Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

বদর যুদ্ধ: আবু জাহলের শেষ কথা - এআই ভিজ্যুয়ালাইজড - ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ) | পর্ব ৬

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

সালটি ছিল ছয়শ চব্বিশ। মাসটি ছিল রমজান মাস। সেই দিন যা বদলে দেবে ইতিহাসের গতিপথ। বদরে দুই বাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একপাশে ৯৫০ জনের পূর্ণসজ্জিত কুরাইশ বাহিনী আর অন্যপাশে অতি সীমিত সম্পদসহ মাত্র ৩১৩ জনের মুসলিম বাহিনী। আহাদুন আহাদ, আহাদুন আহাদ। জুলুমের বিরুদ্ধে ন্যায়, অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঈমানের উত্থান। ইসলামের প্রকৃত আত্মপ্রকাশের প্রথম যুদ্ধ। বদরের যুদ্ধ। সেই সংকটময় দিন এসে গেছে যেদিন নির্ধারণ করবে ইসলামের ভবিষ্যৎ। হয়তো এক মহাবিজয়ের মাধ্যমে ইসলামের উত্থানের সূচনা হবে অথবা সবকিছু শেষ হয়ে যাবে সেই যুদ্ধক্ষেত্রেই। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আল্লাহর কাছে মিনতি করছিলেন। এই কথাগুলো বলে দোয়া করছিলেন, "হে আল্লাহ, আপনি যদি এই ক্ষুদ্র মুমিন দলকে ধ্বংস করে দেন তবে পৃথিবীতে আর কেউ থাকবে না যে আপনার ইবাদত করবে।" তাহলে সেই যুদ্ধক্ষেত্রে কী ঘটবে?

আর তার আগেই ঘটনাগুলো কিভাবে এ পর্যায়ে এলো?

চলুন একটু পেছনে যাই। এই ভিডিও সিরিজটি নির্ভরযোগ্য ইসলামিক উৎসের শত শত রেফারেন্সের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। সমস্ত এআই ভিজুয়াল প্রস্তুত করা হয়েছে যোগ্য ইসলামিক স্কলারদের পরামর্শক্রমে। আর অবশ্যই তা ইসলামী নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মদিনায় নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আল্লাহর রাসূল (সাঃ) একটি গোয়েন্দা ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছিলেন। যার ফলে তিনি শহরের সম্ভাব্য বিপদজনক অবস্থা সম্পর্কে পূর্বেই সব জানতে পারতেন এবং আশপাশের এলাকার সব খবর সংগ্রহ করতেন। হিজরতের দ্বিতীয় বছরে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি সংবাদ এলো। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশরা এক বিশাল বাণিজ্য কাফেলা পাঠিয়েছে। অবশ্যই এই কাফেলা কেবল তাদের নিজস্ব পন্যে গঠিত ছিল না। হিজরতের সময়ের কথা মনে করুন। মুসলিমরা কঠিন পরিস্থিতিতে হিজরতে বাধ্য হয়েছিলেন। মক্কা ছাড়ার সময় তাদের সব সম্পদ পেছনে রেখে যেতে হয়েছিল। পরে সেসব সম্পদ কুরাইশরা দখল করে এই কাফেলায় যুক্ত করে বিক্রি করার জন্যে। মুমিনদের কষ্টার্জিত সম্পদ এখন পরিণত হতে যাচ্ছিল তাদের শত্রুদের হাতে অস্ত্রে। এমনকি হিজরতের সময়েও রহমত ও ন্যায়ের রাসূল মুশরিকদের আমানতের কথাও ভেবেছিলেন এবং সেগুলো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে আলী (রাঃ)-কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অথচ কুরাইশরা এমন নৈতিকতার ছিটেফোঁটাও দেখায়নি। ওরা বরং মুহাজিরদের সম্পদ দখল করে নিয়েছিল। এবার সময় এসেছিল মুশরিকদের দেখানোর যে প্রকৃত শক্তি কার হাতে। যারা মুসলিমদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং নানাভাবে নির্যাতন করেছিল। তাদের বুঝতে হতো যে আর যা খুশি তা করতে পারবে না এবং এমন কিছু দেখাতে হতো যা তাদের মনে ভয় জাগাবে। তারা থামার নয় যতক্ষণ না তারা সত্যিকারের সফলতা অর্জন করতে পারছে। শারীরিক শক্তির মুখোমুখি না হলে তারা থামত না। তাই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কাফেলাটির পিছু নেওয়ার জন্য একজন গোয়েন্দা পাঠালেন। এরপর তিনি সাহাবীদের বললেন, "যার আরোহণের জন্য পশু আছে সে তাতে চড়ে আমাদের সাথে আসুক।" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কুরাইশদের সাথে সম্ভাব্য মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। সাহাবীরা এই অভিযানে অংশ নিতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এতটাই আগ্রহী যে সেখানে এমন পিতা-পুত্রও ছিলেন যারা লটারির মাধ্যমে ঠিক করতেন কে যাবে। তাদের প্রত্যেকেই শাহাদাতের সম্মান কামনা করতেন। অল্প সময়েই তিন শতাধিক সাহাবীর একটি বাহিনী সমবেত হলো। তাদের মধ্যে খুবই অল্প বয়সী তরুণরাও ছিল। কিন্তু নবী (সাঃ) যারা খুব কম বয়সী ছিল তাদের সেনাদলে যোগ দিতে না দিয়ে তাদের ফিরিয়ে দেন। উমাইর ইবনে আবি ওয়াক্কাস যার বয়স ছিল মাত্র ষোল বছর, সেও সেখানে ছিল। অল্প বয়স সত্ত্বেও সেই অভিযানে যোগ দিতে প্রবল ইচ্ছুক ছিল। সে নিজেকে আড়ালে লুকানোর চেষ্টা করেছিল। আশা করেছিল রাসূলুল্লাহ তাকে দেখবেন না এবং ফিরিয়ে দেবেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাকে দেখে বললেন, "তোমাকেও ফিরে যেতে হবে।" উমাইর ছিল খাটো আর তখন পর্যন্ত সে কখনো কোমরে তলোয়ার বাঁধেনি। তার দেহ ছোট ছিল কিন্তু তার হৃদয় ছিল সাহসে পরিপূর্ণ। প্রথমে রাসূলুল্লাহ তাকে ফিরিয়ে দিতে চাইলেও এই তরুণ যোদ্ধার দৃঢ়তা উপেক্ষা করতে পারলেন না। অবশেষে তিনি উমাইরকে বাহিনীতে যোগ দেওয়ার অনুমতি দিলেন। অনুমতি পাওয়ার পর সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস তার ভাইয়ের কোমরে তলোয়ার বেঁধে দিলেন। উমাইর যখন হাঁটছিলেন তার তরবারিটি মাটিতে ছুঁয়ে ঘষে যাচ্ছিল আর তার পেছনে একটি দাগ রেখে যাচ্ছিল। আর সেই তরুণই পরবর্তীতে বদরের শহীদদের একজন হয়েছিলেন। সে সময় আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর প্রিয় কন্যা রুকাইয়া গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তবুও তার অসুস্থতা সত্ত্বেও নবী (সাঃ) এই অভিযানে যাওয়া থেকে বিরত হননি। তবে তিনি তার জামাতা উসমান ইবনে আফফানকে মদিনায় রেখে যান তার সেবাযত্নের জন্য। যখন প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো, ৩১৩ জনের একটি বাহিনী একত্রিত হলো। প্রখর রৌদ্রের নিচে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবীদের নিয়ে বদরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। সেখানে কয়েকটি পানির কূপ ছিল বলে কাফেলাগুলো প্রায়ই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত। বাহিনীর আরোহী পশু ছিল খুবই কম। মাত্র দুটি ঘোড়া এবং সত্তরটি উট। নবী (সাঃ), আলী এবং মারসাদ ইবনে আবি মারসাদ একটি উট ভাগাভাগি করে চড়তেন পালা করে। যখন হাঁটার পালা নবী (সাঃ) এর এলো, অন্য দুজন বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আপনি উঠুন। আপনার বদলে আমরা হাঁটব।" কিন্তু নবী (সাঃ) অস্বীকার করে বললেন, "হাঁটার ক্ষেত্রে তোমরা আমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী নও। আর তোমাদের মতোই আমারও দরকার সৎকাজ আর আল্লাহর সওয়াব।" এভাবেই তারা পথ চলতে থাকলেন। দীর্ঘ এই যাত্রার এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজের দলের সবার দিকে তাকালেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ খালি পায়ে হাঁটছিল। যুদ্ধের সময়ে পায়ে পড়ার মতো কিছুই ছিল না। তিনি দোয়া করলেন, হে আল্লাহ এই সৈনিকদের বহন করার মতো কোনো বাহন নেই। তাই আপনি তাদের বহন করুন। হে আল্লাহ!

তাদের পায়ে পড়ার মতো কিছু নেই। আর তারা ভীষণ ক্ষুধার্ত। তাই আপনি তাদের পোশাক ও খাদ্য দিন। তারা ছিল দারিদ্রের মধ্যে। তবুও তারা জানতেন, প্রকৃত শক্তি আসে ঈমান থেকে। আর সেই ঈমানের সবচেয়ে সুন্দর রূপ এই বাহিনীর মধ্যেই ফুটে উঠেছিল। বদরের সমতলে পৌঁছানোর আগেই আবু সুফিয়ান জানতে পারলো, মুসলিমরা বাহিনী নিয়ে এগুচ্ছে। মুসলমানরা আসছে। রওনা হওয়ার পর থেকেই তার আশঙ্কা ছিল মুসলিমরা পথেই থামিয়ে দেবে। আর এখন তার সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। সে তৎক্ষণাৎ একজন লোককে কুরাইশদের কাছে খবর দিতে পাঠালো এবং পথ পরিবর্তন করলো। ভিন্ন পথে কাফেলাকে মক্কায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। লোকটি যত দ্রুত পারলো মক্কায় পৌঁছালো। রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যেতে যেতে সে চিৎকার করলো, "হে কুরাইশবাসীরা, মোহাম্মদ ও তার সঙ্গীরা তোমাদের কাফেলায় হামলা করতে আসছে। তোমাদের সব পণ্য লুট হয়ে যাবে। দ্রুত আবু সুফিয়ানের সাহায্যে বেরিয়ে পড়ো।" মক্কা জুড়ে ভীষণ ভয় ছড়িয়ে পড়লো। কারণ প্রায় প্রতিটি পরিবারেরই সেই কাফেলায় বিনিয়োগ ছিল। তারা দ্রুত প্রস্তুতি নিলো এবং নয়শো পঞ্চাশ জনের একটি বাহিনী জমায়েত করলো। একশো জন অশ্বারোহী ও সাতশো উটসহ পূর্ণসজ্জিত বাহিনী বদরের দিকে রওনা দিলো। তাদের নেতৃত্বে ছিল আবু জাহেল, ইসলামের অন্যতম কঠোর শত্রু। অন্যদিকে আবু লাহাব অসুস্থতার অজুহাতে নিজের পরিবর্তে অন্য একজনকে পাঠালো। কুরাইশ বাহিনী গানবাজনা আর ঢোলের তালে বদরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। কিছু সময় পর আবু জাহেলের কাছে এক বার্তা এলো, "তুমি বেরিয়েছিলে কাফেলা ও লোকদের রক্ষা করতে। দুটোই এখন নিরাপদ। তাই ফিরে যেতে পারো।" এই বার্তাটি পাঠিয়েছিল আবু সুফিয়ান। সে নিরাপদে কাফেলাকে মক্কায় ফিরিয়ে এনেছিল এবং এখন তাদের ফিরে আসতে বলছিল। বাহিনীর অধিকাংশই ফিরে যেতে চাইল। কিন্তু আবু জাহেল যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পুষে রেখেছিল, তাই তার কোনো ইচ্ছাই ছিল না ফিরে যাওয়ার। তার অধীনে ছিল এক হাজারের কাছাকাছি পূর্ণসজ্জিত এক বাহিনী। তার কাছে এটা ছিল এমন এক সুযোগ যা সে কখনো হাতছাড়া করতে চায় না। সে নিশ্চিত ছিল তারা সব মুসলিমকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে। সে বলল, "এখন আর ফিরে যাওয়া হবে না। আমাদের বদরেই যেতে হবে। সেখানে তিন দিন থাকবো। উট জবাই করবো, খাবো আর মদপান করবো। দাসী নারীরা আমাদের আনন্দ দিতে গান গাইবে। আরবরা জমায়েত হবে আমাদের দেখতে। আর তারপর থেকে তারা সব সময় আমাদেরই ভয় করবে।" সে বাহিনীকে রাজি করিয়ে নিলো আর তারা আবার সামনে এগোতে লাগলো। যখন এই খবর রাসূলুল্লাহর কাছে পৌঁছালো যে কাফেলা মক্কায় পৌঁছে গেছে, অপরদিকে কুরাইশরা বিশাল বাহিনী নিয়ে বদরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, শুনে তিনি বিস্মিত হলেন। আচমকা এমন পট পরিবর্তন তিনি আশা করেননি। তাই তিনি কি করা যেতে পারে এই মুহূর্তে, তাই নিয়ে পরামর্শের জন্য সাহাবীদের একত্র করলেন। প্রথমে মুহাজিরদের পক্ষ থেকে মিকদাদ ইবনে আল আসওয়াদ দাঁড়িয়ে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমরা বনি ইসরাইলের মতো হবো না, যারা মুসাকে বলেছিল, 'তুমি ও তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ করো, আর আমরা এখানেই বসে থাকবো।' আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনার পাশে থেকে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। আপনার রব আপনাকে যা আদেশ করেছেন তাই করুন। আমরা আপনার অনুসরণ করব।" এই কথাগুলো শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তবে তিনি আনসারদের কাছ থেকেও শুনতে চেয়েছিলেন। কারণ আকাবার বাইয়াতে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মদিনার ভেতরে তাকে রক্ষা করবেন। কিন্তু মদিনার বাইরে তারা কি একইভাবে তাকে রক্ষা করবেন?

সাদ ইবনে মুয়াজ দাঁড়িয়ে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনার উপর ঈমান এনেছি। আমরা আপনাকে বিশ্বাস করেছি। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি যা নিয়ে এসেছেন তা সত্য। আমরা পূর্ণ অঙ্গীকারে আপনার কথা শুনতে ও মানতে প্রতিজ্ঞা করেছি।" এক মুহূর্ত কল্পনা করুন, এখন যদি আমরাও রাসূলুল্লাহর বাহিনীর সাথে বদরের পথে অগ্রসর হতাম, তখন কি আমরা তাদের মতো কথা বলতে পারতাম? আমি যেন শুনতেই পাচ্ছি, আপনি বলছেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরাও ঠিক একই কথা বলতাম। কিন্তু বলা সহজ, কাজে করে দেখানো অনেক কঠিন। কারণ আজকের দিকেই তাকান। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর দায়িত্ব কি এখনো চলমান নয়? অবশ্যই। কিন্তু এ পর্যন্ত আমরা এর জন্য আসলে কি ত্যাগ করেছি?

এক ওয়াক্ত নামাজও না পড়তে কত অজুহাতি নামরা দাঁড় করাই। সাদ ইবনে মুয়াজের আন্তরিক কথাগুলো শোনার পর রাসূলুল্লাহর মুখের উদ্বেগ দূর হয়ে গেল। আর তিনি বললেন, "আল্লাহ আজ্জাওয়াজাল আমাকে দুইটির একটির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কাফেলা অথবা স্পষ্ট বিজয়। আল্লাহর কসম!

আমি যেন দেখতে পাচ্ছি শত্রুরা ঠিক কোথায় কোথায় পতিত হবে। আল্লাহর সাহায্য তোমাদের সাথে।" এবার যুদ্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো। তাদের সামনে ছিল সংখ্যায় তিন গুণ পূর্ণসজ্জিত এক বাহিনী। কিন্তু তা মুসলিমদের জন্য কখনোই বাধা হতে পারে না। তাদের সাহসের উৎস ছিল তাদের অন্তরের ঈমান। আর তাদের সহায়ক ছিলেন আল্লাহ, যার ক্ষমতা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। রাসূলুল্লাহ বদরে নিজেদের বাহিনী নিয়ে অবস্থান করলেন এমন স্থানে, যেখানে উনাদের সামনে থাকছে পানিকূপগুলো। ঠিক তখনই হুবাব ইবনে আল মুন্ধির, যিনি ছিলেন তিরিশের কোঠায় এবং যুদ্ধকৌশলে দক্ষ হিসেবে পরিচিত, তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "হে রাসূলুল্লাহ, এখানে শিবির স্থাপনের সিদ্ধান্ত কি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত?" রাসূলুল্লাহ জবাব দিলেন, "না, এটা আমি যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিজে বেছে নিয়েছি।" এ কথা শুনে হুবাব একটি প্রস্তাব দিলেন, "ক্ষমা করবেন, হে আল্লাহর রাসূল, কিন্তু আমার মনে হয় এটা সেরা জায়গা নয়। চলুন, আমরা পানিকূপের কাছাকাছি গিয়ে শিবির স্থাপন করি, যেখানে কুরাইশরা এসে অবস্থান নেবে তারও নিকটে। ওখানে একটি কূপ আছে যেখানে প্রচুর টাটকা পানি আছে। প্রথমে আমরা একটি জলাধার খুঁড়ে পানি ভরে নিতে পারি। তারপর বাকি সব কূপ বন্ধ করে দিতে পারি। তাহলে যখনই আমাদের তৃষ্ণা লাগবে, আমরা আমাদের জলাধার থেকে পানি পান করব। আর তারা পানির অভাবে পড়ে যাবে। ফলে ওরা কঠিন অবস্থায় পড়তে বাধ্য হবে।" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই প্রস্তাবকে দূরদর্শী মনে করলেন এবং গ্রহণ করলেন। এখানে লক্ষ্য করুন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পরামর্শকে কতটা গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলেননি, "আমি নবী, আমার কথাই শেষ কথা।" বরং তিনি আবারও দেখালেন তিনি প্রতিটি দিক থেকেই সত্যিকারের আদর্শ। এরপরে এলো যুদ্ধের পরিকল্পনা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) খুব সতর্কতার সাথে বাহিনীকে সাজালেন। তিনি তাদের সারিবদ্ধ করলেন যাতে তীরন্দজরা থাকে পেছনে এবং বর্শাধারীরা থাকে সামনে। তারপর তিনি বললেন, "তোমরা সারি ছেড়ো না। শৃঙ্খলা ভাঙবে না। ধৈর্য ধরে নিজ নিজ অবস্থান ধরে রাখবে। নড়বে না। আমি নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু করবে না। শত্রু কাছাকাছি আসার আগে তীর ছুঁড়ে তীর নষ্ট করবে না। শত্রু যখন ঢাল নামায় তখন তীর ছুঁড়বে। শত্রু আরও কাছে এলে বর্শা ও ঝিবিলিন ব্যবহার করবে। তলোয়ার চালাবে সবশেষে। এটা শুধু কাছাকাছি লড়াইয়ে ব্যবহার করবে।" মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল। রাত নামলে সবাই বিশ্রামের জন্য ঘুমিয়ে পড়ল। সবাই, শুধু একজন ছাড়া। আল্লাহর রাসূল (সাঃ)। তিনি পুরো রাত কাটালেন দোয়া ও কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে মিনতি করে, "হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করুন। হে আল্লাহ, যদি এই ক্ষুদ্র মুসলিম দল ধ্বংস হয়ে যায় তবে পৃথিবীতে আর কেউ থাকবে না যে আপনার ইবাদত করবে।" এই অন্তর ছোঁয়া দোয়ার জবাব কোরআনেই দেওয়া হয়েছিল। সূরা আল-আনফালের নবম আয়াতে, "যখন তোমরা তোমাদের রবের কাছে সাহায্য চাইছিলে, তখন তিনি তোমাদেরকে সাড়া দিলেন, 'আমি তোমাদের সাহায্য করব এক হাজার ফেরেশতা দিয়ে, একটির পর একটি এসে।' হ্যাঁ, আল্লাহ এই মুসলিমে ও মুমিনকে কখনো পরিত্যাগ করেন না, যারা তার পথে যুদ্ধ করছিল। তিনি তাদের সহায়তা করলেন তার অদৃশ্য বাহিনী দিয়ে, ফেরেশতাদের দিয়ে।" অবশেষে যুদ্ধের দিন এসে গেল। যখন কুরাইশ বাহিনী বদরের সমতলে পৌঁছাল, তারা যা দেখল তাতে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। ওরা সব ক'টা কূপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। মুসলিমরা আগেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নিয়ে নিয়েছিল। তবুও সংখ্যার উপর ভরসা করে তারা ভাবল বিজয় সহজেই এসে যাবে। যখন দুই বাহিনী মুখোমুখি হল, তিনশো তেরো জন মুসলিমের বিপরীতে ছিল নয়শো পঞ্চাশ জন কুরাইশ যোদ্ধা। "আহাদুন আহাদ, আহাদুন আহাদ।" সংখ্যার পার্থক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। বস্তুগত সুবিধা ছিল কুরাইশদের পক্ষেই। কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে পরিস্থিতি ছিল একেবারে উল্টো। একপাশে ময়দান জুড়ে ধ্বনিত হচ্ছিল তাকবীরের ধ্বনি। "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।" আর অন্যপাশে ঢোল, বাদ্য আর গানে বাতাস ভরে যাচ্ছিল। একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল এমন এক বাহিনী যাদের শক্তির উৎস ছিল আল্লাহ, আর যারা জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ছিল। অন্যপাশে ছিল এমন এক বাহিনী যারা যুদ্ধ করছিল শুধু অত্যাচার আর রক্তপাতের জন্য। তখন কুরাইশ নেতাদের একজন উদবা ইবনে রাবিয়া, তার ভাই শাইবা ইবনে রাবিয়া এবং তার ছেলে ওয়ালিদকে নিয়ে এগিয়ে এল। এটা ছিল যুদ্ধ শুরুর আগের এক প্রচলিত রীতি যাকে বলা হতো মুবারাজা। প্রধান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এক, দুই বা তিনজন যোদ্ধা দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসত। তারপর শুরু হতো মূল যুদ্ধ। আনসারদের তিন তরুণ আউফ, মুয়াওয়িজ এবং আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এগিয়ে এলেন। উদবা তাদের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের সুরে জিজ্ঞেস করল, "তোমরা কারা?" "হে মুহাম্মদ, আমাদের সমকক্ষদের পাঠাও লড়াই করতে।" সে আর কারো সাথে যুদ্ধ করতে চাইছিল না। তার ঘৃণা ছিল বনি হাশিম গোত্রের প্রতি। তাই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদিনার মুসলিমদের ফিরে আসতে ডাকলেন। কিন্তু কারা হবেন যাদের রাসূলুল্লাহ বেছে নেবেন?

মুজাহিদদের মধ্য থেকে তিনি উবাইদাহ ইবনে আল-হারিসকে পাঠালেন, হামজা এবং আলী (রাঃ) কে। কারা বের হচ্ছে? উবাইদাহ আর আলী। আলী, আর তৃতীয় জন কে?

হামজা। না, হামজা। এটা তো ঠিক হচ্ছে না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যে তিনজনকে বেছে নিয়েছিলেন তারা তিনজনই ছিলেন তার নিজ পরিবারের। এবার সামনে দাঁড়ানোদের দেখে উদবা সন্তুষ্ট হল, আর দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হল। হামজা শাইবার মুখোমুখি হলেন। আলী ওয়ালিদের মুখোমুখি হলেন। আর উবাইদাহ উদবাকে নিয়ে নিজের দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু করলেন। কয়েকটি আঘাতের পরই আলী ও হামজার প্রতিপক্ষরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু উবাইদাহ ও উদবা এখনো ভীষণভাবে লড়াই করে যাচ্ছিল। মুবারাজার রীতি অনুযায়ী যে তার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করত, সে এরপর গিয়ে অন্যদের সাহায্য করতে পারত। তাই হামজা ও আলী দ্রুত ছুটে গেলেন উবাইদাহকে সাহায্য করতে এবং উদবাকে হত্যা করলেন। তারপর তারা আহত উবাইদাহকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন নবী (সাঃ) এর কাছে। রক্তক্ষরণ ছিল প্রচণ্ড। কিন্তু তাতে তার কিছুই যেন যায় আসে না। তার মন ছিল অন্য এক চিন্তায় বিভোর। তিনি বারবার বলছিলেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমি কি শহীদ নই?" "হে উবাইদাহ, আপনি শহীদ।" এই কথা শুনে উবাইদার মুখে প্রশান্তির ছাপ ফুটে উঠল, আর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইন্তেকাল করলেন এবং শহীদের মর্যাদা লাভ করলেন। তিনি শহীদ হলেন। তার মুখে তখনও একটি হাসি ছিল। কারণ ছিল শাহাদাত। আল্লাহর জন্য জীবন উৎসর্গ করা তাদের কাছে মৃত্যু নয়, বরং তাদের প্রিয় মানুষদের সাথে মিলন। কুরাইশ বাহিনী হতভম্ব হয়ে গেল। যাদেরকে তারা সবচেয়ে সাহসী জানত, কুরাইশদের প্রভাবশালী নেতা উদবা, তার ভাই শাইবা ও তার ছেলে ওয়ালিদ এখন বদরের ময়দানে মৃত পড়ে আছে।বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনতে আবু জাহেল চিৎকার করে বলল, উদবা, শাইবা আর ওয়ালিদের মৃত্যুর কারণে তোমরা বিচলিত হবে না। ওরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আর অকারণেই মারা গেছে। আমি শপথ করছি, আজ বিজয় আমাদেরই হবে। মুহাম্মদ আর তার সঙ্গীরা আমাদের জন্য তো কেবলমাত্র একটা কামোর। তারপর সে তার বাহিনীকে আবার সাজাল। দুই পক্ষই একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেই সামনে ছিলেন। সাহাবীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছিলেন। তিনি বলেননি, "আমি নবী, তোমরা গিয়ে যুদ্ধ করো।" বরং তিনি কথায় কথায় তাদের উৎসাহ দিচ্ছিলেন এবং তাদের হৃদয়ে সাহস ভরে দিচ্ছিলেন। তিনি এমন বীরত্বে লড়েছিলেন যে পরে আলী (রাঃ) বলেছিলেন, "সেদিন সবচেয়ে সাহসী ছিলেন তিনিই। সত্রুসারির তো কাছে আর কেউ কখনো ছিলেন না যতটা তিনি ছিলেন।" হামজা, আলী এবং ওমর (রাঃ) যেই তাদের পথে দাঁড়াত, তাকেই কেটে ফেলছিলেন। তলোয়ার হাতে তারা শত্রুসাড়ি ভেদ করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। একটার পর একটা সারি চিরে। সাহাবীরাও সমস্ত শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করছিলেন। সেদিন যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল আবু আল-বখতারি ইবনে হিশামও। এই নামটা কি আমাদের মনে আছে?

একসময় মক্কায় মুসলিমদের উপর বয়কট চলাকালে পাঁচজন লোক একটা পরিকল্পনা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তারা রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, বয়কটের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল এবং মানুষের কাছ থেকে জোরালো সমর্থন আদায় করেছিল। আবু আল-বখতারি ছিল সেই পাঁচজনেরই একজন। তাই বয়কট শেষ হওয়ার পেছনে তারও একটি ভূমিকা ছিল। আর এখন সেও সেই যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল, কিন্তু মুসলিমদের পক্ষ হয়ে নয়। যুদ্ধ শুরুর আগেই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ঘোষণা করেছিলেন, কিছু ব্যক্তিকে আঘাত করা যাবে না। আবু আল-বখতারি তাদেরই একজন ছিল। কৃতজ্ঞতার আনুগত্যের কি দারুণ উদাহরণ, তাই না?

নবী (সাঃ) তাকে ঈমান আনার জন্য আরেকটি সুযোগ দিচ্ছিলেন। যুদ্ধের সময় আবু আল-বখতারি এক সাহাবীর মুখোমুখি হলো, মুজাজির ইবনে জিয়াদের। কিন্তু মুজাজির তার সাথে লড়াই এড়িয়ে গেলেন। কারণ নবীর নির্দেশ তিনি জানতেন। আবু আল-বখতারি এটা বুঝতে পারল না এবং জিজ্ঞেস করল, "তুমি আমার সাথে লড়ছো না কেন?" মুজাজির যখন তাকে বললেন, নবী (সাঃ) কি বলেছিলেন, আবু আল-বখতারি রেগে গিয়ে চিৎকার করল, "তিনি বললেও বলুন, আজ এখানে আমি তোমার সাথে লড়বই।" নবীর দয়া সে উপেক্ষা করল এবং মুজাজিরের উপর আক্রমণ করল। মুজাজির তাকে এড়াতে চেয়েছিলেন কিন্তু আর কোন উপায় ছিল না। তিনি প্রতিরোধ করলেন এবং শেষ পর্যন্ত আবু আল-বখতারি নিহত হল। এখন যুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এক মুঠো ধুলো তুলে নিলেন, শত্রু বাহিনীর দিকে ছুঁড়ে দিলেন এবং দোয়া করলেন, "ওদের মুখ কালো করে দিন, হে আল্লাহ। তাদের হৃদয়ে ভয় ঢেলে দিন এবং তাদের পা কাঁপিয়ে দিন।" সেই এক মুঠো ধুলো শত্রু বাহিনীর সবার চোখেই পৌঁছে গেল। তারা আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই ঘটনাটি কোরআনে বর্ণনা করেছেন। তুমি যখন নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তুমি নিক্ষেপ করোনি, বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন। কিছুক্ষণ পর অভূতপূর্ব এক ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করল। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আর কুরাইশরা সব দিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। তারপর দ্বিতীয় ঝড় এল, তারপর তৃতীয়টি। আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন এবং তাদের সাহায্যে ফেরেশতা পাঠালেন। কুরাইশরা হতবাক হয়ে গেল। কারণ তারা ভেবেছিল ওরা শুধু তিনশো জনের এক বাহিনীর মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ তাদের চোখে মুসলিম বাহিনী অনেক বড় আর অনেক বেশি শক্তিশালী মনে হল। যুদ্ধের আগে যে আবু জাহেল বলেছিল, "ওরা আমাদের জন্য একটা আঁচড় মাত্র।" এখন সে লুকানোর জায়গা খুঁজছিল। ইসলামের এই শত্রুর পেছনে সবাই লেগেছিল। কে আগে তাকে মারতে পারবে এ প্রতিযোগিতা চলছিল। আনসারদের দুই তরুণ ভাই আব্দুর রহমান ইবনে আউফের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, "আবু জাহেল কে?" ইবনে আউফ জিজ্ঞেস করলেন, "তাকে দিয়ে কি করবে?" "আমি শুনেছি সে নবীকে অপমান করেছে। আমি আল্লাহর নামে শপথ করেছি, যদি আমি তাকে দেখি আমি ওকে ছাড়ব না, যতক্ষণ না আমাদের কেউ মারা যায়।" সেই সাহসী দুই তরুণ ছিল মুয়াজ ও মুয়াইজ। ঠিক তখনই আব্দুর রহমান ইবনে আউফ আবু জাহেলকে দেখিয়ে দিলেন। "ওই দেখো, এই তোমাদের লোক।" দুজনেই একসাথে তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আবু জাহেল তাদের গুরুত্বই দিল না, বরং ব্যঙ্গ করে বলল, "বোকা ছেলেরা। মরতে এত আগ্রহ?" কিন্তু ব্যাপারটা তার ধারণারও বাইরে ছিল। মুয়াজ কাছে গিয়ে তার পায়ে আঘাত করল। এরপর আবু জাহেলের ছেলে ইকরাম ঝাঁপিয়ে পড়ে মুয়াজকে সজোরে আঘাত করল। ঠিক সেই মুহূর্তে মুয়াইজ আবু জাহেলের উপর আরেকটি আঘাত করল এবং তাকে মাটিতে ফেলে দিল। "উম্মতের ফিরাউনটা কি সত্যিই মারা গেছে?" দুজনেই ছুটে গেল নবীজির কাছে এবং বলল যে তারা আবু জাহেলকে হত্যা করেছে। রাসূলুল্লাহ নিশ্চিত হতে চাইলেন। তাই তিনি সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন মৃতদের মধ্যে আবু জাহেলকে খুঁজে দেখতে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদই তাকে খুঁজে পেলেন। আবু জাহেল তখনও মরেনি। সে শেষ নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। ইবনে মাসউদ তার ঘাড়ে পা রেখে বললেন, "হে আল্লাহর শত্রু, দেখেছ?

আল্লাহ তোমাকে অপমানিত করেছেন।" মৃত্যুর মুহূর্তেও আবু জাহেল ছিল দম্বে ভরা। সে জবাব দিল, "তুমি তো এক উঁচু জায়গায় পা রেখেছ, হে রাখালের ছেলে। বড় মানুষদের নিজের লোক আর গোত্রের হাতে মারা পড়া নতুন কিছু নয়। এখন আমাকে বলো..."আজ বিজয় কার? ইবনে মাসউদ বললেন, আল্লাহর আর তার রাসূলের। এই কথায় তাকে বাস্তবে হত্যা করার আগেই তিনি যেন তার অহংকারকে ভেতর থেকেই হত্যা করে দিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের কথা কি মনে আছে?

তিনি একসময় কাবার সামনে গিয়ে প্রথমবার প্রকাশ্যে সূরা আর-রহমান তিলাওয়াত করেছিলেন। কিন্তু মুশরিকরা সঙ্গে সঙ্গেই তার উপর হামলা করে প্রায় মেরেই ফেলেছিল। কিন্তু আজ চিত্রটা একেবারেই পাল্টে গেছে। তিনি মাটি থেকে আবু জাহেলের তলোয়ারটা তুলে নিলেন এবং শেষ আঘাত করলেন যেটা তার জীবনের শেষ পরিণতি ঘটালো। এখানে আরেকটি অবাক করার মতো বিষয় আছে। যুদ্ধ শুরুর আগে নবী (সাঃ) মক্কার নেতারা ঠিক কোথায় কোথায় নিহত হবে সেই স্থানগুলো দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আর আবু জাহেল ঠিক সেই স্থানেই মারা গেল যে জায়গাটা তিনি বর্ণনা করেছিলেন। আরেক নেতা উমাইয়া ইবনে খালাফও ঠিক সেভাবেই পড়ে গেল যে স্থানে নবী (সাঃ) ইশারা করেছিলেন। অন্যরাও ঠিক তাই। পরে ওমর (রাঃ) বলতেন, "আমি সেই সত্তার কসম করছি যিনি তাকে সত্য সহ পাঠিয়েছেন। তাদের একজনও সেই জায়গার বাইরে পড়েনি যেখানে আল্লাহর রাসূল নিজের হাত রেখেছিলেন।" আল্লাহর এক মুজিজা হিসেবে তিনি শুধু কে মরবে তা নয়, কোথায় মরবে সেটাও আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। মক্কার নেতারা একে একে নিহত হওয়ার পর কুরাইশ বাহিনী ভেঙে পড়ল। আর অবিশ্বাসীরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালালো। পেছনে ফিরেও আর তাকালো না। আসলে এই দৃশ্যটাই কোরআনে বছর কয়েক আগেই বলে দেওয়া হয়েছে। সূরা আল-কামারের চুয়াল্লিশ ও পঁয়তাল্লিশ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, অর্থাৎ, তারা কি বলে, আমরা তো এক শক্তিশালী বাহিনী এবং অবশ্যই বিজয়ী হব?

শীঘ্রই এই বড় দল পরাজিত হবে আর তারা সবাই পিঠ দেখিয়ে পালাবে। মক্কার দিনগুলোর কথা মনে করুন। অবিশ্বাসীদের তুলনায় মুসলিমদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। তারা সর্বদিক থেকে কষ্ট সহ্য করেছে। কখনো তিন বছর দীর্ঘ বয়কটের মধ্যে কখনো পাথর ছুড়ে মারা হয়েছে, প্রহার করা হয়েছে। কখনো বা ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ আর অপমান সহ্য করতে হয়েছে। এমন এক সময়ে যখন মুসলিমরা তখনও ভীষণ দুর্বল ছিল। এই আয়াতগুলোই আগাম জানিয়ে দিয়েছিল, শীঘ্রই তারা বিজয় অর্জন করবে শক্তিশালী শহর মক্কার উপর। এতে বলা হয়েছিল, ওরা পিঠ দেখিয়ে পালাবে। সবচেয়ে কঠিন সময়ে নাযিল হওয়া এই ভবিষ্যৎবাণী আবারও প্রমাণ করলো কোরআনের সত্যতা। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকেই নাযিল। আর আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন এবং তাদের বিজয় দান করলেন। টোয়ার্ডস ইটার্নিটিতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করেছি আপনাদের সামনে এই এআই ভিজ্যুয়ালাইজড সিরিজটি তুলে ধরতে। আর এখন ইনশাআল্লাহ আমরা একটি নতুন সিরিজ তৈরি করতে চাই। আমাদের সম্মানিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি গণের জীবন নিয়ে। মুসা, ইব্রাহিম, ইউসুফ, ইউনুস আলাইহি এমন নবীরা যাতে আপনি আর আপনার পরিবার তাদের জীবনী দেখতে পারেন টোয়ার্ডস ইটার্নিটির মানসম্মত প্রযোজনায়। কিন্তু নতুন সিরিজ তৈরি করতে বড় খরচেরও প্রয়োজন পড়ে। এআই, পেশাদার ভয়েস ওভার আর অন্যান্য সরঞ্জামাদি। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন আর আমরা একাতা বহন করতে পারছি না। আপনার সহায়তা ছাড়া এই প্রকল্প সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। আমাদের টিম মোট প্রয়োজনকে পঁচিশ ডলারের শেয়ারে ভাগ করেছে। তাই আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী এক বা একাধিক শেয়ার স্পন্সর করে সহায়তা করতে পারেন। ইনশাআল্লাহ। আপনি যদি এই সওয়াবের কাজে অংশ নিতে চান, টোয়ার্ডস ইটার্নিটিতে দান করুন এবং এই সোনালী সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। বদরের ময়দানে চোদ্দ জন মুসলিম শহীদ হয়েছিলেন। তারা ছিলেন সেই বীরপুরুষেরা যারা তাদের জীবনকে ইসলামের দুর্গ বানিয়েছিলেন এবং আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আর যারা বেঁচে ছিলেন তারা চিরকাল সম্মানিত হবেন আসহাবুল বদর হিসেবে। কারণ বদর কোনো সাধারণ যুদ্ধ ছিল না। মুসলিমদের জন্য এটা ছিল সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় যুদ্ধ। কারণ তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। আর তারা যদি এখানে পরাজিত হতো, তাদের সংখ্যা আরও কমে যেত। তাহলে কুরাইশরা মুসলিমদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করার দারুণ সুযোগ পেয়ে যেত। তাহলে শত্রুপক্ষের অবস্থা কেমন ছিল?

এই যুদ্ধে কুরাইশদের সত্তর জন নিহত হয়েছিল। আর আরও সত্তর জনকে বন্দী করা হয়েছিল। তাহলে তাদের সাথে কী করা হবে? দুটি শর্ত নির্ধারণ করা হলো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমাদের সামনে দুটি বিকল্প দিয়েছেন। তোমরা হয় মুক্তির জন্য মুক্তিপণ দেবে অথবা মদিনার দশ জন শিশুকে পড়তে লিখতে শেখাবে। এই শর্তেই কেবল তাদের মুক্তি দেওয়া হতো। এতে বোঝা যায় ইসলাম জ্ঞান ও শিক্ষাকে কতটা গুরুত্ব দেয়। বন্দীদের মধ্যে নবী (সাঃ) এর চাচা আব্বাসও ছিলেন। তিনি কুরাইশদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। অন্যদের মতো তাকেও হয় দশ জন শিশুকে পড়তে লিখতে শেখাতে হতো অথবা মুক্তিপণ দিতে হতো। কিন্তু তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বললেন, "আমার কাছে কোন টাকা নেই।" তখন আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞেস করলেন, "হে আব্বাস, তাহলে সোনার কি হলো?

মক্কা ছাড়ার দিন তুমি যে সোনা তোমার স্ত্রী উম্মুল ফাদলকে দিয়েছিলে। তুমি যখন তার হাতে তা দিলে তখন সেখানে আর কেউ ছিল না তোমাদের দুজন ছাড়া। আর তুমি তাকে বলেছিলে, আমি জানিনা এই সফরে আমার কি হবে। যদি কিছু ঘটে আর আমি ফিরে না আসি, এতটা সোনা তোমার জন্য, এতটা ফাদলের জন্য, এতটা আব্দুল্লাহর জন্য, এতটা উবাইদুল্লাহর জন্য, এতটা কুসামের জন্য। তাহলে এই সোনা কোথায়?" সত্যিই ঠিক যেমন নবী (সাঃ) বর্ণনা করেছিলেন, সবকিছু তেমনি ঘটেছিল। আব্বাস হতভম্ব হয়ে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আপনাকে এটা কে বলেছে? আল্লাহর কসম!

আমি আর উম্মুল ফাদল ছাড়া এ কথা আর কেউই জানত না।" নবী (সাঃ) জবাব দিলেন, "আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন।" সেই মুহূর্তের আগে আব্বাস গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কিনা তা স্পষ্ট ছিল না। তার ভেতরে এখনও সংশয় ছিল। কিন্তু সেদিন এই মুজিজা দেখে তিনি মুসলিম হয়ে গেলেন। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ। তিনি মক্কায় ফিরে গেলেন এবং ঈমান গোপন রাখলেন। সেখান থেকে তিনি গোপনে নবী (সাঃ) এর কাছে খবর পাঠাতেন এবং নিজের শহরে মুসলিমদের সহায়তা করতেন। আরেক বন্দী ছিল সুহাইল ইবনে আমর। সে ছিল শক্তিশালী বক্তা আর অতীতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কঠোর কথাবার্তা বলত। ওমর (রাঃ) সুহাইলকে খুব ভালো করে চিনতেন। সে ছিল কুরাইশদের নেতৃস্থানীয়দের একজন। ওমর তাকে বন্দীদের মধ্যে দেখে বললেন হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে অনুমতি দিন এই লোকটার সামনের দাঁতগুলো উপড়ে ফেলি, যাতে সে আর কখনো আপনার বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে। তার জোরালো বক্তব্য দিয়ে সে কুরাইশদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উস্কানিত। কিন্তু রহমতের নবী (সাঃ) এমন কথা বললেন যার প্রকৃত অর্থ বহু বছর পরে গিয়ে স্পষ্ট হবে। ওকে ছেড়ে দাও, হে ওমর। আশা করা যায়, একদিন সে এমন অবস্থানে থাকবে যা তোমাকে আনন্দিত করবে। পরে অবশ্য সোহাইল ইসলাম গ্রহণ করেছিল। আর যেদিন নবী (সাঃ) ইন্তেকাল করেন, যখন মক্কা শোকে ডুবে গিয়েছিল, সে এমন এক ভাষণ দেয় যা মানুষের হৃদয়কে শান্ত করে দিয়েছিল। সবাই যখন বিধ্বস্ত, মনে হচ্ছিল যেন পুরো দুনিয়াই ভেঙে পড়েছে। সোহাইলের সান্ত্বনামূলক কথায় জনতা শান্ত হয়ে যেত। আর সেদিনই ওমর (রাঃ) অবশেষে বুঝলেন নবী (সাঃ) কী বোঝাতে চেয়েছিলেন। এই বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমরা হয়ে উঠেছিল এমন এক শক্তি যাকে আর হেলাফেলা করার কোন সুযোগ নেই। মদিনায় যখন আনন্দ আর উৎসবের মাতম চলছিল, মক্কা ছিল শোকে হতবিহ্বল। সেই যুদ্ধক্ষেত্রে শহরটি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের হারিয়েছিল। আবু লাহাব আগেই অসুস্থ ছিল এবং বয়স্ক হয়ে গিয়েছিল। এই খবরের শোক তার সহ্য সীমা ছাড়িয়ে গেল। রাগে আর দুঃখে, অপমানে ভেঙে পড়ে সে এক সপ্তাহের মধ্যেই মারা গেল। তার অসুখ ছোঁয়াচে হতে পারে এই ভয়ে তার নিজের ছেলেরাও অনেকক্ষণ ধরে তার দেহের ধারে কাছে যায়নি। দুর্গন্ধ অসহ্য হয়ে উঠলে শেষে তারা লাশটা টেনে নিয়ে গিয়ে কোথাও কবর দিয়ে দিল। আর এভাবেই ইসলামের আরেক কঠোর শত্রুও বিদায় নিল। সবকিছুই মুসলিমদের অনুকূলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। চৌদ্দ জন শহীদকে হারিয়ে মুসলিমরা বদর থেকে ফিরে এল। কুরাইশদের উপর বিধ্বংসী বিজয়ে যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। আর তাই বাহিনী জুড়ে ছিল জয়ের আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ টিকলো না। হে রাসূলুল্লাহ, আপনার কন্যা রুকাইয়া ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহর রাসূল যখন পৌঁছালেন, তিনি এই হৃদয়বিদারক খবরটা পেলেন। তিনি গভীরভাবে বিচলিত হলেন। শেষ মুহূর্তে তিনি নিজের কন্যাকে দেখতেও পারেননি। একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেন, "যাদের উপর পরীক্ষাগুলো সবচেয়ে কঠিনভাবে আসে তাদের মধ্যে প্রথম নবীরা, তারপর যারা উত্তম, ধর্মীয় অঙ্গীকার অনুযায়ী।" এটা প্রথমবার ছিল না যে তিনি সন্তান হারানোর ব্যথা অনুভব করেছিলেন। এর আগে তিনি ইতিমধ্যেই তার দুই ছেলে কাসিম ও আব্দুল্লাহকে দাফন করেছিলেন। আর তারপর ছিল তার বড় কন্যা জয়নব। তিনি ইসলামের আগমনের পূর্বেই বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তার স্বামী আবু আল আস এখনো মুসলিম হননি। বদরের দিন আবু আল আসও বন্দীদের মধ্যে ছিল। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাকে মুক্তি দিয়েছিলেন এই শর্তে যে তিনি জয়নবকে মদিনায় পাঠাবেন। তখন তিনি গর্ভবতী ছিলেন। কিন্তু বদরের পর ঘৃণায় অন্ধ হয়ে মুশরিকরা তাকে ক্ষতি করতে চেয়েছিল। যেন তিনি বেরোতে না পারেন। তারা নিষ্ঠুরভাবে তার উটকে ভয় দেখাল। আর জয়নব একটি পাথরের উপর পড়ে গেলেন। তিনি তার সন্তানকে হারালেন। এই অবস্থাতেই তিনি মদিনায় পৌঁছালেন। আর তার পিতা তাকে গ্রহণ করলেন গভীর বেদনা নিয়ে। তিনি কি শোক করবেন নাতির মৃত্যুর জন্য নাকি কন্যার যন্ত্রণার জন্য?

জয়নবের এই গর্ভপাত তার স্বাস্থ্যে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। আর এর কয়েক বছর পর তিনিও ইন্তেকাল করেন। কেবলমাত্র একটি সন্তান হারানোর ব্যথা শুধু যারা ভোগ করেছে তারাই সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারে। তবু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এ ব্যথা একবার নয়, ছয়বার সহ্য করেছেন। আর তার পরীক্ষাগুলো শুধু প্রিয়জন হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আল্লাহ তাকে এই কঠিন পরীক্ষাগুলো পার করিয়েছেন একটি কারণেই। যদি তার জীবন দুঃখ বা কষ্টমুক্ত হতো, তিনি কিভাবে আমাদের জন্য প্রকৃত আদর্শ হতে পারতেন? তিনি কিভাবে পথ দেখাতেন জীবনের কঠিন বাস্তবতায় হিমশিম খাওয়া মানুষদের?

