এক আরব কোটিপতি বিলাসী জীবন ছেড়ে ইসলামে - এক সাবেক খ্রিস্টানের ইসলাম গ্রহণ যা সিনেমাকেও হার মানাবে!
প্রকাশের তারিখ
আমি একটি ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছি। আমার মনে হয় না আল্লাহর সাথে আমার কোন সম্পর্ক ছিল। আমি লন্ডনের একটা ক্যাফেতে বসে ছিলাম। আমাদের সামনে দুজন তরুণ বসে ছিল। সে একটি সম্ভ্রান্ত, সবচেয়ে ধনী আর অত্যন্ত সম্পদশালী আরব পরিবারের সন্তান। আর ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আমার পুরো জীবন একেবারে ওলটপালট হয়ে গেল। কখনো প্রাইভেট জেট, প্রাইভেট প্লেনে ভ্রমণ করতাম। আমি কনকর্ডে ভ্রমণ করেছি। আমাদের ছিল ড্রাইভার, গৃহকর্মী, শেফ। মানে আপনি যেটা কল্পনা করতে ারেন সব। আর সত্যি বলতে সেই কথোপকথনগুলো আমার চিন্তাভাবনার ধরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। তাই আমি ইসলাম সম্পর্কে বই কিনতে শুরু করলাম। আর যত পড়তাম মানে বিষয়গুলো আমাকে অভিভূত করে দিত। সবকিছু একসাথে মিলিয়ে দেখলে আমার কাছে পুরোপুরি অর্থবহ লাগত। আর তখন মক্কার নামাজের সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল। শাইখ সুদাইস কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। আর সেটা হঠাৎ আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। আর আমি কাঁদতে শুরু করলাম। কাঁদলাম, কাঁদলাম, কাঁদতেই থাকলাম। তাই আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, "আমরা এখানে যা করছি তা হারাম। হয় আমরা বিয়ে করব, নয়তো আমাকে চলে যেতে হবে।" তখন সে আমাকে বলল, সে বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গেলাম, আমি আর পারব না। আসসালামু আলাইকুম সিস্টার প্যাট্রিসা ফ্র্যাঙ্কো। টোয়ার্ডস ইটারনিটিতে আপনাকে স্বাগতম। আমরা আপনাকে পেয়ে খুবই আনন্দিত। আমি শুরু করতে চাই এই প্রশ্ন দিয়ে, প্যাট্রিসা ফ্র্যাঙ্কোকে অনুগ্রহ করে আপনার জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলবেন?
ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। এখানে আসতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। নিজের কথা বলতে গেলে আমি একজন জার্মান রিভার্ট আমার বাবা আসলে একজন গ্রীক ছিলেন আর মা ছিলেন চেক। আমি একটি খ্রিস্টান তবে খুব উদার পরিবেশে বড় হয়েছি। বিশ বছর বয়সে আমি ইসলাম গ্রহণ করি। পঞ্চাশ বছর বয়সে আমি হেলথ সাইকোলজি পড়া শুরু করি। আর এরপর উনায়া নামের একটি সাপ্লিমেন্ট কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হই। আর আজ আমি একজন হেলথ অ্যাডভোকেট হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শেয়ার -করি। -ইসলামের আগে আপনার জীবন কেমন ছিল?
অনুগ্রহ -করে আমাদের সেই দিনগুলোতে নিয়ে যাবেন। -আমি একটি ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছি। তাই সেখানে আমি ক্যাথলিক ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়েছি। সেখানে নবীদের গল্প পড়তাম। আমি খুব ছোট থাকতেই আমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। আর আমি মায়ের কাছে বড় হই। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, ইস্টার ও বড়দিন উদযাপন করতেন। তাই আল্লাহ কোন না কোনভাবে সবসময় ছিলেন। আমি জানতাম তিনি আছেন কিন্তু কখনো গভীরে যাইনি। বিশ্বাস আসলে কি তা আমি কখনো সত্যি করে জানতে চাইনি। আমার মনে হয় না আল্লাহর সাথে আমার কোন সম্পর্ক ছিল। এগুলো বেশি ছিল ঐতিহ্য যা আমার জীবনের অংশ ছিল। যেমন বড়দিন উদযাপন করা আর অবশ্যই উপহার পেয়ে আমি সবসময় খুব খুশি হতাম। জার্মানিতে আসলে যারা কাজ করে আর নিজেদের খ্রিস্টান মনে করে তারা চার্চকে কর দেয়। কিন্তু আমার মাও একসময় চার্চ ছেড়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, "আল্লাহতে বিশ্বাস করার জন্য আমাকে টাকা দিতে হবে কেন?
কেন আমাকে এর জন্য কর দিতে হবে?" তাই আল্লাহতে বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তিনি চার্চ ছেড়ে দেন। আপনি প্রথম ইসলাম সম্পর্কে কিভাবে শুনলেন? আর আপনার যাত্রা কিভাবে শুরু হলো?
আসলে আমার মনে হয় আমার যাত্রাটা বেশ অস্বাভাবিক। এটা শুরু হয়েছিল গ্রীষ্মের ছুটিতে। আমি ভাষা শেখার কোর্সের জন্য ইংল্যান্ড গিয়েছিলাম। আর জার্মানিতে ফেরার আগের দিন আমি লন্ডনের একটা ক্যাফেতে আমার এক বান্ধবীর সাথে বসে ছিলাম। আর আমাদের সামনে দুজন তরুণ বসে ছিল। তারা আমাদের কাছে এলো। কথা বলা শুরু করলাম, ফোন নাম্বার আদান-প্রদান করলাম। আর ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে মোটামুটি আমার পুরো জীবনটা বদলে গেল, একেবারে ১৮০ ডিগ্রি। আমি তাদের একজনের সাথে যোগাযোগ রাখলাম। পরে সে আমাকে বলল যে সে একটি সম্ভ্রান্ত এবং সবচেয়ে ধনী ও অত্যন্ত সম্পদশালী আরব পরিবারের সন্তান। শেষ পর্যন্ত আমরা চার বছরেরও বেশি সময় একটা সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম। আর সেগুলো সত্যিই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত বছর। মানে আমি ছিলাম একজন জার্মান তরুণী। হঠাৎ করেই যেন রাজকন্যার জীবন কাটাচ্ছি। সবকিছুই যেন রূপকথার মতো লাগছিল। মানে প্রত্যেক মেয়েই তো রাজকন্যা হতে চায়, তাই না?
হ্যাঁ, আমাদের জীবনযাপন ছিল খুবই এক্সক্লুসিভ। সারা পৃথিবীতে ভিআইপি সার্ভিস, কখনো প্রাইভেট জেট, প্রাইভেট প্লেন। আমি কনকর্ডেও ভ্রমণ করেছি। আমাদের ছিল ড্রাইভার, গৃহকর্মী, শেফ। মানে যা আপনি কল্পনা করতে পারেন সবই। এমনকি আমি মাইকেল জ্যাকসনের সাথে দেখা করেছি। তখনকার আমার বয়ফ্রেন্ডের দামি স্পোর্টস কারের প্রতি ভীষণ ঝোঁক ছিল। তাই কখনো আমরা শুধু লন্ডনের রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়াতাম উজ্জ্বল রঙের রোলস রয়েসে করে অথবা সর্বশেষ মডেলের জাগুয়ার স্পোর্টস কারে করে কোন ক্যাফেতে যেতাম। সবকিছু ছিল অসাধারণ, একেবারে একটা পাগলাটে জীবনযাপন। আর আমরা লস অ্যাঞ্জেলেসেও ঘুরেছি হলুদ হার্লে ডেভিডসনে করে, হেলমেট ছাড়াই। হ্যাঁ, সবকিছু ছিল একদম পাগলাটে। তার পরিবার সবসময় আমার প্রতি খুব উদার ছিল। আর তাদের মধ্যে যে বিষয়টি আমি সবচেয়ে ভালোবাসতাম তা হলো তাদের শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন। যদিও সে ধর্মীয়ভাবে খুব বেশি অনুশীলন করত না তবুও তার মধ্যে ইসলামের অনেক মৌলিক মূল্যবোধ ছিল। তাই আমরা প্রায়ই ধর্ম, নারী, পুরুষ, সম্মান আর মর্যাদা নিয়ে কথা বলতাম। আহ!
আর সত্যি বলতে সেই কথোপকথনগুলো আমার চিন্তাভাবনার ধরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। মানে শুরুতে আমি ইসলাম সম্পর্কে খুব বেশি জানতাম না। আমার মাথায় সেই সাধারণ ধারণাগুলোই ছিল। নারীদের সম্মান করা হয় না, তারা কত অসহায় আর তাতে জোর করে ঢেকে রাখা হয়, বুঝলেন? কিন্তু সে যত বেশি বুঝিয়েছে ইসলামে নারীদের আসলে কতটা মর্যাদা দেওয়া হয় আর শালীনতাও যে এক ধরনের মুক্তি হতে পারে, আমি তত বেশি নিজের জীবনকে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। কারণ সত্যিই যদি সৌন্দর্য নির্ধারণ করে ফ্যাশন আর বিউটি ইন্ডাস্ট্রি তাহলে আমি কতটা স্বাধীন? আমার শরীরের কতটা কে দেখবে তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা কি আমার আছে? আমি কি সত্যিই এতটা স্বাধীন নাকি এটা শুধু ভ্রম?
আর যদি আমি সবকিছু না দেখানোর সিদ্ধান্ত নিই, যেমনটা বলতে পারেন চাকরির আবেদনের সময়, মানে বাইরের সৌন্দর্য কি সত্যিই সত্যিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার ভেতরের মূল্যবহত গুণাবলীর চেয়ে?
আর সময়ের সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম পশ্চিমা নারীরা পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে, পুরুষের মতো হতে চাইছে। কারণ নারী হিসেবে তারা সত্যিকার অর্থে প্রাপ্য মূল্য ও অধিকার পায় না। আর সেখান থেকেই আমার ভেতরের যাত্রাটা আসলে শুরু হয়। এই উপলব্ধি থেকে যে চিন্তা করার, জীবনযাপনের আর বিষয়গুলো দেখার আরেকটি পথ আছে। আর তখন যখন আমি মাঝে মাঝে তার নিজ দেশে যেতাম সেখানে বেশ একঘেয়ে লাগত। তখন সোশ্যাল মিডিয়া বা এমন কিছু ছিল না। আর করার মতো তেমন কিছু ছিল না। তাই আমি বই কিনতে শুরু করলাম। আর ইসলাম সম্পর্কে সেই পুরনো ধাঁচের বড় বড় ভিএইচএস টেপ, সেখানে এইগুলোই পাওয়া যেত। আর সেই সময়ে শাইখ আহমেদ দিদাত এবং প্রফেসর জেফ্রি ল্যাং তারাই ছিলেন বিখ্যাত দাওয়াহ ব্যক্তিত্ব।তাই আমি তাদের কিছু লেকচার দেখলাম। বিজ্ঞানীদের ইসলাম গ্রহণের ভিডিও দেখলাম। আমি কোরআনের মোজেজা সম্পর্কে ভিডিও দেখলাম। আর যত দেখতাম, যত পড়তাম, তত বুঝতে পারতাম এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উৎস থেকে আসতে পারে না। মানে চৌদ্দশ্য বছরেরও বেশি আগে মরুভূমির একজন নিরক্ষর মানুষ সমুদ্রের গভীরের অগ্নিশিখা সম্পর্কে জানতে পারতেন না। অথবা পাহাড়ের গভীর শিকড় আছে যা পৃথিবীর ভূ-ত্বককে স্থিতিশীল রাখে। অথবা সূর্য নিজ আলো উৎপন্ন করে আর চাঁদ শুধু তা প্রতিফলিত করে। মানে এটা আমাকে একেবারে অভিভূত করেছিল। এরপর আমি আরও গভীরে গেলাম। আমি ধর্মগুলোকে তুলনা করতে শুরু করলাম। কারণ ভাবলাম তাহলে খ্রিস্ট ধর্মের ব্যাপারটা কি?
আর এটি ছিল আসলে আমার জীবনে প্রথমবার যখন আমি সত্যি করে আল্লাহর ধারণা খুঁজতে শুরু করি। আমি বাইবেল পড়া শুরু করলাম। এটাই ছিল প্রথমবার। আর আমি শায়খ আহমেদ দিদাতের অনেক বিতর্ক দেখলাম। তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী। বাইবেলের আয়াত ও কোরআনের আয়াত, ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ তুলনা করার ক্ষেত্রে মূল শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল অত্যন্ত গভীর। তখন আপনি বুঝতে পারেন, ঈসা আলাইহিস সালামের মূল শিক্ষাও ছিল এক আল্লাহর ইবাদত করা। মানে তিনি কখনো বলেননি যে তিনি তিনের একজন। তিনি কখনো নিজেকে আল্লাহ দাবি করেননি। তাই অনেক পরে বিষয়গুলো বদলে গেছে। কিন্তু মূল শিক্ষাটা আসলে একই। আর তার নামাজ পড়ার পদ্ধতি, তার রোজা রাখা, শুকরের মাংস না খাওয়া মানে এমন আরও অনেক, অনেক বিষয়। অথবা মারিয়াম আলাইহিস সালাম, ঈসা আলাইহিস সালামের মা। তিনি তো আমাদের সবচেয়ে বড় আদর্শের একজন। আর বাইরের দিক থেকেও দেখুন, তাকে সবসময় আবৃত দেখানো হয়। তাই যেমনটা বলছিলাম সবগুলো বিষয় একসাথে মিলিয়ে দেখলে হঠাৎ সবকিছু অর্থবহ হয়ে ওঠে। হঠাৎ সবকিছু বুঝতে পারি। আর একসময় আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বুঝতে পারলাম। বার্তাগুলো সবসময় একই ছিল। উৎস সবসময় একই ছিল। আদম থেকে মুসা, ঈসা আর মুহাম্মদ সবার উপরে শান্তি বর্ষিত হোক। তখন আমি বুঝলাম আমাকে ধর্মগুলোর মধ্যে বেছে নিতে হবে না। কারণ আমি মুসলিম হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমি বিশ্বাস করি খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদি ধর্মের সত্যিকারের শিক্ষায়। মানে একজন মুসলিম মুসলিমই থাকে না যদি সে ঈসা, মুসা এবং তাদের আগে সবাইকে বিশ্বাস না করে। তাই সবকিছু একসাথে মিলিয়ে দেখলে আমার কাছে পুরোপুরি অর্থবহ লাগলো। অন্যদিকে আমি বিষয়গুলো খুব গভীরভাবে অনুভবও করি। আর ইসলাম আমার দুই দিককেই সত্যি স্পর্শ করেছিল। তারপর তার দেশে ঘটেছিল সেই খুব, খুব বিশেষ মুহূর্ত। আর আজও যেন চোখের সামনে ভাসছে। আমি টিভি চালাতে চাইলাম। তাই রিমোট নিলাম। টিভি জ্বালালাম। আর সেখানে মক্কার নামাজের সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল। আর আমার মনে হয় সেদিনই প্রথম আমি সত্যিই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। শায়খ সুদাইস কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। আর তার কন্ঠ কিভাবে কেঁপে উঠেছিল আমি তা কখনো ভুলবো না। প্রতিটি শব্দে আপনি আল্লাহর প্রতি ভয়, ভক্তি ও ভালোবাসা অনুভব করতে পারতেন। তারপর আমি সেইসব মুসলিমদের দিকে তাকালাম। তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল, রুকু করছিল, একত্রিত হয়ে আল্লাহর সামনে নিজেদের বিনীত করছিল। আর তাদের কেউ কেউ কাঁদছিল। আর হঠাৎ সেটা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। আর আমি কাঁদতে শুরু করলাম। কাঁদলাম, কাঁদলাম আর কাঁদতেই থাকলাম। তিনি কি বলছিলেন আমি তার একটা শব্দও বুঝিনি। মনে হয় আমার হৃদয় বুঝেছিল। আমার আত্মাও বুঝেছিল। আমার মনে হয় এটা যেন এমন একটি শিশু তার মায়ের কথার অর্থ বোঝে না কিন্তু তাকে চিনতে পারে। আর ঠিক এমনটাই অনুভূত হয়েছিল। সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গেলাম আমি শুধু জানতাম আল্লাহ সত্যিই আছেন। আর তিনিই -একমাত্র সত্য। -আর শাহাদা গ্রহণের সময় আপনার অনুভূতি কেমন -ছিল?
-আমি জার্মানিতে ফিরে গিয়ে একটা ছোট উঠানের মসজিদে যাই। ইমাম খুব ভালো ছিলেন। তিনি হাসলেন। আমাকে স্বাগত জানালেন। আমরা সবাই মেঝেতে বসলাম গোল হয়ে। আর তিনি আমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। আমি ইসলাম সম্পর্কে জানি কিনা? আমাকে বাধ্য করা হয়েছে কিনা? নাকি আমি স্বেচ্ছায় এটি করছি? আর তারপর তিনি আমাকে শাহাদা পড়তে বললেন। আর আমার আজও মনে আছে আমি অবিশ্বাস্য রকম হালকা অনুভব করছিলাম। যেন গভীর, গভীর এক স্বস্তি। যেন আমার আত্মা বলছিল, "আহ, অবশেষে।" তাহলে ইসলাম গ্রহণের পর আপনার সম্পর্ক কিভাবে এগোলো? আপনি কি তাকে জানিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, আমি তাকে জানিয়েছিলাম। আর সেও সেটা বুঝতে পেরেছিল। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার প্রতি আমার ভালোবাসা দিন দিন বাড়ছিল। আমি রোজা রাখতে শুরু করলাম। নামাজ পড়তে শুরু করলাম। কিন্তু এতে আমার সেই চাকচিক্যময় রাজকন্যার জীবনে আমি ক্রমেই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। কারণ হিজাব পরে নাইট ক্লাবে যাওয়া আসলে কোন মানেই হয় না, তাই না?
তাই শুরুতে আমি একটা সমঝোতা খুঁজে নিতে চেয়েছিলাম। জার্মানিতে থাকলে আমি হিজাব পরতাম। আর তার সঙ্গে থাকলে তা খুলে ফেলতাম। সে এতেই সন্তুষ্ট ছিল। সে বলেছিল আমি তার সঙ্গে থাকলে সে চায় না আমি হিজাব পরি। আমি বললাম ঠিক আছে। কিন্তু অন্তরের গভীরে এটা একদম ঠিক লাগছিল না। এটা আমার হৃদয়ে ভীষণ দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল। কারণ একই সময়ে দুটি আলাদা জীবনে বাঁচা আর সুখী থাকা সম্ভব না। সময় যেতে যেতে আমি বুঝতে পারলাম আল্লাহর যত কাছে অনুভব করতাম, আমার আর তার মধ্যে দূরত্ব তত বেশি অনুভব করতাম। আর তারপর, তারপর একটা ঘটনা ঘটলো। আর আমি বুঝলাম এটাই হয়তো শেষ। আমি ইসলাম সম্পর্কে আরও বেশি পড়ছিলাম, শেখার চেষ্টা করছিলাম। আর মনে আছে আমি বইটি বন্ধ করলাম। আর ভাবলাম ঠিক আছে, এখানে সত্যিই কিছু ভুল হচ্ছে। আমি আর এটা করতে পারব না। এটা আর আমি উপেক্ষা করতে পারব না। তাই তখন আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, "আমরা এখানে যা করছি তা হারাম। আর আমি এভাবে আর চালিয়ে যেতে পারব না। হয় আমরা বিয়ে করব নয়তো আমাকে চলে যেতে হবে।" তখন সে আমাকে বলল সে বিয়ের জন্য প্রস্তুত না। কিন্তু আমরা আগের মতোই চালিয়ে যেতে পারি। আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গেলাম আমি পারব না। আমি আর পারব না। তাই তখন আমি আমার ব্যাগ গোছালাম আর চলে এলাম। তাহলে আপনি যখন বাড়ি ফিরলেন, চার বছরের সম্পর্ক ছেড়ে এলেন, তখন আপনার কেমন অনুভূতি -ছিল?
-ওটা সত্যিই ভয়ঙ্কর সময় ছিল। ওটা ছিল একটা বিপর্যয়। কারণ আমি বাড়ি ফিরলাম। আর মায়ের সঙ্গেও থাকার মতো আমার কোনো জায়গা ছিল না। আমি কী করব? আমার জীবন নিয়ে আমি কী করব? কারণ আমি শুধু হাই স্কুল শেষ করেছি। কিন্তু এখনও কোনো শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নেই নি। আর ভ্রমণ নেই, প্রাইভেট জেট নেই, VIP সার্ভিস নেই, কিছুই নেই। নিজের বাড়িতেই আমি যেন অতিথির মতো অনুভব করতাম। কারণ আমি শুধু এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ বা তিন সপ্তাহ থাকতাম না। আগে তো আসা যাওয়া করতাম। কিন্তু এবার থেকে থাকতে হবে। যেন ঠিক আছে, এখন থেকে চিরদিন। রান্না, ঘর পরিষ্কার সবকিছু এক টানা নিজের হাতে করতে হচ্ছে। আর এটা খুব কঠিন ছিল। আর উপলব্ধি করা যে ঠিক আছে, সব শেষ। আর এখন কী করব?
তাই আমি ভাবলাম ঠিক আছে, ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। কিন্তু কোনো কারণে আমি খুব বেশি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম, আহ! আমি কি সত্যিই এটা করতে পারব? আর তার খুব অল্প সময় পরেই আসলে আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়। তাই আমি সত্যিকার অর্থে তেমন কিছুই শুরু করিনি। ইসলামী জীবনধারা গ্রহণ করা আপনার জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?
যেমন হারাম থেকে দূরে থাকা -আর দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। -হ্যাঁ সত্যি বলতে আমি এটাকে এত কঠিন মনে করিনি। কারণ আমি সত্যিই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম, আর আজও করি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের যে নির্দেশ দিয়েছেন তা প্রজ্ঞায় পূর্ণ। মানে, মানে এগুলো আছে সমাজের কল্যাণের জন্য। আর বিশেষ করে নারীর কল্যাণের জন্য, তার সুরক্ষার জন্য। কারণ সে অবশ্যই বেশি নাজুক অবস্থানে থাকে। ইসলামে নারীদের চৌদ্দশ্য বছরেরও বেশি আগে অনেক অধিকার দেওয়া হয়েছে। মানে উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকার, স্বামী বেছে নেওয়ার অধিকার, তালাকের অধিকার, নিজে উপার্জন করে নিজের অর্থ রাখার অধিকার, এমনকি নিজেকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব। মানে ইউরোপের নারীরা তো এসব অধিকার খুব সম্প্রতি পেয়েছে। তাই আপনার প্রশ্নে ফিরে আসি। ইসলামী জীবনধারা গ্রহণ করা যেমন হিজাব পরা সিদ্ধান্ত আসলে আমি বাসে বসে নিয়েছিলাম। আজও মনে আছে আমি বসে ছিলাম আর চারপাশের মানুষদের দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম মানুষের কথা বা চিন্তার কারণে আমি কি সত্যিই মাথায় এক টুকরো কাপড় পড়তে ভয় পাচ্ছি?
নাকি আল্লাহ কী ভাবেন ও বলেন সে ব্যাপারে আমার আরও বেশি চিন্তা করা উচিত? উত্তরটা আমার কাছে খুব পরিষ্কার ছিল। তাই পরদিন থেকেই আমি হিজাব পড়া শুরু করি। আর আমি খুবই নার্ভাস ছিলাম। মনে আছে আমার হৃদয় যেন ভু ভু ভু ভু ভু করে কাঁপছিল। কিন্তু আসলে এটা আমার ভাবনার চেয়ে অনেক সহজ ছিল। এটা আমাকে গভীর এক পূর্ণতার অনুভূতি দিয়েছিল। কারণ আমার ভেতরে যা ছিল আমি তা বাইরে প্রকাশ করছিলাম। আর হ্যাঁ, তাই হিজাবের সেই ধাপ দিয়ে শুরু করা আমার জন্য অনেক সহজ ছিল। আপনি কি কখনো এমন কোনো অসাধারণ মুহূর্ত অনুভব করেছেন যেখানে আল্লাহর সাথে বিশেষ -সংযোগ অনুভব করেছিলেন?
-ও হ্যাঁ, অনেকবার। যেমন আমার তালাকের পর আমার সন্তানরা আর আমাকে সবকিছু পুরোপুরি একা নতুন করে শুরু করতে হয়েছিল। টাকা নেই, সঞ্চয় নেই, চাকরি নেই, পরিবারের সহায়তা নেই। সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। আমাকে নতুন শহরে যেতে হলো, থাকার জায়গা খুঁজতে হলো। আর যারা কখনো ওই শহরে বাসা ভাড়া নিতে চেষ্টা করেছেন তারা জানেন এটা কতটা কঠিন। মানে তারা চায় আয়, জামানত, গ্যারান্টি সবকিছু চায়। আমার কাছে এর কোনোটাই ছিল না। আর সত্যিই অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও স্থিতিশীল আয় থাকা সত্ত্বেও একটা থাকার জায়গার জন্য হতাশ ভাবে খুঁজছিলেন। আল্লাহর কসম, এটা যেন মনে হচ্ছিলো মিশন ইম্পসিবল। আর আমার খুব ভালোভাবে মনে আছে আমি কম্পিউটারের সামনে বসে ছিলাম। আসলে ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখা শুরু করার পরিকল্পনা করছিলাম। আর সেই মুহূর্তে আমি পুরোপুরি আত্মসমর্পণ ও ভরসার অবস্থায় চলে গেলাম। আর বললাম, "ইয়া আল্লাহ, আমাকে পথ দেখান। আমাকে দেখিয়ে দিন কোথায় যাব। আর প্রথম যে জায়গাটা পাবো আমি সেটাই নেব। কারণ আপনি জানেন আমাদের জন্য কী উত্তম।" আর সেটা ছিল বৃহস্পতিবার। আমি প্রথমবারের মতো খোঁজা শুরু করলাম। আর নতুন মাত্র দেওয়া একটা বিজ্ঞাপন ছিল। একটা খুব সুন্দর বাড়ি। আমাদের সবার জন্য যথেষ্ট বড় আর ভাড়াও সাধ্যের মধ্যে। আমি বিজ্ঞাপনের লোকদের মেসেজ পাঠালাম। আর তারা বলল আমি শনিবার সকাল দশটা থেকে বারোটার মধ্যে যেতে পারি। তবে তারা সতর্ক করলো অনেক মানুষ আসতে পারে, তাই অনেক সময় নিয়ে আসবেন। আমি বললাম ঠিক আছে, অনুগ্রহ করে ঠিকানাটা দিন। শুক্রবার আমি ঠিকানাটা পেলাম। আর জানেন কি হলো?
লোকটি বিজ্ঞাপনে আগ্রহী সবার উদ্দেশ্যে একটা নোট যোগ করেছিল। অনুগ্রহ করে যারা আগ্রহী তারা আবার আমার সাথে যোগাযোগ করুন। কারণ সিস্টেম সব ইমেইল মুছে দিয়েছে। আমি ভাবলাম, হ্যাঁ, বিষয়টা খুব অদ্ভুত লাগলো। কিন্তু আমি আর বেশি ভাবলাম না। কারণ আমি কী পড়বো তা নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলাম। হিজাব নিয়ে আমি খুব অনিশ্চিত ছিলাম। ভাবলাম ঠিক আছে, আমি কি ঢিলেঢালা ভাবে হিজাব পড়বো? একটু পেছনের দিকে বুঝলেন? নাকি ঐতিহ্যগতভাবে সামনে রাখবো?
আমি খুব বেশি ধার্মিক মনে হতে চাইনি। আপনি জানেন আমরা তো জার্মানিতে আছি। এখানে বর্ণবাদ অনেক আছে। তারপর আমি বললাম, "ঠিক আছে, আল্লাহ সবকিছু আপনার হাতে। আর আমি ঐতিহ্যগতভাবেই হিজাব পড়বো। আর যদি এই সুন্দর বাড়িতে আমাদের থাকা নির্ধারিত থাকে তাহলে আপনি তা ঘটিয়ে দিন।" শনিবার সকালে আমার আরেকটি আগের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আর প্রচণ্ড যানজটের কারণে আমি বেশ দেরিতে পৌঁছালাম। দশটা পঁয়তাল্লিশে পরিবারটি দরজা খুললো, হাসলো আর বললো, "স্বাগতম। আপনি প্রথম এসেছেন।" আমার মনে আছে আমি ভাবছিলাম, "কী? এত মানুষ আসার কথা ছিল?" পরে আমি বুঝলাম বেশিরভাগ মানুষের ঠিকানা পায়নি কারণ তাদের ইমেইল মুছে গিয়েছিল। সুবহানাল্লাহ!
সংক্ষেপে বললে ভাড়াটেরা ঠিক করেছিল যাকে প্রথম তাদের ভালো লাগবে তাকেই বাড়িওয়ালার কাছে সুপারিশ করবে। সুবহানাল্লাহ!
আর সেদিন সকালে আমি ছিলাম প্রথম আগত ব্যক্তি যাকে তাদের ভালো লেগেছিল। তাই সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা বাড়িটি পেয়ে গেলাম। আর আল্লাহর কসম, এটা ছিল খুবই সুন্দর একটি বাড়ি। বড় বাগান, সুন্দর মুসলিম প্রতিবেশী। আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু কাছেই ছিল। আর সত্যিই প্রতিদিন আমি কৃতজ্ঞতায় অনেক অশ্রু ফেলেছি। কারণ অবশেষে আমি আমার সন্তানদের একটি শান্ত ও সুন্দর ঘর দিতে পেরেছিলাম।অনেক মানুষ বছরের পর বছর খোঁজে তবুও কোনো জায়গা পায় না। কিন্তু যখন আপনি সত্যিই নিজেকে ছেড়ে দেন, পুরোপুরি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে, শুধু তখনই আল্লাহ আপনাকে বহন করেন। আর এটা একটা অসাধারণ সুন্দর অনুভূতি। সেখানে পৌঁছানো সত্যিই খুব কঠিন। বোন পেট্রিসিয়া, আপনার ইসলামের পথে যাত্রা আপনার স্বাস্থ্য যাত্রাকে প্রভাবিত করেছে। অনুগ্রহ করে এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বলবেন?
