Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

“মুসলিম পরিবার ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ এটি!” ~ টোয়ার্ডস ইটার্নিটি

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

টানাপোড়েনে ভরা একটা বিয়ে শেষ করে দেওয়া কি ঠিক? নাকি ধৈর্য ধরতে হবে, আর বলবেন এটা পরীক্ষা, তাই শেষ করা যাবে না? বিয়ের কিছু বছর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় কেন? প্রথম দিকের ভালোবাসা কি ধরে রাখা সম্ভব নয়? যদি বিয়েটা ঠিকভাবে চালানো যায়, তাহলে ভালোবাসা আরো গভীর হয়। অনেকেই এটা বোঝেন না, ভালোবাসা সময়ের সাথে সম্পর্কের মধ্যেই বেড়ে ওঠে। এভাবে ভালোবাসা একটা স্তর থেকে আরেক স্তরে আরেক স্তরে রূপান্তরিত হয়। তবে এই জায়গায় শয়তানের ধোঁকায় পড়া যাবে না। কারণ শয়তান তো বলবেই, "চিৎকার করো, গালি দাও, রাগ দেখাও।" আপনি বরং সেটা থেকে দূরে থাকবেন। নবী (সা.) কি কখনো তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে মনোমালিন্যে জড়াননি? নাকি সব সময়ই সম্পর্ক ফুলের মতো মসৃণ ছিল?

বুঝলাম। আসসালামু আলাইকুম শেখ ইয়াসির বিরজাস। আমাদের দাওয়াত গ্রহণের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনাকে পেয়ে আমরা সত্যিই খুশি। আজ আমরা বিয়ে নিয়ে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। অবশ্যই, বলুন। আমরা আশা করছি, আজকের প্রশ্নে আপনাকে একটু ঘাম ঝরাব! বিসমিল্লাহ। অপেক্ষায় আছি, শুরু করুন। কেন সময়ের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীরা একে অপরের থেকে দূরে চলে যায়? বিয়ে কি সত্যিই ভালোবাসাকে মেরে ফেলে? আসলেই? সুবহানআল্লাহ। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর একটি বইয়ে লিখেছেন, তিনি এই বিষয়ে লিখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দেখো, যদি সঠিকভাবে করা হয়, বিয়ে বরং ভালোবাসাকে আরো গভীর করে তোলে। প্রশ্ন হলো, সঠিকভাবে বলতে কী বোঝায়?

আমরা বলেছিলাম, আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো - ভালোবাসা আর দয়া, আবেগ আর সহানুভূতি। আর মানুষ যা ঠিকমতো বোঝে না, তার একটি হলো, ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের মাঝেই বেড়ে ওঠে, এবং তা এক রূপ থেকে আরেক রূপে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ১০ বছর পর আর ২/৩টা সন্তান হওয়ার পর বড় সমস্যা দেখা দেয়। মানুষ তখনো আশা করে, তার সঙ্গী ঠিক সেই আগের মতোই ভালোবাসবে। যেমন তারা ভালোবাসতো ১০ বছর আগে, যখন তারা তরুণ, দায়িত্বহীন ছিল, মাশাআল্লাহ। এটা ঠিক নয়। কিন্তু এখন আমি তোমায় অন্য কারণে ভালোবাসি। আমি ভালোবাসি, কারণ তুমি আমার সন্তানের বাবা-মা। আমি ভালোবাসি, কারণ তুমি আমার পাশে থাকো, যখন আমি ক্লান্ত ও অবসন্ন। আমি ভালোবাসি, কারণ তুমি আমাকে সাহায্য করো, তুমি অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, সহানুভূতিশীল এবং আরো অনেক কিছু। এটা ভাঙতে শুরু করে কখন?

প্রথমত, মানুষ একে-অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। প্রধান ব্যাপার হলো এটা বোঝা, কেন এটা হয়। ব্যাপারটা এমন, যেকোনো সম্পর্কের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো শান্তি ও মানসিক প্রশান্তি পাওয়া। আর শান্তি হলো এক ধরনের রিচার্জেবল ব্যাটারি। আপনি দিন শুরু করেন ১০০ শতাংশ সন্তুষ্টি নিয়ে। দীর্ঘ দিনের শেষে আপনি ফেরেন ৯০ শতাংশতে এসে। আপনি সঙ্গীর কাছে কী আশা করেন?

আপনি চান, তিনি আবার ১০০ শতাংশে ফিরিয়ে নিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, খারাপ আচরণের কারণে আমরা বরং একে অপরকে আরো বেশি নিঃশেষ করি। ফলে আমরা ৭০ শতাংশ অবস্থায় ঘুমাতে যাই। এরপর একসময় এমন হয়, আমরা ৯০ শতাংশ নিয়ে জাগি, তারপরে ফিরে আসি ৭০ শতাংশে, আর ঘুমাতে যাই ৫০ শতাংশে। আর যদি এটা চলতেই থাকে, একসময় এমন আসবে, যখন আমার আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট থাকবে না। ঠিক তখনই মানুষ সম্পর্ক ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আমাদের বোঝা দরকার, তুমি আমার জন্য শান্তির উৎস হওয়ার কথা। আর আমি তোমার শান্তির উৎস। তাহলে মানুষ ঝগড়া করে কেন?

তারা ঝগড়া করে কারণ প্রশান্তির বিঘ্ন ঘটে। আমার সেই শান্তি ফিরিয়ে আনতেই হবে। আর তুমি যদি সাহায্য না করো, আমি সেটা জোর করেই ফিরিয়ে আনব। আর তখনই দ্বন্দ্ব আর বিরোধ শুরু হয়। কারণ সবাই নিজের সম্পর্ক থেকে শান্তি পেতে চায়, যেভাবে তাদের কাছে তা অর্থবহ মনে হয়। আর যদি আমরা একে অপরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারি, যদি যথেষ্ট নমনীয় না হই সেই শান্তি দেওয়ার ব্যাপারে, যদি না বুঝি যে, এই প্রক্রিয়ার আমি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছি, তাহলে মানুষ সবসময়ই ঝগড়া করবে। আমাদের নবী (সা.) স্ত্রীদের প্রতি কেমন ছিলেন? সুবহানআল্লাহ!

এটা সত্যিই খুবই সুন্দর একটি দিক, যেটা আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি নবী (সা.) জীবনীতে পড়তে। আমি নবীজি (সা.) - এর ব্যক্তিগত জীবনের ওপর অনেক হাদিস একত্র করেছি। তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ। একজন মহৎ ভদ্রলোক। এরকমই একটি ঘটনা হলো, যখন তিনি সাফিয়া (রা.)-কে বিয়ে করেন, তাঁরা তখন হাইফা থেকে ফিরে আসার পথে ছিলেন। আর যখন সময় হলো সাফিয়া (রা.)-এর উঁচু উটের পিঠে ওঠার, উট তো অনেক উঁচু, তখন নবীজি (সা.) কী করলেন?

তিনি হাঁটু গেড়ে বসে গেলেন। তিনি এক হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং অন্য হাঁটু উপরে তুলে দিলেন, যাতে সাফিয়া (রা.) সেটাকে পা রাখার জন্য সিঁড়ির মতো ব্যবহার করতে পারেন। তিনি যেন তাঁর হাঁটুতে পা রেখে উটের পিঠে উঠতে পারেন। এবং যখন তিনি তা করছিলেন, নবীজি (সা.) শৌর্যবীর্যের সাথে তিনি তাঁর চাদর দিয়ে তাঁকে ঢেকে রাখছিলেন। নবী (সা.) ঠিক এভাবেই তাঁকে ঢেকে দিচ্ছিলেন, যখন তিনি তাঁর হাঁটুর ওপর পা রাখছিলেন। কেন? কারণ যখন তিনি পা তুলছিলেন, তখন হয়তো অপর পা উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারত। তাই নবীজি (সা.) তাঁকে ঢেকে দিচ্ছিলেন। এটিই হলো পুরুষত্ব। পুরুষত্ব বলতে কী বোঝায়?

এটাই আসলে সত্যিকারের পুরুষত্বের দৃষ্টান্ত। কারণ নবী (সা.) ছিলেন রক্ষণশীল, আবার ভদ্রলোকও। আজকের দিনে এর মানে হতে পারে, স্ত্রীর জন্য দরজা খুলে দেওয়া, সে যখন ভেতরে ঢুকছে, তখন দরজা ধরে রাখা। এই ধরনের আচরণই আসলে প্রয়োজন। দুঃখজনকভাবে কিছু সংস্কৃতিতে এটাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়। এতে নাকি পুরুষসুলভ ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়। আমি জানি না তারা কিভাবে বৈবাহিক জীবন উপভোগ করে। ওটা তাদের ব্যাপার। ব্যক্তিগত না হলে বলুন তো, আপনি কি স্ত্রীকে এমন ভালোবাসেন? আপনাকে এটা আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করতে হবে, আমাকে না। - ভালো বলেছেন। তবে হ্যাঁ, আমি করি। আলহামদুলিল্লাহ। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কেমন হওয়া উচিত? আজকাল দুর্ভাগ্যজনকভাবে...

আমরা যে ধরনের জীবনযাপন করি, তাতে ‘সম্মান’ শব্দটাই একটা স্পর্শকাতর শব্দে পরিণত হয়েছে। আজকাল নারীরা যখন ‘সম্মান’ শব্দটা শোনে, তাদের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করে। এই শব্দটা যেন তাদের জন্য খুবই স্পর্শকাতর, কারণ তারা 'সম্মান' শব্দটার মানে বোঝে নিয়ন্ত্রণ হিসেবে। ঠিক তাই। আর অনুগত্য শব্দটা তারা বোঝে দমন-পীড়ন হিসেবে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে। তাই ‘সম্মান’ আর ‘অনুগত্য’ শব্দগুলোকে আজকাল অনেকেই নেতিবাচক অর্থে ব্যাখ্যা করে থাকেন। আমি নারীদের দোষ দিচ্ছি না, কারণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু পুরুষ আছেন, যারা আসলেই এমন ব্যবহার করে থাকেন। তারা ‘সম্মান’ শব্দটার প্রকৃত অর্থই বোঝেন না। তাই তারা এমন অনেক কিছু দাবি করে, যার অর্থ ‘সম্মান’ নয়। আসলে ‘সম্মান’ বিষয়টাও সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন অর্থ বহন করে। এর মানে কী?

কিছু সংস্কৃতিতে ধরুন, স্বামীর সঙ্গে তর্ক বা কথা কাটাকাটি করাকে অসম্মানজনক মনে করা হয়, আবার অন্য সংস্কৃতিতে এটা একদম স্বাভাবিক। এমনকি রাসূল (সা.)-এর যুগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। কারণ নবীজী (সা.)-এর সময় মক্কার পুরুষরা ছিলেন তুলনামূলক বেশি কঠোর বা রুক্ষ স্বভাবের। এবং সম্ভবত তারা পরিবারে কর্তৃত্বেও থাকতেন। তাই তারা সব সময়ই সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখতে চাইতেন। যখন তারা মদিনায় গেলেন, তখন দেখলেন, আনসারি নারীরা অনেক বেশি স্পষ্টভাষী। তারা অনেক বেশি সরব ও দৃশ্যমান ছিলেন। এর কারণ সম্ভবত তারা মাঠের কাজেও সাহায্য করতেন, কৃষিকাজে সরাসরি যুক্ত থাকতেন। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে তারা আরো সাহসী ছিলেন। এমনকি হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) পর্যন্ত বিস্মিত হন, যখন দেখেন, তার স্ত্রীও আনসারি নারীদের মতো জবাব দেওয়া শুরু করেছেন। তার কাছে এটা ছিল একধরনের অসম্মান ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তাহলে এখান থেকে আমরা যা বুঝতে পারি, ‘সম্মান’ শব্দটার অর্থও একেকজনের কাছে একেক রকম হতে পারে। যদি কেউ নিজেরই গ্রামের বা এলাকার কাউকে বিয়ে করেন, তাহলে তিনি আশা করেন, তার স্ত্রী বা স্বামীও তাকে সেইভাবে সম্মান করবে, যেভাবে তিনি দেখে এসেছেন তার চাচা, মামা কিংবা অন্য আত্মীয়দের পরিবারে। কারণ আমাদের সংস্কৃতি তো একই। কিন্তু যখন মানুষ ভিন্ন সংস্কৃতি বা গ্রাম থেকে বিয়ে করে, ভিন্ন শহর, ভিন্ন অঞ্চল। অর্থাৎ একেবারে ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে বিয়ে হয়, তখন "সম্মান" কাকে বলে তা বুঝতে সমস্যা হতে পারে। কেন?

কারণ ছেলেটির কাছে হয়তো কিছু বিষয় একেবারে স্বাভাবিক, কিন্তু মেয়েটির কাছে সেটা হয়তো অস্বাভাবিক, কিংবা সম্পূর্ণ বিপরীত। একটা বিষয় মেয়েটি স্বাভাবিক ভাবলেও, ছেলেটির কাছে সেটা অসম্মানজনক মনে হতে পারে। তাই আসলে, এমন নয় যে কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে, "এই জিনিসটাই হলো সম্মান।" এটা আবারও ফিরে যায় “বিল-মারূফ”-এর দিকে, অর্থাৎ সমাজ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী, যা গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক। অনেক গতানুগতিক পরিবারে, স্বামী আশা করেন স্ত্রী সব কিছু সামলাবে। রান্না, পরিস্কার, বাচ্চাদের দেখাশোনা - সব কিছু। আর স্বামীর কাজ শুধু বাইরে উপার্জন করা। কিন্তু আধুনিক সময় ও সমাজে, মানুষের প্রত্যাশা বদলে গেছে। আপনি যদি চান আপনার সঙ্গী আপনার জন্য কিছু করুক এটা এখনকার সময়ে তাদের কাছে অবশ্যই অসম্মানের কিছু নয়। তাহলে নবী করিম (সা.) কী করতেন?

নবীজি (সা.)-এর জীবন ছিল একধরনের 'ক্রান্তিকালীন' জীবনধারা, অর্থাৎ পুরোপুরি ঐতিহ্যবাহীও না, আবার একেবারে সমতাবাদীও না। যখন তিনি ঘরে থাকতেন, হযরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “নবীজি ঘরে কেমন ছিলেন?” তিনি বলেন, “তিনি অন্য সাধারণ মানুষের মতোই ছিলেন। নিজে ঘর পরিষ্কার করতেন, নিজের জুতো ঠিক করতেন, জামা সেলাই করতেন, এমনকি ছাগলের দুধ নিতেন। কিন্তু যখন আজান শুনতেন, তখনই থেমে যেতেন। তখন তিনি সেই দায়িত্বে চলে যেতেন, যা একজন পুরুষের পালন করা উচিত।” তাই, হ্যাঁ, পুরুষ হওয়ার মানে এই নয় যে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করা যাবে না, বা সন্তানদের দেখাশোনায় যুক্ত হওয়া দায়িত্ব নয়। তবে একই সঙ্গে, স্ত্রীকেও তার স্বামীকে যথাযথ সম্মান দেওয়া উচিত। স্ত্রীর কাছ থেকেও তার সম্মান পাওয়া উচিত, ঘরসংসারে সহযোগিতা ও সহায়তার বিনিময়ে। সফল দাম্পত্য জীবনে আপনি সাধারণত কোন বিষয়গুলো লক্ষ্য করেছেন?

আমি বলব, সফল দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আচরণ ও নৈতিক গুনাবলি। আপনারা যতই আলাদা হোন না কেন, আপনারা যত ধনী বা গরিব হোন না কেন, আপনারা যত শিক্ষিত বা অশিক্ষিত হোন না কেন, দিন শেষে যে জিনিসটা মানুষকে একসাথে রাখে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের ব্যবহার ও আখলাক, এবং তারা একে অপরকে কিভাবে সম্মান করে। ধরুন, আপনি খুব আবেগময় বা উন্মাদ ভালোবাসায় না-ও পড়তে পারেন, তার পরও সম্পর্কে সম্মান ও মর্যাদা বজায় থাকে। আসলে এভাবেই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়। মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করে, কোন বিষয়টি মানুষকে একত্রিত করে?

আমি বলি, মানুষ একত্র হয় মানানসই হওয়ার মাধ্যমে। যেমন ধরুন, আমি আপনার সাথে কথা বলছি। আমরা দেখি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক, ব্যক্তিত্ব মিলে যায়, আমাদের জীবনের লক্ষ্য, স্বপ্নগুলোও অনেকটা একরকম। সবই খুব সুন্দর। এসব বিষয় মানুষকে কাছাকাছি আনে, বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। কিন্তু এগুলো টিকে থাকার নিশ্চয়তা দেয় না। একটা সম্পর্ক টিকে থাকে নমনীয়তার মাধ্যমে। আপনাকে নমনীয় হতে হবে। নিজেকে আপনার মানিয়ে নিতে হবে। না হলে আপনি যদি সব সময় একইভাবে ভালোবাসা বুঝতে চান, সব কিছু আপনি কিভাবে চালাবেন, সন্তানদের কিভাবে বড় করবেন, আপনার লক্ষ্য কিভাবে অর্জন করবেন। আপনি যদি সব সময় একই নিয়মে আটকে থাকেন, যেটা বিয়ের সময় ছিল, তাহলে সেটা বিপজ্জনক। কেন?

কারণ সবাই বদলায়। আমরা সবাই বদলাই। আমরা বদলাই কারণ আমাদের সন্তান হয়। আমরা বদলাই কারণ আমরা আরো ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমরা বদলাই কারণ আমরা বৃদ্ধ হচ্ছি। আমরা বদলাই কারণ মনোযোগের জিনিসগুলো বদলে যায়। আর আপনি যদি সঙ্গীর সঙ্গে সেই পরিবর্তনকে নমনীয়ভাবে মেনে নিতে না পারেন, নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে না পারেন, তাহলে সম্পর্ক বেশি দিন টেকে না। তাই নমনীয় হওয়া খুব জরুরি। মানুষের জীবনে নমনীয়তা কীভাবে আসে?

সহানুভূতি, মমতা, ক্ষমাশীলতা। উদার মনের মানুষ হওয়া। বুঝলেন তো, বিকাশ, মানসিক বিকাশের ধারণা। আমরা সবাই ধীরে ধীরে বেড়ে উঠি। আমাদের সবারই উন্নতির সুযোগ আছে। এই নীতিগুলো মানুষকে একসাথে থাকতে সাহায্য করে। যদি একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা না থাকে, যদি একে অপরের প্রতি মায়া বা দয়া না থাকে, যদি ভুল করলে তারা ক্ষমা না করতে পারে, যদি তারা সম্পর্কের মধ্যে একে অপরের বেড়ে ওঠাকে গ্রহণ না করে, তাহলে সেই সম্পর্ক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার জন্যই তৈরি। আসলেই তা শেষ হয়ে যাবে। ব্যর্থ বিবাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো কী?

ব্যর্থ বিবাহগুলোর সবচেয়ে সাধারণ বৈশিষ্ট হলো নমনীয়তার অভাব। যখন একজন মনে করে, সব কিছুই তার মতো করেই হতে হবে। মানে, আমার মতো হবে, নইলে কিছুই হবে না। ধরা যাক, স্বামী যদি জেদ করে, সব কিছু একটা নির্দিষ্টভাবে হবে, আর স্ত্রীও যদি নিজের মতো করে সব কিছু করতে চায়, আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেউই যদি একধাপ পিছিয়ে এসে সমঝোতা না করে, তাহলে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় একটা বড় সমস্যা। এটাই সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এখন প্রশ্ন হলো, এর মূল কারণটা কী? দুইটা বিষয় আমি সাধারণত ক্লায়েন্টদের শেখাই। যার মাধ্যমে তারা সম্পর্কের ব্যর্থতা এড়াতে পারে। প্রথমত, এমন একটা জিনিস আছে যেটাকে আমি বলি, সম্পর্কের নীরব ঘাতক। সম্পর্কের এই নীরব ঘাতক হলো, প্রত্যাশা বা অপূর্ণ প্রত্যাশা। এটার মানে কী?

আমরা সবাই কোনো না কোনো প্রত্যাশা নিয়ে একটা সম্পর্কে জড়াই। আমরা আশা করি কিছু জিনিস একটা নির্দিষ্টভাবে হবে, নিজের কাছ থেকে, সঙ্গীর কাছ থেকে, সম্পর্ক থেকে, এমনকি সমাজ থেকেও। কিন্তু যখন সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণ হয় না, তখন আমরা হতাশ হই। বারবার সেটা হলে মন খারাপ হতে শুরু করে, রাগ হয়। কারণ তখন সন্দেহ হতে শুরু করে, এখন থেকে কি এভাবেই চলবে? আমার জীবন কি এমনই হবে সামনে?

আর যখন এই সন্দেহগুলো মাথায় আসে, তখন উদ্বেগ শুরু হয়। কারণ এটাই প্রথম আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া। দুশ্চিন্তা শুরু হয়, ভবিষ্যতে জীবন কেমন হবে, পরিবর্তন আদৌ আসবে কিনা। এই রকম অনেক চিন্তা-ভাবনা মানুষকে অজানা ভয় ধরিয়ে দেয়। এই ভয় বেশি হলে মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন সে অসাড় হয়ে যায়। কারণ সে আর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে আমরা খুব বিরক্ত হতে শুরু করি। আমরা সহানুভূতিতে ক্লান্ত হয়ে যাই, আর ছোটখাটো বিষয় নিয়েও ঝগড়া শুরু করি। এরপর আমরা বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করি। তখন যেকোনো ছোট বিষয়েই রাগ উঠে যায়, আর রাগ তখন হয়ে ওঠে সমস্যা প্রকাশের মাধ্যম। তাই এটাই ছিল প্রথম বিষয় সম্পর্কের নীরব ঘাতক, অপূরণীয় প্রত্যাশা। দ্বিতীয় বিষয়টিকে আমি বলি, টিপিং পয়েন্ট। এই টিপিং পয়েন্টেই মানুষ সিদ্ধান্ত নেয় বিয়েটা ছেড়ে দেওয়ার। কারণ সম্পর্ক থেকে আমরা সবাই একই জিনিসটা খুঁজি। সবাই খোঁজে একই জিনিস। আর সেটা কী?

তা হলো, শান্তি ও মানসিক প্রশান্তি। আধুনিক সময়ে একে বলা হয় মানসিক পরিপূর্ণতা। এই মানসিক পরিপূর্ণতাই মানুষকে দেয় শান্তি ও প্রশান্তি। তাই বিচ্ছেদের প্রধান কারণ মানুষ বলে, "আমার এখন আর কোনো মানসিক পরিপূর্ণতা নেই।" এটার প্রধান কারণ কী? কারণ আমি নিজেকে যথাযথভাবে সমাদৃত মনে করি না। প্রশংসার অভাব। কিভাবে বুঝবেন আপনি সমাদৃত হচ্ছেন না? বলবেন, “আমি সেটা শুনি না, আমার সঙ্গীর মধ্যে দেখি না।” তাহলে কেমন সম্মান বা প্রশংসা আমরা চাই? কী ধরনের প্রশংসা দরকার আমাদের?

মৌখিক প্রশংসা যেমন “ধন্যবাদ,” বা “আজ তোমাকে দারুণ লাগছে।” “এই কাজটায় সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ।” বা শারীরিক স্পর্শ যেমন ভালোবাসার ছোঁয়া। যেমন, একটা আলিঙ্গন, চুমু, কিংবা হালকা ছোঁয়া, যা বোঝায় "তোমার সাথে আমি নিরাপদ বোধ করি।” “তোমার আশেপাশে থাকতেই ভালো লাগে।” যখন এই জিনিসগুলো হারিয়ে যায় সম্পর্ক থেকে, তখন মানুষ ভাবে, তার আর মূল্যায়ন নেই। সে তখন নিজেকে অপূর্ণ মনে করে, এবং সেটা সম্পর্ক ছাড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারপর মানুষ চুপচাপ হয়ে যায়। কারণ ভালো কিছু বলার না থাকলে, মানুষ চুপ হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কত দিন চুপ করে থাকা সম্ভব? বেশি দিন নয়। যেই না মুখ খুলবে, কি বের হবে?

ভালো কিছু না সমালোচনা বা বিচার। তখন আপনি তার কাজ নিয়ে সমালোচনা করবেন অথবা পুরো মানুষটাকেই বিচার করবেন। আর সেটাই সম্পর্ক ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। একজন পুরুষ বা নারী বিয়ে থেকে সবচেয়ে বেশি কী চায়? সাধারণভাবে যখন আমরা বলি, নারী ও পুরুষ একে অপরের কাছ থেকে কী চায় বা কী দরকার, তারা অনেক কিছু প্রত্যাশা করে ঠিকই, তবে সবচেয়ে বেশি কী চায়? এক কথায় বললে, তারা অনেক কিছু চায়, কিন্তু এক শব্দে…

নারীরা তাদের স্বামীর কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি যা চায়, তা হলো ভালোবাসা। আর একজন পুরুষ তার স্ত্রীর কাছ থেকে যা চায়, তা হলো সম্মান। তবে, ভালোবাসা আর সম্মান এই দুটি আসলে সমার্থক, অর্থাৎ, দুটো একই জিনিস। কিন্তু নারী-পুরুষ আলাদা ভাষায় তা প্রকাশ করে। মানে, একজন পুরুষও ভালোবাসা চায়, কিন্তু সে সেটা সম্মানের মাধ্যমে দেখে। আর নারীও সম্মান চায়, কিন্তু সেটা দেখে ভালোবাসা আর যত্নের মাধ্যমে। সমস্যা হয় তখনই, যখন একজন স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবাসা দেখায় না, তখন স্ত্রীও তাকে সম্মান দিতে চায় না। আর স্বামী যখন সম্মান পায় না, সে ভালোবাসাও দেখায় না। আর এভাবেই তৈরি হয় এক দুষ্টচক্র। ভালোবাসা না পেয়ে স্ত্রী সম্মানহীন আচরণ করে, স্বামী ভালোবাসাহীন আচরণ করে। স্ত্রী আবার সম্মানহীন হয়ে ওঠে। এভাবে চলতেই থাকে। কারো একজনকে এই চক্র ভাঙতে হবে। যেকোনো মূল্যে। আমাদের একে অপরকে ভালোবাসা আর সম্মান দেখাতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কিভাবে?

কারণ, আমি তো ভাবছিলাম আমি ঠিকঠাকই করছি! এই কাজটা করতে হলে, আপনাকে এমনভাবে তা করতে হবে, যেটা আপনার সঙ্গীর কাছে অর্থবহ, যদিও সেটা আপনার কাছে নাও হতে পারে। আমি মানুষকে একটা উদাহরণ দেই, ধরুন, একজন নারী ডার্ক চকলেট পছন্দ করেন, আর তার স্বামী পছন্দ করেন মিল্ক চকলেট। স্বামী যখন ভালোবাসা দেখাতে চায়, সে কিনে আনে মিল্ক চকলেট। স্ত্রী তখন কী অনুভব করবে? হতাশ, সে নিজেকে একা ভাববে, মনে করবে, স্বামী খুবই স্বার্থপরতা দেখাচ্ছে, স্বামী শুধু নিজের কথাই ভাবে। আর যখন স্ত্রী এটা বোঝাতে চায়, স্বামী কষ্ট পায়, কারণ সে ভেবেছিল সে ভালোই করছে। সে তখন স্ত্রীকে বলবে, “আমি তো তোমাকে সেরা চকলেট এনে দিচ্ছি।” “এইটা বেলজিয়ান চকলেট!

দারুণ!” স্ত্রী বলবে, “কিন্তু আমি তো ডার্ক চকলেট পছন্দ করি।” স্বামী জোর দিয়ে বলবে, “ডার্ক চকলেট আবার কে খায়?” “মিল্ক চকলেট ডার্ক চকলেটের চেয়েও ভালো!” অনেক স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমনই। স্বামী ভালোবাসা দিতে চায় নিজের মতো করে। আর স্ত্রী ভালোবাসা বা সম্মান দেখাতে চায় নিজের মতো করে। ফলে, আমরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। একজন স্বামীর উচিত, স্ত্রীর কাছে যেভাবে ভালোবাসা অর্থবহ, সেইভাবে তা প্রকাশ করা। সেটা তার কাছে অর্থহীন হলেও। এবং একইভাবে, একজন স্ত্রীরও স্বামীর জন্য কাজ করতে হবে, এমনভাবে যা স্বামীর কাছে অর্থবহ, স্ত্রীর কাছে অর্থহীন হলেও। যতক্ষণ না সেটা হারাম বা অযৌক্তিক কিছু হচ্ছে। নবী (সা.)-এর বৈবাহিক জীবনের কোনো হৃদয় ছোঁয়া গল্প কি আপনি শোনাতে পারেন?

তাঁর দয়ার কথা, বোঝাপড়ার কথা, তিনি ছিলেন সত্যিই... তিনি ছিলেন অত্যন্ত মমতাময়, দয়ালু, সহানুভূতিশীল। তিনি তাঁর স্ত্রীর প্রয়োজনগুলো বুঝতেন। এই বোঝাপড়ার এক অনন্য উদাহরণ সাফিয়া (রা.)। সাফিয়া (রাঃ) ইহুদি ধর্মের পটভূমি থেকে এসেছিলেন। যখন তিনি রাসূল (সা.)-কে বিয়ে করে মদিনায় গেলেন, তখন একমাত্র তিনিই ছিলেন, যিনি প্রায়ই রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে ইতিকাফে দেখতে যেতেন। বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে। এ সময় তো নবীজি (সা.) ইবাদাতে ব্যস্ত থাকতেন। তাহলে তিনি কেন তাঁকে দেখতে যেতেন?

কারণ তিনি সম্ভবত নবীজির (সা.)-এর একমাত্র স্ত্রী, যাঁর মদিনায় কোনো আত্মীয় ছিল না। অন্য সবার চাচাতো ভাই-বোন ছিল। মা-বাবা, পরিবার ছিল। কারণ তারা প্রধানত আরব ছিলেন, সাফিয়া ছাড়া, যিনি পরে এসেছিলেন। কিন্তু মদিনায় সাফিয়ার নিজের কোনো পরিবার ছিল না, নবীজি (সা.) ছাড়া। তাই সাফিয়া তাঁকে খুব মিস করতেন। মসজিদে যখন নবীজি (সা.) ইতিকাফ করতেন, তিনি দেখতে আসতেন। নবীজি (সা.) তখন কী বলতেন?

তিনি কি বলতেন, “এখানে কী করছ?” “এটা ইতিকাফ, আমাকে শেষ করতে দাও।” “আমি লাইলাতুল কদরের সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায় আছি।” না, তিনি এমন কিছু বলেননি। তিনি বলেননি, “অস্তাগফিরুল্লাহ, এই সময় মসজিদে আসতে পারবে না, ফিরে যাও।” রাতে তিনি নবীজি (সা.)-কে দেখতে যেতেন। কারণ তিনি স্বামীকে মিস করতেন। নবীজি (সা.) মসজিদে বসে তার সাথে বসে কথা বলতেন। তারপর যখন সাফিয়া সন্তুষ্ট হয়ে যেতেন, তখন তিনি যেতে চাইতেন, নবীজি (সা.) তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। তখনও সাফিয়া কথা বলতেন। কারণ তিনি নবীজি (সা.)এর সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো খুব ভালোবাসেন। তিনি কথা বলা শুরু করলে নবীজি (সা.)-ও কথা বলতেন। কারণ এটা সাফিয়ার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনাটি থেকে আমরা শিখি, নবীজি (সা.) সাফিয়ার প্রতি কতটা মমতা ও গুরুত্ব দিতেন, তার অনুভূতি ও আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি সময় দিতেন। নবীজি (সা.)-কে নিয়ে আমি বলতে পারি, তিনি ছিলেন খুবই স্নেহশীল, মমতাময়। তাঁর দয়া ও সহানুভূতির প্রকাশ আমরা দেখি তাঁর জীবনের শেষ সময়ে। যখন তিনি অসুস্থ অবস্থায় বারবার বলতেন, "আগামীকাল আমি কোথায় থাকব?" কারণ তাঁকে স্ত্রীদের ঘরে ঘরে পালাক্রমে থাকতে হতো। তখন অন্য স্ত্রীগণ বলতেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আয়েশার ঘরেই থাকুন, আমরা আপনাকে দেখতে আসব।” সেই শেষ মুহূর্তটি ছিল অপূর্ব এক দৃশ্য। আয়েশা (রা.) বলেছিলেন, তিনি নবীজি (সা.)-কে ধরে রেখেছিলেন, তাঁর পিঠকে নিজের বুকের ওপর রেখে, হাত ধরে কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন তাঁর জন্য, এবং নবীজি (সা.)-এর নিজ হাত দিয়ে তাঁর শরীর মুছে দিচ্ছিলেন যেন কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। এই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আয়েশা (রা.) বলেন, “তিনি আমার বুক আর গ্রীবার মাঝখানে ইন্তেকাল করেন” এর মানে কী?

তিনি বলেছিলেন, “শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি আমার স্বামীকে আঁকড়ে রেখেছিলাম।” কি অসাধারণ এক মুহূর্ত! আমি বলতে চাই, প্রত্যেক স্বামীই হয়তো চাইবেন তাদের শেষ মুহূর্তটা এমন হোক। আপনার মতে আজকাল এত ডিভোর্স হচ্ছে কেন? আপনি কি কখনো এমন পরিস্থিতিতে একটি সংসার ভাঙার হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছেন?

আলহামদুলিল্লাহ, অনেক সংসারই আমি রক্ষা করতে পেরেছি। তবে এটা বলছি না যে সবার ক্ষেত্রেই সফল হয়েছি। দুঃখজনকভাবে, অনেকেই আসে একেবারে শেষ মুহূর্তে। তখন বাধ্য হয়ে কাউন্সেলিংয়ে আসে, যখন সব কিছু প্রায় ভেঙে পড়ে। তারা আগে থেকেই জেদি ছিল, কাউন্সেলিংয়ে বিশ্বাসই করত না। “কেন বাইরের একজনকে আনব আমাদের সংসার নিয়ে কথা বলার জন্য?” তাই তারা শেষ মুহূর্তে আসে। আর ভাবে আপনি বুঝি কোনো অলৌকিক কিছু করে তাদের সম্পর্কটা বাঁচিয়ে দেবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, যখন সম্পর্কটা ভেঙে যায়, তখন তারা পরামর্শকেই দোষ দেয়। নিজেদেরকে দোষ দেয় না। তবে আলহামদুলিল্লাহ, অনেকেই আছেন যাদের দাম্পত্য জীবন আমরা রক্ষা করতে পেরেছি, মাশাআল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। জীবনে সব সময় মানুষের সাথে দেখা করাটা সত্যিই আমার জন্য অনেক আনন্দের, বিভিন্ন সম্মেলন বা ভ্রমণে। যখন তারা বলে, আলহামদুলিল্লাহ, আপনার সঙ্গে সেশনে ছিলাম বা আপনি আমাদের জন্য যা করেছিলেন, আলহামদুলিল্লাহ। তারা বলে, আপনার সাহায্য খুব উপকারে এসেছে। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সম্পর্কটা টিকে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিবাহবিচ্ছেদের মূল কারণ কী?

কারণ অনেক, এটা বলাই বাহুল্য। আজকাল অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, দুঃখজনকভাবে, অনেক পুরুষই প্রকৃত অর্থে পুরুষের ভূমিকায় আসতে পারছে না। অর্থাৎ, তারা সংসারে নেতৃত্ব দিচ্ছে না, যেভাবে দেওয়া উচিত। অন্যদিকে নারীরাও অনেক সময় নিজের ভূমিকা একজন স্ত্রী বা মায়ের মতো পালন করতে চায় না। ফলে সংসারের ভূমিকার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পুরুষরা চায় বিয়ে করেও অবিবাহিত জীবনের মতো চলতে। নারীরাও চায় বিয়ে করে নিজের মতো স্বাধীন জীবনযাপন করতে। কিন্তু বাস্তবে, বিয়ে সেরকমভাবে চলে না। এভাবে চললে একটা স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক গড়ে ওঠে না স্বামী-স্ত্রীর ও পরিবারের মধ্যে। এই কারণেই এখন দেখা যাচ্ছে, অনেক তরুণ-তরুণী এসে বলছে, “আমরা কি বিয়ে করলেও সন্তান না নিয়ে থাকতে পারি?” তারা সন্তান নিতে চায় না। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা হারাম নয়। আপনি চাইলে সন্তান না নিয়ে বাঁচতে পারেন। কিন্তু এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবেন কিভাবে?

একসময় এটা একঘেয়েমি হয়ে উঠবে। সন্তান নেওয়া সম্পর্কে সফলতা আনার আরেকটি উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। যাতে সম্পর্কটা এগিয়ে যেতে পারে। তবে এতে সম্পর্ক সহজ হয়ে যায় না, তবুও এটি আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সম্পর্ককে ধরে রাখার এবং দীর্ঘস্থায়ী করে তোলার। হ্যাঁ, কখনো কখনো আমরা দেখি, দুঃখজনকভাবে, পুরুষ ও নারীরা সত্যিই বিয়ের অর্থ বুঝতে পারে না। তারা যখন আসে, তখন একে অপরের কাছ থেকে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে আসে। আর যখন সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণ হয় না, তখন তারা ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়। একটি তিক্ত সম্পর্কের কি ইতি টানা কি ঠিক নাকি ধৈর্য ধরা উচিত আর বলা উচিত যে, এটা একটা পরীক্ষা, ইতি টানা উচিত হবে না?

আমরা যখন বলি টানাপোড়েনের বিয়ে, যদি সম্পর্কটায় শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন না থাকে, যদি এতে অতিরিক্ত কষ্ট না থাকে, তাহলে সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেই মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাই উত্তম। আল্লাহ কোরআনে বলেন, তালাক দেওয়ার আগে একটি সমঝোতায় পৌঁছনো উচিত। এই সমঝোতার লক্ষ্য হলো বৈবাহিক দায়িত্বগুলোকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা। এটা পুরোপুরি তালাকের চেয়ে ভালো। তবে যদি সম্পর্কটি হয় সহিংস, অনিরাপদ বা বিষাক্ত, তাহলে আলাদা হওয়াই তাদের জন্য উত্তম। ওয়াল্লাহু আলাম। এমন কিছু বলুন যা পরিস্থিতিকে একটু নরম করবে, যেটা আমার আর স্ত্রীর মধ্যে চাপ কমাবে, যখনই সম্পর্কে কোন প্রকার সমস্যায় পরি। মন থেকে একদম আন্তরিকভাবে বলছি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের এই সমস্যাগুলোর সমাধান দিয়েছেন সূরা ফুসসিলাত-এ, অর্থাৎ কুরআনের ৪১ নম্বর সূরায়, ৩৩ থেকে ৩৬ নম্বর আয়াতে। এই আয়াতের প্রেক্ষাপটে আল্লাহ বলেন, আমি পুরো আয়াত বলছি না, কিন্তু আল্লাহ বলেন, সব সময় উত্তমভাবে জবাব দাও। এর মানে আসলে কী?

আপনি দেখুন, আরবি শব্দটির মানে হলো ‘ধাক্কা দেওয়া’। আর ধাক্কা দিতে গেলে পরিশ্রম হয়… ঘাম ঝরে, ক্লান্তি আসে। এর মানে কী দাঁড়ায়?

বৈবাহিক জীবনে এমন অনেক সময় আসবে যখন আপনাকে নিজেকে সামলাতে হবে। কিন্তু সেই সামলানোটা শয়তানের বিরুদ্ধে হবে। কারণ শয়তান তখন বলবে, ‘চিৎকার করো, গালাগাল করো, এমনটা করো, ওমনটা করো।’ কিন্তু আপনাকে এসব থেকে নিজেকে থামাতে হবে। সব সময় উত্তরে এমন কিছু বলুন, যা সবচেয়ে ভালো। যদি আপনার জীবনসঙ্গী খারাপভাবে কিছু বলে, আপনি তখন আরো ভালোভাবে জবাব দিন, উত্তমভাবে। তিনি কেমন, সেটা দেখে নয় বরং আপনি কেমন, সেটার উপর ভিত্তি করেই তার সাথে আচরণ করুন। আমার চরিত্রের একটা উচ্চ মান আছে। আমি সেটাকেই ধরে রাখতে চাই। কে শুরু করেছে, সেটা বিষয় না। আমি সব সময় ঠিক কাজটাই করতে চাই। এটাই আসল কথা। সঠিক কাজ করাটাই আসল গুরুত্ব বহন করে। তাই আল্লাহ বলেন, সব সময় উত্তরে সবচেয়ে ভালোটা বলো। হতে পারে যার সঙ্গে আপনার শত্রুতা বা দ্বন্দ্ব ছিল, সে-ই একসময় আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হয়ে যাবে। আল্লাহ জানেন, এটা এত সহজ না। তাই তিনি বলেন, “যারা ধৈর্য ধরে, শুধু তারাই এটা পারবে।” মানে, ধৈর্য রাখা খুবই জরুরি। আর কোরআনে ধৈর্যের কোনো নির্দিষ্ট মূল্য লেখা নেই। কারণ ধৈর্যের তো কোনো দাম নির্ধারণ করা যায় না। আর তিনি বলেন, “তোমার পুরস্কার মানুষের কাছে না, সেটা আমার কাছেই থাকবে।” আর তোমার ধৈর্যের পুরস্কার আমি নিজে দেব। তাই মূল বিষয় হলো, আমাদের একে অপরের প্রতি সদয় হতে হবে। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে একে অপরের সঙ্গে, এবং মনে রাখতে হবে, ভুল তো হবেই। আমাদের শেখা উচিত কিভাবে ভুল ক্ষমা করতে হয়, ভুলে যেতে হয়, আর একসঙ্গে বেড়ে উঠতে হয়। এই জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নাকি সবসময়ই সম্পর্কটা ছিল ফুলেল, হাসিখুশি আর নিখুঁত?

এমন নিখুঁত কিছু আশা করা কি বাস্তবসম্মত?

না, না, না। নবীর (সা.) পরিবার ছিল একদম সাধারণ একটি পরিবার। তাঁকেও ‘নীরব প্রতিক্রিয়া’ বা কথা না বলার আচরণ সামলাতে হতো। তাঁর স্ত্রী কখনো কখনো বেশি খরচ বা ভরণপোষণের চাইতেন। তাঁকে কখনো কখনো স্ত্রীদের মধ্যকার মনোমালিন্য সামলাতে হতো, এমনকি কখনো কখনো মেয়ে ও আয়েশা (রা.)-এর মধ্যেও। সব পরিবারেই যেমন হয়, ওনার পরিবারেও রাগ বা অভিমান ছিল, চলত অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বা প্রয়োজনের বিষয়ে দ্বন্দ্ব। এ সবই হাদীসের কিতাবে উল্লেখ আছে। নবী (সা.)-এর হাদীসের কিতাবে এসব স্পষ্টভাবে বর্ণিত। তাঁকেও কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আর এসব কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর সেরা উপায় হলো, নিজের চরিত্র ও ব্যবহার। শেখ ইয়াসির বিরজাস, আপনার উত্তরগুলোর জন্য ধন্যবাদ। আমরা আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিক। আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ।