Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

"জন্মগত মুসলিম বনাম জন্মগত অমুসলিম - এটা কি ন্যায্য?'’

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

একটি খ্রিষ্টান দেশে জন্ম নেওয়া শিশু কি মক্কায় জন্ম নেওয়া শিশুর সমান? এখানে কি কোনো অসমতা আছে? এই ক্ষেত্রে, যে মানুষের পরিবার অমুসলিম তার দোষ কোথায়? সব অমুসলিমই কি দোজখে যাবে?

প্রথমত, যারা ইসলামিক দেশের বাইরে থাকেন তাদের কাছে একে হয়তো অসুবিধা মনে হতে পারে। তবে, এর পরিশেষে গেলে আমরা দেখব যে বিষয়টি এমন নয়। চলুন এই বিষয়ে একসাথে আলোচনা করি। ধর্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ভূমিতে বাস করা আবশ্যিক শর্ত নয়। এর অনেক উদাহরণ আছে। যেমন, আপনারা সবাই হয়তো মুসা (আ) নবীর (মোজেস) কাহিনী জানেন। মুসা নবী ফেরাউনের ঘরে বসবাস করতেন, যিনি ছিলেন একজন অত্যাচারী শাসক যে কিনা নিজেকে স্রষ্টা দাবি করেছিলেন এবং এমন মানুষদের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন যারা ছিল অবিশ্বাসী। কিন্তু, অবশেষে, তিনি একজন নবী হন। অন্যদিকে, নবী ইব্রাহিম (আ), একটি অন্ধকার স্থানে বেড়ে ওঠেন, এমন একটি সম্প্রদায়ে যারা মূর্তিপূজা করতো, এমনকি তার বাবাও। কিন্তু, আবারও, অবশেষে ইমানদারদের ভূমি থেকে যতই দূর হোক না কেন তারা আলোর পথে এসেছেন। অন্যদিকে, আছিয়া, ফেরাউনের স্ত্রী, ফেরাউনের পরিবর্তে, তার স্রষ্টাকে খুঁজে পেলেন, অবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে মুক্তি পেয়ে এবং তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বাদ না দিয়ে। তাহলে ভেবে দেখুন: এমনকি ফেরাউনের স্ত্রীও এই ধরনের পরিবেশে ইমান আনতে পারেন। চলুন আমরা এটিকে অন্যভাবে দেখি। আবু লাহাব, নবী মুহাম্মদ (সা) এর চাচা ছিলেন, আমাদের নবীর সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন, কিন্তু হেদায়াতের সবচেয়ে নিকটে থাকার পরও তিনি বিশ্বাস করতে চাননি। তাকে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান বলে মনে করা হলেও, তিনি আমাদের দেখিয়েছেন যে ইমান আনা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এতেই প্রমাণ হয় যে অমুসলিম দেশে বাস করলেও মানুষ তার প্রচেষ্টার মাধ্যমে হেদায়াত লাভ করতে পারে, যা হয়তো ইসলামিক দেশে বসবাসকারী ব্যক্তিরা পারে না। আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি যে অনেক খ্রিষ্টান অথবা বিধর্মী ব্যক্তি কিছু গবেষণা করে প্রমাণ খুঁজে পাচ্ছে এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে, অন্যদিকে যেসব মুসলিম কোনো গবেষণা করেনি, তারা তাকলিদ (অনুকরণ) জনিত অবস্থার কারণে ইসলাম থেকে দূরে সরে যেতে পারে। একারণে, কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, একজন ব্যক্তির মূল চাবি হলো তার মনকে কাজে লাগানো এবং গবেষণা করা। এই চাবির সাহায্যে, ইনশাআল্লাহ, ইমানের দরজা খুলে যাবে। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে কৌতূহলী। সে ক্ষুদ্র কোনো বিষয় নিয়েও অনুসন্ধান করে। একজন কৌতূহলী ব্যক্তি কিভাবে নিজেকে সবচেয়ে জরুরী বিষয় নিয়ে প্রশ্ন না করে থাকতে পারে, যেমন ''আমি কোথা থেকে এলাম?

কে আমাকে এখানে পাঠাল? এবং আমি কোথায় যাচ্ছি?'' কেন সে কৌতূহল বশত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্বেষণ করে না? আপনার কি মনে হয় না এতে অদ্ভুত কিছু আছে? ধরুন আপনি একটা প্লেনে আছেন। আপনি মাঝের সারিতে বসে আছেন। আপনি সামনের সারির দিকে তাকিয়ে আছেন, এবং তারা কিছু সময় পর পর সামনের সারির লোকদের তুলে প্লেনের বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো, তাদের জায়গায় নতুন লোকদের বসাল। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতিতে, আপনি কি বলবেন না ''আমি এখানে কী করছি? আমি কোথা থেকে এসেছি, আর ছুঁড়ে ফেলে দেয়া লোকগুলো কোথায় যাচ্ছে? শীঘ্রই আমার পালা আসছে। আপনি কি কৌতূহল নিয়ে খোঁজ করবেন না, কারো কাছে এর একটি ব্যাখ্যা চাইবেন না?

