন! তারপর অন্য ধর্ম যাচাই করতে থাকলাম। আর কোনো উত্তর না পেয়ে, রাস্তায় এসে পড়লাম। রাস্তার জীবন, বুঝলেন?
১৮ বছর বয়সে আমি ইসলাম গ্রহণ করি। সেই থেকেই আমি চেষ্টা করছি যত বেশি মানুষকে সাহায্য করতে পারি ইসলাম ধর্মকে বুঝতে। মহামারির সময় আমি ভিডিও গেমারস লীগ শুরু করি মুসলিম গেমারস লীগ। কারণ আমি আমার সন্তানদের সাথে গেম খেলি এটা ছিলো আমার ছোটবেলার অভ্যাস। আমি রেস কার, মাসেল কার বানাতে পছন্দ করি। তো, ইউশা ইভান্স, আমি চেষ্টা করি একজন বহুমাত্রিক মানুষ হতে, সেই সাথে মনে রাখি, বাকি সবার মতই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তো ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক দিয়ে আপনার জীবন কেমন ছিল? আপনি কিসে বিশ্বাস করতেন?
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে, আমি একজন মেথডিস্ট খ্রিস্টান ছিলাম। এটি খ্রিস্টান ধর্মের প্রথাগত একটা সংস্করণ। আপনি যেমনটা ভাবছেন, ঠিক তেমনটা নয়। কোনো চার্চে গেলে আপনি দেখবেন সেখানে লাফালাফি, চিৎকার-চেঁচামেচি। এটাই আনুষ্ঠানিকতা ছিল, অনেকটা ক্যাথোলিকদের প্রার্থনার মতো। তো এসব বিষয়ের কারণেই আমি শেষ পর্যন্ত মিশনারি কার্যক্রমের অংশ হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ১৬ বছর বয়সে আমি ঝুঁকে পড়ি পেন্টিকস্টাল মতবাদের দিকে। বড় হওয়ার সময় আমি সেটাই বিশ্বাস করতাম, যা আমাকে শেখানো হতো, ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করতাম। আমি বিশ্বাস করতাম, বাইবেল হলো স্রষ্টার একমাত্র সত্য বাণী, এটা ছিল স্রষ্টার নির্ভুল বাণী। যেমন মুসলিমরা কুরআন সম্পর্কে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসগুলোই ছিল আমার ধর্মীয় চিন্তার মূল। কিন্তু এগুলোই একসময় আমাকে খ্রিষ্টধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, যখন আমি বাইবেল নিয়ে পড়ি এবং বুঝতে পারি, এটা বাইবেলের শিক্ষা নয়। বাইবেল ত্রিত্ববাদ শেখায় না। যিশু ত্রিত্ববাদ শেখাননি। তাই বাইবেলও কোনো নির্ভুল গ্রন্থ নয়। এই গ্রন্থটি ভুলে ভরা। খ্রিষ্টধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করার মাঝের সময়টাতে আমি একরকম ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিলাম। আমি স্রষ্টায় বিশ্বাস করলেও ধীরে ধীরে নাস্তিক হলাম। আমি নাস্তিকতার সাথে স্রষ্টায় বিশ্বাস করতাম। আমি স্রষ্টায় অবিশ্বাস করতে কখনোই রাজি ছিলাম না, কারণ চারদিকে দেখছিলাম। আমার দাদা সবসময় আমাকে বলতেন, চিত্রশিল্পী ছাড়া কোনো চিত্রকর্ম হয় না, তাই না?
তাই, কোনো কারণ ছাড়াই সৃষ্টির অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তাই, আমি সবসময় স্রষ্টায় বিশ্বাস করতাম, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, স্রষ্টা এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করে নিজ গতিতে চলতে দিয়েছেন। মানে, তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি সৃষ্টি করে ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে দেখছিলেন কী হয়। আর আমি তখন ঈশ্বরের ওপর কিছুটা বিরক্ত হয়ে পড়ি, এক রকমের হতাশা জন্মে। কারণ আমি এদিকে-ওদিকে তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, কিন্তু তিনি দেখা দেন না। তখন আমি ধীরে ধীরে রাস্তার জীবনের দিকে ঝুঁকে পড়লাম, রেপ মিউজিক শুনতে শুরু করলাম। হিপহপ মিউজিকে আসক্ত হয়ে পড়লাম। আমি রেপের হিপহপ স্টাইলের জীবনধারায় ডুকে পড়েছিলাম। আর আমি একবার স্কুলে সমস্যায় পড়েছিলাম। আসলে আমি গ্রেপ্তারও হই সেই সময়। আপনি কেন গ্রেপ্তার হলেন?
বোকামি, স্পষ্টভাবে বলতে গেলে। কিন্তু আসলে, আমার রাগের জন্য আমি গ্রেপ্তার হই। আমি খুব রাগী তরুণ ছিলাম, যা ছিল শৈশবে নির্যাতিত হওয়ার ফল। আমার বাবা-মা আলাদা হয় খুব ছোটবেলায়। তিন মাস বয়সে মা আমাকে ছেড়ে যান। ছয় বছর ধরে তিনি আমার জীবনে ছিলেন না। ছয় বছর বয়সের আগে তাকে আমি দেখিনি। তো আমি বড় হই আমার বাবা কাছে আর পরে তিনি আবার বিয়ে করেন। আমার সৎ মা, তিনি ছিলেন আমার মায়ের স্কুলজীবনের শত্রু। আমর সৎ মা ছিলেন বধির, আর আমার মা...
তারা একই স্কুলে পড়েছেন। বধির হওয়ার কারণে আমার মা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতেন। আর, মায়ের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে, সৎ মা আমাকে নির্যাতন করতেন। শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে, সব দিক দিয়ে। আমার একমাত্র আবেগ ছিল রাগ। তাই আমার রাগ ছাড়া আর কোনো অনুভূতি ছিল না। আমি খুবই রাগী ছিলাম। আর সে সময় আমার ব্ল্যাকবেল্টও ছিল। তো, আমি ব্ল্যাক-বেল্টধারী ছিলাম। তখনই মার্শাল আর্টে প্রথম ব্ল্যাক-বেল্ট পেয়েছিলাম। এক রাতে আমরা দক্ষিণ ক্যারোলাইনার ছোট শহর পিকেনসে আমি মদ্যপ অবস্থায় ছিলাম। আমরা সেই ছোট শহরটির একটা ফোন বুথে গেলাম একদম নির্জন এলাকায়। সেখানে একজন তরুণ কথা বলছিলো। তো আমি তাকে ফোনটি রাখতে বললাম, “ইয়ো আমাকে কথা বলতে দাও। এরপর যাকে ইচ্ছা ফোন কর, কিন্তু এখন আমাকে একটু দাও।” সে বললো, “না।” সে এমন কিছু বললো, যাতে আমি বিরক্ত হই, রেগে যাই। এরপর আমি তাকে মারধর করি, তাকে মারধর করি, খুব বাজেভাবে। তো তাকে মারধর করি, তাকে মারধর করি, খুব বাজেভাবে। বহু দিন ধরে পুষে রাখা রাগকে বের করে দেয়া যাকে বলে, যেটা আপনি অনেক দিন ধরে চেপে রেখেছেন, তখন সেটা একেবারে বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে আসে। আমি সেই তরুণকে মেরে হাসপাতালে পাঠালাম। তারপর গ্রেপ্তার হলাম। জেল থেকে বের হলেন কিভাবে?
বের হইনি। তাহলে কী হলো? আপনি কিভাবে মুক্ত হলেন...
আমি বন্ড দিয়ে বের হয়েছিলাম। শহরটি খুব ছোট ছিল। মাত্র দুজন বিচারক ছিলেন। আর সেই তরুণ ছিল তাদের একজনের সন্তান। তো তারা আমার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনলেন। এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ ছিল। তারা হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনে। তো আমাকে বিচারের মুখোমুখি হতে বলা হলো। কারণ আমি কোনোভাবেই হত্যাচেষ্টার এই অভিযোগ স্বীকার করতাম না আর এজন্য আমি আদালতে গেলাম ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আর আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান ছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ, আমার দাদি একজন আইনজীবী ঠিক করলেন। আর তারা মামলাটিকে হালকা করতে পেরেছিলেন। যদিও এটা সত্যি যে আমি আগে কখনো সমস্যায় পড়িনি। এটাই প্রথম ঘটনা। কিন্তু তারা বিষয়টি প্রমাণ করতে চাচ্ছিলেন, কারণ ছেলেটি ছোট্ট শহরের বিচারকের ছেলে ছিল। তারা তাদের হত্যা-মামলার অভিযোগকে পরিবর্তন করে শুধু আঘাত ও মারধরের মামলা করে। পরে আমাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাহলে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কখন প্রশ্ন করতে শুরু করলেন?
১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মকালে। ১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মকালে, আমি খুটিয়ে খুটিয়ে বাইবেল পড়তে শুরু করি। আর আমি বিজ্ঞানও পড়ছিলাম কারণ, বব জোনস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এটা ছিল একটি বিখ্যাত বিবলিক্যাল কলেজ, সাউথ ক্যারোলাইনায় আমার নিজ শহর গ্রিনভিলে। এটি পুরো বিশ্বেই পরিচিত। আর আমার পড়াশোনার মূল বিষয় ছিল টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম, যার মাধ্যমে বাইবেলের সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা হয়। তাই বাইবেলের গভীরে ঢুকে পড়ার ফলে আমি বুঝতে পারি, এটি আসলে... এমনকি একজন পণ্ডিতের দৃষ্টিকোণ থেকেও, এটা নিখুঁত গ্রন্থ নয়। এটা মানুষের রচিত একটি...
আর যেভাবে এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছেছে, তাতে অনেক বিকৃতি ঘটে গেছে। তো আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে, কোনোমতেই বাইবেল স্রষ্টার বাণী নয়, কারণ এটি নিখুঁত কোনো গ্রন্থ নয়। এবং এ কথাটাই আমি বলেছিলাম বব জোনস ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপককে। তার সাথে আমার আলোচনা হলো। তাকে একটি প্রশ্ন করলাম। যুক্তিসঙ্গত একটি প্রশ্ন। বললাম, স্রষ্টা কি নিখুঁত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, ঠিক আছে, যদি স্রষ্টা নিখুঁত হন, তাহলে স্বাভাবিকভাবে যা কিছু স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসে, তা নিজেও নিখুঁত হওয়া উচিত, তাই না? বললেন, হ্যাঁ। বললাম, তাহলে কি বাইবেল নিখুঁত?
বললেন, না। একজন নিখুঁত স্রষ্টার যদি কোনো গ্রন্থ থাকে, তাহলে তার গ্রন্থটিও নিখুঁত হতে হবে। যদি এটি নিখুঁত না হয়, এটি স্রষ্টার থেকে নয়। এর কিছু অংশ স্রষ্টার কাছ থেকে আসতে পারে, সেখানে মানুষ রচিত অংশও রয়েছে। আর আমরা যদি দুইয়ের মাঝে পার্থক্য করতে না পারি, তাহলে বলা যায় না, এই গ্রন্থটি আপনার বিশ্বাসের স্তম্ভ। এটাই যুক্তিসঙ্গত। এটাই ছিল আমার সমস্যা। খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলামের পথে আমার যাত্রা শুরু হয়। নিঃসন্দেহে সেটা ছিল একটি প্রেরণা। না হলে এটা কখনোই ঘটত না। অন্য ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনার কারণেই এটা ঘটেছে। কিন্তু আমি প্রমাণ খুঁজছিলাম। আমি জীবনের এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলাম যে আমি আর কোনোভাবেই ঠকতে চাইনি। ঠিক?
বিশ্বাস করতাম, স্রষ্টার কোনো ধর্ম থাকলে তার প্রমাণও থাকবে। আমাদের কাছে স্পষ্ট, বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রমাণ থাকবে। আমার দাদা আমাকে শিখিয়েছিলেন তখন তিনি ছিলেন না, আগেই মারা গেছেন। কিন্তু আমার মনে আছে তিনি বলেছিলেন, কেউ যদি বলে, সে সত্য বলছে, তাহলে তার কাছে প্রমাণ চাইবে, কারণ সত্যের সবসময়ই প্রমাণ থাকে। তাই আমি অন্য ধর্মের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছিলাম, ইহুদী, হিন্দু, বৌদ্ধ, তাওবাদের মতো সব ধর্ম। সব ধর্মই মনে হচ্ছিলো যেন, বিরোধপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করছিল। আমার মতে, স্রষ্টার অবশ্যই... শুধু প্রমাণ থাকলেই হবে না, বরং সেটিকে যৌক্তিক হতে হবে আর সহজ হতে হবে। এবং কিছু প্রমাণও থাকতে হবে, আর যেগুলোকে নিখুঁত হতে হবে। সেই পর্যায়ের না হলে আমি কোনো কিছুই গ্রহণ করতাম না। তাহলে আপনি কোনো বন্ধুর মাধ্যমে ইসলামের খোঁজ পেলেন?
আমি ইসলামের খোঁজ পাই... আমি বলব না যে সে আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলো। সে আমার পরিচিত ছিল আর সে মুসলিমও ছিল বটে। আমি অনেকদিন পর সেটা জেনেছি। তার বাড়িতেই একদিন ধর্মের ধারণাটি উঠে আসে। সে জানায়, সে একজন মুসলিম। আমি অবাক হয়ে যাই, সে ছিল আফ্রিকান-আমেরিকান। আমার ধারণা ছিল, শুধু আরবরাই মুসলিম হয়। সে আমাকে শুক্রবারের জুমার নামাজে যেতে বলে। তো আমি ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আমার শহরের মসজিদে গেলাম সেখানে আমি খুতবা শুনলাম। খুবই সুন্দর খুতবা ছিল সেটি। খুবই সুন্দর। মিথ্যা বলব না। সেটি ছিল আল্লাহর ক্ষমা নিয়ে। কিন্তু তা আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। কারণ আমি ইতিমধ্যে অনেক সুন্দর সুন্দর খ্রিস্টীয় উপদেশও শুনেছিলাম। তাই আমি ইমামকে নামাজের পর বললাম, আপনার ধর্মের সত্যতার প্রমাণ আছে?
বললেন, হ্যাঁ। তিনি আমাকে তার অফিসে নিলেন আর একটি কোরআন দিলেন। আমি বললাম, এটা কি?
তিনি বললেন, আল্লাহর বাণী। বললাম, আমি এটি সম্পর্কে জানি। আগেও কয়েকবার এটা শুনেছি। বললাম, আমাকে নিজের মতো করে এটি বুঝতে দিন। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পড়ে দেখব কী হয়। তো আমি কোরআন পড়তে শুরু করলাম। আমি প্রথম সূরা শুরু করলাম। সূরা ফাতিহা আমার মনে হলো স্রষ্টার কাছে প্রার্থনার মতো। কিন্তু দ্বিতীয় সূরার দ্বিতীয় আয়াতটি আমাকে কোরআন পড়তে বাধ্য করে। সেখানে আছে, এটি সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো ভুল নেই। তাই আমি সেটিকে ভুল প্রমাণ করতে চাইলাম, কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, ইসলাম সত্য ধর্ম নয়। আর আমি সূরা বাকারায় আরো একটি চ্যালেঞ্জ পেলাম। তোমরা যদি এই গ্রন্থ নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে এটির মতো কিছু নিয়ে এসো। বুঝলেন তো, অথবা এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে হতো, এতে অনেক অসঙ্গতি দেখতে পেতে। অর্থাৎ গ্রন্থের একেবারে শুরুতেই এতোগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে...
পৃথিবীতে কোরআনের মতো কোরআনের মতো আর কোনো ধর্মীয় বাণী নেই। গ্রন্থটির সূচনা হয়েছে পাঠকদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যে এতে কোনো অসঙ্গতি বা ভুল নেই। চেষ্টা করুন, দয়া করে প্রমাণ করুন। আমি বেশ ভালোভাবেই চ্যালেঞ্জটা নিলাম। আমি সেই পুরো সপ্তাহটি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কোরআন পড়ে কাটিয়েছি, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার। রবিবার কোরআন শেষ করে আমি মুসলিম হয়ে যাই। এমনকি সেই প্রথম পড়াতেও, আমি পারিনি... এমনকি আলেমরাও এটা পুরোপুরি বুঝতে পারেন না, আর আমি পড়ছিলাম ইংরেজিতে। এই গ্রন্থতে এমন কিছু নিশ্চয়ই আছে, যার কারণে মনের অজান্তেই ভাবলাম, এটাই সেই গ্রন্থ। এতে নবীদের কথা বলা আছে, কিন্তু বাইবেলের মতো নবীদের নিয়ে আজগুবি কোনো কথা বলা হয়নি, বুঝলেন?
বাইবেলে নবীদের সম্পর্কে আজগুবি সব কাহিনী বর্ণিত আছে। কোরআনে রবের একত্বের কথা বলা আছে। এতে যিশু ও তার প্রচারিত বার্তার কথা বলা হয়েছে। বাইবেলে এমনটাই খুজে পেয়েছিলাম। খুবই সহজ-সরল ছিল সেটি। এমন অনেককিছু আছে, যেগুলো আমার ধারনা ছিল না, কিন্তু সেগুলো ছিল সত্য। স্রষ্টা এক, তারই ইবাদত করা উচিৎ। বাইবেল থেকে আমার এমনই বিশ্বাস হয়েছিল। খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে অধ্যয়নের সময় আমি প্রায় লোকজনকে বলতাম, ওল্ড টেস্টামেন্টে স্রষ্টা বলেছেন, তিনি এক। কোরআনেও একই কথা বলছে। যখন আমি শেষের দিকে গেলাম, “বলুন তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।” এটাই সেই গ্রন্থ। সেখানে এমনইতো থাকার কথা ছিল। তাই আমি সোমবার মসজিদে গেলাম এবং মুসলিম হলাম। তারপর শুক্রবার সবার সামনে কালেমা শাহাদাত পড়লাম, ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে। কালেমা পাঠের সময় আপনার অনুভূতি কেমন হয়েছিল?