আর সমগ্র মানবজাতিকে চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তার উম্মতদের যারা পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে তারা সবাই তার সিরাতে সান্ত্বনা পেয়ে থাকে। প্রত্যেকে তার জীবনে নিজের ব্যথার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেত। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সবচেয়ে বিস্ময়কর গুণগুলোর একটি ছিল এতসব কষ্ট পেরিয়েও তিনি তবু হাসতে পারতেন। তিনি তার রবের কাছে হৃদয় খুলে দিতেন, নিজের দুশ্চিন্তা উজার করে বলতেন এবং তারই আশ্রয় চাইতেন। তিনি সবকিছুর ভেতরেই ভালোটা দেখতেন এবং সব সময় উজ্জ্বল দিকটাই দেখতেন। তিনি সৌন্দর্য আর আশার দৃষ্টিতে ভাবতেন। আর এভাবেই তিনি নিজের দুঃখগুলোকে পেছনে ফেলতে পেরেছিলেন। আল্লাহ তার দিকে যে নতুন নিয়ামত পাঠাতেন, তিনি সেগুলোর দিকেই মন দিতেন। আর সেগুলোতেই সান্ত্বনা খুঁজে পেতেন। সেই নিয়ামতগুলোর একটি ছিল তার প্রিয় কন্যা ফাতিমার বিয়ে। এতসব মানুষদের মধ্যে তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি আল্লাহর রাসূলের সাথে সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। আর তিনি বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন আলী (রাঃ) কে, যাকে নবী (সাঃ) নিজ হাতেই বড় করেছেন এবং শৈশব থেকেই শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর বরকতময় বংশধারা ফাতিমা ও আলির মাধ্যমে চলতে থাকবে। খুবই সহজ সরল সাতামাটা এক বিয়েতে কোন প্রদর্শন বা অপচয় ছাড়াই একটি শান্ত ভালোবাসাময় ঘর গড়ে উঠলো। আর সেই ঘর আল্লাহর রহমতে পেয়েছিল দুটি সুন্দর সন্তান, হাসান ও হোসাইনকে। নবী (সাঃ) তার নাতিদের প্রতি এমন ভালোবাসা ও মমতা দেখিয়েছিলেন যার কোন তুলনা ছিল না। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) খুতবা দিচ্ছিলেন। আর তখন তিনি দেখলেন হাসান ও হোসাইন সবার সামনে হোচট খেতে খেতে আসছে। তিনি মিম্বর থেকে নেমে এলেন। তাদের তুলে নিলেন। তারপর আবার উঠলেন। সালাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সিজদায় থাকা অবস্থায় হাসান তার পিঠে উঠে পড়ল। আর তিনি সিজদায় আরও কিছুটা বেশি সময় থাকলেন, শুধু যাতে তার খেলায় ব্যঘাত না হয়। তিনি বলতেন, "ওরা এই দুনিয়ার আমার দুই সুগন্ধি ফুল।" তিনি তাদের মাথা আর ঘাড়ে চুমু দিতেন, তাদের গন্ধ শুঁকতেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরতেন। এমন স্নেহ, বিশেষ করে সে সময়ে খুবই বিরল ছিল। একবার এক ব্যক্তি নবীকে হাসানকে চুমু খেতে দেখে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি আপনার সন্তানদের চুমু দেন?

আমার দশটি সন্তান আছে। আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু দেইনি।" আল্লাহর রাসূল (সাঃ) জবাব দিলেন যে, "অন্যদের প্রতি দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হবে না। "তিনি শুধু নাতিদের প্রতিই মমতা দেখাননি, তিনি সব শিশুদের প্রতিই তা দেখিয়েছেন। নবী যখন মদিনায় হিজরত করলেন, আনাস ইবনে মালিক নামের বারো বছরের এক ছেলেকে, তাকে দৈনন্দিন কাজে সহায়তার জন্য আনা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ তার মধ্যে এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিলেন, এত যত্ন ও দয়ার সাথে তাকে গড়ে তুলেছিলেন যে, আনাস হয়ে উঠেছিল অসাধারণ এক মানুষ। তার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ আরেকটি সুন্দর উদাহরণ দেখিয়েছেন, একটি শিশুকে কিভাবে বড় করতে হয়। পরে আনাস (রাঃ) বলতেন, নবী (সাঃ) আমাকে কখনো কঠোর কোনো কথা বলেননি। আর আমি কিছু করলে তিনি কখনো বলেননি, "তুমি এটা কেন করলে?" বা আমি কিছু না করলে কখনোই বলতেন না, "তুমি এটা করলে না কেন?" তিনি নবীজির খেদমত করেছেন এবং দশ বছর তার তত্ত্বাবধানে থেকেছেন। তারপর আনাস হয়ে উঠেছিলেন সবচেয়ে জ্ঞানী ও সম্মানিত সাহাবীদের একজন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার কন্যা ফাতিমাকে আলী (রাঃ)র সাথে বিয়ে দিলেন, যিনি বিরত, গভীর জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার জন্য পরিচিত ও প্রশংসিত ছিলেন। এবং তিনি তার কন্যা উম্মে কুলসুমকে ওসমান (রাঃ) এর সাথে বিয়ে দিলেন, যাকে তিনি বলতেন, "জান্নাতে আমার সঙ্গী।" ওসমান এতটাই লজ্জাশীল ছিলেন যে এমনকি ফেরেশতারাও তার লজ্জাশীলতাকে শ্রদ্ধা করতো এবং তার সামনে সংকোচ বোধ করতো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত এক সাহাবী এবং তার ছিল এক অনন্য মর্যাদা। তিনি নবী (সাঃ) এর জামাতা হয়েছেন দুইবার। অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল তার প্রিয় দুই ফুলকে দুনিয়ার দুই শ্রেষ্ঠতম পুরুষের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নবী (সাঃ) নিজে কি করলেন?

খাদিজা (রাঃ) এর পর তিনি কি আবার বিয়ে করেছিলেন?

নবী (সাঃ) যখন মদিনায় হিজরত করলেন, তিনি দেখলেন মুসলিম সমাজ বড় হচ্ছে এবং দ্রুতই বিস্তৃত হচ্ছে। এবং অবশ্যই এটা শুধু পুরুষদের দিয়েই গঠিত ছিল না। সাহাবীদের মধ্যে অনেক নারীও ছিলেন। তারাও ধর্ম শিখতে এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করতে চাইতেন। কিন্তু নবীজির পক্ষে নারীদের সাথে বারবার ও ঘন ঘন ব্যক্তিগতভাবে মেলামেশা করা উপযুক্ত ছিল না। আরও একটি বিষয় ছিল তারা সবকিছু মুক্তভাবে জিজ্ঞেসও করতে পারতেন না। আসলে তিনি তো একজন পুরুষ। আর কিছু বিষয় আছে যেগুলো জিজ্ঞেস করতে তারা লজ্জা পেতেন। তাই তাদের দরকার ছিল এমন নারীদের যাদের কাছ থেকে তারা শিখতে পারবেন। আর সেই নারীরা হবেন নবী (সাঃ) এর স্ত্রীগণ, যারা উম্মতের নারীদের জন্য শিক্ষিকার ভূমিকা পালন করবেন। তারা নবীজির স্ত্রীদের জিজ্ঞেস করতে পারতেন যেসব বিষয়ে তারা নবীজিকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারতেন না। এবং চাইলে যেকোনো সময় তাদের কাছ থেকে শিখতে পারতেন। সাহাবীরা তাদের দিন কাটাতেন রাসূলুল্লাহর কথা ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। কিন্তু তিনি ঘরে কিভাবে থাকতেন, তার পারিবারিক জীবন তো তারা দেখতে পেতেন না। তার জীবনের সেই অংশগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতেন তার স্ত্রীগণই। এ কারণেই মক্কায় থাকাকালে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রায় পঁচিশ বছর মাত্র একজন স্ত্রীকে নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। কিন্তু মদিনায় হিজরতের পর তিনি একাধিক স্ত্রী নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। দুঃখজনকভাবে ইসলামের কিছু শত্রু তার বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়াতে চেয়েছিল। বলেছিল তিনি নাকি কামনার দ্বারা চালিত ছিলেন, মা আজাল্লাহ। তার নবুয়ত অস্বীকার করার আর কোন পথ না পেয়ে তারা এমন নিচু অপবাদে নেমে পড়েছিল। কিন্তু তার জীবনযাপন এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়। পঁচিশ বছর বয়সে যখন গোত্রের অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রশংসিত, তিনি চল্লিশ বছর বয়সে এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন, খাদিজা (রাঃ) তিনি চাইলে তবে এমন কেউ কি ছিল যে তাকে নিজের মেয়েকে বিয়ে দিতে অস্বীকার করতো?

এবং পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি আর কাউকে বিয়ে করেননি। অথচ কামনা সাধারণত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রবল থাকে পনেরো থেকে চল্লিশ বছরের মধ্যে। আর ঠিক সেই সময়েই তিনি একজন স্ত্রীর সাথেই ছিলেন এবং পবিত্রতা ও নৈতিকতার এক নিখুঁত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। শুধু পঞ্চাশ বছরের পরেই তিনি একাধিক স্ত্রী নিয়ে জীবন শুরু করেন। আর এর কারণ ছিল স্পষ্টভাবে দ্বীনি শিক্ষা। উম্মতের অর্ধেক ছিলেন নারী, আর বাকি অর্ধেক পুরুষ, যাদের গড়ে তোলেন নারীরাই। তাই মুসলিম নারীদের শিক্ষা দেওয়া ছিল অত্যন্ত জরুরি। এই কারণেই নবী (সাঃ) এর প্রয়োজন ছিল ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতা ও গুণাবলী সম্পন্ন স্ত্রীদের। আসলে মূলত ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। কারণ আমাদের দ্বীনের প্রায় অর্ধেকই মানুষকে শিখিয়েছেন নবী (সাঃ) এর স্ত্রীরা। আর তাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন, তিনি ছিলেন আমাদের মা আয়েশা (রাঃ)। তিনি ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমতী এবং সক্ষম একজন নারী। সাহাবীরা যখন কোন দ্বীনি বিষয়ে সমাধান করতে পারতেন না বা বুঝতে পারতেন না, তারা পর্দার আড়াল থেকে তার কাছে যেতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন। উদাহরণ হিসেবে আবু মুসা আল আশআরি, যিনি কোরআন ও হাদিসের জ্ঞানে পরিচিত এক সাহাবী, একবার বলেছিলেন, "আমরা সাহাবীরা যখনই কোন বিষয়ে ব্যাখ্যা দরকার হতো, তখন আয়েশা (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করতাম। আমরা দেখতাম সে বিষয়ে তার জ্ঞান আছে।" ইসলামকে আরও গভীরভাবে জানার জন্য তিনি তার যৌবন এবং সব সামর্থ্য উৎসর্গ করেছিলেন। এভাবেই নবী (সাঃ) এর ওফাতের পরও ছেচল্লিশ বছর ধরে জ্ঞানের এক উৎস হয়েছিলেন, যার কাছে মানুষ সবসময় প্রশ্ন করে উত্তর নিয়ে ফিরতে পারতো। আসলে এটা আমাদের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমাদের দ্বীনের দুটি প্রধান উৎস আছে। একটি হলো কোরআন, আর অন্যটি হলো নবী (সাঃ) এর জীবন, তার পথ, সংক্ষেপে তার সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল জীবিত থাকাকালে আপনি যদি কিছু জানতে চাইতেন, আপনি সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন। কিন্তু তার ওফাতের পর কি হবে?

আপনাকে ফিরতে হবে তাদের কাছে যারা তাকে সবচেয়ে কাছ থেকে চিনতেন, যারা ছিলেন তার একেবারে নিকটতম, তার স্ত্রীগণ। যারা তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কাছ থেকে দেখেছেন। ভাবুন তো, যদি নবী (সাঃ) এর সব স্ত্রী তারপর কয়েক বছরের মধ্যেই ইন্তেকাল করতেন, তাহলে কি বিশাল শূন্যতা তৈরি হতো না?

আরেকটা আশ্চর্য বিষয় হলো, আমরা আগেও বলেছি, নবী (সাঃ) এর একাধিক স্ত্রী থাকার কারণে কিছু মানুষ তাকে কামনার অপবাদ দেয়। কিন্তু এসব মানুষ তার সব বিয়েকে গভীরভাবে লক্ষ্য করেনি। তিনি বিয়ে করেছেন চল্লিশ ও পঞ্চাশ বছরের নারীদের, যারা ছিলেন সন্তানের মা, বিধবা নারী। এই বিয়েগুলোর মাধ্যমে তিনি বারো জন এতিম শিশুর জন্য একজন পিতৃসুলভ আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন এবং তাদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আজকের দিনে মানুষ একজন সন্তানের বিধবা মাকে বিয়ে করতেও দ্বিধা করে। আর করলেও সে কতটা ভালোভাবে পিতার ভূমিকা পালন করে এটা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। অথচ সেই বারোটি শিশুই নবী (সাঃ) কে শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতায় দেখতো। এত বড় একটি দায়িত্ব যখন তিনি কাঁধে নিয়েছিলেন, তাহলে তার বিয়েগুলো কি কামনার সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কিত হতে পারে?

এই সিদ্ধান্ত আমি আপনার উপরই ছেড়ে দিলাম। তাহলে এইসব বিয়েতে নবী (সাঃ) এর স্ত্রীদের সাথে তার সম্পর্ক কেমন ছিল? সাধারণভাবে একজন নেতা বা শাসকের তো দশটা থেকে একশটা কাজ সামলাতে হয়, তাই না?

এমনকি শত শত বিষয়ও। আর অনেক ক্ষেত্রেই তার সময় কম পড়ে যায়। বিশেষ করে নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে। প্রায়ই তাকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। কিন্তু আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর ছিল সময় ব্যবস্থাপনার অসাধারণ দক্ষতা। ভাবুন তোমক্কার সাথে লাগাতার রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল এবং সে বিষয়ে তাকে সবসময় প্রস্তুত ও সতর্ক থাকতে হতো। একই সময়ে মদিনার ভেতরেও অনেক রাজনৈতিক শক্তি অশান্তি তৈরির চেষ্টা করছিল। বিশেষ করে মুনাফিকদের তৎপরতা এবং ইহুদিদের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো। পরের পর্বগুলোতে আমরা এগুলো আরও স্পষ্টভাবে দেখব। এসব চ্যালেঞ্জও তাকে সামলাতে হতো। আর একই সাথে তাকে অন্যান্য আরব গোত্রগুলোর দিকেও নজর রাখতে হতো এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিও। এত কিছুর পরও তাকে দিনে পাঁচবার মসজিদে নামাজের ইমামতি করতে হতো। আর একই সাথে দশ বারোজন সাহাবীর প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো, তাদের শিক্ষা দিতে হতো। যুদ্ধের সময় তাকে বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে হতো। প্রতিটি রাতেই তিনি ঘুম ভেঙে ইবাদতে দাঁড়াতেন। তিনি এমন এক ইবাদতময় জীবন কাটিয়েছেন যা চোদ্দশ বছরে তার উম্মতদের কেউই অতিক্রম করতে পারেনি। বিশ্বাস করুন সিরাতের পাতায় পাতায় যেতে যেতে এই তালিকা আরও দীর্ঘ হতে থাকে। এইসব দায়িত্ব তাকে সফলভাবেই পালন করতে হতো এবং তিনি সত্যিই তা করেছেন। এত ব্যস্ত জীবনে আপনি মনে করেন একজন মানুষ স্ত্রীদের জন্য কতটা সময় আর মনোযোগ দিতে পারে?

তবু তিনি তাদের প্রতি এমন যত্ন ও মনোযোগ দেখিয়েছেন যে চোদ্দশ বছর পরেও কেউ সেই স্তরে পৌঁছাতে পারেনি। দায়িত্বের এই অন্তহীন তালিকার মাঝেও তিনি কিভাবে সময় বের করতেন কখনো কখনো আয়েশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করার? সাফিয়া যখন উঠে উঠতে চাচ্ছিলেন, আল্লাহর রাসূল নিচু হয়ে তার হাঁটু এগিয়ে দিয়েছিলেন যেন তিনি পা রাখতে পারেন। এত দায়িত্বের বোঝা নিয়েও তিনি কিভাবে এমন সতর্ক ও কোমল আচরণ দেখাতেন ভাবতে পারেন? একবার আমাদের মা আয়েশা নবী (সাঃ) এর উপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং উচ্চস্বরে কথা বলে ফেলেছিলেন। তার বাবা আবু বকর (রাঃ) বাইরে থেকে এটা শুনে রেগে গেলেন এবং তাকে মারতে উদ্যত হলেন। তো তখন নবী (সাঃ) কী করলেন?

তিনি তাকে থামালেন। তাকে চলে যেতে বললেন। তারপর আয়েশা (রাঃ) কে মজা করে বললেন, দেখলে তো আমি কিভাবে তোমাকে ওই লোকটার হাত থেকে বাঁচালাম। তিনি এমন ধৈর্য আর সদয়তা দেখিয়েছেন যা অন্য কোন মানুষের মধ্যে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। রাগ করা তো দূরের কথা, হাত তোলার বদলে তিনি উল্টো মজা করেছেন। একদিকে আছে এমন কিছু পুরুষ যারা তাদের স্ত্রীদের মতামতই নেয় না, এমনকি তাদের সম্পর্কিত বিষয়েও নয়। অন্যদিকে আমরা দেখি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কে যিনি কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতেন। তিনি স্ত্রীদের বলতেন, তিনি তাদের ভালোবাসেন। তিনি তাদের ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করতেন, তাদের কদর করতেন এবং তাদেরকে মূল্যবান বলে অনুভব করাতেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী আসার সময় জিব্রাইলের সাথে কথা বলার সময় যখন ফেরেশতারা সম্মান দেখিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন, তিনি কিভাবে তবু তার সব স্ত্রীদের প্রতি এতটা কোমল হতে পারতেন?

উত্তরটা খুবই সহজ। কারণ তিনি আল্লাহ প্রেরিত সর্বোত্তম আদর্শ। ইতিহাসে যাদের নামডাক আছে তাদের প্রত্যেকেই সাধারণত উদাহরণ হয় নিজের দু তিনটি গুণে। কিন্তু নবী (সাঃ) ছিলেন প্রতিটি গুণেই একটি পরিপূর্ণ আদর্শ। তার চরিত্রে, তার আচরণে সবকিছুতেই। আর আপনি কি জানেন সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টা কি? যেসব গুণ খুব কমই একসাথে অতি উচ্চমাত্রায় পাওয়া যায়, সেসব গুণেও তিনি ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শ। এর মানে কি?

