Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

হামযা (রা.) ও উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ইসলাম গ্রহণ! - এআই ভিজ্যুয়ালাইজড - ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ)| পর্ব ৩

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

“হে আল্লাহ, এই দু’জনের মধ্যে যাকে আপনি বেশি ভালোবাসেন, তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করুন। আবু জাহেল অথবা উমর ইবনুল খাত্তাব।” এই দুআটি করেছিলেন আল্লাহর রাসূল (সাঃ)। এটি ছিল তাঁর নবুয়তের পঞ্চম বছর। তাঁর সীমাহীন অক্লান্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, তখন মুসলিমদের সংখ্যা ছিল খুবই কম—প্রায় ১৪০ জন। আধ্যাত্মিক দিক থেকে তারা ছিলেন পুরো মক্কার চেয়েও শক্তিশালী, কিন্তু সংখ্যায় ছিলেন একেবারে সামান্য। ইতিহাস জুড়েই দেখা যায় মানুষ অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, বিশেষত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা। আর সময় এসে গিয়েছিল তখন মক্কায় সেই প্রভাবশালী মানুষদের মধ্যে কয়েকজনকে ইসলামের ছায়া তলে নিয়ে আসার। এই ভিডিও সিরিজটি প্রস্তুত করা হয়েছে বিশ্বস্ত ইসলামী উৎসের শত শত রেফারেন্স থেকে। সব এআই ভিজ্যুয়াল প্রস্তুত করা হয়েছে যোগ্য মুসলিম স্কলারদের পরামর্শে এবং তা সম্পূর্ণভাবে ইসলামী নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আবু জাহেলের প্রকৃত নাম আমর ইবনে হিশাম, আর যেসব গুণ তাকে আলাদা করেছিল তা ছিল তার বুদ্ধিমত্তা ও সম্পদ। তাকে ডাকা হতো ‘আবুল হাকাম’— অর্থাৎ, ‘জ্ঞানীর পিতা’। কিন্তু মহাসত্যের প্রতি সে ছিল সম্পূর্ণ অন্ধ। তার অন্ধতা এবং মুসলিমদের ওপর তার লাগাতার নির্মম নির্যাতন তাকে আল্লাহর কাছে তাকে পরিণত করল ‘আবু জাহেল'-এ, যার অর্থ, ‘অজ্ঞতার পিতা’। আর উমর ইবনুল খাত্তাবকে আলাদা করেছিল তাঁর প্রজ্ঞা, যুক্তিবোধ, সাহস ও ন্যায়বোধ। ইসলামের শুরুর দিনগুলো থেকেই, সে ছিল সবচেয়ে কঠোরদের একজন। মুসলিমদের প্রতি তার আচরণ ছিল ভয়ংকর নিষ্ঠুর। তিনি কোনো সহনশীলতা দেখাতেন না, বরং ইসলাম ত্যাগ করতে অনেককে নির্যাতন করতেন। সে সময় তাঁর হৃদয় এতটাই কঠোর ছিল যে, তিনি একজন নারী সাহাবী লুবাইনাহ (রা.)-কে প্রহার করতেন শুধুমাত্র এজন্য যে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মারতে মারতে ক্লান্ত হলে, একটু থেমে সে বলত, "মনে করো না আমি দয়া প্রদর্শন করছি। আমি থেমেছি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি বলে। শক্তি ফিরে পেলে আমি আবার শুরু করব, এবং তুমি ইসলাম না ছাড়া পর্যন্ত থামব না।” আবু জাহেল ও উমর ইবনুল খাত্তাব— দু’জনই ইসলামের প্রতি শত্রুতায় ছিল সমান। তবুও আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এতটাই আশাবাদী ছিলেন যে এই নির্দয় মানুষদের থেকেও আশা ছাড়েননি। এবং তাঁর রহমত এতই গভীর ছিল যে তাদের জন্য হেদায়াতের দুআও করেছেন। এত কিছুর পরও তিনি তাদের জন্যে এই দুআ করলেন - “হে আল্লাহ, এই দু’জনের মধ্যে যাকে তুমি বেশি ভালোবাসো, তাঁর মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করো - আবু জাহেল কিংবা উমর ইবনুল খাত্তাব।” মক্কায় মুসলিমরা যখন প্রচণ্ড দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছিলেন তখন একদিন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর সাহাবিদের একত্র করলেন এবং বললেন, “এখন তোমরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ো। আল্লাহ আবার তোমাদের একত্র করবেন।” কিন্তু তারা কোথায় যাবে?

“হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ), আমরা কোথায় যাব?” রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন, “ওখানে।” তিনি ইশারা করছিলেন সেই ভূখণ্ডের দিকে, যেখানে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয়। “আবিসিনিয়ার রাজার শাসনে কারও উপর জুলুম করা হয় না। ওটি ন্যায়ের ভূমি। আশা করা যায়, সেখানে আল্লাহ আপনাদের জন্য স্বস্তি দান করবেন।” এভাবেই ইসলামের প্রথম হিজরত এই ভূমির দিকেই সংঘটিত হলো আবিসিনিয়ায়, বর্তমান ইথিওপিয়া। রজব মাসে, ১৫ জন সাহাবি শু‘আইবাহ বন্দর থেকে যাত্রা করলেন এই কাঙ্ক্ষিত ভূমির উদ্দেশ্যে। একবার নিজেকে সেই অবস্থায় কল্পনা করে দেখুনতো। এমন এক যাত্রা কি ভীষণ কঠিন নয়?

আপনি জানেন না, গন্তব্যে আপনার জন্য কী অপেক্ষা করছে। তার ওপর আপনাকে ছেড়ে যেতে হবে আপনার প্রিয়জনদের, আপনার ঘর, আপনার জন্মভূমি, আর সঙ্গে নেওয়ার সুযোগও থাকবে অত্যন্ত সীমিত। ভাবলেই মনটা ভার হয়ে আসে, তাই না?

কিন্তু সাহাবিরা ছিলেন এমন মানুষ, যাদের কাছে কোনো কিছুর মূল্যই আল্লাহর দীন থেকে বেশি ছিল না। আখিরাতের চিরস্থায়ী জীবন ছিল সব কিছুরই ঊর্ধ্বে। আর হয়তো সেই ভূমিতে সত্যপিপাসু কিছু মানুষও আলোর পথে হেদায়াত পাবে। প্রথম গ্রুপের কয়েক মাস পর আরেকটি গ্রুপও রওনা হলো। এবার নেতৃত্বে ছিলেন জা‘ফর ইবনে আবি তালিব (রা.)। এই দলে ছিলেন ১০১ জন, যাদের মধ্যে ১৮ জন ছিলেন নারী। যারা পেছনে রয়ে গেলেন, তারা কোনো সহজ জীবন যাপন করছিলেন না। বরং বাস্তবে তাদের অবস্থা ছিল আরও কঠিন। তারা সবাই ত্যাগের এক কঠিন সময় পার করছিলেন। আর আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কী করছিলেন? তিনি কি চলে যাওয়া লোকদের মধ্যে ছিলেন?

না। যেখানে বিপদ আর উত্তেজনা সবচেয়ে তীব্র ছিল, তিনি ছিলেন ঠিক সেখানেই—সামনের সারিতে। তাঁর ওপর যা-ই আসুক না কেন, তিনি প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিয়ে সব ত্যাগ স্বীকার করতেন। নিরবচ্ছিন্ন হত্যাচেষ্টার ঝুঁকি সত্ত্বেও, তিনি তাঁর দায়িত্ব থেকে কখনো পিছু হটেননি। পরবর্তীতে মদিনায় হিজরতকারীদের মধ্যেও তিনি ছিলেন শেষ দিকের একজন। আর মদিনার দিনগুলোতে, যখনই বিপদ বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিত, তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেন সবার আগে। বদরের দিনে, তিনি ছিলেন শত্রুর সবচেয়ে নিকটে। আর উহুদের দিনে, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে, তিনিই সাহাবিদের নিজের চারপাশে আবার একত্র করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে, সাহস আসে ঈমান থেকে তিনি ছিলেন তার শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। আর কুরাইশরা কী করল? আবিসিনিয়ায় হিজরতের ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়াই বা কী ছিল?

প্রথম দলটিকে তারা খুব একটা গুরুত্বই দেয়নি। “শুনেছি, তোমার ভাতিজার কয়েকজন অনুসারী আবিসিনিয়ায় চলে যাচ্ছে।” “ওকে আমার ভাতিজা বলে ডেকো না। আর তারা যদি যেতে চায়, যাক। আমরাই তো চাইছিলাম ওদের থেকে মুক্তি পেতে।” এবং তারা ভাবলেশহীন রইল। কিন্তু যখন তারা দেখল, একের পর এক মানুষ আবিসিনিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে, তখন তাদের বুক কাঁপতে শুরু করল। “যদি আবিসিনিয়ার লোকেরাও মুসলিম হয়ে যায়? যদি সাহাবিরা সেখানে গিয়েও ইসলাম ছড়াতে শুরু করে?

যদি তারা এমন শক্তি পেয়ে যায় যাকে আর থামানোই যাবে না?” এ কথাটা তারা বুঝতে পারলো অনেক দেরিতে। আর যখন বুঝল, ভেতরটা কেঁপে উঠল গভীর আতঙ্কে। তৎক্ষণাৎ তারা জড়ো হলো দারুন নাদওয়ায় (সমাবেশগৃহে)। তাদের ঠিক করতে হবে—পরের চাল কী হবে। দারুন নাদওয়া ছিল দারুল আরকাম (আরকামের ঘর)-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এক জায়গায় ছড়াত আলো, আরেক জায়গায় ছড়াত অন্ধকার। এই স্থানেই তারা ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্রের জাল বুনত। সেদিনও আবার, কুরাইশ নেতারা একত্র হলো। যেভাবেই হোক, মুসলিমদের ফিরিয়ে আনতেই হবে। এটা করা যাবে—আবিসিনিয়ার লোকদের কাছে মুসলিমদেরকে বিদ্রোহী দল হিসেবে তুলে ধরে, অথবা শাসকদের সামনে ইসলামকে খারাপভাবে উপস্থাপন করে। আজকের ভাষায় বলতে গেলে চালাকি, প্রোপাগান্ডা, এমনকি অপবাদও বলা যায়। এই পথেই কেবল তাদের থামানোর আশা ছিল। নিজ ভূমি ছাড়তে বাধ্য হওয়া সাহাবিরা সেখানে গিয়েও একটুখানি শান্তি পাক—তাও তারা চাইত না। শেষমেশ দারুন নাদওয়া (সমাবেশগৃহ) থেকে সিদ্ধান্ত এল। আরবদের বুদ্ধিমান কূটনীতিক, আমর ইবনুল আসকে আবিসিনিয়ায় পাঠানো হলো। তার অভাবনীয় বোঝানোর ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে, তিনি রাজা নাজাশির কাছে মুসলিমদের ফেরত চাইবেন। আমর নাজাশিকে আগে থেকেই ভালোকরে জানতেন। আবিসিনিয়া সম্পর্কে তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ— কার কাছে যেতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে—সবই জানতেন। তিনি রাজার মন ভোলানোর মতো মূল্যবান উপহার সামগ্রী নিলেন, এবং একজন সঙ্গী নিয়ে রওনা হলেন। শুরুতে তাদের পরিকল্পনা ছিল— দরবারের কর্মকর্তাদের সমর্থন আদায় করা উপহার দিয়ে, আর মিষ্টি কথায় মন জিতে। তাদের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল— রাজা যদি সাহাবিদের ডেকে নেন এবং সরাসরি তাদের কাছ থেকেই কথা শোনেন। তারা ভাবল— “যদি বড় কর্মকর্তারা আমরের পক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে রাজা সাহাবিদের ডাকতেই চাইবেন না, আর কাজটা সহজেই হয়ে যাবে।” এক এক করে আমর খুঁজে নিলেন যাদের তিনি চাইছিলেন, আর পন্দি আঁটতে লাগলেন। শেষপর্যন্ত তিনি যেমনটা চাইছিলেন তেমনই পেলেন। এবার সময়—রাজা’র সামনে উপস্থিত হওয়ার। নাজাশিকে সালাম ও সম্মান জানিয়ে, আমর কথা শুরু করলেন। “হে রাজা, আমরা এসেছি আপনাকে এদের ব্যাপারে সতর্ক করতে— যারা একসময় আমাদের মাঝেই ছিল এবং আমাদের সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করত। এরা এখন আপনার ধর্ম, আপনার দেশ, আর আপনার মানুষকে নষ্ট করতে চায়। এরা আমাদেরই কিছু অজ্ঞ যুবক। এরা আমাদের ধর্ম ছেড়েছে, কিন্তু আপনার ধর্মেও ঢোকেনি। বরং এরা বানিয়েছে একেবারে নতুন এক ধর্ম— যা না আপনি জানেন, না আমরা।” রাজার ধর্ম ছিল খ্রিস্টধর্ম। এটা জেনে আমর আরও বলল— “এরা মরিয়ম-তনয় ঈসা (আ.)-কে ইলাহ বলে মানে না। আর আপনার সম্মুখে এলে, এরা আপনার সামনে নত হয় না। এদের আমাদের হাতে তুলে দিন, আমরা এদের যোগ্য শাস্তি দেব।” উপহার পাওয়া কর্মকর্তারা আমরের পক্ষে কথা বলতে লাগল। কিন্তু রাজা ছিলেন প্রজ্ঞাবান, তিনি কথাগুলো অন্ধভাবে মেনে নিলেন না। তিনি মুসলিমদের নিজের দরবারে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাদের কথাও নিজ কানে শুনতে চাইলেন। এখন কী হবে?

এক পাশে দাঁড়াল আমর ইবনুল আস— ধারালো বুদ্ধি আর বাকচাতুর্য নিয়ে, আর অন্যপাশে রয়েছেন জা‘ফর ইবনে আবি তালিব (রা.)— সাহস আর সত্যনিষ্ঠা নিয়ে। দুইজন দক্ষ বক্তা মুখোমুখি হতে চলেছেন, আর সীরাতের ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তপ্ত বিতর্কগুলোর একটি শুরু হতে যাচ্ছে। অভিযোগের জবাব দেওয়ার আগে, জা‘ফর একটি অনুরোধ করলেন— কুরাইশদের দুই দূতের মধ্যে শুধু একজনই কথা বলবে। আমর রাজি হলো এবং সামনে এগিয়ে এল। তারপর জা‘ফর তিনটি প্রশ্ন করলেন— “আমরা কি দাস—যাদের ধরে নিয়ে গিয়ে মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে?” “আমরা কি অন্যায়ভাবে কারও রক্ত ঝরিয়েছি, যার জন্য আমাদেরকে ভুক্তভোগীর পরিবারের হাতে তুলে দিতে হবে?” “আমরা কি মানুষের কোনো সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়েছি, যা আমাদের ফেরত দিতে হবে?” প্রতিটি প্রশ্নেরই উত্তর ছিল—না। তখন জিজ্ঞেস করা হলো—এই ধর্মটা আসলে কী?

আর জা‘ফর বলতে থাকলেন। “হে রাজা, আমরা ছিলাম জাহিলিয়াতের মানুষ। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মৃত পশুর মাংস খেতাম। সব রকম অশ্লীলতা আর মন্দ কাজে ডুবে থাকতাম। আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, স্বজনদের হক নষ্ট করতাম। পড়শির অধিকার উপেক্ষা করতাম, তাদের প্রতি কোনো যত্ন ছিল না। আমাদের শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর জুলুম করত। এই অবস্থায় আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকেই আমাদের কাছে একজন নবী পাঠালেন। একজন মানুষ—যাঁর বংশ-মর্যাদা, সততা, আমানতদারি, লজ্জাশীলতা ও পবিত্রতা—আমরা সবাই জানতাম। তিনি আমাদের ডাকলেন আল্লাহর একত্ববাদে ঈমান আনতে, শুধু তাঁরই ইবাদত করতে, আর পাথর, কাঠ, সোনা, রূপার তৈরি মূর্তিগুলো ছেড়ে দিতে, যেগুলোকে আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষরা আল্লাহর বদলে পূজা করতাম। তিনি শিখালেন সত্য কথা বলতে, আমানত ফিরিয়ে দিতে, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতে, পড়শির সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে, আর গুনাহ ও রক্তপাত থেকে দূরে থাকতে। তিনি নিষেধ করলেন অশ্লীলতা, মিথ্যা, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ, এবং সতী নারীদের অপবাদ দেওয়া। তাই আমরা তাঁর ওপর ঈমান আনলাম এবং তাঁর বার্তা গ্রহণ করলাম। আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যা এনেছেন, আমরা তা মেনে চললাম। এরপর আমাদের লোকেরা আমাদের শত্রু হয়ে গেল এবং জুলুম করল। আমাদের দ্বীন ছাড়াতে তারা নানা উপায়ে নির্যাতন করতেই থাকলো, আল্লাহর ইবাদত থামাতে, আর মূর্তিপূজায় আবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। এই কারণেই আমরা দেশ ছেড়ে আপনার কাছে আশ্রয় নিতে এসেছি। আমরা অন্যদের বাদ দিয়ে আপনাকেই বেছে নিয়েছি, এবং আশা করি আপনার দেশে, আমরা জুলুম বা অবিচারের মুখে পড়ব না।” জাফরের কথায় সীরাহর সেই পর্যন্ত পুরো গল্পের সারমর্মই ফুটে উঠেছিল। যা ব্যাখ্যা করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগতে পারত, তিনি তা কয়েক মিনিটেই বলে দিলেন। নাজাশি এই কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দিলো, এই নতুন ঈমান সম্পর্কে কৌতূহল জাগল। তিনি খ্রিস্টান ছিলেন বলেই জানতেন—ইঞ্জিলে রয়েছে শেষ নবীর আগমন বিষয়ে অনেকগুলো আলামত। আর জা‘ফর যে নবীর কথা বললেন, সেসব আলামতের সঙ্গেই হুবহু মিলে গেছে। নাজাশি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের কাছে কি ওহি এর কিছু আছে?

যা তোমাদের নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে এনেছেন এবং তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন?” “হ্যাঁ, আছে।” “তবে আমাকে তা তিলাওয়াত করে শোনাও।” আল্লাহ—যিনি অতীত ও ভবিষ্যৎসহ সবই জানেন, তিনি নির্ধারণ করেছিলেন সুরা মারইয়াম আবিসিনিয়ায় হিজরতের ঠিক আগেই নাজিল হয়। রাজা খ্রিস্টান ছিলেন বলেই, এই সুরা ছিল এক মহা নিয়ামত। জা‘ফর সেই সুযোগটা লুপে নিলেন এবং সুরা মারইয়ামের প্রথম ৩৫ আয়াত তিলাওয়াত করলেন। রাজা ও যাজকেরা পূর্ণ মনোযোগে শুনতে লাগলেন, তারা উদ্‌গ্রীব ছিল আল্লাহর সেই বাণী শুনতে যা তাদেরই উদ্দেশে নাযিল হয়েছিলো। আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, নবী যাকারিয়া (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.)-এর কথা। বর্ণনা করা হয়েছে—কীভাবে মরিয়ম (আ.) ঈসা (আ.)-কে ধারণ করেছিলেন, কীভাবে তিনি পিতাহীন জন্ম নিলেন, শিশু অবস্থায় কথা বললেন, আর কীভাবে আল্লাহ তাঁকে নবী করে পাঠালেন। প্রতিটি শব্দের সাথে সাথে তাদের অনুভূতি আরও উথলে উঠছিল। রাজার চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরতে লাগলো, দাড়ি ভিজে যাচ্ছিলো। যাজকেরাও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে কাঁদছিলেন। এগুলোই তো সেই শব্দ, যার জন্য তাদের হৃদয় এতদিন তৃষ্ণার্ত ছিল। এত বছর তারা এগুলো ছাড়া কীভাবে বেঁচে ছিল?

কুরাইশের দূতরা পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে গেল, শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখল। মুসলিমদের সম্পর্কে রাজার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে গেল। তাঁদের প্রতি তাঁর সম্মান ও মুগ্ধতা বহুগুণে বেড়ে গেল। “নিঃসন্দেহে, এটা একই উৎস থেকে এসেছে, যে উৎস থেকে ঈসা (আ.)-কে দেওয়া হয়েছিল।” তারপর তিনি আমর ও তার সঙ্গীর দিকে ফিরে বললেন, “এখনই বেরিয়ে যাও—দুজনেই। যাও। আল্লাহর কসম, আমি কখনোই তাদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না, আর কেউ তাদের স্পর্শও করতে পারবে না।” আমর ইবনুল আস চূর্ণবিচূর্ণ এক পরাজয় স্বীকার করল। তার সব চেষ্টা শেষ হয়ে নিরাশায় ভরে গেলো তার হৃদয়। রাজার দরবার থেকে বেরিয়ে তার ভেতরটা আগুন হয়ে উঠল। সে কিছুতেই এভাবে হাল ছেড়ে দিতে চাইল না। সে ভাবল, “এখানেই শেষ নয়। অন্য কোনো পথ নিশ্চয়ই আছে।” এবার সে আরও বেশি কঠোর হয়ে গেলো। সে নতুন এক পরিকল্পনা আঁটল। পরের দিন, সে একেবারে ভিন্ন চাল দেবে, আর সে নিশ্চিত—আজকের মতো আর তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হবে না। “আল্লাহর কসম!

আগামীকাল আমি রাজার কাছে যাব, আর তাদের সম্পর্কে এমন কথা বলব, যাতে তারা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়!” এদিকে মক্কায়, অসাধারণ কিছু ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। কুরাইশরা কেঁপে উঠবে ভেতর থেকে, যখন দেখবে তাদের প্রভাবশালী নেতাদের কয়েকজন ইসলাম গ্রহণ করেছে, আর তখন মূর্তিপূজকেরা একের পর এক আঘাত খেতে থাকবে। আর আল্লাহ কবুল করবেন তাঁর রাসুল (সাঃ)–এর মহান দোয়া। মুসলিমদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের সময়, উমর এক নারী সাহাবি লায়লা (রা.)-এর মুখোমুখি হলেন। “তাহলে, তোমরা চলে যাচ্ছ?” যে উত্তর তিনি পেলেন, তা তাঁকে গভীর ভাবনায় ফেলে দিল। “জি। আমরা আল্লাহর তৈরি আরেক দেশে যাচ্ছি। তোমরা আমাদের নির্যাতন করেছ, জুলুম করেছ। আল্লাহ যতদিন পর্যন্ত আমাদের জন্য পথ খুলে না দেন, আমরা সেখানেই থাকব।” উমর চুপ করে গেলেন। মনে হলো—মুসলিমদের প্রতি তাঁর করা সবকিছু নিয়ে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করছেন। “আল্লাহ তোমাদের পথকে সহজ করুন।” পরে লায়লা এই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে বলতেন, “আমি তার মধ্যে এমন কোমলতা ও মমতা দেখেছি, যা এর আগে কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছিল, আমাদের চলে যাওয়া তাকে কষ্ট দিচ্ছিলো।” কিছুক্ষণ পরে, তার স্বামী আমির ফিরে এলে, সে তাকে সব ঘটনা বলল। “তুমি কি সত্যিই আশা করো, উমর মুসলিম হয়ে যাবে?” “জি, আমি আশা করি।” আমির ব্যঙ্গ করে জবাব দিল— “এ কথা ভালো করে জেনে রাখো। ও লোকটা কখনো মুসলিম হবে না— যতক্ষণ না তুমি খাত্তাবের গাধাকে মুসলিম হতে দেখো!” ততদিন পর্যন্ত উমরের কঠোরতা মানুষকে এমনটাই ভাবিয়েছিল। তবও আবু জাহলকে টপকে সে এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল। আর আল্লাহর জন্য, সেই হৃদয়কে ফিরিয়ে দেওয়া কখনোই কঠিন ছিল না। যেমন তিনি কুদসি হাদিসে বলেছেন “আমার বান্দা যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।” সেই পদক্ষেপ কখনোই বৃথা যাবে না। দুজনের গল্পে ছিল একটি কমন মিল। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, রাতের গভীরে, তারা গোপনে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)–এর কাছে এসে কুরআন শুনত। আবু জাহেল চাইত না লোকেরা বলুক, “দেখো, সে কুরআন শুনছে।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে, তার কৌতূহল ছিল প্রবল। সে শুনতে চাইত। এক রাতে, কাউকে না জানিয়ে, সে গোপনে নবী (আ.)-এর ঘরের কাছে গেল। সে এক কোণায় লুকিয়ে পড়ল এবং নামাজে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)–এর কুরআন তিলাওয়াত শুনতে লাগল। সে ডুবে গেল গভীর ভাবনায়, মনটা আটকে রইল। এতটাই নড়ে উঠল যে যখন বেরিয়ে এলো, তখন সূর্য উঠে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে কেবল শুনেই গেছে। ফেরার পথে তার দেখা হলো আবু সুফিয়ান ও আখনাস ইবনে শরীকের সঙ্গে, যারা ছিল কুরাইশের দুই নেতা। দেখা গেল, তারা তিনজনই—একে অপরকে না জানিয়েই ঠিক একই কারণে সেখানে এসেছিল। “চলো, আর কখনো এখানে শুনতে আসব না। কেউ যদি আমাদের দেখে ফেলে, তাহলে মানুষের মনে সন্দেহ ঢুকে যাবে।” আবু জাহেল যা শুনেছিল, তাতে সে ভীষণভাবে কেঁপে উঠল। নবী (আ.) তো সারাজীবনে এমন কেউ ছিলেন না, যিনি কবিতা বা সাহিত্যচর্চায় জড়িত ছিলেন। তিনি পড়তেও লিখতেও জানতেন না। তাহলে এমন শক্তিশালী, সুন্দর শব্দ একজন এমন মানুষের মুখ থেকে কীভাবে বেরোয়?

এমনকি তাঁর সাধারণ কথাবার্তাও এই স্তরের ধারেকাছেও ছিল না। কিছুই মিলছিল না। আবু জাহেলের মনে সন্দেহ জাগল। সে নিজেকে থামাতে পারল না—আবার যেতে মন চাইলো। সেই রাতও কাটল আগের রাতের মতোই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে সে শুনল নবী (আ.)–এর কুরআন তিলাওয়াত। ভোরের আলো ফুটতেই সে লুকোনো জায়গা থেকে বেরোল, আর বাড়ি ফেরার পথে আবার দেখা হলো সেই একই দুজনের সঙ্গে। তারাও এসেছিল একই কারণেই। গতবারের মতোই তারাও তাই করেছিলো, তারা একে অন্যকে সাবধান করল এবং আলাদা পথে চলে গেল। কিন্তু আবু জাহেলের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। পরের রাতেও, আবারও সে নিজেকে সামলাতে পারল না—একই কাজ করল। আর আবারও, সব শেষ হলে, সে সেই একই দুজনের মুখোমুখি হলো। তাদের ভেতরেও চলছিল আবু জাহেলের মতোই একই টানাপোড়েন। তাই তারা একই কাজ বার বার করছিল। আর ভবিষ্যতে, তাদের দুজনই শেষ পর্যন্ত মুসলিম হবে। ভয় ছিল—কেউ যদি তাদের দেখে ফেলে, মানুষের হৃদয় ইসলামমুখী হয়ে যেতে পারে, তাই তারা একে অন্যের কাছে কসম করল— আর কখনোই যাবে না। এই তিন রাতের মধ্যে, সে দেখল আল্লাহর নাজিলকৃত মহান বাণী আর গভীর অর্থ। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা—নিজ চোখে দেখল, যাকে সে মিথ্যাবাদী বলত, সেই মানুষটা সারারাত নামাজে দাঁড়িয়ে ভোর পর্যন্ত ইবাদত করছেন। মা‘আযাল্লাহ (আল্লাহ না করুন), যদি তাঁর দাবি মিথ্যা হতো, তবে তিনি এটা কেন করতেন?

এর লাভই বা কী ছিল তাঁর? তবুও, সে ছাড়ল না তার গোত্রীয় অহংকার, তার ঘৃণা আর হিংসা। তার একটাই চিন্তা ছিল— মানুষ যেন সন্দেহ ছাড়াই মূর্তিই পূজা করে যায়। আর এভাবেই, তার হাতের সামনে আসা ঈমানের সুযোগটা সে নিজেই ছুঁড়ে ফেলে দিল। তাহলে উমরের অভিজ্ঞতা কী ছিল? আবু জাহেলের মতো তার এমন কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। এক রাতে, কা‘বার কাছে, তিনি নামাজরত অবস্থায় আল্লাহর রাসুল (সাঃ)–কে দেখে ফেললেন। তিনি চুপিচুপি কাছে এসে মনে মনে বললেন, “আল্লাহর কসম!

যা-ই হোক, আজ রাতে আমি দাঁড়িয়ে শুনব মুহাম্মদ কী তিলাওয়াত করছেন।” রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তিলাওয়াত করছিলেন সুরা হাক্কাহ (বাস্তব সত্য)। উমর শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে গেলেন শব্দের অনর্গল প্রতিধ্বনিতে আর অর্থের গভীরতায়। তবে তিনি এত সহজে বিশ্বাসও করতে চাইছেন না। কুরআন শুনতে শুনতে তিনি মনে মনে বললেন, “হয়তো লোকটা সত্যিই কবি— যেমনটা কুরাইশরা বলে।” ঠিক সেই মুহূর্তেই, নবী (আ.) পৌঁছে গেলেন ৪১ নম্বর আয়াতে। “এটি কবির বক্তব্য নয়; তোমাদের বিশ্বাস খুবই সামান্য।” উমর যেন জমে গেলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, “সে তো জানে আমি কী ভাবছিলাম!

তাহলে কি সে গণক?” কিন্তু পরের আয়াতই এসে গেল। “এটা কোনো গণকের কথাও নয় তোমরা কতই না দুর্বল চিন্তা করো!” উমর সম্পূর্ণ হতভম্ব—কী হচ্ছে, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আর সুরা তিলাওয়াত চলতেই থাকলো। “এ তো অবতীর্ণ— সৃষ্টিজগতের রবের পক্ষ থেকে।” এভাবেই তিনি শুনতে থাকলেন, সুরা শেষ হওয়া পর্যন্ত। ঘটনাটা তাঁকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিল। আর এভাবেই তাঁর হৃদয়ে ঈমানের বীজ বপন হয়ে গেলো। কিন্তু সেই বীজটিকে বেড়ে উঠতে কী সাহায্য করবে?

মক্কা জুড়ে যে খবরটা ঝড় তুলবে— এক মহান ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ: আল্লাহর রাসুল (সাঃ)–এর চাচা হামজা (রা.)। তবে সেখানে যাওয়ার আগে, চলুন আবার আবিসিনিয়ায় ফিরে যাই এবং যেখানে থেমেছিলাম সেখান থেকেই শুরু করি। জা‘ফর ইবনে আবি তালিব (রা.), আমর ইবনুল আস, এবং নাজাশি আশামা। দ্বিতীয় দিনে, এই তিনজনের মধ্যে আরেকটি কথোপকথন হতে যাচ্ছিল। এইবার আমরের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। রাজা যে খ্রিস্টান—এটা জেনে, আর ইসলাম খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে কী বলে সেটাও মাথায় রেখেই, সে ঠিক করল সেই দিকটা ধরেই রাজার কাছে যাবে। সে দরবারে ঢুকে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “হে রাজা, এরা মরিয়ম-তনয় ঈসা (আ.) সম্পর্কে কঠিন কথা বলে। আপনি চাইলে তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করুন— তারা তাঁকে নিয়ে কী বলে।” কিন্তু গতকালের ঘটনার পর, রাজা আরও সতর্ক হয়ে গিয়েছিলেন— কোনো প্ররোচনায় পড়বেন না। তিনি কাউকে তাঁকে বিভ্রান্ত করতে দেবেন না। তাই জা‘ফর ও অন্য সাহাবিদের আবারও ডেকে পাঠানো হলো। কিন্তু আমর কী ভরসায় আবার রাজার সামনে হাজির হয়ে এই বিষয়টা তুললো?

মুসলিমরা কি সত্যিই এমন কিছু বিশ্বাস করে যা রাজাকে রাগিয়ে দেবে? তারা কি, মা‘আযাল্লাহ (আল্লাহ না করুন), ঈসা (আ.)–কে পথভ্রষ্ট বলে? কখনোই না। তিনি তো আল্লাহর নবী— যাঁকে আল্লাহ কিতাব দিয়েছিলেন। বরং লক্ষাধিক নবীর মধ্যে, তিনি ছিলেন পাঁচ শ্রেষ্ঠ—উলুল আযম নবীদের একজন। তাহলে কি মুসলিমরা তাঁর মাতা মরিয়ম (আ.)-কে সেই যুগের ইহুদিদের মতো অপবাদ দিত? তারা কি বলত, মা‘আযাল্লাহ (আল্লাহ না করুন), ঈসা (আ.) ব্যভিচারের ফল? কখনোই না। মরিয়ম (আ.) ছিলেন পবিত্র ও সতী, আল্লাহর বিশেষভাবে নির্বাচিত এক বান্দী। আর ঈসা (আ.) জন্মেছিলেন এক মু‘জিজা হিসেবে পিতা ছাড়া। তাহলে পার্থক্যটা ছিল কোথায়?

ইসলাম একেবারে স্পষ্ট করে দিল— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই)। একবার নিজেকে সেখানেই কল্পনা করুন। একজন রাজার সামনে দাঁড়িয়ে বলা— এটা এতোটাও সহজ নয়, যাকে তিনি ইলাহ মনে করেন—অর্থাৎ ঈসা (আ.)—তিনি ইলাহ নন। এমন কথা বলার পরিণাম কী হবে—তা অনিশ্চিত, এমনকি বিপজ্জনকও হতে পারে। তাহলে দরবারে ঢোকার আগে সাহাবিরা নিজেদের মধ্যে কী সিদ্ধান্ত নিলেন? “আল্লাহর কসম! আমরা শুধু তাই বলব— ঈসা (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ যা বলেছেন, আর আমাদের নবী (সাঃ) যা শেখিয়েছেন। পরিণাম যা-ই হোক না কেন।” অবশেষে, জা‘ফর কথা বললেন এবং রাজার সামনে ব্যাখ্যা করলেন— ঈসা (আ.) ও মরিয়ম (আ.) সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা, যেমন করে ওহি নাজিল হয়েছে ঠিক তেমন ভাবেই। তাহলে রাজা কী প্রতিক্রিয়া দেখালেন?

আমর আশায় বসে ছিল। এবার মনে হচ্ছিল, কাজটা বুঝি হয়ে যাবে। রাজা মাটি থেকে একটি লাঠি তুলে বললেন— “আল্লাহর কসম, মরিয়ম-তনয় ঈসা (আ.) ঠিক তেমনই, যেমনটা তোমরা বলেছ। সামান্যতমও কোনো পার্থক্য নেই। এই লাঠিটুকুর সমানও না!” আবারও আমরের দুনিয়া ভেঙে পড়ল। “আস্তে কথা বলো, সে আমাদের দেখছে।” দরবারের কিছু লোক ফিসফিস করে আপত্তি তুলল। তাদের ভালো লাগল না এই কথা। কিন্তু রাজা তাদের দিকে ফিরে বললেন, “আল্লাহর কসম, তোমরা ফিসফিস করলেও, এটাই সত্য।” তারপর তিনি সাহাবিদের দিকে ফিরে বললেন, “যাও। আমার দেশে তোমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। আমাকে যদি সোনার পাহাড়ও দেওয়া হয়, তবু আমি তোমাদের একজনেরও কোন ক্ষতি করব না।” এত বড় ব্যর্থতার পর মক্কায় কীভাবে ফিরবে— আমর এমনিতেই চিন্তায় ছিল, তার ওপর এখন তাকে রাজার রাগও সহ্য করতে হলো। নাজাশি আদেশ দিলেন, “ওরা যে উপহার এনেছে, এই দুই লোককে তা ফিরিয়ে দাও। আমার এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহর কসম, আল্লাহ যখন আমাকে সিংহাসন দিলেন, তিনি আমার কাছ থেকে কোনো ঘুষ নেননি, তাহলে আমি কেন এ ব্যাপারে ঘুষ নেব?” যদিও তাঁর অধিকাংশ প্রজা ইসলাম গ্রহণ করেনি, তবু নাজাশি নিজে ছিলেন এক খাঁটি মুসলিম— আর এভাবেই একদিন তাঁর ইন্তেকাল হয়। বছর কয়েক পর, সাহাবিদের মাঝে বসে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) হঠাৎ বললেন, “তোমাদের ভাই নাজাশি ইন্তেকাল করেছেন। তাই দাঁড়াও, তার জন্য জানাজার নামাজ পড়ো।” তারপর, শত শত মাইল দূর থেকে, তিনি নাজাশির জানাজার নামাজ পড়ালেন। আর যখন এক সপ্তাহ পরে তাঁর মৃত্যুসংবাদ মদিনায় পৌঁছাল, তারা জানতে পারল—তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন ঠিক সেদিনই যেদিন তারা জানাজা নামাজ আদায় করেছিলেন। আপনি ভাবতে পারেন, “কিন্তু সেটা তো ছিল এক ভিন্ন দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি। এত দূরের দেশে কারও জন্য ইসলামে মানিয়ে নেওয়া কি খুব কঠিন নয়?” না। কারণ সব মানুষই সৃষ্টি হয়েছে একই ফিতরাতে। আর স্রষ্টা-প্রেরিত দ্বীন কখনো বলেনি— “তোমার সংস্কৃতি, তোমার জাতি, বা তোমার পরিচয় বদলে ফেলো।” ইসলাম যেহেতু সমগ্র মানবতার জন্য পাঠানো হয়েছে, তাই এই দ্বীন মানতে গিয়ে রাজার কোনো অসুবিধা হয়নি। আগে তাঁর নাম কী ছিল?

আশামা। আর মুসলিম হওয়ার পর?

তবুও আশামা। পোশাক একই, পরিচয় একই— আর হালাল-হারামের কথা মনে রেখে তিনি অবশ্যই তাঁর রীতিনীতি ছাড়েননি। বরং নাজাশি হয়ে উঠলেন অমুসলিম দেশে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্য এক দৃষ্টান্ত। যারা মনে করে তার প্রতিটি কথা আমার জীবন পুরো বদলে যাবে” তাদের সামনে তিনি শত শত বছর আগেই তা প্রমাণ করে গেছেন। নাজাশির ভাষণের প্রতিটি শব্দই সাহাবিদের মনে একের পর এক আরও বেশি স্বস্তি এনে দিচ্ছিল। একজন রাজার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)–কে সত্যায়ন করা এ ছিল সত্যিই বিস্ময়কর খবর। কিন্তু কুরাইশের জন্য, এটা ছিল এক বিপর্যয়। আরও ভালো হতো যদি তারা কাউকে একেবারেই নাই পাঠাত। তারা জানত না তাদের ষড়যন্ত্রের আড়ালেও আল্লাহরও একটি পরিকল্পনা ছিল। আর এটা তো ছিল কেবল শুরু। খুব শিগগিরই, তারা দুটি বড় আঘাতে বিদ্ধ হবে। হামজা (রা.) ছিলেন আল্লাহর রাসুল (সাঃ)–এর প্রায় সমবয়সী। অসাধারণ দেহের অধিকারী সাহসী এক মানুষ, শক্তিশালী, সম্মানিত, এবং মক্কার লোকদের কাছে আতঙ্কেরও বটে। তিনি শিকার ভালোবাসতেন, তাই মাঝে মাঝে শহরের বাইরে থাকতেন। সেদিনও তিনি ধনুক হাতে শিকার থেকে ফিরছিলেন। সাফা পাহাড় থেকে কা‘বার দিকে নামতে নামতে, তিনি দেখলেন এক নারী তাঁর দিকে দৌড়ে আসছে। “হে আবু উমায়রা!

আপনি যদি দেখতেন—আপনার ভাতিজা মুহাম্মদ (সাঃ) কী অপমান সহ্য করেছেন, আবুল-হাকাম ইবনে হিশাম (আবু জাহেল) তার সাথে কী করেছে!

সে এখানে বসে থাকা অবস্থায় তাঁর কাছে এসে, গালি দিচ্ছে, অপমান করছে, এবং আরও অনেক কঠিন কঠিন কথা বলছে যা তিনি সহ্য করছেন। আর তারপর চলে গেল, আর মুহাম্মদ তাকে একটা কথাও বললেন না।” সে সময় হামজা (রা.) তখনও মুসলিম হননি, কিন্তু তিনি বরাবরই ভাতিজার খুব কাছের ছিলেন। এ কথা শুনে তাঁর ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। তিনি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রওনা হলেন। তার মনে তখন একটাই চিন্তা ঘুরছিল: আবু জাহেলকে খুঁজে বের করে তার কাজের প্রতিশোধ নিতে হবে। এটাই শুধু তাঁর আগুন শান্ত করতে পারত। কা‘বার কাছে পৌঁছে, যাকে খুঁজছিলেন তাকে তিনি পেয়ে গেলেন। “হামজা— ও এত রেগে আছে কেন?” এক মুহূর্তও দেরি না করে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন সামনে। তারপর একটি কথাও না বলে, ধনুক দিয়ে আবু জাহেলের মাথায় আঘাত করলেন— ভীষণ জোরে কষিয়ে এক আঘাত!

আঘাতটা এত প্রবল ছিল যে মাথা ফেটে গেল, রক্তে ভেসে গেল, আর সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। “তুইই কি তাকে অপমান করেছিস? শুনে রাখ! তারা জানে যে, আমিও তারই ধর্মের অনুসারী! সে যা বলে আমিও তাই বলি। আমার ভাতিজার সাথে যা করেছ, সাহস থাকলে আমার সাথেও করে দেখ!” মক্কা স্তব্ধ হয়ে গেল। হামজা (রা.)-ও মুসলিম হয়ে গেল? আবু জাহেল মরিয়া হয়ে নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করল। “কিন্তু সে তো আমাদের বোকা বলেছে!

সে আমাদের মূর্তিগুলোকে অপমান করেছে, আর পূর্বপুরুষদের পথ ছেড়ে দিয়েছে!” হামজা (রা.) তার একটি কথাও সহ্য করলেন না। তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, “তোর চেয়ে বড় বোকা কে আছে?” আর ঠিক সেখানেই, তিনি শাহাদাহ পাঠ করলেন। “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি—মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসুল।” আবু জাহেলের গোত্র বনু মাখযুম জড়ো হলো— হামজার ওপর চড়াও হতে। কিন্তু আবু জাহেলই তাদের থামাল। সে নিজের কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়েছিল। “আবু উমারাকে ছেড়ে দাও!

আমি তার ভাতিজাকে বহুবার অপমান করেছি।” সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে হামজা (রা.) নিজেও ঠিকমতো বুঝতে পারলেন না তিনি কী করে ফেলেছেন। তিনি অস্থির মনে, বিভ্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরে গেলেন। শয়তানের কাছে হামজার ইসলাম গ্রহণ ছিল বড় এক বিপদ। তাই সে তাঁর মনের ভেতর, কানে কানে ফিসফিস করতে লাগল— “কুরাইশদের মধ্যে তুমিই ছিলে সম্মানিত মানুষ, আর এখন তুমি অনুসরণ করলে এই লোকটাকে— যে তোমার পূর্বপুরুষদের দ্বীন ছেড়ে দিয়েছে? তুমি তাদের পথ ছেড়ে দিলে? যা করেছো, তার চেয়ে তো মরেই যাওয়া ভালো!” এই ফিসফাসগুলো তাঁকে ভোর পর্যন্ত ঘুমাতে দিলোনা। তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না—সঠিক পথ কোনটা। তিনি ঠিক কাজ করেছেন, নাকি ভুল?

তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। তিনি অসহায় বোধ করলেন— চিন্তার ওপর চিন্তা জমে যাচ্ছিল। এটা ছিল ভীষণ ক্লান্তিকর। শেষমেশ তাঁর মনে এলো এক সমাধান। সেই মুহূর্তে এটাই ছিল তার পক্ষে সবচেয়ে ভালো কাজ। গভীর আন্তরিকতায়, নিজ অসহায়তা পুরো বুঝে, তিনি দুই হাত তুলে দোয়া করলেন— “হে আল্লাহ, আমি যে পথ ধরেছি— যদি এটাই সত্যিকারের সঠিক পথ হয়, তবে আমার হৃদয়কে তাতে দৃঢ় করে দিন। এই বিষয়ে আমাকে পথ দেখান।” তিনি নিজেকে সঁপে দিলেন— পুরো মন থেকে মেনে নিলেন, সত্য কোনটা—তা সর্বদা শুধু আল্লাহই জানেন। তিনি সেই সত্তার কাছে চাইলেন— যাঁর হাতে সব কিছুর চাবি— তাঁকে সরল পথে পরিচালিত করতে। সেই রাত কাটল গভীর আত্মসমীক্ষায়। নিজ সত্তার সঙ্গে এমন লড়াই তিনি আগে কখনো করেননি। পরদিন তিনি গেলেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)–এর কাছে এবং যা যা তিনি পার করেছেন, সব খুলে বললেন। যে জবাব পেলেন, নবী (আ.)–এর মুখ থেকে যে কথা শুনলেন— সেগুলোই ছিল ঠিক তা-ই যা তাঁর আত্মা খুঁজে ফিরছিল। আর এরপর থেকে, তিনি আর সাধারণ জীবনযাপনকারী হামজা থাকবেন না— তিনি হবেন আসাদুল্লাহ—আল্লাহর সিংহ। কুরাইশদের প্রতিক্রিয়াটা একবার ভাবুন। এক পাশে আবিসিনিয়ায় তাদের পরাজয়, আরেক পাশে হামজা (রা.)–এর ইসলাম গ্রহণ। একটার পর একটা আঘাত পড়ছিল তাদের ওপর। পাল্লা বদলাতে শুরু করল। তাই আবারও তারা জড়ো হলো দারুন নাদওয়ায় (সমাবেশগৃহে)। “চোখের সামনে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তোমরা অস্বীকার করতে পারবে না।” নির্যাতন, চাপ, আর নিষেধাজ্ঞা চলতেই থাকল। তবু এত জুলুমের মাঝেও, কিছুই বদলাচ্ছিল না। প্রতিটি পরিবারে, সমাজের প্রতিটি স্তরে, মানুষ মুসলিমদের দলে যোগ দিচ্ছিল। আর সংখ্যা বাড়ছিল লাগাতার। ইসলাম ছড়িয়ে পড়া থামাতে কুরাইশরা মরিয়া হয়ে উঠল। একটা ভাবনা তাদের মাথায় অনেকদিন ধরেই ছিল, কিন্তু ভয় ছিল বলেই তারা কাজে নামাতে সাহস পায়নি। “আমাদের আর কোনো পথ নেই। এটাই করতে হবে।” “মানে কী?

বলতে চাচ্ছ” “সে বলতে চাইছে আমাদের তাকে হত্যা করতে হবে।” এর ফল ভয়াবহ হতে পারত, কারণ নবী (আ.)–এর পরিবার, বনু হাশিমগোত্র রক্ত-প্রতিশোধে নেমে পড়ত। তারা মুসলিম হোক বা না হোক, গোত্রীয় রীতির সঙ্গে তারা ছিল গভীরভাবে বাঁধা। আর একবার রক্ত ঝরলে, তা সহজে থামত না। হত্যা অসম্ভব ছিল না, কিন্তু এর জন্য দরকার চরম সাহস। ঠিক সেই মুহূর্তে, যে দুজনের জন্য আল্লাহর রাসুল (সাঃ) দোয়া করেছিলেন, তাদের একজন সামনে এসে পড়লেন। কেউ কেউ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভিড়কে উসকাচ্ছিল, আর তাদের একজন ছিল আবু জাহেল। কিন্তু সবই বৃথাচেষ্টা। কেউ সামনে এগোনোর সাহস পেল না। কেউই না—শুধু একজন ছাড়া। সে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “আমি করব!” হঠাৎ পুরো সভা স্তব্ধ হয়ে গেল, আর সবার চোখ গিয়ে পড়ল তার দিকে। কণ্ঠটা ছিল এক লম্বা, প্রশস্ত কাঁধের, নির্ভীক মানুষের— উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। যদিও কুরআন তাকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছিল এবং তার হৃদয় নরম হতে শুরু করেছিল, কিন্তু যখনই সে মূর্তিপূজকদের সঙ্গে থাকত, তার হৃদয় আবার কঠিন হয়ে যেত। তার মনে হলো—বিষয়টা অনেক দূর গড়িয়েছে। সবাই তাকে উৎসাহ দিতে লাগল। “হ্যাঁ, এটা শুধু তুমিই পারবে।” কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর কী হতে যাচ্ছে— তার কোনোটাই তারা জানত না। সে তড়িঘড়ি করে তরবারি তুলে নিল। সে শুনেছিল—আল্লাহর রাসুল (সাঃ) সাফা পাহাড়ের কাছে একটা ঘরে আছেন। তাই সে সেদিকেই রওনা হলো। তার হাঁটার ভঙ্গি দেখলেই মানুষের গায়ে কাঁটা দিত। এই রাগী পদযাত্রা থামাল তার আত্মীয় নু‘আইম ইবনে আব্দুল্লাহ। তিনি-ও ছিলেন মুসলিম। “হে উমর, কোথায় যাচ্ছ?” “আমি মুহাম্মদকে হত্যা করতে যাচ্ছি, যে তার দ্বীন ছেড়ে দিয়েছে আর কুরাইশদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে!” সে মুহূর্তে, তার রাগকে হয় সময় দিয়ে ঠান্ডা হতে হতো, না হয় অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে হতো। আর নু‘আইম বেছে নিলেন দ্বিতীয় পথটাই। “হে উমর, আল্লাহর কসম, তুমি নিজেকেই ধোঁকা দিচ্ছ। তুমি কি মনে করো, আবদে মানাফের ছেলেরা তাকে মেরে ফেললে তোমাকে বাঁচতে দেবে?

তার আগে তোমার নিজের পরিবারের দিকে দেখো।” “কার কথা বলছ?” “তোমার দুলাভাই আর চাচাতো ভাই, সাঈদ ইবনে যায়েদ, আর তার স্ত্রী— তোমার বোন ফাতিমা—মুসলিম হয়ে গেছে। তারা মুহাম্মদের দ্বীনের অনুসারী হয়ে গেছে। আগে গিয়ে তাদের সাথে হিসাব চুকাও।” উমর বিশ্বাসই করতে চাইলো না। তাই সে চলতেই থাকল। কিন্তু সন্দেহের একটা বীজ তার হৃদয়ে আগেই জন্মেছিলো। পথের মাঝখানে, সে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল— আর আরও জ্বলন্ত রাগ নিয়ে, সে ছুটল তার বোনের ঘরের দিকে। ভেতরে খাব্বাব ইবনে আরাত (রা.) সুরা ত্ব-হা তিলাওয়াত করছিলেন। হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে আঘাত পড়ল। এটা ছিল উমর। ভয়ে খাব্বাব তৎক্ষণাৎ লুকিয়ে পড়লেন, আর ফাতিমা দ্রুত লুকাতে চাইলেন তার হাতে থাকা কুরআনের পাতাগুলো। “তোমরা কী তিলাওয়াত করছিলে?

আমরা তো শুধু নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম।” কিন্তু উমরের রাগ কমল না। সে সোজা গিয়ে পড়ল তার বোনজামাই সাঈদ ইবনে যায়দের ওপর, আর মারতে শুরু করল। সে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “তাহলে যা শুনেছি তা সত্যি! তোমরা মুহাম্মদ এর দ্বীনে ঢুকে পড়েছ, তাই তো?” সেই মুহূর্তে ফাতিমা এগিয়ে এলেন, তাকে শান্ত করতে চাইলেন। কিন্তু উমর তাকে সজোরে আঘাত করল। একেবারে শেষসীমায় পৌঁছে গেলো। ফাতিমা আর লুকালেন না। তিনি বললেন, “যা ইচ্ছা করো, হে উমর!

আমি আর আমার স্বামী এখন মুসলিম হয়ে গেছি। আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর ঈমান এনেছি!” আর সাহস করে শাহাদাহ উচ্চারণ করলেন। আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ। উমর যেন থমকে গেল। সে দেখল—নিজ পরিবারের লোকেরা ঈমানের জন্য সব কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত। বোনের মুখে রক্ত ঝরতে দেখে তার মমতা জেগে উঠল। সে নিজেকেই প্রশ্ন করতে লাগল। সে কী হয়ে গেছে? সে কি সত্যিই বোনকে মারছে শুধু এই জন্য যে সে বলেছে—“আমার রব আল্লাহ”?

সে বসে পড়ল, গভীর ভাবনায় ডুবে গেলো। “তোমরা যা পড়ছিলে, সেটা আমাকে দাও। দেখি তো—মুহাম্মদের কাছে কী নাজিল হয়েছে।” উমর কুরআন অবমাননা করবে—এই ভয়ে তার বোন ফাতিমা শঙ্কিত হলেন। কিন্তু একই সাথে, তার অবস্থা যেন একেবারেই বদলে গেছে। তাহলে কি তার হৃদয় ইসলামের দিকে গলতে শুরু করেছে?

ফাতিমা মন থেকে সেই কামনাই করলেন— যে ব্যথা শুধু সেই-ই বোঝে, যার নিজের ভাই এখনও মুসলিম হয়নি। তারপর সে আয়াতগুলো পড়তে শুরু করল। ত্বা-হা। মা-আ আনযালনা আলাইকাল কুর-আনা লিতাশ্‌কা। ইল্লা তাযকিরাতাল লিমান ইয়াখ্‌শা। “ত্বা-হা। হে নবী, আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি আপনার উপর কুরআন নাজিল করিনি, বরং যারা আল্লাহকে ভয় করে— তাদের জন্য উপদেশ হিসেবে।” সুরা ত্ব-হার প্রথম আয়াতগুলো পড়ে, উমর গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। বছরের পর বছর বুকে জমে থাকা রাগ আর ঘৃণা গলে যেতে লাগল, আর সেখানে জায়গা নিল বিস্ময় ও মুগ্ধতা। “কী সুন্দর, কী মহৎ, কী গম্ভীর এই বাণী!

এর চেয়ে মধুর, এর চেয়ে সুন্দর কথা আর হতে পারে না।” হৃদয়ে বপন হওয়া ঈমানের বীজ অবশেষে ফুটতে শুরু করল। এখন তার একটাই আকাঙ্ক্ষা— নবী (আ.)–এর সামনে দাঁড়িয়ে নিজ ঈমান ঘোষণা করা। তার কথা শুনে, খাব্বাব লুকোনো জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “সুসংবাদ, হে উমর!

আমি আশা করি—আল্লাহর রাসুল (সাঃ)–এর দোয়া তোমার মাধ্যমেই কবুল হবে। গত রাতেই তিনি দোয়া করেছেন— ‘হে আল্লাহ, ইসলামকে শক্তিশালী করুন আবু জাহেল অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের মাধ্যমে।’” এক পাশে ছিল আবু জাহেল যে হত্যা করার দাবি তুলেছিল। আর অন্য পাশে ছিল উমর যে সেই কাজ করতে বের হয়েছিল। কিন্তু যে পথে সে নবী (সাঃ)–কে হত্যা করতে বেরিয়েছিল, সেই পথেই সে হয়ে গেল ঈমানে জাগ্রত হওয়া একজন। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) যে দোয়া করেছিলেন মাত্র এক রাত আগেই, তার জবাব এসে গেল পরদিন সকালে। কীভাবেই বা আসবে না?

উনার মাধ্যমে, আর তিনি যে বার্তা এনেছেন তার মাধ্যমে এই মহাবিশ্ব যে অর্থ খুঁজে পেয়েছে। চৌদ্দশো বছরেরও বেশি সময় ধরে, তাঁর হেদায়াতের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মুসলিম পেয়েছে চিরকালের জান্নাতের চাবি। তিনি তাঁর অনুসারীদের দেখিয়েছেন— কীভাবে জিততে হয় এই দুনিয়া এবং মৃত্যুর পরের চিরস্থায়ী জীবনও। এই পৃথিবী নামের মসজিদে, তিনি এর প্রতিটি প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মুমিনকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আর সময়ের গণ্ডি ছাপিয়ে প্রতিধ্বনিত কণ্ঠে, তিনি তাঁর রবের ইবাদত করেছেন এবং তাঁর ওপর অর্পিত সব দায়িত্ব পূর্ণ করেছেন। আল্লাহর কাছে এত প্রিয় এক বান্দা, মুসলিমদের শক্তি চেয়ে দোয়া করবেন— আর আল্লাহ কি তার উত্তর না দিয়ে পারেন?

উমর তাঁর হৃদয়কে পুরোপুরি হেদায়াতের দিকে ফিরিয়ে দিলেন। আর এভাবেই আল্লাহ কবুল করলেন তাঁর প্রিয় রাসুল (সাঃ)–এর দোয়া। যে উমর ইবনুল খাত্তাব ছিল সেই মুহূর্ত পর্যন্ত ইসলামের শত্রু হিসেবে পরিচিত— পাথর-হৃদয়, মুসলিমদের নির্যাতনকারী— এখন সে বদলে যাচ্ছিল উমর (রা.) তে। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কোথায় আছেন—জেনে, সে উদগ্রীব হয়ে রওনা হলো দারুল আরকামের দিকে (আরকামের ঘর)। সাহাবিরা যখন দরজায় তরবারি হাতে উমরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল, তারা আঁতকে উঠল। কিন্তু হামজা (রা.)–এর স্থিরতা পরিস্থিতি সামলে নিল। তিনি বললেন, “ওকে ভেতরে ঢুকতে দাও। ভালো উদ্দেশ্যে এলে ভালোভাবেই তাকে স্বাগত জানাব। আর খারাপ উদ্দেশ্যে এলে, তবে তার নিজের তরবারি দিয়েই তার হিসাব করে দেব।” দরজা খুলে দেওয়া হলো, আর উমর ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। দারুন নাদওয়া (সমাবেশগৃহ) থেকে বেরোনোর সময় তার মুখে যে রাগ ছিল, তা আর নেই—এখন তার জায়গায় আছে কেবল সম্ভাবনা। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) উঠোনে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তাকে কাছে টেনে বললেন, “হে খাত্তাবের ছেলে, কী উদ্দেশ্যে এসেছ?

আল্লাহর কসম, আমি মনে করি না— আল্লাহ তোমার ওপর কোনো বিপদ না পাঠানো পর্যন্ত তুমি থামবে।” “আমি এসেছি আল্লাহ, তাঁর রাসুল (সাঃ), এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যা এনেছেন—তাতে ঈমান আনতে।” আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ। সাহাবিরা আনন্দে ভেঙে পড়লেন। এটা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় দিনগুলোর একটি। “আল্লাহু আকবার!

আল্লাহু আকবার!” ধ্বনি মক্কার রাস্তায় রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হলো। হামজা (রা.) আর এরপর এবার উমর ইসলাম গ্রহণ করায়, দারুল আরকামে আর লুকিয়ে থাকার প্রয়োজন রইল না। উমর এখন আল্লাহর দেওয়া সাহসকে ইসলামের জন্যই ব্যয় করবেন। আর ঠিক সেখানেই, সেই মুহূর্তে, তিনি দিলেন নিজের প্রথম প্রস্তাব। “হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ), আমরা কি সত্য দ্বীনের ওপর নই— বেঁচে থাকি কিংবা মারা যাই?” নবী (সাঃ) বললেন, “হ্যাঁ, সেই সত্তার কসম—যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা জীবিত থাকো বা মারা যাও, তোমরা সত্য দ্বীনের ওপরই আছ।” “তাহলে আমরা এখনও লুকিয়ে কেন?

আল্লাহর কসম, যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন— আমি সাহস করে, নির্ভয়ে, একটুও দ্বিধা না করে, মূর্তিপূজকদের প্রতিটি সমাবেশে গিয়ে তাদের সামনে ইসলাম ঘোষণা করব।” সেদিন, চল্লিশজন মুসলিম বেরিয়ে এলেন দারুল আরকাম (আরকামের ঘর) থেকে। সামনে ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সাঃ)—ডানে উমর, বামে হামজা (রা.)। “আল্লাহু আকবার!

আল্লাহু আকবার!” ধ্বনি তুলে তারা এগোতে লাগলেন। এটা ছিল ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি, আর মুসলিমদের প্রথম প্রকাশ্য মিছিল। সেদিন, কুরাইশদেরকে দেওয়া হলো এক কঠিন সতর্কবার্তা। তারা কিছুই করতে পারল না— শুধু স্তম্ভিত নীরবতায় তাকিয়ে রইল। এই চল্লিশ মুমিন দেখিয়ে দিলেন আগামী শতাব্দীগুলোকে— ঐক্যবদ্ধ হলে মুসলিমরা কতটা শক্তিশালী হতে পারে। কিন্তু উমরের হৃদয়ের উত্তেজনা এখনও থামেনি। তিনি চাইলেন—সবাই জানুক তাঁর ঈমানের কথা। তাই তিনি গেলেন জামীল ইবনে মা‘মারের কাছে। কারণ লোকটা একবার কিছু শুনলে, মক্কা জুড়ে ছড়িয়ে দিতে তার সময় লাগত না। “হে জামীল, আমি মুসলিম হয়ে গেছি।” সাথে সাথেই জামীল লাফিয়ে উঠল আর চারদিকে খবর ছড়াতে লাগল। “উমর আমাদের দ্বীন ছেড়ে দিয়েছে!

উমর আমাদের দ্বীন ছেড়ে দিয়েছে!” কিন্তু উমর এখানেই থামলেন না। তিনি সোজা গেলেন আবু জাহেলের বাড়িতে। আর কিছুই না জেনে, আবু জাহেল তাকে উষ্ণভাবে স্বাগত জানাল। “হে আমর! আমি মুসলিম হয়ে গেছি।” “না… না… এটা—এটা হতে পারে না!” সে কল্পনাও করতে পারেনি—উমর, যে নবী (সাঃ)–কে হত্যা করতে বের হয়েছিল, সে-ই ইসলাম গ্রহণ করবে! “আল্লাহ তোকে অভিশাপ দিন আর তোর আনা খবরকেও!” এরপর, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) উমরকে উপাধি দিলেন “আল-ফারূক”— যে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করে। কী বিস্ময়কর!

ইসলামের এক ঘণ্টা আগে উমরকে দেখুন, আর এক ঘণ্টা পরের উমরকে দেখুন। একই উমর—যে ছিল ইসলামের শত্রুদের একজন, যে করছিল সবচেয়ে বড় গুনাহ—আল্লাহর সাথে শরিক করা, সে এখন হয়ে যাচ্ছে উমর— নবী (সাঃ)–এর সাহাবি, যিনি পরে হবেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, নিজ ইনসাফের জন্য বিখ্যাত। কারও অতীত যেমনই হোক, সে যদি আন্তরিকভাবে তার রবের দিকে ফিরে আসে, আল্লাহ তার হৃদয় বদলে দিতে পারেন কল্পনারও বাইরে। আল্লাহর রাসুল (সাঃ)–এর আত্মায় ছিল এমন এক নূর— যে কেউ তাঁকে দেখে ঈমান আনলে, যে কেউ তাঁর সান্নিধ্যে বসলে, তার ভেতরটা বদলে যেত— কয়লা থেকে হীরা হয়ে। যারা একসময় অপরাধবোধ ছাড়াই নিজের মেয়েকে জীবন্ত কবর দিত, তারাই হয়ে উঠছিল এমন মানুষ, যারা একটা মাছিকেও আর কষ্ট দিত না। কখনো কখনো অন্য কোনো গোত্রের একজন মানুষ এসে মাত্র এক ঘণ্টা কিংবা একদিন তাঁর সান্নিধ্যে থাকতেন, আর নিজের কওমের কাছে ফিরে যেতেন শিক্ষক হয়ে— আবু যর (রা.) কিংবা তুফায়েল ইবনে আমর (রা.)-এর মতো। তাদের আত্মার সব খারাপ গুণ মুছে যেত, আর তারা হয়ে উঠত সর্বোচ্চ নৈতিকতায় ভরা। উমরের মতো কয়লা থেকে হীরা হওয়া মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তেই থাকল। আর ইসলামের দাওয়াত এখন আরও বেশি শক্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এই সব ঘটনার পর দারুন নাদওয়ায় আরও বৈঠক জমতে লাগল, যেখানে ঘৃণায় ভরা পরিকল্পনা আঁটা হচ্ছিল। প্রতিশোধের আগুনে তাড়িত হয়ে, তারা মুসলিমদের ওপর এক বিধ্বংসী আঘাত হানতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। শহরটি ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর মুখোমুখি হতে যাচ্ছিল, কারণ এবার তারা নিষ্ঠুরতার চূড়ায় পৌঁছে যাবে। পরের পর্বে, আপনি দেখবেন বয়কটের বছরগুলো। সেখানেই দেখা হবে।