উম্মাহর প্রতি নবী মুহাম্মদ ﷺএর সর্বশেষ নসীহা! অশ্রুসিক্ত মদিনা | চূড়ান্ত পর্ব -ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ)
প্রকাশের তারিখ
প্রত্যেক নবীকেই একটি স্পেশাল দোয়া প্রদান করা হয়েছিল, আর তা যেকোনো সময় অবশ্যই কবুল হতো। আর প্রত্যেক নবী তা তার জীবদ্দশায় ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, সুলাইমান (আঃ) এই দোয়াটি করেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে এমন এক রাজত্ব দান করুন দানশীল।" যা আমার পরে আর কাউকে দেওয়া হবে না। নিশ্চয়ই আপনি উত্তম আর আল্লাহ তাকে দান করেছিলেন অতুলনীয় এক রাজত্ব। অন্যদিকে যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার উত্তরসূরি হওয়ার পর স্বজনদের নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বৃদ্ধ, আর তার স্ত্রী সন্তান জন্মদানে অক্ষম ছিলেন। তাই তিনি আল্লাহর কাছে তার দোয়া নিবেদন করলেন একটি সন্তান চেয়ে। আর আল্লাহ তাকে ইয়াহিয়া আলাইহিস সালাম দ্বারা ধন্য করলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকল জগতের জন্য রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছিলেন। তাই তিনি তার দোয়া দুনিয়ায় ব্যবহার করেননি। কারণ তার অন্তরে নিজের প্রয়োজন ও কষ্টের আগেই ছিল তার উম্মাহ, ছিলাম আমরা। তাই তিনি সেই দোয়াটি সঞ্চিত রাখলেন। তিনি তা নিজের জন্য ব্যবহার করেননি বা তার পরিবারের জন্যও না বা তিনি যে কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করেছিলেন তা লাঘবের জন্যও নয়। তিনি বলেছিলেন, "আমি আমার সেই দোয়াটি কেয়ামতের দিনে আমার উম্মতের জন্য শাফায়াত করার উদ্দেশ্যে সংরক্ষণ করে রাখতে চাই।" তিনি সেই দোয়াটি সঞ্চিত রেখেছিলেন যাতে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে পারেন আমাদের পক্ষ থেকে পরকালে আমাদের ক্ষমা করার জন্য। যাতে তিনি তার প্রতিপালকের কাছে মিনতি করে বলতে পারেন, "আমার উম্মাহ, আমার উম্মাহ" এবং কেয়ামতের দিনে আমাদের রক্ষা করতে পারেন। তিনি সেই দোয়াটি এ জীবনে ব্যবহার করেননি। নিজের স্বস্তি চাওয়ার বদলে তিনি আমাদের চিরন্তন জীবন রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। এমনই ছিল তার উম্মতের প্রতি তার বহন করা দয়া ও ভালোবাসা। আর এখন তিনি অনুভব করতে পারছিলেন যে, তিনি তার জীবনের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত করছেন। অচিরেই তিনি তার সাহাবীগণকে, তার উম্মাহকে এবং সমগ্র মানবজাতিকে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেবেন, যা আমরা বিদায়ী হজের ভাষণ নামে জানি। এবার চলুন আমরা ফিরে যাই সেই ঐতিহাসিক -মুহূর্তে, উনার ভাষণ শুনতে। -[আযান] এই ভিডিও সিরিজটি নির্ভরযোগ্য শত শত বিশ্বস্ত ইসলামিক উৎসের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। সমস্ত AI দৃশ্য প্রস্তুত করা হয়েছে যোগ্য মুসলিম আলেমদের পরামর্শক্রমে এবং তা সম্পূর্ণ ইসলামিক নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো হজ। ফরজ করা হয়েছিল হিজরতের নবম বছরে। আর দশম বছরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজের প্রস্তুতি শুরু করলেন। এবং তিনি মদিনার মুসলিমদের ও আশপাশের গোত্রগুলোকে প্রস্তুত হতে বললেন। হাজার হাজার মুসলিম মদিনায় সমবেত হলো যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে। তারা অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। কারণ তারা তাদের প্রথম হজ আদায় করতে যাচ্ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে একত্রে। কিন্তু তাদের কোনো ধারণাই ছিল না যে, এটি হবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ হজ। জিলকদ মাসের পঁচিশ তারিখে চল্লিশ হাজার মানুষের এক কাফেলা নিয়ে যোহরের সালাত আদায় করে তারপর রওনা হলো রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বে। হজ শুরু করার আগে তিনি এই দোয়াটি করেছিলেন, "হে আল্লাহ, আমাকে এমন এক হজ দান করুন যাতে কোন চাকচিক্য না থাকে এবং কোন খ্যাতি অর্জনের ইচ্ছাও না থাকে।" তারা কুরবানির জন্য সঙ্গে এনেছিলেন একশটি উট। প্রায় দশ দিন সফরের পর তারা মক্কায় পৌঁছালেন জিলহজ মাসের চার তারিখে। ইয়েমেন ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে হজের জন্য আগত মুসলিমরা তাদের সঙ্গে যোগ দিলে তাদের সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়িয়ে গেল। হৃদয় জুড়ানো কি যে এক অপূর্ব দৃশ্যই না ছিল এটি!
দশ বছর আগে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, পাশে কেবল আবু বকরকে নিয়ে। আর এখন তিনি মক্কায় ফিরছেন অসংখ্য মুসলিমকে সঙ্গে নিয়ে। এটি ছিল এমন এক বিজয় যা কোন যুদ্ধ বা কোন তরবারি কখনো অর্জন করতে পারত না। এটি কোন তরবারির বিষয় ছিল না। এটি ছিল মানুষের হৃদয় জয় করা এক অনন্য ব্যাপার। আল্লাহর রাসূল ছিলেন প্রশান্ত। তিনি তার হজের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত ছিলেন। জিলহজ মাসের আট তারিখে তিনি মিনায় গেলেন। আর নয় তারিখে তিনি আরাফাতে গেলেন। সেদিন বিকেলে আরাফাতের উপত্যকার মাঝখানে তিনি তার বিদায়ী ভাষণ প্রদান করলেন। তিনি শুরুটা করেছিলেন এইভাবে, "হে মানব!" লক্ষ্য করুন, তিনি বলেননি, "হে মুসলিমগণ!" কারণ এই আহ্বান শুধু তাদের জন্য ছিল না যারা সেদিন আরাফাতে উপস্থিত ছিলেন। এটি ছিল প্রত্যেক মানুষের জন্য যারা কেয়ামত পর্যন্ত আসবে। নারী ও পুরুষ, তরুণ ও বৃদ্ধ, তিনি এক লক্ষেরও বেশি মানুষের উদ্দেশ্যে বলছিলেন এবং তাদের মাধ্যমে আসন্ন প্রতিটি প্রজন্মের উদ্দেশ্যে। তিনি তার ভাষণ শুরু করেন এই কথাগুলো দিয়ে, "সমস্ত প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্য। আমরা তার প্রশংসা করি এবং তারই সাহায্য চাই। আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট হতে ছেড়ে দেন, কেউ তাকে হেদায়েত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনি একক, তার কোন শরিক নেই, কোন সমকক্ষ নেই এবং তার তুলনীয়ও কেউ নেই। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তার বান্দা ও তার রাসূল। হে মানবজাতি, আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমি জানিনা, হয়তো এ বছরের পরে আমি আর এখানে তোমাদের মাঝে থাকবো না। হে মানুষ, যেমন তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস এবং তোমাদের এ নগরী মক্কা পবিত্র, তেমনি পবিত্র তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মানও। এসব কিছু যেন সব ধরনের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকে। হে আমার সাহাবীগণ, আগামীকাল তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ পাবে। আর তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে আজ তোমরা যা কিছু করেছ সেসব সম্পর্কে। আমার পরে আবার একে অন্যের গর্দানের উপর আঘাত করে এমন কুফরিতে ফিরে যেও না। যারা এখানে উপস্থিত আছে তারা যেন আমি যা বলেছি তা তাদের কাছে পৌঁছে দেয় যারা আজ উপস্থিত নেই। এমনও হতে পারে যে, যারা তা পাবে তারা আজ এখানে যারা শুনেছে তাদের চেয়েও তা ভালোভাবে বুঝবে।" তিনি প্রথমে রিবা সম্পর্কে কথা বললেন। তিনি বললেন, "হে আমার সাহাবীগণ, যার কাছে কারো কোন আমানত থাকে, সে যেন তা অবিলম্বে তার মালিককে ফিরিয়ে দেয়। জেনে রেখো, সব ধরনের রিবা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এটি আল্লাহর নির্দেশ। আর আমি যে প্রথম রিবা বাতিল করছি, তা হলো আমার চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদ। তবে মূল যে অর্থ তোমরা দিয়েছিলে তা তোমাদেরই প্রাপ্য। তোমরা অন্যায় করো না এবং তোমাদের প্রতিও যেন অন্যায় করা না হয়।" এরপর তিনি নারীদের অধিকার সম্পর্কে কথা বললেন, "হে মানুষ, আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি নারীদের অধিকার সম্মান করতে এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে। কারণ তোমরা তাদের গ্রহণ করেছ আল্লাহর আমানত হিসেবে এবং তোমরা বৈধ করেছ তাদের সান্নিধ্য আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার মাধ্যমে। তাদের উপর তোমাদের অধিকার আছে, যেমন তোমাদের উপর নারীদেরও অধিকার আছে।" তিনি এমন বাণী উচ্চারণ করলেন যা বর্ণবাদ সম্পূর্ণরূপে মুছে দেয়, "হে মানুষ, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতাও এক। তোমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে।"কোন আরবের উপর কোন অনারবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি কোন অনারবেরও কোন আরবের উপর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোন শ্বেতাঙ্গ মানুষের কোন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি কোন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরও কোন শ্বেতাঙ্গ মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব আসে কেবল তাকওয়া থেকে অর্থাৎ আল্লাহর সচেতনতা থেকে। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সেই, যার তাকওয়া সবচেয়ে বেশি। তিনি সেই বিষয়গুলো নিয়েই বলছিলেন যেগুলো নিয়ে মানবতা সংগ্রাম করবে আগামীতে বহু শতাব্দী ধরে এবং দিচ্ছিলেন সেসব সমাধান যার জন্য বিশ্ব ছিল মরিয়া। এরপর তিনি আমাদের -কাছে একটি বিশ্বাস রেখে গেলেন। -আল্লাহর রাসূল বলেন, "হে মুমিনগণ, আমি তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এগুলোকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে ততদিন কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। এ দুটি হলো আল্লাহর কিতাব আল-কোরআন -এবং তার নবীর সুন্নাহ, নবীর আদর্শ।" -সবশেষে তিনি তার সাহাবীগণকে একটি প্রশ্ন করলেন, "হে মানুষ, তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তখন তোমরা কী বলবে?" "আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আমাদের উপদেশ দিয়েছেন।" এ কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশের দিকে তার তর্জনী উঁচু করে বললেন, "হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন।" চৌদ্দ শতাব্দী পরেও যদি আমাদের সাক্ষ্য কবুল হয় তবে আমরাও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন, হে আল্লাহর রাসূল। সেটি ছিল প্রায় শেষ বিকেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উটনী কাসওয়ার পিঠে ছিলেন। হঠাৎ তার চেহারার অবস্থা বদলে গেল এবং কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে লাগল। সাহাবীগণ বুঝতে পারলেন যে তার উপর ওহী নাযিল হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে যখন সে অবস্থা কেটে গেল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেলাওয়াত করলেন সদ্য নাযিল হওয়া আয়াতটি। "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকেই তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।" হঠাৎ গভীর কান্নার শব্দ শোনা গেল। তিনি ছিলেন আবু বকর। তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু অনবরত গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু যখন অন্য সবাই এই আয়াত শুনে আনন্দে ভরে উঠেছিল, তখন কি এমন ছিল যা তাকে কাঁদিয়েছিল?
তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, এই আয়াতটি আসলে এক বিদায় বার্তা। কারণ আল্লাহ যখন বললেন, "আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম", তখন এর অর্থ ছিল নবীর দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে এবং বিচ্ছেদের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তে এ কথা একমাত্র আবু বকরই বুঝেছিলেন। সম্ভবত আল্লাহ তাকে এই ভারী বিদায়ের জন্য আগেভাগেই প্রস্তুত করছিলেন। কারণ রাসূলুল্লাহর ইন্তেকাল সাহাবীদের অন্তরকে গভীরভাবে কাঁপিয়ে দেবে। যখন তা ঘটবে তখন কাউকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে, সবাইকে শান্ত করতে হবে এবং পথ দেখাতে হবে। আর সত্যিই সেদিন আবু বকর পর্বতের মতো অটল থেকেছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর দুই বছর কেটে গিয়েছিল। তাহলে ওই দুই বছরে কী ঘটেছিল?