এই অনুভূতিকে এটাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সত্যি বলতে গেলে মানে এমন যে...ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি আপনার প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো আনন্দের। মানে, কোনো সত্যিকারের... এর উপযুক্ত কোনো শব্দ নেই। আমি যেন আমার গন্তব্য খুঁজে পেলাম, মানে বুঝলেন? আমার মনে হলো যেন, আমার আত্মায় বিরাজ করা সেই শূন্যতা যেন পূরণ হয়ে গেছে। কারণ এর আগে আমি অনেক কিছু দিয়ে সেটি পূরণ করতে চাচ্ছিলাম, বুঝলেন? কিছু দিন খ্রিস্টধর্মে ছিলাম, তারপর রাস্তা, পার্টি, এ ধরণের সবকিছু। মানুষকে বোঝাতাম, আত্মার সন্তুষ্টির জন্য...
কারণ ইসলামবিহীন সব মানুষের মনেই শূন্যতা থাকে। এটাই আমাদের প্রকৃত অবস্থা। আমি মানুষকে বলতে চাইতাম, আপনি যদি ইসলাম ছাড়া অন্যকিছু দিয়ে সেটি পূরণ করতে চান, সেটি হবে সৈকতে গিয়ে বালু দিয়ে সমুদ্র ঢাকার চেষ্টার মতো। আপনি যত বালুই ঢালুন না কেন, আপনি কখনোই তা পূরণ করতে পারবেন না। কখনই না। প্রকৃত স্বভাবে ফিরে আসলেই সেটি কেবল পূরণ করা সম্ভব, আর সেটি হলো, রবের ইবাদত করা। আমার ভালো লাগলো, যেন শান্তি খুঁজে পেলাম। আমার সকল ক্রোধ, মনের সব উন্মাদনা যেন নিমিষেই শান্ত হয়ে গেল, যেন শূন্যতা পূরণ হলো। আপনার আশপাশের লোকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
আমি বলব না যে অনেক মানুষ ছিল, ঘটনা হলো, আমার তখনকার বন্ধুদের থেকে আমি তাদের থেকে দূরে দূরে থাকতাম, কারণ তারা আমাকে সাহায্য করেনি। তারা আমার সাথে সেই রাত পর্যন্ত ছিল, যখন আমি সেই তরুণকে মারছিলাম। তারা আমাকে তিরস্কার করছিল। পুলিশ এলে, তারা আমাকেই কটুক্তি করল। তাই, আমি সবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলাম। আমার দাদি ও বাবাকে তখনই বলিনি যে আমি মুসলিম হয়েছি। আমি জীবনটাকে সুন্দর করতে চাচ্ছিলাম। আর এক মাস পর আমার দাদি যখন দেখলেন সবকিছু, তিনি সব দেখে বললেন, তোমার পরিবর্তন হয়েছে। আমার কথা বুঝছো? অর্থাৎ...
আমি ভদ্র ও মার্জিত হয়েছি। বেশি বেশি সাহায্য করছি, ভালো কাজ করার চেষ্টা করছি। তিনি বললেন, “কিভাবে সম্ভব?” তখন আমি তাকে বললাম, আমি মুসলিম হয়েছি। তার কথা ছিল, তোমার সাথে পুরোপুরি একমত নই, কিন্তু এটাই যদি তোমার পরিবর্তনের কারণ হয়, তাহলে এটাতেই কর। আর আমার বাবা বললেন, তুমি বড় হয়েছ। তোমার সিদ্ধান্ত নিতে পার। তুমি এটা নিয়েই থাক। আমি ২৫ বছর ধরে মুসলিম। এখনো বাবার সাথে কথা হয়। ২৫ বছর ধরে তাকে দাওয়াত দিচ্ছি। তিনি এখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। আল্লাহ তাকে হেদায়েত দিক। কিন্তু তিনি খুবই খুশি যে আমি মুসলিম। তিনি বলেন, ইসলাম তোমাকে তোমার সেরা অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তিনি মানুষকে গর্ব করে বলেন যে, “আমার ছেলে মুসলিম, সে সারা বিশ্ব ঘুরে ঘুরে মানুষকে সাহায্য করে। দাতব্য কাজে জড়িত। সে উদ্বাস্তু শিবিরে যায়।” এ পর্যন্ত আমার শহরে দুইবার বক্তৃতা দিয়েছি, প্রতিবারই বাবা প্রথম সারিতে ছিলেন। তিনি এসে প্রথম সারিতে বসতেন। আমি নতুন মুসলিমদের এটাই বলি। মানুষকে বলে বেড়ানোর দরকার নেই, বরং কাজই যেন বলে, তোমার কাজই যেন বলে, তুমি মুসলিম হয়েছো। এটাই হলো পার্থক্য। আপনি কি এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে মণে হয়েছে যে, আল্লাহর সাথে আপনার বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে?
আমি যখন জেল থেকে বাইরে আসি, একটা চাকরির খুব জরুরি দরকার ছিল। আমি যদি আমার কোনো কাজের জন্য বাদ পড়ি, সেটি আমার পরীক্ষামূলক সময়ের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। তাহলে আমাকে আবারও দুই বছরের জন্য জেলে যেতে হবে। তাই জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর, আমি কন্সট্রাকশনের একটি চাকরি পাই। প্রথম শুক্রবারে আমি আমার বসকে বললাম, সবাই যখন দুপুরের খাবার খায়... কারণ এক ঘণ্টা দুপুরের খাবারের বিরতি ছিল। বললাম, আমি দুপুরের খাবারের পরিবর্তে... জায়গাটি তিন মাইল দূরে ছিল, আমি বললাম, আমি জুমার নামাজ পড়তে যাব। তারা জানত আমি মুসলিম এবং আমি কর্মস্থলেই নামাজ পড়তাম। বললাম, আমি জুমার নামাজ পড়তে যাব। বললেন, তোমার কর্মস্থল ত্যাগ করার অনুমতি নাই আমি বললাম, এটাতো...
আমি আসলে অনুমতি চাচ্ছি না। আমি শুধু আপানকে জানাচ্ছি। এরপর বললেন, তুমি যদি কর্মস্থল ত্যাগ করো, তোমাকে চাকরিচ্যুত করা হবে। তাই চাকরি করতে হলে আল্লাহর অবাধ্য হতে হবে। অথবা জুমার নামাজ পড়লে আমি আমার চাকরি হারাব। আমি বললাম, আপনি জানেন কি? আমি চার বছর জেলে থেকে দ্বীন জেনে সঠিক কাজ করতে শিখেছি। আমি সঠিক কাজটিই করলাম। তো ছেড়ে দিলাম। আপনার চাকরি থাক, আমি গেলাম। আমি জুমার নামাজে গেলাম। এবং আমি সেই জুমায় অনেক দোয়া করলাম, হে আল্লাহ, আমি তোমার জন্যই এখানে এসেছি। তাই, আমাকে সাহায্য করো। জুমার পর এক তরুণ আমার কাছে এলো। বলল, “ভাই, আপনার কি চাকরি আছে?” আমি বললাম, “একটু আগেও ছিল। আমি কর্মস্থল ত্যাগ করেছি এবং চাকরি ছেড়ে এখানে এসেছি।” তিনি বললেন, তার বাবা ইমাম ছিলেন...
তিনি এসে বললেন, “আমার বাবা বলেছেন আপনি কি তার পিজ্জার দোকানে কাজ করতে চান?” বললাম, “অবশ্যই, আমার চাকরি দরকার।” তো সেদিন থেকেই আমার চাকরি শুরু হলো। যার বেতন ছিল দ্বিগুণ, যেটা আমি কন্সট্রাকশন কম্পানিতে পেতাম। আগের চাকরি ছেড়ে নতুন চাকরি পেতে আমার সময় লেগেছে দুই ঘণ্টা। আল্লাহর জন্য বিনীতভাবে কিছু করলে, তিনি আপনার জন্য পথ খুলে দেবেন। তো সঠিক কাজ করাটা অনেক সময় ভয়ংকর হতে পারে, সেটি ছিল অন্যতম সুন্দর একটি রাত, সেটা আমার সারাজীবন মনে থাকবে। নবী (সা.)-এর কোন দিকটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?
তাঁর ভালোবাসা আমাদের আর উম্মাহর জন্য। মানে সেটা আসলে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। উম্মাহর জন্য তার যে অসীম ভালোবাসা ছিল, প্রত্যেক নবীরই একটি করে দোয়া ছিল, যা দিয়ে তাঁরা ইচ্ছা মতো চাইতে পারত। তাঁদের যেকোনো চাওয়াই পূরণ হয়েছে। আমাদের নবী (সা.)-এর অনেক সময় এই দোয়ার দরকার ছিল। চাচা আবু তালিব অমুসলিম থেকেই মৃত্যুবরণ করেন। বদরের যুদ্ধের পূর্বে, উহুদের যুদ্ধের সময়, আপনি জানেন খন্দকের যুদ্ধে মদিনায় যখন... এমন অনেক সময় ছিল, যখন তিনি সেই দোয়ার উত্তম ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বললেন, না, আমি এটি রেখে দেব। তিনি কার জন্য এটি করলেন?
আমাদের জন্য। তিনি বললেন, আমি তোমাদের জন্য রেখেছি। বিচারের দিন আল্লাহ তাঁকে সামনে আসতে বলবেন এবং তিনি সিজদায় পড়ে যাবেন। আমরা এই বিখ্যাত ঘটনা জানি। এবং তিনি দীর্ঘ সময় সিজদায় পড়ে থাকবেন। আর আল্লাহ তাঁকে বলবেন, মাথা তুলুন এবং আমার কাছে চান। কারণ আপনার দোয়াটি অবশিষ্ট রয়েছে। আল্লাহ এই বিষয়টি জানেন। আপনি এই দোয়াটি করেননি। তো এখন আপনি কি চান? তিনি তো অনেককিছু চাইতে পারতেন। তখন তিনি কী বলবেন?