ধরুন, কেউ যদি খুব দয়ালু হয় তাহলে অনেক সময় তার ন্যায়বোধে দুর্বলতা দেখা যায়। অথবা কারো ন্যায়বোধ যদি খুব শক্ত হয় তাহলে তার মধ্যে দয়ার অভাব দেখা যায়। কিন্তু তার মধ্যে এই দুটো গুণই একসাথে সর্বোচ্চ মাত্রায় ছিল। কেউ যদি খুব সাহসী ও দৃঢ়চেতা হয় তাহলে প্রয়োজনের সময়েও তার শান্ত ও কোমল থাকা সেটা সাধারণত আশা করা যায় না। আর কেউ যদি শান্ত ও নম্র স্বভাবের হয় তাহলে সময় এলে তার দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসাও সাধারণত দেখা যায় না। কিন্তু আবারও নবী (সাঃ) এই দুই দিকেই সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। একইভাবে কেউ যদি সবসময় দ্রুত পদক্ষেপ নেয় তাহলে তার সতর্ক হওয়া সেটা সাধারণত আশা করা যায় না। আর কেউ যদি খুব সতর্ক হয় তাহলে তাকে খুব দ্রুত বা দুঃসাহসী পদক্ষেপ নিতে খুব কমই দেখা যায়। কিন্তু আবারও রাসূলুল্লাহ এই দুই দিকেই ছিলেন সর্বাগ্রে। তিনি ছিলেন শান্তির মানুষ। অথচ একই সাথে আল্লাহর জন্য অন্যায়ের প্রতি ছিল তার সবচেয়ে তীব্র ঘৃণা। খরচে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। কিন্তু দানের বেলায় তিনি ছিলেন সীমাহীন উদার। এভাবেই আরও অনেক অনেক কিছু। বেদিউজ্জামান সাইদ নূরী যখন এই তুলনা করেছেন, তিনি আল্লাহর রাসূলের এই দিকটাকে বর্ণনা করেছেন মুজিজার ও মুজিজা বলে। এখন আমরা আল্লাহর রাসূলের পারিবারিক জীবন এবং তার চরিত্রের দিকে একবার তাকালাম। এখন চলুন বদরের পর কী ঘটেছিল সেদিকে যাই। আপনার মনে আছে কি নবী (সাঃ) এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল মদিনার মানুষদের মধ্যে বিভাজন এড়িয়ে চলা। আর এটাও বলা হয়েছিল ইহুদি গোত্রগুলো এই বিষয়ে বড় সমস্যা করবে। তাই সম্ভাব্য সংঘাত ঠেকাতে এবং শান্তিতে একসাথে থাকতে নবী (সাঃ) হিজরতের পর একটি চুক্তি তৈরি করেছিলেন। আর তারা তাতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু বদরের পর মদিনার ইহুদি গোত্রগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন বাড়তে শুরু করল। মুসলিমদের বিজয়ে তাদের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা হিংসার বিদ্বেষকে আরও বাড়িয়ে দিল। তারা এমন কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল যাতে নবী (সাঃ) কে অপমান করা হয় এবং মুসলিমদেরকেও। তারা আরও নানাভাবে উস্কানি দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তারপর তারা এমন এক কাজ করল যেটা সীমা ছাড়িয়ে গেল। একদিন একজন মুসলিমের স্ত্রী একটি গয়নার দোকানে ঢুকলো, যেটা বনু কাইনুকা গোত্রের এক ইহুদি চালাতো। লজ্জাশীলতার কারণে তিনি মুখ ঢেকে রেখেছিলেন। তিনি সেখানে বসে থাকতেই কিছু ইহুদি তাকে উত্ত্যক্ত করতে লাগলো এবং তার মুখ উন্মোচনের চেষ্টা করলো। তিনি তাতে অসম্মতি জানালে তাদের একজন পেছন থেকে এসে কাঁটা দিয়ে তার পোশাকের এক অংশকে অন্য অংশের সাথে আটকিয়ে দিল। তিনি দাঁড়াতেই হঠাৎ তার কাপড় খুলে গেল। আর এই জঘন্য কাজ দেখে ইহুদিরা হাসিতে ফেটে পড়ল। মুসলিম নারীটি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলো। তার চিৎকার শুনে একজন সাহাবী দোকানে ছুটে এলেন। রাগে ফেটে পড়ে তিনি ওই ইহুদির গলা চেপে ধরলেন। তাকে মেরেই ফেললেন। এরপর অন্য ইহুদিরা সাহাবীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে প্রহার করতে করতে হত্যা করলো। তিনি শহীদ হলেন সেখানেই। এই ঘটনার সংবাদ দ্রুত পৌঁছে গেল আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর কাছে। বিলম্ব না করে রাসূলুল্লাহ বনু কাইনুকাকে একত্র করলেন এবং তাদের সাথে কথা বললেন। অশান্তি সৃষ্টি এবং তাদের অহংকারপূর্ণ অসম্মানজনক আচরণ বন্ধ করতে। তারপর তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানালেন। কিন্তু এসব শুনে নিজেকে শুধরে নেওয়ার বদলে তারা অহংকার ভরে জবাব দিল, "হে মুহাম্মদ, যারা যুদ্ধ সম্পর্কে কিছুই জানে না তাদের উপর তোমার বিজয়ে তুমি ধোঁকায় পড়ো না। আমরা তাদের মতন নই। আমরা দক্ষ যোদ্ধা। তুমি যদি আমাদের মুখোমুখি হতে সাহস করো তাহলে বুঝবে আমরা কেমন লোক।" এই প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের পর তারা চলে গেলতারা মদিনার চুক্তি ভঙ্গ করেছিল। নবী (সাঃ) তৎক্ষণাৎ তার সাহাবীদের একত্র করলেন এবং তাদের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন। তিনি তাদের চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে যাচ্ছিলেন। সিরাতের পাতায় আমরা এই একই মনোভাব বহুবার দেখব। যখনই কেউ মুসলিমদের ভয় দেখাতে অথবা চ্যালেঞ্জ করতে চেষ্টা করেছে, শত্রু যত বড়ই হোক না কেন, এমনকি তাদের যদি এক লক্ষ সৈন্যও থাকত, নবী (সাঃ) কখনোই পিছু হটতেন না। তিনি নির্ভয়ে তাদের মুখোমুখি হতেন এবং মুসলিমদের সাহস ও শক্তি প্রদর্শন করতেন। তিনি প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন এবং বনু কাইনুকার দিকে অগ্রসর হলেন। এটি ছিল ইহুদিদের একটি শক্তিশালী দুর্গ। নবী (সাঃ) ওয়াসাল্লাম আসছেন এই খবর পেয়ে তারা সেই দুর্গে আশ্রয় নিল। বনু কাইনুকার প্রায় সাতশ যোদ্ধা ছিল। যাদের মধ্যে তিনশ জন বর্ম পরিহিত ছিল, আর তারা সিদ্ধান্ত নিল দুর্গের ভেতর থেকেই আত্মরক্ষা করবে। প্রায় পনেরো দিন তারা সেখানেই অবস্থান করল। বাইরে বেরোতে পারছিল না। অবশেষে যখন তারা বুঝল, তার আর মুসলিমদের মোকাবেলা করতে পারবে না, ভয় তাদের গ্রাস করল এবং তারা আত্মসমর্পণে সম্মত হল। যুদ্ধ ছাড়াই তারা হার মানল। যদিও নবী (সাঃ) ওয়াসাল্লাম তাদের মৃত্যুদণ্ড দিতে পারতেন, তিনি তাদের প্রাণ রক্ষা করলেন এবং মদিনা ছাড়ার জন্য তিন দিন সময় দিলেন। এভাবেই চুক্তি ভঙ্গের শাস্তি হিসেবে বনু কাইনুকা গোত্রকে মদিনা থেকে নির্বাসিত করা হল। মদিনার এসব ঘটনার সময়ই মক্কার পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। বদরে কুরাইশদের শীর্ষ নেতারা নিহত হওয়ার পর আবু সুফিয়ান তাদের নতুন নেতা হল। কুরাইশা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিল। পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করে আবু সুফিয়ান দুইশ অশ্বারোহী নিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হল। সেখানে কিছু ইহুদির কাছ থেকে সে মুসলিমদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করল এবং মদিনার নিকটবর্তী উরাইদ নামক স্থানে দুটি ঘর ও কয়েকটি খেজুর বাগান পুড়িয়ে দিল এবং দুজন মুসলিমকে শহীদ করল। কিন্তু যখন সে শুনল দুইশ মুসলিম তার দিকে এগিয়ে আসছে, সে দ্রুত পালিয়ে গেল। এই কাজের মাধ্যমে আবু সুফিয়ান ভাবল সে প্রতিশোধ নিয়ে ফেলেছে। আর অবশ্যই কুরাইশা কিন্তু এতেই থামেনি। বদরে যারা নিজেদের প্রয়োজন হারিয়েছিল, তারা এখনও প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিল। অবশেষে তারা যে মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল তা এসে গেল। তাদের বাণিজ্য কাফেলা ফিরে এল। তারা লাভের অর্থ একত্র করল এবং প্রতিবেশী গোত্রগুলোর কাছে সাহায্য চাইল। আর তারপর অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তাদের আক্রমণের পরিকল্পনা শুরু করল। প্রতিশোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় কুরাইশা তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী জড়ো করল। একটি ভয়াবহ যুদ্ধ সামনে অপেক্ষা করছিল। এবার কী ঘটবে?

কে জিতবে? উহুদের যুদ্ধ, যাকে নবী (সাঃ) বলেছিলেন, "আমার জীবনের দুইটা কঠিন দিনের একটি।" তা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে পরবর্তী পর্বে। সাথেই থাকুন।