চলুন সংক্ষেপে তা দেখে নেই। আরব উপদ্বীপের হৃদয়স্থল হিসেবে মক্কা পরিণত হয়েছিল তাওহীদের কেন্দ্রে অর্থাৎ আল্লাহর একত্বের কেন্দ্রে। আর এই বিশাল পরিবর্তন অন্য গোত্রগুলোর জন্য -ইসলাম গ্রহণের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিল। -আর মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আর এর সঙ্গেই শুরু হয় সেই বছর যা সানাতুল উফুদ নামে পরিচিত। আরবের প্রতিটি প্রান্ত থেকে গোত্রগুলো এসে ইসলাম গ্রহণ করল। ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ সুলাইম, মুজাইনা, জুহাইনা গোত্রের লোকেরা, হাওয়াজিন এমনকি তাইফের লোকেরাও এসে মুসলিম হয়ে গেল। তাইফবাসীর জন্য নবীর করা দোয়ার কথা কি আপনার মনে আছে?
সেই প্রার্থনার জবাব এখন দেওয়া হচ্ছিল। সে বছর সাতটিরও বেশি প্রতিনিধি দল এসেছিল। মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পরেই ওমানের শাসক এবং তার জনগণও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। আরেকজন নেতা যিনি মুসলিম হয়েছিলেন তিনি ছিলেন বাহরাইনের শাসক। তার সঙ্গে সঙ্গে জরোথস্ত্রিওদের ধর্মীয় নেতাও ইসলাম গ্রহণ করেন। যদিও বাহরাইনের কিছু জরোথস্ত্রিও মানুষ মুসলিম হয়েছিলেন, অন্যরা নিজেদের ধর্মেই অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সূরা আন-নাসরে পূর্ববাণীকৃত দিনগুলো অবশেষে এসে গিয়েছিল। আয়াতে যেমন বর্ণনা করা হয়েছে, মানুষ দলে দলে একের পর এক আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছিল। আর এই নব মুসলিমদের অঞ্চলগুলোতে সাহাবীদের পাঠানো হয়েছিল প্রশাসক বা দূত হিসেবে। এই সাহাবীরা যেমন বিচারকের দায়িত্ব পালন করতেন, তেমনি মানুষকে তাদের দ্বীনও -শিক্ষা দিতেন। -আর তোমরা বিভক্ত হয়ে যেও না। জাকাতের বিষয়গুলো তদারকির দায়িত্বও তাদের উপরে ছিল। মনে আছে যখন মদিনায় রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মিত হচ্ছিল, তখন আল্লাহর রাসূল তিনটি বিষয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। অজ্ঞতা, দারিদ্রতা আর সংঘাত। এই প্রশাসকরা কার্যত সেই একই সংগ্রামকে বাস্তবের রূপ দিচ্ছিলেন। তারা মানুষকে দ্বীন শিখতে সাহায্য করতেন। আর যেহেতু ইসলাম শুধু ইবাদত নিয়েই নয় বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা দেয়, তাই তারা প্রকৃতপক্ষে অজ্ঞতার বিরুদ্ধেই লড়ছিলেন। বিচারক হিসেবে তাদের ভূমিকার মাধ্যমে ন্যায়সংগত রায় প্রদান করে এবং ইসলামের নৈতিক আদর্শ ছড়িয়ে দিয়ে তারা সংঘাত ও বিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। আর যাকাতের বিষয়সমূহ পরিচালনার মাধ্যমে তারা সরাসরি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। প্রতি বছর গোত্রগুলোকে যাকাত সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হতো যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। এরপর তা সংগ্রহ করা হতো তাদের কাছ থেকে, যাদের সম্পদ ন্যূনতম নির্ধারিত পরিমাণের বেশি ছিল যা মূলত নিসাব পরিমাণ হিসেবে উল্লেখ্য। এরপর কর্মকর্তারা বন্টন করতেন এই যাকাতের অর্থ সেই একই এলাকার অভাবী মানুষের মাঝে। এই ব্যবস্থার প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই যারা একসময় যাকাত গ্রহণ করতো তারা এমন অবস্থায় পৌঁছে যেত যে নিজেরাই যাকাত দিতে পারতো। প্রকৃতপক্ষে মাত্র কয়েক বছর পরেই মুয়াজ ইবনে জাবাল যাকাত সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ইয়ামানি তিনি একজনও অভাবী মানুষ খুঁজে না পাওয়ায় তাকে যাকাতের অর্থ পাঠাতে হয়েছিল খিলাফতের মূল কেন্দ্রে যাতে তা অন্যত্র বন্টন করা যায়। একবার কল্পনা করুন, আপনি সাদাকা দিতে গেলেন অথচ আপনার পুরো শহরে একজনও অভাবী নেই। এটা কেমন যেন স্বপ্নের মতো একটা ব্যাপার, তাই না?
ইসলাম এমনই এক ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এবং চার খলিফার আমলে মুসলিমদের কাছে যাকাত ছাড়া আর কোনো কর চাওয়া হতো না।আর কোন মুসলিম যদি যাকাত দিতে সক্ষম না হতো তবে তার কাছ থেকে কিছুই নেওয়া হতো না। কিন্তু ইহুদি, খ্রিস্টান এবং জরাথুস্ত্রীয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকে জিজিয়া নামে একটি কর গ্রহণ করা হতো। এই করের বিনিময়ে তাদের যুদ্ধের সময় সৈন্যদলে যোগ দিতে হতো না। তাদের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষিত থাকতো এবং কোন বৈষম্য ছাড়াই তারা ভোগ করতে পারতো রাষ্ট্রের সেবা সমূহের সুবিধা। এমনকি তার খিলাফতের সময়ে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন খ্রিস্টান ব্যক্তির সঙ্গে আদালতে সমান মর্যাদায় বিবেচিত হয়েছিলেন। যদিও তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। আর সেই খ্রিস্টান ব্যক্তির প্রতি কোন ধরনের অন্যায় করা হয়নি। তবে আপনি কখনোই দেখতে পাবেন না এ ধরনের ন্যায়বিচার অন্য রাষ্ট্রগুলোতে, যেমন বাইজেন্টাইন বা সাসানীয়দের মধ্যে। আর ধার্য করা জিজিয়া এত বেশি ছিল না যে তা মানুষকে কঠিন অবস্থায় ফেলে দিত। বরং বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় শাসনের অধীনে বসবাসকারীরা বহু বছর ধরে দিতে বাধ্য হয়েছিল ভারী কর। এটাই আমার শস্যদানার শেষ তলানিটুকু। আমার সন্তানরাও না হারে। আর তোমাদের শস্য ভাণ্ডার উপচে পড়ছে। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের জন্য একজন ত্রাণকর্তা পাঠাবেন। কিন্তু যখন তাদের ভূমি ইসলামিক শাসনের অধীনে এলো তখন তারা অনেক কম কর দিয়েই স্বস্তি খুঁজে পেল। আর এর পাশাপাশি নারী, বৃদ্ধ, গুরুতর অসুস্থ মানুষ এবং ধর্মীয় নেতাদের উপর কোন করই ধার্য করা হতো না। বিজিত ভূমি ছাড়াও কিছু রাজ্য মুসলিমদের কর্তৃত্ব মেনে নেয় এবং বার্ষিক জিজিয়া প্রদানে সম্মত ছিল। উদাহরণস্বরূপ তাবুক অভিযানের সময় কিন্দাহর রাজা, আইলার শাসক এবং জারবা ও আজরুহর জনগণকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। তাই প্রতি বছর জিজিয়া দেওয়ার বিনিময়ে তাদের -সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। -আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে এখন থেকে তোমরা জিজিয়া প্রদান করবে। সেই সময় রাষ্ট্রের ব্যয়ভার তিন ভাবে নির্বাহ করা হতো। জিজিয়া, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের আয় ওয়াকফের সম্পদ থেকে। এভাবেই মক্কা বিজয়ের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই দৃঢ় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এখন একটি সুসংহত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে সারা অঞ্চল জুড়ে মূর্তি এবং মূর্তির উপাসনালয় ধ্বংস করা হয়। আরবী মূর্তি পূজা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে গিয়েছিল। এইসব বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল মাত্র তেইশ বছরের মধ্যে। জাহিলিয়াতের যুগের মতো একটা সমাজে, যেখানে এমন রূপান্তর প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হতো। আল্লাহর ইচ্ছায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়লাকে হীরেকে পরিণত করেছিলেন। আর তিনি যে সাহাবীদের গড়ে তুলেছিলেন তারা ছিলেন এমন মানুষ যারা হয়ে উঠবেন শিক্ষক এবং বিশ্ববাসীর জন্য আদর্শ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জ আদায় করছিলেন। তিনি সম্পন্ন করেছিলেন সব আচার অনুষ্ঠান একে একে। কিন্তু যখন কুরবানির সময় এলো তিনি ঠিক তেষট্টিটি উট কুরবানি করলেন। তার জীবনের প্রতিটি বছরের জন্য একটি করে। আর তিনি এটি করেছিলেন নিজের হাতেই। তার বয়সের একজন মানুষের জন্য একদিনে তেষট্টিটি উট জবাই করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। এটি প্রমাণ করেছিল যে তিনি তখনও শক্তিশালী ও সুস্থ ছিলেন। বয়স বাড়া সত্ত্বেও তার মধ্যে দুর্বলতার কোন লক্ষণ ছিল না। এরপর তিনি মাথা মুন্ডন করালেন। অতঃপর হজ্জ সম্পূর্ণ হলো। তিনি তার সাহাবীদের নিয়ে মদিনার পথে রওনা হলেন। এটি ছিল হিজরতের একাদশ বছর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্বরে আক্রান্ত হলেন। এটি ছিল এমন এক অসুস্থতা যা দিন দিন আরও তীব্রতর হচ্ছিল। প্রতি বছর রমজানে ফেরেশতা জিবরীল আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসতেন এবং আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে তিনি কোরআনের সব আয়াত তেলাওয়াত করতেন যেগুলো সে সময় পর্যন্ত নাজিল হয়েছিল। কিন্তু সে বছর তারা পূর্ণ তেলাওয়াত দুইবার সম্পন্ন করেছিলেন। এটি ছিল স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত যে এ বছরটি ভিন্ন ছিল। এই সময় তিনি প্রায়ই কবরস্থান পরিদর্শনে যেতেন। আল্লাহর রাসূল জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে গিয়ে বললেন, "আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, হে মুমিনদের আবাসস্থল। আপনাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা আপনাদের কাছে এসে গেছে। ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই আমরাও আপনাদের সঙ্গে যোগ দেব। হে আল্লাহ, বাকী আল গারকাদে সমাহিত মানুষদের ক্ষমা করুন।" কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, "আহা!
যদি আমি আমার ভাইদের দেখতে পেতাম।" "হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি আপনার ভাই নই?" তিনি উত্তর দিলেন, "তোমরা তো আমার সাহাবী। আর আমার ভাই তারা যারা এখনো পৃথিবীতে আসেনি। আর আমি হাউজে কাউসারে তোমাদের আগেই পৌঁছাব, যে হ্রদ পূর্ণ থাকবে আল কাউসারের পানিতে।" হ্যাঁ, তিনি আমাদের কথাই বলছিলেন। তিনি আমাদের বলেছেন, আমার ভাই। অর্থাৎ তারা যারা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে না দেখেই তার পথ অনুসরণ করবে। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনাকে না দেখেই আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। হে আল্লাহর প্রিয়, আমরা আপনাকে না দেখেই আপনাকে ভালোবেসেছি। আপনার ভাই বলে পরিচিত হওয়ার যোগ্য হয়তো আমরা নই, কিন্তু আমরা আপনাকে গভীরভাবে ভালোবেসেছি। এখন তিনি অতিবাহিত করছেন নিজ জীবনের শেষ তেরো দিন। এগুলো ছিল তার বরকতময় জীবনের শেষ দিনগুলো। তার অসুস্থতা আরও বেড়ে গিয়েছিল। আর তার দেহ খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তিনি প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। সবাই বুঝতে পারছিল পরিস্থিতি কতটা গুরুতর। সাহাবীগণ গভীরভাবে মর্মাহত ছিলেন। তিনি তো এসেছিলেন তাদের আত্মিক এতিমত্ব থেকে রক্ষা করতে। আর এখন তাদের কি তাকে ছাড়াই বাঁচতে হবে?
আবারও এতিমের মতো? তিনি চলে গেলে তারা তাদের দুঃখকষ্ট নিয়ে কার কাছে যাবেন? কার বাণী তাদের মন ও আত্মাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে? কিন্তু এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। আর প্রতিটি মানুষ এখানে কেবল একজন মেহমান। আজ না হয় কাল মৃত্যুর ফেরেশতা সবার দুয়ারেই করা নাড়বে। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। এমনকি তার শেষ দিনগুলোতেও তিনি তখনও নিজের উম্মাহর কথাই ভাবছিলেন। তার দোয়ায়, তার অশ্রুতে তার উম্মতি সর্বদা উপস্থিত ছিল। তিনি তাদের জন্যই কাঁদছিলেন। আর এমনই এক মুহূর্তে জিবরীল আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কেন কাঁদছেন?
তিনি উত্তরে বললেন, আমার উম্মাহ, হে জিবরীলআমার উম্মাহ। আমি তাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। জিব্রিল আলাইহিস সালাম ফিরে গেলেন। আর এবার তিনি সুসংবাদ নিয়ে আবার ফিরে এলেন। আপনার প্রতিপালক বলেন, মুহাম্মদের কাছে যাও এবং তাকে বলো, আমি অবশ্যই আপনাকে সন্তুষ্ট করব আপনার উম্মতের ব্যাপারে এবং আমি আপনাকে দুঃখিত করব না। এই কঠিন দিনগুলোতে তিনি থাকতে চেয়েছিলেন সেখানে, যেখানে তিনি সবচেয়ে স্বস্তি পেতেন। আমাদের মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহে। প্রতি রাতে পালাক্রমে তিনি তার স্ত্রীদের একজনের কাছে থাকতেন। সেই অবস্থাতেও তিনি ন্যায় পরায়ণতার ক্ষেত্রে কখনো শৈথিল্য দেখাননি। তিনি প্রথমে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সেদিন কার পালা?
এবং তিনি গেলেন আমাদের মা মাইমুনার ঘরে। তবে তার স্ত্রীগণ তার ইচ্ছা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তারা সবাই একত্র হলেন এবং আল্লাহর রাসূলের জন্য সম্মতি দিলেন যাতে তিনি আয়েশার ঘরেই অবস্থান করেন। আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি ছিল। তিনি জানতেন এই দুনিয়ায় তার সময় শেষ হয়ে আসছে। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সহায়তায় তিনি মসজিদে গেলেন এবং সাহাবীদের সেখানে একত্র হতে সংবাদ পাঠালেন। আল্লাহর রাসূল তার সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন, আল্লাহ তার এক বান্দাকে এ দুনিয়া এবং তার নিকট যা আছে এর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেছিলেন। আর সেই বান্দা বেছে নিয়েছে আল্লাহর নিকট যা আছে তাই। হঠাৎ একজন কাঁদতে শুরু করলেন। আবারও তিনি ছিলেন তার বিশ্বস্ত বন্ধু আবু বকর আস সিদ্দিক। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মাতা পিতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরের দিকে তাকিয়ে বললেন, সবার মাঝে মধ্যে সেই ব্যক্তি যিনি আমার প্রতি সর্বাধিক অনুগ্রহ দেখিয়েছেন, তার সঙ্গ ও তার সম্পদ উভয় দিক থেকেই তিনি হলেন আবু বকর। আমি যদি এই দুনিয়ায় একজন খলিল গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকেই করতাম। কিন্তু আমি কোন খলিল গ্রহণ করতে পারি না। কারণ আল্লাহ আমাকে তার খলিল হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের মধ্যে যে বন্ধন রয়েছে তা হলো ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার। এরপর তিনি বললেন, মসজিদের সব দরজা বন্ধ করে দাও আবু বকরের দরজা ছাড়া। তারপর সেই নির্দেশ কার্যকর করা হলো। প্রকৃতপক্ষে মসজিদের সব দরজা বন্ধ করো আবু বকরের দরজা ছাড়া এ কথা বলে তিনি আরও গভীর একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন তিনি বলছেন, তোমাদের কেউ কেউ হয়তো এই উম্মাহর দায়িত্ব নিতে চাইবে। কিন্তু সে ব্যাপারে আমি অন্য সব দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি। আর আমি চাই আবু বকরকেই সেই মর্যাদা দেওয়া হোক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্বর ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। আর তার অসুস্থতা আরও তীব্রতর হচ্ছিল। সাহাবীগণ যখন তাকে দেখতে আসতেন এবং এ অবস্থায় তাকে দেখতেন, তারা গভীরভাবে মর্মাহত হতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলেছিলেন, সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলো নবীদের উপরেই আসে। তবুও একজন নবী সে পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে যে আনন্দ পান তা তোমরা নিয়ামত প্রাপ্ত হলে যে আনন্দ অনুভব করো তার চেয়েও বেশি। এরপর তিনি যোগ করলেন, কোন মুসলিমের উপর কোন কষ্ট আসে না। অসুস্থতা থেকে হোক বা অন্য কিছু থেকে যা দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহ মুছে দেন না, যেমনটা গাছ তার পাতা ঝরিয়ে ফেলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর মসজিদে যাওয়ার শক্তি পাচ্ছিলেন না। ততদিন পর্যন্ত তার চাচা আব্বাস, আলী এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র ফাদুলের সহায়তায় তিনি এখনো সেখানে যেতে পারতেন এবং নামাজে ইমামতি করতেন। কিন্তু এখন তিনি দীর্ঘ সময় নিজের সজ্জায় শায়িত থাকেন। আর মাঝেমধ্যে কেবল চোখ খুলতে পারতেন। একসময় তিনি চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কি নামাজ পড়েছে?
না। তারা আপনার অপেক্ষায় আছে, হে আল্লাহর রাসূল। তখন তিনি বললেন, আবু বকরকে বলো, তিনি যেন নামাজ পড়ান। হে আল্লাহর রাসূল, আমার পিতা আবু বকর অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি যদি আপনার স্থলাভিষিক্ত হন, তবে তিনি তার অশ্রু সংবরণ করতে পারবেন না। আর মানুষও শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে কাঁদতে শুরু করবে। আপনি কি এর পরিবর্তে অন্য কাউকে নিয়োগ করতে পারেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নির্দেশ পুনরায় দিলেন। আবু বকরকে বলো, তিনি যেন সবার নামাজ পড়ান। অতএব আবু বকর ইমাম হিসেবে এগিয়ে এলেন এবং যোহরের নামাজের ইমামতি করলেন। পরদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হঠাৎ সজ্জা থেকে উঠবার মতো কিছুটা শক্তি অনুভব করলেন। আর পাশে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তায় তিনি মসজিদে এলেন। আবু বকর তাকে দেখতে পেয়ে পেছনে সরে যেতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ ইশারায় তাকে নিজ স্থানে থাকতে বললেন। তারপর তিনি তার বাম পাশে বসলেন। কিন্তু আবু বকর পেছনে সরে গেলেন এবং তার অনুসরণ করলেন। এটাই ছিল শেষ সালাত যাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের ইমামতি করেছিলেন। এরপর থেকে আবু বকরই নামাজে ইমামতি করতেন। এটি ছিল তার অসুস্থতার ত্রয়োদশ দিন। এক সোমবার সকাল। তিনি প্রথম এ পৃথিবীতে চোখ খুলেছিলেন এক সোমবারে। আর এখন আবারও সোমবার। কিন্তু এবার এক ভারী বিদায় ঘনিয়ে আসছিল। আবু বকর সাহাবীদের নিয়ে ফজরের নামাজ পড়াচ্ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মুহূর্তের জন্য মাথা তুললেন এবং তার কক্ষের জানালা দিয়ে তিনি সাহাবীদের দেখলেন সোজা কাতারে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। সেই মুহূর্তে তার হৃদয় ভরে গেল অপার আনন্দে। এই তো তারা, তার সাহাবীরা, যাদের জন্য তিনি এত কষ্ট সহ্য করেছিলেন। তেইশ বছর আগের জাহিলিয়াতের দিনগুলোর তুলনায় তারা কতই না বদলে গিয়েছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই নিজ প্রতিপালকের দিকে ফিরে এসেছিলেন, ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর দাওয়াতের কাজে নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের সে অবস্থায় দেখা কত বড় সুখেরই না ছিল। এটাই ছিল শেষবার যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের এভাবে দেখেছিলেন। বিচ্ছেদের বেদনা তাদের হৃদয়ে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো নেমে আসতে চলেছিল। এখন তাদের পুনর্মিলন জান্নাতের জন্যই রেখে দেওয়া হলো। একসময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় কন্যা ফাতিমাকে নিজের কাছে ডাকলেন। তিনি ছিলেন তার একমাত্র জীবিত সন্তান। আর তার চরিত্রে, তার হাঁটার ভঙ্গিতে এবং আরও বহু দিক দিয়ে তার পিতার সঙ্গে ছিল তার প্রচুর মিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের বাম পাশে বসালেন এবং তার কানে ফিসফিস করে কিছু বললেন।শুনামাত্রই ফাতিমা হঠাৎই গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগলো। তার কন্ঠ কেঁপে উঠছিল। এরপর রাসূলুল্লাহ তার কানে কানে আবারও কিছু বললেন। আর এবার তিনি মৃদু হাসতে শুরু করলেন। পরে আয়েশা যখন জিজ্ঞেস করলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কি বলেছিলেন?
তখন ফাতিমা বললেন, "প্রথমে তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, খুব শীঘ্রই তিনি এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেবেন এবং আমাকে রেখে চলে যাবেন। তাই আমি কেঁদেছিলাম। তারপর তিনি আমাকে বললেন, তার পরিবারের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম তার সঙ্গে মিলিত হবো। আর সে কারণেই আমি হেসেছিলাম।" আর ঠিক তাই ঘটেছিল। পিতার ইন্তেকালের ছয় মাস পরেই তিনিও ইন্তেকাল করেন। যখন তার বয়স তখনও বিশের কোঠায় ছিল। নবীর যন্ত্রণা নিজ হৃদয়ে অনুভব করে ফাতিমা আর তা সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি তার প্রিয় পিতাকে দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত হলেন। "আমার বাবা!
আপনি কত কষ্টই না পাচ্ছেন।" এটি ছিল বহু বছর আগেকার সেই একই ধরনের আর্তনাদ, যখন মুশরিকরা তার পিঠে উটের নাড়িভুঁড়ি ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু এখন তার কষ্টের সময় ঘনিয়ে এসেছে একেবারে শেষ প্রান্তে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ কন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, "হে ফাতিমা, আজকের পর তোমার পিতার আর কোন কষ্ট থাকবে না। যে বিষয়টি কেয়ামত পর্যন্ত কাউকেই রেহাই দেবে না, সেই মৃত্যু এখন তোমার পিতার কাছেও এসে গেছে।" আল্লাহর রাসূল এখন এমন এক পথে ছিলেন যেখান থেকে আর ফেরার কোন সুযোগ নেই। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছেন, যিনি নিজের উম্মাহর জন্য চেষ্টা সংগ্রাম কখনো থামাননি, যিনি ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে প্রতিটি কষ্ট সহ্য করেছেন, যার জীবন ছিল সমস্ত মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, তিনি এখন নিজের শেষ সজ্জায় শায়িত আছেন। হ্যাঁ, গত কয়েকদিন ধরে আমরা তার বরকতময় জীবন নিয়েই কথা বলেছি। তিনি জন্মেছিলেন এতিম অবস্থায়। খুব অল্প বয়সেই তিনি তার মাকেও হারিয়েছিলেন। আর তার জীবন ছিল কষ্ট ও পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। প্রথম ওহী তিনি লাভ করেছিলেন গভীর চিন্তায় নিমগ্ন একাকী অবস্থায় হেরা গুহায়। প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি কি ঘটছে। তাই তিনি সরাসরি চলে গেলেন সেই প্রথম ব্যক্তির কাছে, যার কাছে তিনি সব সময় ফিরে যেতেন, তার খাদিজার কাছে। তিনি বললেন, "আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও।" তাকে অর্পণ করা হয়েছিল নবুয়তের দায়িত্ব। আর এভাবেই শুরু হয়েছিল তার সেই সংগ্রাম, যা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র তেইশ বছর। প্রথম দিকের বছরগুলোতে তিনি সব ধরনের নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন। মুহাম্মদের আনুগত্যকারীদের সঙ্গে এমনটিই করা হয়। তার সাহাবীরা যখন কষ্ট পেতেন, তিনিও তাদের সঙ্গে কষ্ট পেতেন। মুশরিকরা তাদের উপর অকল্পনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল যাতে তারা ইসলাম ত্যাগ করে। পূর্ণ তিনটি বছর ধরে তিনি ও তার পরিবার, তার স্বজনরা সহ অবরোধের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। তাদের ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত রাখা হয়েছিল। তবু তিনি কখনো নিজের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। আর যখন সেই সময় শেষ হলো, সবকিছু একটু সহজ হতে শুরু করতেই তিনি হারালেন তার সবচেয়ে প্রিয়জনদের। প্রথমে তিনি হারালেন তার চাচা আবু তালিবকে, যিনি সব সময় তাকে রক্ষা করতেন। তারপর তিনি হারালেন তার প্রিয় খাদিজাকে, যিনি সব সময় তার পাশে ছিলেন। তারপর তিনি গেলেন তায়েফে, এই আশায় যে হয়তো তারা শুনবে। কিন্তু তারা নির্মমভাবে তাকে পাথর ছুঁড়েছিল। তিনি চাইলে আল্লাহ তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দিতেন। কিন্তু তিনি তা চাননি। তিনি ছিলেন রহমতের নবী। তিনি বললেন, "আমি বিশ্বাস করি তাদের মধ্য থেকে এমন প্রজন্ম আসবে যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে।" আরও একবার তিনি তার উম্মাহর কথাই ভাবলেন। আরও একবার তিনি রহমতকেই বেছে নিলেন। এতসব কষ্টের পরও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি মদিনায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি এক নতুন সভ্যতা গড়ে তুললেন এবং সেখান থেকেই তিনি ইসলামকে সুদূরপ্রসারীভাবে ছড়িয়ে দিলেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি তার চাচা হামজাকে হারালেন, যিনি সব সময় পাহাড়ের মতো তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তিনি তার কিছু নিকটতম সাহাবীকেও হারালেন। এই ক্ষতিগুলো তার উপর খুব গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু প্রতিটি কষ্টের মাঝেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শক্তি গ্রহণ করতেন আল্লাহর কাছ থেকে এবং কখনো বিরত হননি তার বার্তা পৌঁছে দিতে। তিনি বহু সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তাকে বিজয় দান করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে বহু গোত্র ইসলামকে জানতে পারে এবং তা গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশেষে তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছিলেন। অতঃপর তিনি বিদায় হজ্জ আদায় করলেন এবং বিদায় ভাষণ প্রদান করলেন। সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে তার চূড়ান্ত উপদেশ ও স্মরণবাণী দিয়ে তার সাহাবীদেরকে এবং তার উম্মাহকে। হ্যাঁ, তিনি তার দায়িত্ব সর্বোত্তম উপায়ে সম্পন্ন করেছিলেন। আর এখন এসে গেছে চিরস্থায়ী জগতে পাড়ি দেওয়ার সময়। দিন ইতিমধ্যেই অর্ধেক পেরিয়ে গিয়েছিল। আর সূর্য অস্ত যাওয়ার পথে ছিল। শুধু তার ঠোঁট নড়ছিল। "হে আল্লাহ, আমাকে আর রফিকুল আ'লার সান্নিধ্য দান করুন। হে আল্লাহ, আর রফিকুল আ'লা।" এককথায় তিনি বলছিলেন, "আমাকে সর্বোচ্চ সঙ্গীর কাছে নিয়ে নিন।" তিনি আরও বারবার বলছিলেন, "আসসালাহ, আসসালাহ" অর্থাৎ নামাজকে আঁকড়ে ধরে থাকতে তাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। শত শত বছর ধরে পৃথিবী তার আগমনের অপেক্ষায় ছিল। আর এখন আসমানের ফেরেশতারা অপেক্ষা করছিলেন। তার পাশে ছিল একটি পানির পাত্র। তিনি তাতে নিজের হাত ডুবিয়ে মুখমণ্ডল মুছতে মুছতে বলছিলেন, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।" তারপর তিনি আকাশের দিকে ইশারা করে বলতে লাগলেন, "হে আল্লাহ, আর রফিকুল আ'লা। হে আল্লাহ, আর রফিকুল আ'লা।" তিনি তেষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করলেন। ফাতিমা অশ্রু সংবরণ করতে না পেরে উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করলেন। নবীর স্ত্রীগণও যখন কাঁদতে শুরু করলেন, তখন সাহাবীগণ বুঝতে পারলেন কি ঘটে গেছে। আলী সেখানে ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন পাথরের মূর্তির মতো। তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠেছিল। উসমান ছিলেন নির্বাক। যেন তার জিহ্বা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই ভয়াবহ মুহূর্তের আকস্মিক আঘাতে সম্পূর্ণ অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। আল্লাহর রাসূল ইন্তেকাল করেননি। তিনি জীবিত আছেন। তিনি শুধু অচেতন হয়ে পড়েছেন। যেমনটি মুসা আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে হয়েছিল। যেই বলবে মুহাম্মদ ইন্তেকাল করেছেন আমি তাকে আমার তরবারি দিয়ে দ্বিখন্ডিত করে ফেলব। সেই সময়ে আবু বকর ছিলেন সুনহেতার বাড়িতে। সংবাদটি শোনা মাত্র তিনি দ্রুত সেখানে ছুটে এলেন। কারো দিকে না তাকিয়ে তিনি সোজা কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং নবীর মুখমন্ডল থেকে কাপড় সরালেন। তিনি তার কপালে -চুম্বন করলেন এবং কাঁদলেন। -মৃত্যুতেও আপনি কতই না সুন্দর!
যেমনটি ছিলেন জীবিত অবস্থায়ও, হে আল্লাহর রাসূল। এরপর তিনি আবার তার মুখ ঢেকে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তার সামনে ছিল সাহাবীদের এক সমাবেশ যারা বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন। সবাই কাঁদছিলেন। শোক ও স্তব্ধতায় অভিভূত হয়ে তিনি ওমরের কথাগুলো শুনেছিলেন। যে মুহাম্মদের ইবাদত করত সে জেনে রাখুক মুহাম্মদ ইন্তেকাল করেছেন। আর যে আল্লাহর ইবাদত করে সে জেনে রাখুক আল্লাহ চিরঞ্জীব। তিনি কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। আল্লাহ বলেছেন, মুহাম্মদ তো একজন রাসূল মাত্র। তার আগে আরও বহু রাসূল দুনিয়াতে এসেছিলেন। তিনি যদি ইন্তেকাল করেন কিংবা নিহত হন তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে এবং কুফরীতে ফিরে যাবে?
যারা এমন করবে তারা আল্লাহর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন। এই আয়াতটি মূলত উহুদের দিনে নাযিল হয়েছিল, যখন মুশরিকদের ছড়ানো মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন। যদিও সাহাবীগণ এই আয়াত শতবার হয়তো হাজারবারও তিলাওয়াত করেছিলেন তবুও শোকের সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যেন হঠাৎ তারা তা ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু ওই একটিমাত্র আয়াতের মাধ্যমেই আবু বকর সবার হৃদয় শান্ত করে দিলেন। এই কথাগুলো শোনার পর সাহাবীগণ নিজেদের কিছুটা হলেও সামনে নিতে শুরু করলেন, অন্তত সামান্য হলেও। অবশেষে তারা মেনে নিলেন আল্লাহর রাসূল এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। ওমরও তখন বাস্তবতায় ফিরে এলেন এবং এ কথা বলা বন্ধ করলেন যে আল্লাহর রাসূল ইন্তেকাল করেননি। পরে ওমর বলেছিলেন, মনে হচ্ছিল যেন আমি আয়াতটি একেবারে প্রথমবার শুনলাম। হ্যাঁ, তার ইতিহাসে এর আগে মদিনা কখনো এমন আনন্দ অনুভব করেনি, যেমনটি করেছিল নবীজির আগমনের দিনে। আর এখন তা অতিক্রম করছিল তার সবচেয়ে গভীর শোক ও বেদনা। তাদের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল আর তাদের অন্তর থেকে শোক ও বেদনা উপচে পড়ছিল। কিন্তু -শুধু শোক করলেই কিছুই সম্পন্ন হয় না। -এখন আমরা কি করব?
একজন খলিফা নির্বাচন করা জরুরি ছিল। এমন একজন যিনি মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবেন এবং ইসলামের বিধানসমূহ কার্যকর রাখবেন। তাকে হতে হবে সমগ্র উম্মাহর আশ্রয়স্থল। এমন একজন যিনি দিনরাত ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন। তাই সাহাবীগণ সমবেত হলেন। এই মহান দায়িত্বের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন আবু বকর। তিনি মক্কায় প্রথম যুগের ঈমান গ্রহণকারীদের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন হিজরতের পথে নবীর সঙ্গী, গুহার সেই দুইজনের একজন। আর তার অসুস্থতার সময়ে রাসূলুল্লাহ ইতিমধ্যেই তাকে নির্দেশ করে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি মসজিদের দিকে খোলা সব দরজা বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং শুধু আবু বকরের দরজাটিই খোলা রেখেছিলেন। তিনি তাকেই নামাজ পড়ানোর দায়িত্বও দিয়েছিলেন। তিনি তাকে ইমামের ভূমিকা দিয়েছিলেন যার অর্থ নেতৃত্ব। সালাত তো ইসলামের একটি স্তম্ভ, তাই না?
আর অসংখ্য সাহাবীদের মধ্য থেকে তিনি আবু বকরকেই বেছে নিয়েছিলেন সালাতের ইমামতি করার জন্য, সমস্ত মুসলিমদের জন্য। আবু বকর ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য নিজের সবকিছু উৎসর্গ করতে কখনো পিছপা হননি, একদিনের জন্যও নয়। যখন সেনাবাহিনীর প্রস্তুত করার প্রয়োজন হলো তিনি এমন কুরবানি করলেন যা আর কেউ করতে পারেনি। তিনি নিজের সবকিছু নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর, আপনার পরিবারের -জন্য আপনি কি রেখে এসেছেন?
-আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। মেরাজের পরের সকালে যখন মুশরিকরা আল্লাহর রাসূলকে উপহাস করছিল এবং সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের সময়েও আবু বকর সব সময় তার পাশেই ছিলেন। এই এতসব কারণেই মূলত নবীজির পরে খলিফা হওয়ার জন্য তিনিই ছিলেন সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল। সাহাবীগণ একত্রিত হয়ে পারস্পরিক পরামর্শ করার পর আবু বকরকে ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করা হলো। পরদিন জোহরের সময় হলো। এখনো অশ্রুসিক্ত সমগ্র মদিনা নামাজের জন্য মসজিদে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সব সময়ের মতো বিলাল আজান দেওয়া শুরু করলেন। কিন্তু যখন তিনি এই কথায় পৌঁছালেন, "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ" তার গলা ভারী হয়ে এলো, কন্ঠ কেঁপে উঠলো এবং তিনি বাক্যটি শেষই করতে পারলেন না। তার তো মানুষকে নামাজের দিকে আহ্বান করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি পারলেন না। তিনি আর এগিয়ে যেতে পারলেন না এবং অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। সবাই কাঁদছিল। বিলাল সচ্ছই করতে পারছিলেন না। এমনকি সেই মদিনার চিন্তাটুকু যেখানে নবীজি নেই। তিনি আর আজান দিতে পারছিলেন না। তিনি আর থাকতে চাননি সেই শহরে যার প্রতিটি কোণ তাকে স্মরণ করিয়ে দিত আল্লাহর রাসূলের কথা। আর এর কয়েক বছর পরে তিনি শামে চলে যান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র দেহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু গোসল করিয়েছিলেন। আর তিনি তাকে গোসল করাতে করাতে তার দেহ থেকে মিশকের মতো সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। এমন সুগন্ধ যা এর আগে কেউ কখনো অনুভব করেনি। মঙ্গলবার দুপুরের আগেই গোসল ও কাফনের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল।সাহাবীগণ এসে জানাজার নামাজ আদায় করলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলেছিলেন, কোন নবীকেই তিনি যেখানে ইন্তেকাল করেছেন সেখানে ছাড়া আর অন্য কোথাও দাফন করা হয়নি। তাই আবু বকরের নির্দেশে তাকে আয়েশার কক্ষেই দাফন করা হয়েছিল। ঠিক সেই জায়গায় যেখানে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা নবীগণ উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু রেখে যাই না। আমরা যে রেখে যাই তা হলো সাদাকা। এমনকি তার বর্মটিও জবের বিনিময়ে এক ইহুদি ব্যক্তির কাছে বন্ধক রাখা ছিল। যে ব্যক্তি তাকে চিনতোও না। তার জন্যও শুধু এই দৃশ্যটুকুই যথেষ্ট হতো। তবু সব কিছুর পরও তিনি আপনাদের জন্য একটি উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। দুটি উত্তরাধিকার, কোরআন এবং সুন্নাহ। তিনি তার দায়িত্ব সর্বোত্তমভাবে পালন করেছেন। এখন আমাদের পালা। তিনি পতাকাটি আমাদের হাতে অর্পণ করেছেন। আর এখন সেটিকে আবার উচ্ছে উত্তোলন করা আমাদেরই দায়িত্ব এবং তা সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে দেওয়া। এটি ঘরে বসে থাকার সময় নয়। আমাদের উপর অর্পিত এই পতাকা আমাদের একটি পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছে। এটি সেই দিনগুলোর জন্য আকুল যখন এটি আবার উঁচুতে উড়বে। এই বার্তাটি শোনার জন্য বিশ্ব অপেক্ষা করছে। এটি জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে ঈমানের আলোয়, কোরআনের আলোয় প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। মানবতা আজ আত্মিকভাবে অসুস্থ। তাদের আত্মা যন্ত্রণায় কাতর। কিন্তু তারা মুক্তির কোন পথ খুঁজে পাচ্ছে না। যখন আরোগ্য আমাদের হাতেই আছে তখন আর কতক্ষণ আমরা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকব?
আমাদের নিজের যাত্রা শুরু করার সময় কি এসে যায়নি? হে আল্লাহর রাসূল, আপনি বেঁচে ছিলেন আপনার উম্মতের জন্য। কিন্তু আমরা কিসের জন্য বেঁচে আছি? আপনি আপনার উম্মতের অনন্ত জীবন রক্ষার জন্য নিদ্রাহীন রাত কাটিয়েছেন। আর আমরা তো নিজেদের ছাড়া আর কাউকে ভাবিই না। আপনি কঠিনতম পরীক্ষার মধ্যেও নিজের দাওয়াত কখনো ছাড়েননি। অথচ আমরা সামান্যতম কষ্টেই পথ হারিয়ে ফেলি। আর তবুও আপনি আমাদের জন্য আকুল ছিলেন। আপনি আমাদের বলেছেন, আমার ভাই ও বোনেরা। কিন্তু আমরা কি সত্যিই সে নামের যোগ্য? শুধু আপনাকে ভালোবাসি বললেই কি আপনার উম্মাহ হওয়া যথেষ্ট?
নাকি বিষয়টি হলো আপনার সুন্নাহকে জীবনে ধারণ করা, বাস্তবেই তা আমাদের জীবনে বহন করা। এখনই সময় জেগে ওঠার। যে উম্মাহর জন্য আপনি অশ্রু ঝরিয়েছেন সে উম্মাহ হিসেবে আপনার যোগ্য হওয়ার সময় এসেছে। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা অঙ্গীকার করছি আপনার পথ, আপনার দাওয়াত ও আপনার উত্তরাধিকার দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার। আজ আমরাই আনব পরিবর্তন। আজ আমরা আপনার আদর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন শুরু করব। আজ আপনি এক পা এগিয়ে যাবেন সেই ভাইদের একজন হতে যাদের জন্য আপনি আকুল ছিলেন। আর আপনাকে বলছি, হ্যাঁ, আমার ভাই, হ্যাঁ, আমার বোন, যিনি এখন এই ভিডিওটি দেখছেন। আপনি যদি নিজের ঈমানকে শক্তিশালী করতে চান এবং জ্ঞানকে আরও গভীর করতে চান তবে আমরা আপনার জন্য ডজন ডজন শিক্ষামূলক ভিডিও প্রস্তুত করেছি আমাদের টুওয়ার্ডস ইটারনিটি চ্যানেলে। অল্প হলেও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আপনি বিশ্বকর অগ্রগতি করতে পারেন ইনশাআল্লাহ। আপনি যদি বলে থাকেন আমি একেবারে শুরু থেকে ইসলাম শিখতে চাই তাহলে আমাদের একটি অ্যাপ আছে নাম স্টেপ ইসলাম। আমাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সালাহ অ্যাপের মাধ্যমে আপনি দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে নিজ জীবনের একটি নিয়মিত অংশ করে তুলতে পারেন। আপনি যদি আরবিতে কোরআন পড়তে না জানেন তবে আমরা লামাদিফ কোরআন নামে একটি অ্যাপ তৈরি করেছি। আর আপনি যদি কোরআনের অর্থ আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে চান তবে আপনি আমাদের তাফসীর রিডিং অ্যাপ মাই রিসাল ডাউনলোড করতে পারেন। এই ধারাবাহিকটি যদি আপনার কাছে পৌঁছে থাকে তবে আল্লাহ চান আপনি নিজ জীবনে কিছু পরিবর্তন আনুন। তাহলে কি আমরা তার দিকে একটি পদক্ষেপও বাড়াব না?
হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আমাদেরকে আপনার উপযুক্ত এক উম্মাহ হওয়ার তৌফিক দান করুন। আপনার উপর শান্তি ও বরকত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহর রাসূল, যিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছেন। হে রাসূল!
দশ বছর আগে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, পাশে কেবল আবু বকরকে নিয়ে। আর এখন তিনি মক্কায় ফিরছেন অসংখ্য মুসলিমকে সঙ্গে নিয়ে। এটি ছিল এমন এক বিজয় যা কোন যুদ্ধ বা কোন তরবারি কখনো অর্জন করতে পারত না। এটি কোন তরবারির বিষয় ছিল না। এটি ছিল মানুষের হৃদয় জয় করা এক অনন্য ব্যাপার। আল্লাহর রাসূল ছিলেন প্রশান্ত। তিনি তার হজের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত ছিলেন। জিলহজ মাসের আট তারিখে তিনি মিনায় গেলেন। আর নয় তারিখে তিনি আরাফাতে গেলেন। সেদিন বিকেলে আরাফাতের উপত্যকার মাঝখানে তিনি তার বিদায়ী ভাষণ প্রদান করলেন। তিনি শুরুটা করেছিলেন এইভাবে, "হে মানব!" লক্ষ্য করুন, তিনি বলেননি, "হে মুসলিমগণ!" কারণ এই আহ্বান শুধু তাদের জন্য ছিল না যারা সেদিন আরাফাতে উপস্থিত ছিলেন। এটি ছিল প্রত্যেক মানুষের জন্য যারা কেয়ামত পর্যন্ত আসবে। নারী ও পুরুষ, তরুণ ও বৃদ্ধ, তিনি এক লক্ষেরও বেশি মানুষের উদ্দেশ্যে বলছিলেন এবং তাদের মাধ্যমে আসন্ন প্রতিটি প্রজন্মের উদ্দেশ্যে। তিনি তার ভাষণ শুরু করেন এই কথাগুলো দিয়ে, "সমস্ত প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্য। আমরা তার প্রশংসা করি এবং তারই সাহায্য চাই। আল্লাহ যাকে হেদায়েত দেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট হতে ছেড়ে দেন, কেউ তাকে হেদায়েত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। তিনি একক, তার কোন শরিক নেই, কোন সমকক্ষ নেই এবং তার তুলনীয়ও কেউ নেই। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তার বান্দা ও তার রাসূল। হে মানবজাতি, আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমি জানিনা, হয়তো এ বছরের পরে আমি আর এখানে তোমাদের মাঝে থাকবো না। হে মানুষ, যেমন তোমাদের এ দিন, তোমাদের এ মাস এবং তোমাদের এ নগরী মক্কা পবিত্র, তেমনি পবিত্র তোমাদের জীবন, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মানও। এসব কিছু যেন সব ধরনের ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত থাকে। হে আমার সাহাবীগণ, আগামীকাল তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ পাবে। আর তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে আজ তোমরা যা কিছু করেছ সেসব সম্পর্কে। আমার পরে আবার একে অন্যের গর্দানের উপর আঘাত করে এমন কুফরিতে ফিরে যেও না। যারা এখানে উপস্থিত আছে তারা যেন আমি যা বলেছি তা তাদের কাছে পৌঁছে দেয় যারা আজ উপস্থিত নেই। এমনও হতে পারে যে, যারা তা পাবে তারা আজ এখানে যারা শুনেছে তাদের চেয়েও তা ভালোভাবে বুঝবে।" তিনি প্রথমে রিবা সম্পর্কে কথা বললেন। তিনি বললেন, "হে আমার সাহাবীগণ, যার কাছে কারো কোন আমানত থাকে, সে যেন তা অবিলম্বে তার মালিককে ফিরিয়ে দেয়। জেনে রেখো, সব ধরনের রিবা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এটি আল্লাহর নির্দেশ। আর আমি যে প্রথম রিবা বাতিল করছি, তা হলো আমার চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদ। তবে মূল যে অর্থ তোমরা দিয়েছিলে তা তোমাদেরই প্রাপ্য। তোমরা অন্যায় করো না এবং তোমাদের প্রতিও যেন অন্যায় করা না হয়।" এরপর তিনি নারীদের অধিকার সম্পর্কে কথা বললেন, "হে মানুষ, আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি নারীদের অধিকার সম্মান করতে এবং তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করতে। কারণ তোমরা তাদের গ্রহণ করেছ আল্লাহর আমানত হিসেবে এবং তোমরা বৈধ করেছ তাদের সান্নিধ্য আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার মাধ্যমে। তাদের উপর তোমাদের অধিকার আছে, যেমন তোমাদের উপর নারীদেরও অধিকার আছে।" তিনি এমন বাণী উচ্চারণ করলেন যা বর্ণবাদ সম্পূর্ণরূপে মুছে দেয়, "হে মানুষ, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতাও এক। তোমরা সবাই আদমের সন্তান। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে।"কোন আরবের উপর কোন অনারবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি কোন অনারবেরও কোন আরবের উপর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোন শ্বেতাঙ্গ মানুষের কোন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তেমনি কোন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরও কোন শ্বেতাঙ্গ মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব আসে কেবল তাকওয়া থেকে অর্থাৎ আল্লাহর সচেতনতা থেকে। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক সম্মানিত সেই, যার তাকওয়া সবচেয়ে বেশি। তিনি সেই বিষয়গুলো নিয়েই বলছিলেন যেগুলো নিয়ে মানবতা সংগ্রাম করবে আগামীতে বহু শতাব্দী ধরে এবং দিচ্ছিলেন সেসব সমাধান যার জন্য বিশ্ব ছিল মরিয়া। এরপর তিনি আমাদের -কাছে একটি বিশ্বাস রেখে গেলেন। -আল্লাহর রাসূল বলেন, "হে মুমিনগণ, আমি তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা এগুলোকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে ততদিন কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। এ দুটি হলো আল্লাহর কিতাব আল-কোরআন -এবং তার নবীর সুন্নাহ, নবীর আদর্শ।" -সবশেষে তিনি তার সাহাবীগণকে একটি প্রশ্ন করলেন, "হে মানুষ, তোমাদেরকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। তখন তোমরা কী বলবে?" "আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আমাদের উপদেশ দিয়েছেন।" এ কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশের দিকে তার তর্জনী উঁচু করে বললেন, "হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন। হে আল্লাহ, সাক্ষী থাকুন।" চৌদ্দ শতাব্দী পরেও যদি আমাদের সাক্ষ্য কবুল হয় তবে আমরাও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন, হে আল্লাহর রাসূল। সেটি ছিল প্রায় শেষ বিকেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উটনী কাসওয়ার পিঠে ছিলেন। হঠাৎ তার চেহারার অবস্থা বদলে গেল এবং কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে লাগল। সাহাবীগণ বুঝতে পারলেন যে তার উপর ওহী নাযিল হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে যখন সে অবস্থা কেটে গেল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেলাওয়াত করলেন সদ্য নাযিল হওয়া আয়াতটি। "আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকেই তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।" হঠাৎ গভীর কান্নার শব্দ শোনা গেল। তিনি ছিলেন আবু বকর। তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু অনবরত গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু যখন অন্য সবাই এই আয়াত শুনে আনন্দে ভরে উঠেছিল, তখন কি এমন ছিল যা তাকে কাঁদিয়েছিল?
তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, এই আয়াতটি আসলে এক বিদায় বার্তা। কারণ আল্লাহ যখন বললেন, "আমি তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম", তখন এর অর্থ ছিল নবীর দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে এবং বিচ্ছেদের সময় ঘনিয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তে এ কথা একমাত্র আবু বকরই বুঝেছিলেন। সম্ভবত আল্লাহ তাকে এই ভারী বিদায়ের জন্য আগেভাগেই প্রস্তুত করছিলেন। কারণ রাসূলুল্লাহর ইন্তেকাল সাহাবীদের অন্তরকে গভীরভাবে কাঁপিয়ে দেবে। যখন তা ঘটবে তখন কাউকে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে, সবাইকে শান্ত করতে হবে এবং পথ দেখাতে হবে। আর সত্যিই সেদিন আবু বকর পর্বতের মতো অটল থেকেছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর দুই বছর কেটে গিয়েছিল। তাহলে ওই দুই বছরে কী ঘটেছিল?
চলুন সংক্ষেপে তা দেখে নেই। আরব উপদ্বীপের হৃদয়স্থল হিসেবে মক্কা পরিণত হয়েছিল তাওহীদের কেন্দ্রে অর্থাৎ আল্লাহর একত্বের কেন্দ্রে। আর এই বিশাল পরিবর্তন অন্য গোত্রগুলোর জন্য -ইসলাম গ্রহণের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিল। -আর মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আর এর সঙ্গেই শুরু হয় সেই বছর যা সানাতুল উফুদ নামে পরিচিত। আরবের প্রতিটি প্রান্ত থেকে গোত্রগুলো এসে ইসলাম গ্রহণ করল। ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ সুলাইম, মুজাইনা, জুহাইনা গোত্রের লোকেরা, হাওয়াজিন এমনকি তাইফের লোকেরাও এসে মুসলিম হয়ে গেল। তাইফবাসীর জন্য নবীর করা দোয়ার কথা কি আপনার মনে আছে?
সেই প্রার্থনার জবাব এখন দেওয়া হচ্ছিল। সে বছর সাতটিরও বেশি প্রতিনিধি দল এসেছিল। মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পরেই ওমানের শাসক এবং তার জনগণও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। আরেকজন নেতা যিনি মুসলিম হয়েছিলেন তিনি ছিলেন বাহরাইনের শাসক। তার সঙ্গে সঙ্গে জরোথস্ত্রিওদের ধর্মীয় নেতাও ইসলাম গ্রহণ করেন। যদিও বাহরাইনের কিছু জরোথস্ত্রিও মানুষ মুসলিম হয়েছিলেন, অন্যরা নিজেদের ধর্মেই অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সূরা আন-নাসরে পূর্ববাণীকৃত দিনগুলো অবশেষে এসে গিয়েছিল। আয়াতে যেমন বর্ণনা করা হয়েছে, মানুষ দলে দলে একের পর এক আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছিল। আর এই নব মুসলিমদের অঞ্চলগুলোতে সাহাবীদের পাঠানো হয়েছিল প্রশাসক বা দূত হিসেবে। এই সাহাবীরা যেমন বিচারকের দায়িত্ব পালন করতেন, তেমনি মানুষকে তাদের দ্বীনও -শিক্ষা দিতেন। -আর তোমরা বিভক্ত হয়ে যেও না। জাকাতের বিষয়গুলো তদারকির দায়িত্বও তাদের উপরে ছিল। মনে আছে যখন মদিনায় রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মিত হচ্ছিল, তখন আল্লাহর রাসূল তিনটি বিষয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। অজ্ঞতা, দারিদ্রতা আর সংঘাত। এই প্রশাসকরা কার্যত সেই একই সংগ্রামকে বাস্তবের রূপ দিচ্ছিলেন। তারা মানুষকে দ্বীন শিখতে সাহায্য করতেন। আর যেহেতু ইসলাম শুধু ইবাদত নিয়েই নয় বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা দেয়, তাই তারা প্রকৃতপক্ষে অজ্ঞতার বিরুদ্ধেই লড়ছিলেন। বিচারক হিসেবে তাদের ভূমিকার মাধ্যমে ন্যায়সংগত রায় প্রদান করে এবং ইসলামের নৈতিক আদর্শ ছড়িয়ে দিয়ে তারা সংঘাত ও বিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। আর যাকাতের বিষয়সমূহ পরিচালনার মাধ্যমে তারা সরাসরি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। প্রতি বছর গোত্রগুলোকে যাকাত সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া হতো যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। এরপর তা সংগ্রহ করা হতো তাদের কাছ থেকে, যাদের সম্পদ ন্যূনতম নির্ধারিত পরিমাণের বেশি ছিল যা মূলত নিসাব পরিমাণ হিসেবে উল্লেখ্য। এরপর কর্মকর্তারা বন্টন করতেন এই যাকাতের অর্থ সেই একই এলাকার অভাবী মানুষের মাঝে। এই ব্যবস্থার প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই যারা একসময় যাকাত গ্রহণ করতো তারা এমন অবস্থায় পৌঁছে যেত যে নিজেরাই যাকাত দিতে পারতো। প্রকৃতপক্ষে মাত্র কয়েক বছর পরেই মুয়াজ ইবনে জাবাল যাকাত সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ইয়ামানি তিনি একজনও অভাবী মানুষ খুঁজে না পাওয়ায় তাকে যাকাতের অর্থ পাঠাতে হয়েছিল খিলাফতের মূল কেন্দ্রে যাতে তা অন্যত্র বন্টন করা যায়। একবার কল্পনা করুন, আপনি সাদাকা দিতে গেলেন অথচ আপনার পুরো শহরে একজনও অভাবী নেই। এটা কেমন যেন স্বপ্নের মতো একটা ব্যাপার, তাই না?
ইসলাম এমনই এক ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এবং চার খলিফার আমলে মুসলিমদের কাছে যাকাত ছাড়া আর কোনো কর চাওয়া হতো না।আর কোন মুসলিম যদি যাকাত দিতে সক্ষম না হতো তবে তার কাছ থেকে কিছুই নেওয়া হতো না। কিন্তু ইহুদি, খ্রিস্টান এবং জরাথুস্ত্রীয় সম্প্রদায়ের কাছ থেকে জিজিয়া নামে একটি কর গ্রহণ করা হতো। এই করের বিনিময়ে তাদের যুদ্ধের সময় সৈন্যদলে যোগ দিতে হতো না। তাদের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষিত থাকতো এবং কোন বৈষম্য ছাড়াই তারা ভোগ করতে পারতো রাষ্ট্রের সেবা সমূহের সুবিধা। এমনকি তার খিলাফতের সময়ে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু একজন খ্রিস্টান ব্যক্তির সঙ্গে আদালতে সমান মর্যাদায় বিবেচিত হয়েছিলেন। যদিও তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। আর সেই খ্রিস্টান ব্যক্তির প্রতি কোন ধরনের অন্যায় করা হয়নি। তবে আপনি কখনোই দেখতে পাবেন না এ ধরনের ন্যায়বিচার অন্য রাষ্ট্রগুলোতে, যেমন বাইজেন্টাইন বা সাসানীয়দের মধ্যে। আর ধার্য করা জিজিয়া এত বেশি ছিল না যে তা মানুষকে কঠিন অবস্থায় ফেলে দিত। বরং বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় শাসনের অধীনে বসবাসকারীরা বহু বছর ধরে দিতে বাধ্য হয়েছিল ভারী কর। এটাই আমার শস্যদানার শেষ তলানিটুকু। আমার সন্তানরাও না হারে। আর তোমাদের শস্য ভাণ্ডার উপচে পড়ছে। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের জন্য একজন ত্রাণকর্তা পাঠাবেন। কিন্তু যখন তাদের ভূমি ইসলামিক শাসনের অধীনে এলো তখন তারা অনেক কম কর দিয়েই স্বস্তি খুঁজে পেল। আর এর পাশাপাশি নারী, বৃদ্ধ, গুরুতর অসুস্থ মানুষ এবং ধর্মীয় নেতাদের উপর কোন করই ধার্য করা হতো না। বিজিত ভূমি ছাড়াও কিছু রাজ্য মুসলিমদের কর্তৃত্ব মেনে নেয় এবং বার্ষিক জিজিয়া প্রদানে সম্মত ছিল। উদাহরণস্বরূপ তাবুক অভিযানের সময় কিন্দাহর রাজা, আইলার শাসক এবং জারবা ও আজরুহর জনগণকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। তাই প্রতি বছর জিজিয়া দেওয়ার বিনিময়ে তাদের -সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। -আল্লাহর রাসূলের নির্দেশে এখন থেকে তোমরা জিজিয়া প্রদান করবে। সেই সময় রাষ্ট্রের ব্যয়ভার তিন ভাবে নির্বাহ করা হতো। জিজিয়া, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানের আয় ওয়াকফের সম্পদ থেকে। এভাবেই মক্কা বিজয়ের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই দৃঢ় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এখন একটি সুসংহত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ছিল। অন্যদিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে সারা অঞ্চল জুড়ে মূর্তি এবং মূর্তির উপাসনালয় ধ্বংস করা হয়। আরবী মূর্তি পূজা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়ে গিয়েছিল। এইসব বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল মাত্র তেইশ বছরের মধ্যে। জাহিলিয়াতের যুগের মতো একটা সমাজে, যেখানে এমন রূপান্তর প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হতো। আল্লাহর ইচ্ছায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়লাকে হীরেকে পরিণত করেছিলেন। আর তিনি যে সাহাবীদের গড়ে তুলেছিলেন তারা ছিলেন এমন মানুষ যারা হয়ে উঠবেন শিক্ষক এবং বিশ্ববাসীর জন্য আদর্শ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জ আদায় করছিলেন। তিনি সম্পন্ন করেছিলেন সব আচার অনুষ্ঠান একে একে। কিন্তু যখন কুরবানির সময় এলো তিনি ঠিক তেষট্টিটি উট কুরবানি করলেন। তার জীবনের প্রতিটি বছরের জন্য একটি করে। আর তিনি এটি করেছিলেন নিজের হাতেই। তার বয়সের একজন মানুষের জন্য একদিনে তেষট্টিটি উট জবাই করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। এটি প্রমাণ করেছিল যে তিনি তখনও শক্তিশালী ও সুস্থ ছিলেন। বয়স বাড়া সত্ত্বেও তার মধ্যে দুর্বলতার কোন লক্ষণ ছিল না। এরপর তিনি মাথা মুন্ডন করালেন। অতঃপর হজ্জ সম্পূর্ণ হলো। তিনি তার সাহাবীদের নিয়ে মদিনার পথে রওনা হলেন। এটি ছিল হিজরতের একাদশ বছর। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জ্বরে আক্রান্ত হলেন। এটি ছিল এমন এক অসুস্থতা যা দিন দিন আরও তীব্রতর হচ্ছিল। প্রতি বছর রমজানে ফেরেশতা জিবরীল আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসতেন এবং আল্লাহর রাসূলের সঙ্গে তিনি কোরআনের সব আয়াত তেলাওয়াত করতেন যেগুলো সে সময় পর্যন্ত নাজিল হয়েছিল। কিন্তু সে বছর তারা পূর্ণ তেলাওয়াত দুইবার সম্পন্ন করেছিলেন। এটি ছিল স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত যে এ বছরটি ভিন্ন ছিল। এই সময় তিনি প্রায়ই কবরস্থান পরিদর্শনে যেতেন। আল্লাহর রাসূল জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে গিয়ে বললেন, "আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, হে মুমিনদের আবাসস্থল। আপনাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা আপনাদের কাছে এসে গেছে। ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই আমরাও আপনাদের সঙ্গে যোগ দেব। হে আল্লাহ, বাকী আল গারকাদে সমাহিত মানুষদের ক্ষমা করুন।" কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, "আহা!
যদি আমি আমার ভাইদের দেখতে পেতাম।" "হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি আপনার ভাই নই?" তিনি উত্তর দিলেন, "তোমরা তো আমার সাহাবী। আর আমার ভাই তারা যারা এখনো পৃথিবীতে আসেনি। আর আমি হাউজে কাউসারে তোমাদের আগেই পৌঁছাব, যে হ্রদ পূর্ণ থাকবে আল কাউসারের পানিতে।" হ্যাঁ, তিনি আমাদের কথাই বলছিলেন। তিনি আমাদের বলেছেন, আমার ভাই। অর্থাৎ তারা যারা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে না দেখেই তার পথ অনুসরণ করবে। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনাকে না দেখেই আপনার প্রতি ঈমান এনেছি। হে আল্লাহর প্রিয়, আমরা আপনাকে না দেখেই আপনাকে ভালোবেসেছি। আপনার ভাই বলে পরিচিত হওয়ার যোগ্য হয়তো আমরা নই, কিন্তু আমরা আপনাকে গভীরভাবে ভালোবেসেছি। এখন তিনি অতিবাহিত করছেন নিজ জীবনের শেষ তেরো দিন। এগুলো ছিল তার বরকতময় জীবনের শেষ দিনগুলো। তার অসুস্থতা আরও বেড়ে গিয়েছিল। আর তার দেহ খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তিনি প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন। সবাই বুঝতে পারছিল পরিস্থিতি কতটা গুরুতর। সাহাবীগণ গভীরভাবে মর্মাহত ছিলেন। তিনি তো এসেছিলেন তাদের আত্মিক এতিমত্ব থেকে রক্ষা করতে। আর এখন তাদের কি তাকে ছাড়াই বাঁচতে হবে?
আবারও এতিমের মতো? তিনি চলে গেলে তারা তাদের দুঃখকষ্ট নিয়ে কার কাছে যাবেন? কার বাণী তাদের মন ও আত্মাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে? কিন্তু এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। আর প্রতিটি মানুষ এখানে কেবল একজন মেহমান। আজ না হয় কাল মৃত্যুর ফেরেশতা সবার দুয়ারেই করা নাড়বে। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। এমনকি তার শেষ দিনগুলোতেও তিনি তখনও নিজের উম্মাহর কথাই ভাবছিলেন। তার দোয়ায়, তার অশ্রুতে তার উম্মতি সর্বদা উপস্থিত ছিল। তিনি তাদের জন্যই কাঁদছিলেন। আর এমনই এক মুহূর্তে জিবরীল আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কেন কাঁদছেন?
তিনি উত্তরে বললেন, আমার উম্মাহ, হে জিবরীলআমার উম্মাহ। আমি তাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন। জিব্রিল আলাইহিস সালাম ফিরে গেলেন। আর এবার তিনি সুসংবাদ নিয়ে আবার ফিরে এলেন। আপনার প্রতিপালক বলেন, মুহাম্মদের কাছে যাও এবং তাকে বলো, আমি অবশ্যই আপনাকে সন্তুষ্ট করব আপনার উম্মতের ব্যাপারে এবং আমি আপনাকে দুঃখিত করব না। এই কঠিন দিনগুলোতে তিনি থাকতে চেয়েছিলেন সেখানে, যেখানে তিনি সবচেয়ে স্বস্তি পেতেন। আমাদের মা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহে। প্রতি রাতে পালাক্রমে তিনি তার স্ত্রীদের একজনের কাছে থাকতেন। সেই অবস্থাতেও তিনি ন্যায় পরায়ণতার ক্ষেত্রে কখনো শৈথিল্য দেখাননি। তিনি প্রথমে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সেদিন কার পালা?
এবং তিনি গেলেন আমাদের মা মাইমুনার ঘরে। তবে তার স্ত্রীগণ তার ইচ্ছা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তারা সবাই একত্র হলেন এবং আল্লাহর রাসূলের জন্য সম্মতি দিলেন যাতে তিনি আয়েশার ঘরেই অবস্থান করেন। আর মাত্র পাঁচ দিন বাকি ছিল। তিনি জানতেন এই দুনিয়ায় তার সময় শেষ হয়ে আসছে। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সহায়তায় তিনি মসজিদে গেলেন এবং সাহাবীদের সেখানে একত্র হতে সংবাদ পাঠালেন। আল্লাহর রাসূল তার সাহাবীদের দিকে ফিরে বললেন, আল্লাহ তার এক বান্দাকে এ দুনিয়া এবং তার নিকট যা আছে এর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেছিলেন। আর সেই বান্দা বেছে নিয়েছে আল্লাহর নিকট যা আছে তাই। হঠাৎ একজন কাঁদতে শুরু করলেন। আবারও তিনি ছিলেন তার বিশ্বস্ত বন্ধু আবু বকর আস সিদ্দিক। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মাতা পিতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকরের দিকে তাকিয়ে বললেন, সবার মাঝে মধ্যে সেই ব্যক্তি যিনি আমার প্রতি সর্বাধিক অনুগ্রহ দেখিয়েছেন, তার সঙ্গ ও তার সম্পদ উভয় দিক থেকেই তিনি হলেন আবু বকর। আমি যদি এই দুনিয়ায় একজন খলিল গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকেই করতাম। কিন্তু আমি কোন খলিল গ্রহণ করতে পারি না। কারণ আল্লাহ আমাকে তার খলিল হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের মধ্যে যে বন্ধন রয়েছে তা হলো ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার। এরপর তিনি বললেন, মসজিদের সব দরজা বন্ধ করে দাও আবু বকরের দরজা ছাড়া। তারপর সেই নির্দেশ কার্যকর করা হলো। প্রকৃতপক্ষে মসজিদের সব দরজা বন্ধ করো আবু বকরের দরজা ছাড়া এ কথা বলে তিনি আরও গভীর একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন তিনি বলছেন, তোমাদের কেউ কেউ হয়তো এই উম্মাহর দায়িত্ব নিতে চাইবে। কিন্তু সে ব্যাপারে আমি অন্য সব দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি। আর আমি চাই আবু বকরকেই সেই মর্যাদা দেওয়া হোক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জ্বর ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। আর তার অসুস্থতা আরও তীব্রতর হচ্ছিল। সাহাবীগণ যখন তাকে দেখতে আসতেন এবং এ অবস্থায় তাকে দেখতেন, তারা গভীরভাবে মর্মাহত হতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলেছিলেন, সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলো নবীদের উপরেই আসে। তবুও একজন নবী সে পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে যে আনন্দ পান তা তোমরা নিয়ামত প্রাপ্ত হলে যে আনন্দ অনুভব করো তার চেয়েও বেশি। এরপর তিনি যোগ করলেন, কোন মুসলিমের উপর কোন কষ্ট আসে না। অসুস্থতা থেকে হোক বা অন্য কিছু থেকে যা দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহ মুছে দেন না, যেমনটা গাছ তার পাতা ঝরিয়ে ফেলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর মসজিদে যাওয়ার শক্তি পাচ্ছিলেন না। ততদিন পর্যন্ত তার চাচা আব্বাস, আলী এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র ফাদুলের সহায়তায় তিনি এখনো সেখানে যেতে পারতেন এবং নামাজে ইমামতি করতেন। কিন্তু এখন তিনি দীর্ঘ সময় নিজের সজ্জায় শায়িত থাকেন। আর মাঝেমধ্যে কেবল চোখ খুলতে পারতেন। একসময় তিনি চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, সবাই কি নামাজ পড়েছে?
না। তারা আপনার অপেক্ষায় আছে, হে আল্লাহর রাসূল। তখন তিনি বললেন, আবু বকরকে বলো, তিনি যেন নামাজ পড়ান। হে আল্লাহর রাসূল, আমার পিতা আবু বকর অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ। তিনি যদি আপনার স্থলাভিষিক্ত হন, তবে তিনি তার অশ্রু সংবরণ করতে পারবেন না। আর মানুষও শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে কাঁদতে শুরু করবে। আপনি কি এর পরিবর্তে অন্য কাউকে নিয়োগ করতে পারেন?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নির্দেশ পুনরায় দিলেন। আবু বকরকে বলো, তিনি যেন সবার নামাজ পড়ান। অতএব আবু বকর ইমাম হিসেবে এগিয়ে এলেন এবং যোহরের নামাজের ইমামতি করলেন। পরদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হঠাৎ সজ্জা থেকে উঠবার মতো কিছুটা শক্তি অনুভব করলেন। আর পাশে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তায় তিনি মসজিদে এলেন। আবু বকর তাকে দেখতে পেয়ে পেছনে সরে যেতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ ইশারায় তাকে নিজ স্থানে থাকতে বললেন। তারপর তিনি তার বাম পাশে বসলেন। কিন্তু আবু বকর পেছনে সরে গেলেন এবং তার অনুসরণ করলেন। এটাই ছিল শেষ সালাত যাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের ইমামতি করেছিলেন। এরপর থেকে আবু বকরই নামাজে ইমামতি করতেন। এটি ছিল তার অসুস্থতার ত্রয়োদশ দিন। এক সোমবার সকাল। তিনি প্রথম এ পৃথিবীতে চোখ খুলেছিলেন এক সোমবারে। আর এখন আবারও সোমবার। কিন্তু এবার এক ভারী বিদায় ঘনিয়ে আসছিল। আবু বকর সাহাবীদের নিয়ে ফজরের নামাজ পড়াচ্ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মুহূর্তের জন্য মাথা তুললেন এবং তার কক্ষের জানালা দিয়ে তিনি সাহাবীদের দেখলেন সোজা কাতারে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। সেই মুহূর্তে তার হৃদয় ভরে গেল অপার আনন্দে। এই তো তারা, তার সাহাবীরা, যাদের জন্য তিনি এত কষ্ট সহ্য করেছিলেন। তেইশ বছর আগের জাহিলিয়াতের দিনগুলোর তুলনায় তারা কতই না বদলে গিয়েছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই নিজ প্রতিপালকের দিকে ফিরে এসেছিলেন, ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর দাওয়াতের কাজে নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের সে অবস্থায় দেখা কত বড় সুখেরই না ছিল। এটাই ছিল শেষবার যেভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবীদের এভাবে দেখেছিলেন। বিচ্ছেদের বেদনা তাদের হৃদয়ে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো নেমে আসতে চলেছিল। এখন তাদের পুনর্মিলন জান্নাতের জন্যই রেখে দেওয়া হলো। একসময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় কন্যা ফাতিমাকে নিজের কাছে ডাকলেন। তিনি ছিলেন তার একমাত্র জীবিত সন্তান। আর তার চরিত্রে, তার হাঁটার ভঙ্গিতে এবং আরও বহু দিক দিয়ে তার পিতার সঙ্গে ছিল তার প্রচুর মিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের বাম পাশে বসালেন এবং তার কানে ফিসফিস করে কিছু বললেন।শুনামাত্রই ফাতিমা হঠাৎই গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তার চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগলো। তার কন্ঠ কেঁপে উঠছিল। এরপর রাসূলুল্লাহ তার কানে কানে আবারও কিছু বললেন। আর এবার তিনি মৃদু হাসতে শুরু করলেন। পরে আয়েশা যখন জিজ্ঞেস করলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কি বলেছিলেন?
তখন ফাতিমা বললেন, "প্রথমে তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, খুব শীঘ্রই তিনি এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেবেন এবং আমাকে রেখে চলে যাবেন। তাই আমি কেঁদেছিলাম। তারপর তিনি আমাকে বললেন, তার পরিবারের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম তার সঙ্গে মিলিত হবো। আর সে কারণেই আমি হেসেছিলাম।" আর ঠিক তাই ঘটেছিল। পিতার ইন্তেকালের ছয় মাস পরেই তিনিও ইন্তেকাল করেন। যখন তার বয়স তখনও বিশের কোঠায় ছিল। নবীর যন্ত্রণা নিজ হৃদয়ে অনুভব করে ফাতিমা আর তা সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি তার প্রিয় পিতাকে দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত হলেন। "আমার বাবা!
আপনি কত কষ্টই না পাচ্ছেন।" এটি ছিল বহু বছর আগেকার সেই একই ধরনের আর্তনাদ, যখন মুশরিকরা তার পিঠে উটের নাড়িভুঁড়ি ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু এখন তার কষ্টের সময় ঘনিয়ে এসেছে একেবারে শেষ প্রান্তে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ কন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, "হে ফাতিমা, আজকের পর তোমার পিতার আর কোন কষ্ট থাকবে না। যে বিষয়টি কেয়ামত পর্যন্ত কাউকেই রেহাই দেবে না, সেই মৃত্যু এখন তোমার পিতার কাছেও এসে গেছে।" আল্লাহর রাসূল এখন এমন এক পথে ছিলেন যেখান থেকে আর ফেরার কোন সুযোগ নেই। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছেন, যিনি নিজের উম্মাহর জন্য চেষ্টা সংগ্রাম কখনো থামাননি, যিনি ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে প্রতিটি কষ্ট সহ্য করেছেন, যার জীবন ছিল সমস্ত মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ, তিনি এখন নিজের শেষ সজ্জায় শায়িত আছেন। হ্যাঁ, গত কয়েকদিন ধরে আমরা তার বরকতময় জীবন নিয়েই কথা বলেছি। তিনি জন্মেছিলেন এতিম অবস্থায়। খুব অল্প বয়সেই তিনি তার মাকেও হারিয়েছিলেন। আর তার জীবন ছিল কষ্ট ও পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। প্রথম ওহী তিনি লাভ করেছিলেন গভীর চিন্তায় নিমগ্ন একাকী অবস্থায় হেরা গুহায়। প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি কি ঘটছে। তাই তিনি সরাসরি চলে গেলেন সেই প্রথম ব্যক্তির কাছে, যার কাছে তিনি সব সময় ফিরে যেতেন, তার খাদিজার কাছে। তিনি বললেন, "আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও।" তাকে অর্পণ করা হয়েছিল নবুয়তের দায়িত্ব। আর এভাবেই শুরু হয়েছিল তার সেই সংগ্রাম, যা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র তেইশ বছর। প্রথম দিকের বছরগুলোতে তিনি সব ধরনের নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন। মুহাম্মদের আনুগত্যকারীদের সঙ্গে এমনটিই করা হয়। তার সাহাবীরা যখন কষ্ট পেতেন, তিনিও তাদের সঙ্গে কষ্ট পেতেন। মুশরিকরা তাদের উপর অকল্পনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল যাতে তারা ইসলাম ত্যাগ করে। পূর্ণ তিনটি বছর ধরে তিনি ও তার পরিবার, তার স্বজনরা সহ অবরোধের মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন। তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। তাদের ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত রাখা হয়েছিল। তবু তিনি কখনো নিজের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। আর যখন সেই সময় শেষ হলো, সবকিছু একটু সহজ হতে শুরু করতেই তিনি হারালেন তার সবচেয়ে প্রিয়জনদের। প্রথমে তিনি হারালেন তার চাচা আবু তালিবকে, যিনি সব সময় তাকে রক্ষা করতেন। তারপর তিনি হারালেন তার প্রিয় খাদিজাকে, যিনি সব সময় তার পাশে ছিলেন। তারপর তিনি গেলেন তায়েফে, এই আশায় যে হয়তো তারা শুনবে। কিন্তু তারা নির্মমভাবে তাকে পাথর ছুঁড়েছিল। তিনি চাইলে আল্লাহ তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দিতেন। কিন্তু তিনি তা চাননি। তিনি ছিলেন রহমতের নবী। তিনি বললেন, "আমি বিশ্বাস করি তাদের মধ্য থেকে এমন প্রজন্ম আসবে যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে।" আরও একবার তিনি তার উম্মাহর কথাই ভাবলেন। আরও একবার তিনি রহমতকেই বেছে নিলেন। এতসব কষ্টের পরও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি মদিনায় হিজরত করেছিলেন। সেখানে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি এক নতুন সভ্যতা গড়ে তুললেন এবং সেখান থেকেই তিনি ইসলামকে সুদূরপ্রসারীভাবে ছড়িয়ে দিলেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি তার চাচা হামজাকে হারালেন, যিনি সব সময় পাহাড়ের মতো তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তিনি তার কিছু নিকটতম সাহাবীকেও হারালেন। এই ক্ষতিগুলো তার উপর খুব গভীর প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু প্রতিটি কষ্টের মাঝেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শক্তি গ্রহণ করতেন আল্লাহর কাছ থেকে এবং কখনো বিরত হননি তার বার্তা পৌঁছে দিতে। তিনি বহু সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তাকে বিজয় দান করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে বহু গোত্র ইসলামকে জানতে পারে এবং তা গ্রহণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশেষে তার দায়িত্ব পূর্ণ করেছিলেন। অতঃপর তিনি বিদায় হজ্জ আদায় করলেন এবং বিদায় ভাষণ প্রদান করলেন। সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে তার চূড়ান্ত উপদেশ ও স্মরণবাণী দিয়ে তার সাহাবীদেরকে এবং তার উম্মাহকে। হ্যাঁ, তিনি তার দায়িত্ব সর্বোত্তম উপায়ে সম্পন্ন করেছিলেন। আর এখন এসে গেছে চিরস্থায়ী জগতে পাড়ি দেওয়ার সময়। দিন ইতিমধ্যেই অর্ধেক পেরিয়ে গিয়েছিল। আর সূর্য অস্ত যাওয়ার পথে ছিল। শুধু তার ঠোঁট নড়ছিল। "হে আল্লাহ, আমাকে আর রফিকুল আ'লার সান্নিধ্য দান করুন। হে আল্লাহ, আর রফিকুল আ'লা।" এককথায় তিনি বলছিলেন, "আমাকে সর্বোচ্চ সঙ্গীর কাছে নিয়ে নিন।" তিনি আরও বারবার বলছিলেন, "আসসালাহ, আসসালাহ" অর্থাৎ নামাজকে আঁকড়ে ধরে থাকতে তাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন। শত শত বছর ধরে পৃথিবী তার আগমনের অপেক্ষায় ছিল। আর এখন আসমানের ফেরেশতারা অপেক্ষা করছিলেন। তার পাশে ছিল একটি পানির পাত্র। তিনি তাতে নিজের হাত ডুবিয়ে মুখমণ্ডল মুছতে মুছতে বলছিলেন, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।" তারপর তিনি আকাশের দিকে ইশারা করে বলতে লাগলেন, "হে আল্লাহ, আর রফিকুল আ'লা। হে আল্লাহ, আর রফিকুল আ'লা।" তিনি তেষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করলেন। ফাতিমা অশ্রু সংবরণ করতে না পেরে উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করলেন। নবীর স্ত্রীগণও যখন কাঁদতে শুরু করলেন, তখন সাহাবীগণ বুঝতে পারলেন কি ঘটে গেছে। আলী সেখানে ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন পাথরের মূর্তির মতো। তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠেছিল। উসমান ছিলেন নির্বাক। যেন তার জিহ্বা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই ভয়াবহ মুহূর্তের আকস্মিক আঘাতে সম্পূর্ণ অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। আল্লাহর রাসূল ইন্তেকাল করেননি। তিনি জীবিত আছেন। তিনি শুধু অচেতন হয়ে পড়েছেন। যেমনটি মুসা আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে হয়েছিল। যেই বলবে মুহাম্মদ ইন্তেকাল করেছেন আমি তাকে আমার তরবারি দিয়ে দ্বিখন্ডিত করে ফেলব। সেই সময়ে আবু বকর ছিলেন সুনহেতার বাড়িতে। সংবাদটি শোনা মাত্র তিনি দ্রুত সেখানে ছুটে এলেন। কারো দিকে না তাকিয়ে তিনি সোজা কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং নবীর মুখমন্ডল থেকে কাপড় সরালেন। তিনি তার কপালে -চুম্বন করলেন এবং কাঁদলেন। -মৃত্যুতেও আপনি কতই না সুন্দর!
যেমনটি ছিলেন জীবিত অবস্থায়ও, হে আল্লাহর রাসূল। এরপর তিনি আবার তার মুখ ঢেকে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তার সামনে ছিল সাহাবীদের এক সমাবেশ যারা বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন। সবাই কাঁদছিলেন। শোক ও স্তব্ধতায় অভিভূত হয়ে তিনি ওমরের কথাগুলো শুনেছিলেন। যে মুহাম্মদের ইবাদত করত সে জেনে রাখুক মুহাম্মদ ইন্তেকাল করেছেন। আর যে আল্লাহর ইবাদত করে সে জেনে রাখুক আল্লাহ চিরঞ্জীব। তিনি কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। আল্লাহ বলেছেন, মুহাম্মদ তো একজন রাসূল মাত্র। তার আগে আরও বহু রাসূল দুনিয়াতে এসেছিলেন। তিনি যদি ইন্তেকাল করেন কিংবা নিহত হন তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে এবং কুফরীতে ফিরে যাবে?
যারা এমন করবে তারা আল্লাহর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন। এই আয়াতটি মূলত উহুদের দিনে নাযিল হয়েছিল, যখন মুশরিকদের ছড়ানো মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন। যদিও সাহাবীগণ এই আয়াত শতবার হয়তো হাজারবারও তিলাওয়াত করেছিলেন তবুও শোকের সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যেন হঠাৎ তারা তা ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু ওই একটিমাত্র আয়াতের মাধ্যমেই আবু বকর সবার হৃদয় শান্ত করে দিলেন। এই কথাগুলো শোনার পর সাহাবীগণ নিজেদের কিছুটা হলেও সামনে নিতে শুরু করলেন, অন্তত সামান্য হলেও। অবশেষে তারা মেনে নিলেন আল্লাহর রাসূল এ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। ওমরও তখন বাস্তবতায় ফিরে এলেন এবং এ কথা বলা বন্ধ করলেন যে আল্লাহর রাসূল ইন্তেকাল করেননি। পরে ওমর বলেছিলেন, মনে হচ্ছিল যেন আমি আয়াতটি একেবারে প্রথমবার শুনলাম। হ্যাঁ, তার ইতিহাসে এর আগে মদিনা কখনো এমন আনন্দ অনুভব করেনি, যেমনটি করেছিল নবীজির আগমনের দিনে। আর এখন তা অতিক্রম করছিল তার সবচেয়ে গভীর শোক ও বেদনা। তাদের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল আর তাদের অন্তর থেকে শোক ও বেদনা উপচে পড়ছিল। কিন্তু -শুধু শোক করলেই কিছুই সম্পন্ন হয় না। -এখন আমরা কি করব?
একজন খলিফা নির্বাচন করা জরুরি ছিল। এমন একজন যিনি মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবেন এবং ইসলামের বিধানসমূহ কার্যকর রাখবেন। তাকে হতে হবে সমগ্র উম্মাহর আশ্রয়স্থল। এমন একজন যিনি দিনরাত ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন। তাই সাহাবীগণ সমবেত হলেন। এই মহান দায়িত্বের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন আবু বকর। তিনি মক্কায় প্রথম যুগের ঈমান গ্রহণকারীদের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন হিজরতের পথে নবীর সঙ্গী, গুহার সেই দুইজনের একজন। আর তার অসুস্থতার সময়ে রাসূলুল্লাহ ইতিমধ্যেই তাকে নির্দেশ করে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি মসজিদের দিকে খোলা সব দরজা বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং শুধু আবু বকরের দরজাটিই খোলা রেখেছিলেন। তিনি তাকেই নামাজ পড়ানোর দায়িত্বও দিয়েছিলেন। তিনি তাকে ইমামের ভূমিকা দিয়েছিলেন যার অর্থ নেতৃত্ব। সালাত তো ইসলামের একটি স্তম্ভ, তাই না?
আর অসংখ্য সাহাবীদের মধ্য থেকে তিনি আবু বকরকেই বেছে নিয়েছিলেন সালাতের ইমামতি করার জন্য, সমস্ত মুসলিমদের জন্য। আবু বকর ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য নিজের সবকিছু উৎসর্গ করতে কখনো পিছপা হননি, একদিনের জন্যও নয়। যখন সেনাবাহিনীর প্রস্তুত করার প্রয়োজন হলো তিনি এমন কুরবানি করলেন যা আর কেউ করতে পারেনি। তিনি নিজের সবকিছু নিয়ে এসেছিলেন। আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু বকর, আপনার পরিবারের -জন্য আপনি কি রেখে এসেছেন?
-আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলকে রেখে এসেছি। মেরাজের পরের সকালে যখন মুশরিকরা আল্লাহর রাসূলকে উপহাস করছিল এবং সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের সময়েও আবু বকর সব সময় তার পাশেই ছিলেন। এই এতসব কারণেই মূলত নবীজির পরে খলিফা হওয়ার জন্য তিনিই ছিলেন সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল। সাহাবীগণ একত্রিত হয়ে পারস্পরিক পরামর্শ করার পর আবু বকরকে ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করা হলো। পরদিন জোহরের সময় হলো। এখনো অশ্রুসিক্ত সমগ্র মদিনা নামাজের জন্য মসজিদে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সব সময়ের মতো বিলাল আজান দেওয়া শুরু করলেন। কিন্তু যখন তিনি এই কথায় পৌঁছালেন, "আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ" তার গলা ভারী হয়ে এলো, কন্ঠ কেঁপে উঠলো এবং তিনি বাক্যটি শেষই করতে পারলেন না। তার তো মানুষকে নামাজের দিকে আহ্বান করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি পারলেন না। তিনি আর এগিয়ে যেতে পারলেন না এবং অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়লেন। সবাই কাঁদছিল। বিলাল সচ্ছই করতে পারছিলেন না। এমনকি সেই মদিনার চিন্তাটুকু যেখানে নবীজি নেই। তিনি আর আজান দিতে পারছিলেন না। তিনি আর থাকতে চাননি সেই শহরে যার প্রতিটি কোণ তাকে স্মরণ করিয়ে দিত আল্লাহর রাসূলের কথা। আর এর কয়েক বছর পরে তিনি শামে চলে যান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র দেহ আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু গোসল করিয়েছিলেন। আর তিনি তাকে গোসল করাতে করাতে তার দেহ থেকে মিশকের মতো সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। এমন সুগন্ধ যা এর আগে কেউ কখনো অনুভব করেনি। মঙ্গলবার দুপুরের আগেই গোসল ও কাফনের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল।সাহাবীগণ এসে জানাজার নামাজ আদায় করলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বলেছিলেন, কোন নবীকেই তিনি যেখানে ইন্তেকাল করেছেন সেখানে ছাড়া আর অন্য কোথাও দাফন করা হয়নি। তাই আবু বকরের নির্দেশে তাকে আয়েশার কক্ষেই দাফন করা হয়েছিল। ঠিক সেই জায়গায় যেখানে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা নবীগণ উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু রেখে যাই না। আমরা যে রেখে যাই তা হলো সাদাকা। এমনকি তার বর্মটিও জবের বিনিময়ে এক ইহুদি ব্যক্তির কাছে বন্ধক রাখা ছিল। যে ব্যক্তি তাকে চিনতোও না। তার জন্যও শুধু এই দৃশ্যটুকুই যথেষ্ট হতো। তবু সব কিছুর পরও তিনি আপনাদের জন্য একটি উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। দুটি উত্তরাধিকার, কোরআন এবং সুন্নাহ। তিনি তার দায়িত্ব সর্বোত্তমভাবে পালন করেছেন। এখন আমাদের পালা। তিনি পতাকাটি আমাদের হাতে অর্পণ করেছেন। আর এখন সেটিকে আবার উচ্ছে উত্তোলন করা আমাদেরই দায়িত্ব এবং তা সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে দেওয়া। এটি ঘরে বসে থাকার সময় নয়। আমাদের উপর অর্পিত এই পতাকা আমাদের একটি পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছে। এটি সেই দিনগুলোর জন্য আকুল যখন এটি আবার উঁচুতে উড়বে। এই বার্তাটি শোনার জন্য বিশ্ব অপেক্ষা করছে। এটি জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে ঈমানের আলোয়, কোরআনের আলোয় প্রবেশের অপেক্ষায় আছে। মানবতা আজ আত্মিকভাবে অসুস্থ। তাদের আত্মা যন্ত্রণায় কাতর। কিন্তু তারা মুক্তির কোন পথ খুঁজে পাচ্ছে না। যখন আরোগ্য আমাদের হাতেই আছে তখন আর কতক্ষণ আমরা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকব?
আমাদের নিজের যাত্রা শুরু করার সময় কি এসে যায়নি? হে আল্লাহর রাসূল, আপনি বেঁচে ছিলেন আপনার উম্মতের জন্য। কিন্তু আমরা কিসের জন্য বেঁচে আছি? আপনি আপনার উম্মতের অনন্ত জীবন রক্ষার জন্য নিদ্রাহীন রাত কাটিয়েছেন। আর আমরা তো নিজেদের ছাড়া আর কাউকে ভাবিই না। আপনি কঠিনতম পরীক্ষার মধ্যেও নিজের দাওয়াত কখনো ছাড়েননি। অথচ আমরা সামান্যতম কষ্টেই পথ হারিয়ে ফেলি। আর তবুও আপনি আমাদের জন্য আকুল ছিলেন। আপনি আমাদের বলেছেন, আমার ভাই ও বোনেরা। কিন্তু আমরা কি সত্যিই সে নামের যোগ্য? শুধু আপনাকে ভালোবাসি বললেই কি আপনার উম্মাহ হওয়া যথেষ্ট?
নাকি বিষয়টি হলো আপনার সুন্নাহকে জীবনে ধারণ করা, বাস্তবেই তা আমাদের জীবনে বহন করা। এখনই সময় জেগে ওঠার। যে উম্মাহর জন্য আপনি অশ্রু ঝরিয়েছেন সে উম্মাহ হিসেবে আপনার যোগ্য হওয়ার সময় এসেছে। হে আল্লাহর রাসূল, আমরা অঙ্গীকার করছি আপনার পথ, আপনার দাওয়াত ও আপনার উত্তরাধিকার দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার। আজ আমরাই আনব পরিবর্তন। আজ আমরা আপনার আদর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন শুরু করব। আজ আপনি এক পা এগিয়ে যাবেন সেই ভাইদের একজন হতে যাদের জন্য আপনি আকুল ছিলেন। আর আপনাকে বলছি, হ্যাঁ, আমার ভাই, হ্যাঁ, আমার বোন, যিনি এখন এই ভিডিওটি দেখছেন। আপনি যদি নিজের ঈমানকে শক্তিশালী করতে চান এবং জ্ঞানকে আরও গভীর করতে চান তবে আমরা আপনার জন্য ডজন ডজন শিক্ষামূলক ভিডিও প্রস্তুত করেছি আমাদের টুওয়ার্ডস ইটারনিটি চ্যানেলে। অল্প হলেও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আপনি বিশ্বকর অগ্রগতি করতে পারেন ইনশাআল্লাহ। আপনি যদি বলে থাকেন আমি একেবারে শুরু থেকে ইসলাম শিখতে চাই তাহলে আমাদের একটি অ্যাপ আছে নাম স্টেপ ইসলাম। আমাদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সালাহ অ্যাপের মাধ্যমে আপনি দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে নিজ জীবনের একটি নিয়মিত অংশ করে তুলতে পারেন। আপনি যদি আরবিতে কোরআন পড়তে না জানেন তবে আমরা লামাদিফ কোরআন নামে একটি অ্যাপ তৈরি করেছি। আর আপনি যদি কোরআনের অর্থ আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে চান তবে আপনি আমাদের তাফসীর রিডিং অ্যাপ মাই রিসাল ডাউনলোড করতে পারেন। এই ধারাবাহিকটি যদি আপনার কাছে পৌঁছে থাকে তবে আল্লাহ চান আপনি নিজ জীবনে কিছু পরিবর্তন আনুন। তাহলে কি আমরা তার দিকে একটি পদক্ষেপও বাড়াব না?
হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আমাদেরকে আপনার উপযুক্ত এক উম্মাহ হওয়ার তৌফিক দান করুন। আপনার উপর শান্তি ও বরকত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহর রাসূল, যিনি সমগ্র জগতের জন্য রহমত রূপে প্রেরিত হয়েছেন। হে রাসূল!