উম্মত, উম্মত। তিনি আমাদের জন্য দোয়া করবেন। তো এটা তাঁর উম্মাহর জন্য ভালোবাসা এবং উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ শুধু সাহাবিদের জন্য নয়, সবার জন্য। তিনি আমাদের এতটাই ভালোবাসেন যে তিনি আমাদের জন্য কত কষ্ট সয়ে গেছেন, কিন্তু তাও সেই দোয়াটির সুযোগ নেননি। কারণ তিনি জানতেন, আমাদের এই দোয়ার প্রয়োজন হবে। অনেক মানুষ ইসলামের কথা চিন্তা করে, কিন্তু তাদের কিছু প্রশ্ন আছে। তারা বলেন, ইসলাম গ্রহণ করলে কি আমাকে আমার সংস্কৃতি ত্যাগ করতে হবে, আরবদের মতো পোশাক পরতে ও দাড়ি রাখতে হবে? আমি কি নিজের সংস্কৃতি ত্যাগ না করেই একজন আমেরিকান মুসলিম হতে পারি?
মুসলিম হওয়ার জন্য আপনার নিজের পরিচয়, আপানর সাংস্কৃতিক পরিচয় ত্যাগ করতে হবে না। আপনাকে শুধু এর সাথে সম্পর্কিত ইসলামবিরোধী অংশ ত্যাগ করতে হবে। তাই আমার মুসলিম হওয়ার জন্য আমেরিকান পরিচয় ত্যাগ করতে হবে না। প্যান্ট, শার্ট, স্যুট, টাই পরাতে কোনো ধরণের সমস্যা নেই। তো আপনি নিজের পরিচয় ধরে রাখতে পারেন। ধরুন, আপনি আফ্রিকায় গেলেন। আপনি সেখানকার মুসলিমদের সংস্কৃতি দেখবেন। সেটি অনেক আলাদা। দক্ষিণ এশিয়াতে গেলেও একই অবস্থা দেখবেন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায়তেও তারা সংস্কৃতি ধরে রেখেছে, বরং ইসলাম সেটি বৃদ্ধি করেছে। আপনাকে একজন আরব বা পাকিস্তানি হতে হবে না। আপনি নিজের মতো থাকতে পারবেন। এমন অনেক খ্রিস্টান আছেন, যারা বলেন, প্রার্থনা করার সময় আমি স্রষ্টার সাথে এক ধরণের আধ্যাত্মিকতা অনুভব করি। তাই, আমার নতুন কিছুর দরকার নেই। এমন মানুষকে কী বলতে চাইবেন?
আধ্যাত্মিকতা, প্রতারণাও হতে পারে। কারণ এটি হলো একটি অনুভূতি। খ্রিস্টানরা এর পেছনেই ছুটছে। তারা সেই আধ্যাত্মিকতার পেছনে ছুটছে। সেই আধ্যাত্মিকতা আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। এটি প্রমাণভিত্তিক কোনো সংযোগ নয়। কারণ অনেকে এটা পায় ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। হিন্দুরাও একই কাজ করে। উইকানরা জাদুবিদ্যা দিয়ে একই কাজ করে। মাদকাসক্তরাও একই কাজ করে। একজন মদ্যপও একই কাজ করে। তারা এটাই করে যায়। আর ইসলামে আমরা তেমনটা করি না। ওই উচ্ছ্বাসটা আসে আবার চলে যায়। কখনো আপনার আধ্যাত্মিকতা বেশি হবে এবং কখনো কম হবে। নবী (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন, ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। আমরা আল্লাহর সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক চাই, যেহেতু তিনি ইবাদতের যোগ্য একমাত্র সত্ত্বা। আল্লাহর সাথে আমার সঠিক সম্পর্ক নির্ধারণের দায়িত্ব আমার নয়। ওহ, এটাকে ঠিক মনে হচ্ছে, তো ঠিকই আছে। এমনটা নয়...
ঐ শর্তগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এসব আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। আল্লাহ নির্ধারণ করেন আর আমরা অনুসরণ করি। তাই, আমরা তাঁর পছন্দ করা উপায়েই ইবাদত করি, আমাদের পছন্দ করা উপায়ে নয়। তো, কোনো খ্রিস্টান বলতে পারে, আপনি যিশুর দল ত্যাগ করলেন কেন? আমি করিনি, আমি এখন যিশুকে ঠিকভাবেই অনুসরণ করছি। আমি যিশুকে ত্যাগ করিনি, বরং খুঁজে পেয়েছি। পলকে ত্যাগ করেছি। আমি পলকে ত্যাগ করে যিশুকে অনুসরণ করেছি। কারণ, খ্রিস্টান শব্দের অর্থ হলো খ্রিস্টের মতো। যিশু একমাত্র সত্য প্রভুর ইবাদতকারী ছিলেন। আমিও এখন তা-ই করেছিলাম। একটা প্রশ্ন, আপনি বললেন, আপনি আপনার ছুরিকাঘাতকারীকে ক্ষমা করেছেন। আপনার সৎ মাকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন? হ্যাঁ, কিন্তু...
আমি তাকে ক্ষমা করেছি তার জন্য নয়। আমি তাকে একটি চিঠি লিখি, কারণ তিনি কখনো দোষ স্বীকার করেননি, তিনি কী করেছিলেন। তাকে দেখে মনে হতো, কিছুই ঘটেনি। যেন আমি এসব বানিয়ে বলেছি শিশুকালের। তাই, আমি তাকে ক্ষমা করে একটা চিঠি লিখি। আমি লিখি, আমি তাকে ক্ষমা করছি তার জন্য না। আমি নিজের জন্যই তাকে ক্ষমা করছি। কারণ, তিনি কখনই এমন আচরণ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। আমি বুঝতে পারলাম, তার প্রতি সেই রাগ ধরে রাখা, তিনি এখন আর আমাকে অত্যাচার করছেন না। বরং আমি নিজেকেই অত্যাচার করছিলাম। এবং এমনটা অনেকবার ঘটে। আমি প্রতিদিন কাউন্সেলিং এবং কোচিং করি। প্রতিদিন। আমি সেখানেই ছিলাম, আমার একটা সেশন ছিল, এখানে আসার ঠিক আগেই। তাদের অধিকাংশই মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত, যারা অপমাণ ও এ রকম জিনিসের মধ্য দিয়ে গেছেন। এবং আমি তাদের ব্যাখ্যা করলাম যে, এই ক্ষমাটা এটা আপনাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্যই। কারণ, তার মধ্যে এটা ছিল না...
আমি মনে করি না, আমার জীবনে সেই প্রভাব ফেলার অধিকার তার ছিল। আমি আর বলতে পারব না...আমি তাকে দোষ দেব না। শৈশবে আমার হওয়া নির্যাতনের জন্য আমি তাকে দোষ দিতে পারি না। সেটি শেষ হয়ে গেছে। ৩০ বছর আগেই সেটি শেষ হয়েছে। আমি নিজের ওপরই তেমনটি করছিলাম, তাই আমি সেটি ত্যাগ করি। হ্যাঁ আমি তাকে ক্ষমা করেছি, তাকে নিজের জন্যই ক্ষমা করেছি। আমরা আল্লাহর জন্য ক্ষমা করি। অবশ্যই এর পেছনে ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু আমি নিজের জন্যই তাকে ক্ষমা করি, কারণ আমি সেটি থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। সর্বশেষ, আপনাকে যদি কয়েক মিনিটের সুযোগ দেওয়া হয়, সারা বিশ্বের অমুসলিমদের উদ্দেশে কি বলতে চাইবেন?
আমি তাদের বলব, নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন এবং জীবনের উদ্দেশ্য অনুধাবন করুন। সবকিছুরই উদ্দেশ্য রয়েছে। এই পৃথিবীতে উদ্দেশ্যহীন কিছুই নেই। এতে আপনিও অন্তর্ভূক্ত। এখানে আপনি কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন। সেই উদ্দেশ্য খুঁজে বের করুন। আপনি নিজের উদ্দেশ্যকে জানুন। আর সেটি হলো স্রষ্টার ইবাদত করা। যিনি আপানকে সৃষ্টি করেছেন। তাই, আপনাকে এই বিষয় নিয়ে মারাত্মক ধরণের কিছু অনুসন্ধান করতে হবে। এবং নিশ্চিত করুন, আপনি যা বিশ্বাস করেন, তার পেছনে একটি কারণ রয়েছে। সেটা শুধু আপনার মা-বাবার শিক্ষা থেকে নয়, বা সংস্কৃতি কিভাবে পরিচালিত করে, সেরকম কিছু নয়। আপনার অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস পদ্ধতিকে আপনার বাছাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী বিষয়ে পরিণত করুন।
হ্যাঁ, কিন্তু... আসসালামু আলাইকুম, ভাই ইউশা ইভানস... আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে পেয়ে আমরা আনন্দিত। ইউশা ইভানসের পরিচয় দিয়ে শুরু করতে চাই। আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলবেন কি? ইউশা ইভানস কে? এই প্রশ্নটি আমি নিজেকে বহুবার করেছি। আমি দক্ষিণ ক্যারোলাইনার গ্রিনভিলে বড় হয়েছি। খ্রিস্টান হিসেবে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, গির্জায় বড় হয়েছি। ইচ্ছা ছিল যুবমন্ত্রী হওয়ার, মানে, খ্রিস্টান মন্ত্রী। বুঝলেন! তারপর অন্য ধর্ম যাচাই করতে থাকলাম। আর কোনো উত্তর না পেয়ে, রাস্তায় এসে পড়লাম। রাস্তার জীবন, বুঝলেন?
