উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) - ইসলামের ঘোর শত্রু থেকে ন্যায়ের সাম্রাজ্যের খলিফা! ~ টোয়ার্ডস ইটার্নিটি
প্রকাশের তারিখ
৬১৬ সালের কথা। মক্কার রাস্তাগুলোতে কিছু একটা ঘটছে। মানুষ নিজেদের মধ্যে চুপিচুপি ফিসফিস করছে। তারা একে অন্যকে জিজ্ঞাসা করছে, মনে হচ্ছে যেন, ফেরেশতারাও দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছে। যে ব্যক্তি এইসব বিভ্রান্তির মূল কারণ, তিনি রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালেন। তার দীর্ঘ ছয় ফুট শরীর নিয়ে, তিনি মহিমার সঙ্গে হাঁটেন। তিনি এতটাই নির্ভীক আমাদের রাসূল (সা.)-এর ভাষায়: তিনি কাবার কাছে যান এবং চিৎকার করে বলতে থাকেন: তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন সমস্ত ক্ষমতাশালী মানুষের বিরুদ্ধে এবং উচ্ছৃঙ্খল নেতাদের বিরুদ্ধে যারা মূর্তিপূজা করতো। প্রথমবারের মতো, একজন মুসলিমের কণ্ঠস্বর এত জোরালো ছিল। মক্কার মুশরিকদের জন্য এক বিশাল ক্ষতির কারণ ছিল। "উমরও মুসলিম হয়ে গেলেন?" যদি তা-ই হয়, তাহলে মুসলিমরা আর দুর্বল ও অসহায় নয়। কিন্তু কীভাবে উমর, যিনি হঠাৎ করে সমস্ত ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিলেন?
কীভাবে তিনি একজন ইসলামের অন্যতম বড় শত্রু থেকে ইসলামের একজন অন্যতম মহান সৈনিক হয়ে উঠলেন? যখন তিনি রাসূলকে হ*ত্যা করতে যাচ্ছিলেন, কীভাবে তিনি হঠাৎ করে একজন মানুষ হয়ে গেলেন যিনি সেই একই ব্যক্তির জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত?
তিনি পরে হয়ে উঠলেন রাসূলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং নিকটতম সঙ্গী এবং তাঁর পরবর্তী দ্বিতীয় খলিফা। এটা হচ্ছে বিশ্বের দেখা একটি অন্যতম আকর্ষনীয় একটি ঘটনা। উমর(রঃ) এর বাবা, খাত্তাব ছিলেন কুরাইশ গোত্রের আদিয়ি বংশের প্রধান। বনু আদিয়ি। উমর(রঃ) ভালো শিক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং খুবই শক্তিশালী এক যুবক। যেহেতু তিনি একজন কুস্তিগীরকে পরাজিত করেছিলেন, যাকে ওই অঞ্চলে অপরাজেয় বলে মনে করা হতো, ফলে মক্কাবাসীরা তাঁকে উপাধি দিয়েছিল এরপর তিনি হয়ে গেলেন নিজের গোত্রের প্রধান, তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও শক্তির কারণে। ইসলামের প্রথম বছরগুলোতে, রাসূল (সা.) বার্তা প্রকাশ্যে প্রচার করছিলেন না , বরং গোপনে। যারা ইসলামের কাছাকাছি ছিলেন, তাদের জন্য মুসলিমরা বার্তা গোপনে প্রচার করতেন। এবং যারা ইসলাম গ্রহণ করতেন, তারা সেই ব্যাপারটা গোপন রাখতেন। তারা কেবল ইসলামের কথা বলতেন তাদের কাছে, যাদের তারা বিশ্বাস করতেন এবং আন্তরিক মনে করতেন। এমনকি যে স্থানটিতে মুসলিমরা একত্র হতেন, সেটিও ছিল গোপন। এর পেছনের কারণ ছিল সবার অগোচরে রাখা। যদি প্রচার প্রকাশ্যে করা হতো, তাহলে যা হতো খুব সম্ভবত, তাঁরা ভোগান্তির শিকার হতেন, কারণ তারা ছিলেন সংখ্যায় খুবই কম। এই পরিস্থিতি কিছুদিন ধরে চলতে থাকলে, শহরে গুজব ছড়াতে শুরু করল। এই নতুন ধর্মের কথা মক্কার মুশরিক নেতাদের কানে পৌঁছতে লাগল। শুরুতে তারা এটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, এমনকি তাদের আত্মীয়রাও যখন এই ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করল এই নতুন পরিস্থিতি আলোচনা করার জন্য, তারা দারুন নাদওয়ায় সভা আয়োজন করল। যা মক্কার নগর পরিষদ এবং প্রতিটি পরিবারের প্রধান এই সভাগুলোতে উপস্থিত ছিলেন। উমরও সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁর গোত্রের প্রধান হিসেবে। এই সভাগুলোতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একটি সিদ্ধান্ত ছিল এমন: তাই উমর নিজের গোত্রের মুসলিমদের বেঁধে ফেলেন এবং চাবুক মারতে শুরু করেন, যতক্ষণ না তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন মুসলিমদের মধ্যে তাঁর উপাধি ছিল "নিষ্ঠুর" যেহেতু ইসলাম গোপনে প্রচার করা হচ্ছিল, উমর তখনও জানতেন না ইসলামের চূড়ান্ত সত্য সম্পর্কে। তিনি মনে করতেন যে তিনি একটি ভালো কাজ করছেন। কারণ তাঁর কাছে, রাসূল (সা.) এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি নিজের স্বার্থের জন্য আরবদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছিলেন। এবং উমর শুধু চেষ্টা করছিলেন এই হুমকি থেকে নিজের জাতিকে রক্ষা করতে। সময়ের সাথে সাথে, মুসলিমদের ওপর অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠল। এরফলে, রাসূলুল্লাহর অনুমতি পাওয়ার পর, কিছু মুসলিম হাবশিস্তানে (ইথিওপিয়ায়) হিজরত করতে শুরু করলেন। এই মুসলিমদের মধ্যে একজন ছিলেন আমির। তিনি ছিলেন উমরের বাবা খাত্তাবের দাস, তবে পরে তিনি স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী লাইলাও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এই হিজরতের কাফেলায় যোগ দেওয়ার জন্য। আমির তখন বাইরে গিয়েছিলেন কিছু আনতে। যখন উমর লাইলার সামনে আসেন, তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তিনি উত্তর দেন, অপ্রত্যাশিতভাবে নরম স্বরে, উমর বলেন: এরপর তিনি চলে যান। ততক্ষণে, তিনি মুসলিমদের সঙ্গে যা করছিলেন তার কারণে তাঁর হৃদয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তিনি অনুভব করতে শুরু করলেন যে কিছু একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু তাঁর মন এবং হৃদয় তখনও দ্বিধায় ছিল। লাইলা মনের মধ্যে অনুভব করলেন সহানুভূতি ও করুণার অনুভূতি । যখন তাঁর স্বামী আমির ফিরে এলেন, তিনি তাঁকে এই পরিস্থিতির কথা জানালেন। আমির খুব অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: "তুমি কি আশা করছ উমর মুসলিম হবে?" এরপর তিনি বললেন: এটি ছিল সেই ধারণা, যেটি উমর মানুষের মধ্যে তৈরি করেছিলেন তাঁর আচরণের মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর হৃদয়, যেটি ছিল পাথরের মতো কঠিন, শীঘ্রই নরম হতে শুরু করে। লাইলার দেখা উমরের মধ্যে থাকা সেই সহানুভূতি গভীরে কোথাও ছিল। এবং সেটি প্রকাশ পেতে, নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। এর মধ্যে একটি ছিলো- এক রাতে, উমর রাসূলুল্লাহর সঙ্গে কাবার কাছে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তখন সালাত আদায় করছিলেন। তিনি কী তিলাওয়াত করছেন তা জানার কৌতূহলে, তিনি গোপনে তাঁর কাছে যান, রাসূল তখন সূরা আল-হাক্কাহ তিলাওয়াত করছিলেন। উমর যখন তাঁর তিলাওয়াত শুনতে লাগলেন, তিনি অনিবার্যভাবে মুগ্ধ হয়ে পড়লেন আল-কুরআনের বাণীতে। কিন্তু তিনি এতো সহজে ইসলাম গ্রহণ করতে রাজী নন। তিনি মনে মনে ভাবলেন: আর ঠিক তখনই, রাসূল তিলাওয়াত করতে থাকলেন ৪১তম আয়াত: উমর হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি তখন মনে মনে ভাবতে শুরু করলেন: রাসূল তিলাওয়াত চালিয়ে যান পরবর্তী আয়াত: উমর হতভম্ব হয়ে গেলেন। এমন মনে হচ্ছিল যেন প্রতিটি আয়াত সরাসরি তাঁর উত্তর দিচ্ছিল। তিনি বোঝার চেষ্টা করছিলেন ঠিক কী ঘটছে। এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিল। ঈমানের বীজ তাঁর হৃদয়ে অঙ্কুরিত হতে লাগল। তিনি সেই অবস্থায় বাড়ি ফিরে গেলেন। মক্কায় গোপনে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল এবং বাড়ছিল। কিন্তু একই সময়ে ঘটনাগুলোর উত্তেজনাও বাড়ছিল। উমর যে কুরআন শুনেছিলেন তার দ্বারা যদিও তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন, তবুও তিনি মনে করতেন যে আল্লাহর রাসূল পরিবারগুলোকে বিভক্ত করছেন এবং ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছেন। এবং এই কারণে, তাঁর ক্ষোভ ও ঘৃণা একই রকম ছিল। এইসবের পরেও, করুণার নবী (সা.) তখনও তাঁর হেদায়েতের জন্য দোয়া করছিলেন। তিনি বলছিলেন, এই কথাগুলো রাসূলের প্রিয় মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার ঠিক পরেই, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছিলেন সারা বিশ্বের মধ্যে হেদায়েতের অন্যতম সুন্দর একটি কাহিনি। সেই দোয়ার রাতের পরদিন সকালে, আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল দারুন-নাদওয়ায়। রাসূলের গোত্র, বানু হাসিমের কাছ থেকে, বিরোধে জড়িয়ে পড়ার ভয় এবং প্রতিরোধের আশঙ্কায়, আবু জাহাল একটি প্রস্তাব দেয়: এই রক্ত প্রতিশোধের, ঝুঁকি নিয়ে সভার এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল এবং এই প্রস্তাব গ্রহণ করল। তিনি ছিলেন উমর। তিনি মনে করলেন, এটি চলছে, অনেক বেশি সময় ধরে এবং দেরি না করে তাঁর তলোয়ার তুলে নিলেন। এই দুই ব্যক্তির জন্য রাসূলুল্লাহ নাম ধরে দোয়া করেছিলেন এর আগের রাতেই। তবুও, তাঁদের একজন তাঁর হত্যার জন্য পুরস্কার নির্ধারণ করল, আর অন্যজন তাঁকে খুঁজে বের করে হত্যা করতে বের হলো। যখন আপনি এটি ভাববেন, এটি ছিল উমরের জন্য একটি আত্মঘাতী মিশন। কারণ রাসূলের পরিবার নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেবে এবং তাকেঁও হত্যা করবে। তিনি এটিও জানতেন, যদিও তিনি ছিলেন তরুণ, শক্তিশালী, ধনী, এবং সম্মানিত, তবে তিনি প্রস্তুত হচ্ছিলেন নিজেকে উৎসর্গ করতে। তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে বৃথা যেতে দেবেন না। তাঁকে দেওয়া হবে মৃত্যুর পথে জীবন। তিনি তাঁর তলোয়ার তুলে নেন এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তাঁর মূল লক্ষ্যকে হত্যা করতে। পথে, তিনি তাঁর আত্মীয় নুয়াইমের দেখা পান। নুয়াইম তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: উমর উত্তর দেন: এটি শুনে, নুয়াইম, যিনি গোপনে মুসলিম হয়েছিলেন, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি চিৎকার করে বলেন: উমর বলেন, তাঁকে হত্যা করার পর, তিনি তাঁদের কাছে যাবেন এবং আত্মসমর্পণ করবেন। নুয়াইম, যা পারেন তাই করতে চাইলেন রাসূলুল্লাহকে উমরের হাত থেকে রক্ষা করতে। তাঁকে বিভ্রান্ত করতে তার কিছু বলতে হতো। তাই তিনি বললেন, তোমার বোন এবং তাঁর স্বামী তোমার ধর্ম ত্যাগ করেছে এবং মুসলিম হয়েছে!" উমর থমকে গেলেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর, তাঁর রক্ত টগবগ করতে লাগল, তিনি তাঁর দিক পরিবর্তন করলেন এবং ছুটে চললেন তাঁর বোনের বাড়ির দিকে। এদিকে, খাব্বাব বিন আরাত সুরা আত-ত্বহা শেখাচ্ছিলেন, উমরের বোন ফাতিমাকে এবং তাঁর স্বামী সাঈদ বিন জাইদকে। যখন খাব্বাব উমরের কণ্ঠস্বর বাইরে থেকে শুনলেন, তিনি ঘরের ভেতরে লুকিয়ে পড়লেন। উমর ক্রোধে উন্মাদ হয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। যখন তাঁর বোন তাঁকে দেখলেন অন্ধকারাচ্ছন্ন চেহারা নিয়ে, তিনি তৎক্ষণাৎ লুকিয়ে ফেললেন কুরআনের পৃষ্ঠাগুলো যেগুলো তাঁর হাতে ছিলো। তিনি তাঁর বোনের ওপর চিৎকার করা শুরু করলেন.
এবং জিজ্ঞেস করলেন, যখন তাঁর ভগ্নিপতি উত্তর দিলেন, পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছিলাম।" উমরের ক্রোধ আরও বেড়ে গেল। তিনি তাঁকে গলায় ধরে মাটিতে আছড়ে ফেললেন। তিনি চিৎকার করে বললেন: "তাহলে, যা শুনেছি তা সত্য, তোমরা মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছ, তাই না?" যখন ফাতিমা তাঁর স্বামীকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেন, একটি শক্ত চড়ের পর, তিনি নিজেও পড়ে গেলেন মাটিতে। তাঁর মুখ থেকে রক্ত বের হতে লাগল। ফাতিমা আর সহ্য করতে পারলেন না এবং নির্ভয়ে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করলেন। যা ইচ্ছা কর!" উমর কিছু সময়ের জন্য থমকে গেলেন এবং ভাবতে শুরু করলেন তিনি কী করছেন। তিনি বিস্মিত হলেন তাঁর বোনের সাহস দেখে এবং ভাবলেন কী সেই কারণ যা তাঁকে এত দৃঢ় করেছে। তাঁর মুখের রক্ত দেখে উমরের ভেতর এক ধরনের সহানুভূতি জন্মাল। তিনি তাঁর বোন ফাতিমার দিকে ফিরে বললেন: রাসূলের দোয়া কি তবে কবুল হতে চলেছে?