বিশ বছরের বিষাক্ত দাম্পত্য জীবন আর সন্তানদের বড় করার পর আমি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। যেমনটা বললাম, আর আমার শরীর ভেঙে পড়েছিল। আমার অটোইমিউন রোগ হলো হাশিমোটো আর সোরিয়াসিস। আমার দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ছিল। আর আমি প্রতিটি দিন আর রাত সত্যি ব্যথায় কাটাতাম। এমন সময়ও ছিল যখন আমি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেও পারতাম না। আমাকে বসে পড়তে হতো। আমার চুল পড়া, হার্টের সমস্যা, ব্রেইন ফগ আর গভীর গভীর ক্লান্তি ছিল। আমি যতই ঘুমাতাম, যতই কফি পান করতাম কোনো লাভ হতো না। আর যখনই ডাক্তারের কাছে যেতাম তিনি শুধু বলতেন, "কেমন আছেন?" আর আমি অঝরে কাঁদতে শুরু করতাম। একবার তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনি এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গিয়ে পড়বেন। হয় বার্নআউট নিয়ে নয়তো ক্যানসার নিয়ে।" আর এটা আমাকে সত্যিই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। কারণ সেই সময়ে আমি ক্যানসার হওয়ার খুব ভয় পেতাম। সেই সময়েই আমি আবার আমার জীবনে এক অলৌকিক ঘটনা অনুভব করি। আমি আমার কম্পিউটারের সামনে কাজ করছিলাম আর আমার মা আমাকে খুশি করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি ফোনে বললেন, "ও, গিয়ে আমার ফেসবুক প্রোফাইল দেখো। আমি মজার কিছু পোস্ট করেছি।" আমি কখনো এমন কিছু করতাম না। কখনো না, কখনোই না, একেবারেই না। আমার কোনো সময়ই ছিল না। কিন্তু সেই মুহূর্তে খুব বিশেষ কিছু ঘটলো। আজও তা মনে আছে। সত্যিই মনে হলো কেউ যেন আমার হাতের উপর হাত রেখে মাউসটা ঠেলে দিচ্ছে। আমি মায়েরপ্রোফাইল-এ গিয়ে ক্লিক করলাম। একটু স্ক্রল করলাম। আর হঠাৎ একটা শিরোনাম চোখে পড়লো, "ক্যানসার-এর গবেষণায় যুগান্তকারী অগ্রগতি। বেড়ির মাধ্যমে ক্যানসার নিরাময়।" আর সেই মুহূর্ত থেকে আমি গবেষণায় ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর ডুব দিলাম। আমি সুস্থ শরীর পাওয়ার আশায় অতৃপ্ত তৃষ্ণায় ছিলাম। বোঝার জন্য আমি যেন একেবারে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি শুধু বুঝতে চাইতাম শরীর কিভাবে কাজ করে, কিভাবে সবকিছু একসাথে মিলিয়ে দেখা যায়। আর আমি শত শত সাপ্লিমেন্ট নিয়েছি। সব চেষ্টা করেছি, সব বদলেছি। আমি সারা বিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনুসরণ করেছি যারা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও অটোইমিউন রোগ সারানোর দাবি করতেন। আর আজ আমি এখানে আছি। আলহামদুলিল্লাহ। এটা কাজ করেছে আল্লাহর ইচ্ছাতেই। বায়োফিল্ম কি?
আর আপনি এখন কোন প্রকল্পে কাজ করছেন? আসলে বায়োফিল্ম মূলত আপনার অন্ত্রে এক ধরনের আঠালো ময়লা যে আপনাকে অসুস্থ করতে পারে। আর আমার অভিজ্ঞতায় প্রায় সবারই এটা থাকে। সম্ভবত আপনারও আছে। আর বলে রাখি বায়োফিল্ম নতুন কিছু নয়। ভাবুন আপনার সিঙ্ক-এর নিচের ড্রেইন পাইপ-এর কথা। ওখানে ভেতরের দেয়ালে সবসময় এক ধরনের পিচ্ছিল দুর্গন্ধযুক্ত স্তর জমে থাকে, তাই না?
আর ঠিক তেমনি এক ধরনের পিচ্ছিল স্তর আপনার অন্ত্রের নালীর ভেতরের দেয়ালেও তৈরি হতে পারে যেখানে আপনার ইমিউন সিস্টেম-এর সবচেয়ে বড় অংশ থাকে। আর এটা সত্যি বড় সমস্যা হতে পারে। আর আমি সত্যি বিশ্বাস করি স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বায়োফিল্ম সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়গুলোর একটি। এমনকি American Health Institute-এ প্রকাশিত গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয় আমাদের শরীরের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ৮০ পারসেন্ট পর্যন্ত Biofilm-এর সাথে জড়িত। এটা অবিশ্বাস্য। আমার অন্ত্র থেকে Biofilm দূর করা সবকিছু বদলে দিয়েছিল। আর আপনি যখন আমার Gut Clean System দিয়ে এটা দূর করবেন, আপনি আসলে এটাকে বের করে দিতে পারবেন এবং হাতে ধরেও দেখতে পারবেন। আমি এটা সত্যিই ভালোবাসি। আর আপনার অবশ্যই এটা চেষ্টা করা উচিত। আর সমস্যা হলো আজকে আমাদের যে জীবনযাপন, আমরা যে খাবার খাই, যে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাই এসবের মাধ্যমে আমরা ভালো bacteria-র বদলে খারাপ জীবাণুগুলোকে খাওয়াচ্ছি। তাই আপনি যদি Biofilm তৈরি ও বড় হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে চান তাহলে ভালো bacteriaগুলোকে খাওয়াতে থাকুন। ওরা প্রকৃতি ভালোবাসে, আসল খাবার ভালোবাসে, পরিপুষ্ট খাবার ভালোবাসে। যা কিছু প্রাকৃতিক আর পরিষ্কার তা খান। বাকি সব ছেড়ে দিন। তাহলে আপনি আপনার ভালো bacteriaগুলোকে খাওয়াচ্ছেন। তাহলে ইসলাম ও চিকিৎসা আপনার কাছে কি অর্থ বহন করে?
আমি, আমি সত্যিই বিশ্বাস করি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের এই অসাধারণ শরীর সৃষ্টি করেছেন। এটি যেন আমাদের এই জীবন পার করিয়ে নেয়। মানে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। আর আমার স্বাস্থ্য যাত্রায় একটি বিষয় আমি বুঝেছি যে আপনার শরীর সবসময় আপনাকে রক্ষা করারই চেষ্টা করে। আর আমি সত্যিই চাই চিকিৎসা ব্যবস্থা যেন মনোযোগ দেয় সেই নিরাময় প্রক্রিয়াগুলোকে সহায়তা করার দিকে যেগুলো আল্লাহ ইতিমধ্যেই আমাদের ভেতরে সৃষ্টি করে দিয়েছেন। শুধু লক্ষণগুলো চিকিৎসা করার বদলে শরীর কি করছে সেটা বোঝার চেষ্টা করি না কেন? মানে শরীর হঠাৎ করে Cholesterol বাড়ায় কেন? Insulin receptor হঠাৎ কম সাড়া দেয় কেন? হৃৎপিণ্ড চাপ বাড়ায় কেন? কে এসব প্রশ্ন করছে?
আর আপনি যদি সত্যিই কারণ খুঁজতে যান, আপনি অবাক হয়ে যাবেন। কারণ আপনার শরীর আপনাকে ব্যর্থ করছে না। বেশিরভাগ সময় এটি আসলে আপনাকে আরও খারাপ কিছু থেকে বাঁচাচ্ছে। আর এটা আমাকে সত্যিই দুঃখ দেয় যে আমরা মুসলিম হিসেবে এত স্পষ্ট নির্দেশনা পেয়েছি যে কি খেতে হবে আর কি খাওয়া যাবে না, এমনকি কতটা খেতে হবে সে সম্পর্কেও। আর আমি ভুল না করলে কোরআনে মাত্র চারটি আয়াতে হালাল খাবার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সবসময় তা তায়েব কিছুর সাথে মিলিয়ে বলা হয়েছে যার অর্থ হলো যা ভালো। তাহলে বলুন তো আজকাল সত্যিই ভালো কি? চিনি কি হালাল? হ্যাঁ। কিন্তু এটা কি আমাদের জন্য ভালো? না। মাংস খাওয়া কি হালাল? আশা করি। কিন্তু প্রতিদিন মাংস খাওয়া কি আমাদের জন্য ভালো?
না। আর প্যাকেটের উপর হালাল সিল থাকলেই তা তায়েব হয়ে যায় না। আর আমি সত্যিই মনে করি ইসলাম ও চিকিৎসা একসাথে চলা উচিত। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা প্রতিটি রোগের সঙ্গে তার নিরাময়ও সৃষ্টি করেছেন। আর বলে রাখি এই হাদিসটি আমার রান্নাঘরের তাকেই রাখা আছে আমাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে -বেশি মুগ্ধ করেছে?
-আমার মনে হয় তিনি সবসময় অত্যন্ত কোমল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সবসময় দয়ালু ছিলেন আর ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। কখনো কখনো যদি আমি কল্পনা করি সে সময় বেঁচে থাকা, সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলা, নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা, নিজের মর্যাদা ঝুঁকিতে ফেলা। আপনি সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলছেন। আপনি, আপনি সবকিছু হারাতে পারেন। তারপরও বন্ধুসুলভ, ভালোবাসাপূর্ণ এবং ন্যায়পরায়ণ থাকা মানে এটা, এটা সত্যিই, এটা মানুষের সাধ্যের বাইরে। যে কেউই খুব বিরক্ত হয়ে যেত, যে কেউই রাগে পাগল হয়ে যেত, যেকোনো মানুষই হয়তো অন্যায় আচরণ করা শুরু করত। আর তিনি তা করেননি।আর এমন ধৈর্য, এমন সাহস, এমন শক্তি থাকা এটা অসাধারণ। এটা, এটা শুধু তখনই সম্ভব যখন আপনি আল্লাহর নির্বাচিত একজন রসূল। অন্য কেউ এটা করতে পারত না। শেষ প্রশ্ন, যদি পৃথিবীর সব অমুসলিমদের সাথে আপনার এক মিনিট কথা বলার সুযোগ হতো, আপনি -তাদের কি বলতে চাইতেন?
-আমি সত্যিই চাইতাম, আমি কোরআন পড়ার সময় যা অনুভব করি, আপনারাও যদি তা অনুভব করতে পারতেন। কিছু আয়াত আমাকে সত্যিই অশ্রুসিক্ত করে দেয়। কারণ আমি উপলব্ধি করি এগুলো হলো স্রষ্টার বাণী। আর কোন মানুষ এভাবে কথা বলত না। আরেকটি অংশ আছে যা বিশেষভাবে আমাকে স্পর্শ করে। আল্লাহ যখন সৃষ্টির সব নিদর্শন আর চারপাশের সব প্রমাণ বর্ণনা করেন, তখন তিনি মানবজাতিকে একটা প্রশ্ন করেন। "তাহলে তোমরা কোথায় যাচ্ছ?" মানে আপনি লক্ষ্য অর্জনের পেছনে ছুটতে পারেন, নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারেন, ক্লান্ত করে ফেলতে পারেন, বাড়ি বানাতে পারেন, পরিবার গড়তে পারেন, আপনি গাড়ি কিনতে পারেন, দিনগুলো ভরে রাখতে পারেন, আরো বেশি পাওয়ার সংগ্রাম করতে পারেন। তারপর এক মুহূর্ত থামুন, চোখ বন্ধ করুন। আর যখন আপনার স্রষ্টা কোমলভাবে ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন, অনুভব করার চেষ্টা করুন, "তাহলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?"
ওয়ালাইকুম আসসালাম। আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। এখানে আসতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। নিজের কথা বলতে গেলে আমি একজন জার্মান রিভার্ট আমার বাবা আসলে একজন গ্রীক ছিলেন আর মা ছিলেন চেক। আমি একটি খ্রিস্টান তবে খুব উদার পরিবেশে বড় হয়েছি। বিশ বছর বয়সে আমি ইসলাম গ্রহণ করি। পঞ্চাশ বছর বয়সে আমি হেলথ সাইকোলজি পড়া শুরু করি। আর এরপর উনায়া নামের একটি সাপ্লিমেন্ট কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হই। আর আজ আমি একজন হেলথ অ্যাডভোকেট হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শেয়ার -করি। -ইসলামের আগে আপনার জীবন কেমন ছিল?
অনুগ্রহ -করে আমাদের সেই দিনগুলোতে নিয়ে যাবেন। -আমি একটি ক্যাথলিক স্কুলে পড়েছি। তাই সেখানে আমি ক্যাথলিক ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়েছি। সেখানে নবীদের গল্প পড়তাম। আমি খুব ছোট থাকতেই আমার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়। আর আমি মায়ের কাছে বড় হই। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, ইস্টার ও বড়দিন উদযাপন করতেন। তাই আল্লাহ কোন না কোনভাবে সবসময় ছিলেন। আমি জানতাম তিনি আছেন কিন্তু কখনো গভীরে যাইনি। বিশ্বাস আসলে কি তা আমি কখনো সত্যি করে জানতে চাইনি। আমার মনে হয় না আল্লাহর সাথে আমার কোন সম্পর্ক ছিল। এগুলো বেশি ছিল ঐতিহ্য যা আমার জীবনের অংশ ছিল। যেমন বড়দিন উদযাপন করা আর অবশ্যই উপহার পেয়ে আমি সবসময় খুব খুশি হতাম। জার্মানিতে আসলে যারা কাজ করে আর নিজেদের খ্রিস্টান মনে করে তারা চার্চকে কর দেয়। কিন্তু আমার মাও একসময় চার্চ ছেড়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, "আল্লাহতে বিশ্বাস করার জন্য আমাকে টাকা দিতে হবে কেন?
কেন আমাকে এর জন্য কর দিতে হবে?" তাই আল্লাহতে বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও তিনি চার্চ ছেড়ে দেন। আপনি প্রথম ইসলাম সম্পর্কে কিভাবে শুনলেন? আর আপনার যাত্রা কিভাবে শুরু হলো?
আসলে আমার মনে হয় আমার যাত্রাটা বেশ অস্বাভাবিক। এটা শুরু হয়েছিল গ্রীষ্মের ছুটিতে। আমি ভাষা শেখার কোর্সের জন্য ইংল্যান্ড গিয়েছিলাম। আর জার্মানিতে ফেরার আগের দিন আমি লন্ডনের একটা ক্যাফেতে আমার এক বান্ধবীর সাথে বসে ছিলাম। আর আমাদের সামনে দুজন তরুণ বসে ছিল। তারা আমাদের কাছে এলো। কথা বলা শুরু করলাম, ফোন নাম্বার আদান-প্রদান করলাম। আর ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে মোটামুটি আমার পুরো জীবনটা বদলে গেল, একেবারে ১৮০ ডিগ্রি। আমি তাদের একজনের সাথে যোগাযোগ রাখলাম। পরে সে আমাকে বলল যে সে একটি সম্ভ্রান্ত এবং সবচেয়ে ধনী ও অত্যন্ত সম্পদশালী আরব পরিবারের সন্তান। শেষ পর্যন্ত আমরা চার বছরেরও বেশি সময় একটা সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলাম। আর সেগুলো সত্যিই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত বছর। মানে আমি ছিলাম একজন জার্মান তরুণী। হঠাৎ করেই যেন রাজকন্যার জীবন কাটাচ্ছি। সবকিছুই যেন রূপকথার মতো লাগছিল। মানে প্রত্যেক মেয়েই তো রাজকন্যা হতে চায়, তাই না?
হ্যাঁ, আমাদের জীবনযাপন ছিল খুবই এক্সক্লুসিভ। সারা পৃথিবীতে ভিআইপি সার্ভিস, কখনো প্রাইভেট জেট, প্রাইভেট প্লেন। আমি কনকর্ডেও ভ্রমণ করেছি। আমাদের ছিল ড্রাইভার, গৃহকর্মী, শেফ। মানে যা আপনি কল্পনা করতে পারেন সবই। এমনকি আমি মাইকেল জ্যাকসনের সাথে দেখা করেছি। তখনকার আমার বয়ফ্রেন্ডের দামি স্পোর্টস কারের প্রতি ভীষণ ঝোঁক ছিল। তাই কখনো আমরা শুধু লন্ডনের রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়াতাম উজ্জ্বল রঙের রোলস রয়েসে করে অথবা সর্বশেষ মডেলের জাগুয়ার স্পোর্টস কারে করে কোন ক্যাফেতে যেতাম। সবকিছু ছিল অসাধারণ, একেবারে একটা পাগলাটে জীবনযাপন। আর আমরা লস অ্যাঞ্জেলেসেও ঘুরেছি হলুদ হার্লে ডেভিডসনে করে, হেলমেট ছাড়াই। হ্যাঁ, সবকিছু ছিল একদম পাগলাটে। তার পরিবার সবসময় আমার প্রতি খুব উদার ছিল। আর তাদের মধ্যে যে বিষয়টি আমি সবচেয়ে ভালোবাসতাম তা হলো তাদের শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন। যদিও সে ধর্মীয়ভাবে খুব বেশি অনুশীলন করত না তবুও তার মধ্যে ইসলামের অনেক মৌলিক মূল্যবোধ ছিল। তাই আমরা প্রায়ই ধর্ম, নারী, পুরুষ, সম্মান আর মর্যাদা নিয়ে কথা বলতাম। আহ!
আর সত্যি বলতে সেই কথোপকথনগুলো আমার চিন্তাভাবনার ধরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। মানে শুরুতে আমি ইসলাম সম্পর্কে খুব বেশি জানতাম না। আমার মাথায় সেই সাধারণ ধারণাগুলোই ছিল। নারীদের সম্মান করা হয় না, তারা কত অসহায় আর তাতে জোর করে ঢেকে রাখা হয়, বুঝলেন? কিন্তু সে যত বেশি বুঝিয়েছে ইসলামে নারীদের আসলে কতটা মর্যাদা দেওয়া হয় আর শালীনতাও যে এক ধরনের মুক্তি হতে পারে, আমি তত বেশি নিজের জীবনকে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। কারণ সত্যিই যদি সৌন্দর্য নির্ধারণ করে ফ্যাশন আর বিউটি ইন্ডাস্ট্রি তাহলে আমি কতটা স্বাধীন? আমার শরীরের কতটা কে দেখবে তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা কি আমার আছে? আমি কি সত্যিই এতটা স্বাধীন নাকি এটা শুধু ভ্রম?
আর যদি আমি সবকিছু না দেখানোর সিদ্ধান্ত নিই, যেমনটা বলতে পারেন চাকরির আবেদনের সময়, মানে বাইরের সৌন্দর্য কি সত্যিই সত্যিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমার ভেতরের মূল্যবহত গুণাবলীর চেয়ে?
আর সময়ের সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম পশ্চিমা নারীরা পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে, পুরুষের মতো হতে চাইছে। কারণ নারী হিসেবে তারা সত্যিকার অর্থে প্রাপ্য মূল্য ও অধিকার পায় না। আর সেখান থেকেই আমার ভেতরের যাত্রাটা আসলে শুরু হয়। এই উপলব্ধি থেকে যে চিন্তা করার, জীবনযাপনের আর বিষয়গুলো দেখার আরেকটি পথ আছে। আর তখন যখন আমি মাঝে মাঝে তার নিজ দেশে যেতাম সেখানে বেশ একঘেয়ে লাগত। তখন সোশ্যাল মিডিয়া বা এমন কিছু ছিল না। আর করার মতো তেমন কিছু ছিল না। তাই আমি বই কিনতে শুরু করলাম। আর ইসলাম সম্পর্কে সেই পুরনো ধাঁচের বড় বড় ভিএইচএস টেপ, সেখানে এইগুলোই পাওয়া যেত। আর সেই সময়ে শাইখ আহমেদ দিদাত এবং প্রফেসর জেফ্রি ল্যাং তারাই ছিলেন বিখ্যাত দাওয়াহ ব্যক্তিত্ব।তাই আমি তাদের কিছু লেকচার দেখলাম। বিজ্ঞানীদের ইসলাম গ্রহণের ভিডিও দেখলাম। আমি কোরআনের মোজেজা সম্পর্কে ভিডিও দেখলাম। আর যত দেখতাম, যত পড়তাম, তত বুঝতে পারতাম এটা আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উৎস থেকে আসতে পারে না। মানে চৌদ্দশ্য বছরেরও বেশি আগে মরুভূমির একজন নিরক্ষর মানুষ সমুদ্রের গভীরের অগ্নিশিখা সম্পর্কে জানতে পারতেন না। অথবা পাহাড়ের গভীর শিকড় আছে যা পৃথিবীর ভূ-ত্বককে স্থিতিশীল রাখে। অথবা সূর্য নিজ আলো উৎপন্ন করে আর চাঁদ শুধু তা প্রতিফলিত করে। মানে এটা আমাকে একেবারে অভিভূত করেছিল। এরপর আমি আরও গভীরে গেলাম। আমি ধর্মগুলোকে তুলনা করতে শুরু করলাম। কারণ ভাবলাম তাহলে খ্রিস্ট ধর্মের ব্যাপারটা কি?
