২১ বছর পর ১০,০০০ সৈন্যের মুসলিম বাহিনী মক্কায় প্রবেশ করল! - ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ) | পর্ব ১০
প্রকাশের তারিখ
কুরাইশদের প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। কুরাইশদের প্রতিভাবান নেতা আমর ইবনুল আস এবং কাবার চাবির রক্ষক উসমান ইবনে তালহা। তিনজনেই যাত্রা শুরু করেছিলেন ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে। কিন্তু তাদের পথ এসে মিলল হাদ্দাহ নামের এক স্থানে। তাদের সবার মধ্যে একটি বিষয় ছিল কমন। ইসলামের প্রতি তাদের ঘৃণা। খালিদ ইবনে ওয়ালিদের কথা মনে করুন। উহুদের যুদ্ধে যেখানে হামজা ও মুসাব ইবনে উমাইর শহীদ হন। মুসলিম বাহিনীর পরাজয়ের জন্য মূলত তিনিই দায়ী ছিলেন। তিনি মুশরিকদের বাহিনী পরিচালনা করেছিলেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আমর ইবনুল আসের কথা মনে আছে। যখন সাহাবীরা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তখন পেছনে ধাওয়া করেছিলেন তিনিই এবং তাদের ফিরিয়ে আনতে সম্ভাব্য সব চেষ্টাই তিনি করেছিলেন। তিনি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ব্যবহার করতেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে। তিনি বলতেন, সব কুরাইশ যদি মুসলিম হয়ে যায় তবুও মনে হয় না আমি কখনো মুসলিম হবো। আর উসমান ইবনে তালহার কথা বলতে গেলে উহুদের যুদ্ধে তিনি হারিয়েছিলেন তার বাবা, চাচা এবং চার ভাইকে। এক এক করে সবাইকে। তারা লড়াই করছিল কুরাইশদের পক্ষ হয়ে। এরপর এখন অনেক দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। তাদের চিন্তা ও অনুভূতিতে আমূল পরিবর্তন এসে গিয়েছিল। আর তাদের চরিত্রও পরিপক্ক হয়ে উঠেছিল। এই ভিডিও ধারাবাহিকটি তৈরি হয়েছে শত শত নির্ভরযোগ্য ইসলামী সূত্রের রেফারেন্সের ভিত্তি করে। সমস্ত AI visual প্রস্তুত করা হয়েছে যোগ্য মুসলিম স্কলারদের পরামর্শক্রমে এবং তা ইসলামিক নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা যেসব ঘটনার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন সেগুলো তাদের ক্লান্ত করে তুলেছিল। খালিদ ও উসমান মক্কায় ঠিক করেছিলেন এখানে দেখা করবেন। কিন্তু আমর তাদের কারো ব্যাপারেই জানতেন না। আল্লাহ এখানেই তাদের পথকে মিলিয়ে দিলেন। তাহলে তাদের এই যাত্রার উদ্দেশ্য কী ছিল?
আমর জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কোথায় যাচ্ছেন?" "হে খালিদ, হে আমর, সঠিক পথ এখন একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমার আর কোন সন্দেহ নেই যে মুহাম্মদ একজন নবী। আমার মতে আর সময় নষ্ট করার কোন অর্থ নেই। আমি মদিনায় যাচ্ছি মুসলিম হওয়ার জন্য।" আমর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কারণ তার উদ্দেশ্য ছিল ঠিক একই। তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম!
আমি এই পথে চলেছি ঠিক একই উদ্দেশ্যে।" তিনজনেই রওনা হয়েছিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করতে। পেছনে ফেলে এসেছিলেন তাদের সব খারাপ উদ্দেশ্য এবং অতীতের কাজের জন্য গভীর অনুতাপ ও লজ্জা অনুভব করছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূর থেকে তাদের দেখে হাসলেন এবং আশপাশের লোকদের বললেন, "মক্কা তোমাদের কাছে তার সবচেয়ে মূল্যবান মানুষদের পাঠিয়েছে।" তারা দ্রুত প্রবেশ করলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে। একবার ভাবুন তো, এর আগে পর্যন্ত তারা মুসলমানদের ভীষণ ক্ষতি করেছিল। তবুও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেন না। এমনকি অতীতের কথা স্মরণও করিয়ে দিলেন না। এটাই ছিল তার মহান চরিত্র। যদি তার সামনে থাকা ব্যক্তি অনুতপ্ত হতো, তিনি কখনোই তাদের ভুলগুলো তাদের মুখে ছুড়ে দিতেন না। তিনি শুধু চাইতেন তারা যেন তাদের চিরন্তন জীবন রক্ষা করে। প্রথমে খালিদ তার হাত বাড়িয়ে বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল।" তিনি লজ্জিত ছিলেন। "হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লড়েছি, আপনি তা জানেন। আমি আপনার কাছে অনুরোধ করছি এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।" নবীজির কথাগুলো খালিদের অন্তরে স্বস্তি এনে দিল। আসলে তার কোন কথাই বা স্বস্তি দিত না। তিনি বললেন, "হে খালিদ, ইসলাম তার পূর্বের সব গুনাহ মুছে দেয়।" তারপর তিনি তার হাত উঠিয়ে এই দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ, খালিদকে ক্ষমা করে দিন তার সব প্রচেষ্টার জন্য যা সে করেছিল আপনার বান্দাদেরকে আপনার পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে।" খালিদের মনে হলো তার কাঁধ থেকে এক বিশাল বোঝা নেমে গেল। সেই মুহূর্ত থেকে তিনি ব্যবহার করবেন তার শক্তি ও সামরিক প্রতিভা ইসলামের গৌরব ও বিস্তারের জন্য। এই পথে তার বীরত্বের কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডাকতেন সাইফুল্লাহ নামে। অর্থাৎ আল্লাহর তরবারি। এরপর আমর ইবনুল আস হাত বাড়িয়ে খালিদের মতোই একই অনুরোধ করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমরের জন্যও একই দোয়া করলেন। অবশেষে তিনি সেই শান্তি পেলেন যা তিনি বহু বছর ধরে খুঁজছিলেন। পরবর্তীতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বহু যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন এবং আল্লাহ তার মাধ্যমে অনেক বিজয় দান করবেন। কুরাইশদের সেই প্রতিভাবান নেতা এখন ইসলামের সেবায় নিয়োজিত হলেন। আর তার সবচেয়ে বড় বিজয় হলো মিশর বিজয়। আল্লাহ তার মাধ্যমে সেসব ভূখণ্ডে ইসলাম পৌঁছে দেবেন। এই কারণেই তাকে স্মরণ করা হয় মিশর বিজয়ী হিসেবে। সবশেষে উসমান ইবনে তালহা হাত বাড়ালেন এবং তিনিও মুসলিম হয়ে গেলেন। এইভাবে একই দিনে ইসলামের কাতারে যোগ দিলেন তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে। সূরা আল-ফাতেহায় আল্লাহ যা বলেছেন তা কি মনে আছে?
আল্লাহ জানতেন যা তোমরা জানতে না। হুদাইবিয়া সন্ধি ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণার অস্ত্রকে নিস্তেজ করে দিয়েছিল এবং মানুষের হৃদয়ের প্রাচীরগুলো ভেঙে দিয়েছিল। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, মুশরিকরা মেনে নিয়েছে যে তোমরা মক্কায় যেতে পারবে এবং তোমাদের প্রয়োজন মেটাতে পারবে এবং আসা যাওয়ার সময় তোমরা নিরাপদ থাকবে। আর এইভাবেই তারা তোমাদের মাধ্যমে ইসলাম দেখবে ও শিখবে। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করবেন এবং সেখান থেকে ফিরিয়ে আনবেন নিরাপদ অবস্থায় ও পুরস্কারসহ। এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়। ঠিক সেটাই ঘটেছিল। নবুয়তের সূচনা ও হুদাইবিয়া সন্ধির মধ্যে উনিশ বছর কেটে গিয়েছিল। অতঃপর হুদাইবিয়ার পর আর মাত্র এক বছর অতিবাহিত হতে চলেছে এবং বিস্ময়করভাবে সেই এক বছরেই পূর্ববর্তী উনিশ বছরের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এই কারণেই কোরআন হুদাইবিয়াকে বলেছে, ফাতহাম মুবিনা, এক সুস্পষ্ট বিজয়। যদিও প্রথমে এটিকে পরাজয় বলেই মনে হচ্ছিল। খাইবার বিজয়ের মাধ্যমে ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটল। হুদাইবিয়ার মাধ্যমে এক আধ্যাত্মিক বিজয় অর্জিত হয়েছিল এবং মুসলমানরা নিকটবর্তী আরব গোত্রগুলোর কাছে নিজেদের শক্তির পরিচয় দিয়েছিল। তবে সবচেয়ে মৌলিক সমস্যাটি এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গিয়েছিল। কাবা নির্মিত হয়েছিল একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এখন এর ভেতর ও চারপাশ মূর্তিতে পরিপূর্ণ হয়েছিল। এর চারপাশে সংঘটিত হচ্ছিল নানাবিধ লজ্জাজনক কাজ ও পাপ।এমন অবস্থায় সেই স্থানটি কিভাবে এখনো তাওহীদের প্রতীক হয়ে থাকতে পারে?
এই সমস্যার সমাধান অবশ্যই করতে হবে। কাবাকে ইসলামের অধীনেই আসতে হবে এবং তার চারপাশের মূর্তিগুলো অপসারণ করতে হবে। কিন্তু কিভাবে?
মক্কাবাসীদের সঙ্গে দশ বছরের একটি শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ হলেন মুসাব্বিবুল আসবাব, যিনি ইচ্ছামত কারণসমূহ সৃষ্টি করেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রয়োজনীয় উপায়গুলো একত্র করে তার বান্দাদের সাহায্য করেন। আর এখন কাবা মুক্তির জন্য করা দোয়াগুলোর কবুল হওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়ে এসেছিল। এর অল্প কিছুদিন পরেই আল্লাহ এর জন্য একটি কারণ সৃষ্টি করলেন। কুরাইশরা নিজেরাই এই চুক্তি ভঙ্গ করবে। খুজা গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল যারা ছিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিত্র, হঠাৎ মদিনায় এসে পৌঁছালো। হুদাইবিয়ার সন্ধির একটি শর্ত অনুযায়ী, অন্যান্য আরব গোত্রগুলো মৈত্রী স্থাপন করতে স্বাধীন ছিল যে পক্ষকে তারা চাইবে। আর খুজা বেছে নিয়েছিল নবীজির পক্ষকে এবং মুসলমানদের পক্ষকে। প্রতিনিধি দলের প্রধান আমর গভীরভাবে মর্মাহত ছিলেন। তারা কেন এসেছে তিনি তা ব্যাখ্যা করলেন। "হে আল্লাহর রাসূল, কুরাইশ তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। তারা আপনার সঙ্গে করা সবচেয়ে দৃঢ় চুক্তিটাই ভঙ্গ করেছে। এক রাতে তারা হঠাৎ আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। তারা আমাদেরকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে আমাদের লোকদের হত্যা করে। যখন কেউ ছিল রুকুতে, আর কেউ ছিল সিজদায়। আমাদের সাহায্য করুন।" এইভাবে হুদাইবিয়া সন্ধি প্রকাশ্যভাবেই ভঙ্গ করা হলো। কুরাইশ আবু সুফিয়ানকে মদিনায় পাঠালো আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে কথা বলতে। আবু সুফিয়ান প্রথমে গেলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এবং চুক্তি নবায়নের আবেদন জানালেন। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে তিনি কোন উত্তর পেলেন না। এরপর তিনি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন। এই আশায় যে পারিবারিক সম্পর্ক হয়তো তাকে কোন সমাধান এনে দিতে পারে। কিন্তু এই চেষ্টাও ব্যর্থ হলো। এবার তিনি ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন এবং মিনতি করে বললেন, "চুক্তিটা নবায়নের চেষ্টা করুন। আমাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন।" ওমর ক্রুদ্ধ হয়ে জবাব দিলেন, "মূলত তোমরাই তো চুক্তিটা ভেঙেছো, তাই তো?
এর যদি সামান্য কিছু এখনো অবশিষ্ট থাকে, আল্লাহ যেন তা যত দ্রুত সম্ভব ধ্বংস করেন। আমি কখনোই আল্লাহর রাসূলের কাছে তোমাদের পক্ষে সুপারিশ করতে যাব না। আল্লাহর কসম!
যদি আমি কিছুই না পাই শুধু একটি ছোট পিঁপড়া ছাড়া, তবুও আমি তা দিয়েই তোমাদের বিরুদ্ধে লড়ব।" আবু সুফিয়ান সেখান থেকে বেরিয়ে সরাসরি ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন। কিন্তু ফল এবারও একই হলো। শেষ আশা হিসেবে তিনি গেলেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে। কিন্তু তার কাছ থেকেও কোন সমর্থন পেলেন না। আপনি কি খেয়াল করেছেন, হুদাইবিয়া কুরাইশদের জন্য সামান্যতম উপকারও বয়ে আনেনি। তবু তারা কতটাই না আত্মবিশ্বাসী ছিল। শেষ পর্যন্ত এটি শুধু মুসলমানদের কাজই সহজ করে দিল। শত্রু কমে যাওয়ায় তাদের জন্য অন্য হুমকির দিকে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়ে গেল। এদিকে একই সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে মক্কাকে ইসলামের ভূমিতে পরিণত করার লক্ষ্য পূরণ করল। আর এসব উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ চাইলেন চুক্তিটি ভঙ্গ হোক। এইভাবেই আল্লাহ তার পথে সংগ্রামকারীদের সহযোগিতা দান করেন। সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত সময়ে, সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত স্থান থেকে এবং সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত উপায়ে। মানুষ প্রায়ই এ ধরনের ঘটনাকে খারাপ কিছু বলে মনে করে। কিন্তু কদরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর পেছনে লুকিয়ে থাকে অগণিত প্রজ্ঞা। এই কথাগুলো কি আপনার মনে আছে?
"আল্লাহর কসম! আপনি আল্লাহর ভূমিগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম এবং আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আল্লাহর কসম!