১৮ বছর বয়সে আমি ইসলাম গ্রহণ করি। সেই থেকেই আমি চেষ্টা করছি যত বেশি মানুষকে সাহায্য করতে পারি ইসলাম ধর্মকে বুঝতে। মহামারির সময় আমি ভিডিও গেমারস লীগ শুরু করি মুসলিম গেমারস লীগ। কারণ আমি আমার সন্তানদের সাথে গেম খেলি এটা ছিলো আমার ছোটবেলার অভ্যাস। আমি রেস কার, মাসেল কার বানাতে পছন্দ করি। তো, ইউশা ইভান্স, আমি চেষ্টা করি একজন বহুমাত্রিক মানুষ হতে, সেই সাথে মনে রাখি, বাকি সবার মতই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। তো ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক দিয়ে আপনার জীবন কেমন ছিল? আপনি কিসে বিশ্বাস করতেন?
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে, আমি একজন মেথডিস্ট খ্রিস্টান ছিলাম। এটি খ্রিস্টান ধর্মের প্রথাগত একটা সংস্করণ। আপনি যেমনটা ভাবছেন, ঠিক তেমনটা নয়। কোনো চার্চে গেলে আপনি দেখবেন সেখানে লাফালাফি, চিৎকার-চেঁচামেচি। এটাই আনুষ্ঠানিকতা ছিল, অনেকটা ক্যাথোলিকদের প্রার্থনার মতো। তো এসব বিষয়ের কারণেই আমি শেষ পর্যন্ত মিশনারি কার্যক্রমের অংশ হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ১৬ বছর বয়সে আমি ঝুঁকে পড়ি পেন্টিকস্টাল মতবাদের দিকে। বড় হওয়ার সময় আমি সেটাই বিশ্বাস করতাম, যা আমাকে শেখানো হতো, ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করতাম। আমি বিশ্বাস করতাম, বাইবেল হলো স্রষ্টার একমাত্র সত্য বাণী, এটা ছিল স্রষ্টার নির্ভুল বাণী। যেমন মুসলিমরা কুরআন সম্পর্কে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসগুলোই ছিল আমার ধর্মীয় চিন্তার মূল। কিন্তু এগুলোই একসময় আমাকে খ্রিষ্টধর্ম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, যখন আমি বাইবেল নিয়ে পড়ি এবং বুঝতে পারি, এটা বাইবেলের শিক্ষা নয়। বাইবেল ত্রিত্ববাদ শেখায় না। যিশু ত্রিত্ববাদ শেখাননি। তাই বাইবেলও কোনো নির্ভুল গ্রন্থ নয়। এই গ্রন্থটি ভুলে ভরা। খ্রিষ্টধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করার মাঝের সময়টাতে আমি একরকম ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিলাম। আমি স্রষ্টায় বিশ্বাস করলেও ধীরে ধীরে নাস্তিক হলাম। আমি নাস্তিকতার সাথে স্রষ্টায় বিশ্বাস করতাম। আমি স্রষ্টায় অবিশ্বাস করতে কখনোই রাজি ছিলাম না, কারণ চারদিকে দেখছিলাম। আমার দাদা সবসময় আমাকে বলতেন, চিত্রশিল্পী ছাড়া কোনো চিত্রকর্ম হয় না, তাই না?
তাই, কোনো কারণ ছাড়াই সৃষ্টির অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তাই, আমি সবসময় স্রষ্টায় বিশ্বাস করতাম, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, স্রষ্টা এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করে নিজ গতিতে চলতে দিয়েছেন। মানে, তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি সৃষ্টি করে ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে দেখছিলেন কী হয়। আর আমি তখন ঈশ্বরের ওপর কিছুটা বিরক্ত হয়ে পড়ি, এক রকমের হতাশা জন্মে। কারণ আমি এদিকে-ওদিকে তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, কিন্তু তিনি দেখা দেন না। তখন আমি ধীরে ধীরে রাস্তার জীবনের দিকে ঝুঁকে পড়লাম, রেপ মিউজিক শুনতে শুরু করলাম। হিপহপ মিউজিকে আসক্ত হয়ে পড়লাম। আমি রেপের হিপহপ স্টাইলের জীবনধারায় ডুকে পড়েছিলাম। আর আমি একবার স্কুলে সমস্যায় পড়েছিলাম। আসলে আমি গ্রেপ্তারও হই সেই সময়। আপনি কেন গ্রেপ্তার হলেন?
বোকামি, স্পষ্টভাবে বলতে গেলে। কিন্তু আসলে, আমার রাগের জন্য আমি গ্রেপ্তার হই। আমি খুব রাগী তরুণ ছিলাম, যা ছিল শৈশবে নির্যাতিত হওয়ার ফল। আমার বাবা-মা আলাদা হয় খুব ছোটবেলায়। তিন মাস বয়সে মা আমাকে ছেড়ে যান। ছয় বছর ধরে তিনি আমার জীবনে ছিলেন না। ছয় বছর বয়সের আগে তাকে আমি দেখিনি। তো আমি বড় হই আমার বাবা কাছে আর পরে তিনি আবার বিয়ে করেন। আমার সৎ মা, তিনি ছিলেন আমার মায়ের স্কুলজীবনের শত্রু। আমর সৎ মা ছিলেন বধির, আর আমার মা...
তারা একই স্কুলে পড়েছেন। বধির হওয়ার কারণে আমার মা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতেন। আর, মায়ের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে, সৎ মা আমাকে নির্যাতন করতেন। শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে, সব দিক দিয়ে। আমার একমাত্র আবেগ ছিল রাগ। তাই আমার রাগ ছাড়া আর কোনো অনুভূতি ছিল না। আমি খুবই রাগী ছিলাম। আর সে সময় আমার ব্ল্যাকবেল্টও ছিল। তো, আমি ব্ল্যাক-বেল্টধারী ছিলাম। তখনই মার্শাল আর্টে প্রথম ব্ল্যাক-বেল্ট পেয়েছিলাম। এক রাতে আমরা দক্ষিণ ক্যারোলাইনার ছোট শহর পিকেনসে আমি মদ্যপ অবস্থায় ছিলাম। আমরা সেই ছোট শহরটির একটা ফোন বুথে গেলাম একদম নির্জন এলাকায়। সেখানে একজন তরুণ কথা বলছিলো। তো আমি তাকে ফোনটি রাখতে বললাম, “ইয়ো আমাকে কথা বলতে দাও। এরপর যাকে ইচ্ছা ফোন কর, কিন্তু এখন আমাকে একটু দাও।” সে বললো, “না।” সে এমন কিছু বললো, যাতে আমি বিরক্ত হই, রেগে যাই। এরপর আমি তাকে মারধর করি, তাকে মারধর করি, খুব বাজেভাবে। তো তাকে মারধর করি, তাকে মারধর করি, খুব বাজেভাবে। বহু দিন ধরে পুষে রাখা রাগকে বের করে দেয়া যাকে বলে, যেটা আপনি অনেক দিন ধরে চেপে রেখেছেন, তখন সেটা একেবারে বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে আসে। আমি সেই তরুণকে মেরে হাসপাতালে পাঠালাম। তারপর গ্রেপ্তার হলাম। জেল থেকে বের হলেন কিভাবে?
বের হইনি। তাহলে কী হলো? আপনি কিভাবে মুক্ত হলেন...
আমি বন্ড দিয়ে বের হয়েছিলাম। শহরটি খুব ছোট ছিল। মাত্র দুজন বিচারক ছিলেন। আর সেই তরুণ ছিল তাদের একজনের সন্তান। তো তারা আমার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনলেন। এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ ছিল। তারা হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনে। তো আমাকে বিচারের মুখোমুখি হতে বলা হলো। কারণ আমি কোনোভাবেই হত্যাচেষ্টার এই অভিযোগ স্বীকার করতাম না আর এজন্য আমি আদালতে গেলাম ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আর আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান ছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ, আমার দাদি একজন আইনজীবী ঠিক করলেন। আর তারা মামলাটিকে হালকা করতে পেরেছিলেন। যদিও এটা সত্যি যে আমি আগে কখনো সমস্যায় পড়িনি। এটাই প্রথম ঘটনা। কিন্তু তারা বিষয়টি প্রমাণ করতে চাচ্ছিলেন, কারণ ছেলেটি ছোট্ট শহরের বিচারকের ছেলে ছিল। তারা তাদের হত্যা-মামলার অভিযোগকে পরিবর্তন করে শুধু আঘাত ও মারধরের মামলা করে। পরে আমাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাহলে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কখন প্রশ্ন করতে শুরু করলেন?
১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মকালে। ১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মকালে, আমি খুটিয়ে খুটিয়ে বাইবেল পড়তে শুরু করি। আর আমি বিজ্ঞানও পড়ছিলাম কারণ, বব জোনস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এটা ছিল একটি বিখ্যাত বিবলিক্যাল কলেজ, সাউথ ক্যারোলাইনায় আমার নিজ শহর গ্রিনভিলে। এটি পুরো বিশ্বেই পরিচিত। আর আমার পড়াশোনার মূল বিষয় ছিল টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম, যার মাধ্যমে বাইবেলের সবচেয়ে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা হয়। তাই বাইবেলের গভীরে ঢুকে পড়ার ফলে আমি বুঝতে পারি, এটি আসলে... এমনকি একজন পণ্ডিতের দৃষ্টিকোণ থেকেও, এটা নিখুঁত গ্রন্থ নয়। এটা মানুষের রচিত একটি...
আর যেভাবে এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছেছে, তাতে অনেক বিকৃতি ঘটে গেছে। তো আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে, কোনোমতেই বাইবেল স্রষ্টার বাণী নয়, কারণ এটি নিখুঁত কোনো গ্রন্থ নয়। এবং এ কথাটাই আমি বলেছিলাম বব জোনস ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপককে। তার সাথে আমার আলোচনা হলো। তাকে একটি প্রশ্ন করলাম। যুক্তিসঙ্গত একটি প্রশ্ন। বললাম, স্রষ্টা কি নিখুঁত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, ঠিক আছে, যদি স্রষ্টা নিখুঁত হন, তাহলে স্বাভাবিকভাবে যা কিছু স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসে, তা নিজেও নিখুঁত হওয়া উচিত, তাই না? বললেন, হ্যাঁ। বললাম, তাহলে কি বাইবেল নিখুঁত?
বললেন, না। একজন নিখুঁত স্রষ্টার যদি কোনো গ্রন্থ থাকে, তাহলে তার গ্রন্থটিও নিখুঁত হতে হবে। যদি এটি নিখুঁত না হয়, এটি স্রষ্টার থেকে নয়। এর কিছু অংশ স্রষ্টার কাছ থেকে আসতে পারে, সেখানে মানুষ রচিত অংশও রয়েছে। আর আমরা যদি দুইয়ের মাঝে পার্থক্য করতে না পারি, তাহলে বলা যায় না, এই গ্রন্থটি আপনার বিশ্বাসের স্তম্ভ। এটাই যুক্তিসঙ্গত। এটাই ছিল আমার সমস্যা। খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলামের পথে আমার যাত্রা শুরু হয়। নিঃসন্দেহে সেটা ছিল একটি প্রেরণা। না হলে এটা কখনোই ঘটত না। অন্য ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনার কারণেই এটা ঘটেছে। কিন্তু আমি প্রমাণ খুঁজছিলাম। আমি জীবনের এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলাম যে আমি আর কোনোভাবেই ঠকতে চাইনি। ঠিক?
বিশ্বাস করতাম, স্রষ্টার কোনো ধর্ম থাকলে তার প্রমাণও থাকবে। আমাদের কাছে স্পষ্ট, বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রমাণ থাকবে। আমার দাদা আমাকে শিখিয়েছিলেন তখন তিনি ছিলেন না, আগেই মারা গেছেন। কিন্তু আমার মনে আছে তিনি বলেছিলেন, কেউ যদি বলে, সে সত্য বলছে, তাহলে তার কাছে প্রমাণ চাইবে, কারণ সত্যের সবসময়ই প্রমাণ থাকে। তাই আমি অন্য ধর্মের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছিলাম, ইহুদী, হিন্দু, বৌদ্ধ, তাওবাদের মতো সব ধর্ম। সব ধর্মই মনে হচ্ছিলো যেন, বিরোধপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করছিল। আমার মতে, স্রষ্টার অবশ্যই... শুধু প্রমাণ থাকলেই হবে না, বরং সেটিকে যৌক্তিক হতে হবে আর সহজ হতে হবে। এবং কিছু প্রমাণও থাকতে হবে, আর যেগুলোকে নিখুঁত হতে হবে। সেই পর্যায়ের না হলে আমি কোনো কিছুই গ্রহণ করতাম না। তাহলে আপনি কোনো বন্ধুর মাধ্যমে ইসলামের খোঁজ পেলেন?
আমি ইসলামের খোঁজ পাই... আমি বলব না যে সে আমার খুব ভালো বন্ধু ছিলো। সে আমার পরিচিত ছিল আর সে মুসলিমও ছিল বটে। আমি অনেকদিন পর সেটা জেনেছি। তার বাড়িতেই একদিন ধর্মের ধারণাটি উঠে আসে। সে জানায়, সে একজন মুসলিম। আমি অবাক হয়ে যাই, সে ছিল আফ্রিকান-আমেরিকান। আমার ধারণা ছিল, শুধু আরবরাই মুসলিম হয়। সে আমাকে শুক্রবারের জুমার নামাজে যেতে বলে। তো আমি ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আমার শহরের মসজিদে গেলাম সেখানে আমি খুতবা শুনলাম। খুবই সুন্দর খুতবা ছিল সেটি। খুবই সুন্দর। মিথ্যা বলব না। সেটি ছিল আল্লাহর ক্ষমা নিয়ে। কিন্তু তা আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। কারণ আমি ইতিমধ্যে অনেক সুন্দর সুন্দর খ্রিস্টীয় উপদেশও শুনেছিলাম। তাই আমি ইমামকে নামাজের পর বললাম, আপনার ধর্মের সত্যতার প্রমাণ আছে?
বললেন, হ্যাঁ। তিনি আমাকে তার অফিসে নিলেন আর একটি কোরআন দিলেন। আমি বললাম, এটা কি?
তিনি বললেন, আল্লাহর বাণী। বললাম, আমি এটি সম্পর্কে জানি। আগেও কয়েকবার এটা শুনেছি। বললাম, আমাকে নিজের মতো করে এটি বুঝতে দিন। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পড়ে দেখব কী হয়। তো আমি কোরআন পড়তে শুরু করলাম। আমি প্রথম সূরা শুরু করলাম। সূরা ফাতিহা আমার মনে হলো স্রষ্টার কাছে প্রার্থনার মতো। কিন্তু দ্বিতীয় সূরার দ্বিতীয় আয়াতটি আমাকে কোরআন পড়তে বাধ্য করে। সেখানে আছে, এটি সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো ভুল নেই। তাই আমি সেটিকে ভুল প্রমাণ করতে চাইলাম, কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, ইসলাম সত্য ধর্ম নয়। আর আমি সূরা বাকারায় আরো একটি চ্যালেঞ্জ পেলাম। তোমরা যদি এই গ্রন্থ নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে এটির মতো কিছু নিয়ে এসো। বুঝলেন তো, অথবা এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে হতো, এতে অনেক অসঙ্গতি দেখতে পেতে। অর্থাৎ গ্রন্থের একেবারে শুরুতেই এতোগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে...
পৃথিবীতে কোরআনের মতো কোরআনের মতো আর কোনো ধর্মীয় বাণী নেই। গ্রন্থটির সূচনা হয়েছে পাঠকদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে যে এতে কোনো অসঙ্গতি বা ভুল নেই। চেষ্টা করুন, দয়া করে প্রমাণ করুন। আমি বেশ ভালোভাবেই চ্যালেঞ্জটা নিলাম। আমি সেই পুরো সপ্তাহটি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কোরআন পড়ে কাটিয়েছি, শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার। রবিবার কোরআন শেষ করে আমি মুসলিম হয়ে যাই। এমনকি সেই প্রথম পড়াতেও, আমি পারিনি... এমনকি আলেমরাও এটা পুরোপুরি বুঝতে পারেন না, আর আমি পড়ছিলাম ইংরেজিতে। এই গ্রন্থতে এমন কিছু নিশ্চয়ই আছে, যার কারণে মনের অজান্তেই ভাবলাম, এটাই সেই গ্রন্থ। এতে নবীদের কথা বলা আছে, কিন্তু বাইবেলের মতো নবীদের নিয়ে আজগুবি কোনো কথা বলা হয়নি, বুঝলেন?
বাইবেলে নবীদের সম্পর্কে আজগুবি সব কাহিনী বর্ণিত আছে। কোরআনে রবের একত্বের কথা বলা আছে। এতে যিশু ও তার প্রচারিত বার্তার কথা বলা হয়েছে। বাইবেলে এমনটাই খুজে পেয়েছিলাম। খুবই সহজ-সরল ছিল সেটি। এমন অনেককিছু আছে, যেগুলো আমার ধারনা ছিল না, কিন্তু সেগুলো ছিল সত্য। স্রষ্টা এক, তারই ইবাদত করা উচিৎ। বাইবেল থেকে আমার এমনই বিশ্বাস হয়েছিল। খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে অধ্যয়নের সময় আমি প্রায় লোকজনকে বলতাম, ওল্ড টেস্টামেন্টে স্রষ্টা বলেছেন, তিনি এক। কোরআনেও একই কথা বলছে। যখন আমি শেষের দিকে গেলাম, “বলুন তিনিই আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়।” এটাই সেই গ্রন্থ। সেখানে এমনইতো থাকার কথা ছিল। তাই আমি সোমবার মসজিদে গেলাম এবং মুসলিম হলাম। তারপর শুক্রবার সবার সামনে কালেমা শাহাদাত পড়লাম, ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে। কালেমা পাঠের সময় আপনার অনুভূতি কেমন হয়েছিল?
এই অনুভূতিকে এটাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সত্যি বলতে গেলে মানে এমন যে...ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি আপনার প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো আনন্দের। মানে, কোনো সত্যিকারের... এর উপযুক্ত কোনো শব্দ নেই। আমি যেন আমার গন্তব্য খুঁজে পেলাম, মানে বুঝলেন? আমার মনে হলো যেন, আমার আত্মায় বিরাজ করা সেই শূন্যতা যেন পূরণ হয়ে গেছে। কারণ এর আগে আমি অনেক কিছু দিয়ে সেটি পূরণ করতে চাচ্ছিলাম, বুঝলেন? কিছু দিন খ্রিস্টধর্মে ছিলাম, তারপর রাস্তা, পার্টি, এ ধরণের সবকিছু। মানুষকে বোঝাতাম, আত্মার সন্তুষ্টির জন্য...
কারণ ইসলামবিহীন সব মানুষের মনেই শূন্যতা থাকে। এটাই আমাদের প্রকৃত অবস্থা। আমি মানুষকে বলতে চাইতাম, আপনি যদি ইসলাম ছাড়া অন্যকিছু দিয়ে সেটি পূরণ করতে চান, সেটি হবে সৈকতে গিয়ে বালু দিয়ে সমুদ্র ঢাকার চেষ্টার মতো। আপনি যত বালুই ঢালুন না কেন, আপনি কখনোই তা পূরণ করতে পারবেন না। কখনই না। প্রকৃত স্বভাবে ফিরে আসলেই সেটি কেবল পূরণ করা সম্ভব, আর সেটি হলো, রবের ইবাদত করা। আমার ভালো লাগলো, যেন শান্তি খুঁজে পেলাম। আমার সকল ক্রোধ, মনের সব উন্মাদনা যেন নিমিষেই শান্ত হয়ে গেল, যেন শূন্যতা পূরণ হলো। আপনার আশপাশের লোকদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
আমি বলব না যে অনেক মানুষ ছিল, ঘটনা হলো, আমার তখনকার বন্ধুদের থেকে আমি তাদের থেকে দূরে দূরে থাকতাম, কারণ তারা আমাকে সাহায্য করেনি। তারা আমার সাথে সেই রাত পর্যন্ত ছিল, যখন আমি সেই তরুণকে মারছিলাম। তারা আমাকে তিরস্কার করছিল। পুলিশ এলে, তারা আমাকেই কটুক্তি করল। তাই, আমি সবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলাম। আমার দাদি ও বাবাকে তখনই বলিনি যে আমি মুসলিম হয়েছি। আমি জীবনটাকে সুন্দর করতে চাচ্ছিলাম। আর এক মাস পর আমার দাদি যখন দেখলেন সবকিছু, তিনি সব দেখে বললেন, তোমার পরিবর্তন হয়েছে। আমার কথা বুঝছো? অর্থাৎ...
আমি ভদ্র ও মার্জিত হয়েছি। বেশি বেশি সাহায্য করছি, ভালো কাজ করার চেষ্টা করছি। তিনি বললেন, “কিভাবে সম্ভব?” তখন আমি তাকে বললাম, আমি মুসলিম হয়েছি। তার কথা ছিল, তোমার সাথে পুরোপুরি একমত নই, কিন্তু এটাই যদি তোমার পরিবর্তনের কারণ হয়, তাহলে এটাতেই কর। আর আমার বাবা বললেন, তুমি বড় হয়েছ। তোমার সিদ্ধান্ত নিতে পার। তুমি এটা নিয়েই থাক। আমি ২৫ বছর ধরে মুসলিম। এখনো বাবার সাথে কথা হয়। ২৫ বছর ধরে তাকে দাওয়াত দিচ্ছি। তিনি এখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। আল্লাহ তাকে হেদায়েত দিক। কিন্তু তিনি খুবই খুশি যে আমি মুসলিম। তিনি বলেন, ইসলাম তোমাকে তোমার সেরা অবস্থায় নিয়ে এসেছে। তিনি মানুষকে গর্ব করে বলেন যে, “আমার ছেলে মুসলিম, সে সারা বিশ্ব ঘুরে ঘুরে মানুষকে সাহায্য করে। দাতব্য কাজে জড়িত। সে উদ্বাস্তু শিবিরে যায়।” এ পর্যন্ত আমার শহরে দুইবার বক্তৃতা দিয়েছি, প্রতিবারই বাবা প্রথম সারিতে ছিলেন। তিনি এসে প্রথম সারিতে বসতেন। আমি নতুন মুসলিমদের এটাই বলি। মানুষকে বলে বেড়ানোর দরকার নেই, বরং কাজই যেন বলে, তোমার কাজই যেন বলে, তুমি মুসলিম হয়েছো। এটাই হলো পার্থক্য। আপনি কি এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন যেখানে মণে হয়েছে যে, আল্লাহর সাথে আপনার বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে?
আমি যখন জেল থেকে বাইরে আসি, একটা চাকরির খুব জরুরি দরকার ছিল। আমি যদি আমার কোনো কাজের জন্য বাদ পড়ি, সেটি আমার পরীক্ষামূলক সময়ের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। তাহলে আমাকে আবারও দুই বছরের জন্য জেলে যেতে হবে। তাই জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর, আমি কন্সট্রাকশনের একটি চাকরি পাই। প্রথম শুক্রবারে আমি আমার বসকে বললাম, সবাই যখন দুপুরের খাবার খায়... কারণ এক ঘণ্টা দুপুরের খাবারের বিরতি ছিল। বললাম, আমি দুপুরের খাবারের পরিবর্তে... জায়গাটি তিন মাইল দূরে ছিল, আমি বললাম, আমি জুমার নামাজ পড়তে যাব। তারা জানত আমি মুসলিম এবং আমি কর্মস্থলেই নামাজ পড়তাম। বললাম, আমি জুমার নামাজ পড়তে যাব। বললেন, তোমার কর্মস্থল ত্যাগ করার অনুমতি নাই আমি বললাম, এটাতো...
আমি আসলে অনুমতি চাচ্ছি না। আমি শুধু আপানকে জানাচ্ছি। এরপর বললেন, তুমি যদি কর্মস্থল ত্যাগ করো, তোমাকে চাকরিচ্যুত করা হবে। তাই চাকরি করতে হলে আল্লাহর অবাধ্য হতে হবে। অথবা জুমার নামাজ পড়লে আমি আমার চাকরি হারাব। আমি বললাম, আপনি জানেন কি? আমি চার বছর জেলে থেকে দ্বীন জেনে সঠিক কাজ করতে শিখেছি। আমি সঠিক কাজটিই করলাম। তো ছেড়ে দিলাম। আপনার চাকরি থাক, আমি গেলাম। আমি জুমার নামাজে গেলাম। এবং আমি সেই জুমায় অনেক দোয়া করলাম, হে আল্লাহ, আমি তোমার জন্যই এখানে এসেছি। তাই, আমাকে সাহায্য করো। জুমার পর এক তরুণ আমার কাছে এলো। বলল, “ভাই, আপনার কি চাকরি আছে?” আমি বললাম, “একটু আগেও ছিল। আমি কর্মস্থল ত্যাগ করেছি এবং চাকরি ছেড়ে এখানে এসেছি।” তিনি বললেন, তার বাবা ইমাম ছিলেন...
তিনি এসে বললেন, “আমার বাবা বলেছেন আপনি কি তার পিজ্জার দোকানে কাজ করতে চান?” বললাম, “অবশ্যই, আমার চাকরি দরকার।” তো সেদিন থেকেই আমার চাকরি শুরু হলো। যার বেতন ছিল দ্বিগুণ, যেটা আমি কন্সট্রাকশন কম্পানিতে পেতাম। আগের চাকরি ছেড়ে নতুন চাকরি পেতে আমার সময় লেগেছে দুই ঘণ্টা। আল্লাহর জন্য বিনীতভাবে কিছু করলে, তিনি আপনার জন্য পথ খুলে দেবেন। তো সঠিক কাজ করাটা অনেক সময় ভয়ংকর হতে পারে, সেটি ছিল অন্যতম সুন্দর একটি রাত, সেটা আমার সারাজীবন মনে থাকবে। নবী (সা.)-এর কোন দিকটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?
তাঁর ভালোবাসা আমাদের আর উম্মাহর জন্য। মানে সেটা আসলে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। উম্মাহর জন্য তার যে অসীম ভালোবাসা ছিল, প্রত্যেক নবীরই একটি করে দোয়া ছিল, যা দিয়ে তাঁরা ইচ্ছা মতো চাইতে পারত। তাঁদের যেকোনো চাওয়াই পূরণ হয়েছে। আমাদের নবী (সা.)-এর অনেক সময় এই দোয়ার দরকার ছিল। চাচা আবু তালিব অমুসলিম থেকেই মৃত্যুবরণ করেন। বদরের যুদ্ধের পূর্বে, উহুদের যুদ্ধের সময়, আপনি জানেন খন্দকের যুদ্ধে মদিনায় যখন... এমন অনেক সময় ছিল, যখন তিনি সেই দোয়ার উত্তম ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বললেন, না, আমি এটি রেখে দেব। তিনি কার জন্য এটি করলেন?
আমাদের জন্য। তিনি বললেন, আমি তোমাদের জন্য রেখেছি। বিচারের দিন আল্লাহ তাঁকে সামনে আসতে বলবেন এবং তিনি সিজদায় পড়ে যাবেন। আমরা এই বিখ্যাত ঘটনা জানি। এবং তিনি দীর্ঘ সময় সিজদায় পড়ে থাকবেন। আর আল্লাহ তাঁকে বলবেন, মাথা তুলুন এবং আমার কাছে চান। কারণ আপনার দোয়াটি অবশিষ্ট রয়েছে। আল্লাহ এই বিষয়টি জানেন। আপনি এই দোয়াটি করেননি। তো এখন আপনি কি চান? তিনি তো অনেককিছু চাইতে পারতেন। তখন তিনি কী বলবেন?
উম্মত, উম্মত। তিনি আমাদের জন্য দোয়া করবেন। তো এটা তাঁর উম্মাহর জন্য ভালোবাসা এবং উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ শুধু সাহাবিদের জন্য নয়, সবার জন্য। তিনি আমাদের এতটাই ভালোবাসেন যে তিনি আমাদের জন্য কত কষ্ট সয়ে গেছেন, কিন্তু তাও সেই দোয়াটির সুযোগ নেননি। কারণ তিনি জানতেন, আমাদের এই দোয়ার প্রয়োজন হবে। অনেক মানুষ ইসলামের কথা চিন্তা করে, কিন্তু তাদের কিছু প্রশ্ন আছে। তারা বলেন, ইসলাম গ্রহণ করলে কি আমাকে আমার সংস্কৃতি ত্যাগ করতে হবে, আরবদের মতো পোশাক পরতে ও দাড়ি রাখতে হবে? আমি কি নিজের সংস্কৃতি ত্যাগ না করেই একজন আমেরিকান মুসলিম হতে পারি?
মুসলিম হওয়ার জন্য আপনার নিজের পরিচয়, আপানর সাংস্কৃতিক পরিচয় ত্যাগ করতে হবে না। আপনাকে শুধু এর সাথে সম্পর্কিত ইসলামবিরোধী অংশ ত্যাগ করতে হবে। তাই আমার মুসলিম হওয়ার জন্য আমেরিকান পরিচয় ত্যাগ করতে হবে না। প্যান্ট, শার্ট, স্যুট, টাই পরাতে কোনো ধরণের সমস্যা নেই। তো আপনি নিজের পরিচয় ধরে রাখতে পারেন। ধরুন, আপনি আফ্রিকায় গেলেন। আপনি সেখানকার মুসলিমদের সংস্কৃতি দেখবেন। সেটি অনেক আলাদা। দক্ষিণ এশিয়াতে গেলেও একই অবস্থা দেখবেন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায়তেও তারা সংস্কৃতি ধরে রেখেছে, বরং ইসলাম সেটি বৃদ্ধি করেছে। আপনাকে একজন আরব বা পাকিস্তানি হতে হবে না। আপনি নিজের মতো থাকতে পারবেন। এমন অনেক খ্রিস্টান আছেন, যারা বলেন, প্রার্থনা করার সময় আমি স্রষ্টার সাথে এক ধরণের আধ্যাত্মিকতা অনুভব করি। তাই, আমার নতুন কিছুর দরকার নেই। এমন মানুষকে কী বলতে চাইবেন?
আধ্যাত্মিকতা, প্রতারণাও হতে পারে। কারণ এটি হলো একটি অনুভূতি। খ্রিস্টানরা এর পেছনেই ছুটছে। তারা সেই আধ্যাত্মিকতার পেছনে ছুটছে। সেই আধ্যাত্মিকতা আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। এটি প্রমাণভিত্তিক কোনো সংযোগ নয়। কারণ অনেকে এটা পায় ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। হিন্দুরাও একই কাজ করে। উইকানরা জাদুবিদ্যা দিয়ে একই কাজ করে। মাদকাসক্তরাও একই কাজ করে। একজন মদ্যপও একই কাজ করে। তারা এটাই করে যায়। আর ইসলামে আমরা তেমনটা করি না। ওই উচ্ছ্বাসটা আসে আবার চলে যায়। কখনো আপনার আধ্যাত্মিকতা বেশি হবে এবং কখনো কম হবে। নবী (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন, ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। আমরা আল্লাহর সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক চাই, যেহেতু তিনি ইবাদতের যোগ্য একমাত্র সত্ত্বা। আল্লাহর সাথে আমার সঠিক সম্পর্ক নির্ধারণের দায়িত্ব আমার নয়। ওহ, এটাকে ঠিক মনে হচ্ছে, তো ঠিকই আছে। এমনটা নয়...
ঐ শর্তগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এসব আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। আল্লাহ নির্ধারণ করেন আর আমরা অনুসরণ করি। তাই, আমরা তাঁর পছন্দ করা উপায়েই ইবাদত করি, আমাদের পছন্দ করা উপায়ে নয়। তো, কোনো খ্রিস্টান বলতে পারে, আপনি যিশুর দল ত্যাগ করলেন কেন? আমি করিনি, আমি এখন যিশুকে ঠিকভাবেই অনুসরণ করছি। আমি যিশুকে ত্যাগ করিনি, বরং খুঁজে পেয়েছি। পলকে ত্যাগ করেছি। আমি পলকে ত্যাগ করে যিশুকে অনুসরণ করেছি। কারণ, খ্রিস্টান শব্দের অর্থ হলো খ্রিস্টের মতো। যিশু একমাত্র সত্য প্রভুর ইবাদতকারী ছিলেন। আমিও এখন তা-ই করেছিলাম। একটা প্রশ্ন, আপনি বললেন, আপনি আপনার ছুরিকাঘাতকারীকে ক্ষমা করেছেন। আপনার সৎ মাকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন? হ্যাঁ, কিন্তু...
আমি তাকে ক্ষমা করেছি তার জন্য নয়। আমি তাকে একটি চিঠি লিখি, কারণ তিনি কখনো দোষ স্বীকার করেননি, তিনি কী করেছিলেন। তাকে দেখে মনে হতো, কিছুই ঘটেনি। যেন আমি এসব বানিয়ে বলেছি শিশুকালের। তাই, আমি তাকে ক্ষমা করে একটা চিঠি লিখি। আমি লিখি, আমি তাকে ক্ষমা করছি তার জন্য না। আমি নিজের জন্যই তাকে ক্ষমা করছি। কারণ, তিনি কখনই এমন আচরণ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। আমি বুঝতে পারলাম, তার প্রতি সেই রাগ ধরে রাখা, তিনি এখন আর আমাকে অত্যাচার করছেন না। বরং আমি নিজেকেই অত্যাচার করছিলাম। এবং এমনটা অনেকবার ঘটে। আমি প্রতিদিন কাউন্সেলিং এবং কোচিং করি। প্রতিদিন। আমি সেখানেই ছিলাম, আমার একটা সেশন ছিল, এখানে আসার ঠিক আগেই। তাদের অধিকাংশই মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত, যারা অপমাণ ও এ রকম জিনিসের মধ্য দিয়ে গেছেন। এবং আমি তাদের ব্যাখ্যা করলাম যে, এই ক্ষমাটা এটা আপনাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্যই। কারণ, তার মধ্যে এটা ছিল না...
আমি মনে করি না, আমার জীবনে সেই প্রভাব ফেলার অধিকার তার ছিল। আমি আর বলতে পারব না...আমি তাকে দোষ দেব না। শৈশবে আমার হওয়া নির্যাতনের জন্য আমি তাকে দোষ দিতে পারি না। সেটি শেষ হয়ে গেছে। ৩০ বছর আগেই সেটি শেষ হয়েছে। আমি নিজের ওপরই তেমনটি করছিলাম, তাই আমি সেটি ত্যাগ করি। হ্যাঁ আমি তাকে ক্ষমা করেছি, তাকে নিজের জন্যই ক্ষমা করেছি। আমরা আল্লাহর জন্য ক্ষমা করি। অবশ্যই এর পেছনে ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু আমি নিজের জন্যই তাকে ক্ষমা করি, কারণ আমি সেটি থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। সর্বশেষ, আপনাকে যদি কয়েক মিনিটের সুযোগ দেওয়া হয়, সারা বিশ্বের অমুসলিমদের উদ্দেশে কি বলতে চাইবেন?
আমি তাদের বলব, নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন এবং জীবনের উদ্দেশ্য অনুধাবন করুন। সবকিছুরই উদ্দেশ্য রয়েছে। এই পৃথিবীতে উদ্দেশ্যহীন কিছুই নেই। এতে আপনিও অন্তর্ভূক্ত। এখানে আপনি কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন। সেই উদ্দেশ্য খুঁজে বের করুন। আপনি নিজের উদ্দেশ্যকে জানুন। আর সেটি হলো স্রষ্টার ইবাদত করা। যিনি আপানকে সৃষ্টি করেছেন। তাই, আপনাকে এই বিষয় নিয়ে মারাত্মক ধরণের কিছু অনুসন্ধান করতে হবে। এবং নিশ্চিত করুন, আপনি যা বিশ্বাস করেন, তার পেছনে একটি কারণ রয়েছে। সেটা শুধু আপনার মা-বাবার শিক্ষা থেকে নয়, বা সংস্কৃতি কিভাবে পরিচালিত করে, সেরকম কিছু নয়। আপনার অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস পদ্ধতিকে আপনার বাছাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী বিষয়ে পরিণত করুন।