ইসলামের উৎপত্তি কিভাবে হলো? - বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্মের ইতিহাস। অসাধারণ বিশ্লেষণ!
প্রকাশের তারিখ
৬০০ শতাব্দীর প্রথম দিকের কথা আরব উপদ্বীপের এক উত্তপ্ত ও প্রখর গরম দিন। একটি ছোট মেয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল তার বাবা কী করছেন। তিনি দেখলেন, তার বাবা একটি গর্ত খুঁড়ছেন মরুভূমির মধ্য। যদিও সে বিভ্রান্ত ছিল, তবুও সে অত্যন্ত খুশি ছিল যে অবশেষে তার বাবা কিছুটা সময় তার সাথে কাটাচ্ছেন। প্রথম বারের মতো কারণ, এর আগে সে তার বাবার কাছ থেকে কখনো কোনো ভালোবাসা পায়নি। এক পর্যায়ে, মেয়েটি এমনকি তাকে গর্ত খুঁড়তে সাহায্য করার চেষ্টা করছিল। যখন গর্তটি আরও গভীর এবং গভীর হতে লাগল, তার কৌতূহলও বাড়তে থাকল। তারা কি কোনো খেলা খেলতে যাচ্ছে? কীভাবে হবে সেই খেলা?
যখন সে বুঝতে চেষ্টা করছিল কী হতে যাচ্ছে, হঠাৎ একটি ধাক্কায় সে নিজেকে গর্তের তলায় আবিষ্কার করল। তার বাবা তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে ছিলেন। তার মেয়ের ভীত মুখের দিকে না তাকিয়ে, তিনি দ্রুত গর্তে মাটি ফেলতে শুরু করলেন। এই ভয়ানক দৃশ্যটি ইসলামের পূর্ববর্তী আরবের। জাহিলিয়্যাতের সময় অজ্ঞতার সময়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুঃখজনকভাবে খুবই সাধারণ ছিল, সেই অন্ধকার যুগে। মেয়েদের বিবেচনা করা হত, লজ্জার কারণ হিসাবে। তাদের সবচেয়ে নির্মম উপায়ে জীবন্ত কবর দেওয়া হত, তাদের নিজেদের বাবার দ্বারা, যাদের কাছ থেকে তারা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা আশা করতো। কিন্তু শুধু তাই নয়। অনেক নিরপরাধ মানুষ রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ নিতে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছিল। এতিমদের দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল। সবলেরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছিল। কোনো আইন বা ন্যায়বিচার ছিল না সেখানে। মানুষ এতটাই পথভ্রষ্ট ছিল যে, তারা এতদূর চলে গিয়েছিল। তারা পাথর দিয়ে মূর্তি বানাত এবং সেই মূর্তিগুলোকে পূজা করত যা তারা নিজেরাই তৈরি করতো। তারা সেগুলো থেকে সাহায্য ও সুরক্ষা আশা করত। আধ্যাত্মিক পরিবেশটি অন্ধকার মেঘে আচ্ছন্ন ছিল। হৃদয় ভরা ছিল সহিংসতায়। আর মন ছিল অজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। পরিস্থিতি এমন ছিলো যে, আত্মাগুলো যেন নিঃশ্বাস ফেলার বাতাস খুজছে। তারা মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করছিল। এমন সময়ে, আল্লাহ প্রেরণ করেন নির্দেশনার আলো এবং সমস্ত অন্ধকারকে রূপান্তর করেন আলোয়। সে আলো ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। সালটি ছিল ৬০৮ খ্রিস্টাব্দ। নবুয়াত পাওয়ার আগে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, মুহাম্মদ (সা.) আরও বেশি পরিচিত হয়ে উঠলেন এবং তার সততা এবং নৈতিকতার জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠলেন। কেউ কখনও দেখেনি যে তিনি একবারও মিথ্যা বলেছেন। এবং তিনি হয়ে উঠলেন সমাজের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিদের একজন। এতটাই যে তাকে এই উপাধি দেওয়া হলো “মুহাম্মদ আল-আমিন।” বিশ্বাসী মুহাম্মদ। একদিন, তার গোত্র, কুরাইশ, খুব জোরেসোরে কাবা মেরামতের চেষ্টা করছিল। যখন এটি অবশেষে শেষ হলো, গোত্রগুলো একমত হতে পারল না যে কে পবিত্র হাজরে আসওয়াদ পাথরটিকে তার স্থানে স্থাপন করবে। প্রত্যেকে বিশ্বাস করত যে তাদের পরিবার এই সম্মানের যোগ্য। তীব্র বিতর্কের কারণে, তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাল যেখানে তারা একে অপরকে হত্যার শপথ নিচ্ছিল। তখন, তাদের সর্বসম্মতিক্রমে, মুহাম্মদ আল-আমিন বিচারক হিসেবে কাজ করলেন এবং সমস্যাটি সমাধান করলেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে সংঘর্ষের অবসান ঘটালেন। তিনি তাদের হাজরে আসওয়াদ একটি কাপড়ে রাখতে বললেন, এবং প্রতিটি গোত্রের নেতা কাপড়টি বহন করলেন এর এক একটি প্রান্ত ধরে। অবশেষে, তিনি পাথরটি তুলে নিলেন এবং নিজ হাতে এটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখলেন। এই সিদ্ধান্তে সবাই খুবই সন্তুষ্ট হলো। ৬১০ সাল। রাসূল (সা.) চল্লিশ বছরের কাছাকাছি বয়সে পৌঁছেছিলেন। যখন অত্যাচার ও অবিচার, আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল মক্কায়, তিনি চেয়েছিলেন নির্মম মূর্তিপূজকদের ছেড়ে দিয়ে নিজ প্রভুর সাথে একান্তে সময় কাটাতে। তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না যা কিছু ঘটছিল শহরে। একপর্যায়ে, তিনি সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে নিয়মিত নূর পর্বতে উঠে যেতেন। তিনি যখন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন, নিজ প্রভুর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে চিন্তা করতেন এবং প্রার্থনা করতেন মাসের পর মাস, দিনের পর দিন, যা তাঁর স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসাকে দিন দিন বাড়িয়ে তুলছিল। একদিন, হঠাৎ তিনি এমন এক সত্তার সম্মুখীন হলেন যাকে তিনি আগে কখনও দেখেননি। তিনি ছিলেন জিব্রাঈল। আল্লাহ্র বার্তাবাহক ফেরেশতা। এবং শেষ সত্য কিতাব, কুরআনের প্রথম আয়াত পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়। পড়ুন । আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন । সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড হতে। পড়ুন । আর আপনার রব ভীষণ দয়ালু। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। প্রথম ওহি এবং নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তিনি মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে শুরু করলেন, নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের দিয়ে তা শুরু করলেন। আর প্রথম নারী যিনি ঈমান এনেছিলেন তিনি ছিলেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা। প্রথম পুরুষ যিনি ঈমান এনেছিলেন তিনি ছিলেন আবু বকর। এবং প্রথম শিশু ছিলেন আলী (রা.)। ওহীর প্রথম বছরগুলোতে, ইসলামের প্রতি আহ্বান গোপনে করা হত। এইভাবে, মুসলিমরা বিপদের হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষার চেষ্টা করতেন। সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই বিশ্বাসীরা ছিলেন। পুরুষ, নারী, দরিদ্র, ধনী থেকে শুরুকরে স্বাধীন, দাস, প্রাপ্তবয়স্ক, শিশু, সবাই। এবং সময়ের সাথে সাথে তাদের সংখ্যা প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি পৌঁছাল। তৃতীয় বছরের শেষে, নবী (সা.) সাফা পাহাড়ে দাঁড়ালেন এবং কুরাইশের মানুষদের ইসলামের কথা প্রকাশ্যে জানালেন। সালটি ছিল ৬১৪। অবিশ্বাসীরা, যারা তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্ম বহু বছর ধরে, পালন করে আসছিলেন, নতুন এই ধর্ম নিয়ে তারা মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল ইসলামের ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর জন্য। তারা এটিকে ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের বাধা হিসেবে দেখছিল। গোত্রগুলোর মধ্যে আধিপত্যের জন্য লড়াই চলতো। এ কারণেই তারা শোনার পরিবর্তে যা কিছু বলা হচ্ছিল তা উপেক্ষা করছিলো। তাদের কাছে এই ধর্ম ছিল অগ্রহণযোগ্য, কারণ এটি তাদের সমস্ত ধারণা পরিবর্তন করে দিচ্ছিল। এটা কি সম্ভব যে কালো এবং সাদা, ধনী এবং দরিদ্র, সম্ভ্রান্ত এবং সাধারণ মানুষ, দাস এবং মুক্ত সবাই সমান হতে পারে?
কিভাবে এদের সবাইকে ভাই এবং বোন বলা যায়? কন্যাদের মূল্যায়ন করা, নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা, তাদের মতামত প্রকাশের, কথা বলার অধিকার দেওয়া। এটা বলা যে “মায়েদের পায়ের নিচে বেহেশত” এই ধারণাগুলো তাদের জন্য খুবই অদ্ভুত ছিল সেই সময়। তারা বলছিল, এই নতুন ধর্ম কোথা থেকে এলো?
যেহেতু তারা ইসলামকে দাস এবং দরিদ্রদের ধর্ম হিসেবে দেখছিল, তাই তারা তাদের অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা সব ধরনের চেষ্টা করছিল, মুমিনদেরকে তাদের ঈমান থেকে ফিরিয়ে আনতে। তারা তাদের অপমান করছিল, মারধর করছিল, তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিল। মুসলমানরা সবচেয়ে নিষ্ঠুর যন্ত্রণার শিকার হয়েছিল শুধুমাত্র এই কথা বলার কারণে যে, “আল্লাহ আমার প্রভু, এবং আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।” সালটি ছিল ৬১৬ তাদের উপর অত্যাচারের ফলে, ১০১ সদস্যের মুসলমানদের একটি দল আবিসিনিয়ায় চলে গিয়েছিল যাতে তারা শান্তিতে তাদের ধর্ম পালন করতে পারে। তাদের আগে, আরো ১৯জন মুসলিমও সেখানে চলে গিয়েছিল, কিন্তু রাসূল (সা.) এবং তার কিছু সাহাবী মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন। আবিসিনিয়ার রাজা, নাজাশি, বলেছিলেন যে বাইবেল এবং তওরাতে পূর্বাভাস দিয়েছিল রাসূল মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনের। তিনি মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার দেশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার। সকল অত্যাচারের পরেও, মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ছিল। যে দু'জন যাদেরকে মক্কার প্রায় সবাই ভয় করতো, তারাও মুসলিম হয়ে গিয়েছিল। হামজা এবং উমর (রা)। এটি বিশ্বাসীদের শক্তি এবং সাহস আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রথমবারের মতো একত্রে, মুসলিমরা রাস্তায় বেরিয়ে খোলাখুলি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিল। এটি একটি চিহ্ন ছিল যে ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে শুরু করেছিল। সালটি ছিল ৬১৭। মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে, মূর্তিপূজারীদের ক্রোধও বাড়তে শুরু করেছিল। কুরাইশরা প্রত্যেকটি উপায়েই চেষ্টা করেছিল রাসূল (সা.) এবং তাঁর অনুসারীদের থামানোর জন্য। তিনি তার প্রচার ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের করা সকল প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যেমন, আমরা আপনাকে সবচেয়ে ধনী বানাবো, আমরা আপনাকে আমাদের নেতা বানাবো, ইত্যাদি ইত্যাদি। মিথ্যা এবং উপহাসের কথাগুলো না রাসূল (সা.) কে নিরুৎসাহিত করতে পারছিল না তার চারপাশের মানুষদের। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়ে ব্যর্থ হয়ে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরু করেছিল। এবং যখন সেটিও কাজ করেনি, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিষ্ঠুর বয়কট আরম্ভ করতে রাসূল (সা.) সহ, হাশিমের বংশধরের পরিবারের বিরুদ্ধে। তারা তাদের থেকে কিছু বিক্রি বা ক্রয় কিছুই করতো না। তারা এমনকি তাদের প্রতিরোধ করত যারা মুসলিমদের কাছে কিছু বিক্রি করতে চাইতো, কিংবা তাদের কোনোভাবে সাহায্য করতে চাইতো। বৃদ্ধ, শিশু, নারী এবং অসুস্থদের মধ্যে কোন পার্থক্য না রেখে, তারা তাদের ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং একাকীত্বে রাখতে চেয়েছিল যেন তারা শেষ পর্যন্ত সত্যকে ছেড়ে দেয়। সালটি ছিল ৬১৯ বয়কট বিষয়টা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং ক্লান্তিকর। প্রায় সময়, মুসলিমরা কোনো ধরনের খাদ্য খুঁজে পেত না এবং অনেকগুলো দিন টানা ক্ষুধায় কাটাত। এমনকি বাঁচার জন্য তাদের খেতে হতো পশুর চামড়া এবং গাছের ছাল। যখন মানুষ দেখল যে রাসূল (সা.) তাঁর সমস্ত ধন-সম্পত্তি প্রত্যাখ্যান করছেন এইজন্যে যে, অন্যরা সবাই কেবলমাত্র তাঁর কারণেই কষ্ট সহ্য করছেন, তারা তার আন্তরিকতা অস্বীকার করতে পারল না এবং তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করলো। এমন এক সত্যের পথে কি দাঁড়াতে পারে যা তৃপ্ত এবং আলোকিত করে প্রাণ, হৃদয় এবং মনকে?
দীর্ঘ তিন বছর পর, বয়কট শেষ হয়ে আসে, যা ছিল সমস্ত মুসলিমদের জন্য এবং রাসূল (সা.) এর জন্য অনেক বড় স্বস্তির। কিন্তু একই বছরে তিনি তার দুই গুরুত্বপূর্ণ সমর্থককে হারালেন যারা একপায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার প্রতিটি কষ্টে। তার চাচা আবু তালিব এবং তার প্রিয় স্ত্রী খাদিজা(রা)। এ কারণে সেই বছরটিকে বলা হয়েছিল দুঃখের বছর। সালটি ছিল ৬২০। সকল দুঃখ সত্ত্বেও, আমাদের রাসূল (সা.) জানতেন যে এটি পরীক্ষার পৃথিবী। এবং তিনি তার কর্তব্য পালনে থামেননি, একটি মুহূর্তের জন্যও। তার জাতিকে ঈমান এবং হেদায়েত দেওয়া ছিল আল্লাহর উপর। তাই তিনি তার দ্বায়িত্বে মনোযোগ দিয়েছিলেন। যা ছিল ওহী পৌঁছানো। তাই তিনি যান সেই এলাকার এক বড় শহর, তায়েফে, যাইদের সাথে তাদের ইসলাম গ্রহণে আহ্বান করতে। কিন্তু তাদের নেতা-গণের আদেশে, তায়েফের মানুষ তাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। ২.৫ কিলোমিটাররের দুরত্ব যা ৩০০০ পদক্ষেপ এরও বেশি, নিষ্ঠুরভাবে পাথর ছোঁড়া, থুতু নিক্ষেপ এবং অপমানিত হতে হয়েছিল। তায়েফ থেকে, যেখানে তিনি গিয়েছিলেন, জনগণের চিরন্তন জীবন রক্ষার জন্য, রাসূল মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় ফিরে আসেন, রক্ত এবং আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে। দুঃখের পর দুঃখ সহ্য করার পর, আল্লাহ আমাদের রাসূল (সা.) কে এক মহান আশীর্বাদ দান করেন এবং তাঁকে নিয়ে যান মিরাজে। মিরাজের মাধ্যমে, আল্লাহ তাঁকে দেখিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর রাসূলকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করেন এবং তাকে সবচেয়ে বড় উপহারগুলার একটি দেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর সংগ্রামে দৃঢ়, রাসূলুল্লাহ (সা.) হজ্জ মৌসুমে তাবু ঘুরে ফিরে দাওয়াত দিতে থাকেন। এবং অবশেষে মদিনার একটি যুবকের দল আকাবায় ইসলাম গ্রহণ করে। সালটি ছিল ৬২১। মুসাইব ইবনু উমাইর, যিনি ছিলেন, রাসূল (সা.) এর অন্যতম প্রধান সাহাবী, মদিনায় তাকে কুরআনের শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। এটি সেখানে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং অনেক মানুষ শাহাদা গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটে। সালটি ছিল ৬২২। এখন মক্কায় ইসলাম চর্চা করা আর সম্ভব হচ্ছিলো না। নির্যাতন সীমা ছাড়িয়ে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। এ কারণে, মুসলিমরা অভিবাসন শুরু করেছিল মদিনায়, আলাদা আলাদা দলে। কিন্তু রাসূল (সা.) শেষ মুহূর্তে হিজরত করতে যাচ্ছিলেন। কারণ, একজন নেতা হিসেবে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে সবাই মদিনায় নিরাপদে পৌঁছেছে। তাই তিনি মক্কাতেই থাকলেন। মদিনায় মুসলিমদের শক্তিশালী এক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা দেখে, অবিশ্বাসীরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা একমত হয়েছিল যে রাসূল (সা.) কে হত্যা করে তাদেরকে একটা চিরস্থায়ী সমাধান করতে হবে। রাসূল (সা.), আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে, অত্যন্ত গোপনে তাদের যাত্রা শুরু করলেন এবং যাত্রাপথে হেরা গুহায় আশ্রয় নিলেন কাফেরদের কাছ থেকে লুকাতে। আলৌকিকভাবে, আল্লাহ দুটি প্রাণীকে নিযুক্ত করেছিলেন। একটি মাকড়সা তাড়াতাড়ি একটি জাল বানালো, এবং একটি পাখি বাসা তৈরি করল গুহার প্রবেশপথ বন্ধ করার জন্য। ভেতরে কেউ থাকতে পারে না ভেবে, কাফেররা ফিরে গেল। হিজরতের সময়, তিনি বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু তার প্রভু তাকে রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ পরে এই বাস্তবতা কুরআনে উল্লেখ করেন এবং বলেন, "মানুষের অনিষ্ট হতে আল্লাহ্ই আপনাকে রক্ষা করবেন" এবং এটাই চরম সত্যি। তিঁনি তাঁর জীবনব্যাপী একাধিক হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে অবশেষে তিনিঁ তাঁর বিছানায় মৃত্যুবরণ করেন। যখন তিনি হেরাগুহা থেকে বের হয়ে আসলেন, যেখানে তিনি আল্লাহর রহমতে রক্ষা পেয়েছিলেন, ভারাক্রান্ত মনে মক্কার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আল্লাহর কসম, তুমি আল্লাহর সবচেয়ে ভালো ভূমি এবং আল্লাহর ভূমির মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। আল্লাহর কসম, যদি আমি তোমাদের থেকে বহিষ্কৃত না হতাম, তবে আমি কখনোই চলে যেতাম না," তারপর আবার পথ চলা অব্যাহত রাখলেন। মক্কার যুগ এখন শেষ, এবং মদিনার যুগ শুরু হয়েছে। এই তারিখটি শুরু হিসেবে ধরা হয়েছিল হিজরি ক্যালেন্ডারের। তিনি বলেছিলেন, "যদি তারা সূর্যকে আমার ডান হাতে এবং চন্দ্রকে আমার বাম হাতে এনে দেয় তবুও, আমি কখনোই ইসলামকে রক্ষা করা থামাব না যতক্ষণ না আল্লাহ একে জয়ী করেন কিংবা আমি এটিকে রক্ষা করতে করতে মারা যাই।" সালটি ছিল ৬২৩। হিজরতের পর, ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান, মদিনার সংবিধান, ইসলামী রাষ্ট্র গঠন হয়েছিল। সে বছরটি ছিলো ৬২৪ সাল। ইসলাম পরিপূর্ণভাবে চর্চা এবং পালন হতে শুরু করল মদিনায়। এই সময়কালে, মক্কার কাফিরদের সাথে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ, "বদর যুদ্ধ" সংঘটিত হয়েছিল। শত্রুদের তুলনায়, মুসলিম সেনারা অনেক দুর্বল ছিল অস্রশস্রের দিক থেকে। এবং তাদের সংখ্যাও ছিল অনেক কম। শুধু ৩১৩ জন মুসলিম যোদ্ধা লড়াই করেছিল কুরাইশের ১০০০ সেনার বিরুদ্ধে। যুদ্ধের শেষে, ৭০ জন কাফির, এবং কুরাইশের অনেক প্রখ্যাত নেতা যেমন আবু জাহেল নিহত হয়েছিলো এবং ১৪ জন মুসলিম শহীদ হন। এটি ইসলামের প্রথম বিজয়ের সূচনা। এবং তখন থেকে, কিছুই আর আগের মতো ছিল না। মদিনার প্রথম বছরগুলিতে, বাধ্যতামূলক ইবাদতগুলো পালন করা হচ্ছিল। রোজা ফরজ করা হয়েছিল। প্রথম ঈদুল ফিতর উদযাপন করা হয়েছিল। তারপর এসেছিল আরও একটি বরকতের সুযোগ। প্রথম ঈদুল আজহা। তারপর, জাকাত ফরজ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ইসলামের মৌলিক আদেশগুলো এক এক করে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। প্রথম বছরগুলোতে, আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের বিশ্বাস, আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিশ্বাস, এবং মানব জীবনের সৃষ্টির উদ্দেশ্য মুসলিমদের হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এবং এখানে আইন ও ইবাদতের বিধান প্রচলিত হতে শুরু করেছিল। সালটি ছিল ৬২৫। উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এটি ছিল একটি যুদ্ধ যেখানে মুসলিমরা লড়েছিল ৭০০ জন যোদ্ধা নিয়ে এবং অবিশ্বাসীদের এর সাথে ছিল ৩০০০ জন। শুরুর দিকে, মুসলিমরা শত্রুকে ধ্বংস করছিল। কিন্তু যখন তীরন্দাজরা তাদের অবস্থান ত্যাগ করল, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে, অবিশ্বাসীরা পাল্টা হামলা চালালো এবং মুসলিমরা যুদ্ধ হেরে যায়। ৭০ জন মুসলিম শহীদ হন এবং ২০ এর বেশি অবিশ্বাসী নিহত হয়। আল্লাহর সিংহ, হামজা, যিনি ইসলামের জন্য এতটা কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন, তিনিও ছিলেন শহীদদের মধ্যে । হত্যা করার পরেও, তার দেহ প্রতিশোধের কারণে বিকৃত করা হয়েছিল। সালটি ছিল ৬২৬। মদিনার রাস্তায় মদ বইছিল যেন নদীর মতো। এমনটা হয় তখন যখন মদপান সম্পূর্ণভাবে হারাম করা হয়েছিল। প্রত্যেকে তাদের বাড়ি থেকে সমস্ত মদ রাস্তার মধ্যে ঢেলে দিয়েছিল। যদিও এটি ছিল তাদের সমাজের তিনটি প্রধান পানীয়ের মধ্যে একটি, এটি ছিল মদ নিষেধের আয়াত নাজিলের পরের সেই দৃশ্য। যখন ধূমপানের মতো একটা অভ্যাসও মুছে ফেলা একটা ছোট সমাজেও অসম্ভব ছিল, কিন্তু পুরো মুসলিম জাতির একসাথে তৎক্ষণাৎ মদ ত্যাগ করা, কুরআনের অলৌকিক শক্তিরই প্রমাণ। হৃদয় এবং মনের মধ্যে, এবং এর উৎস শুধু আল্লাহই হতে পারেন। সালটি ছিল ৬২৭। আহযাবের যুদ্ধে, যা পরিখার যুদ্ধ নামেও পরিচিত, মুসলিমরা লড়াই করেছিল কাফিরদের সাথে যারা আরবের সর্বত্র থেকে একত্রিত হয়েছিল কুরাইশের নেতৃত্বে। প্রায় ১২,০০০ জনের একটি সেনাদল নিয়ে, তারা মদিনায় এসেছিল মুছে দিতে সমস্ত মুসলিমদের, একই সঙ্গে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদেরও। অপরদিকে ভিন্ন একটি যুদ্ধ কৌশল নিয়ে, মুসলিমরা মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করেছিল শহর রক্ষা করার জন্য। এই চমৎকার কৌশল কাজ করেছিল এবং কাফিররা সেই পরিখা অতিক্রম করতে পারেনি। অবশেষে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল এবং মুসলিমরা যুদ্ধে জয়লাভ করে। সালটি ছিল ৬২৮। মুসলিমদের মনটা কাঁদছিল মক্কার কাবাকে স্মরণ করে বহু বছর ধরে এবং অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে উমরাহ পালন করতে চেয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে তারা একসাথে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু কুরাইশরা এটি প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল, তাই তাদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যা হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। এটি আসলে একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত ছিল। কারণ আপাতদৃষ্টিতে যদিও চুক্তির শর্তাবলী কাফিরদের পক্ষে মনে হয়েছিল, বাস্তবে এটি কিন্ত তাদের চূড়ান্ত পরাজয়ের দিকে নিয়ে যায়। মুসলিমরা সেই বছর কাবা পরিদর্শন করতে পারবে না, কিন্তু এক বছর পর পারবে। তাছাড়া, তাদের মধ্যে দশ বছরের জন্য অস্ত্রবিরতি থাকবে। কুরাইশের সাথে কোনো সংঘাত না থাকার সুবিধা নিয়ে, রাসূল মুহাম্মদ (সা.) তার বার্তা আরও বেশি গোত্র এবং জাতির মাঝে ছড়িয়ে দিতে মনোযোগ দেন। ইসলামের দাওয়াতের চিঠি পাঠানো হয় প্রতিবেশী দেশগুলোর শাসকদের কাছে, বাইজান্টাইন এবং সাসানীয় সম্রাটদের থেকে শুরু করে প্রায় সর্বত্রই। কারণ ইসলাম এমন কোনো ধর্ম নয় যা একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা জাতির জন্য পাঠানো হয়েছে, বরং এটি সমগ্র পৃথিবী এবং সমস্ত জাতির জন্য প্রেরিত। সালটি ছিল ৬২৯। চুক্তির পরে, কুরাইশদের ইসলামের প্রতি বাক্রুদ্ধতা এবং একগুঁয়েমি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। হৃদয় এবং মন আরও বেশি খোলা হতে থাকে ইসলামের প্রতি। এক অর্থে, শারীরের তরবারি নামিয়ে রাখা হয়েছিল এবং ইসলামের আধ্যাত্মিক হীরার তরবারি মন এবং হৃদয় জয় করেছিল। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, কুরাইশদের একজন সামরিক প্রতিভা এই সত্যগুলোকে উপেক্ষা করতে পারলেন না এবং মুসলিম হবার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সময়কালে, মু'তা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে। যেখানে তিনজন মহান সেনাপতি যাইদ, জাফর, এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা শহীদ হয়েছিলেন, একের পর এক, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এবং তার প্রতিভাময় কৌশলে, মুসলিম বাহিনী খুব কঠিন পরিক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, বিশাল বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীকে যা তাদেরকে বিপুল সংখ্যায় পরাস্থ করেছিল বার বার। বাইজান্টাইনরা প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পর, দুই পক্ষই পিছু হটে। এটি ছিল প্রথম যুদ্ধ মুসলিম এবং বাইজান্টাইনের মধ্যে। সালটি ছিল ৬৩০। চুক্তি স্বাক্ষরের দুই বছর পর, হুদাইবিয়ার সন্ধি লঙ্ঘন করেছিল মক্কার কাফিররা। বহু বছরের বিচ্ছেদের পরে, কাবা এবং মক্কার প্রতি আকাঙ্ক্ষা অপরিসীমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এবং অবশেষে, এটি সমাধানের সময় এসেছিল। মুসলিমদের ঈমান পূর্ণ হৃদয় সাথে নিয়ে, রাসূল (সা.) প্রস্তুতি শুরু করলেন মক্কা বিজয়ের। মুসলিম বাহিনী, যা এক থেকে হাজারে এবং আসতে আসতে এখন ১০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, মক্কায় প্রবেশ করেছিল প্রচণ্ড আনন্দ এবং উত্তেজনার সাথে। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটা সবচেয়ে সুন্দর বিজয়। কারণ মক্কা জয় করা হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই। তারপর, রাসূল (সা.) ঘোষণা করেছিলেন একটি সাধারণ ক্ষমা, এবং বলেছিলেন যে সবাইকে ক্ষমা করা হয়েছে। এটি ছিল এমন একটি দয়া এবং মহত্ত্ব যা বিশ্বের ইতিহাসে তুলনাহীন। তিনি এমনকি তাদেরও ক্ষমা করেছিলেন যারা শহীদ করেছিল তার চাচা হামজাকে এবং বিকৃত করেছিল তার মৃতদেহ। ওয়াহশি, হামজাকে শহীদকারী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং হয়ে যান ওয়াহশি (রা)। অর্থাৎ, প্রতিটি মুসলিম তার জন্য প্রার্থনা করত, বলত, "আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোক।" হিন্দ, যিনি হামজাকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন এবং তার কলিজা চিবিয়ে ছিলেন, তিনিও সাহাবী হয়ে যান। যারা আল্লাহর রাসূলকে নির্যাতন করেছিল, সব রকমভাবে, তাকে অপমান করেছিল, যারা ছিল তার ভয়ঙ্কর শত্রু, যারা তাকে আঘাত দিয়ে আনন্দ পেত, তাদের ক্ষমা করে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর, একের পর এক গোত্র ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। প্রায় ৭০টি গোত্রে প্রতিনিধি পাঠানো হয় এবং তারা সবাই মুসলিম হয়ে যায়। ইসলামের দ্বারা শাসিত ভূমি ধীরে ধীরে আরও বড় হতে থাকে। সালটি ছিল ৬৩২। এখন আমরা পৌঁছেগেছি একেবারে শেষ পর্যায়ে। আমাদের রাসূল (সা.) মদিনা ছেড়ে বিদায়ী হজ্জের জন্য রওনা দিয়েছিলেন। প্রায় এক লক্ষ মুসলিমের সামনে দাঁড়িয়ে, তিঁনি তাঁর বিদায়ী খুতবা প্রদান করেন। এক মুহূর্তের জন্য, আমি আপনাকে সেখানে নিজেকে কল্পনা করতে বলবো এবং শুনতে বলব। তার খুতবার এক অংশে, তিনি এই কথাগুলোই বলেছিলেন। “হে মানুষ!
