Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

বিখ্যাত এশিয়ান মডেলের ইসলাম গ্রহণ! - “ইসলাম আমাকে সেই দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তি দিয়েছে!”

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

আমি যুক্তরাষ্ট্রে বড় হয়েছি। আমার বাবা প্রেসবিটারিয়ান চার্চের একজন যাজক। আপনি যত জনপ্রিয় হবেন, আপনার জীবনটা ততোটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে। মনে হয় আপনার নিয়ন্ত্রণ আপনার কাছে, এবং জীবনটা খুবই ঝলমলে দেখায়, কিন্তু আসলে, আপনি মুক্ত নন, যেমন, আমি একটা এজেন্সির সাথে বাঁধা পড়েছিলাম। আর আমার মনে হতো, এজেন্সি যেন আমার আত্মাকে শুষে নিচ্ছিলো। আমি কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না। আমি আমার ভেতরে অনেক শূন্যতা অনুভব করছিলাম। আমি কে? এলিজা কে?

মনে হতো এখন আমি আর জানি না। নিজেকে দাসী মনে হচ্ছিল আমি বুঝতে পারছিলাম আমার ডিপ্রেশন বেড়ে যাচ্ছে। আমি অনুভব করছিলাম, আমার ভিতরে এই অন্ধকারটা বাড়ছিলো আর আমি ভাবছিলাম, এখন আমার আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজন। সেই সময়, মালয়শিয়াতে আমি এমন একজনের সাথে বন্ধুত্ব করলাম যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। তিনি আমাকে কিছু প্যামফ্লেট দিলেন। একটার পর একটা, আমার মনোভাব পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল। এবং শেষে বললেন, "এলিজা আমার মনে হয় তুমি অনেককিছু জানো। আমার মনে হয় তোমার এখন মুসলিম হয়ে যাওয়া উচিত"। আল্লাহ যদি আমার জন্য এটাই নির্ধারণ করে রাখেন, আমার বাধা দেবার কোন ক্ষমতাই নেই। আমি খুবই হাল্কা অনুভব করলাম। আর এখন আমি স্বাধীন। এলিজা কিম কে? সংক্ষেপে আমাদের বলতে পারেন?

আমি একজন থাই বংশোদ্ভূত আমেরিকান। আমি জন্মেছি ওকলাহোমার ইনিড নামের একটা ছোট্ট শহরে একজন যাজকের পরিবারে। আমার বাবা প্রেসবিটারিয়ান চার্চের একজন যাজক। আমি যুক্তরাষ্ট্রেই বড় হয়েছি। মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করার পর আমি থাইল্যান্ডে চলে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি আসলে মিস থাইল্যান্ড প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। আর তখন থেকেই আমি অভিনয় আর মডেলিং ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম, আর এরপর মালয়েশিয়ায় যাই, যেখানে ১২ বছর আগে আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি। আলহামদুলিল্লাহ। আপনার জীবনে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাব কেমন ছিল?

আমি এক ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান পরিবারে জন্মেছি। আমার বাবা প্রেসবিটারিয়ান চার্চের একজন যাজক। আমার চাচাও ধর্মযাজক ছিলেন, আমার দাদাও ধর্মযাজক ছিলেন। আর তারা থাইল্যান্ডে ধর্মীয় দিক থেকে বেশ উচ্চপদস্থ ছিলেন। তো আমি যেই সময়টায় ওকলাহোমায় জন্মেছিলাম, সেই সময় আমার বাবা ধর্মতত্ত্বে পিএইচডি করছিলেন। এজন্য আমি মোটামুটি চার্চের মধ্যেই বড় হয়েছি। আমার বয়স যখন তিন বছর তখন থেকে চার্চের কোরাস গান গাওয়া শুরু করেছিলাম, আমি প্রতি রবিবার চার্চে যেতাম। এমনকি কলেজেও আমি খ্রিস্টান অ্যাকাপেলা গ্রুপে গান গাইতাম। তাই খ্রিস্টান ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, স্রষ্টায় বিশ্বাস আমার জন্য অনেক বড় একটা বিষয় ছিল। পরীক্ষা দেওয়ার সময়গুলো আমার মনে আছে। আমি ভাবতাম, “আমি ঠিকমতো পড়িনি,” কিন্তু আমার কাছে ক্রস ছিল, আমি সেটা আমার ডেস্কে রাখতাম, আর যদি ভালো ফলাফল আসতো, তাহলে মনে হতো এটা স্রষ্টার করুণা। আমি বেশ ধার্মিক মেয়ে ছিলাম, কিন্তু সবসময় স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতাম। আমি কখনো যীশুর কাছে প্রার্থনা করিনি। কখনো স্রষ্টার পুত্রের কাছে প্রার্থনা করিনি। ঠিক কি কারণে আপনার বিশ্বাস নিয়ে আপনি সন্দিহান ছিলেন?

আমার মনে হয় একটু খ্যাতি পাওয়ার পর থেকেই আমার এমনটা শুরু হয়েছিল। আসলে, আমি ১২ বছর বয়স থেকে টিভির পর্দায় আসছি। এই জগৎটা আমার খুব চেনা। আমার মনে হয় আমার মা আমাকে বিকশিত হতে দেখে এবং আমি একটু ওপেন মাইন্ডেড হতে পারছি সেটা দেখে বেশ খুশিই হয়েছিলেন। তখন আমাকে বাচ্চাদের মডেলিংয়ের মতো কাজ করতে দেওয়া হলো। তারপর মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করার পর, আমি থাইল্যান্ডে গেলাম বাবার সঙ্গে ছুটি কাটাতে। ঠিক যখন আমি থাইল্যান্ডে পৌঁছালাম, বাবা ঠিক করলেন, আসলে ঠিক করলেন এমন নয়, তাকে ব্যবসায়িক কাজে জেনেভায় যেতে হলো, আর দুই সপ্তাহের জন্য আমাকে একা ছেড়ে গেলেন। সেই সময়ে মিস থাইল্যান্ড প্রতিযোগিতার একটা বিজ্ঞাপন দেয়া শুরু হয়েছিলো। আমি ভাবলাম, “আচ্ছা, এটাতো আমার জন্য দুই সপ্তাহের ফ্রি ছুটি।” বাবা যেহেতু চলে গেছেন। তাই এই সুন্দর ছুটিটা আমি উপভোগ করছিলাম। আমি প্রতিযোগিতায় অংশ নিলাম, আমি যেহেতু খুব একটা লম্বা নই, তাই ভাবলাম, “হয়তো আমি পারব না,” “এখানে আমার তো হবে না।” আমিতো কেবল ফ্রি খাবারের জন্যেই গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি প্রথম পাঁচজনের মধ্যে চলে এলাম, তখন ভাবলাম, “আমি এটা কী করছি?” কিন্তু সেই প্রতিযোগিতাই আমার জীবনের অনেক দরজা খুলে দিয়েছিল। আমি প্রতিযোগিতা শেষ করে, টিভি কমার্শিয়ালে কাজ করা শুরু করলাম, আর মালয়েশিয়ায় আসার কারণও সেই টিভি কমার্শিয়াল ছিল। তো আমি মালয়েশিয়ায় সেই কাজের জন্যই গিয়েছিলাম। আমি একটা এই রকম রিয়েলিটি শো করলাম। অবশেষে একটা টেলিমুভিতে কাজ করলাম, যা টিভির জন্য তৈরি, আর একটা ভ্যাম্পায়ার মুভি ছিল। আমার সেই টেলিমুভির কলাকুশলীরা ছিল মালয় মুসলিম। তখন আমার মাইন্ডসেট খুব আমেরিকান ছিল, আমি সেই দেশে পৌছে ধর্ম বা অন্য কিছু নিয়ে একবারও ভাবিনি। আমার মনে হয়নি, এই হিজাব পরা নারীরা মুসলিম। আমি মনে করতাম, “আচ্ছা, এটা এখানকার ফ্যাশন।” আমি ভাবিনি, দাড়িওয়ালা পুরুষরা মুসলিম। আমি শুধু মনে করতাম, “এখানকার পুরুষরা দাড়ি রাখতে পছন্দ করে।” তারপর যখন শুটিং শুরু হলো, আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার টিমের পরিচালক আর অন্যান্য অভিনেতারা দিনে কেন খাবার খাচ্ছে না?

আর রাতের বেলা অনেক খাচ্ছে। আমার তো জানা ছিলো না তখন রমজান মাস চলছিল। আমি শুধু জানতাম তারা দিনের বেলা খাচ্ছে না। তারা আমাকে খেতে বলত, কিন্তু নিজেরা খেত না। আমি ভাবতাম, “ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত।” আমার একটা উদাহরণ দিতে হবে, অনেক সময় আমরা দেখি হলিউড তারকারা, খ্যাতি পাওয়ার পর তারা বিষণ্ণতা বা তার চেয়েও খারাপ অবস্থায় চলে যায়। সবাই ভাবে, এমন কেন? তাদের তো সবকিছুই আছে। তাদের সবকিছু থাকার পরেও তারা কী করছে? তো আমার ঠিক সেরকম অনুভুতি হতো, আমি মনে করতে শুরু করলাম যে, মানুষরা আমাকে জানে সেজন্য আমার বন্ধু হতে চায়, নাকি আমি অভিনেত্রী সেজন্য?

এবং শুধু তাই নয়, কারণ একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় যাওয়ার পরে, আপনাকে লোকে যত বেশি জানবে বা আপনি যত জনপ্রিয় হবেন, আপনার জীবন ততোটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। মনে হয় আপনার নিয়ন্ত্রণ আপনার কাছে, এবং জীবনটা খুবই ঝলমলে দেখায়, যেমন, আমি একটা এজেন্সির সাথে বাঁধা পড়েছিলাম। আর আমার মনে হতো, এজেন্সি আমার আত্মাকে শুষে নিচ্ছিলো। কারণ কমার্শিয়াল একটা মডেলিং ইন্ডাস্ট্রিতে আপনি যখন একটা নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছান যেমন আপনি সকালে উঠবেন, তারপরে শুটে যাবেন, আপনার চুল আঁচড়ানোর প্রয়োজন নেই, কিছুই আসলে করার দরকার নেই। এমনকি বাসায় পরার কাপড়ে পড়েই, একেবারে শুটিং স্পটে চলে যেতে পারবেন। যখনই আমি সেখানে বসতাম, কেউ এসে আমার চুল আঁচড়াতে শুরু করতো, কেউ এসে আমাকে জামা দিতো, কেউ এসে মেকআপ করিয়ে দিতো, কেউ এসে আমাকে খাবার দিয়ে যেতো। আমি কোনও সিদ্ধান্ত নিতাম না, এমনকি আমি জানতামও না, কোন ধরনের ডিম আমি খেতে চাই। আমি জানতাম না, কোন ধরনের হেয়ারকাট আমি চাই। যদি আমি শুটিং এ হেয়ারকাট করি এবং তারপর ক্লায়েন্ট আসে এবং বলে, “ওহ, এই হেয়ার কাটটা আমাদের পছন্দ হয়নি,” তারা স্যালন থেকে কাউকে নিয়ে আসবে সেখানেই আমার চুল কাটানোর জন্য। আসলে আমি ভেতরে অনেক শূন্যতা অনুভব করছিলাম। আমি কে?

এলিজা কে?

এখন আমি আর জানি না। আমি জানি না কিভাবে পোশাক পরতে হয়। আমার মনে হচ্ছিলো আমার জীবনটা গোলক ধাঁধায় পড়ে গিয়েছে আর আমি ভিতরে প্রচন্ড শূন্যতা অনুভব করছিলাম। তখন অনুভব করতাম, আমি যেন শূন্যতায় হারিয়ে যাচ্ছি। এবং সত্যি বলতে ব্যাপারটা এমন ছিলোও না। আমি আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম কিভাবে সুখে থাকা যায়। আমি জানতাম না আমি কে। আমি জানতাম না কোনটা অনুভব করতে হবে। কারণ আমি শুধু আমার স্ক্রিপ্ট যা বলত, তাই অনুভব করতাম। যদি সেদিন আমাকে বিষণ্ণ থাকতে বলা হতো, তাহলে আমি সেদিন বিষণ্ণ থাকতাম। আর যদি আমাকে হাসিখুশি থাকতে বলা হতো, সেদিন হাসিখুশি থাকতাম। আমি জানতাম না আমি কি অনুভব করছি। আমি কাউকে জানানো ছাড়া নিজের নখও কাটতে পারতাম না। আমি রোদে যেতে পারতাম না, কারণ ত্বক রোদে পুড়ে গেলে মেকআপ বদলে যাবে, এমনকি আমি ৩০০ গ্রাম ওজন কমাতে বা বাড়াতে পারতাম না, কারণ তাতে আমার মুখের বৈশিষ্ট্য এবং শরীর বদলে যাবে। আমি একরকম দাসী হয়ে গিয়েছিলাম। আমি যেন শূন্যতা আর অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিলাম। তো আমি সবসময় অনুভব করতাম, আমি কে?

একজন খুব আত্মবিশ্বাসী আমেরিকান মেয়ে থেকে, আমি বুঝতে পারছিলাম আমার ডিপ্রেশন বেড়ে যাচ্ছিলো। আমি অনুভব করছিলাম, আমার ভিতরে এই অন্ধকারটা বাড়ছিলো, আর আমি ভাবছিলাম, এখন আমার আধ্যাত্মিকতার প্রয়োজন। যেহেতু আমি একজন ধর্ম যাজকের মেয়ে তাই প্রথমে আমি, আমি খ্রিস্টান ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম। এজন্য আমি অনেক বই কিনেছিলাম, সেগুলো এতো বেশি ছিলো যে, আমার বাবা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি সেমিনারিতে যাবে?" তুমি কি যাজক হতে চাচ্ছ, না কি অন্য কিছু?

তো আমি অনেক বই কিনলাম এটা ভেবে যে, আমি ছোটবেলা থেকে সব সময় স্রস্টার উপর নির্ভর করেছি। আমি ধর্মে গভীর মনোনিবেশের সিদ্ধান্ত নিলাম। আর আমি ভাবলাম, আমি একটা শিশুর মতো, যাজকদের কথা না শুনে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে সঠিকভাবে গবেষণা করব। তাই আমি পড়তে শুরু করলাম। এবং সত্যি বলতে, আমি এর আগে খুব বেশি বই পড়িনি। কিন্তু এখানে আল্লাহ আমাকে পথপ্রদর্শন করতে শুরু করলেন কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, যদি আমি প্রাচীন চার্চ খুঁজে পেতে পারি, আর আমার ইচ্ছাও ছিলো আমি প্রাচীন চার্চ খুঁজে বের করব, এবং তারা কীভাবে ইবাদত করেছিলো, তা জানব। আর সেভাবেই আমি স্রষ্টার ইবাদত করার চেষ্টা করব। কারণ এতেই তিনি সন্তুষ্ট হবেন। আসলে আমি জানতাম যে খ্রিস্টধর্মে অনেক ধরনের বিভক্তি রয়েছে। তখন, প্রায় ২০০টি বিভিন্ন ধরনের বিভক্তি ছিল। আমি মনে মনে বললাম, এটা হতে পারে না। অবশ্যই একটা পথ থাকবে যেটা সর্বশ্রেষ্ঠ হবে। যখন আমি বাইবেল কীভাবে সংযুক্ত হয়েছিল তার ইতিহাস পড়লাম, আমি ভাবলাম, যেটা আল্লাহর কাছ থেকে আসছে বলে ধারণা করা হয় সেই ম্যানুস্ক্রিপ্টের ব্যাপারে কিভাবে কিছু পুরুষ মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

কিভাবে তারা এতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে? এটা হাস্যকর। কিভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, এই অংশ থাকবে, আর ঐ অংশ থাকবে না? বিষয়টা অবাক করার মতো। এটা হতে পারে না। আমি বাইবেলকে বিশ্বাস করতে পারি না। তখন আমি ভাবলাম, এটা নিয়ে চিন্তা করাটা বাদই দিই। কারণ বিষয়টা আমাকে খুব অস্থির করে তুলছিলো। তো আমি বাইবেলটা রাখলাম। তার চেয়ে ইতিহাস নিয়ে খুঁজি। আর খ্রিস্টান ইতিহাস অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী। তখন আমি ভাবলাম, যদি কিছু বিশ্বাস করানোর জন্য কাউকে খুন করা লাগে, এবং মানুষকে চাপে ফেলে বিশ্বাস করাতে হয়, তবে তা সঠিক মনে হচ্ছে না। অতএব বাইবেল বাদ, ইতিহাসও বাদ। তখন ভাবছি কি করা যায়?

একজন খ্রিস্টান মেয়ে হিসেবে, আমি প্রার্থনা করতে ভুলতে পারি, শুধু তাই নয়, তখন আমি নাচতে ভালোবাসতাম। যদি আমি এক রাতে নাচতে যাই, শনিবার রাতে, এবং আমি যেটা ইচ্ছা পরছি আর যা ইচ্ছা করছি, তারপর আমি পরের দিন সকালে চার্চে যাই, আচ্ছা এটা কি ঠিক?

এটা আসলে ঠিক নয়। তো আমার মনে হলো, এখানে কিছু ফাঁকফোকর আছে। আমি জানতাম না আমি এসব ফাঁকফোকর মেনে নিতে পারবো কিনা। আমি এগুলো নিয়ে না ভাবার চেষ্টা করতাম, জানতাম না, আমি এগুলো মেনে নিতে পারবো কিনা। আমি তখনও খ্রিস্টধর্ম বাদ দিইনি। আমি ভাবলাম আমার হয়তো আরো কিছু রিসার্চ করতে হবে। সেই সময়, মালয়শিয়াতে আমি এমন একজনের সাথে বন্ধুত্ব হোল, যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে। এর আগে আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, এমন কারো সাথে কখনোই মিশিনি। আমি দেখলাম যে, আমার বান্ধবী মাশাআল্লাহ আল্লাহ যেমনটি চেয়েছেন, দিনে পাঁচ বার সম্পূর্ণ শরীরের একটা প্রার্থনা করে। আর আমি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখতাম আর ভাবতাম, আমি একজন যাজকের মেয়ে সেই আমিতো দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করিনা। যদি আমি দুই মাসের জন্য প্রার্থনা বন্ধও করে দেই, কিছুই যায় আসে না। তো আমার সেই বান্ধবী, তারা যে ক্লাস করত তার একটাতে তাদের সাথে আমাকে যেতে বলল। এবং এটা ছিল শেখ হুসাইনির ইসলামিক সেন্টারের একটা ক্লাস। আমি জানতাম না তিনি কে। আমি কি ধরনের পোশাক পরবো?

আমিতো একজন মডেল। এসব ভেবে আমি বরং একটু ভয়ে ভয়েই ছিলাম। অবশেষে আমরা যখন সেখ হুসাইনির ইসলামিক সেন্টারে গেলাম। তিনি আমাকে কিছু প্যামফ্লেট দিলেন, আর আমি আপনাকে বলছি এই প্যামফ্লেটগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন আল্লাহ এগুলো আমার জন্যই সাজিয়ে দিয়েছেন। প্রথমটার কথা আমার এখনো মনে আছে, এটার নাম ছিল আনাতু। আনাতু ছিল আসলে অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের ঈশ্বর। এখানে আনাতুর কথা বলা হয়েছিল কারণ তাদের স্রস্টার ধারনা ছিল এরকম যিনি খাবার খান না এবং টয়লেটে যাননা। তো বিষয়টা তাওহীদের অর্থাৎ একেশ্বরবাদের দিকেই যাচ্ছিল। এভাবেই একটার পর একটা, আমার মনোভাব পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল। তিনি নবীদের কাহিনী বলছিলেন, আর আমি ভাবছিলাম, সবকিছু কেমন যেন পরিচিত পরিচিত লাগছে। ইব্রাহিম (আঃ) যে আব্রাহাম এটা আমি বুঝতে পারিনি। আমি এটাও বুঝতে পারিনি যে মুসা (আঃ) হচ্ছেন মযেস। কারণ এগুলো আরবিতে বলা হচ্ছিল যা আমার কাছে সম্পুর্ণ অচেনা। মাঝে মাঝে মানুষ আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আপনি তো মডেল ছিলেন, এসব থেকে ফিরে আসা কি খুব কঠিন ছিল?

আমি বলবো, না। যদিও আমি মডেল ছিলাম, কিন্তু তথাকথিত মডেলদের মতো আমি পার্টি, আনন্দ ফুর্তি এসব করে বেড়াতাম না। আমি এক কোনে বসে বই পড়তাম আর আমার পালা এলে কাজ করতাম, এই আরকি। তো আমি যা পড়তাম, আমি তাই নিয়ে ভাবনায় পড়ে যেতাম। তা আমার নীতির সাথে অনুরণিত হোত। আমি সব সময় ভাবতাম, আমি যেখানে আছি, তা আসলে ঠিক আমার সাথে যায়না। হ্যাঁ, আমি অভিনয় এবং মডেলিং করেছি, এবং প্রচুর মানুষ এই ইন্ডাস্ট্রিতে যেতে চায়, আমিও নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করতাম, কিন্তু সবসময় মনে হত যেন আমি আমার নিজের মধ্যে নেই। যখন আমি প্যামফ্লেটগুলো পড়তে শুরু করলাম, আমি অনুভব করলাম সেখানে যে মূল্যবোধ গুলোর কথা ছিল, তা আমার সাথে খুব ভালোভাবে মিলে যায়। তাই, এটা কঠিন ছিল না। তাওহীদের ধারনা, একেশ্বরবাদের ধারণা, আমার মনে খণ্ড খণ্ড চিত্রের যে ধাঁধা ছিল তার পরিপূর্ণ সমাধান দিচ্ছিল। আমার মনে হয় কি জানেন?

ইসলাম এক প্রত্যয়ের নাম। আমি বুঝতে পারলাম আদম (আঃ) এর সময় থেকে অর্থাৎ, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব সময়ই ইসলাম ছিল। সব সময়েই মুসলিমরা ছিলেন। আমাকে ভাবায়, আমার ভেতরের অতিরিক্ত চিন্তা করা, পারফেকশনিস্ট, পড়ুয়া স্বত্বা বলছিল আমাকে একজন ভালো মুসলিম হতে হবে। আমি কি তা হতে পারব?

আমি মুসলিম হলাম আর সাথে সাথে পাপ করাও শুরু করলাম আমি এমনটা একদমই হতে চাইনা। সে সময়ে এটাই আমার যুক্তি ছিল। আর আমি ভাবলাম ঠিক আছে, আমাকে কিছু জিনিস শিখতে হবে। আমাকে আরবি শিখতে হবে, নামাজ পড়া শিখতে হবে, সবকিছু শিখতে হবে। কিন্তু উস্তাদ শরিফ আমাকে এ পর্যায়ে থামালেন। বলা বাহুল্য সেই দিন থেকেই তিনি আমার সাথে আরও গুরুত্ব সহকারে কথা বলা শুরু করেছিলেন। আল খাদিম থেকে আমি একজন ভলান্টিয়ার বুক করেছিলাম। আমি ভাবছিলাম, আমাকে তো জানোতে হবে এরা কত সকালে ঘুম থেকে উঠে, হিজাব পড়তে কতক্ষণ লাগতে পারে? নিশ্চয়ই প্রচুর সময় লাগে, রোজা কিভাবে রাখে? কারণ তখন আমি এখনকার থেকেও বেশি হাল্কা পাতলা ছিলাম। আমি ভাবছিলাম, আমি তো এত পাতলা একটা মানুষ। আমি কেমন করে রোজা রাখবো? আমি অসুস্থ হয়ে যাবো নাতো?

তাই আমি ঠিক করলাম, এক সপ্তাহের জন্য একটা মেয়েকে পর্যবেক্ষণ করবো। আমি তার বাড়ীতে ভোর ৫ টায় চলে যাবো। সে কি করে আমাকে দেখতে হবে। তাহলে আমিও সেসব করতে পারি কীনা বোঝা যাবে। তো সেদিন আমি আমার ভলান্টিয়ারের সাথে দেখা করার কথা। কিন্তু সেদিন ছিল রবিবার, নিয়মিত ক্লাস ছিল। তাই আমি আগে ক্লাসে গেলাম এবং ওস্তাদ শরিফ আমাকে থামালেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন "এলিজা, তুমি এখন পর্যন্ত কী কী জানতে পেরেছ?

তুমি কী এ ব্যাপারে কথা বলতে চাও?" আমি মনে মনে বললাম, না উস্তাদ, আমি আমার অনুসন্ধান করে ফেলেছি। আমার নিজেকে মুসলিমই মনে হয়। কিন্তু তিনি এত সুন্দর করে বললেন, যে আমি ভাবলাম ঠিক আছে, একটু কথা নাহয় বলেই দেখি। তো আমরা শেখ হুসাইনের বাড়ীতে গেলাম, এবং বসে আলাপ করতে শুরু করলাম এখন আসলে আমি আপনাকে যা বলছি। তো তিনি সব শুনলেন। এবং শেষে বললেন, "এলিজা তুমিতো বেশ অনেক কিছুই জানো। তোমার এখন মুসলিম হয়ে যাওয়া উচিত"। আমি বললাম, আজকে আমার একজন ভলান্টিয়ারের সাথে দেখা করার কথা এইতো আর ১৫ মিনিটের মধ্যে। আজকে মনে হয় হবেনা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "তাহলে, তোমাকে কিসে আটকাচ্ছে?" তাই আমি তাকে বললাম, আমার মনে হয় আমার আরবি শিখতে হবে, কুরআন পড়া শিখতে হবে, নামাজ পড়া শিখতে হবে। অন্তত কিছু হাদিস, নবীর বাণী আমার জানা উচিত। তিনি আমার দিকে তাকালেন, আমার মনে আছে, আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, অথবা আমার মনে হয় তিনি আমার ভেতরের পারফেকশনিসম তখনই বুঝে গিয়েছিলেন, সেটা বুঝতে পেরেই, তিনি বললেন, "তোমার কি মনে হয় এই কাজগুলো করতে তোমার কতদিন লাগতে পারে?

২০ বছর? ৩০ বছর? ৫০ বছর? আর তারপর- আমি জানিনা দর্শকদের কাছে এটা হাস্যকর লাগবে কিনা- কিন্তু আমি আমার কান্না আটকে রাখতে পারিনি, এখানে আপনার মনে রাখতে হবে আমি এই বিষয়ে প্রায় তিন মাস ধরে পড়াশোনা, অনুসন্ধান করে যাচ্ছি, দ্বীনি জ্ঞান আমি প্রচণ্ড ভাবে অর্জন করতে চেয়েছি। আমি সবকিছু বুঝতে চেয়েছি যাতে আমি একজন ভালো মুসলিম হতে পারি। তো তিনি বললেন, "এলিজা, তুমি কি জাননা আল্লাহ প্রশংসিত এবং মহিমান্বিত দীনি ইল্ম শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্যই সংরক্ষিত রেখেছেন?

তো তখন বিষয়টা বুঝতে পেরে আমার বুকে আঘাত লাগলো। আমি কাঁদতে শুরু করেছিলাম এই ভেবে যে, আমি একজন পরিপূর্ণ মুসলিম হতে পারবনা। কিন্তু সে মুহূর্তে আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আল্লাহ আমার মনে এই ভাবনা স্থাপন করে দিয়েছিলেন, যে আল্লাহ এই যাত্রায় আমাকে দেখিয়েছেন আসলে আমার পুরো জীবনে আমি ভেতর থেকে একজন মুসলিম ছিলাম, তিনি কি আমার বাবার ব্যাপারেও আমাকে সাহায্য করবেন না?

তিনি নিশ্চয়ই আমার পরিবারের ব্যাপারেও সাহায্য করবেন। এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হলাম। আর আমি ভাবলাম, ওস্তাদ ঠিকইতো বলছেন। আমি যাই বলি না কেন, আমার মধ্যে কিছুটা হলেও, জাহির করার প্রবণতা তো আছে। জাহির করতে চেয়েছি আমি কতটুকু জানি, কতটুকু আমি অনুভব করি, আমি শুধু মুখেই তাওহীদের আনুগত্য করেছি। যতক্ষণ না আমি শাহাদা নিচ্ছি, আমি শুধু কিছু বাক্যব্যয় ছাড়া কিছুই করিনি। আমি যদি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার পদক্ষেপটা পর্যন্ত নিতে না পারি আল্লাহ আমাকে দ্বীনি এলেম কেন দান করবেন?

আমার কান্না আরও বেড়ে গেল, মাশাআল্লাহ ওস্তাদ যিনি শাহাদার সাথে অতি পরিচিত, বুঝতে পেরেছিলেন আমার ধারনা আরও গভীর হয়েছে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি তৈরি?" এভাবেই সেই আলাপচারিতায়, অপরিকল্পিতভাবে, আমার ভলান্টিয়ারের সাথে দেখা করার পথে আমি বুঝতে পারলাম। আল্লাহ যদি আমার জন্য এটাই নির্ধারণ করে রাখেন, আমার বাধা দেবার কোন ক্ষমতাই নেই। আল্লাহ যদি এটাই চান, আমি আটকাতে পারবনা। তো আমি আমার শাহাদা নিলাম। আপনি তখন কেমন বোধ করছিলেন?

সেই অনুভূতি, আমি এখনো অনুভব করতে পারি। আরবিতে বলার সময়, তেমন কিছু বুঝতে পারিনি কারণ আমি এটা ঠিকভাবে উচ্চারণ পর্যন্ত করতে পেরেছি কিনা তাতেও সন্দেহ আছে। কিন্তু যখন আমি এটা ইংরেজিতে বললাম, আমি এখনো অনুভব করছি, একটা হাল্কা শিহরণ মাথা থেকে ঘাড় এবং তারপর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আমি এখনো এটা আমার হাঁটুতে এবং পায়ে অনুভাব করছি। আপনি একটা তরঙ্গের মতো অনুভব করবেন, যেন আপনার পুরনো জীবন আপনাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এবং আদম এর রুহ যেমন উপর থেকে নিচে ফুঁ দেওয়া হয়েছিল, ঠিক তেমন ভাবে নতুন জীবন আপনার শরীরে প্রবেশ করছে। এমনটাই অনুভব করেছিলাম। এবং যখন আমি এটা আমার পায়ের আঙ্গুলে, অনুভব করলাম যেমনটা আপনি কোন টিভি স্টেশনে সম্প্রচারে বিঘ্ন ঘটলে একটা বিপ্‌ শোনেন?

আমার কানে আমি এমন কিছুই শুনেছিলাম। আমার দৃষ্টিও একটু গোলাপি হয়ে গিয়েছিল। আমার দৃষ্টি একটু ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এরপর আমি হাল্কা, খুবই হাল্কা অনুভব করলাম। অনেক বেশী হাল্কা। আর ঠিক এর পরেই, আসরের আযান পড়ল। আর আমি ওযু কিভাবে করতে হয় না জেনেই ওযু করতে গেলাম। কেউ একজন বলে দিল, এভাবে করো, ওভাবে করোনা। আমি সাথে সাথেই আল কাদিমের নামাজ ঘরে চলে গেলাম। এবং আমার আরেক বান্ধবীর পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। পুরোটা সময় আমি তার দিকে দেখে দেখে নামাজ পড়লাম। ঠিক আছে এভাবে, ওহ্‌ এভাবে। এবং সেটা ছিল আমার প্রথম নামাজ আর আমার যতদূর মনে পড়ে, তারপর থেকে আমি কোন নামাজ মিস করিনি। আমার প্রথম সিজদাহ যেটা আমি বুঝে করেছিলাম সেটা ছিল সেই রাতে মাগরিবের সময়। একদিন আমি আমার ভলন্টিয়ার এবং তার বান্ধবীদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেখানে পাঁচজন ছিল। তার মধ্যে চারজন ছিল ইসলাম ধর্মে প্রত্যাবর্তিত। আমরা একটা ক্যাফেতে গেলাম আর তারপর, তাদের একজনের বাসায় মাগরিবের নামাজ পড়তে গেলাম। তো আমার প্রথম ইমাম ছিলেন একজন পুরুষ, দ্বিতীয় ইমাম হলেন একজন নারী। এবং সেই চারজন প্রত্যাবর্তিত মুসলিম আমাকে সিজদাহ করা শেখালেন। শেষ সেজদা, দোয়া করার জন্য একটু বেশি সময় ধরে করেছি কারণ এ সময় দোয়া কবুল হয়। আমি আপনাকে একটা দোয়ার কথা বলি যেটা আমি সেই বছরের শেষ সময় পর্যন্ত করেছি। আমার প্রত্যেকটা শব্দ মনে আছে কারণ আমি প্রতি নামাজে এই দোয়া করতাম। "ও আল্লাহ আমার বাবা মা যেন আমাকে তাদের মুসলিম মেয়ে হিসেবে মেনে নেন।" আমার প্রত্যাবর্তনের কাহিনী শুনে প্রথমেই মানুষ আমাকে যে প্রশ্নটি করে সেটা হচ্ছে, আপনার বাবা মা বিষয়টা কেমনভাবে নিয়েছিলেন?

এবং আমি আপনাকে বলছি দোয়ার শক্তির কথা, কারণ আমি অনেক ভয়ে ছিলাম। চিন্তিত ছিলাম। আমি যে মুসলিম হয়েছি সে কথা ডিসেম্বরের মধ্যেই আমার বাবাকে জানাতে হবে, কারণ আমি আল্লাহর কাছে এমনটাই ওয়াদা করেছিলাম। তাই আমি তাকে ডিনার করতে বাইরে নিয়ে গেলাম। পেট শান্ত থাকলে মানুষের মনও শান্ত থাকে। আসলে এটাই ছিল একটা কৌশল। এবং মনে রাখবেন, সারা বছরের দোয়াও এর সাথে আছে, যে দোয়ার কথা আমি আগে উল্লেখ করেছি, "হে রব, প্লিজ আমার বাবা মা যেন আমাকে তাদের মুসলিম মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করে।" আমি বার বার এই দোয়া করে গিয়েছি, কখনো হাল ছাড়িনি। ডেজার্ট খাওয়া শেষে, আমি সাহস সঞ্চয় করে বাবাকে বললাম, "বাবা তোমাকে ইসলাম এবং আমার ব্যাপারে কিছু বলার আছে।" এরপরে তিনি বললেন, "এলিজা তোমার কিছু বলতে হবেনা।" ওহ্‌ নো। তার কিছুক্ষণ পরে, আমার বাবা খুব সুন্দর কিছু কথা বললেন, অসম্বভ সুন্দর কথা। তিনি বললেন, "এলিজা, তুমি যদি আমার মতো, ইবরাহিম (আঃ) এর স্রষ্টাকে বিশ্বাস কর, তাহলে আমি খুশি। যদি এই ধর্মটি তোমার মনে নোঙ্গর করে এবং তোমাকে শান্তি দেয়, তাহলে ঠিক আছে। তুমি এগিয়ে যাও। তোমাকে আমার ব্যাপারে ভাবতে হবেনা, তোমাকে তোমার মায়ের ব্যাপারেও ভাবতে হবেনা, এবং পরিবারের কারো ব্যাপারেই ভাবতে হবেনা।" তিনি বললেন, আমাদের পরিবারে বৌদ্ধ আছে, ক্যাথোলিক আছে, প্রটেস্টান্ট আছে। এবার একজন মুসলিমও যোগ হল। তাই এত ভাবার কিছু নেই। কথাগুলো এতো সুন্দর ছিলো, আমার কাছে মনে হয়েছে সবচেয়ে সুন্দর স্নেহভরা কোমল কিছু কথা। এর পরের প্রশ্ন আসবে আমার মায়ের ব্যাপারে। আমার মা আমেরিকায় ছিলেন। আমার প্ল্যান ছিল, যেহেতু আমি বুদ্ধিমতী কন্যা, বাবাকে আগে বলা, কারণ দুজনের মধ্যে বাবা তুলনামূলক নরম ছিলেন, আমার সাথে দেখা করার পরে, তিনি সবসময় মার সাথে দেখা করতেন। মা তখনো বোস্টনে থাকতেন। তার কিডনিতে প্রব্লেম ছিল, তিনি নিজের দেখাশোনা নিজেই করছিলেন। প্ল্যান ছিল আমি বাবাকে বলবো, বাবা মাকে বলবে। তো বাবা বোস্টনে গেলেন, কথা ছিল তিনি সেখানে পৌঁছেই মাকে সব জানাবেন। আমি ভাবলাম, "ঠিক আছে, কালকে হয়তো তিনি আমাকে বলবেন যে সবকিছু বলেছেন।" একদিন গেল, দুইদিন গেল। মাকে বলতে আমার ভয় লাগতো। মা আমাকে হাজারটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবেন। কিন্তু একে একে পাঁচদিন চলে গেল। এবার আমি বাধ্য হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি মাকে বলেছ?

তিনি স্বাভাবিকভাবে বললেন, "হ্যাঁ বলেছি। কোন সমস্যা নেই। তুমি কি তার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে চাও?" আমি বললাম, " না না, চাইনা।" তো আমার বাবা মায়ের গল্পটা বেশ সহজ ছিল। অনেক সহজ। আমি সম্পূর্ণভাবে, সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি যে এমনটা দোয়ার কারণেই হয়েছিল। কখনো, কখনোই দোয়া করা ছেড়ে দেবেন না। দোয়া করার কথা ভুলবেন না। দোয়া করতেই থাকবেন যতক্ষণ না কবুল হয়। যখন আমি মুসলিম হয়েছিলাম, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমি একটি পরিবার পেয়ে গেছি। প্রথমবারের মতো আমি একটি পরিবার পেয়েছি যারা আমি পড়াশোনায় ভালো করলাম কিনা সেটা নিয়ে মাথা ঘামায় না, যারা আমার অতীত নিয়েও মাথা ঘামায় না। আমার খেয়াল রাখার জন্য আমাকে বিপদে সাহায্য করার জন্য একজন সাধারণ মুসলিম হওয়াই তাদের জন্য যথেষ্ট। যা পূর্বে কখনোই আমার ছিলনা। আমি বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আমি একা বড় হয়েছি। আমি ভাবছিলাম সবাই একজন আরেকজনকে ভাই বোন কেন বলছেন?

আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি, কিন্তু এখন আমি রাস্তায় যদি কোন হিজাবি দেখি তাহলে সে আমার বোন। আমি পরোয়া করিনা সে কোথা থেকে এসেছে। আমি তাকে চিনিনা, জানিনা, কিন্তু সে আমার বোন। যখন আমি থাইল্যান্ডের কোন রাস্তায় হাঁটি, কখনো কখনো আমি জানিও না সে মুসলিম, একজন ভাই হয়তো পাশ কাটিয়ে গেলেন আমি শুনতে পেলাম "আসসালামু আলাইকুম" আর আমি, "ওয়ালাইকুম আসসালাম" বলতাম। যখন আমার জীবনে ইসলাম এলো, অবশ্যই, প্রথমে আমি নিজের নীতিবোধের সাথে এর সাদৃশ্য পেয়েছিলাম। এরপর আমি বাহ্যিক ভাবেও সাদৃশ্য পেতে শুরু করলাম। এবং আমি বুঝতে পারলাম, হিজাব পরার পরে আমি কি বলতে চাইছি মানুষ তা শুনছে। এখন আমার কণ্ঠ মানুষের কাছে পৌঁছায়.

মানুষ এখন আমার বুদ্ধিবৃত্তি দেখে, যা আমি সবসময় চাইতাম। আমার মতামত শেয়ার করতে পারতাম না। কিছুই শেয়ার করতে পারতাম না। কিন্তু এখন আমি স্বাধীন। সেই দাসত্ব থেকে আমি মুক্তি পেয়েছি। ইসলাম হচ্ছে স্বাধীনতা, মনের স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা কাকে কি দেখাব, আমি কি পরবো। মাশাআল্লাহ। ইসলাম গ্রহণকারী একজন নারী হিসেবে, আপনি কি মনে করেন এই ধর্ম নারীদের অসম্মান করে, তাদের অবমূল্যায়ন করে?

এই ব্যাপারে একটা মিসকন্সেপশন আছে, যে ইসলাম নারীদের গুরুত্ব কম দেয়, তাদের অবমূল্যায়ন করে ইত্যাদি। কিন্তু আমি বলবো এটা একদমই সত্য নয়। তবে এটা বলা যায় যে কিছু কিছু জায়গায়, সংস্কৃতিকে ইসলামের নামে পালন করা হয়, আমরা যদি প্রকৃত ইসলামের কথা বলি, তখন উল্টো পুরুষদের জন্যই আপনার মন খারাপ হবে, সরি। আমার পুরুষদের জন্য একটু কষ্টই লাগে কারণ তাদেরকে পরিবারের জীবীকার জন্য বাধ্যতামূলক বাইরে যেতেই হবে, এছাড়াও তাদের অন্যান্য অনেক দায়িত্ব আছে। যেখানে আল্লাহ নারীদেরকে বরং প্রচণ্ড ছাড় এবং স্বাচ্ছন্দ্যই দিয়েছেন, পুরুষরদেরকে নারীদের সব দায়িত্ব নিতে হবে - আর্থিক, শারীরিক, মানসিক, সবকিছু, সবকিছু। নারীরা, আমরা সাদাকাহ হিসেবে পুরুষের জন্য রান্না করি, তাদের কাপড় ধুয়ে দেয়াও আমাদের সাদাকাহ। এবং অবশ্যই আমরা তাদেরকে আল্লাহর জন্যই সন্তুষ্ট করি। কিন্তু আপনি যদি প্রপার প্র্যাক্টিসিং মুসলিম পুরুষসমাজে থাকেন, একজন নারী হিসেবে মাশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, আপনি নিপীড়িত নন। আপনি আপনার মতামত জাহির করতে পারবেন, গুরুত্ব পাবেন, নিরাপত্তা পাবেন। প্রপার প্র্যাক্টিসিং পুরুষদের মধ্যে, ও আল্লাহ, একবার আমি একটি এনজিওতে কাজ করেছিলাম, ইসলামিক এনজিও, আমরা পালাক্রমে তাযকিরাহ করতাম। যখন আমার পালা আসতো সব পুরুষেরা হয় নিচের দিকে তাকিয়ে থাকত নয়ত অন্যদিকে তাকাতো। তারা আমাকে সম্মান করে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত না। আমার লেকচার মনযোগ সহকারে শুনত, আমি যখন চিলিস-এ খেতে যাই, একটা আমেরিকান রেস্টুরেন্ট, হালাল রেস্টুরেন্ট। আমার মনে আছে, আমি এভাবেই সেই রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম সেখানকার ওয়েটার ছিল বাংলাদেশী। তিনি আমাকে দেখার সাথে সাথে "হ্যালো" বলে সাথে সাথে মাথা নিচু করে টেবিলের দিকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। "হ্যালো ম্যাম। আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?

পুরোটা সময়, তিনি টেবিলের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। তিনি আমাকে যথেষ্ট রেস্পেক্ট দিয়েছিলেন। শত শত ধর্ম ও জীবনবাবস্থার মধ্যে ইসলামই কেন বেছে নিলেন? এটাও সবচেয়ে বেশি করা প্রশ্নের মধ্যে একটাঃ ইসলামই কেন? তো আমার উত্তর শরিয়াহ আইন। এই আইনগুলো আমার পছন্দ। সবাই আমার এই উত্তর শুনে খুবই অবাক হতো, "তোমার শরিয়াহ আইন পছন্দ?" মানে কি যে শরিয়াহ আইন পছন্দ?

"আমাদেরই তো এগুলো পছন্দ না।" জন্মসূত্রে মুসলিম বান্ধবীরা এটা বলতো। যে মানসিক অবস্থা থেকে আমি ফিরে এসেছি, আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম এবং শুন্য হয়ে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে ফিরে আসার পর এবং তথাকথিত সেমি-সেলিব্রেটি জীবন যাপন করার পর, যাইহোক, আমি পার্থক্যটা বুঝতে পারি। এটাও না জানা যে আপনি আসলে কি করছেন, ঠিক করছেন না ভুল করছেন, থেকে সবকিছু পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে যাওয়া, জানা যে এটা হল ঠিক, এটা হল ভুল, এর মাঝামাঝি যা কিছু আছে, যতক্ষণ না ইসলামের সাথে সাংঘর্ষীক হয় এমন কিছু করছেন, আলহামদুল্লিয়াহ সব কিছুই খুব পরিষ্কার। আমি জানি কীভাবে আমার জীবন সাজাতে হবে। আমি জানি কী করতে হবে। তাই আমি বিধানগুলো পছন্দ করি। আর যখন কিছু বিধান আমরা বুঝি না, যেমন: কেন দুইজন পুরুষ সাক্ষী বা একজন পুরুষের সঙ্গে দুইজন নারী সাক্ষী লাগে?

এর সব সময়ই একটা লজিক্যাল ব্যাখ্যা আছে। সব সময়ই এগুলোর ব্যাখ্যা থাকে। যদি কোনো মেয়ে নিজের মূল্য খুঁজে পেতে চায় বাহ্যিক সৌন্দর্যে চারপাশের মানুষের চোখে সুন্দর দেখাতে, বা শুধুই খ্যাতিতে, বা অন্য কিছুর ভেতর, তাকে আপনি কী বলবেন? নিজেকে আপনি জিজ্ঞেস করুন, এসব কি সত্যিই আপনাকে সুখী করবে? কারণ যখন আপনি ওই মেকআপ, ওই চুলের সাজ, সেসব পোশাক আর যা সবকিছু করছেন, একটু গভীরভাবে ভেবেচিন্তে দেখুন আপনি নিজের সুখটা অন্য মানুষের ওপর ছেড়ে দিচ্ছেন। তাদের স্বীকৃতি আর গ্রহণযোগ্যতার ওপরই নির্ভর করছেন যাতে আপনি খুশি হতে পারেন। সুখটা তাদের হাতে। আপনার মূল্য তাদের কাছে বাঁধা। আর খ্যাতির কথা? খ্যাতি কি সত্যিই আপনাকে তৃপ্ত করবে?

খ্যাতিও বাহ্যিক বিষয়। খ্যাতি আসে অন্য মানুষের কাছ থেকেই। আপনি বিখ্যাত হতে পারবেন না যদি না অন্যরা বলে যে আপনি অসাধারণ। তাহলে এটা কি সত্যিই আপনি নিজের জন্য চান?

হতে পারে আপনি চান, কিন্তু খ্যাতি পাওয়ার অন্য পথও আছে। আপনি ফেরেশতাদের কাছে বিখ্যাত হতে পারেন । হ্যাঁ, কিন্তু সেটা চোখে দেখা যায় না। আপনি আপনার ভালো কাজের কারণেও খ্যাতি পেতে পারেন। আপনি কতটা সৎ ও ধার্মিক, তার কারণেও পরিচিত হতে পারেন। যদি আপনি দাবি করেন, আপনার নিজের আত্মবিশ্বাস রয়েছে, আপনার বাহ্যিক যেমনি হোক না কেন, আপনি নিজের কথা তুলে ধরতে সক্ষম তাহলে মানুষ নিশ্চয়ই আপনার কথা শুনবে, আপনি নিজের জন্য গর্ববোধ করতে পারবেন, হ্যাঁ, তাহলে হয়তো বিশ্বাস করব। নিজের মর্যাদা খুঁজে নিন নিজের ভেতরেই, আর ইসলামকে শিখুন, কারণ ইসলামই আপনার সম্মান আপনাকে ফিরিয়ে দেবে। ইসসলামই আপনার কণ্ঠকে ফিরিয়ে দেবে, আপনাকে মর্যাদা ফিরিয়ে দেবে আপনাকে বোঝাবে যে পোশাক বা ম্যাকআপের চেয়ে আপনার নিজের মূল্য বেশি নিজের ভেতরে এগুলো খুঁজুন, আর সেই সব উত্তরের খোজ না পাওয়া পর্যন্ত সন্ধান করে যান।