তাঁর ভাইয়ের হেদায়েতের আশায় তিনি বললেন, উমর তাঁর কথামতো তা করলেন। তারপর তিনি তাঁকে দিলেন সেই পৃষ্ঠাগুলো যেখানে কুরআনের আয়াত লেখা ছিল এবং উমর তিলাওয়াত শুরু করলেন সূরা ত্ব-হা-এর শুরু থেকে। তিনি যতই পড়তে লাগলেন, তাঁর হৃদয়ের কঠোরতা এবং চেহারার রাগ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। তিনি তাঁর বোন এবং ভগ্নিপতির দিকে ফিরে বললেন: তারা দুজনেই পরস্পরের দিকে তাকালেন আনন্দ ও বিস্ময় নিয়ে। এই শব্দগুলোর বিরুদ্ধে উমরের মধ্যে অবাধ্যতার আর কোনো জেদ ছিল না। তাঁর হৃদয় আত্মসমর্পণ করল। এসব শুনে খাব্বাব আনন্দে তাঁর লুকিয়ে থাকা স্থান থেকে বেরিয়ে এলেন এবং চিৎকার করে বললেন: উমর তাঁর দিকে ফিরে বললেন: "আমাকে বলো, রাসূল কোথায় আছেন!" যখন খাব্বাব তাঁকে রাসূলের অবস্থান সাফা পাহাড়ের কাছে বলে দিলেন, উমর রওনা হয়ে গেলেন। তিনি যতই এগোচ্ছিলেন, তাঁর হৃদয়ের উত্তেজনা ততই বাড়তে লাগলো। তিনি খুশিতে অভিভূত হয়ে গেলেন। কিন্তু উমর এখনও তাঁর তলোয়ার বের করেননি, কারণ তাঁর একমাত্র ভাবনা সে মুহূর্তে ছিল যত দ্রুত সম্ভব রাসূলুল্লাহর কাছে পৌঁছানো এবং ঈমান গ্রহণ করা। অবশেষে উমর পৌঁছে গেলেন এবং দরজায় কড়া নাড়লেন। যখন সাহাবিগণ দেখলেন তাঁর হাতে তলোয়ার, তারা ভীত হয়ে গেলেন। তারা রাসূল (সা.) কে এ সম্পর্কে জানালে তিনি প্রবেশের অনুমতি দিলেন। যখন রাসূল (সা.) উমরকে দেখলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর তলোয়ারের বেল্ট ধরে তাঁকে আঁকড়ে ধরলেন বললেন: হেদায়েতের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে, উমর শাহাদাহ উচ্চারণ করলেন এবং মুসলিম হলেন। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা সবাই উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ ছিল। কারণ উমর মানে “ভয়” যারা উমরের বিরুদ্ধে তাদের জন্য, কিন্তু যদি উমর এখন মুসলিম হয়, এর মানে হলো আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রত্যেক সাহাবি একসঙ্গে তাকবীর ধ্বনি দিতে লাগলেন। আল্লাহু আকবার!
এটি এত জোরে ছিল যে, তা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল মক্কার রাস্তায়। উমর রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন: রাসূল (সা.) বললেন: "হ্যাঁ!" তখন উমর বললেন: অতঃপর রাসূল (সা.) অনুমতি দিলেন বিশ্বাসীদের বেরিয়ে আসতে তাঁদের লুকানো স্থান থেকে এবং সরাসরি ইসলাম প্রচার করতে। রাসূল (সা.) সামনে, উমর তাঁর ডানদিকে, এবং হামজা তাঁর বামদিকে, এবং বাকি বিশ্বাসীরা পিছন থেকে অনুসরণ করতে লাগলেন। সমস্ত মুসলিমরা অগ্রসর হতে লাগলেন কাবার দিকে। এভাবেই তারা নিজেদের পুরো নগরী ও কুরাইশদের কাছে প্রকাশ করলেন। সবাই তাদের চারপাশে বড় বিস্ময়ে জড়ো হল। সেই মুহূর্তে, কুরাইশ নেতারা বুঝতে পারল যে বাতাস এখন বইতে শুরু করেছে বিপরীত দিকে। সবচেয়ে বিখ্যাত একজন, সাহাবিদের মধ্যে, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, উমর সম্পর্কে এভাবে বর্ণনা করেন: এটা একটা বড় পার্থক্য ছিল এক ঘণ্টা আগের অমুসলিম উমর এবং এক ঘণ্টা পরের নতুন মুসলিম উমরের মধ্যে। যিনি মানুষদের নির্যাতন করতেন, তেমন একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি থেকে, তিনি এমন একজন হয়ে উঠলেন, যিনি একটি মাছিকেও কষ্ট দিতেন না। যে হেদায়েতের আলো যেটা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে এসেছিল, তা তাঁর ভেতরে লুকানো আলোকে উজ্জ্বল করতে লাগল। সেই দিন, ঈমানের বীজ উমরের হৃদয়ে বপন করা হলো। এবং সেই বীজ থেকে, আল্লাহ সৃষ্টি করলেন এক বিশাল ন্যায় ও বিবেকের বৃক্ষ। এতটাই যে, তাঁর খেলাফতের সময়ে, তাঁকে উপাধি দেওয়া হলো এবং শুধু মানুষই নয়, বরং পশুরাও অন্যায়ের হাত থেকে নিরাপদ ছিল।
কীভাবে তিনি একজন ইসলামের অন্যতম বড় শত্রু থেকে ইসলামের একজন অন্যতম মহান সৈনিক হয়ে উঠলেন? যখন তিনি রাসূলকে হ*ত্যা করতে যাচ্ছিলেন, কীভাবে তিনি হঠাৎ করে একজন মানুষ হয়ে গেলেন যিনি সেই একই ব্যক্তির জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত?
তিনি পরে হয়ে উঠলেন রাসূলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং নিকটতম সঙ্গী এবং তাঁর পরবর্তী দ্বিতীয় খলিফা। এটা হচ্ছে বিশ্বের দেখা একটি অন্যতম আকর্ষনীয় একটি ঘটনা। উমর(রঃ) এর বাবা, খাত্তাব ছিলেন কুরাইশ গোত্রের আদিয়ি বংশের প্রধান। বনু আদিয়ি। উমর(রঃ) ভালো শিক্ষা পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং খুবই শক্তিশালী এক যুবক। যেহেতু তিনি একজন কুস্তিগীরকে পরাজিত করেছিলেন, যাকে ওই অঞ্চলে অপরাজেয় বলে মনে করা হতো, ফলে মক্কাবাসীরা তাঁকে উপাধি দিয়েছিল এরপর তিনি হয়ে গেলেন নিজের গোত্রের প্রধান, তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও শক্তির কারণে। ইসলামের প্রথম বছরগুলোতে, রাসূল (সা.) বার্তা প্রকাশ্যে প্রচার করছিলেন না , বরং গোপনে। যারা ইসলামের কাছাকাছি ছিলেন, তাদের জন্য মুসলিমরা বার্তা গোপনে প্রচার করতেন। এবং যারা ইসলাম গ্রহণ করতেন, তারা সেই ব্যাপারটা গোপন রাখতেন। তারা কেবল ইসলামের কথা বলতেন তাদের কাছে, যাদের তারা বিশ্বাস করতেন এবং আন্তরিক মনে করতেন। এমনকি যে স্থানটিতে মুসলিমরা একত্র হতেন, সেটিও ছিল গোপন। এর পেছনের কারণ ছিল সবার অগোচরে রাখা। যদি প্রচার প্রকাশ্যে করা হতো, তাহলে যা হতো খুব সম্ভবত, তাঁরা ভোগান্তির শিকার হতেন, কারণ তারা ছিলেন সংখ্যায় খুবই কম। এই পরিস্থিতি কিছুদিন ধরে চলতে থাকলে, শহরে গুজব ছড়াতে শুরু করল। এই নতুন ধর্মের কথা মক্কার মুশরিক নেতাদের কানে পৌঁছতে লাগল। শুরুতে তারা এটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, এমনকি তাদের আত্মীয়রাও যখন এই ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করল এই নতুন পরিস্থিতি আলোচনা করার জন্য, তারা দারুন নাদওয়ায় সভা আয়োজন করল। যা মক্কার নগর পরিষদ এবং প্রতিটি পরিবারের প্রধান এই সভাগুলোতে উপস্থিত ছিলেন। উমরও সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁর গোত্রের প্রধান হিসেবে। এই সভাগুলোতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একটি সিদ্ধান্ত ছিল এমন: তাই উমর নিজের গোত্রের মুসলিমদের বেঁধে ফেলেন এবং চাবুক মারতে শুরু করেন, যতক্ষণ না তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তখন মুসলিমদের মধ্যে তাঁর উপাধি ছিল "নিষ্ঠুর" যেহেতু ইসলাম গোপনে প্রচার করা হচ্ছিল, উমর তখনও জানতেন না ইসলামের চূড়ান্ত সত্য সম্পর্কে। তিনি মনে করতেন যে তিনি একটি ভালো কাজ করছেন। কারণ তাঁর কাছে, রাসূল (সা.) এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি নিজের স্বার্থের জন্য আরবদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করছিলেন। এবং উমর শুধু চেষ্টা করছিলেন এই হুমকি থেকে নিজের জাতিকে রক্ষা করতে। সময়ের সাথে সাথে, মুসলিমদের ওপর অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠল। এরফলে, রাসূলুল্লাহর অনুমতি পাওয়ার পর, কিছু মুসলিম হাবশিস্তানে (ইথিওপিয়ায়) হিজরত করতে শুরু করলেন। এই মুসলিমদের মধ্যে একজন ছিলেন আমির। তিনি ছিলেন উমরের বাবা খাত্তাবের দাস, তবে পরে তিনি স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী লাইলাও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এই হিজরতের কাফেলায় যোগ দেওয়ার জন্য। আমির তখন বাইরে গিয়েছিলেন কিছু আনতে। যখন উমর লাইলার সামনে আসেন, তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তিনি উত্তর দেন, অপ্রত্যাশিতভাবে নরম স্বরে, উমর বলেন: এরপর তিনি চলে যান। ততক্ষণে, তিনি মুসলিমদের সঙ্গে যা করছিলেন তার কারণে তাঁর হৃদয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তিনি অনুভব করতে শুরু করলেন যে কিছু একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু তাঁর মন এবং হৃদয় তখনও দ্বিধায় ছিল। লাইলা মনের মধ্যে অনুভব করলেন সহানুভূতি ও করুণার অনুভূতি । যখন তাঁর স্বামী আমির ফিরে এলেন, তিনি তাঁকে এই পরিস্থিতির কথা জানালেন। আমির খুব অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন: "তুমি কি আশা করছ উমর মুসলিম হবে?" এরপর তিনি বললেন: এটি ছিল সেই ধারণা, যেটি উমর মানুষের মধ্যে তৈরি করেছিলেন তাঁর আচরণের মাধ্যমে। কিন্তু তাঁর হৃদয়, যেটি ছিল পাথরের মতো কঠিন, শীঘ্রই নরম হতে শুরু করে। লাইলার দেখা উমরের মধ্যে থাকা সেই সহানুভূতি গভীরে কোথাও ছিল। এবং সেটি প্রকাশ পেতে, নির্দিষ্ট কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। এর মধ্যে একটি ছিলো- এক রাতে, উমর রাসূলুল্লাহর সঙ্গে কাবার কাছে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তখন সালাত আদায় করছিলেন। তিনি কী তিলাওয়াত করছেন তা জানার কৌতূহলে, তিনি গোপনে তাঁর কাছে যান, রাসূল তখন সূরা আল-হাক্কাহ তিলাওয়াত করছিলেন। উমর যখন তাঁর তিলাওয়াত শুনতে লাগলেন, তিনি অনিবার্যভাবে মুগ্ধ হয়ে পড়লেন আল-কুরআনের বাণীতে। কিন্তু তিনি এতো সহজে ইসলাম গ্রহণ করতে রাজী নন। তিনি মনে মনে ভাবলেন: আর ঠিক তখনই, রাসূল তিলাওয়াত করতে থাকলেন ৪১তম আয়াত: উমর হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি তখন মনে মনে ভাবতে শুরু করলেন: রাসূল তিলাওয়াত চালিয়ে যান পরবর্তী আয়াত: উমর হতভম্ব হয়ে গেলেন। এমন মনে হচ্ছিল যেন প্রতিটি আয়াত সরাসরি তাঁর উত্তর দিচ্ছিল। তিনি বোঝার চেষ্টা করছিলেন ঠিক কী ঘটছে। এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিল। ঈমানের বীজ তাঁর হৃদয়ে অঙ্কুরিত হতে লাগল। তিনি সেই অবস্থায় বাড়ি ফিরে গেলেন। মক্কায় গোপনে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল এবং বাড়ছিল। কিন্তু একই সময়ে ঘটনাগুলোর উত্তেজনাও বাড়ছিল। উমর যে কুরআন শুনেছিলেন তার দ্বারা যদিও তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন, তবুও তিনি মনে করতেন যে আল্লাহর রাসূল পরিবারগুলোকে বিভক্ত করছেন এবং ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছেন। এবং এই কারণে, তাঁর ক্ষোভ ও ঘৃণা একই রকম ছিল। এইসবের পরেও, করুণার নবী (সা.) তখনও তাঁর হেদায়েতের জন্য দোয়া করছিলেন। তিনি বলছিলেন, এই কথাগুলো রাসূলের প্রিয় মুখ থেকে উচ্চারিত হওয়ার ঠিক পরেই, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) সৃষ্টি করতে যাচ্ছিলেন সারা বিশ্বের মধ্যে হেদায়েতের অন্যতম সুন্দর একটি কাহিনি। সেই দোয়ার রাতের পরদিন সকালে, আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল দারুন-নাদওয়ায়। রাসূলের গোত্র, বানু হাসিমের কাছ থেকে, বিরোধে জড়িয়ে পড়ার ভয় এবং প্রতিরোধের আশঙ্কায়, আবু জাহাল একটি প্রস্তাব দেয়: এই রক্ত প্রতিশোধের, ঝুঁকি নিয়ে সভার এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল এবং এই প্রস্তাব গ্রহণ করল। তিনি ছিলেন উমর। তিনি মনে করলেন, এটি চলছে, অনেক বেশি সময় ধরে এবং দেরি না করে তাঁর তলোয়ার তুলে নিলেন। এই দুই ব্যক্তির জন্য রাসূলুল্লাহ নাম ধরে দোয়া করেছিলেন এর আগের রাতেই। তবুও, তাঁদের একজন তাঁর হত্যার জন্য পুরস্কার নির্ধারণ করল, আর অন্যজন তাঁকে খুঁজে বের করে হত্যা করতে বের হলো। যখন আপনি এটি ভাববেন, এটি ছিল উমরের জন্য একটি আত্মঘাতী মিশন। কারণ রাসূলের পরিবার নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেবে এবং তাকেঁও হত্যা করবে। তিনি এটিও জানতেন, যদিও তিনি ছিলেন তরুণ, শক্তিশালী, ধনী, এবং সম্মানিত, তবে তিনি প্রস্তুত হচ্ছিলেন নিজেকে উৎসর্গ করতে। তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে বৃথা যেতে দেবেন না। তাঁকে দেওয়া হবে মৃত্যুর পথে জীবন। তিনি তাঁর তলোয়ার তুলে নেন এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তাঁর মূল লক্ষ্যকে হত্যা করতে। পথে, তিনি তাঁর আত্মীয় নুয়াইমের দেখা পান। নুয়াইম তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: উমর উত্তর দেন: এটি শুনে, নুয়াইম, যিনি গোপনে মুসলিম হয়েছিলেন, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি চিৎকার করে বলেন: উমর বলেন, তাঁকে হত্যা করার পর, তিনি তাঁদের কাছে যাবেন এবং আত্মসমর্পণ করবেন। নুয়াইম, যা পারেন তাই করতে চাইলেন রাসূলুল্লাহকে উমরের হাত থেকে রক্ষা করতে। তাঁকে বিভ্রান্ত করতে তার কিছু বলতে হতো। তাই তিনি বললেন, তোমার বোন এবং তাঁর স্বামী তোমার ধর্ম ত্যাগ করেছে এবং মুসলিম হয়েছে!" উমর থমকে গেলেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর, তাঁর রক্ত টগবগ করতে লাগল, তিনি তাঁর দিক পরিবর্তন করলেন এবং ছুটে চললেন তাঁর বোনের বাড়ির দিকে। এদিকে, খাব্বাব বিন আরাত সুরা আত-ত্বহা শেখাচ্ছিলেন, উমরের বোন ফাতিমাকে এবং তাঁর স্বামী সাঈদ বিন জাইদকে। যখন খাব্বাব উমরের কণ্ঠস্বর বাইরে থেকে শুনলেন, তিনি ঘরের ভেতরে লুকিয়ে পড়লেন। উমর ক্রোধে উন্মাদ হয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। যখন তাঁর বোন তাঁকে দেখলেন অন্ধকারাচ্ছন্ন চেহারা নিয়ে, তিনি তৎক্ষণাৎ লুকিয়ে ফেললেন কুরআনের পৃষ্ঠাগুলো যেগুলো তাঁর হাতে ছিলো। তিনি তাঁর বোনের ওপর চিৎকার করা শুরু করলেন.
এবং জিজ্ঞেস করলেন, যখন তাঁর ভগ্নিপতি উত্তর দিলেন, পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছিলাম।" উমরের ক্রোধ আরও বেড়ে গেল। তিনি তাঁকে গলায় ধরে মাটিতে আছড়ে ফেললেন। তিনি চিৎকার করে বললেন: "তাহলে, যা শুনেছি তা সত্য, তোমরা মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছ, তাই না?" যখন ফাতিমা তাঁর স্বামীকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেন, একটি শক্ত চড়ের পর, তিনি নিজেও পড়ে গেলেন মাটিতে। তাঁর মুখ থেকে রক্ত বের হতে লাগল। ফাতিমা আর সহ্য করতে পারলেন না এবং নির্ভয়ে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করলেন। যা ইচ্ছা কর!" উমর কিছু সময়ের জন্য থমকে গেলেন এবং ভাবতে শুরু করলেন তিনি কী করছেন। তিনি বিস্মিত হলেন তাঁর বোনের সাহস দেখে এবং ভাবলেন কী সেই কারণ যা তাঁকে এত দৃঢ় করেছে। তাঁর মুখের রক্ত দেখে উমরের ভেতর এক ধরনের সহানুভূতি জন্মাল। তিনি তাঁর বোন ফাতিমার দিকে ফিরে বললেন: রাসূলের দোয়া কি তবে কবুল হতে চলেছে?
তাঁর ভাইয়ের হেদায়েতের আশায় তিনি বললেন, উমর তাঁর কথামতো তা করলেন। তারপর তিনি তাঁকে দিলেন সেই পৃষ্ঠাগুলো যেখানে কুরআনের আয়াত লেখা ছিল এবং উমর তিলাওয়াত শুরু করলেন সূরা ত্ব-হা-এর শুরু থেকে। তিনি যতই পড়তে লাগলেন, তাঁর হৃদয়ের কঠোরতা এবং চেহারার রাগ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। তিনি তাঁর বোন এবং ভগ্নিপতির দিকে ফিরে বললেন: তারা দুজনেই পরস্পরের দিকে তাকালেন আনন্দ ও বিস্ময় নিয়ে। এই শব্দগুলোর বিরুদ্ধে উমরের মধ্যে অবাধ্যতার আর কোনো জেদ ছিল না। তাঁর হৃদয় আত্মসমর্পণ করল। এসব শুনে খাব্বাব আনন্দে তাঁর লুকিয়ে থাকা স্থান থেকে বেরিয়ে এলেন এবং চিৎকার করে বললেন: উমর তাঁর দিকে ফিরে বললেন: "আমাকে বলো, রাসূল কোথায় আছেন!" যখন খাব্বাব তাঁকে রাসূলের অবস্থান সাফা পাহাড়ের কাছে বলে দিলেন, উমর রওনা হয়ে গেলেন। তিনি যতই এগোচ্ছিলেন, তাঁর হৃদয়ের উত্তেজনা ততই বাড়তে লাগলো। তিনি খুশিতে অভিভূত হয়ে গেলেন। কিন্তু উমর এখনও তাঁর তলোয়ার বের করেননি, কারণ তাঁর একমাত্র ভাবনা সে মুহূর্তে ছিল যত দ্রুত সম্ভব রাসূলুল্লাহর কাছে পৌঁছানো এবং ঈমান গ্রহণ করা। অবশেষে উমর পৌঁছে গেলেন এবং দরজায় কড়া নাড়লেন। যখন সাহাবিগণ দেখলেন তাঁর হাতে তলোয়ার, তারা ভীত হয়ে গেলেন। তারা রাসূল (সা.) কে এ সম্পর্কে জানালে তিনি প্রবেশের অনুমতি দিলেন। যখন রাসূল (সা.) উমরকে দেখলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর তলোয়ারের বেল্ট ধরে তাঁকে আঁকড়ে ধরলেন বললেন: হেদায়েতের আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে, উমর শাহাদাহ উচ্চারণ করলেন এবং মুসলিম হলেন। এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা সবাই উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ ছিল। কারণ উমর মানে “ভয়” যারা উমরের বিরুদ্ধে তাদের জন্য, কিন্তু যদি উমর এখন মুসলিম হয়, এর মানে হলো আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রত্যেক সাহাবি একসঙ্গে তাকবীর ধ্বনি দিতে লাগলেন। আল্লাহু আকবার!
এটি এত জোরে ছিল যে, তা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল মক্কার রাস্তায়। উমর রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলেন: রাসূল (সা.) বললেন: "হ্যাঁ!" তখন উমর বললেন: অতঃপর রাসূল (সা.) অনুমতি দিলেন বিশ্বাসীদের বেরিয়ে আসতে তাঁদের লুকানো স্থান থেকে এবং সরাসরি ইসলাম প্রচার করতে। রাসূল (সা.) সামনে, উমর তাঁর ডানদিকে, এবং হামজা তাঁর বামদিকে, এবং বাকি বিশ্বাসীরা পিছন থেকে অনুসরণ করতে লাগলেন। সমস্ত মুসলিমরা অগ্রসর হতে লাগলেন কাবার দিকে। এভাবেই তারা নিজেদের পুরো নগরী ও কুরাইশদের কাছে প্রকাশ করলেন। সবাই তাদের চারপাশে বড় বিস্ময়ে জড়ো হল। সেই মুহূর্তে, কুরাইশ নেতারা বুঝতে পারল যে বাতাস এখন বইতে শুরু করেছে বিপরীত দিকে। সবচেয়ে বিখ্যাত একজন, সাহাবিদের মধ্যে, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, উমর সম্পর্কে এভাবে বর্ণনা করেন: এটা একটা বড় পার্থক্য ছিল এক ঘণ্টা আগের অমুসলিম উমর এবং এক ঘণ্টা পরের নতুন মুসলিম উমরের মধ্যে। যিনি মানুষদের নির্যাতন করতেন, তেমন একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি থেকে, তিনি এমন একজন হয়ে উঠলেন, যিনি একটি মাছিকেও কষ্ট দিতেন না। যে হেদায়েতের আলো যেটা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর মাধ্যমে এসেছিল, তা তাঁর ভেতরে লুকানো আলোকে উজ্জ্বল করতে লাগল। সেই দিন, ঈমানের বীজ উমরের হৃদয়ে বপন করা হলো। এবং সেই বীজ থেকে, আল্লাহ সৃষ্টি করলেন এক বিশাল ন্যায় ও বিবেকের বৃক্ষ। এতটাই যে, তাঁর খেলাফতের সময়ে, তাঁকে উপাধি দেওয়া হলো এবং শুধু মানুষই নয়, বরং পশুরাও অন্যায়ের হাত থেকে নিরাপদ ছিল।