সমগ্র মানবজাতি আদম ও হাওয়ার বংশধর। একজন আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই একজন অনারবের উপর, এবং একজন অনারবেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই একজন আরবের উপর। তেমনি, একজন সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই একজন কালোর উপর, এবং একজন কালোরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই একজন সাদার উপর, তাকওয়া (আল্লাহর প্রতি সচেতনতা) এবং উত্তম কাজের মাধ্যমে পথ চলা। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সে ব্যক্তি যে তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।” তিনি তখন ৬৩ বছর বয়সী ছিলেন। কয়েক দিন ধরে চলতে থাকা তার অসুস্থতা, তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং তার ব্যথা বাড়ছিল। এটি ছিল তার জন্য তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। প্রতীক্ষা শেষ হয়েছিল। তিনি এই পৃথিবী ত্যাগ করেছিলেন এবং চিরন্তন জগতে যোগ দিয়েছিলেন। এবং সর্বশক্তিমান বন্ধুর সাথে মিলিত হয়েছিলেন। রাফিকুল আআলা মাত্র ২৩ বছরের ছোট সময়কালের মধ্যে, রাসূল (সা.) এমন একটি পরিবর্তন এনেছিলেন যা আগে কখনো দেখা যায়নি মানবজাতির ইতিহাসে। তার পরে, সেই পিতা যিনি তার মেয়েকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন, একটি মাছিরও ক্ষতি করতে ভয় পেতে শুরু করেন। যারা একসময় একে অপরের বিরুদ্ধে তরবারি তুলেছিল, তারা এখন প্রস্তুত একে অপরের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে। যে জাতির মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল অপসংস্কৃতি যা "জাহেলিয়া" নামে পরিচিত ছিল, অজ্ঞতা, তা পুরোপুরি চলে গিয়েছিল, এবং যেন একদম ভিন্ন একটি জাতি এসেছিল তাদের জায়গায়। তাদের নীতি-নৈতিকতা এবং চরিত্র এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল যা উদাহরণ হিসেবে স্থাপিত হয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সমগ্র মানবজাতির জন্য। সংক্ষেপে, আল্লাহর রাসূল (সা.) কয়লাকে উজ্জ্বল হীরাতে পরিণত করেছিলেন, এবং তিনি হৃদয়ে যে আলো ছড়িয়েছিলেন, তা অঙ্কুরিত হয়েছিল, ফুটিয়েছিল, এবং আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল, এবং তা আমাদের কাছে এই বর্তমান সময় পর্যন্ত পৌছেছে। তার উপর চিরন্তন শান্তি ও বরকত বর্ষিত হোক। আমিন।
যখন সে বুঝতে চেষ্টা করছিল কী হতে যাচ্ছে, হঠাৎ একটি ধাক্কায় সে নিজেকে গর্তের তলায় আবিষ্কার করল। তার বাবা তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে ছিলেন। তার মেয়ের ভীত মুখের দিকে না তাকিয়ে, তিনি দ্রুত গর্তে মাটি ফেলতে শুরু করলেন। এই ভয়ানক দৃশ্যটি ইসলামের পূর্ববর্তী আরবের। জাহিলিয়্যাতের সময় অজ্ঞতার সময়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুঃখজনকভাবে খুবই সাধারণ ছিল, সেই অন্ধকার যুগে। মেয়েদের বিবেচনা করা হত, লজ্জার কারণ হিসাবে। তাদের সবচেয়ে নির্মম উপায়ে জীবন্ত কবর দেওয়া হত, তাদের নিজেদের বাবার দ্বারা, যাদের কাছ থেকে তারা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা আশা করতো। কিন্তু শুধু তাই নয়। অনেক নিরপরাধ মানুষ রক্তক্ষয়ী প্রতিশোধ নিতে মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছিল। এতিমদের দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছিল। সবলেরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছিল। কোনো আইন বা ন্যায়বিচার ছিল না সেখানে। মানুষ এতটাই পথভ্রষ্ট ছিল যে, তারা এতদূর চলে গিয়েছিল। তারা পাথর দিয়ে মূর্তি বানাত এবং সেই মূর্তিগুলোকে পূজা করত যা তারা নিজেরাই তৈরি করতো। তারা সেগুলো থেকে সাহায্য ও সুরক্ষা আশা করত। আধ্যাত্মিক পরিবেশটি অন্ধকার মেঘে আচ্ছন্ন ছিল। হৃদয় ভরা ছিল সহিংসতায়। আর মন ছিল অজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। পরিস্থিতি এমন ছিলো যে, আত্মাগুলো যেন নিঃশ্বাস ফেলার বাতাস খুজছে। তারা মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করছিল। এমন সময়ে, আল্লাহ প্রেরণ করেন নির্দেশনার আলো এবং সমস্ত অন্ধকারকে রূপান্তর করেন আলোয়। সে আলো ছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। সালটি ছিল ৬০৮ খ্রিস্টাব্দ। নবুয়াত পাওয়ার আগে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, মুহাম্মদ (সা.) আরও বেশি পরিচিত হয়ে উঠলেন এবং তার সততা এবং নৈতিকতার জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠলেন। কেউ কখনও দেখেনি যে তিনি একবারও মিথ্যা বলেছেন। এবং তিনি হয়ে উঠলেন সমাজের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিদের একজন। এতটাই যে তাকে এই উপাধি দেওয়া হলো “মুহাম্মদ আল-আমিন।” বিশ্বাসী মুহাম্মদ। একদিন, তার গোত্র, কুরাইশ, খুব জোরেসোরে কাবা মেরামতের চেষ্টা করছিল। যখন এটি অবশেষে শেষ হলো, গোত্রগুলো একমত হতে পারল না যে কে পবিত্র হাজরে আসওয়াদ পাথরটিকে তার স্থানে স্থাপন করবে। প্রত্যেকে বিশ্বাস করত যে তাদের পরিবার এই সম্মানের যোগ্য। তীব্র বিতর্কের কারণে, তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাল যেখানে তারা একে অপরকে হত্যার শপথ নিচ্ছিল। তখন, তাদের সর্বসম্মতিক্রমে, মুহাম্মদ আল-আমিন বিচারক হিসেবে কাজ করলেন এবং সমস্যাটি সমাধান করলেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে সংঘর্ষের অবসান ঘটালেন। তিনি তাদের হাজরে আসওয়াদ একটি কাপড়ে রাখতে বললেন, এবং প্রতিটি গোত্রের নেতা কাপড়টি বহন করলেন এর এক একটি প্রান্ত ধরে। অবশেষে, তিনি পাথরটি তুলে নিলেন এবং নিজ হাতে এটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখলেন। এই সিদ্ধান্তে সবাই খুবই সন্তুষ্ট হলো। ৬১০ সাল। রাসূল (সা.) চল্লিশ বছরের কাছাকাছি বয়সে পৌঁছেছিলেন। যখন অত্যাচার ও অবিচার, আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল মক্কায়, তিনি চেয়েছিলেন নির্মম মূর্তিপূজকদের ছেড়ে দিয়ে নিজ প্রভুর সাথে একান্তে সময় কাটাতে। তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না যা কিছু ঘটছিল শহরে। একপর্যায়ে, তিনি সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে নিয়মিত নূর পর্বতে উঠে যেতেন। তিনি যখন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন, নিজ প্রভুর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে চিন্তা করতেন এবং প্রার্থনা করতেন মাসের পর মাস, দিনের পর দিন, যা তাঁর স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসাকে দিন দিন বাড়িয়ে তুলছিল। একদিন, হঠাৎ তিনি এমন এক সত্তার সম্মুখীন হলেন যাকে তিনি আগে কখনও দেখেননি। তিনি ছিলেন জিব্রাঈল। আল্লাহ্র বার্তাবাহক ফেরেশতা। এবং শেষ সত্য কিতাব, কুরআনের প্রথম আয়াত পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়। পড়ুন । আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন । সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড হতে। পড়ুন । আর আপনার রব ভীষণ দয়ালু। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না। প্রথম ওহি এবং নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তিনি মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাতে শুরু করলেন, নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের দিয়ে তা শুরু করলেন। আর প্রথম নারী যিনি ঈমান এনেছিলেন তিনি ছিলেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা। প্রথম পুরুষ যিনি ঈমান এনেছিলেন তিনি ছিলেন আবু বকর। এবং প্রথম শিশু ছিলেন আলী (রা.)। ওহীর প্রথম বছরগুলোতে, ইসলামের প্রতি আহ্বান গোপনে করা হত। এইভাবে, মুসলিমরা বিপদের হাত থেকে নিজেদেরকে রক্ষার চেষ্টা করতেন। সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই বিশ্বাসীরা ছিলেন। পুরুষ, নারী, দরিদ্র, ধনী থেকে শুরুকরে স্বাধীন, দাস, প্রাপ্তবয়স্ক, শিশু, সবাই। এবং সময়ের সাথে সাথে তাদের সংখ্যা প্রায় ৪০ এর কাছাকাছি পৌঁছাল। তৃতীয় বছরের শেষে, নবী (সা.) সাফা পাহাড়ে দাঁড়ালেন এবং কুরাইশের মানুষদের ইসলামের কথা প্রকাশ্যে জানালেন। সালটি ছিল ৬১৪। অবিশ্বাসীরা, যারা তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্ম বহু বছর ধরে, পালন করে আসছিলেন, নতুন এই ধর্ম নিয়ে তারা মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল ইসলামের ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর জন্য। তারা এটিকে ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের বাধা হিসেবে দেখছিল। গোত্রগুলোর মধ্যে আধিপত্যের জন্য লড়াই চলতো। এ কারণেই তারা শোনার পরিবর্তে যা কিছু বলা হচ্ছিল তা উপেক্ষা করছিলো। তাদের কাছে এই ধর্ম ছিল অগ্রহণযোগ্য, কারণ এটি তাদের সমস্ত ধারণা পরিবর্তন করে দিচ্ছিল। এটা কি সম্ভব যে কালো এবং সাদা, ধনী এবং দরিদ্র, সম্ভ্রান্ত এবং সাধারণ মানুষ, দাস এবং মুক্ত সবাই সমান হতে পারে?
কিভাবে এদের সবাইকে ভাই এবং বোন বলা যায়? কন্যাদের মূল্যায়ন করা, নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্য করা, তাদের মতামত প্রকাশের, কথা বলার অধিকার দেওয়া। এটা বলা যে “মায়েদের পায়ের নিচে বেহেশত” এই ধারণাগুলো তাদের জন্য খুবই অদ্ভুত ছিল সেই সময়। তারা বলছিল, এই নতুন ধর্ম কোথা থেকে এলো?
যেহেতু তারা ইসলামকে দাস এবং দরিদ্রদের ধর্ম হিসেবে দেখছিল, তাই তারা তাদের অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা সব ধরনের চেষ্টা করছিল, মুমিনদেরকে তাদের ঈমান থেকে ফিরিয়ে আনতে। তারা তাদের অপমান করছিল, মারধর করছিল, তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছিল। মুসলমানরা সবচেয়ে নিষ্ঠুর যন্ত্রণার শিকার হয়েছিল শুধুমাত্র এই কথা বলার কারণে যে, “আল্লাহ আমার প্রভু, এবং আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।” সালটি ছিল ৬১৬ তাদের উপর অত্যাচারের ফলে, ১০১ সদস্যের মুসলমানদের একটি দল আবিসিনিয়ায় চলে গিয়েছিল যাতে তারা শান্তিতে তাদের ধর্ম পালন করতে পারে। তাদের আগে, আরো ১৯জন মুসলিমও সেখানে চলে গিয়েছিল, কিন্তু রাসূল (সা.) এবং তার কিছু সাহাবী মক্কায় রয়ে গিয়েছিলেন। আবিসিনিয়ার রাজা, নাজাশি, বলেছিলেন যে বাইবেল এবং তওরাতে পূর্বাভাস দিয়েছিল রাসূল মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনের। তিনি মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার দেশে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার। সকল অত্যাচারের পরেও, মুসলিমদের সংখ্যা বাড়ছিল। যে দু'জন যাদেরকে মক্কার প্রায় সবাই ভয় করতো, তারাও মুসলিম হয়ে গিয়েছিল। হামজা এবং উমর (রা)। এটি বিশ্বাসীদের শক্তি এবং সাহস আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রথমবারের মতো একত্রে, মুসলিমরা রাস্তায় বেরিয়ে খোলাখুলি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিল। এটি একটি চিহ্ন ছিল যে ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে শুরু করেছিল। সালটি ছিল ৬১৭। মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে, মূর্তিপূজারীদের ক্রোধও বাড়তে শুরু করেছিল। কুরাইশরা প্রত্যেকটি উপায়েই চেষ্টা করেছিল রাসূল (সা.) এবং তাঁর অনুসারীদের থামানোর জন্য। তিনি তার প্রচার ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের করা সকল প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যেমন, আমরা আপনাকে সবচেয়ে ধনী বানাবো, আমরা আপনাকে আমাদের নেতা বানাবো, ইত্যাদি ইত্যাদি। মিথ্যা এবং উপহাসের কথাগুলো না রাসূল (সা.) কে নিরুৎসাহিত করতে পারছিল না তার চারপাশের মানুষদের। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়ে ব্যর্থ হয়ে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরু করেছিল। এবং যখন সেটিও কাজ করেনি, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিষ্ঠুর বয়কট আরম্ভ করতে রাসূল (সা.) সহ, হাশিমের বংশধরের পরিবারের বিরুদ্ধে। তারা তাদের থেকে কিছু বিক্রি বা ক্রয় কিছুই করতো না। তারা এমনকি তাদের প্রতিরোধ করত যারা মুসলিমদের কাছে কিছু বিক্রি করতে চাইতো, কিংবা তাদের কোনোভাবে সাহায্য করতে চাইতো। বৃদ্ধ, শিশু, নারী এবং অসুস্থদের মধ্যে কোন পার্থক্য না রেখে, তারা তাদের ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং একাকীত্বে রাখতে চেয়েছিল যেন তারা শেষ পর্যন্ত সত্যকে ছেড়ে দেয়। সালটি ছিল ৬১৯ বয়কট বিষয়টা ছিল অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং ক্লান্তিকর। প্রায় সময়, মুসলিমরা কোনো ধরনের খাদ্য খুঁজে পেত না এবং অনেকগুলো দিন টানা ক্ষুধায় কাটাত। এমনকি বাঁচার জন্য তাদের খেতে হতো পশুর চামড়া এবং গাছের ছাল। যখন মানুষ দেখল যে রাসূল (সা.) তাঁর সমস্ত ধন-সম্পত্তি প্রত্যাখ্যান করছেন এইজন্যে যে, অন্যরা সবাই কেবলমাত্র তাঁর কারণেই কষ্ট সহ্য করছেন, তারা তার আন্তরিকতা অস্বীকার করতে পারল না এবং তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করলো। এমন এক সত্যের পথে কি দাঁড়াতে পারে যা তৃপ্ত এবং আলোকিত করে প্রাণ, হৃদয় এবং মনকে?
দীর্ঘ তিন বছর পর, বয়কট শেষ হয়ে আসে, যা ছিল সমস্ত মুসলিমদের জন্য এবং রাসূল (সা.) এর জন্য অনেক বড় স্বস্তির। কিন্তু একই বছরে তিনি তার দুই গুরুত্বপূর্ণ সমর্থককে হারালেন যারা একপায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার প্রতিটি কষ্টে। তার চাচা আবু তালিব এবং তার প্রিয় স্ত্রী খাদিজা(রা)। এ কারণে সেই বছরটিকে বলা হয়েছিল দুঃখের বছর। সালটি ছিল ৬২০। সকল দুঃখ সত্ত্বেও, আমাদের রাসূল (সা.) জানতেন যে এটি পরীক্ষার পৃথিবী। এবং তিনি তার কর্তব্য পালনে থামেননি, একটি মুহূর্তের জন্যও। তার জাতিকে ঈমান এবং হেদায়েত দেওয়া ছিল আল্লাহর উপর। তাই তিনি তার দ্বায়িত্বে মনোযোগ দিয়েছিলেন। যা ছিল ওহী পৌঁছানো। তাই তিনি যান সেই এলাকার এক বড় শহর, তায়েফে, যাইদের সাথে তাদের ইসলাম গ্রহণে আহ্বান করতে। কিন্তু তাদের নেতা-গণের আদেশে, তায়েফের মানুষ তাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। ২.৫ কিলোমিটাররের দুরত্ব যা ৩০০০ পদক্ষেপ এরও বেশি, নিষ্ঠুরভাবে পাথর ছোঁড়া, থুতু নিক্ষেপ এবং অপমানিত হতে হয়েছিল। তায়েফ থেকে, যেখানে তিনি গিয়েছিলেন, জনগণের চিরন্তন জীবন রক্ষার জন্য, রাসূল মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় ফিরে আসেন, রক্ত এবং আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে। দুঃখের পর দুঃখ সহ্য করার পর, আল্লাহ আমাদের রাসূল (সা.) কে এক মহান আশীর্বাদ দান করেন এবং তাঁকে নিয়ে যান মিরাজে। মিরাজের মাধ্যমে, আল্লাহ তাঁকে দেখিয়েছিলেন যে তিনি তাঁর রাসূলকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করেন এবং তাকে সবচেয়ে বড় উপহারগুলার একটি দেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর সংগ্রামে দৃঢ়, রাসূলুল্লাহ (সা.) হজ্জ মৌসুমে তাবু ঘুরে ফিরে দাওয়াত দিতে থাকেন। এবং অবশেষে মদিনার একটি যুবকের দল আকাবায় ইসলাম গ্রহণ করে। সালটি ছিল ৬২১। মুসাইব ইবনু উমাইর, যিনি ছিলেন, রাসূল (সা.) এর অন্যতম প্রধান সাহাবী, মদিনায় তাকে কুরআনের শিক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। এটি সেখানে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং অনেক মানুষ শাহাদা গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটে। সালটি ছিল ৬২২। এখন মক্কায় ইসলাম চর্চা করা আর সম্ভব হচ্ছিলো না। নির্যাতন সীমা ছাড়িয়ে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। এ কারণে, মুসলিমরা অভিবাসন শুরু করেছিল মদিনায়, আলাদা আলাদা দলে। কিন্তু রাসূল (সা.) শেষ মুহূর্তে হিজরত করতে যাচ্ছিলেন। কারণ, একজন নেতা হিসেবে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে সবাই মদিনায় নিরাপদে পৌঁছেছে। তাই তিনি মক্কাতেই থাকলেন। মদিনায় মুসলিমদের শক্তিশালী এক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা দেখে, অবিশ্বাসীরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা একমত হয়েছিল যে রাসূল (সা.) কে হত্যা করে তাদেরকে একটা চিরস্থায়ী সমাধান করতে হবে। রাসূল (সা.), আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে, অত্যন্ত গোপনে তাদের যাত্রা শুরু করলেন এবং যাত্রাপথে হেরা গুহায় আশ্রয় নিলেন কাফেরদের কাছ থেকে লুকাতে। আলৌকিকভাবে, আল্লাহ দুটি প্রাণীকে নিযুক্ত করেছিলেন। একটি মাকড়সা তাড়াতাড়ি একটি জাল বানালো, এবং একটি পাখি বাসা তৈরি করল গুহার প্রবেশপথ বন্ধ করার জন্য। ভেতরে কেউ থাকতে পারে না ভেবে, কাফেররা ফিরে গেল। হিজরতের সময়, তিনি বেশ কয়েকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু তার প্রভু তাকে রক্ষা করেছিলেন। আল্লাহ পরে এই বাস্তবতা কুরআনে উল্লেখ করেন এবং বলেন, "মানুষের অনিষ্ট হতে আল্লাহ্ই আপনাকে রক্ষা করবেন" এবং এটাই চরম সত্যি। তিঁনি তাঁর জীবনব্যাপী একাধিক হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে অবশেষে তিনিঁ তাঁর বিছানায় মৃত্যুবরণ করেন। যখন তিনি হেরাগুহা থেকে বের হয়ে আসলেন, যেখানে তিনি আল্লাহর রহমতে রক্ষা পেয়েছিলেন, ভারাক্রান্ত মনে মক্কার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আল্লাহর কসম, তুমি আল্লাহর সবচেয়ে ভালো ভূমি এবং আল্লাহর ভূমির মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। আল্লাহর কসম, যদি আমি তোমাদের থেকে বহিষ্কৃত না হতাম, তবে আমি কখনোই চলে যেতাম না," তারপর আবার পথ চলা অব্যাহত রাখলেন। মক্কার যুগ এখন শেষ, এবং মদিনার যুগ শুরু হয়েছে। এই তারিখটি শুরু হিসেবে ধরা হয়েছিল হিজরি ক্যালেন্ডারের। তিনি বলেছিলেন, "যদি তারা সূর্যকে আমার ডান হাতে এবং চন্দ্রকে আমার বাম হাতে এনে দেয় তবুও, আমি কখনোই ইসলামকে রক্ষা করা থামাব না যতক্ষণ না আল্লাহ একে জয়ী করেন কিংবা আমি এটিকে রক্ষা করতে করতে মারা যাই।" সালটি ছিল ৬২৩। হিজরতের পর, ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান, মদিনার সংবিধান, ইসলামী রাষ্ট্র গঠন হয়েছিল। সে বছরটি ছিলো ৬২৪ সাল। ইসলাম পরিপূর্ণভাবে চর্চা এবং পালন হতে শুরু করল মদিনায়। এই সময়কালে, মক্কার কাফিরদের সাথে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ, "বদর যুদ্ধ" সংঘটিত হয়েছিল। শত্রুদের তুলনায়, মুসলিম সেনারা অনেক দুর্বল ছিল অস্রশস্রের দিক থেকে। এবং তাদের সংখ্যাও ছিল অনেক কম। শুধু ৩১৩ জন মুসলিম যোদ্ধা লড়াই করেছিল কুরাইশের ১০০০ সেনার বিরুদ্ধে। যুদ্ধের শেষে, ৭০ জন কাফির, এবং কুরাইশের অনেক প্রখ্যাত নেতা যেমন আবু জাহেল নিহত হয়েছিলো এবং ১৪ জন মুসলিম শহীদ হন। এটি ইসলামের প্রথম বিজয়ের সূচনা। এবং তখন থেকে, কিছুই আর আগের মতো ছিল না। মদিনার প্রথম বছরগুলিতে, বাধ্যতামূলক ইবাদতগুলো পালন করা হচ্ছিল। রোজা ফরজ করা হয়েছিল। প্রথম ঈদুল ফিতর উদযাপন করা হয়েছিল। তারপর এসেছিল আরও একটি বরকতের সুযোগ। প্রথম ঈদুল আজহা। তারপর, জাকাত ফরজ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ইসলামের মৌলিক আদেশগুলো এক এক করে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। প্রথম বছরগুলোতে, আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের বিশ্বাস, আখিরাত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিশ্বাস, এবং মানব জীবনের সৃষ্টির উদ্দেশ্য মুসলিমদের হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এবং এখানে আইন ও ইবাদতের বিধান প্রচলিত হতে শুরু করেছিল। সালটি ছিল ৬২৫। উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এটি ছিল একটি যুদ্ধ যেখানে মুসলিমরা লড়েছিল ৭০০ জন যোদ্ধা নিয়ে এবং অবিশ্বাসীদের এর সাথে ছিল ৩০০০ জন। শুরুর দিকে, মুসলিমরা শত্রুকে ধ্বংস করছিল। কিন্তু যখন তীরন্দাজরা তাদের অবস্থান ত্যাগ করল, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে ভেবে, অবিশ্বাসীরা পাল্টা হামলা চালালো এবং মুসলিমরা যুদ্ধ হেরে যায়। ৭০ জন মুসলিম শহীদ হন এবং ২০ এর বেশি অবিশ্বাসী নিহত হয়। আল্লাহর সিংহ, হামজা, যিনি ইসলামের জন্য এতটা কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন, তিনিও ছিলেন শহীদদের মধ্যে । হত্যা করার পরেও, তার দেহ প্রতিশোধের কারণে বিকৃত করা হয়েছিল। সালটি ছিল ৬২৬। মদিনার রাস্তায় মদ বইছিল যেন নদীর মতো। এমনটা হয় তখন যখন মদপান সম্পূর্ণভাবে হারাম করা হয়েছিল। প্রত্যেকে তাদের বাড়ি থেকে সমস্ত মদ রাস্তার মধ্যে ঢেলে দিয়েছিল। যদিও এটি ছিল তাদের সমাজের তিনটি প্রধান পানীয়ের মধ্যে একটি, এটি ছিল মদ নিষেধের আয়াত নাজিলের পরের সেই দৃশ্য। যখন ধূমপানের মতো একটা অভ্যাসও মুছে ফেলা একটা ছোট সমাজেও অসম্ভব ছিল, কিন্তু পুরো মুসলিম জাতির একসাথে তৎক্ষণাৎ মদ ত্যাগ করা, কুরআনের অলৌকিক শক্তিরই প্রমাণ। হৃদয় এবং মনের মধ্যে, এবং এর উৎস শুধু আল্লাহই হতে পারেন। সালটি ছিল ৬২৭। আহযাবের যুদ্ধে, যা পরিখার যুদ্ধ নামেও পরিচিত, মুসলিমরা লড়াই করেছিল কাফিরদের সাথে যারা আরবের সর্বত্র থেকে একত্রিত হয়েছিল কুরাইশের নেতৃত্বে। প্রায় ১২,০০০ জনের একটি সেনাদল নিয়ে, তারা মদিনায় এসেছিল মুছে দিতে সমস্ত মুসলিমদের, একই সঙ্গে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদেরও। অপরদিকে ভিন্ন একটি যুদ্ধ কৌশল নিয়ে, মুসলিমরা মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করেছিল শহর রক্ষা করার জন্য। এই চমৎকার কৌশল কাজ করেছিল এবং কাফিররা সেই পরিখা অতিক্রম করতে পারেনি। অবশেষে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল এবং মুসলিমরা যুদ্ধে জয়লাভ করে। সালটি ছিল ৬২৮। মুসলিমদের মনটা কাঁদছিল মক্কার কাবাকে স্মরণ করে বহু বছর ধরে এবং অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে উমরাহ পালন করতে চেয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে তারা একসাথে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু কুরাইশরা এটি প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল, তাই তাদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যা হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত। এটি আসলে একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত ছিল। কারণ আপাতদৃষ্টিতে যদিও চুক্তির শর্তাবলী কাফিরদের পক্ষে মনে হয়েছিল, বাস্তবে এটি কিন্ত তাদের চূড়ান্ত পরাজয়ের দিকে নিয়ে যায়। মুসলিমরা সেই বছর কাবা পরিদর্শন করতে পারবে না, কিন্তু এক বছর পর পারবে। তাছাড়া, তাদের মধ্যে দশ বছরের জন্য অস্ত্রবিরতি থাকবে। কুরাইশের সাথে কোনো সংঘাত না থাকার সুবিধা নিয়ে, রাসূল মুহাম্মদ (সা.) তার বার্তা আরও বেশি গোত্র এবং জাতির মাঝে ছড়িয়ে দিতে মনোযোগ দেন। ইসলামের দাওয়াতের চিঠি পাঠানো হয় প্রতিবেশী দেশগুলোর শাসকদের কাছে, বাইজান্টাইন এবং সাসানীয় সম্রাটদের থেকে শুরু করে প্রায় সর্বত্রই। কারণ ইসলাম এমন কোনো ধর্ম নয় যা একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা জাতির জন্য পাঠানো হয়েছে, বরং এটি সমগ্র পৃথিবী এবং সমস্ত জাতির জন্য প্রেরিত। সালটি ছিল ৬২৯। চুক্তির পরে, কুরাইশদের ইসলামের প্রতি বাক্রুদ্ধতা এবং একগুঁয়েমি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। হৃদয় এবং মন আরও বেশি খোলা হতে থাকে ইসলামের প্রতি। এক অর্থে, শারীরের তরবারি নামিয়ে রাখা হয়েছিল এবং ইসলামের আধ্যাত্মিক হীরার তরবারি মন এবং হৃদয় জয় করেছিল। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, কুরাইশদের একজন সামরিক প্রতিভা এই সত্যগুলোকে উপেক্ষা করতে পারলেন না এবং মুসলিম হবার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সময়কালে, মু'তা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে। যেখানে তিনজন মহান সেনাপতি যাইদ, জাফর, এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা শহীদ হয়েছিলেন, একের পর এক, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এবং তার প্রতিভাময় কৌশলে, মুসলিম বাহিনী খুব কঠিন পরিক্ষার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, বিশাল বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীকে যা তাদেরকে বিপুল সংখ্যায় পরাস্থ করেছিল বার বার। বাইজান্টাইনরা প্রচুর ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পর, দুই পক্ষই পিছু হটে। এটি ছিল প্রথম যুদ্ধ মুসলিম এবং বাইজান্টাইনের মধ্যে। সালটি ছিল ৬৩০। চুক্তি স্বাক্ষরের দুই বছর পর, হুদাইবিয়ার সন্ধি লঙ্ঘন করেছিল মক্কার কাফিররা। বহু বছরের বিচ্ছেদের পরে, কাবা এবং মক্কার প্রতি আকাঙ্ক্ষা অপরিসীমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এবং অবশেষে, এটি সমাধানের সময় এসেছিল। মুসলিমদের ঈমান পূর্ণ হৃদয় সাথে নিয়ে, রাসূল (সা.) প্রস্তুতি শুরু করলেন মক্কা বিজয়ের। মুসলিম বাহিনী, যা এক থেকে হাজারে এবং আসতে আসতে এখন ১০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, মক্কায় প্রবেশ করেছিল প্রচণ্ড আনন্দ এবং উত্তেজনার সাথে। এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটা সবচেয়ে সুন্দর বিজয়। কারণ মক্কা জয় করা হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই। তারপর, রাসূল (সা.) ঘোষণা করেছিলেন একটি সাধারণ ক্ষমা, এবং বলেছিলেন যে সবাইকে ক্ষমা করা হয়েছে। এটি ছিল এমন একটি দয়া এবং মহত্ত্ব যা বিশ্বের ইতিহাসে তুলনাহীন। তিনি এমনকি তাদেরও ক্ষমা করেছিলেন যারা শহীদ করেছিল তার চাচা হামজাকে এবং বিকৃত করেছিল তার মৃতদেহ। ওয়াহশি, হামজাকে শহীদকারী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং হয়ে যান ওয়াহশি (রা)। অর্থাৎ, প্রতিটি মুসলিম তার জন্য প্রার্থনা করত, বলত, "আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোক।" হিন্দ, যিনি হামজাকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন এবং তার কলিজা চিবিয়ে ছিলেন, তিনিও সাহাবী হয়ে যান। যারা আল্লাহর রাসূলকে নির্যাতন করেছিল, সব রকমভাবে, তাকে অপমান করেছিল, যারা ছিল তার ভয়ঙ্কর শত্রু, যারা তাকে আঘাত দিয়ে আনন্দ পেত, তাদের ক্ষমা করে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর, একের পর এক গোত্র ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। প্রায় ৭০টি গোত্রে প্রতিনিধি পাঠানো হয় এবং তারা সবাই মুসলিম হয়ে যায়। ইসলামের দ্বারা শাসিত ভূমি ধীরে ধীরে আরও বড় হতে থাকে। সালটি ছিল ৬৩২। এখন আমরা পৌঁছেগেছি একেবারে শেষ পর্যায়ে। আমাদের রাসূল (সা.) মদিনা ছেড়ে বিদায়ী হজ্জের জন্য রওনা দিয়েছিলেন। প্রায় এক লক্ষ মুসলিমের সামনে দাঁড়িয়ে, তিঁনি তাঁর বিদায়ী খুতবা প্রদান করেন। এক মুহূর্তের জন্য, আমি আপনাকে সেখানে নিজেকে কল্পনা করতে বলবো এবং শুনতে বলব। তার খুতবার এক অংশে, তিনি এই কথাগুলোই বলেছিলেন। “হে মানুষ!
সমগ্র মানবজাতি আদম ও হাওয়ার বংশধর। একজন আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই একজন অনারবের উপর, এবং একজন অনারবেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই একজন আরবের উপর। তেমনি, একজন সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই একজন কালোর উপর, এবং একজন কালোরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই একজন সাদার উপর, তাকওয়া (আল্লাহর প্রতি সচেতনতা) এবং উত্তম কাজের মাধ্যমে পথ চলা। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সে ব্যক্তি যে তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে।” তিনি তখন ৬৩ বছর বয়সী ছিলেন। কয়েক দিন ধরে চলতে থাকা তার অসুস্থতা, তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং তার ব্যথা বাড়ছিল। এটি ছিল তার জন্য তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়। প্রতীক্ষা শেষ হয়েছিল। তিনি এই পৃথিবী ত্যাগ করেছিলেন এবং চিরন্তন জগতে যোগ দিয়েছিলেন। এবং সর্বশক্তিমান বন্ধুর সাথে মিলিত হয়েছিলেন। রাফিকুল আআলা মাত্র ২৩ বছরের ছোট সময়কালের মধ্যে, রাসূল (সা.) এমন একটি পরিবর্তন এনেছিলেন যা আগে কখনো দেখা যায়নি মানবজাতির ইতিহাসে। তার পরে, সেই পিতা যিনি তার মেয়েকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন, একটি মাছিরও ক্ষতি করতে ভয় পেতে শুরু করেন। যারা একসময় একে অপরের বিরুদ্ধে তরবারি তুলেছিল, তারা এখন প্রস্তুত একে অপরের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে। যে জাতির মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল অপসংস্কৃতি যা "জাহেলিয়া" নামে পরিচিত ছিল, অজ্ঞতা, তা পুরোপুরি চলে গিয়েছিল, এবং যেন একদম ভিন্ন একটি জাতি এসেছিল তাদের জায়গায়। তাদের নীতি-নৈতিকতা এবং চরিত্র এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল যা উদাহরণ হিসেবে স্থাপিত হয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সমগ্র মানবজাতির জন্য। সংক্ষেপে, আল্লাহর রাসূল (সা.) কয়লাকে উজ্জ্বল হীরাতে পরিণত করেছিলেন, এবং তিনি হৃদয়ে যে আলো ছড়িয়েছিলেন, তা অঙ্কুরিত হয়েছিল, ফুটিয়েছিল, এবং আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল, এবং তা আমাদের কাছে এই বর্তমান সময় পর্যন্ত পৌছেছে। তার উপর চিরন্তন শান্তি ও বরকত বর্ষিত হোক। আমিন।