এবং ধরুন, সেই পর্যায়ে, আপনার কাছে কেউ এসে বলল, এখানে কি ঘটছে তা নিয়ে আপনি চিন্তিত হবেন না। আপনি আপনার সামনে থাকা কম্পিউটারে আপনার পছন্দের যেকোনো গেইম খেলতে পারেন। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনাকে কিছু খাবার দিব এবং আপনি আপনার পছন্দের যেকোনো সুস্বাদু খাবার বেছে নিতে পারবেন। আপনি শুধু আরাম করুন।'' এমন ক্ষেত্রে, আপনি সম্ভবত আপনার সামনে পরিবেশিত বস্তুর দিকে একবারও তাকাবেন না, আপনি মূল জিনিসটাই লক্ষ্য করবেন। এই বিশ্ব ঠিক একটি দ্রুতগামী প্লেনের মতো। আমরা আমাদের চোখ খুলেই নিজেকে পৃথিবীর এই উড়োজাহাজে আবিষ্কার করেছি। এরপর, আমরা এমন জিনিসে ডুবে থেকেছি যাতে আত্মা তৃপ্তি পায়, যেমন কম্পিউটার গেমস, সময়-নষ্ট করা মুভি আর টিভি শো তাই আমরা মোটেও টের পাইনি যে আমরা সেই প্লেনে ছিলাম। আমরা দেখতে পাইনি মানুষ প্রতিদিন মারা যাচ্ছে এবং তাদের বদলে নতুন মানুষের জন্ম হচ্ছে। আমরা কেবল সুস্বাদু খাবার নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি। এর জন্য আমরা সবাই দায়ী। আসক্তি সৃষ্টিকারী খেলনার পেছনে সময়ের অপচয় নানাভাবে গবেষণা দক্ষতা ব্যবহার করা থেকে আমাদের বিরত রেখেছে। যদিও আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে গবেষণা করি, এমনকি আমাদের ডায়েট সংক্রান্ত আর্টিকেল পড়ি, আমরা কি জানি পরকালে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

দূর্ভাগ্যবশত, আমাদের প্রথমে কী করা উচিত তা নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। যাইহোক, কৌতূহলই বিজ্ঞানের জনক। যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করে সে সত্যকে আবিষ্কার করতে নিজের বিদ্যাকে কাজে লাগায়। ব্যাপারটা যদি এমন হয়, তাহলে এখানে মূল বিষয় হল মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও অভিযোজন, কিন্তু প্রকৃত সত্য হল মানুষ তার জীবনযাপনে, সাময়িক সুখের অনুভূতি এবং আসক্তিকর বিনোদনকে অগ্রাধিকার দেয়। এবং মনকে একপাশে সরিয়ে রেখে, কৌতূহল সঞ্চারের পথ রোধ করে রাখে। অবশ্যই, এর ফলস্বরূপ, তারা হয়তো সত্যকে আবিষ্কার করতে পারবে না। আরেকটি ব্যাপারকে প্রায় ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয় সেটি হলো ইমান মুসলিমদের জান্নাতের নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু এটা জানা গুরুত্বপুর্ণ যে বিশ্বাস হলো সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তাই আমরা জানি না শেষ পর্যন্ত কে একজন ইমানদার হবে। যেসব মুসলিম অনুকরণ বশত বিশ্বাস করে, যারা আল্লাহ সম্পর্কে জানেন না, গবেষণা ও প্রমাণের মাধ্যমে তাদের ইমানকে মজবুত করেন না, এবং এসব বিষয়কে অবজ্ঞা করেই জীবন পার করেন, তারা আরো বড় বিপদে পড়বেন। কারণ তারা নিজেদেরকে বিশ্বাস করিয়েছে যে, তাদের বিশ্বাসই যথেষ্ট, কিন্তু তারা বিশ্বাসী হিসেবে মারা যাবে কি না তা অজানা। সুতরাং, অমুসলিমদের যেমন তথ্য ও প্রমাণ ব্যবহার করে তাদের বিশ্বাস নিয়ে গবেষণা ও উপলব্ধি করতে হবে তেমনি মুসলমানদেরও অবশ্যই তা করতে হবে। এবং এই প্রশ্নের জন্য, "সকল কাফের কি জাহান্নামে যাবে?" 'অন্তুবর্তী সময়ের মানুষ' ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন অন্তবর্তী সময়ের কথা ভাবি, অনেকেই আমাদের মহানবী (সা) এবং নবী ইসা (আ) যে ধর্ম এনেছিলেন তার মধ্যবর্তী সময়কালকে মনে করে। তবে, এই শব্দটি কোনো নবীর মাধ্যমে প্রেরিত ধর্মের আলো থেকে অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তি বা সময়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। ইমাম গাজ্জালি আমাদের মহানবী (সা.) এর আগমনের পর মানুষের অবস্থা সম্পর্কে নিম্নলিখিত শ্রেণিবিন্যাস করেন। আমাদের মহানবী (সা.) এর আগমনের পর, অবিশ্বাসীদের তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: যার মধ্যে প্রথম হলো যারা আমাদের নবীর (সা.) ডাক শোনেননি। এবং তারা জানতেন না। এই শ্রেণি নিঃসন্দেহে জান্নাতের অধিবাসী। দ্বিতীয় শ্রেণী: তারা আমাদের নবীর (সা.) দাওয়াত, মুজেযা এবং তার সুন্দর নৈতিক আদর্শের কথা সম্পর্কে শুনেছিল, কিন্তু এরপরেও তারা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে। নিঃসন্দেহে এই দলটি জাহান্নামের অধিবাসী। তৃতীয় শ্রেণি: এই শ্রেণি অন্য দুটির মাঝামাঝি। যদিও তারা আমাদের নবীর (সা.) নাম শুনেছে, তবে তারা তাঁর গুণাবলী ও চরিত্রের কথা শোনেনি। এই লোকেরা রাসূল (সা.) কে খুব ছোট থেকেই জানত 136 00:05:38,237 --> 00:05:40,406 এবং পরে একজন মিথ্যা নবী হিসেবে, যার নাম মুহাম্মাদ। তারা আমাদের নবী (সা.) সম্পর্কে গুজব ছাড়া আর কিছুই শোনেনি। যদিও ইমাম গাজ্জালি এই শ্রেণির লোকদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু বলেননি, তবে তিনি বলেছেন, "আমার মতে, তাদের অবস্থা প্রথম দলের লোকদের মতো, অর্থাৎ, যারা আমাদের নবীর কথা কখনও শোনেনি। কারণ তারা আমাদের নবীর নাম শুনেছিল, তাঁর চরিত্রের বিপরীতের সাথে মিশ্রিত অবস্থায়। এটি মানুষকে গভীরভাবে চিন্তা করতে এবং সত্য সন্ধানে অনুসন্ধান করতে উত্সাহিত করে না। আমরা যখন মহাবিশ্বের দিকে তাকাই, তখন আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর সহানুভূতি দেখতে পাই। প্রতিটি প্রাণির চাহিদা সদয়ভাবে ও ক্ষমার সাথে পূরণ করা হয়। হ্যাঁ, অসংখ্য চাহিদা পূরণ ও জীবিকা এমন সব জায়গা থেকে আসে, যেগুলোর সামর্থ্য আমাদের নেই, আমরা জানি না এবং কখনো আশাও করি না। এটা একজন করুণাময়, দয়াময় ও যত্নশীল সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে দেখায়। যদি তাই হয়, তবে তিনি প্রতিটি ব্যক্তির পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালভাবে অবগত আছেন, বিশেষ করে যাদের সম্পর্কে তিনি সবচেয়ে বেশি যত্নশীল, যখন এটি ইমানের একটি অপরিহার্য বিষয়। নিঃসন্দেহে তিনি তাদের প্রতি ক্ষমা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে আচরণ করবেন। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের উচিত আল্লাহর উদারতার কথা স্মরণ করে এভাবেই বিষয়গুলোর নিকটবর্তী হওয়া। আল্লাহ কি তাদের প্রতি নিষ্ঠুর হতে পারেন, যাদের প্রতি তোমরা সমবেদনা ও সহানুভূতিশীল?

আমরা কি ধরে নিতে পারি যে, আল্লাহ, যিনি আপনাকে সহানুভূতির অনুভূতি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ভালোবাসাপূর্ণ, তাদের প্রতি তার সহানুভূতি নেই? আল্লাহ ন্যায়পরায়ণও এবং এ বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে পরকালে প্রতিষ্ঠিত আদালতে তিনি যে নিরপেক্ষভাবে বিচার করবেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। এই তথ্য অনুযায়ী, যদি প্রতিটি ব্যক্তিকে তার সামর্থের মধ্যে যাচাই করা হয় এবং দায়বদ্ধ করা হয়, আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে: "আমি আমার সুযোগ কতটা ভালোভাবে ব্যবহার করছি? আমার প্রতি দাবিগুলো আমি কতটুকু পূরণ করতে পারবো?