আর এটি ছিল আসলে আমার জীবনে প্রথমবার যখন আমি সত্যি করে আল্লাহর ধারণা খুঁজতে শুরু করি। আমি বাইবেল পড়া শুরু করলাম। এটাই ছিল প্রথমবার। আর আমি শায়খ আহমেদ দিদাতের অনেক বিতর্ক দেখলাম। তিনি ছিলেন অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী। বাইবেলের আয়াত ও কোরআনের আয়াত, ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ তুলনা করার ক্ষেত্রে মূল শিক্ষার দিকে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল অত্যন্ত গভীর। তখন আপনি বুঝতে পারেন, ঈসা আলাইহিস সালামের মূল শিক্ষাও ছিল এক আল্লাহর ইবাদত করা। মানে তিনি কখনো বলেননি যে তিনি তিনের একজন। তিনি কখনো নিজেকে আল্লাহ দাবি করেননি। তাই অনেক পরে বিষয়গুলো বদলে গেছে। কিন্তু মূল শিক্ষাটা আসলে একই। আর তার নামাজ পড়ার পদ্ধতি, তার রোজা রাখা, শুকরের মাংস না খাওয়া মানে এমন আরও অনেক, অনেক বিষয়। অথবা মারিয়াম আলাইহিস সালাম, ঈসা আলাইহিস সালামের মা। তিনি তো আমাদের সবচেয়ে বড় আদর্শের একজন। আর বাইরের দিক থেকেও দেখুন, তাকে সবসময় আবৃত দেখানো হয়। তাই যেমনটা বলছিলাম সবগুলো বিষয় একসাথে মিলিয়ে দেখলে হঠাৎ সবকিছু অর্থবহ হয়ে ওঠে। হঠাৎ সবকিছু বুঝতে পারি। আর একসময় আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বুঝতে পারলাম। বার্তাগুলো সবসময় একই ছিল। উৎস সবসময় একই ছিল। আদম থেকে মুসা, ঈসা আর মুহাম্মদ সবার উপরে শান্তি বর্ষিত হোক। তখন আমি বুঝলাম আমাকে ধর্মগুলোর মধ্যে বেছে নিতে হবে না। কারণ আমি মুসলিম হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমি বিশ্বাস করি খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদি ধর্মের সত্যিকারের শিক্ষায়। মানে একজন মুসলিম মুসলিমই থাকে না যদি সে ঈসা, মুসা এবং তাদের আগে সবাইকে বিশ্বাস না করে। তাই সবকিছু একসাথে মিলিয়ে দেখলে আমার কাছে পুরোপুরি অর্থবহ লাগলো। অন্যদিকে আমি বিষয়গুলো খুব গভীরভাবে অনুভবও করি। আর ইসলাম আমার দুই দিককেই সত্যি স্পর্শ করেছিল। তারপর তার দেশে ঘটেছিল সেই খুব, খুব বিশেষ মুহূর্ত। আর আজও যেন চোখের সামনে ভাসছে। আমি টিভি চালাতে চাইলাম। তাই রিমোট নিলাম। টিভি জ্বালালাম। আর সেখানে মক্কার নামাজের সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল। আর আমার মনে হয় সেদিনই প্রথম আমি সত্যিই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। শায়খ সুদাইস কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। আর তার কন্ঠ কিভাবে কেঁপে উঠেছিল আমি তা কখনো ভুলবো না। প্রতিটি শব্দে আপনি আল্লাহর প্রতি ভয়, ভক্তি ও ভালোবাসা অনুভব করতে পারতেন। তারপর আমি সেইসব মুসলিমদের দিকে তাকালাম। তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল, রুকু করছিল, একত্রিত হয়ে আল্লাহর সামনে নিজেদের বিনীত করছিল। আর তাদের কেউ কেউ কাঁদছিল। আর হঠাৎ সেটা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। আর আমি কাঁদতে শুরু করলাম। কাঁদলাম, কাঁদলাম আর কাঁদতেই থাকলাম। তিনি কি বলছিলেন আমি তার একটা শব্দও বুঝিনি। মনে হয় আমার হৃদয় বুঝেছিল। আমার আত্মাও বুঝেছিল। আমার মনে হয় এটা যেন এমন একটি শিশু তার মায়ের কথার অর্থ বোঝে না কিন্তু তাকে চিনতে পারে। আর ঠিক এমনটাই অনুভূত হয়েছিল। সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গেলাম আমি শুধু জানতাম আল্লাহ সত্যিই আছেন। আর তিনিই -একমাত্র সত্য। -আর শাহাদা গ্রহণের সময় আপনার অনুভূতি কেমন -ছিল?
-আমি জার্মানিতে ফিরে গিয়ে একটা ছোট উঠানের মসজিদে যাই। ইমাম খুব ভালো ছিলেন। তিনি হাসলেন। আমাকে স্বাগত জানালেন। আমরা সবাই মেঝেতে বসলাম গোল হয়ে। আর তিনি আমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। আমি ইসলাম সম্পর্কে জানি কিনা? আমাকে বাধ্য করা হয়েছে কিনা? নাকি আমি স্বেচ্ছায় এটি করছি? আর তারপর তিনি আমাকে শাহাদা পড়তে বললেন। আর আমার আজও মনে আছে আমি অবিশ্বাস্য রকম হালকা অনুভব করছিলাম। যেন গভীর, গভীর এক স্বস্তি। যেন আমার আত্মা বলছিল, "আহ, অবশেষে।" তাহলে ইসলাম গ্রহণের পর আপনার সম্পর্ক কিভাবে এগোলো? আপনি কি তাকে জানিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, আমি তাকে জানিয়েছিলাম। আর সেও সেটা বুঝতে পেরেছিল। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার প্রতি আমার ভালোবাসা দিন দিন বাড়ছিল। আমি রোজা রাখতে শুরু করলাম। নামাজ পড়তে শুরু করলাম। কিন্তু এতে আমার সেই চাকচিক্যময় রাজকন্যার জীবনে আমি ক্রমেই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। কারণ হিজাব পরে নাইট ক্লাবে যাওয়া আসলে কোন মানেই হয় না, তাই না?
তাই শুরুতে আমি একটা সমঝোতা খুঁজে নিতে চেয়েছিলাম। জার্মানিতে থাকলে আমি হিজাব পরতাম। আর তার সঙ্গে থাকলে তা খুলে ফেলতাম। সে এতেই সন্তুষ্ট ছিল। সে বলেছিল আমি তার সঙ্গে থাকলে সে চায় না আমি হিজাব পরি। আমি বললাম ঠিক আছে। কিন্তু অন্তরের গভীরে এটা একদম ঠিক লাগছিল না। এটা আমার হৃদয়ে ভীষণ দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল। কারণ একই সময়ে দুটি আলাদা জীবনে বাঁচা আর সুখী থাকা সম্ভব না। সময় যেতে যেতে আমি বুঝতে পারলাম আল্লাহর যত কাছে অনুভব করতাম, আমার আর তার মধ্যে দূরত্ব তত বেশি অনুভব করতাম। আর তারপর, তারপর একটা ঘটনা ঘটলো। আর আমি বুঝলাম এটাই হয়তো শেষ। আমি ইসলাম সম্পর্কে আরও বেশি পড়ছিলাম, শেখার চেষ্টা করছিলাম। আর মনে আছে আমি বইটি বন্ধ করলাম। আর ভাবলাম ঠিক আছে, এখানে সত্যিই কিছু ভুল হচ্ছে। আমি আর এটা করতে পারব না। এটা আর আমি উপেক্ষা করতে পারব না। তাই তখন আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, "আমরা এখানে যা করছি তা হারাম। আর আমি এভাবে আর চালিয়ে যেতে পারব না। হয় আমরা বিয়ে করব নয়তো আমাকে চলে যেতে হবে।" তখন সে আমাকে বলল সে বিয়ের জন্য প্রস্তুত না। কিন্তু আমরা আগের মতোই চালিয়ে যেতে পারি। আর সেই মুহূর্তে আমি বুঝে গেলাম আমি পারব না। আমি আর পারব না। তাই তখন আমি আমার ব্যাগ গোছালাম আর চলে এলাম। তাহলে আপনি যখন বাড়ি ফিরলেন, চার বছরের সম্পর্ক ছেড়ে এলেন, তখন আপনার কেমন অনুভূতি -ছিল?
-ওটা সত্যিই ভয়ঙ্কর সময় ছিল। ওটা ছিল একটা বিপর্যয়। কারণ আমি বাড়ি ফিরলাম। আর মায়ের সঙ্গেও থাকার মতো আমার কোনো জায়গা ছিল না। আমি কী করব? আমার জীবন নিয়ে আমি কী করব? কারণ আমি শুধু হাই স্কুল শেষ করেছি। কিন্তু এখনও কোনো শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নেই নি। আর ভ্রমণ নেই, প্রাইভেট জেট নেই, VIP সার্ভিস নেই, কিছুই নেই। নিজের বাড়িতেই আমি যেন অতিথির মতো অনুভব করতাম। কারণ আমি শুধু এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ বা তিন সপ্তাহ থাকতাম না। আগে তো আসা যাওয়া করতাম। কিন্তু এবার থেকে থাকতে হবে। যেন ঠিক আছে, এখন থেকে চিরদিন। রান্না, ঘর পরিষ্কার সবকিছু এক টানা নিজের হাতে করতে হচ্ছে। আর এটা খুব কঠিন ছিল। আর উপলব্ধি করা যে ঠিক আছে, সব শেষ। আর এখন কী করব?
তাই আমি ভাবলাম ঠিক আছে, ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করি। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। কিন্তু কোনো কারণে আমি খুব বেশি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম, আহ! আমি কি সত্যিই এটা করতে পারব? আর তার খুব অল্প সময় পরেই আসলে আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা হয়। তাই আমি সত্যিকার অর্থে তেমন কিছুই শুরু করিনি। ইসলামী জীবনধারা গ্রহণ করা আপনার জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?
যেমন হারাম থেকে দূরে থাকা -আর দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। -হ্যাঁ সত্যি বলতে আমি এটাকে এত কঠিন মনে করিনি। কারণ আমি সত্যিই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতাম, আর আজও করি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের যে নির্দেশ দিয়েছেন তা প্রজ্ঞায় পূর্ণ। মানে, মানে এগুলো আছে সমাজের কল্যাণের জন্য। আর বিশেষ করে নারীর কল্যাণের জন্য, তার সুরক্ষার জন্য। কারণ সে অবশ্যই বেশি নাজুক অবস্থানে থাকে। ইসলামে নারীদের চৌদ্দশ্য বছরেরও বেশি আগে অনেক অধিকার দেওয়া হয়েছে। মানে উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকার, স্বামী বেছে নেওয়ার অধিকার, তালাকের অধিকার, নিজে উপার্জন করে নিজের অর্থ রাখার অধিকার, এমনকি নিজেকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব। মানে ইউরোপের নারীরা তো এসব অধিকার খুব সম্প্রতি পেয়েছে। তাই আপনার প্রশ্নে ফিরে আসি। ইসলামী জীবনধারা গ্রহণ করা যেমন হিজাব পরা সিদ্ধান্ত আসলে আমি বাসে বসে নিয়েছিলাম। আজও মনে আছে আমি বসে ছিলাম আর চারপাশের মানুষদের দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম মানুষের কথা বা চিন্তার কারণে আমি কি সত্যিই মাথায় এক টুকরো কাপড় পড়তে ভয় পাচ্ছি?
নাকি আল্লাহ কী ভাবেন ও বলেন সে ব্যাপারে আমার আরও বেশি চিন্তা করা উচিত? উত্তরটা আমার কাছে খুব পরিষ্কার ছিল। তাই পরদিন থেকেই আমি হিজাব পড়া শুরু করি। আর আমি খুবই নার্ভাস ছিলাম। মনে আছে আমার হৃদয় যেন ভু ভু ভু ভু ভু করে কাঁপছিল। কিন্তু আসলে এটা আমার ভাবনার চেয়ে অনেক সহজ ছিল। এটা আমাকে গভীর এক পূর্ণতার অনুভূতি দিয়েছিল। কারণ আমার ভেতরে যা ছিল আমি তা বাইরে প্রকাশ করছিলাম। আর হ্যাঁ, তাই হিজাবের সেই ধাপ দিয়ে শুরু করা আমার জন্য অনেক সহজ ছিল। আপনি কি কখনো এমন কোনো অসাধারণ মুহূর্ত অনুভব করেছেন যেখানে আল্লাহর সাথে বিশেষ -সংযোগ অনুভব করেছিলেন?
-ও হ্যাঁ, অনেকবার। যেমন আমার তালাকের পর আমার সন্তানরা আর আমাকে সবকিছু পুরোপুরি একা নতুন করে শুরু করতে হয়েছিল। টাকা নেই, সঞ্চয় নেই, চাকরি নেই, পরিবারের সহায়তা নেই। সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। আমাকে নতুন শহরে যেতে হলো, থাকার জায়গা খুঁজতে হলো। আর যারা কখনো ওই শহরে বাসা ভাড়া নিতে চেষ্টা করেছেন তারা জানেন এটা কতটা কঠিন। মানে তারা চায় আয়, জামানত, গ্যারান্টি সবকিছু চায়। আমার কাছে এর কোনোটাই ছিল না। আর সত্যিই অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও স্থিতিশীল আয় থাকা সত্ত্বেও একটা থাকার জায়গার জন্য হতাশ ভাবে খুঁজছিলেন। আল্লাহর কসম, এটা যেন মনে হচ্ছিলো মিশন ইম্পসিবল। আর আমার খুব ভালোভাবে মনে আছে আমি কম্পিউটারের সামনে বসে ছিলাম। আসলে ভাড়ার বিজ্ঞাপন দেখা শুরু করার পরিকল্পনা করছিলাম। আর সেই মুহূর্তে আমি পুরোপুরি আত্মসমর্পণ ও ভরসার অবস্থায় চলে গেলাম। আর বললাম, "ইয়া আল্লাহ, আমাকে পথ দেখান। আমাকে দেখিয়ে দিন কোথায় যাব। আর প্রথম যে জায়গাটা পাবো আমি সেটাই নেব। কারণ আপনি জানেন আমাদের জন্য কী উত্তম।" আর সেটা ছিল বৃহস্পতিবার। আমি প্রথমবারের মতো খোঁজা শুরু করলাম। আর নতুন মাত্র দেওয়া একটা বিজ্ঞাপন ছিল। একটা খুব সুন্দর বাড়ি। আমাদের সবার জন্য যথেষ্ট বড় আর ভাড়াও সাধ্যের মধ্যে। আমি বিজ্ঞাপনের লোকদের মেসেজ পাঠালাম। আর তারা বলল আমি শনিবার সকাল দশটা থেকে বারোটার মধ্যে যেতে পারি। তবে তারা সতর্ক করলো অনেক মানুষ আসতে পারে, তাই অনেক সময় নিয়ে আসবেন। আমি বললাম ঠিক আছে, অনুগ্রহ করে ঠিকানাটা দিন। শুক্রবার আমি ঠিকানাটা পেলাম। আর জানেন কি হলো?
লোকটি বিজ্ঞাপনে আগ্রহী সবার উদ্দেশ্যে একটা নোট যোগ করেছিল। অনুগ্রহ করে যারা আগ্রহী তারা আবার আমার সাথে যোগাযোগ করুন। কারণ সিস্টেম সব ইমেইল মুছে দিয়েছে। আমি ভাবলাম, হ্যাঁ, বিষয়টা খুব অদ্ভুত লাগলো। কিন্তু আমি আর বেশি ভাবলাম না। কারণ আমি কী পড়বো তা নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলাম। হিজাব নিয়ে আমি খুব অনিশ্চিত ছিলাম। ভাবলাম ঠিক আছে, আমি কি ঢিলেঢালা ভাবে হিজাব পড়বো? একটু পেছনের দিকে বুঝলেন? নাকি ঐতিহ্যগতভাবে সামনে রাখবো?
আমি খুব বেশি ধার্মিক মনে হতে চাইনি। আপনি জানেন আমরা তো জার্মানিতে আছি। এখানে বর্ণবাদ অনেক আছে। তারপর আমি বললাম, "ঠিক আছে, আল্লাহ সবকিছু আপনার হাতে। আর আমি ঐতিহ্যগতভাবেই হিজাব পড়বো। আর যদি এই সুন্দর বাড়িতে আমাদের থাকা নির্ধারিত থাকে তাহলে আপনি তা ঘটিয়ে দিন।" শনিবার সকালে আমার আরেকটি আগের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আর প্রচণ্ড যানজটের কারণে আমি বেশ দেরিতে পৌঁছালাম। দশটা পঁয়তাল্লিশে পরিবারটি দরজা খুললো, হাসলো আর বললো, "স্বাগতম। আপনি প্রথম এসেছেন।" আমার মনে আছে আমি ভাবছিলাম, "কী? এত মানুষ আসার কথা ছিল?" পরে আমি বুঝলাম বেশিরভাগ মানুষের ঠিকানা পায়নি কারণ তাদের ইমেইল মুছে গিয়েছিল। সুবহানাল্লাহ!
সংক্ষেপে বললে ভাড়াটেরা ঠিক করেছিল যাকে প্রথম তাদের ভালো লাগবে তাকেই বাড়িওয়ালার কাছে সুপারিশ করবে। সুবহানাল্লাহ!
আর সেদিন সকালে আমি ছিলাম প্রথম আগত ব্যক্তি যাকে তাদের ভালো লেগেছিল। তাই সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা বাড়িটি পেয়ে গেলাম। আর আল্লাহর কসম, এটা ছিল খুবই সুন্দর একটি বাড়ি। বড় বাগান, সুন্দর মুসলিম প্রতিবেশী। আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু কাছেই ছিল। আর সত্যিই প্রতিদিন আমি কৃতজ্ঞতায় অনেক অশ্রু ফেলেছি। কারণ অবশেষে আমি আমার সন্তানদের একটি শান্ত ও সুন্দর ঘর দিতে পেরেছিলাম।অনেক মানুষ বছরের পর বছর খোঁজে তবুও কোনো জায়গা পায় না। কিন্তু যখন আপনি সত্যিই নিজেকে ছেড়ে দেন, পুরোপুরি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে, শুধু তখনই আল্লাহ আপনাকে বহন করেন। আর এটা একটা অসাধারণ সুন্দর অনুভূতি। সেখানে পৌঁছানো সত্যিই খুব কঠিন। বোন পেট্রিসিয়া, আপনার ইসলামের পথে যাত্রা আপনার স্বাস্থ্য যাত্রাকে প্রভাবিত করেছে। অনুগ্রহ করে এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বলবেন?
বিশ বছরের বিষাক্ত দাম্পত্য জীবন আর সন্তানদের বড় করার পর আমি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। যেমনটা বললাম, আর আমার শরীর ভেঙে পড়েছিল। আমার অটোইমিউন রোগ হলো হাশিমোটো আর সোরিয়াসিস। আমার দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ছিল। আর আমি প্রতিটি দিন আর রাত সত্যি ব্যথায় কাটাতাম। এমন সময়ও ছিল যখন আমি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেও পারতাম না। আমাকে বসে পড়তে হতো। আমার চুল পড়া, হার্টের সমস্যা, ব্রেইন ফগ আর গভীর গভীর ক্লান্তি ছিল। আমি যতই ঘুমাতাম, যতই কফি পান করতাম কোনো লাভ হতো না। আর যখনই ডাক্তারের কাছে যেতাম তিনি শুধু বলতেন, "কেমন আছেন?" আর আমি অঝরে কাঁদতে শুরু করতাম। একবার তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনি এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গিয়ে পড়বেন। হয় বার্নআউট নিয়ে নয়তো ক্যানসার নিয়ে।" আর এটা আমাকে সত্যিই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। কারণ সেই সময়ে আমি ক্যানসার হওয়ার খুব ভয় পেতাম। সেই সময়েই আমি আবার আমার জীবনে এক অলৌকিক ঘটনা অনুভব করি। আমি আমার কম্পিউটারের সামনে কাজ করছিলাম আর আমার মা আমাকে খুশি করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি ফোনে বললেন, "ও, গিয়ে আমার ফেসবুক প্রোফাইল দেখো। আমি মজার কিছু পোস্ট করেছি।" আমি কখনো এমন কিছু করতাম না। কখনো না, কখনোই না, একেবারেই না। আমার কোনো সময়ই ছিল না। কিন্তু সেই মুহূর্তে খুব বিশেষ কিছু ঘটলো। আজও তা মনে আছে। সত্যিই মনে হলো কেউ যেন আমার হাতের উপর হাত রেখে মাউসটা ঠেলে দিচ্ছে। আমি মায়েরপ্রোফাইল-এ গিয়ে ক্লিক করলাম। একটু স্ক্রল করলাম। আর হঠাৎ একটা শিরোনাম চোখে পড়লো, "ক্যানসার-এর গবেষণায় যুগান্তকারী অগ্রগতি। বেড়ির মাধ্যমে ক্যানসার নিরাময়।" আর সেই মুহূর্ত থেকে আমি গবেষণায় ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর ডুব দিলাম। আমি সুস্থ শরীর পাওয়ার আশায় অতৃপ্ত তৃষ্ণায় ছিলাম। বোঝার জন্য আমি যেন একেবারে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম। আমি শুধু বুঝতে চাইতাম শরীর কিভাবে কাজ করে, কিভাবে সবকিছু একসাথে মিলিয়ে দেখা যায়। আর আমি শত শত সাপ্লিমেন্ট নিয়েছি। সব চেষ্টা করেছি, সব বদলেছি। আমি সারা বিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনুসরণ করেছি যারা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও অটোইমিউন রোগ সারানোর দাবি করতেন। আর আজ আমি এখানে আছি। আলহামদুলিল্লাহ। এটা কাজ করেছে আল্লাহর ইচ্ছাতেই। বায়োফিল্ম কি?
আর আপনি এখন কোন প্রকল্পে কাজ করছেন? আসলে বায়োফিল্ম মূলত আপনার অন্ত্রে এক ধরনের আঠালো ময়লা যে আপনাকে অসুস্থ করতে পারে। আর আমার অভিজ্ঞতায় প্রায় সবারই এটা থাকে। সম্ভবত আপনারও আছে। আর বলে রাখি বায়োফিল্ম নতুন কিছু নয়। ভাবুন আপনার সিঙ্ক-এর নিচের ড্রেইন পাইপ-এর কথা। ওখানে ভেতরের দেয়ালে সবসময় এক ধরনের পিচ্ছিল দুর্গন্ধযুক্ত স্তর জমে থাকে, তাই না?
আর ঠিক তেমনি এক ধরনের পিচ্ছিল স্তর আপনার অন্ত্রের নালীর ভেতরের দেয়ালেও তৈরি হতে পারে যেখানে আপনার ইমিউন সিস্টেম-এর সবচেয়ে বড় অংশ থাকে। আর এটা সত্যি বড় সমস্যা হতে পারে। আর আমি সত্যি বিশ্বাস করি স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বায়োফিল্ম সবচেয়ে অবহেলিত বিষয়গুলোর একটি। এমনকি American Health Institute-এ প্রকাশিত গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয় আমাদের শরীরের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের ৮০ পারসেন্ট পর্যন্ত Biofilm-এর সাথে জড়িত। এটা অবিশ্বাস্য। আমার অন্ত্র থেকে Biofilm দূর করা সবকিছু বদলে দিয়েছিল। আর আপনি যখন আমার Gut Clean System দিয়ে এটা দূর করবেন, আপনি আসলে এটাকে বের করে দিতে পারবেন এবং হাতে ধরেও দেখতে পারবেন। আমি এটা সত্যিই ভালোবাসি। আর আপনার অবশ্যই এটা চেষ্টা করা উচিত। আর সমস্যা হলো আজকে আমাদের যে জীবনযাপন, আমরা যে খাবার খাই, যে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাই এসবের মাধ্যমে আমরা ভালো bacteria-র বদলে খারাপ জীবাণুগুলোকে খাওয়াচ্ছি। তাই আপনি যদি Biofilm তৈরি ও বড় হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে চান তাহলে ভালো bacteriaগুলোকে খাওয়াতে থাকুন। ওরা প্রকৃতি ভালোবাসে, আসল খাবার ভালোবাসে, পরিপুষ্ট খাবার ভালোবাসে। যা কিছু প্রাকৃতিক আর পরিষ্কার তা খান। বাকি সব ছেড়ে দিন। তাহলে আপনি আপনার ভালো bacteriaগুলোকে খাওয়াচ্ছেন। তাহলে ইসলাম ও চিকিৎসা আপনার কাছে কি অর্থ বহন করে?
আমি, আমি সত্যিই বিশ্বাস করি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের এই অসাধারণ শরীর সৃষ্টি করেছেন। এটি যেন আমাদের এই জীবন পার করিয়ে নেয়। মানে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। আর আমার স্বাস্থ্য যাত্রায় একটি বিষয় আমি বুঝেছি যে আপনার শরীর সবসময় আপনাকে রক্ষা করারই চেষ্টা করে। আর আমি সত্যিই চাই চিকিৎসা ব্যবস্থা যেন মনোযোগ দেয় সেই নিরাময় প্রক্রিয়াগুলোকে সহায়তা করার দিকে যেগুলো আল্লাহ ইতিমধ্যেই আমাদের ভেতরে সৃষ্টি করে দিয়েছেন। শুধু লক্ষণগুলো চিকিৎসা করার বদলে শরীর কি করছে সেটা বোঝার চেষ্টা করি না কেন? মানে শরীর হঠাৎ করে Cholesterol বাড়ায় কেন? Insulin receptor হঠাৎ কম সাড়া দেয় কেন? হৃৎপিণ্ড চাপ বাড়ায় কেন? কে এসব প্রশ্ন করছে?
আর আপনি যদি সত্যিই কারণ খুঁজতে যান, আপনি অবাক হয়ে যাবেন। কারণ আপনার শরীর আপনাকে ব্যর্থ করছে না। বেশিরভাগ সময় এটি আসলে আপনাকে আরও খারাপ কিছু থেকে বাঁচাচ্ছে। আর এটা আমাকে সত্যিই দুঃখ দেয় যে আমরা মুসলিম হিসেবে এত স্পষ্ট নির্দেশনা পেয়েছি যে কি খেতে হবে আর কি খাওয়া যাবে না, এমনকি কতটা খেতে হবে সে সম্পর্কেও। আর আমি ভুল না করলে কোরআনে মাত্র চারটি আয়াতে হালাল খাবার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সবসময় তা তায়েব কিছুর সাথে মিলিয়ে বলা হয়েছে যার অর্থ হলো যা ভালো। তাহলে বলুন তো আজকাল সত্যিই ভালো কি? চিনি কি হালাল? হ্যাঁ। কিন্তু এটা কি আমাদের জন্য ভালো? না। মাংস খাওয়া কি হালাল? আশা করি। কিন্তু প্রতিদিন মাংস খাওয়া কি আমাদের জন্য ভালো?
না। আর প্যাকেটের উপর হালাল সিল থাকলেই তা তায়েব হয়ে যায় না। আর আমি সত্যিই মনে করি ইসলাম ও চিকিৎসা একসাথে চলা উচিত। আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা প্রতিটি রোগের সঙ্গে তার নিরাময়ও সৃষ্টি করেছেন। আর বলে রাখি এই হাদিসটি আমার রান্নাঘরের তাকেই রাখা আছে আমাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোন বিষয়টা আপনাকে সবচেয়ে -বেশি মুগ্ধ করেছে?
-আমার মনে হয় তিনি সবসময় অত্যন্ত কোমল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সবসময় দয়ালু ছিলেন আর ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। কখনো কখনো যদি আমি কল্পনা করি সে সময় বেঁচে থাকা, সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলা, নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা, নিজের মর্যাদা ঝুঁকিতে ফেলা। আপনি সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলছেন। আপনি, আপনি সবকিছু হারাতে পারেন। তারপরও বন্ধুসুলভ, ভালোবাসাপূর্ণ এবং ন্যায়পরায়ণ থাকা মানে এটা, এটা সত্যিই, এটা মানুষের সাধ্যের বাইরে। যে কেউই খুব বিরক্ত হয়ে যেত, যে কেউই রাগে পাগল হয়ে যেত, যেকোনো মানুষই হয়তো অন্যায় আচরণ করা শুরু করত। আর তিনি তা করেননি।আর এমন ধৈর্য, এমন সাহস, এমন শক্তি থাকা এটা অসাধারণ। এটা, এটা শুধু তখনই সম্ভব যখন আপনি আল্লাহর নির্বাচিত একজন রসূল। অন্য কেউ এটা করতে পারত না। শেষ প্রশ্ন, যদি পৃথিবীর সব অমুসলিমদের সাথে আপনার এক মিনিট কথা বলার সুযোগ হতো, আপনি -তাদের কি বলতে চাইতেন?
-আমি সত্যিই চাইতাম, আমি কোরআন পড়ার সময় যা অনুভব করি, আপনারাও যদি তা অনুভব করতে পারতেন। কিছু আয়াত আমাকে সত্যিই অশ্রুসিক্ত করে দেয়। কারণ আমি উপলব্ধি করি এগুলো হলো স্রষ্টার বাণী। আর কোন মানুষ এভাবে কথা বলত না। আরেকটি অংশ আছে যা বিশেষভাবে আমাকে স্পর্শ করে। আল্লাহ যখন সৃষ্টির সব নিদর্শন আর চারপাশের সব প্রমাণ বর্ণনা করেন, তখন তিনি মানবজাতিকে একটা প্রশ্ন করেন। "তাহলে তোমরা কোথায় যাচ্ছ?" মানে আপনি লক্ষ্য অর্জনের পেছনে ছুটতে পারেন, নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারেন, ক্লান্ত করে ফেলতে পারেন, বাড়ি বানাতে পারেন, পরিবার গড়তে পারেন, আপনি গাড়ি কিনতে পারেন, দিনগুলো ভরে রাখতে পারেন, আরো বেশি পাওয়ার সংগ্রাম করতে পারেন। তারপর এক মুহূর্ত থামুন, চোখ বন্ধ করুন। আর যখন আপনার স্রষ্টা কোমলভাবে ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন, অনুভব করার চেষ্টা করুন, "তাহলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?"