যদি আমাকে আপনার থেকে বের করে না দেওয়া হতো, তাহলে আমি কখনোই আপনাকে ছেড়ে যেতাম না।" এগুলোই ছিল সেই কথা যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন হিজরতের আগে শেষবারের মতো মক্কার দিকে ফিরে তাকানোর সময়ে। মক্কার প্রতিটি পাহাড় আর পাথর সেই কথাগুলোর সাক্ষী ছিল। আর এখন সেই বিদায়ের পর আট বছর কেটে গেছে। মক্কা অপেক্ষা করছিল সেই দিনের জন্য, যেদিন আবার মিলিত হবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এবং তার সাহাবীদের সঙ্গে। তাদের জন্য এমন আকুলতায় যেমনটি এর আগে আর কারো জন্য ছিল না। এবং অবশেষে সেই বরকতময় দিন ঘনিয়ে এলো। মক্কা মুক্ত হবে। বছরের-পর-বছর অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং মক্কার মুসলমানরা তাদের ঘরে ফিরে যাবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব দ্রুতই একটি বড়সড় অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করলেন। কিন্তু তিনি কাউকেই বলেননি তারা কোথায় যাচ্ছেন। এটি গোপন রাখা ছিল অত্যন্ত জরুরি। যদি মক্কার মুশরিকরা অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়ে, তাহলে রক্তপাত ছাড়াই শহরটি দখল করা যাবে এবং সেই মহাবিজয় উর্ধ্বিত হতে পারে। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল এই বরকতময় নগরীতে একেবারে যুদ্ধ ছাড়াই প্রবেশ করা। এই কারণেই তিনি সব প্রস্তুতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পূর্ণ করলেন এবং সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সাথে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে দশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী আল্লাহর রাসূলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, তার নির্দেশের অপেক্ষায়। এটি ছিল সেই দিন পর্যন্ত মুসলমানদের সমবেত হওয়া সবচেয়ে বড় বাহিনী। তারা এখন অগ্রযাত্রার জন্য প্রস্তুত ছিল। সবচেয়ে আন্তরিক দোয়াগুলো ছিল তাদের জিহ্বায় এবং তাদের অন্তরে। সেই মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসে গিয়েছিল যারা একুশ বছর ধরে তাদের নির্যাতন করেছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। তারাই ছিল তারা যারা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এত বছর ধরে নানাভাবে নিষ্ঠুর আচরণ করেছিল। তাহলে সেদিন তারা কি করবে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আল্লাহর রাসূল তাদের সঙ্গে প্রতিদানে কেমন আচরণ করবেন?
এমন বহু আবেগঘন দৃশ্য যা আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দেবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে এই পর্বের ঠিক পরের অংশে। তখন ছিল রমজান মাস এবং রাসূলুল্লাহ এই দোয়াটি করছিলেন। "হে আল্লাহ, কুরাইশের গুপ্তচর ও অনুসন্ধানীদের আটকে রাখুন যতক্ষণ না আমরা হঠাৎ করেই তাদের ভূখণ্ডে উপস্থিত হই।" যাত্রা শুরুর পর থেকেই তিনি গন্তব্যস্থল গোপন রেখেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল মক্কাকে আকস্মিকভাবে ঘিরে ফেলা। তিনি যুদ্ধ ছাড়াই বিজয় চেয়েছিলেন। কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষার সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও খবর বহনকারী একজন ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গিয়েছিল। মুজাইনাহ গোত্রের এক নারী মক্কার পথে ছিল। ঠিক যখনই মনে হচ্ছিল রাসূলুল্লাহর সমস্ত পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে যাবে, ওহীর মাধ্যমে তাকে এ বিষয়ে জানানো হলো। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আলী, জুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, "দ্রুত যাও, যতক্ষণ না তোমরা খাক বাগানে পৌঁছে যাও। সেখানে তোমরা একটি উটে আরোহী নারীকে পাবে। তার কাছে একটি চিঠি আছে, তা তার কাছ থেকে নিয়ে নাও।" তিন সাহাবী দ্রুত রাওদাতুল খাকের দিকে গেলেন এবং সেখানে সেই নারীকে পেলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কাছে যে চিঠি আছে তা কোথায়?"আমার কাছে কোন চিঠি নেই। আলী বুঝতে পারলেন যে সে মিথ্যা বলছে। তাই তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল কখনো মিথ্যা বলেন না। তারপর তিনি কঠোরভাবে তাকে সতর্ক করলেন চিঠিটি দিয়ে দিতে। না হলে তল্লাশি করা হবে বলে হুমকি দিলেন। অবশেষে নারীটি তার বেনী করা চুলের ভেতর লুকিয়ে রাখা চিঠিটি বের করল। চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন একজন সাহাবী, হাতিব ইবনে আবি বালতাআ। তিনি ছিলেন এক মুহাজির, যিনি বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং মিশরের শাসক মুকাউকিসের কাছে দূত হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সাহাবীগণ বিস্মিত হয়ে গেলেন। তারা কিছুতেই বিষয়টি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতিবকে ডেকে পাঠালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কেন তিনি এই চিঠি লিখেছেন?
হাতিবের পরিবার মক্কায় ছিল। আর তিনি কুরাইশ বংশের না হওয়ায় তাদের রক্ষার জন্য সেখানে তার কেউ ছিল না। তিনি কুরাইশদের প্রতি একটি উপকার করতে চেয়েছিলেন যাতে মক্কা অবরুদ্ধ হলে তারা তার পরিবারের কোন ক্ষতি না করে। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বললেন, আমি এটা করিনি এই কারণে যে আমি আমার দ্বীন ছেড়েছি বা ইসলামের পর কুফর গ্রহণ করেছি। আল্লাহর কসম!
আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি আমার ঈমান অটল রয়েছে। তার কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন, হাতিব তোমাদের সত্যই বলেছে। অতএব তার সম্পর্কে ভালো ছাড়া আর কিছু বলো না এবং তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। অভিযানের বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল এবং তারা অগ্রসর হতে থাকলেন। মক্কার লোকেরা সামান্যতম খবরও শুনতে পায়নি। অবশেষে বাহিনী শিবির স্থাপন করল মারর আয জাহরান নামক স্থানে। তখন ছিল রাত। ঘন অন্ধকার ঢেকে রেখেছিল উপত্যকাটিকে। শুধু শোনা যাচ্ছিল বাতাসের শো শো শব্দ। তারপর হঠাৎ চারদিকে আগুন জ্বলে উঠল। আল্লাহর রাসূল চেয়েছিলেন এই অগ্নিশিখার মাধ্যমে মক্কার লোকদের কাছে বাহিনীর আগমনের বার্তা পৌঁছাক। ইসলামের সেই আলো যা তারা এত চেষ্টা করেও নিভাতে পারেনি, আর তা এখন সম্পূর্ণভাবে মক্কাকে ঘিরে ফেলেছে। তারা অপেক্ষা করেছিল এই দিন দুর্বল হবে এবং মুমিনদের সংখ্যা কমে যাবে বলে। বছরের পর বছর তারা সম্ভব সবকিছুই চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল। কি মহিমান্বিত দৃশ্যই না ছিল এটি!
আল্লাহর রাসূল বিশেষভাবে সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি আগুন জ্বালাতে। এভাবে বাহিনীকে অনেক বড় বলে মনে হবে এবং মুশরিকরা পুরোপুরি তাদের সাহস হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু মক্কায় তখন কি ঘটছিল? সেই দৃশ্য দেখে তারা ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা ভয় আর উদ্বেগ নিয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। কেউই বুঝতে পারছিল না কি ঘটছে। তবে একটি বিষয় ছিল স্পষ্ট। এই রাতটি ছিল এক মহা পরিবর্তনের সূচনা। আবু সুফিয়ান রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়লেন। সে জানতে চেয়েছিল কি ঘটছে। তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে, তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে সে চারপাশে খোঁজ নেবে, গোপনে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং তারপর ফিরে যাবে। সে নজরে পড়তে চায়নি। কিন্তু যিনি সবকিছু দেখেন সেই আল্লাহর কাছ থেকে কি লুকানো সম্ভব?
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের জানিয়ে দিলেন। তিনি তাদের সজাগ থাকতে বললেন এবং বললেন যে তারা অবশ্যই আবু সুফিয়ানের মুখোমুখি হবে। আর ঠিক সেটাই ঘটল। আব্বাস আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিজের নিরাপত্তায় নিলেন। তিনি তাকে নিজের খচ্চরের পেছনে তুলে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে গেলেন। যখন আবু সুফিয়ানের দুই সঙ্গীকেও তাবুর ভেতরে আনা হলো, রাসূলুল্লাহ তাদেরকে মক্কার পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারা গভীর রাত পর্যন্ত তাবুতেই অবস্থান করল। রাসূলুল্লাহ তাদের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। আর সেখানেই আবু সুফিয়ানের দুই সঙ্গী শাহাদাত গ্রহণ করলেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান তখনও নিশ্চিত ছিল না। সে চিন্তা করার জন্য কিছুটা সময় চাইল। তারপর তাদের সবাইকে নিজ নিজ তাবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। সকালে আবু সুফিয়ান আবারও আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। আগামীকাল কি ঘটবে?
কি বদলে যাবে? সাহাবীদের মনে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান কি অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করবে? এই মুহূর্তে এর উত্তর কেউ জানত না। সকাল হলে আব্বাস আবু সুফিয়ানকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে এলেন। আল্লাহর রাসূল তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আবু সুফিয়ান, আপনার কি এখনো সময় আসেনি বলার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ?" আবু সুফিয়ান বললেন, "কিন্তু এইসব মূর্তি নিয়ে আমি কি করব?
লাত ও উজ্জাতকে আমি কিভাবে ছেড়ে দেব?" ওমর তাবুর পেছনে অপেক্ষা করছিলেন। এ কথা শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, "কৃতজ্ঞ থাকুন যে, আপনি তাবুর ভেতরে আছেন। বাইরে থাকলে আপনি কখনোই এ কথা বলতে পারতেন না।" আবু সুফিয়ান জবাব দিলেন, "হে ওমর, আপনার জন্য লজ্জা। আপনি আপনার পিতার মতোই কঠোর। আর তাছাড়া, হে খাত্তাবের পুত্র, আমি আপনার জন্য আসিনি। আমি আমার চাচাতো ভাইয়ের কাছে এসেছি। আমি তার সঙ্গেই কথা বলব। তাই আমাদের কথা বলতে দিন।" এরপর তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ফিরে বললেন, "আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন। আপনার প্রশান্ত স্বভাব ও কোমলতায়, আপনার উদারতা ও মহত্ত্বে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায়, আপনার যত্নে, আপনার চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই।" এরপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। অবশেষে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না এবং স্বীকার করে বলল, "আল্লাহর কসম!
আমি মনে করি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। কারণ সত্যিই যদি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য থাকত, তবে সে আমাকে সাহায্য করত, আমাকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করত এবং আমাকে কিছু উপকার দিত।" কথোপকথন আরও কিছুক্ষণ চলল। অবশেষে আবু সুফিয়ান শাহাদাত পাঠ করলেন এবং মুসলিম হয়ে গেলেন। সেই মুহূর্তে তার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। তার জন্য শুরু হলো সম্পূর্ণ এক নতুন যুগ। তবে তখন তার বয়স ছিল ষাটেরও বেশি। তাই তার হৃদয়ে ঈমানের শিকড় গাঁথতে নিশ্চয়ই কিছুটা সময় লাগত। এরপর আল্লাহর রাসূল আব্বাসের দিকে ফিরে বললেন, "হে আব্বাস, আবু সুফিয়ানকে উপত্যকার সংকীর্ণ অংশে নিয়ে যান। সেই পাহাড়ি পথে, যেখানে ঘোড়াগুলো ঘন হয়ে সারিবদ্ধ থাকে, যাতে সে দেখতে পারে আল্লাহর বাহিনীর মহিমা।" এটি আসলে ছিল একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। আবু সুফিয়ান যদি সরাসরি মক্কায় ফিরে যেতেন, তবে মক্কার মুশরিকরা তার মন পরিবর্তন করে দিতে পারত। কিন্তু যখন তিনি বাহিনীর বিশালতা দেখবেন, তখন তিনি বুঝবেন কুরাইশ আসলে কতটা অসহায়। এরপর তিনি মুশরিকদের বলবেন, এমন শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা অর্থহীন এবং এভাবে তাদেরকে পাল্টা লড়াই করা থেকে নিরুৎসাহিত করবেন। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজির নির্দেশ পালন করলেন এবং আবু সুফিয়ান বিস্ময়ে মুসলিম বাহিনীকে দেখলেন। তিনি বললেন, "হে আব্বাস..."আজ পর্যন্ত আমি এমন বাহিনী বা এমন জনসমষ্টি কখনো দেখিনি। এরপর তিনি দ্রুত রওনা হলেন মুশরিকদের সতর্ক করতে। তিনি চিৎকার করে বললেন, "হে কুরাইশ সম্প্রদায়, মুহাম্মদ এসে গেছেন। তিনি এমন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তোমাদের দরজায় এসে পৌঁছেছেন, যার বিরুদ্ধে তোমরা দাঁড়াতে পারবে না।" তারপর তিনি সর্বোচ্চ কন্ঠে ঘোষণা করলেন, "যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। যে নিজ ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ। যে আল-মসজিদুল হারামে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ।" অনেক মুশরিক তাদের রাগ আর চেপে রাখতে পারল না। এমনকি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ তাকে গালমন্দ করতে শুরু করল। আবু জাহেলের ছেলে ইকরিমা এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া লোকদের উসকে দিতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু কেউই তাদের কথায় কর্ণপাত করল না। সবাই ছড়িয়ে পড়ল আশ্রয় খুঁজতে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনীকে বিভক্ত করেছিলেন পাঁচটি প্রধান দলে। এবং তিনি প্রতিটি দলের অধিনায়ককে একই স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন, "তোমাদেরকে বাধা না দেওয়া হলে বা আক্রমণ না করা হলে কারো সঙ্গে যুদ্ধ করবে না।" অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্তটি এসে গেল। বহু বছরের বিচ্ছেদের পর মুসলিম বাহিনী মক্কায় প্রবেশ করছিল। আল্লাহর রাসূল ছিলেন তার উট কাসোয়ার পিঠে। আর তার মাথা ছিল গভীর বিনয়ে অবনত। তিনি তার বরকতময় মাথা এতটাই নিচু করেছিলেন যে, তার কপাল প্রায় তার উটের পিঠে স্পর্শ করছিল। তিনি জানতেন এই বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। এবং তিনি তা সবার সামনে ঘোষণা করছিলেন। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মতো এই মুহূর্তেও তিনি সবচেয়ে সুন্দর আদর্শ স্থাপন করলেন। তিনি মক্কায় প্রবেশ করছিলেন মহিমা ও মর্যাদার সঙ্গে। একদিকে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া ও প্রশংসা করছিলেন। আর অন্যদিকে তিনি সূরা আল-ফাতহা পাঠ করছিলেন, যে সূরা এই বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিল। মুখগুলোতে ছিল হাসি আর অন্তরগুলো খুঁজে পাচ্ছিল প্রশান্তি। মক্কা অবশেষে ইসলামের ভূমিতে পরিণত হচ্ছিল। অপেক্ষার অবসান ঘটেছিল। মুসলমানরা যে অন্যায়, অপমান ও নির্যাতন সহ্য করেছিল, তা এখন পেছনে পড়ে গেছে। এবার বিজয়ী পক্ষ ছিল মুসলমানরা। রাসূলুল্লাহ চলছিলেন মক্কার রাস্তাগুলো দিয়ে। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মোড় ছিল স্মৃতিতে ভরা। কোন এক স্থানে তার মনে পড়লো মানুষগুলোর বিদ্রূপ ভরা দৃষ্টির কথা। আরেক স্থানে যেন তাদের অপমান আর কষ্টদায়ক কথাগুলো এখনো তার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কেউ কেউ তো তার মুখের উপরই ভয়ঙ্কর সব নাম চাপিয়ে দিয়েছিল। মিথ্যাবাদী, পাগল, জাদুকর, মা আজাল্লাহ। তারা তার পিঠের উপর উটের নাড়িভুঁড়ি ঢেলে দিয়েছিল। তিনি তিন বছরের বয়কট আর অনাহার সহ্য করেছিলেন। বছরের পর বছর তিনি একই মানুষদের ইসলামের দাওয়াত দিয়ে গেছেন, যারা তাকে বারবার প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রতিটি রাস্তা ছিল স্মৃতিতে ভরা। তারা তাকে তার নিজের শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এখন তিনি কিভাবে এমন এক বাহিনী নিয়ে ফিরে এলেন?
তিনি কিভাবে এত মানুষের হৃদয় জয় করে নিলেন? তিনি এগিয়ে চললেন, আরও এগিয়ে। আর তারপর সেটি সামনে এসে গেল। কাবা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সমস্ত মহিমা নিয়ে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকবীর পাঠ করছিলেন। আর একসঙ্গে সব মুসলমান উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।" যাতে মক্কা প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। মক্কায় ইসলাম প্রথম প্রকাশ্যে ঘোষণা হওয়ার সেই দিনের কথা কি মনে আছে?
দারুল আরকামে চল্লিশ জন মুসলমানের তাকবীরগুলো ছিল যেন একটি বীজ। আর সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে বেড়ে উঠেছিল। আর এখন সেটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল দশ হাজার মানুষের তাকবীর হয়ে। "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।" কিন্তু সেখানে দেখার মতো একটি বেদনাদায়ক দৃশ্যও ছিল। কাবার চারপাশে ছিল তিনশ ষাটটি মূর্তি। হাতে থাকা লাঠি দিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে সেই মূর্তিগুলো স্পর্শ করতে লাগলেন এবং এই আয়াতটি তেলাওয়াত করছিলেন। "আউযুবিল্লাহ। ওয়া জা'আল হাক্কু ওয়া যাকাল বাতিল। ইন্নাল বাতিলা কানা জাহুকা।" সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। তিনি যে মূর্তিটিকে স্পর্শ করতেন সেটিই মাটিতে পড়ে যেত। কুরাইশরা কাবার ভেতরেও মূর্তি স্থাপন করেছিল। কিন্তু এখন একটিও মূর্তি দাঁড়িয়ে রইল না। তখন যোহরের নামাজের সময় হয়ে এলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে বিলাল কাবার ছাদে আরোহণ করলেন। এবং আজান দিতে শুরু করলেন। এই সেই বিলাল, যাকে তারা রাস্তায় টেনে হিঁচড়ে নিয়েছিল তার গলায় দড়ি বেঁধে। যাকে তারা নির্যাতন করেছিল তার ঈমান ছাড়ানোর জন্য এবং এক দাস বলে তুচ্ছ জ্ঞান করত। তিনি এখন কাবার উপরে দাঁড়িয়ে ইসলামের বিজয় ঘোষণা করে তার কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়ছিল সমস্ত মক্কা জুড়ে। নিজ নিজ ঘরে লুকিয়ে থাকা বিদ্বেষপরায়ণ মুশরিকরা ভেঙে পড়ল। Towards Eternity হিসেবে আমরা নিরলস পরিশ্রম করেছি আপনাদের জন্য এই AI visualized সিরিজটি উপস্থাপন করতে। আর এখন ইনশাল্লাহ আমরা একটি নতুন সিরিজ তৈরি করতে চাই। আমাদের মহিমান্বিত নবী আলাইহিমুস সালামের জীবনী নিয়ে। মুসা, ইব্রাহিম, ইউসুফ, ইউনুস আলাইহিমুস সালামের মতো নবীগণকে নিয়ে। যাতে আপনি এবং আপনার পরিবার তাদের কাহিনীগুলো দেখতে পারেন Towards Eternityর মানসম্মত প্রযোজনায়। কিন্তু একটি নতুন সিরিজ তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল বটে। AI, পেশাদার voice over এবং স্মরণ জমা দিই। আর দুর্ভাগ্যবশত আমরা আর একা এটি বহন করতে পারছি না। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া আমরা এই প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারব না। আমাদের টিম মোট প্রয়োজনকে পঁচিশ ডলারের অংশে ভাগ করেছে। যাতে আপনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এক বা একাধিক অংশের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারেন ইনশাল্লাহ। আপনি যদি এই নেক কাজের অংশীদার হতে চান তবে Towards Eternityকে দান করুন। আর এই সোনালী সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।ঠিক সেই সময় কুরাইশের কিছু নেতা আবু সুফিয়ান, আত্বাব ইবনে আসীদ এবং হারিস ইবনে হিশাম নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। আত্বাব অভিযোগ করে বলল, আমার বাবা আসীদ কতই না সৌভাগ্যবান। এই দিনটি না দেখিয়ে আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন। মোহাম্মদকে আজান দেওয়ার জন্য এই লোকটি ছাড়া আর কাউকে পেল না। তখন আবু সুফিয়ান বলল, আমি কিছু বলতে ভয় পাচ্ছি। অন্য কেউ না শুনলেও আমাদের পায়ের নিচের বালু ও পাথর তাকে বলে দেবে, আর তিনি জেনে যাবেন। কিছুক্ষণ পর তারা আল্লাহর রাসূলকে দেখল। তারা কল্পনাও করতে পারেনি কি দেখতে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের একে অন্যকে বলা প্রতিটি কথাই হুবহু বলে দিলেন। তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। তিনি কিভাবে জানলেন তারা গোপনে কি কথা বলেছে?
সেদিন কুরাইশের এই দুই নেতা আত্বাব ও হারিস তারাও মুসলিম হয়ে গেল। একবার ভেবে দেখুন, সেদিন পর্যন্ত তারা দুজনেই ইসলামের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে ছিল। বছরের পর বছর তারা এভাবেই কাটিয়েছিল। এমনকি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তারা নিজেদের কিছু আত্মীয়কেও হারিয়েছিল। কিন্তু এখন যখন তাদের জিজ্ঞেস করা হলো কেন তারা নিজেদের ধর্ম বদলে ফেলল? তাদের উত্তর ছিল সহজ। আমরা নবীজির মুজিজা প্রত্যক্ষ করেছি। সিরাতের সমগ্র ইতিহাস জুড়ে এমন অনেক মানুষ ছিল যারা একসময় ইসলামের কঠোর শত্রু ছিল। কিন্তু মুজিজা প্রত্যক্ষ করার পর মুসলিম হয়ে গিয়েছিল। তারা যে মুজিজাগুলো দেখেছিল সেগুলো মিথ্যা হওয়ার কি কোন সম্ভাবনা আছে? তারা কি নিজেদের ধর্ম, জীবনের উদ্দেশ্য এবং পুরো মানসিকতা পরিবর্তন করত এমন কিছুর জন্য যা কখনো ঘটেইনি?
অবশ্যই না। এই মুজিজাগুলো ছিল বাস্তব। এসব ছিল সত্য। আর ওই সমাবেশের তৃতীয় ব্যক্তি আবু সুফিয়ান বলল, হে আল্লাহর রাসূল, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। অন্তত আমি তো কিছু বলিনি। এখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই কাবায় প্রবেশ করবেন যাকে তিনি গভীরভাবে মিস করেছিলেন। তিনি উসমান ইবনে তালহার কাছে লোক পাঠালেন এবং তাকে চাবি আনতে বললেন। বহু বছর ধরে তার পরিবারই সেই চাবির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল। আর এখন উসমান ভাবছিলেন এই দায়িত্ব আর তার পরিবারে থাকবে না। অন্যদিকে নবীজির চাচা আব্বাস এই সম্মানটি পাওয়ার খুবই আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। উসমান যখন চাবি নিয়ে এলেন, নবীজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি বহু আগে তোমাকে যা বলেছিলাম তা কি সত্য প্রমাণিত হয়নি? তিনি কি বোঝাতে চেয়েছিলেন? এর আগে কি ঘটেছিল?
ইসলামের প্রাথমিক যুগে আল্লাহর রাসূল উসমানকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তুমি তোমার জাতির ধর্মের বিরোধিতা করেছ এবং এক নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছ। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, হে উসমান, আমি আশা করি এমন একদিন আসবে যখন তুমি আমাকে এমন অবস্থানে দেখবে যেখানে আমি এই চাবি যেখানে ইচ্ছা রাখতে পারব এবং যাকে ইচ্ছা দিতে পারব। উসমানের সে কথা স্পষ্ট মনে ছিল। তিনি বললেন, জি। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ যা বলেছিলেন তা সত্যিই পূর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি যোগ করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি চাবি রক্ষার যোগ্য ছিলেন। তিনি বহু বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি সত্যিই সেই আমানতের উপযুক্ত ছিলেন। সবাই ভাবছিল এখন চাবি কার হাতে যাবে। তখন আল্লাহর রাসূল এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানত তার হকদারদের কাছে ফিরিয়ে দিতে। এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে, ন্যায়ের সঙ্গে ফয়সালা করবে। তারপর তিনি বললেন, হে উসমান, এই নাও তোমার চাবি। আজ কল্যাণের দিন এবং অঙ্গীকার রক্ষার দিন। এরপর তিনি কাবায় প্রবেশ করলেন। তিনি দরজাটি বন্ধ করালেন এবং কিছু সময় ভেতরে একা অবস্থান করলেন। যখন তিনি বেরিয়ে এলেন, এক বিশাল জনসমাগম তার অপেক্ষায় ছিল। কুরাইশরা উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিল তিনি তাদের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নেবেন তা শোনার জন্য। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ নীরবে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি কি করতে যাচ্ছিলেন?
তিনি কি তাদের অপমান আর হেয় করবেন, যেমনটি তারা তার সঙ্গে ইতিপূর্বে করেছিল? তিনি কি তাদের উপর উটের নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপ করবেন, যেমনটা তারা করেছিল? তিনি কি তাদের পথ জুড়ে কাঁটা ছড়িয়ে দেবেন এবং তাদের তা মাড়িয়ে হাঁটাবেন? তিনি কি তাদের বয়কট করবেন এবং অনাহারে রাখবেন? তিনি কি তাদেরকে নিজেদের ঘর থেকে বের করে দেবেন? তিনি কি তাদের সবাইকে হত্যার নির্দেশ দেবেন? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করলেন এবং তার বিজয়ী খুতবা শুরু করলেন। তিনি শেষ করে তাদের জিজ্ঞেস করলেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়, এখন তোমরা কি মনে করো আমার তোমাদের সঙ্গে এখন কেমন আচরণ করা উচিত?
তারা বলে উঠল, আপনি একজন দয়ালু ও মহানুভব ভাই এবং একজন দয়ালু ও মহানুভব ভাইয়ের পুত্র। আমরা আপনার কাছ থেকে ভালো ছাড়া আর কিছুই আশা করি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছিলেন, বললেন, তোমাদের সঙ্গে আমার অবস্থা ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনার মতো। যেমনটা ইউসুফ তার ভাইদের বলেছিলেন, আমিও তোমাদের বলছি, আজ তোমাদের উপর আমার আর কোন আক্রোশ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি দয়াশীলদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত। জাস্ট একবার সেই দৃশ্যটি কল্পনা করুন। এটি ছিল এমন এক ক্ষমা যার তুলনা ইতিহাসে আর একটাও হবে না। কারণ তার হাতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এটাই কি ক্ষমার সর্বোচ্চ রূপ নয়?
আর অকল্যাণের জবাবে কল্যাণ করা কি সর্বোচ্চ মহত্ব নয়?
কুরাইশের একগৈমি এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। তাদের চোখ যা সত্যের ব্যাপারে অন্ধ ছিল অবশেষে দেখতে শুরু করল। পরের দিন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ে উঠলেন। এটাই ছিল সেই স্থান যেখানে বহু বছর আগে তিনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নবুয়তের ঘোষণা দিয়েছিলেন। মনে আছে, তিনি কারো কাছ থেকেই তেমন কাঙ্ক্ষিত কোন সাড়া পাননি। বরং সবার সামনে নিজের আপন চাচার কাছ থেকেই অপমানিত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন কুরাইশের লোকেরা দল বেঁধে ঈমান গ্রহণ করতে আসছিল। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও দলবদ্ধভাবে মুসলিমা হতে এলো। আর তাদের মধ্যে হিন্দু ছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী। ধরা পড়ার ভয়ে তিনি মুখ ঢেকে নারীদের দলে মিশে গিয়েছিলেন। তার অন্তর ভরেছিল গভীর অনুতাপে। অতীতে তিনি নবীজির এবং মুসলমানদের প্রতি যা যা করেছিলেন তার জন্য। অপরাধবোধে ভারী হয়ে ওঠা তার চিন্তাগুলো তার হৃদয় ও মনকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। তবুও তার আশা ছিলতিনি আশা করছিলেন রহমতের নবীর দয়ার প্রতি। আল্লাহর রাসূল যখন জানতে পারলেন হিন্দ ইসলাম গ্রহণ করেছে, তিনি তার প্রতি কোন বিদ্বেষ পোষণ করলেন না। তার অতীতের সব ভুল সত্ত্বেও তিনি তাকে ক্ষমা করলেন এবং তার বাইআত গ্রহণ করলেন। হিন্দ নামটি আমাদের আরেকটি নাম মনে করিয়ে দেয় ওয়াহশি। সে ছিল এক দাস যে স্বাধীনতা পেয়েছিল হামজাকে হত্যা করার বিনিময়ে। যিনি ছিলেন নবীজির অত্যন্ত প্রিয় চাচা। এমনকি সে হামজার কলিজা কেটে হিন্দের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। আর আনন্দে হিন্দ তাকে তার সব গয়না দিয়ে দিয়েছিল। সেদিন ওয়াহশি তার তথাকথিত স্বাধীনতা পেলেও মক্কা কখনোই তাকে একজন মুক্ত মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেনি। তাদের চোখে সে আগের মতই থেকে গিয়েছিল। কুফরিতে ডুবে থাকা মানুষদের কাছ থেকে সে কিভাবে মর্যাদা আশা করতে পারে?
আর তাদের সম্মানই বা কি এমন আসে যায়? নিজের বিবেকের কারাগার থেকে সে কখনো মুক্ত হতে পারেনি। মক্কা বিজয় সেই বোঝাটা কেবল আরও ভারী করে তুলল। কিভাবে সে মুসলমানদের মধ্যে থাকবে নবীজির চাচাকে হত্যা করার পর? এই চিন্তাগুলো নিয়ে ওয়াহশি মক্কা ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু পালিয়ে গিয়ে কি সত্যিই সে অতীত থেকে মুক্তি পেতে পারবে? আল্লাহর দিকে ফিরে না এসে পালিয়ে গিয়ে সে কিভাবে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবে?
সে যেখানেই যেত, তার গুনাহের ভার তাকে অনুসরণ করত। নিজের বিবেকের আঘাতে সে একেবারে ভেঙে পড়েছিল। এই সবকিছুর মাঝখানে এক অপ্রত্যাশিত সাহায্যের হাত তার দিকে এগিয়ে এল। একটি প্রতিনিধি দল যাচ্ছে আল্লাহর রাসূলের কাছে ইসলাম গ্রহণ করতে। তিনি দুধদের কোন ক্ষতি করেন না। তুমি তাদের সঙ্গে যাও এবং ইসলাম গ্রহণ করো। সে সেই পরামর্শ মেনে নিল, মক্কায় ফিরে এল এবং নবীজির সামনে ইসলাম গ্রহণ করল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আমাদের রবের দয়া এতই অসীম যে, যারা তাওবা করে তিনি তাদের করা প্রতিটি গুনাহকে নেক আমলে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি তাদের এ আশাও দেন যে তারা তাদের মন্দ অভ্যাসগুলোকে ভালো অভ্যাসে বদলে ফেলতে পারবে। আরও একটি আনন্দময় দৃশ্য উন্মোচিত হল আবু বকরের জন্য। ইসলামের শুরুর দিনগুলো থেকেই তিনি আকাঙ্ক্ষা করতেন তার বাবা যেন ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেন। তিনি তার হাত ধরলেন এবং তাকে নিয়ে এলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। নবীজি সম্মানবশত অস্বস্তি বোধ করলেন। কারণ এক বৃদ্ধ মানুষকে তার কাছে আনা হয়েছিল। তিনি বললেন, "আপনি কেন এই বৃদ্ধ মানুষটিকে ঘরেই রাখলেন না?
যাতে করে আমরাই সেখানে তার কাছে যেতে পারতাম।" রাসূলুল্লাহ তার হাত বাবার বুকে রাখলেন। কোমলভাবে মালিশ করলেন এবং বললেন, "হে আবু কুহাফা, ইসলাম গ্রহণ করুন।" আর তারপর তিনিও মুসলমান হয়ে গেলেন। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। কিন্তু তখনও কিছু মানুষ ছিল যারা ঈমান আনেনি। তারা সত্য থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। হেদায়েতের আলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। চলুন আমরা ফিরে যাই বিজয়ের সেই দিনে। সেদিন মুসলিম বাহিনীকে পাঁচটি দলে ভাগ করা হয়েছিল এবং তার একটির নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। এদিকে ইকরিমা ইবনে আবি জাহিল এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া প্রতিরোধ করার জন্য একদল যোদ্ধাকে জড়ো করেছিল। বাহিনী যখন শহরে প্রবেশ করছিল, তারা খালিদের ইউনিটের উপর আক্রমণ করল। যদিও নবীজি রক্তপাত চাননি, মুশরিকরা কিন্তু যুদ্ধের উপরই জোর দিয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা তেরো জন মানুষকে হারিয়ে পালিয়ে গেল। ইকরিমা পালাতে সক্ষম হলো এবং বন্দরে পৌঁছে গেল। সবকিছুর পরেও সে তখনও তার রবের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করছিল। সে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার জন্য একটি জাহাজে উঠে পড়ল। সে সবকিছু পেছনে ফেলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তার রব তাকে ছেড়ে দিলেন না। হঠাৎ করেই সাগরে এক অপ্রত্যাশিত ঝড় শুরু হলো। বাতাস ক্রমেই তীব্র হতে লাগল। জাহাজ ভীষণভাবে দুলতে এবং কাঁপতে শুরু করল। তারা আশঙ্কা করল এটি বুঝি ডুবেই যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে নাবিক জাহাজের লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল, "নিষ্ঠাবান হও, সত্যবাদী হও। এই ঝড় থেকে একমাত্র আল্লাহই আমাদের রক্ষা করতে পারেন।" তারা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বাতাস ছিল প্রচণ্ড, আর আকাশ ছিল অন্ধকার ও মলিন। জাহাজের লোকেরা আন্তরিকভাবে দোয়া করতে শুরু করল এবং শুধু আল্লাহকেই ডাকতে লাগল, আর তার একত্বতা ঘোষণা করল। তোমরা এভাবে দোয়া করছ কেন?
আল্লাহ ছাড়া আর কেউ আমাদের সাহায্য করতে পারে না। ইকরিমা সেখানে এসেছিল এই সত্যকেই অস্বীকার করতে। কিন্তু তাদের কথাগুলো তার অন্তরকে গভীরভাবে নাড়া দিল। তাই সে দোয়া করল, "হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তবে আমি মুহাম্মদের কাছে যাব এবং ইসলাম গ্রহণ করব।" এর কিছুক্ষণ পর ঝড় শান্ত হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে ইকরিমা সেই মুহূর্তটি এভাবে বর্ণনা করেছিল, "সেটাই ছিল সেই সময় যখন আমি ইসলামকে বুঝতে শুরু করি, আর তার প্রতি ভালোবাসা আমার অন্তরে প্রবেশ করে। আমি জাহাজের লোকদের বললাম, 'আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চলো। আল্লাহর কসম!
আমি এখন মুহাম্মদের কাছেই ফিরে যাব।' " ইকরিমা মক্কা ছেড়ে যাওয়ার পর তার স্ত্রী উম্মে হাকিম মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে তার স্বামীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আর দয়ার নবী ইকরিমাকে অভয় প্রদান করলেন। উম্মে হাকিম সঙ্গে সঙ্গেই তার দাসকে নিয়ে তার স্বামীর খোঁজে বের হলেন। দীর্ঘ সফরের পর তিনি তাকে তিহামার উপকূলে খুঁজে পেলেন। একটি দাম্পত্য যা একসময় তাদের জাহান্নামের দিকে টেনে নিচ্ছিল, এখন সেটিই রূপ নেবে এমন সম্পর্কে যা তাদের জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। লজ্জায় ভরা ইকরিমা বুঝতে পারছিল না সে কিভাবে মুখোমুখি হবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। সে বারবার ভাবছিল ইসলামের বিরুদ্ধে যা কিছু করেছে সেসব নিয়ে। কিভাবে তাকে ক্ষমা করা হবে?
আর তার উপরও সে ছিল আবু জাহেলের ছেলে। তার মন ভরেছিল নানা ভাবনায়। যখন তার স্ত্রী তাকে জানালেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, সে বিস্মিত হয়ে গেল, আর তার অন্তর প্রশান্তি অনুভব করল। কয়েকদিনের সফরের পর তারা মক্কার কাছে এসে পৌঁছাল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশঙ্কা করছিলেন কিছু লোক হয়তো ইকরিমার অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে। তাই তিনি তার সাহাবীদের বললেন, "ইকরিমা তোমাদের কাছে আসছে একজন মুমিন এবং একজন মুহাজির হিসেবে। তার বাবার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলো না। কারণ মৃতদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলা জীবিতদের কষ্ট দেয়, কিন্তু তা মৃতদের কাছে পৌঁছায় না।"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেখে আনন্দে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন এবং তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর তিনি ইকরিমাকে আলিঙ্গন করে বললেন, স্বাগতম হে মুহাজির ও সওয়ারোহী। ইক্রিমা এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা একেবারেই আশা করেনি। তবুও সে লজ্জিত ছিল এবং মাথা নিচু করে রেখেছিল। তারপর তারা বসে কথা বলতে শুরু করল। অবশেষে ইক্রিমা শাহাদা পাঠ করল এবং মুসলমান হয়ে গেল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তার অতীত জীবন গুনাহে পরিপূর্ণ ছিল এবং সে শিরকের অন্ধকারে ডুবেছিল। সে চেয়েছিল অবশেষে তার অন্তর প্রশান্তি খুঁজে পাক। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার কাছে আমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া চাই। আমি আপনার প্রতি যে শত্রুতা দেখিয়েছি, আপনার বিরুদ্ধে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য, আমি যেসব অবস্থানে আপনার বিরোধিতা করেছি এবং আপনার সামনে বা আড়ালে যে প্রতিটি কথা বলেছি তার জন্য। আল্লাহর রাসূল হাত তুললেন এবং আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ইক্রিমার আত্মার উপরের ভারী বোঝা অবশেষে নেমে গেল। তারপর তিনি নবীজির কাছে এই অঙ্গীকার করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম, আমি দ্বিগুণ সম্পদ ব্যয় করব আল্লাহর পথে যতটা আমি মানুষকে তার পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে ব্যয় করেছিলাম। আর আমি দ্বিগুণ যুদ্ধ করব আল্লাহর পথে যতটুকু আমি লড়েছিলাম মানুষকে তার পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে। এভাবেই আল্লাহর রাসূলের আরেকটি স্বপ্ন পূর্ণ হলো। নবীজি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন যার অর্থ তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি নিজেকে জান্নাতে দেখলেন আর সেখানে একটি সুন্দর বৃক্ষ ছিল যা তাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটি কার?" উত্তরটি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। "এটি আবু জাহেলের।" তিনি মনে মনে বললেন, "আল্লাহর কসম, সে কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কিন্তু আমাদের মত এমন অর্থহীন স্বপ্ন নবীগণ দেখেন না।" আর সেদিন এই স্বপ্নের অর্থ স্পষ্ট হয়ে গেল। সেই বৃক্ষটি ছিল আবু জাহেলের ছেলে ইক্রিমা। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাপত্তা দিয়েছিলেন কুরাইশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও যেমন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ও সোহাইল ইবনে আমরকে। আর তারাও মুসলিম হয়েছিলেন এবং জীবনের অবশিষ্ট সময় ব্যয় করেছিলেন ইসলামের পথে। আল্লাহ তাদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। শহরে ছিল অপরিসীম আনন্দ। মক্কার মানুষ ঈমানের মাধুর্য অনুভব করছিল। যে জিনিসটি তারা সারা জীবন খুঁজেছে কিন্তু এর আগে তা কখনো খুঁজে পায়নি। এই আধ্যাত্মিক পরিবেশে এক বেদুইন আল্লাহর রাসূলের কাছে এলো। উত্তেজনায় সে কাঁপছিল। রাসূলুল্লাহ তার অবস্থা লক্ষ্য করলেন এবং তাকে বললেন, "শান্ত হও। আমি কোন রাজা নই। আমি তো শুধু এমন এক নারীর সন্তান যিনি শুকনো গোশত খেতেন।" সেই দিনটি ছিল বিনয়, মমতা ও বিশ্বস্ততার উদাহরণে ভরপুর। একজন মানুষ বিনয়ী হতে পারে কিন্তু বিজয়ের শিখরে দাঁড়িয়ে বিনয় দেখানো তা এক ভিন্ন বিষয়। একজন মানুষ দয়ালু ও ক্ষমাশীল হতে পারে কিন্তু ক্ষমতার চূড়ায় থেকেও এই গুণগুলো দেখানো তা একেবারেই ভিন্ন মাত্রার। মক্কা এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য একেবারে নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছিল। আল্লাহ তার আলো পূর্ণ করছিলেন। তবে মদিনার মুসলমানরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে লাগলেন। তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছিলেন, "আল্লাহ তার রাসূলকে তার নিজ জন্মভূমির বিজয় দান করেছেন। এখন কি নবীজি ও তার সাহাবীগণ মক্কাতেই থেকে যাবেন নাকি আমাদের সঙ্গে ফিরে যাবেন?" তারা এ বিষয়ে গভীরভাবে কৌতূহলী ছিলেন কিন্তু তখনও এর উত্তর তাদের জানা ছিল না। আল্লাহর রাসূল তাদের উদ্বেগ বুঝতে পারলেন এবং আনসারদের জিজ্ঞেস করলেন তারা কি নিয়ে কথা বলছে। তারা বললেন, "তেমন কিছু না, হে আল্লাহর রাসূল।" কিন্তু তিনি কয়েকবার একই প্রশ্ন পুনরাবৃত্তি করার পর খেয়াল করলেন যে তারা স্পষ্ট উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে। তখন তিনি বুঝলেন তাদের মনে কি চলছে। তখন তিনি তাদের বললেন, "আমি তোমাদের সঙ্গেই বাঁচব এবং তোমাদের সঙ্গেই মারা যাব।" আবারও এই কথাগুলো তাদের সঙ্গে তার গভীর বন্ধন প্রকাশ করল। চোখে কান্না নিয়ে আনসাররা তার চারপাশে জড়ো হয়ে বললেন, "আল্লাহর কসম, আমরা এ কথাগুলো বলেছিলাম শুধু আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসার কারণে। এর বাইরে আর কোন কারণ নেই।" মক্কা বিজয় সবকিছু একেবারেই সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। কষ্টের দিনগুলো শেষ হয়ে গিয়েছিল আর সংগ্রাম সহজতায় রূপ নিয়েছিল। এটি ছিল এই ইঙ্গিতও যে একটি যুগের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে। সবকিছু ঠিক যেমনটি হওয়ার কথা ছিল তেমনি স্থির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখে গভীর প্রশান্তির পাশাপাশি ছিল এক নীরব প্রতীক্ষা। এখন তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল অবশেষে তার সর্বাধিক প্রিয় রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। এই পৃথিবীতে যেখানে তিনি বছরের পর বছর আল্লাহর বার্তা ছড়িয়ে দিতে নিজ হৃদয় ও প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, সেখানে তিনি অচিরেই তার উম্মাহর সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলবেন। আর এবার শুধু অল্প কয়েকজন নয় বরং এক লক্ষেরও বেশি মুমিন সেই মুহূর্তের সাক্ষী থাকবেন। তাহলে বিজয়ের পর পৃথিবীতে কি পরিবর্তন এলো?
আরব উপদ্বীপে কেমন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ দিনগুলোতে কি ঘটেছিল? কি কি আবেগঘন মুহূর্ত ঘটেছিল? আর দয়ার নবী যখন তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন তখন তিনি তার উম্মাহর জন্য কি রেখে গেলেন? এই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এবং সূরা আল নাসরের মহান সুসংবাদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, সবকিছুই থাকবে আমাদের ধারাবাহিকের শেষ পর্বে। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন।
আমর জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কোথায় যাচ্ছেন?" "হে খালিদ, হে আমর, সঠিক পথ এখন একেবারে পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমার আর কোন সন্দেহ নেই যে মুহাম্মদ একজন নবী। আমার মতে আর সময় নষ্ট করার কোন অর্থ নেই। আমি মদিনায় যাচ্ছি মুসলিম হওয়ার জন্য।" আমর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কারণ তার উদ্দেশ্য ছিল ঠিক একই। তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম!
আমি এই পথে চলেছি ঠিক একই উদ্দেশ্যে।" তিনজনেই রওনা হয়েছিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করতে। পেছনে ফেলে এসেছিলেন তাদের সব খারাপ উদ্দেশ্য এবং অতীতের কাজের জন্য গভীর অনুতাপ ও লজ্জা অনুভব করছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূর থেকে তাদের দেখে হাসলেন এবং আশপাশের লোকদের বললেন, "মক্কা তোমাদের কাছে তার সবচেয়ে মূল্যবান মানুষদের পাঠিয়েছে।" তারা দ্রুত প্রবেশ করলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে। একবার ভাবুন তো, এর আগে পর্যন্ত তারা মুসলমানদের ভীষণ ক্ষতি করেছিল। তবুও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেন না। এমনকি অতীতের কথা স্মরণও করিয়ে দিলেন না। এটাই ছিল তার মহান চরিত্র। যদি তার সামনে থাকা ব্যক্তি অনুতপ্ত হতো, তিনি কখনোই তাদের ভুলগুলো তাদের মুখে ছুড়ে দিতেন না। তিনি শুধু চাইতেন তারা যেন তাদের চিরন্তন জীবন রক্ষা করে। প্রথমে খালিদ তার হাত বাড়িয়ে বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল।" তিনি লজ্জিত ছিলেন। "হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লড়েছি, আপনি তা জানেন। আমি আপনার কাছে অনুরোধ করছি এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।" নবীজির কথাগুলো খালিদের অন্তরে স্বস্তি এনে দিল। আসলে তার কোন কথাই বা স্বস্তি দিত না। তিনি বললেন, "হে খালিদ, ইসলাম তার পূর্বের সব গুনাহ মুছে দেয়।" তারপর তিনি তার হাত উঠিয়ে এই দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ, খালিদকে ক্ষমা করে দিন তার সব প্রচেষ্টার জন্য যা সে করেছিল আপনার বান্দাদেরকে আপনার পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে।" খালিদের মনে হলো তার কাঁধ থেকে এক বিশাল বোঝা নেমে গেল। সেই মুহূর্ত থেকে তিনি ব্যবহার করবেন তার শক্তি ও সামরিক প্রতিভা ইসলামের গৌরব ও বিস্তারের জন্য। এই পথে তার বীরত্বের কারণে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডাকতেন সাইফুল্লাহ নামে। অর্থাৎ আল্লাহর তরবারি। এরপর আমর ইবনুল আস হাত বাড়িয়ে খালিদের মতোই একই অনুরোধ করলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমরের জন্যও একই দোয়া করলেন। অবশেষে তিনি সেই শান্তি পেলেন যা তিনি বহু বছর ধরে খুঁজছিলেন। পরবর্তীতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বহু যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন এবং আল্লাহ তার মাধ্যমে অনেক বিজয় দান করবেন। কুরাইশদের সেই প্রতিভাবান নেতা এখন ইসলামের সেবায় নিয়োজিত হলেন। আর তার সবচেয়ে বড় বিজয় হলো মিশর বিজয়। আল্লাহ তার মাধ্যমে সেসব ভূখণ্ডে ইসলাম পৌঁছে দেবেন। এই কারণেই তাকে স্মরণ করা হয় মিশর বিজয়ী হিসেবে। সবশেষে উসমান ইবনে তালহা হাত বাড়ালেন এবং তিনিও মুসলিম হয়ে গেলেন। এইভাবে একই দিনে ইসলামের কাতারে যোগ দিলেন তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে। সূরা আল-ফাতেহায় আল্লাহ যা বলেছেন তা কি মনে আছে?
আল্লাহ জানতেন যা তোমরা জানতে না। হুদাইবিয়া সন্ধি ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণার অস্ত্রকে নিস্তেজ করে দিয়েছিল এবং মানুষের হৃদয়ের প্রাচীরগুলো ভেঙে দিয়েছিল। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, মুশরিকরা মেনে নিয়েছে যে তোমরা মক্কায় যেতে পারবে এবং তোমাদের প্রয়োজন মেটাতে পারবে এবং আসা যাওয়ার সময় তোমরা নিরাপদ থাকবে। আর এইভাবেই তারা তোমাদের মাধ্যমে ইসলাম দেখবে ও শিখবে। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করবেন এবং সেখান থেকে ফিরিয়ে আনবেন নিরাপদ অবস্থায় ও পুরস্কারসহ। এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়। ঠিক সেটাই ঘটেছিল। নবুয়তের সূচনা ও হুদাইবিয়া সন্ধির মধ্যে উনিশ বছর কেটে গিয়েছিল। অতঃপর হুদাইবিয়ার পর আর মাত্র এক বছর অতিবাহিত হতে চলেছে এবং বিস্ময়করভাবে সেই এক বছরেই পূর্ববর্তী উনিশ বছরের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এই কারণেই কোরআন হুদাইবিয়াকে বলেছে, ফাতহাম মুবিনা, এক সুস্পষ্ট বিজয়। যদিও প্রথমে এটিকে পরাজয় বলেই মনে হচ্ছিল। খাইবার বিজয়ের মাধ্যমে ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গে সংঘাতের অবসান ঘটল। হুদাইবিয়ার মাধ্যমে এক আধ্যাত্মিক বিজয় অর্জিত হয়েছিল এবং মুসলমানরা নিকটবর্তী আরব গোত্রগুলোর কাছে নিজেদের শক্তির পরিচয় দিয়েছিল। তবে সবচেয়ে মৌলিক সমস্যাটি এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গিয়েছিল। কাবা নির্মিত হয়েছিল একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এখন এর ভেতর ও চারপাশ মূর্তিতে পরিপূর্ণ হয়েছিল। এর চারপাশে সংঘটিত হচ্ছিল নানাবিধ লজ্জাজনক কাজ ও পাপ।এমন অবস্থায় সেই স্থানটি কিভাবে এখনো তাওহীদের প্রতীক হয়ে থাকতে পারে?
এই সমস্যার সমাধান অবশ্যই করতে হবে। কাবাকে ইসলামের অধীনেই আসতে হবে এবং তার চারপাশের মূর্তিগুলো অপসারণ করতে হবে। কিন্তু কিভাবে?
মক্কাবাসীদের সঙ্গে দশ বছরের একটি শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ হলেন মুসাব্বিবুল আসবাব, যিনি ইচ্ছামত কারণসমূহ সৃষ্টি করেন ও নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রয়োজনীয় উপায়গুলো একত্র করে তার বান্দাদের সাহায্য করেন। আর এখন কাবা মুক্তির জন্য করা দোয়াগুলোর কবুল হওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়ে এসেছিল। এর অল্প কিছুদিন পরেই আল্লাহ এর জন্য একটি কারণ সৃষ্টি করলেন। কুরাইশরা নিজেরাই এই চুক্তি ভঙ্গ করবে। খুজা গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল যারা ছিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিত্র, হঠাৎ মদিনায় এসে পৌঁছালো। হুদাইবিয়ার সন্ধির একটি শর্ত অনুযায়ী, অন্যান্য আরব গোত্রগুলো মৈত্রী স্থাপন করতে স্বাধীন ছিল যে পক্ষকে তারা চাইবে। আর খুজা বেছে নিয়েছিল নবীজির পক্ষকে এবং মুসলমানদের পক্ষকে। প্রতিনিধি দলের প্রধান আমর গভীরভাবে মর্মাহত ছিলেন। তারা কেন এসেছে তিনি তা ব্যাখ্যা করলেন। "হে আল্লাহর রাসূল, কুরাইশ তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। তারা আপনার সঙ্গে করা সবচেয়ে দৃঢ় চুক্তিটাই ভঙ্গ করেছে। এক রাতে তারা হঠাৎ আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। তারা আমাদেরকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পেয়ে আমাদের লোকদের হত্যা করে। যখন কেউ ছিল রুকুতে, আর কেউ ছিল সিজদায়। আমাদের সাহায্য করুন।" এইভাবে হুদাইবিয়া সন্ধি প্রকাশ্যভাবেই ভঙ্গ করা হলো। কুরাইশ আবু সুফিয়ানকে মদিনায় পাঠালো আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে কথা বলতে। আবু সুফিয়ান প্রথমে গেলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এবং চুক্তি নবায়নের আবেদন জানালেন। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে তিনি কোন উত্তর পেলেন না। এরপর তিনি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন। এই আশায় যে পারিবারিক সম্পর্ক হয়তো তাকে কোন সমাধান এনে দিতে পারে। কিন্তু এই চেষ্টাও ব্যর্থ হলো। এবার তিনি ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন এবং মিনতি করে বললেন, "চুক্তিটা নবায়নের চেষ্টা করুন। আমাদের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন।" ওমর ক্রুদ্ধ হয়ে জবাব দিলেন, "মূলত তোমরাই তো চুক্তিটা ভেঙেছো, তাই তো?
এর যদি সামান্য কিছু এখনো অবশিষ্ট থাকে, আল্লাহ যেন তা যত দ্রুত সম্ভব ধ্বংস করেন। আমি কখনোই আল্লাহর রাসূলের কাছে তোমাদের পক্ষে সুপারিশ করতে যাব না। আল্লাহর কসম!
যদি আমি কিছুই না পাই শুধু একটি ছোট পিঁপড়া ছাড়া, তবুও আমি তা দিয়েই তোমাদের বিরুদ্ধে লড়ব।" আবু সুফিয়ান সেখান থেকে বেরিয়ে সরাসরি ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলেন। কিন্তু ফল এবারও একই হলো। শেষ আশা হিসেবে তিনি গেলেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে। কিন্তু তার কাছ থেকেও কোন সমর্থন পেলেন না। আপনি কি খেয়াল করেছেন, হুদাইবিয়া কুরাইশদের জন্য সামান্যতম উপকারও বয়ে আনেনি। তবু তারা কতটাই না আত্মবিশ্বাসী ছিল। শেষ পর্যন্ত এটি শুধু মুসলমানদের কাজই সহজ করে দিল। শত্রু কমে যাওয়ায় তাদের জন্য অন্য হুমকির দিকে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয়ে গেল। এদিকে একই সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে মক্কাকে ইসলামের ভূমিতে পরিণত করার লক্ষ্য পূরণ করল। আর এসব উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ চাইলেন চুক্তিটি ভঙ্গ হোক। এইভাবেই আল্লাহ তার পথে সংগ্রামকারীদের সহযোগিতা দান করেন। সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত সময়ে, সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত স্থান থেকে এবং সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত উপায়ে। মানুষ প্রায়ই এ ধরনের ঘটনাকে খারাপ কিছু বলে মনে করে। কিন্তু কদরের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর পেছনে লুকিয়ে থাকে অগণিত প্রজ্ঞা। এই কথাগুলো কি আপনার মনে আছে?
"আল্লাহর কসম! আপনি আল্লাহর ভূমিগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম এবং আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আল্লাহর কসম!
যদি আমাকে আপনার থেকে বের করে না দেওয়া হতো, তাহলে আমি কখনোই আপনাকে ছেড়ে যেতাম না।" এগুলোই ছিল সেই কথা যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন হিজরতের আগে শেষবারের মতো মক্কার দিকে ফিরে তাকানোর সময়ে। মক্কার প্রতিটি পাহাড় আর পাথর সেই কথাগুলোর সাক্ষী ছিল। আর এখন সেই বিদায়ের পর আট বছর কেটে গেছে। মক্কা অপেক্ষা করছিল সেই দিনের জন্য, যেদিন আবার মিলিত হবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এবং তার সাহাবীদের সঙ্গে। তাদের জন্য এমন আকুলতায় যেমনটি এর আগে আর কারো জন্য ছিল না। এবং অবশেষে সেই বরকতময় দিন ঘনিয়ে এলো। মক্কা মুক্ত হবে। বছরের-পর-বছর অপেক্ষার অবসান ঘটবে এবং মক্কার মুসলমানরা তাদের ঘরে ফিরে যাবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব দ্রুতই একটি বড়সড় অভিযানের প্রস্তুতি শুরু করলেন। কিন্তু তিনি কাউকেই বলেননি তারা কোথায় যাচ্ছেন। এটি গোপন রাখা ছিল অত্যন্ত জরুরি। যদি মক্কার মুশরিকরা অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা পড়ে, তাহলে রক্তপাত ছাড়াই শহরটি দখল করা যাবে এবং সেই মহাবিজয় উর্ধ্বিত হতে পারে। তার আকাঙ্ক্ষা ছিল এই বরকতময় নগরীতে একেবারে যুদ্ধ ছাড়াই প্রবেশ করা। এই কারণেই তিনি সব প্রস্তুতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পূর্ণ করলেন এবং সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সাথে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে দশ হাজার যোদ্ধার এক বিশাল বাহিনী আল্লাহর রাসূলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, তার নির্দেশের অপেক্ষায়। এটি ছিল সেই দিন পর্যন্ত মুসলমানদের সমবেত হওয়া সবচেয়ে বড় বাহিনী। তারা এখন অগ্রযাত্রার জন্য প্রস্তুত ছিল। সবচেয়ে আন্তরিক দোয়াগুলো ছিল তাদের জিহ্বায় এবং তাদের অন্তরে। সেই মানুষের মুখোমুখি হওয়ার সময় এসে গিয়েছিল যারা একুশ বছর ধরে তাদের নির্যাতন করেছে এবং তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। তারাই ছিল তারা যারা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এত বছর ধরে নানাভাবে নিষ্ঠুর আচরণ করেছিল। তাহলে সেদিন তারা কি করবে?
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আল্লাহর রাসূল তাদের সঙ্গে প্রতিদানে কেমন আচরণ করবেন?
এমন বহু আবেগঘন দৃশ্য যা আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দেবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে এই পর্বের ঠিক পরের অংশে। তখন ছিল রমজান মাস এবং রাসূলুল্লাহ এই দোয়াটি করছিলেন। "হে আল্লাহ, কুরাইশের গুপ্তচর ও অনুসন্ধানীদের আটকে রাখুন যতক্ষণ না আমরা হঠাৎ করেই তাদের ভূখণ্ডে উপস্থিত হই।" যাত্রা শুরুর পর থেকেই তিনি গন্তব্যস্থল গোপন রেখেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল মক্কাকে আকস্মিকভাবে ঘিরে ফেলা। তিনি যুদ্ধ ছাড়াই বিজয় চেয়েছিলেন। কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষার সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও খবর বহনকারী একজন ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গিয়েছিল। মুজাইনাহ গোত্রের এক নারী মক্কার পথে ছিল। ঠিক যখনই মনে হচ্ছিল রাসূলুল্লাহর সমস্ত পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে যাবে, ওহীর মাধ্যমে তাকে এ বিষয়ে জানানো হলো। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আলী, জুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, "দ্রুত যাও, যতক্ষণ না তোমরা খাক বাগানে পৌঁছে যাও। সেখানে তোমরা একটি উটে আরোহী নারীকে পাবে। তার কাছে একটি চিঠি আছে, তা তার কাছ থেকে নিয়ে নাও।" তিন সাহাবী দ্রুত রাওদাতুল খাকের দিকে গেলেন এবং সেখানে সেই নারীকে পেলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার কাছে যে চিঠি আছে তা কোথায়?"আমার কাছে কোন চিঠি নেই। আলী বুঝতে পারলেন যে সে মিথ্যা বলছে। তাই তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল কখনো মিথ্যা বলেন না। তারপর তিনি কঠোরভাবে তাকে সতর্ক করলেন চিঠিটি দিয়ে দিতে। না হলে তল্লাশি করা হবে বলে হুমকি দিলেন। অবশেষে নারীটি তার বেনী করা চুলের ভেতর লুকিয়ে রাখা চিঠিটি বের করল। চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন একজন সাহাবী, হাতিব ইবনে আবি বালতাআ। তিনি ছিলেন এক মুহাজির, যিনি বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং মিশরের শাসক মুকাউকিসের কাছে দূত হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সাহাবীগণ বিস্মিত হয়ে গেলেন। তারা কিছুতেই বিষয়টি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতিবকে ডেকে পাঠালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কেন তিনি এই চিঠি লিখেছেন?
হাতিবের পরিবার মক্কায় ছিল। আর তিনি কুরাইশ বংশের না হওয়ায় তাদের রক্ষার জন্য সেখানে তার কেউ ছিল না। তিনি কুরাইশদের প্রতি একটি উপকার করতে চেয়েছিলেন যাতে মক্কা অবরুদ্ধ হলে তারা তার পরিবারের কোন ক্ষতি না করে। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বললেন, আমি এটা করিনি এই কারণে যে আমি আমার দ্বীন ছেড়েছি বা ইসলামের পর কুফর গ্রহণ করেছি। আল্লাহর কসম!
আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি আমার ঈমান অটল রয়েছে। তার কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন, হাতিব তোমাদের সত্যই বলেছে। অতএব তার সম্পর্কে ভালো ছাড়া আর কিছু বলো না এবং তিনি তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সময় অতিবাহিত হচ্ছিল। অভিযানের বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল এবং তারা অগ্রসর হতে থাকলেন। মক্কার লোকেরা সামান্যতম খবরও শুনতে পায়নি। অবশেষে বাহিনী শিবির স্থাপন করল মারর আয জাহরান নামক স্থানে। তখন ছিল রাত। ঘন অন্ধকার ঢেকে রেখেছিল উপত্যকাটিকে। শুধু শোনা যাচ্ছিল বাতাসের শো শো শব্দ। তারপর হঠাৎ চারদিকে আগুন জ্বলে উঠল। আল্লাহর রাসূল চেয়েছিলেন এই অগ্নিশিখার মাধ্যমে মক্কার লোকদের কাছে বাহিনীর আগমনের বার্তা পৌঁছাক। ইসলামের সেই আলো যা তারা এত চেষ্টা করেও নিভাতে পারেনি, আর তা এখন সম্পূর্ণভাবে মক্কাকে ঘিরে ফেলেছে। তারা অপেক্ষা করেছিল এই দিন দুর্বল হবে এবং মুমিনদের সংখ্যা কমে যাবে বলে। বছরের পর বছর তারা সম্ভব সবকিছুই চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল। কি মহিমান্বিত দৃশ্যই না ছিল এটি!
আল্লাহর রাসূল বিশেষভাবে সাহাবীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি আগুন জ্বালাতে। এভাবে বাহিনীকে অনেক বড় বলে মনে হবে এবং মুশরিকরা পুরোপুরি তাদের সাহস হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু মক্কায় তখন কি ঘটছিল? সেই দৃশ্য দেখে তারা ভয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তারা ভয় আর উদ্বেগ নিয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। কেউই বুঝতে পারছিল না কি ঘটছে। তবে একটি বিষয় ছিল স্পষ্ট। এই রাতটি ছিল এক মহা পরিবর্তনের সূচনা। আবু সুফিয়ান রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়লেন। সে জানতে চেয়েছিল কি ঘটছে। তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে, তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে সে চারপাশে খোঁজ নেবে, গোপনে তথ্য সংগ্রহ করবে এবং তারপর ফিরে যাবে। সে নজরে পড়তে চায়নি। কিন্তু যিনি সবকিছু দেখেন সেই আল্লাহর কাছ থেকে কি লুকানো সম্ভব?
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের জানিয়ে দিলেন। তিনি তাদের সজাগ থাকতে বললেন এবং বললেন যে তারা অবশ্যই আবু সুফিয়ানের মুখোমুখি হবে। আর ঠিক সেটাই ঘটল। আব্বাস আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিজের নিরাপত্তায় নিলেন। তিনি তাকে নিজের খচ্চরের পেছনে তুলে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে গেলেন। যখন আবু সুফিয়ানের দুই সঙ্গীকেও তাবুর ভেতরে আনা হলো, রাসূলুল্লাহ তাদেরকে মক্কার পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারা গভীর রাত পর্যন্ত তাবুতেই অবস্থান করল। রাসূলুল্লাহ তাদের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। আর সেখানেই আবু সুফিয়ানের দুই সঙ্গী শাহাদাত গ্রহণ করলেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান তখনও নিশ্চিত ছিল না। সে চিন্তা করার জন্য কিছুটা সময় চাইল। তারপর তাদের সবাইকে নিজ নিজ তাবুতে নিয়ে যাওয়া হলো। সকালে আবু সুফিয়ান আবারও আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। আগামীকাল কি ঘটবে?
কি বদলে যাবে? সাহাবীদের মনে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। আবু সুফিয়ান কি অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করবে? এই মুহূর্তে এর উত্তর কেউ জানত না। সকাল হলে আব্বাস আবু সুফিয়ানকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিয়ে এলেন। আল্লাহর রাসূল তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আবু সুফিয়ান, আপনার কি এখনো সময় আসেনি বলার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ?" আবু সুফিয়ান বললেন, "কিন্তু এইসব মূর্তি নিয়ে আমি কি করব?
লাত ও উজ্জাতকে আমি কিভাবে ছেড়ে দেব?" ওমর তাবুর পেছনে অপেক্ষা করছিলেন। এ কথা শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, "কৃতজ্ঞ থাকুন যে, আপনি তাবুর ভেতরে আছেন। বাইরে থাকলে আপনি কখনোই এ কথা বলতে পারতেন না।" আবু সুফিয়ান জবাব দিলেন, "হে ওমর, আপনার জন্য লজ্জা। আপনি আপনার পিতার মতোই কঠোর। আর তাছাড়া, হে খাত্তাবের পুত্র, আমি আপনার জন্য আসিনি। আমি আমার চাচাতো ভাইয়ের কাছে এসেছি। আমি তার সঙ্গেই কথা বলব। তাই আমাদের কথা বলতে দিন।" এরপর তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ফিরে বললেন, "আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোন। আপনার প্রশান্ত স্বভাব ও কোমলতায়, আপনার উদারতা ও মহত্ত্বে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায়, আপনার যত্নে, আপনার চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই।" এরপর তিনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। অবশেষে সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না এবং স্বীকার করে বলল, "আল্লাহর কসম!
আমি মনে করি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। কারণ সত্যিই যদি আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য থাকত, তবে সে আমাকে সাহায্য করত, আমাকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করত এবং আমাকে কিছু উপকার দিত।" কথোপকথন আরও কিছুক্ষণ চলল। অবশেষে আবু সুফিয়ান শাহাদাত পাঠ করলেন এবং মুসলিম হয়ে গেলেন। সেই মুহূর্তে তার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। তার জন্য শুরু হলো সম্পূর্ণ এক নতুন যুগ। তবে তখন তার বয়স ছিল ষাটেরও বেশি। তাই তার হৃদয়ে ঈমানের শিকড় গাঁথতে নিশ্চয়ই কিছুটা সময় লাগত। এরপর আল্লাহর রাসূল আব্বাসের দিকে ফিরে বললেন, "হে আব্বাস, আবু সুফিয়ানকে উপত্যকার সংকীর্ণ অংশে নিয়ে যান। সেই পাহাড়ি পথে, যেখানে ঘোড়াগুলো ঘন হয়ে সারিবদ্ধ থাকে, যাতে সে দেখতে পারে আল্লাহর বাহিনীর মহিমা।" এটি আসলে ছিল একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। আবু সুফিয়ান যদি সরাসরি মক্কায় ফিরে যেতেন, তবে মক্কার মুশরিকরা তার মন পরিবর্তন করে দিতে পারত। কিন্তু যখন তিনি বাহিনীর বিশালতা দেখবেন, তখন তিনি বুঝবেন কুরাইশ আসলে কতটা অসহায়। এরপর তিনি মুশরিকদের বলবেন, এমন শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা অর্থহীন এবং এভাবে তাদেরকে পাল্টা লড়াই করা থেকে নিরুৎসাহিত করবেন। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু নবীজির নির্দেশ পালন করলেন এবং আবু সুফিয়ান বিস্ময়ে মুসলিম বাহিনীকে দেখলেন। তিনি বললেন, "হে আব্বাস..."আজ পর্যন্ত আমি এমন বাহিনী বা এমন জনসমষ্টি কখনো দেখিনি। এরপর তিনি দ্রুত রওনা হলেন মুশরিকদের সতর্ক করতে। তিনি চিৎকার করে বললেন, "হে কুরাইশ সম্প্রদায়, মুহাম্মদ এসে গেছেন। তিনি এমন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তোমাদের দরজায় এসে পৌঁছেছেন, যার বিরুদ্ধে তোমরা দাঁড়াতে পারবে না।" তারপর তিনি সর্বোচ্চ কন্ঠে ঘোষণা করলেন, "যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। যে নিজ ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেবে সে নিরাপদ। যে আল-মসজিদুল হারামে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ।" অনেক মুশরিক তাদের রাগ আর চেপে রাখতে পারল না। এমনকি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ তাকে গালমন্দ করতে শুরু করল। আবু জাহেলের ছেলে ইকরিমা এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া লোকদের উসকে দিতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু কেউই তাদের কথায় কর্ণপাত করল না। সবাই ছড়িয়ে পড়ল আশ্রয় খুঁজতে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনীকে বিভক্ত করেছিলেন পাঁচটি প্রধান দলে। এবং তিনি প্রতিটি দলের অধিনায়ককে একই স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন, "তোমাদেরকে বাধা না দেওয়া হলে বা আক্রমণ না করা হলে কারো সঙ্গে যুদ্ধ করবে না।" অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্তটি এসে গেল। বহু বছরের বিচ্ছেদের পর মুসলিম বাহিনী মক্কায় প্রবেশ করছিল। আল্লাহর রাসূল ছিলেন তার উট কাসোয়ার পিঠে। আর তার মাথা ছিল গভীর বিনয়ে অবনত। তিনি তার বরকতময় মাথা এতটাই নিচু করেছিলেন যে, তার কপাল প্রায় তার উটের পিঠে স্পর্শ করছিল। তিনি জানতেন এই বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। এবং তিনি তা সবার সামনে ঘোষণা করছিলেন। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মতো এই মুহূর্তেও তিনি সবচেয়ে সুন্দর আদর্শ স্থাপন করলেন। তিনি মক্কায় প্রবেশ করছিলেন মহিমা ও মর্যাদার সঙ্গে। একদিকে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া ও প্রশংসা করছিলেন। আর অন্যদিকে তিনি সূরা আল-ফাতহা পাঠ করছিলেন, যে সূরা এই বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিল। মুখগুলোতে ছিল হাসি আর অন্তরগুলো খুঁজে পাচ্ছিল প্রশান্তি। মক্কা অবশেষে ইসলামের ভূমিতে পরিণত হচ্ছিল। অপেক্ষার অবসান ঘটেছিল। মুসলমানরা যে অন্যায়, অপমান ও নির্যাতন সহ্য করেছিল, তা এখন পেছনে পড়ে গেছে। এবার বিজয়ী পক্ষ ছিল মুসলমানরা। রাসূলুল্লাহ চলছিলেন মক্কার রাস্তাগুলো দিয়ে। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি মোড় ছিল স্মৃতিতে ভরা। কোন এক স্থানে তার মনে পড়লো মানুষগুলোর বিদ্রূপ ভরা দৃষ্টির কথা। আরেক স্থানে যেন তাদের অপমান আর কষ্টদায়ক কথাগুলো এখনো তার কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কেউ কেউ তো তার মুখের উপরই ভয়ঙ্কর সব নাম চাপিয়ে দিয়েছিল। মিথ্যাবাদী, পাগল, জাদুকর, মা আজাল্লাহ। তারা তার পিঠের উপর উটের নাড়িভুঁড়ি ঢেলে দিয়েছিল। তিনি তিন বছরের বয়কট আর অনাহার সহ্য করেছিলেন। বছরের পর বছর তিনি একই মানুষদের ইসলামের দাওয়াত দিয়ে গেছেন, যারা তাকে বারবার প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রতিটি রাস্তা ছিল স্মৃতিতে ভরা। তারা তাকে তার নিজের শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এখন তিনি কিভাবে এমন এক বাহিনী নিয়ে ফিরে এলেন?
তিনি কিভাবে এত মানুষের হৃদয় জয় করে নিলেন? তিনি এগিয়ে চললেন, আরও এগিয়ে। আর তারপর সেটি সামনে এসে গেল। কাবা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সমস্ত মহিমা নিয়ে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকবীর পাঠ করছিলেন। আর একসঙ্গে সব মুসলমান উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।" যাতে মক্কা প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। মক্কায় ইসলাম প্রথম প্রকাশ্যে ঘোষণা হওয়ার সেই দিনের কথা কি মনে আছে?
দারুল আরকামে চল্লিশ জন মুসলমানের তাকবীরগুলো ছিল যেন একটি বীজ। আর সেই বীজ অঙ্কুরিত হয়ে বেড়ে উঠেছিল। আর এখন সেটি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল দশ হাজার মানুষের তাকবীর হয়ে। "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।" কিন্তু সেখানে দেখার মতো একটি বেদনাদায়ক দৃশ্যও ছিল। কাবার চারপাশে ছিল তিনশ ষাটটি মূর্তি। হাতে থাকা লাঠি দিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে সেই মূর্তিগুলো স্পর্শ করতে লাগলেন এবং এই আয়াতটি তেলাওয়াত করছিলেন। "আউযুবিল্লাহ। ওয়া জা'আল হাক্কু ওয়া যাকাল বাতিল। ইন্নাল বাতিলা কানা জাহুকা।" সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। তিনি যে মূর্তিটিকে স্পর্শ করতেন সেটিই মাটিতে পড়ে যেত। কুরাইশরা কাবার ভেতরেও মূর্তি স্থাপন করেছিল। কিন্তু এখন একটিও মূর্তি দাঁড়িয়ে রইল না। তখন যোহরের নামাজের সময় হয়ে এলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে বিলাল কাবার ছাদে আরোহণ করলেন। এবং আজান দিতে শুরু করলেন। এই সেই বিলাল, যাকে তারা রাস্তায় টেনে হিঁচড়ে নিয়েছিল তার গলায় দড়ি বেঁধে। যাকে তারা নির্যাতন করেছিল তার ঈমান ছাড়ানোর জন্য এবং এক দাস বলে তুচ্ছ জ্ঞান করত। তিনি এখন কাবার উপরে দাঁড়িয়ে ইসলামের বিজয় ঘোষণা করে তার কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়ছিল সমস্ত মক্কা জুড়ে। নিজ নিজ ঘরে লুকিয়ে থাকা বিদ্বেষপরায়ণ মুশরিকরা ভেঙে পড়ল। Towards Eternity হিসেবে আমরা নিরলস পরিশ্রম করেছি আপনাদের জন্য এই AI visualized সিরিজটি উপস্থাপন করতে। আর এখন ইনশাল্লাহ আমরা একটি নতুন সিরিজ তৈরি করতে চাই। আমাদের মহিমান্বিত নবী আলাইহিমুস সালামের জীবনী নিয়ে। মুসা, ইব্রাহিম, ইউসুফ, ইউনুস আলাইহিমুস সালামের মতো নবীগণকে নিয়ে। যাতে আপনি এবং আপনার পরিবার তাদের কাহিনীগুলো দেখতে পারেন Towards Eternityর মানসম্মত প্রযোজনায়। কিন্তু একটি নতুন সিরিজ তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল বটে। AI, পেশাদার voice over এবং স্মরণ জমা দিই। আর দুর্ভাগ্যবশত আমরা আর একা এটি বহন করতে পারছি না। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া আমরা এই প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারব না। আমাদের টিম মোট প্রয়োজনকে পঁচিশ ডলারের অংশে ভাগ করেছে। যাতে আপনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এক বা একাধিক অংশের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারেন ইনশাল্লাহ। আপনি যদি এই নেক কাজের অংশীদার হতে চান তবে Towards Eternityকে দান করুন। আর এই সোনালী সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।ঠিক সেই সময় কুরাইশের কিছু নেতা আবু সুফিয়ান, আত্বাব ইবনে আসীদ এবং হারিস ইবনে হিশাম নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। আত্বাব অভিযোগ করে বলল, আমার বাবা আসীদ কতই না সৌভাগ্যবান। এই দিনটি না দেখিয়ে আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন। মোহাম্মদকে আজান দেওয়ার জন্য এই লোকটি ছাড়া আর কাউকে পেল না। তখন আবু সুফিয়ান বলল, আমি কিছু বলতে ভয় পাচ্ছি। অন্য কেউ না শুনলেও আমাদের পায়ের নিচের বালু ও পাথর তাকে বলে দেবে, আর তিনি জেনে যাবেন। কিছুক্ষণ পর তারা আল্লাহর রাসূলকে দেখল। তারা কল্পনাও করতে পারেনি কি দেখতে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের একে অন্যকে বলা প্রতিটি কথাই হুবহু বলে দিলেন। তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল। তিনি কিভাবে জানলেন তারা গোপনে কি কথা বলেছে?
সেদিন কুরাইশের এই দুই নেতা আত্বাব ও হারিস তারাও মুসলিম হয়ে গেল। একবার ভেবে দেখুন, সেদিন পর্যন্ত তারা দুজনেই ইসলামের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে ছিল। বছরের পর বছর তারা এভাবেই কাটিয়েছিল। এমনকি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তারা নিজেদের কিছু আত্মীয়কেও হারিয়েছিল। কিন্তু এখন যখন তাদের জিজ্ঞেস করা হলো কেন তারা নিজেদের ধর্ম বদলে ফেলল? তাদের উত্তর ছিল সহজ। আমরা নবীজির মুজিজা প্রত্যক্ষ করেছি। সিরাতের সমগ্র ইতিহাস জুড়ে এমন অনেক মানুষ ছিল যারা একসময় ইসলামের কঠোর শত্রু ছিল। কিন্তু মুজিজা প্রত্যক্ষ করার পর মুসলিম হয়ে গিয়েছিল। তারা যে মুজিজাগুলো দেখেছিল সেগুলো মিথ্যা হওয়ার কি কোন সম্ভাবনা আছে? তারা কি নিজেদের ধর্ম, জীবনের উদ্দেশ্য এবং পুরো মানসিকতা পরিবর্তন করত এমন কিছুর জন্য যা কখনো ঘটেইনি?
অবশ্যই না। এই মুজিজাগুলো ছিল বাস্তব। এসব ছিল সত্য। আর ওই সমাবেশের তৃতীয় ব্যক্তি আবু সুফিয়ান বলল, হে আল্লাহর রাসূল, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। অন্তত আমি তো কিছু বলিনি। এখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই কাবায় প্রবেশ করবেন যাকে তিনি গভীরভাবে মিস করেছিলেন। তিনি উসমান ইবনে তালহার কাছে লোক পাঠালেন এবং তাকে চাবি আনতে বললেন। বহু বছর ধরে তার পরিবারই সেই চাবির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল। আর এখন উসমান ভাবছিলেন এই দায়িত্ব আর তার পরিবারে থাকবে না। অন্যদিকে নবীজির চাচা আব্বাস এই সম্মানটি পাওয়ার খুবই আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। উসমান যখন চাবি নিয়ে এলেন, নবীজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি বহু আগে তোমাকে যা বলেছিলাম তা কি সত্য প্রমাণিত হয়নি? তিনি কি বোঝাতে চেয়েছিলেন? এর আগে কি ঘটেছিল?
ইসলামের প্রাথমিক যুগে আল্লাহর রাসূল উসমানকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তুমি তোমার জাতির ধর্মের বিরোধিতা করেছ এবং এক নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছ। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, হে উসমান, আমি আশা করি এমন একদিন আসবে যখন তুমি আমাকে এমন অবস্থানে দেখবে যেখানে আমি এই চাবি যেখানে ইচ্ছা রাখতে পারব এবং যাকে ইচ্ছা দিতে পারব। উসমানের সে কথা স্পষ্ট মনে ছিল। তিনি বললেন, জি। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ যা বলেছিলেন তা সত্যিই পূর্ণ হয়েছে। তারপর তিনি যোগ করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি চাবি রক্ষার যোগ্য ছিলেন। তিনি বহু বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি সত্যিই সেই আমানতের উপযুক্ত ছিলেন। সবাই ভাবছিল এখন চাবি কার হাতে যাবে। তখন আল্লাহর রাসূল এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানত তার হকদারদের কাছে ফিরিয়ে দিতে। এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে ফয়সালা করবে, ন্যায়ের সঙ্গে ফয়সালা করবে। তারপর তিনি বললেন, হে উসমান, এই নাও তোমার চাবি। আজ কল্যাণের দিন এবং অঙ্গীকার রক্ষার দিন। এরপর তিনি কাবায় প্রবেশ করলেন। তিনি দরজাটি বন্ধ করালেন এবং কিছু সময় ভেতরে একা অবস্থান করলেন। যখন তিনি বেরিয়ে এলেন, এক বিশাল জনসমাগম তার অপেক্ষায় ছিল। কুরাইশরা উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিল তিনি তাদের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নেবেন তা শোনার জন্য। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ নীরবে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি কি করতে যাচ্ছিলেন?
তিনি কি তাদের অপমান আর হেয় করবেন, যেমনটি তারা তার সঙ্গে ইতিপূর্বে করেছিল? তিনি কি তাদের উপর উটের নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপ করবেন, যেমনটা তারা করেছিল? তিনি কি তাদের পথ জুড়ে কাঁটা ছড়িয়ে দেবেন এবং তাদের তা মাড়িয়ে হাঁটাবেন? তিনি কি তাদের বয়কট করবেন এবং অনাহারে রাখবেন? তিনি কি তাদেরকে নিজেদের ঘর থেকে বের করে দেবেন? তিনি কি তাদের সবাইকে হত্যার নির্দেশ দেবেন? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করলেন এবং তার বিজয়ী খুতবা শুরু করলেন। তিনি শেষ করে তাদের জিজ্ঞেস করলেন, হে কুরাইশ সম্প্রদায়, এখন তোমরা কি মনে করো আমার তোমাদের সঙ্গে এখন কেমন আচরণ করা উচিত?
তারা বলে উঠল, আপনি একজন দয়ালু ও মহানুভব ভাই এবং একজন দয়ালু ও মহানুভব ভাইয়ের পুত্র। আমরা আপনার কাছ থেকে ভালো ছাড়া আর কিছুই আশা করি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছিলেন, বললেন, তোমাদের সঙ্গে আমার অবস্থা ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনার মতো। যেমনটা ইউসুফ তার ভাইদের বলেছিলেন, আমিও তোমাদের বলছি, আজ তোমাদের উপর আমার আর কোন আক্রোশ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি দয়াশীলদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত। জাস্ট একবার সেই দৃশ্যটি কল্পনা করুন। এটি ছিল এমন এক ক্ষমা যার তুলনা ইতিহাসে আর একটাও হবে না। কারণ তার হাতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এটাই কি ক্ষমার সর্বোচ্চ রূপ নয়?
আর অকল্যাণের জবাবে কল্যাণ করা কি সর্বোচ্চ মহত্ব নয়?
কুরাইশের একগৈমি এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। তাদের চোখ যা সত্যের ব্যাপারে অন্ধ ছিল অবশেষে দেখতে শুরু করল। পরের দিন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ে উঠলেন। এটাই ছিল সেই স্থান যেখানে বহু বছর আগে তিনি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে নবুয়তের ঘোষণা দিয়েছিলেন। মনে আছে, তিনি কারো কাছ থেকেই তেমন কাঙ্ক্ষিত কোন সাড়া পাননি। বরং সবার সামনে নিজের আপন চাচার কাছ থেকেই অপমানিত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন কুরাইশের লোকেরা দল বেঁধে ঈমান গ্রহণ করতে আসছিল। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও দলবদ্ধভাবে মুসলিমা হতে এলো। আর তাদের মধ্যে হিন্দু ছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী। ধরা পড়ার ভয়ে তিনি মুখ ঢেকে নারীদের দলে মিশে গিয়েছিলেন। তার অন্তর ভরেছিল গভীর অনুতাপে। অতীতে তিনি নবীজির এবং মুসলমানদের প্রতি যা যা করেছিলেন তার জন্য। অপরাধবোধে ভারী হয়ে ওঠা তার চিন্তাগুলো তার হৃদয় ও মনকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল। তবুও তার আশা ছিলতিনি আশা করছিলেন রহমতের নবীর দয়ার প্রতি। আল্লাহর রাসূল যখন জানতে পারলেন হিন্দ ইসলাম গ্রহণ করেছে, তিনি তার প্রতি কোন বিদ্বেষ পোষণ করলেন না। তার অতীতের সব ভুল সত্ত্বেও তিনি তাকে ক্ষমা করলেন এবং তার বাইআত গ্রহণ করলেন। হিন্দ নামটি আমাদের আরেকটি নাম মনে করিয়ে দেয় ওয়াহশি। সে ছিল এক দাস যে স্বাধীনতা পেয়েছিল হামজাকে হত্যা করার বিনিময়ে। যিনি ছিলেন নবীজির অত্যন্ত প্রিয় চাচা। এমনকি সে হামজার কলিজা কেটে হিন্দের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। আর আনন্দে হিন্দ তাকে তার সব গয়না দিয়ে দিয়েছিল। সেদিন ওয়াহশি তার তথাকথিত স্বাধীনতা পেলেও মক্কা কখনোই তাকে একজন মুক্ত মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেনি। তাদের চোখে সে আগের মতই থেকে গিয়েছিল। কুফরিতে ডুবে থাকা মানুষদের কাছ থেকে সে কিভাবে মর্যাদা আশা করতে পারে?
আর তাদের সম্মানই বা কি এমন আসে যায়? নিজের বিবেকের কারাগার থেকে সে কখনো মুক্ত হতে পারেনি। মক্কা বিজয় সেই বোঝাটা কেবল আরও ভারী করে তুলল। কিভাবে সে মুসলমানদের মধ্যে থাকবে নবীজির চাচাকে হত্যা করার পর? এই চিন্তাগুলো নিয়ে ওয়াহশি মক্কা ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু পালিয়ে গিয়ে কি সত্যিই সে অতীত থেকে মুক্তি পেতে পারবে? আল্লাহর দিকে ফিরে না এসে পালিয়ে গিয়ে সে কিভাবে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবে?
সে যেখানেই যেত, তার গুনাহের ভার তাকে অনুসরণ করত। নিজের বিবেকের আঘাতে সে একেবারে ভেঙে পড়েছিল। এই সবকিছুর মাঝখানে এক অপ্রত্যাশিত সাহায্যের হাত তার দিকে এগিয়ে এল। একটি প্রতিনিধি দল যাচ্ছে আল্লাহর রাসূলের কাছে ইসলাম গ্রহণ করতে। তিনি দুধদের কোন ক্ষতি করেন না। তুমি তাদের সঙ্গে যাও এবং ইসলাম গ্রহণ করো। সে সেই পরামর্শ মেনে নিল, মক্কায় ফিরে এল এবং নবীজির সামনে ইসলাম গ্রহণ করল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আমাদের রবের দয়া এতই অসীম যে, যারা তাওবা করে তিনি তাদের করা প্রতিটি গুনাহকে নেক আমলে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি তাদের এ আশাও দেন যে তারা তাদের মন্দ অভ্যাসগুলোকে ভালো অভ্যাসে বদলে ফেলতে পারবে। আরও একটি আনন্দময় দৃশ্য উন্মোচিত হল আবু বকরের জন্য। ইসলামের শুরুর দিনগুলো থেকেই তিনি আকাঙ্ক্ষা করতেন তার বাবা যেন ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেন। তিনি তার হাত ধরলেন এবং তাকে নিয়ে এলেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। নবীজি সম্মানবশত অস্বস্তি বোধ করলেন। কারণ এক বৃদ্ধ মানুষকে তার কাছে আনা হয়েছিল। তিনি বললেন, "আপনি কেন এই বৃদ্ধ মানুষটিকে ঘরেই রাখলেন না?
যাতে করে আমরাই সেখানে তার কাছে যেতে পারতাম।" রাসূলুল্লাহ তার হাত বাবার বুকে রাখলেন। কোমলভাবে মালিশ করলেন এবং বললেন, "হে আবু কুহাফা, ইসলাম গ্রহণ করুন।" আর তারপর তিনিও মুসলমান হয়ে গেলেন। এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। কিন্তু তখনও কিছু মানুষ ছিল যারা ঈমান আনেনি। তারা সত্য থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। হেদায়েতের আলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। চলুন আমরা ফিরে যাই বিজয়ের সেই দিনে। সেদিন মুসলিম বাহিনীকে পাঁচটি দলে ভাগ করা হয়েছিল এবং তার একটির নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। এদিকে ইকরিমা ইবনে আবি জাহিল এবং সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া প্রতিরোধ করার জন্য একদল যোদ্ধাকে জড়ো করেছিল। বাহিনী যখন শহরে প্রবেশ করছিল, তারা খালিদের ইউনিটের উপর আক্রমণ করল। যদিও নবীজি রক্তপাত চাননি, মুশরিকরা কিন্তু যুদ্ধের উপরই জোর দিয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা তেরো জন মানুষকে হারিয়ে পালিয়ে গেল। ইকরিমা পালাতে সক্ষম হলো এবং বন্দরে পৌঁছে গেল। সবকিছুর পরেও সে তখনও তার রবের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানোর চেষ্টা করছিল। সে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার জন্য একটি জাহাজে উঠে পড়ল। সে সবকিছু পেছনে ফেলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তার রব তাকে ছেড়ে দিলেন না। হঠাৎ করেই সাগরে এক অপ্রত্যাশিত ঝড় শুরু হলো। বাতাস ক্রমেই তীব্র হতে লাগল। জাহাজ ভীষণভাবে দুলতে এবং কাঁপতে শুরু করল। তারা আশঙ্কা করল এটি বুঝি ডুবেই যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে নাবিক জাহাজের লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল, "নিষ্ঠাবান হও, সত্যবাদী হও। এই ঝড় থেকে একমাত্র আল্লাহই আমাদের রক্ষা করতে পারেন।" তারা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। বাতাস ছিল প্রচণ্ড, আর আকাশ ছিল অন্ধকার ও মলিন। জাহাজের লোকেরা আন্তরিকভাবে দোয়া করতে শুরু করল এবং শুধু আল্লাহকেই ডাকতে লাগল, আর তার একত্বতা ঘোষণা করল। তোমরা এভাবে দোয়া করছ কেন?
আল্লাহ ছাড়া আর কেউ আমাদের সাহায্য করতে পারে না। ইকরিমা সেখানে এসেছিল এই সত্যকেই অস্বীকার করতে। কিন্তু তাদের কথাগুলো তার অন্তরকে গভীরভাবে নাড়া দিল। তাই সে দোয়া করল, "হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তবে আমি মুহাম্মদের কাছে যাব এবং ইসলাম গ্রহণ করব।" এর কিছুক্ষণ পর ঝড় শান্ত হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে ইকরিমা সেই মুহূর্তটি এভাবে বর্ণনা করেছিল, "সেটাই ছিল সেই সময় যখন আমি ইসলামকে বুঝতে শুরু করি, আর তার প্রতি ভালোবাসা আমার অন্তরে প্রবেশ করে। আমি জাহাজের লোকদের বললাম, 'আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চলো। আল্লাহর কসম!
আমি এখন মুহাম্মদের কাছেই ফিরে যাব।' " ইকরিমা মক্কা ছেড়ে যাওয়ার পর তার স্ত্রী উম্মে হাকিম মুসলিম হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গিয়ে তার স্বামীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আর দয়ার নবী ইকরিমাকে অভয় প্রদান করলেন। উম্মে হাকিম সঙ্গে সঙ্গেই তার দাসকে নিয়ে তার স্বামীর খোঁজে বের হলেন। দীর্ঘ সফরের পর তিনি তাকে তিহামার উপকূলে খুঁজে পেলেন। একটি দাম্পত্য যা একসময় তাদের জাহান্নামের দিকে টেনে নিচ্ছিল, এখন সেটিই রূপ নেবে এমন সম্পর্কে যা তাদের জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। লজ্জায় ভরা ইকরিমা বুঝতে পারছিল না সে কিভাবে মুখোমুখি হবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। সে বারবার ভাবছিল ইসলামের বিরুদ্ধে যা কিছু করেছে সেসব নিয়ে। কিভাবে তাকে ক্ষমা করা হবে?
আর তার উপরও সে ছিল আবু জাহেলের ছেলে। তার মন ভরেছিল নানা ভাবনায়। যখন তার স্ত্রী তাকে জানালেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, সে বিস্মিত হয়ে গেল, আর তার অন্তর প্রশান্তি অনুভব করল। কয়েকদিনের সফরের পর তারা মক্কার কাছে এসে পৌঁছাল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশঙ্কা করছিলেন কিছু লোক হয়তো ইকরিমার অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে। তাই তিনি তার সাহাবীদের বললেন, "ইকরিমা তোমাদের কাছে আসছে একজন মুমিন এবং একজন মুহাজির হিসেবে। তার বাবার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলো না। কারণ মৃতদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলা জীবিতদের কষ্ট দেয়, কিন্তু তা মৃতদের কাছে পৌঁছায় না।"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দেখে আনন্দে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন এবং তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর তিনি ইকরিমাকে আলিঙ্গন করে বললেন, স্বাগতম হে মুহাজির ও সওয়ারোহী। ইক্রিমা এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা একেবারেই আশা করেনি। তবুও সে লজ্জিত ছিল এবং মাথা নিচু করে রেখেছিল। তারপর তারা বসে কথা বলতে শুরু করল। অবশেষে ইক্রিমা শাহাদা পাঠ করল এবং মুসলমান হয়ে গেল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। তার অতীত জীবন গুনাহে পরিপূর্ণ ছিল এবং সে শিরকের অন্ধকারে ডুবেছিল। সে চেয়েছিল অবশেষে তার অন্তর প্রশান্তি খুঁজে পাক। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার কাছে আমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া চাই। আমি আপনার প্রতি যে শত্রুতা দেখিয়েছি, আপনার বিরুদ্ধে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য, আমি যেসব অবস্থানে আপনার বিরোধিতা করেছি এবং আপনার সামনে বা আড়ালে যে প্রতিটি কথা বলেছি তার জন্য। আল্লাহর রাসূল হাত তুললেন এবং আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। ইক্রিমার আত্মার উপরের ভারী বোঝা অবশেষে নেমে গেল। তারপর তিনি নবীজির কাছে এই অঙ্গীকার করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর কসম, আমি দ্বিগুণ সম্পদ ব্যয় করব আল্লাহর পথে যতটা আমি মানুষকে তার পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে ব্যয় করেছিলাম। আর আমি দ্বিগুণ যুদ্ধ করব আল্লাহর পথে যতটুকু আমি লড়েছিলাম মানুষকে তার পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে। এভাবেই আল্লাহর রাসূলের আরেকটি স্বপ্ন পূর্ণ হলো। নবীজি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন যার অর্থ তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি নিজেকে জান্নাতে দেখলেন আর সেখানে একটি সুন্দর বৃক্ষ ছিল যা তাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "এটি কার?" উত্তরটি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। "এটি আবু জাহেলের।" তিনি মনে মনে বললেন, "আল্লাহর কসম, সে কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কিন্তু আমাদের মত এমন অর্থহীন স্বপ্ন নবীগণ দেখেন না।" আর সেদিন এই স্বপ্নের অর্থ স্পষ্ট হয়ে গেল। সেই বৃক্ষটি ছিল আবু জাহেলের ছেলে ইক্রিমা। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাপত্তা দিয়েছিলেন কুরাইশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও যেমন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া ও সোহাইল ইবনে আমরকে। আর তারাও মুসলিম হয়েছিলেন এবং জীবনের অবশিষ্ট সময় ব্যয় করেছিলেন ইসলামের পথে। আল্লাহ তাদের সবার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। শহরে ছিল অপরিসীম আনন্দ। মক্কার মানুষ ঈমানের মাধুর্য অনুভব করছিল। যে জিনিসটি তারা সারা জীবন খুঁজেছে কিন্তু এর আগে তা কখনো খুঁজে পায়নি। এই আধ্যাত্মিক পরিবেশে এক বেদুইন আল্লাহর রাসূলের কাছে এলো। উত্তেজনায় সে কাঁপছিল। রাসূলুল্লাহ তার অবস্থা লক্ষ্য করলেন এবং তাকে বললেন, "শান্ত হও। আমি কোন রাজা নই। আমি তো শুধু এমন এক নারীর সন্তান যিনি শুকনো গোশত খেতেন।" সেই দিনটি ছিল বিনয়, মমতা ও বিশ্বস্ততার উদাহরণে ভরপুর। একজন মানুষ বিনয়ী হতে পারে কিন্তু বিজয়ের শিখরে দাঁড়িয়ে বিনয় দেখানো তা এক ভিন্ন বিষয়। একজন মানুষ দয়ালু ও ক্ষমাশীল হতে পারে কিন্তু ক্ষমতার চূড়ায় থেকেও এই গুণগুলো দেখানো তা একেবারেই ভিন্ন মাত্রার। মক্কা এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য একেবারে নতুন এক যুগের সূচনা হয়েছিল। আল্লাহ তার আলো পূর্ণ করছিলেন। তবে মদিনার মুসলমানরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে লাগলেন। তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছিলেন, "আল্লাহ তার রাসূলকে তার নিজ জন্মভূমির বিজয় দান করেছেন। এখন কি নবীজি ও তার সাহাবীগণ মক্কাতেই থেকে যাবেন নাকি আমাদের সঙ্গে ফিরে যাবেন?" তারা এ বিষয়ে গভীরভাবে কৌতূহলী ছিলেন কিন্তু তখনও এর উত্তর তাদের জানা ছিল না। আল্লাহর রাসূল তাদের উদ্বেগ বুঝতে পারলেন এবং আনসারদের জিজ্ঞেস করলেন তারা কি নিয়ে কথা বলছে। তারা বললেন, "তেমন কিছু না, হে আল্লাহর রাসূল।" কিন্তু তিনি কয়েকবার একই প্রশ্ন পুনরাবৃত্তি করার পর খেয়াল করলেন যে তারা স্পষ্ট উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে। তখন তিনি বুঝলেন তাদের মনে কি চলছে। তখন তিনি তাদের বললেন, "আমি তোমাদের সঙ্গেই বাঁচব এবং তোমাদের সঙ্গেই মারা যাব।" আবারও এই কথাগুলো তাদের সঙ্গে তার গভীর বন্ধন প্রকাশ করল। চোখে কান্না নিয়ে আনসাররা তার চারপাশে জড়ো হয়ে বললেন, "আল্লাহর কসম, আমরা এ কথাগুলো বলেছিলাম শুধু আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসার কারণে। এর বাইরে আর কোন কারণ নেই।" মক্কা বিজয় সবকিছু একেবারেই সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। কষ্টের দিনগুলো শেষ হয়ে গিয়েছিল আর সংগ্রাম সহজতায় রূপ নিয়েছিল। এটি ছিল এই ইঙ্গিতও যে একটি যুগের সমাপ্তি ঘনিয়ে এসেছে। সবকিছু ঠিক যেমনটি হওয়ার কথা ছিল তেমনি স্থির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখে গভীর প্রশান্তির পাশাপাশি ছিল এক নীরব প্রতীক্ষা। এখন তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল অবশেষে তার সর্বাধিক প্রিয় রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। এই পৃথিবীতে যেখানে তিনি বছরের পর বছর আল্লাহর বার্তা ছড়িয়ে দিতে নিজ হৃদয় ও প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন, সেখানে তিনি অচিরেই তার উম্মাহর সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলবেন। আর এবার শুধু অল্প কয়েকজন নয় বরং এক লক্ষেরও বেশি মুমিন সেই মুহূর্তের সাক্ষী থাকবেন। তাহলে বিজয়ের পর পৃথিবীতে কি পরিবর্তন এলো?
আরব উপদ্বীপে কেমন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ দিনগুলোতে কি ঘটেছিল? কি কি আবেগঘন মুহূর্ত ঘটেছিল? আর দয়ার নবী যখন তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন তখন তিনি তার উম্মাহর জন্য কি রেখে গেলেন? এই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এবং সূরা আল নাসরের মহান সুসংবাদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, সবকিছুই থাকবে আমাদের ধারাবাহিকের শেষ পর্বে। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন।