ইসলাম কী অবিশ্বাসীদের হ#ত্যা করতে বলে? - জিহাদ, শরি'আ এবং দাসত্বের প্রকৃত বাস্তবতা
প্রকাশের তারিখ
ইসলাম যদি মানুষকে মর্যাদা দেয়, তাহলে দাসত্বের ধারণা কিভাবে এলো? প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে যুদ্ধ ছিল, এবং ইসলামেও ‘জিহাদ’ নামে একটি বিষয় আছে। যদি কেউ বলে, ‘এসব কি বর্বরতা আর সহিংসতা নয়?’ তাকে আপনি কী বলবেন? যদি ইসলাম অমুসলিমদের হত্যা করতে উৎসাহিত করত, শুধু তারা অমুসলিম হওয়ার কারণে, তাহলে মুসলমানরা কিভাবে প্রায় এক হাজার বছর ভারত শাসন করেছে? তখন তারা ইচ্ছা করলেই সব হিন্দুকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারত, তাই না?
শরিয়াহ মানে হলো আইন। তো ইসলামি শরিয়াহ যেমন আছে, ফরাসি শরিয়াহ, অ্যাঙ্গলো-স্যাক্সন শরিয়াহও আছে। সব শরিয়াহই ভালো আর সুন্দর। কিন্তু ইসলামি শরিয়াহ ও বাকিসব শরিয়াহ মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। আর তা হলো, এটা পরিপূর্ণ। আব্রাহাম লিংকন এক সাহসী নেতা। একটি বিল স্বাক্ষর করেছিলেন, যার মাধ্যমে এক দিনেই ৪০ লাখ দাসকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে ৫ লাখ মানুষ মারা যায় আর ৫ লাখ মানুষ অক্ষম হয়ে যায়। ইসলাম মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার ভালোভাসা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ইসলাম কিভাবে এটা করেছে?
খ্রিষ্টধর্ম মূলত ভালোবাসা ও শান্তির বার্তা দেয়। ম্যাথিউ ৫:৩৯-এ বলা হয়েছে, চোখের বদলে চোখ নেওয়ার পরিবর্তে, বরং কেউ চড় মারলে অন্য গালও বাড়িয়ে দাও। অন্যদিকে ইসলাম এমন একটি শরিয়াহ ব্যবস্থা, যেখানে কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে। একজন খ্রিষ্টান, যে বলে ‘ঈশ্বর প্রেম’, তাহলে সে কেন ইসলাম গ্রহণ করবে? আমি মাঝে মাঝে একটা উদাহরণ দিই। আমি উইসকনসিনের মার্শফিল্ড গিয়েছিলাম। সেখানে একটি মসজিদ খোলা ছিল। একজন নারী আমাকে ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলেন, ‘আচ্ছা ড.
সাবিল, আপনি বললেন ইসলাম খুব সুন্দর। তাহলে আপনাদের শরিয়াহর শাস্তিগুলো এত কঠোর কেন?’ আমি তাকে একটি উদাহরণ দিই। এই দেশে প্রতিবছর রিপোর্টকৃত ধর্ষণের সংখ্যা ৯০ হাজার। এগুলো কেবল রিপোর্ট করা সংখ্যাই। যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে একজন ধর্ষক গড়ে মাত্র ৫ থেকে ৭ বছর জেল খাটে। যখন সে মুক্ত হয়, সমাজ তখন অরক্ষিত হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী নারী চিন্তায় থাকে, সে আবারও আমাকে আক্রমণ করতে পারে। তাহলে সমাজের ন্যায্যতা, শান্তি আর ঐ নারীর নিরাপত্তা কোথায়? এই অপরাধী বা যাকে আমারা বলছি এই ধর্ষক যখন জেলে থাকে, তখন কে তাকে খাওয়াবে? কে তার থাকার ব্যবস্থা করবে? কে তাকে জেলের সব সুযোগ-সুবিধা দেবে? নিউ ইয়র্ক স্টেটে, বছরে প্রতি বন্দির পেছনে প্রায় ৯০ হাজার ডলার খরচ হয়। ৯০ হাজার!
আমার ট্যাক্সের টাকা। মানুষের পরিশ্রমের টাকা। ইসলাম বলে, শাস্তি হতে হবে ন্যায্য। যদি সেই শাস্তি জনসমক্ষে কার্যকর হয়, তাহলে সমাজের অন্যরাও দেখবে— এই অপরাধীর শাস্তি হচ্ছে, আর কোনো সম্ভাব্য ধর্ষক, খুনি কিংবা চোর, যদি তার মনে এমন কিছু করার চিন্তা থাকে, সে ভাববে, আমি যদি এমন কিছু করি, তাহলে আমার অবস্থাও এমনই হবে। সুতরাং ইসলামের শাস্তি হলো একটি সতর্কবার্তা। এগুলো কাজ করে। যদি আপনি তুলনা করেন, যেকোনো ইসলামী বা মুসলিম দেশে আমার বলা উচিৎ ধর্ষণ অনেক কম হয়। যেসব দেশে এই ধরনের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেই সেসব দেশের তুলনায় হত্যা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, সহিংসতা অনেক কম। এটাই প্রথম পয়েন্ট। দ্বিতীয়টি হচ্ছে— ধরুন, রাত ২টায় একজন ডাকাত আপনার দরজায় কড়া নাড়ল, তারপর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। আপনি বলবেন না, ‘স্বাগতম। এই ঘরটা আপনার। আপনি এই ঘরে থাকুন, আমি বাকি ঘরগুলোও দেখিয়ে দিচ্ছি।’ এটাই ‘আরেক গাল বাড়িয়ে দেওয়া’। কিন্তু এটা তো বাস্তবসম্মত না। এই দুনিয়া এভাবে চলে না। ভাবুন তো, সবাই যদি গাল বাড়িয়ে দিত, তাহলে পুরো পৃথিবী ডাকাত, চোর, ধর্ষক আর হামলাকারীতে ভরে যেত। এটা বাস্তবসম্মত নয়। কেউই এমনটা করে না। আমাদের দেশ, মানে আমি এই দেশটার কথাই বলছি, এই দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ৮০০ বিলিয়ন ডলার। ভাবুন তো, যদি আমেরিকা ‘আরেক গাল বাড়িয়ে দেওয়া’র নীতি মেনে চলত, তাহলে চীন ও রাশিয়া দেশটাকে গ্রাস করে ফেলত। বিশ্বাস করুন, তারা পুরো আমেরিকাকে দখল করে নিত। তখন আর এটা আমেরিকা থাকত না। কোনো পরিবার ‘গাল বাড়িয়ে দেওয়া’ চর্চা করে না। কোনো পুরুষের উচিত না, এই নীতি মেনে চলা। কারণ এটা বাস্তবসম্মত নয়। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এতে সব ভালো মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। শরিয়াহ মানে হলো আইন। তো ইসলামি শরিয়াহ যেমন আছে, ফরাসি শরিয়াহ, অ্যাঙ্গলো-স্যাক্সন শরিয়াহও আছে। সব ধরনের শরিয়াহই ভালো আর সুন্দর। সবই মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু ইসলামি শরিয়াহ আর বাকি সব শরিয়াহর মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। আর তা হলো, এটা পরিপূর্ণ। এটা নিখুঁত। কেন?
কারণ প্রতিটি আইনই তার প্রণেতার বৈশিষ্ট্য বহন করে। যদি শরিয়াহ কোনো মানুষের তৈরি হয়, তাহলে তা সুন্দর হতে পারে, কারণ সেই মানুষটিও সুন্দর হতে পারে। কিন্তু শরিয়াহ আল্লাহর দেওয়া শরিয়াহ পরিপূর্ণ। এতে কোনো ত্রুটি নেই, কোনো ভুল নেই। অনেক সময় মানুষ ভাবে, তারা নাকি আল্লাহর চেয়েও বেশি জ্ঞানী। তখন তারা নিজের মতো আইন বানায়, কিন্তু পরে গিয়ে সেটা ব্যর্থ হয়। তো আল্লাহ যা বলেছেন, তার চেয়ে উত্তম কিছুই নেই। এটা আমার ব্যক্তিগত মত জানেন তো, আমি যদি মুসলিম না হতাম, আর ইসলাম সম্পর্কে যা কিছু জানি, সেগুলো না জানতাম, তাহলেও ইসলাম আমাকে আকর্ষণ করত নানা কারণে। তার মধ্যে একটি হলো শরিয়াহ। এটাও এক ধরণের অলৌকিক বিষয়। এর নাম হলো 'কুরআনের আইনগত মুজিজা।’ কেন?
কারণ সেই সময়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সমাজ চেষ্টা করছিল ভালো আইন বানাতে। রোমানরা চেষ্টা করছিল ভালো আইন তৈরি করতে। গ্রিকরাও চেষ্টা করছিল। আপনি যদি তাদের সেই পুরনো আইনগুলো এখন পড়ে দেখেন, তাহলে আপনার হাসি পাবে। কিন্তু কুরআনের আইন এখনো চলমান, আর এটা প্রতিটি সময়, সকল যুগের জন্য উপযোগী। এই কঠোর ধরনের শাস্তিগুলো আসলে যতজনকে ইচ্ছা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। উদাহরণ দিলে, আমি এমন দেশে থাকি যেখানে ট্রাফিক আইন, দ্রিভেইং আইন খুব কঠোর। আর এজন্যই দেখবেন মানুষ নিয়ম মেনে গাড়ি চালায়। আপনি খুব বেশি দুর্ঘটনা দেখবেন না, যেটা অন্য কোথাও হয়। এগুলোর লক্ষ্য হলো, মানুষকে রক্ষা করা। আপনি যদি অপরাধীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, তাহলে মনে হবে শাস্তি কঠিন। কিন্তু ভিকটিমের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তারা তো চায় শাস্তি আরো কঠোর হোক। মানে করুন কোন এক লোকের বাসায় চুরি হয়েছে, আর তার সমস্ত টাকা লুট হয়েছে, তার কাছে তো এই অর্থ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে এটা বছরের পর বছর ধরে জমাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ কেউ একদিন বাড়িতে ঢুকে, এই অর্থ চুরি করে, তারপর সেটা দিয়ে মাদক কিনল। তো চুরের দৃষ্টিকোণ থেকে, যারা বলে ‘শাস্তি খুব বেশি কঠোর’, তারা চোরের প্রতি সহানুভূতিশীল, ভুক্তভোগীর প্রতি নয়। অনেকে বলে, ‘আপনারা কেন ব্যভিচারের জন্য মানুষকে শাস্তি দেন?’ ‘আর সে শাস্তি এতটাই গুরুতর, প্রাণদণ্ডও হতে পারে।’ তারা প্রশ্ন তোলে, কেন এমন শাস্তি?
পশ্চিমা দুনিয়ায় বলা হয়, ‘এটা তো বর্বরতা।’ আমি বলি, কিন্তু আপনি কি জানেন ব্যভিচার কত বড় ক্ষতির কারণ হয়? দেখুন ইসলামে ব্যভিচার প্রমাণের জন্য আইন খুবই কঠিন। এখানে চারজন সাক্ষীর দরকার হয়, আর তাদের প্রত্যক্ষভাবে ঘটনাটি দেখা লাগে… শুধু দুজন মানুষ একসাথে আছে এটা না। তাদের সব কিছু দেখার সাক্ষী হতে হয়। খুব কঠিন শর্ত। শর্তগুলো মানুষকে ভয় দেখিয়ে দূরে রাখার জন্য। কিন্তু শাস্তিটা এত কঠোর কেন? কেন?
কারণ এর উদ্দেশ্যই হলো, ব্যভিচার থেকে মানুষকে দূরে রাখা। আপনি যদি আমেরিকান সংস্কৃতির দিকে তাকান, শিকাগো ট্রিবিউনের একটি জরিপ বলছে, এই দেশে একজন সাধারণ পুরুষের অন্তত সাতজন করে প্রেমিকা থাকে, বিয়ের আগেই কিংবা পরেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়। আর একজন পুরুষ যদি বিয়ের বাইরে কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়, আর সেই নারী যদি তার গর্ভে সন্তান ধারণ করে, লোকটি তখনোও চাইলে পালিয়ে যেতে পারে। শুধু কিছু ন্যূনতম খরচ দিলেই চলবে। কিন্তু সেই সন্তান পিতাহীন থেকে যাচ্ছে। একক অভিভাবকের পরিবার এটাই কি সমাধান?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, গবেষণা বলছে, যেসব শিশু একক অভিভাবকের ঘরে জন্ম নেয় বা বড় হয়, আমি বলছি পরিসংখ্যানগতভাবে সব নয়, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, তাদের আইকিউ কম থাকে। তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয় দুই অভিভাবকের ঘরে বেড়ে ওঠা শিশুর তুলনায়। তারা স্কুল থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে বেশি। তাদের মধ্যে বেকার থাকার সম্ভাবনাও বেশি। তারা মাদক, গ্যাং এসবের দিকেও বেশি ঝুঁকে পড়ে। আর এই খারাপ চক্র চলতেই থাকে। এই পরিস্থিতি পশ্চিমাদেশগুলোর জন্য এত বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায় যে তারা বাধ্য হয় আইন করতে— যেসব পুরুষ বিয়ের বাইরে সন্তান জন্ম দেবে, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে সেই সন্তানের খরচ দিতে হবে। কারণ করদাতাদের অনেক অর্থ এতে ব্যয় হচ্ছিল। পুরো ব্যাপারটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এই তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’র জন্য। দুঃখিত এটা কি সত্যিই ঘটেছে?
আপনি কি বলছেন? আপনি কি বুঝাতে চাইছেন। সরকার কি এ বিষয়ে কোনো আইন করেছে? হ্যা, এখন সব পশ্চিমা দেশে এটাই নিয়ম। হুম... হ্যাঁ, যদি কোনো পুরুষ নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করে, আর সেই নারী গর্ভবতী হয়, আর সে যদি সেই সন্তানকে রেখে দেয়, মানে গর্ভপাত না করায়, তাহলে সেই পুরুষকে সন্তানের ভরণপোষণের জন্য খরচ দিতে হয়। এমনকি তাদের বিয়ে না হলেও। এমনকি তাদের বিয়ে না করলেও কারণ ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। ঠিক আছে, কিন্তু সেই নিষ্পাপ শিশুর কী হবে? তার তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু পরিণতি তো থাকেই। আপনি পরিণতি ছাড়া কিছু করতে পারবেন না, ঠিক আছে। কিন্তু এ ব্যবস্থায়ও নতুন সমস্যা দেখা দিল। এখানে কিছু পুরুষ ভাবতে লাগল, ‘আমি নিশ্চিত না, এটা আসলে আমার সন্তান কি না।’ ওই নারী তো অন্য পুরুষের সঙ্গেও ছিল। তাই না?
কিভাবে জানব এটা আমার সন্তান? তাই এর একমাত্র উপায় হলো জেনেটিক টেস্ট করা, আর টেস্টে যদি প্রমাণ হয়, এটা তার সন্তান নয়, তখন আপনি বলতে পারেন যে এরপর সে দায়মুক্তি পাবে। কিন্তু এমনও হয়, অনেক সময় নারী নিজেই জানে না তার সন্তানের বাবা কে?
সে ভাবে হয়তো বর্তমান প্রেমিকই তার বাবা, কিন্তু কিন্তু বাস্তবে হয়তো অন্য কেউ, অথবা স্বামী ভাবছে সে বাবা, কিন্তু তার বাইরেও কারো সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। হয়তো এক রাতে কোনো পাব বা ক্লাবে দেখা হয়েছিল, তারা বাইরে গিয়ে অ্যালকোহল খেয়েছিল। পরে আর মনে নেই কার সঙ্গে ছিল। বিষয়টা এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে গিয়েছিল যে ফ্রান্সে গিয়ে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায়, তারা এখন জেনেটিক টেস্ট নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কারণ বহুবার এমনটা ঘটেছিল যে, নারী যে পুরুষকে বলেছে, ‘এই লোকটাই তার সন্তানের বাবা’, সে আসলে সন্তানের বাবা নয়। এগুলোই সেই ধরনের পরিণতি, যেগুলো এখন পশ্চিমে দেখা যাচ্ছে। আর মানুষকে, তাদের বলা হচ্ছে, তুমি যদি খোলামেলা পোশাক না পরো, বা তোমার পোশাক, যদি তোমার সম্পদ, সৌন্দর্য আর ক্ষমতা না দেখায়, তাহলে কেউ তোমার প্রতি মনোযোগ দেবে না। আর মনোযোগ মানেই ভালো। তাতে তুমি টাকা আয় করতে পারবে, সম্মান পেতে পারবে। সবাই মনোযোগ পেতে চায়। তারা এমনভাবে পোশাক পরে, যাতে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। প্রতিদিনই আপনি এমন বিজ্ঞাপন দেখছেন, যা ব্যভিচারকে, অথবা নারীর সঙ্গে প্রতারণাকে প্রশ্রয় দেয়। তারপর তারা অবাক হয়, ব্যভিচারের বা প্রতারণার হার এত বেশি কেন?
পশ্চিমে ডিভোর্সের হার এখন শতকরা ৫০ ভাগ। মানে প্রতি দুটি বিয়ের একটির পরিণতি বিচ্ছেদ। তারা ভাবে, এটা কেন হচ্ছে? কারণ মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারছে না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাস নেই। সবসময় তারা দুশ্চিন্তায় ভোগে। উদ্বিগ্ন থাকে। ‘আমার স্বামী কি প্রতারণা করছে?
নাকি আমার স্ত্রী করছে?’ এটাই পশ্চিমা সমাজ। এটাই সেই তথাকথিত সুখ, যেটা ‘স্বাধীনতা’ এনে দিয়েছে। সবার মনে ভয়, দুশ্চিন্তা, নিরাপত্তাহীনতা। রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনে যুদ্ধ ছিল। আর ইসলামেও ‘জিহাদ’ নামে একটি বিষয় আছে। কেউ যদি প্রশ্ন করে, ‘এসব কি বর্বরতা ও সহিংসতার উদাহরণ না?’ যখন মানুষ রাসূল (সাঃ)-এর যুদ্ধ নিয়ে কথা বলে, তিনি কতগুলো যুদ্ধ করেছেন তা তুলে ধরে, তখন বলা দরকার, ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রায় সব নবীই তো যুদ্ধ করেছেন, মূসা (আঃ), দাউদ (আঃ) ও সোলায়মান (আঃ)-ও যুদ্ধ করেছিলেন আমি আরো অনেক নবীর নাম বলতে পারি, যারা যুদ্ধ করেছেন। আসলে কেউ যুদ্ধ করেছেন বলে তাকে নবুয়ত থেকে বাদ দেয় যায়, এমনটা না। শুধু যুদ্ধ করার কারণে কাউকে নবী হিসেবে অযোগ্য বলা যায় না। তাহলে নবীর মানদণ্ড কী? তিনি কোনো যুদ্ধ করবেন না?
নাকি, নবী হওয়ার শর্ত এটা নয়। অনেক সময় যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে যায়, শান্তি রক্ষা ও আত্মরক্ষার জন্য। রাসূল (সাঃ) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন, তখন তিনি একটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করেন। তখন মক্কার মুশরিকরা, অবিশ্বাসীরা ও তাদের মিত্ররা, বারবার রাসূল (সাঃ)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো, আজকের দুনিয়ার বহু সংবিধানের তুলনায় ইসলাম যুদ্ধ সম্পর্কিত নৈতিক ও ন্যায্য দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এমনকি যদি যুদ্ধ ন্যায্য হয়, তবুও সেটির জন্য কিছু বিধি-নিষেধ মানতেই হবে। কুরআনের ২ নম্বর সূরার ১৯০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ আপনার ওপর কেউ যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে আপনি আত্মরক্ষার অধিকার রাখেন। তবে সেই যুদ্ধে আল্লাহ বলছেন, আপনাকে অবশ্যই কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। সীমা অতিক্রম করা যাবে না। তাহলে কয়েকটি নিয়ম কী কী?
কুরআনের ৫ নম্বর সূরার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "একজন নিরীহ মানুষের জীবন কেঁড়ে নেওয়া, সমগ্র মানব জাতীর জীবন কেঁড়ে নেওয়ার সম্মান।" অর্থাৎ, যুদ্ধ ন্যায্য হলেও আপনি নারী-শিশু বা নিরস্ত্র কাউকে আঘাত করতে পারবেন না। নিরপরাধদের ক্ষতি করা যাবে না। এটাই হলো একটি নির্দেশনা। ইসলামে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে হামলা বলে কিছু নেই। ইসলামে নেই হিরোশিমা বা নাগাসাকির মতো গণবিধ্বংসী হামলা। ইসলামে কোনোভাবেই নির্বিচারে হত্যা করার অনুমতি নেই। যেমনটা কিছু দেশ করে থাকে। এবং বেসামরিক মানুষের সম্পদ ধ্বংস করাও নিষিদ্ধ। ফসল, পশুসম্পদ, বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট এগুলো ধ্বংস করা যাবে না। সবশেষে, যদি শত্রুপক্ষ বলে, ‘চলুন আমরা শান্তিচুক্তি করি’, যদি তারা অস্ত্র ফেলে দেয়, শান্তির দিকে এগিয়ে আসে, তাহলে কুরআনের ৮ নম্বর সূরার ৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাহলে আপনিও তার প্রতি ঝুঁকে পড়েন।’ তাদের পেছন থেকে গুলি করবেন না, শান্তি গ্রহণ করুন। বিশ্বে অন্য যেসব যুদ্ধ হয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে, একটা উদাহরণ দিই, ধরা যাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি। কারণ তাদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ বেসামরিক মানুষ। ইসলাম এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলে, নৈতিক নির্দেশনার মাধ্যমে। তাই কেউ যদি ইসলামের নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে, তাহলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি অনেক কমে যেত। এবং যুদ্ধও কমে যেত। কারণ এতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিবন্ধকতা থাকত। যেভাবে ইসলাম মানুষকে জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়— শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে নিজের প্রতিবেশীর সঙ্গে চলা। এই বিষয়গুলোর বহু উদাহরণ দেওয়া যায়। যদি ইসলাম সত্যিই মুসলমানদের অমুসলিমদের হত্যা করতে বলত, কেবল তারা অমুসলিম হওয়ার কারণে, তাহলে মুসলমানরা যখন ভারতে প্রায় হাজার বছর শাসন করেছিল, তখন তো তারা চাইলে সব হিন্দুকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারত। তাহলে আজ আর একজন হিন্দুও থাকত না সেখানে। তাদের বর্তমান বংশধররাই প্রমাণ, মুসলিম শাসকরা এই অভিযোগটি বাস্তবে প্রয়োগ করেননি, যে অমুসলিমদের হত্যা করতে হবে। মুসলিমরা স্পেনে ৭৭০ বছর শাসন করেছিল। তাহলে তো প্রতিটি ক্যাথলিক ও ইহুদিকে হত্যা করা হতো। কিন্তু তারা তা করেনি। কারণ ইসলাম এমনটি বলে না। মিসরে এখনো প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কপটিক খ্রিস্টান রয়েছে। তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে ইসলাম উৎসাহ দেয় না, বরং ইসলাম নিষেধ করে, কাউকে হত্যা করতে, যদি সে আপনার অধীনে বা সঙ্গে বসবাস করে। আর তুরস্ক, ইরান, ইরাকেও তাই। আমি একবার এক নাপিতের কাছে গিয়েছিলাম, তিনি বললেন, ‘আমি ইরাকের একজন খ্রিস্টান।’ তিনি নিজেই সাক্ষ্য দিলেন, যখন মুসলমানরা ইরাক শাসন করছিল, তারা আমাদের হত্যা করেনি। আচ্ছা একটি আয়াত আছে, সুরা হাদীদে, আল্লাহ বলেন, সুরা হাদীদের ২৫ নাম্বর আয়াতে সম্ভবত, ‘নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদি এবং তাদের সাথে কিতাব ও ন্যায়ের মানদন্ড নাযিল করে পাঠিয়েছি। যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ তাই ইসলাম হলো ন্যায়বিচারের ধর্ম। ঠিক আছে আর এরপর আল্লাহ আরো বলেন, কারণ আপনি দেখবেন, রাসূল পাঠানো, কিতাব পাঠানো এগুলো শান্তিপূর্ণ মাধ্যম, যার মাধ্যমে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হয়?
তাহলে আয়াতটিতে আরো বলা হয়েছে, ‘আমি আরো নাযিল করেছি লোহা, তাতে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু কল্যাণ।’ তাই যখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হয়, তখন তা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তো ইসলাম হলো ন্যায়বিচারের ধর্ম। শান্তি ও যুদ্ধ উভয়ই হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের বলেন, ‘প্রথমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করো।’ যুদ্ধ কেবল রাষ্ট্রের হাতে থাকা বহু উপকরণেরগুলোর মধ্যে একটি। মানুষ যখন ইসলামের কথা ভাবে, তারা ইসলামী রাষ্ট্রকে বিচার করার জন্য এক ভিন্ন মানদণ্ড ব্যবহার করে, ইসলাম পরিচালিত সরকার হলে তারা আলাদা করে দেখে। কিন্তু অন্য রাষ্ট্রগুলোকে এভাবে দেখে না। আপনি যদি এখন কোনো সরকারকে বলেন, তোমাদের সেনাবাহিনী থাকা উচিত নয়, আর চূড়ান্ত অবস্থায় আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধও করা উচিত নয়, তাহলে সবাই বলবে, এই ধারণা বাস্তবে সম্ভব নয় বলেই মনে হবে। তাহলে ইসলাম যদি মানুষকে মূল্য দেয়, সেখানে দাসত্বের ধারণা কেন আছে?
ইসলাম কি দাসত্ব পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে পারত না? না, ইসলাম দাসত্ব বিলুপ্ত করেছে, আর পশ্চিমও দাসত্ব বিলুপ্ত করেছে কিন্তু ভিন্নভাবে। দেখা যাক, কোন পদ্ধতি ভালো ছিল বা কোনটা কার্যকর ছিল। যেভাবে আমেরিকায় এটা নিষিদ্ধ হয়েছে, এটা হয়েছে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে। ইসলাম করেছে দাসত্ব নিরুৎসাহিত করে, সরাসরি নিষিদ্ধ না করে। আব্রাহাম লিংকন, একজন সাহসী নেতা, একটি বিল সই করেছিলেন, যার মাধ্যমে এক দিনে ৪০ লাখ দাসকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে ৫ লাখ মানুষ মারা যায় আর আরো ৫ লাখ মানুষ অক্ষম হয়ে যায়। ঠিক আছে, হ্যাঁ এটাকে বলা যেতে পারে স্বাধীনতার মূল্য। সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলাম কিভাবে এটা করেছে?
আজকের দিনে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের সম্পর্ক দেখুন। দাসত্ব বিলুপ্তির ১৫০ বছর পরও বৈষম্য রয়ে গেছে। অন্যদিকে আমাদের দেশে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ নিয়ে সমস্যা নেই। কেন? কারণ ইসলাম যেভাবে এটা করেছে, ইসলাম মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার ভালোবাসা সৃষ্টি করেছে। তো ইসলাম মুসলমানদের বুঝিয়েছে দাসত্ব ভালো নয়। ইসলাম চায়, আপনি এটার অবসান করুন। ঠিক আছে, ধরুন, উদাহরণ স্বরূপ, কোনো প্রতিজ্ঞা ভেঙে ফেলেছেন। তাহলে কি করবেন?
একজন দাসকে মুক্ত করুন। ঠিক আছে, তো আপনি কোনো কিছুর শপথ করেছিলেন, পরে দেখলেন, আরো ভালো কিছু আছে। সমস্যা নেই, সেই ভালোটা করুন এবং এক দাস মুক্ত করুন। ঠিক আছে, রোজা রাখার সময় যদি অকারণে ভেঙে ফেলেন, তাহলে কাফফারা দিতে গিয়ে একজন দাস মুক্ত করতে হবে। যদি ভুলবশত কাউকে হত্যা করেন। ধরুন, গাড়ি দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেল। সমস্যা নেই, এক দাস মুক্ত করুন। আপনি জানেন, এর মানে কী? আপনি ভুল করে কারো জীবন কেড়ে নিয়েছেন। ঠিক আছে, সমস্যা নেই এখন আপনি অন্য একজনকে জীবন দিন। কিন্তু কিভাবে অন্য কাউকে জীবন দেবেন?
একজন বন্দি মানুষকে মুক্তি দিয়ে, যে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত ছিল। মানে হলো, ইসলামে স্বাধীনতা মানে জীবন। এই সব বিধানের মাধ্যমে ইসলাম মুসলমানদের মনে স্বাধীনতার প্রতি ভালোবাসা গেঁথে দিয়েছে। এবং এর ফলেই দাসত্ব শেষ হয়েছে। যেটা সমাজে গভীরভাবে ছিল, যেটি বিলুপ্ত হয়েছে ধাপে ধাপে, আর মানুষ নিজের ইচ্ছায়। আর তাই অনেক দাস যখন মুক্তি পেল, তারা এমনকি তাদের মালিকদের ছেড়েও যেতে চায়নি। তারা বলেছে, ‘হ্যা, আমি মুক্ত, কিন্তু আমি কি আপনার সাথে থাকতে পারি?’ তো ‘দাস’ শব্দটা কিছু বছরের মধ্যেই, এটা প্রায় হারিয়ে যায়, আর নতুন একটা শব্দ আসে, যেটা হলো ‘মাওয়ালি’। ‘মাওয়ালি’ মানে হলো, সাবেক দাস অথবা সাবেক মালিক। যেমন, সালিম মাওয়ালি আবু হুঝাইফা, মানে আবু হুঝাইফার সাবেক দাস। আবার আবু হুঝাইফা মাওয়ালি সালিম, মানে সাবেক মালিক। তাদের উপাধি একই ছিল। এটা সত্যিই বিস্ময়কর। এরপর মানুষ এসে বলে, ‘তোমরা তো দাসত্ব নিষিদ্ধ করোনি!’ এক্সকিউজ মি!
আপনারা আমাদের মতো দাসত্ব বিলুপ্ত করুন। মানুষ যখন দাসত্বের কথা ভাবে, তখন মনে পড়ে আমেরিকার দাসত্বের ইতিহাস। সেখানে নিষ্ঠুর ব্যবহার হতো, অধিকার কেড়ে নেওয়া হতো। ঘন্টার পর ঘণ্টা কাজ হতো কৃষিক্ষেতে, বাগানে। এই দৃশ্যটাই আমাদের মাথায় আসে। ইসলাম সেই দাসপ্রথাকেই বিলুপ্ত করেছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেখুন, দাসত্ব তখন ছিল একটা প্রতিষ্ঠান। আর ইসলাম সেটা তৈরি করেনি। এটা তো আগেই ছিল, বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি আর দেশে, সপ্তম শতাব্দীরও আগে থেকেই। সেই প্রতিষ্ঠানটিকেই ইসলাম নতুনভাবে গঠন করে ‘দাস’ শব্দটি বদলে ফেলে। তার বদলে বলা হয়, এরা আমাদের দুধ-ভাই, এরা আমাদের দুধ-বোন। তাদেরকে অধিকার দেওয়া হয়েছে, ন্যায়বিচার দেওয়া হয়েছে। এখন তারা পরিচিত ‘দুধ-ভাই’ হিসেবেই। তাদের সঙ্গে খুবই সুন্দরভাবে আচরণ করতে বলা হয়েছে। আপনি যেসব পোশাক পরেন, তারাও সেই একই পোশাক পরবে। আপনি যেসব খাবার খান, তারাও সেই খাবারই খাবে। তাদের সাথে রূঢ় ব্যবহার করা যাবে না, বেশি বোঝাও দেওয়া যাবে না। আরও অনেক উপায় আছে ধরুন, আর যদি তারা বলে, ‘আপনি কি আমাদের মুক্তি দেবেন?’ তাহলে একজন ভালো মুসলিম অবশ্যই তাদের মুক্তি দেবে। মুসলিম যদি কোনো শপথ ভেঙে ফেলে, তাহলে তাকে দাস মুক্ত করতে হয়। যখন দাসরা মুক্তি পেয়েছে, তখন তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাদের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। তাদের উচ্চ পদ দেওয়া হয়েছে, সম্মান দেওয়া হয়েছে। এবং এখন তারা অন্যদের মতো সমান মর্যাদা পায়। কিন্তু আমেরিকায় যখন দাসদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন সেটা হয়নি। তাই আজও, দুর্ভাগ্যবশত, আমরা এখনো তার প্রভাব দেখতে পাই...
যেমন শিকাগোর সাউথ সাইড, বা ডেট্রয়েট এলাকা। যেখানে আফ্রিকান ভাই-বোনরা, কৃষ্ণাঙ্গ ভাই-বোনরা আজও ঠিকমতো সাংস্কৃতিক অধিকার পায় না। তারা এখনো বঞ্চনার শিকার, বৈষম্যের শিকার। কিন্তু ইসলাম দাসদের শুধু মুক্তিই দেয়নি, বরং তাদের ক্ষমতায়িতও করেছে। তাই আলহামদুলিল্লাহ, এটা যে মানবতার জন্য এক বরকত, তা আমরা দেখতে পাই। এই ব্যাখ্যাগুলোর পর, ইসলামের ব্যাপারে প্রশ্ন বা সন্দেহ থাকা একজন খ্রিষ্টানকে আপনি কী বলতে চান?
আমার খ্রিষ্টান ভাই-বোনদের এবং যেকোনো মানুষের প্রতি আমার কথা হলো, আমাদের জীবন শুধু একটিই। খুব শিগগিরই আমাদের সবার মৃত্যু হবে। তখন আমরা আল্লাহর সামনে, সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়াব। সেই সময় আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না, ঠিক বিশ্বাস, ঠিক পথ, ঠিক সৃষ্টিকর্তাকে বেছে নেওয়ার। তাই আমার অনুরোধ হবে, আমার খ্রিষ্টান ভাই-বোনসহ সব মানুষের প্রতি, একটা কুরআন নিন, অন্তত শিক্ষা বা জানার উদ্দেশ্যে পড়ুন। আপনি তাতে সঠিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা পাবেন, যা সব নবীদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। আপনি জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাবেন, যা আল্লাহ কুরআনে ব্যাখ্যা করেছেন। আপনি ইসলামে খুঁজে পাবেন বর্ণবাদ, হত্যা, আত্মহত্যা বা পরিবার ভাঙনের মতো বড় বড় সমস্যার সঠিক সমাধান। ইসলাম দেয় শক্তিশালী পরিবার, নৈতিকতা, মা-বাবার প্রতি সম্মান। আজকাল সন্তানরা মা-বাবার কথা শুনে না, মাদকাসক্তি বাড়ছে। সান ফ্রান্সিসকোতে ফেন্টানাইলের অপব্যবহার চলছে। গৃহহীনতা আছে, দারিদ্র্য আছে। বর্ণবাদ, মাদকাসক্তি, সবই মহামারির মতো ছড়াচ্ছে। এর সমাধান কী?
ইসলাম দেয় নিখুঁত সমাধান, ন্যায়সংগত সমাধান, ব্যবহারিক সমাধান। এই সব সমস্যার জন্য। আমাদের যা প্রয়োজন, ইসলাম তা দেয়, আপনারও সেটি প্রয়োজন। সুতরাং শেষ পর্যন্ত, আপনি যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবেন, তখন আর ফিরে আসা যাবে না। আর তখন ভাববেন, ‘ইস, আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করতাম!’ জীবন একটাই। একবার কুরআন পড়ে দেখুন, আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি পেয়ে যাবেন। এটা আপনাকে শান্তি দেবে। এটা আপনাকে সমাধান দেবে। এটা আপনাকে মুক্তির পথ দেখাবে। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, ‘হে আল্লাহ, আমাকে সত্য দেখাও, আমাকে সত্যের পথে পরিচালিত করো।’ ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে সত্যের পথ দেখাবেন। আল্লাহ আপনাকে ইসলামের পথে পরিচালিত করবেন।
শরিয়াহ মানে হলো আইন। তো ইসলামি শরিয়াহ যেমন আছে, ফরাসি শরিয়াহ, অ্যাঙ্গলো-স্যাক্সন শরিয়াহও আছে। সব শরিয়াহই ভালো আর সুন্দর। কিন্তু ইসলামি শরিয়াহ ও বাকিসব শরিয়াহ মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। আর তা হলো, এটা পরিপূর্ণ। আব্রাহাম লিংকন এক সাহসী নেতা। একটি বিল স্বাক্ষর করেছিলেন, যার মাধ্যমে এক দিনেই ৪০ লাখ দাসকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে ৫ লাখ মানুষ মারা যায় আর ৫ লাখ মানুষ অক্ষম হয়ে যায়। ইসলাম মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার ভালোভাসা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ইসলাম কিভাবে এটা করেছে?
খ্রিষ্টধর্ম মূলত ভালোবাসা ও শান্তির বার্তা দেয়। ম্যাথিউ ৫:৩৯-এ বলা হয়েছে, চোখের বদলে চোখ নেওয়ার পরিবর্তে, বরং কেউ চড় মারলে অন্য গালও বাড়িয়ে দাও। অন্যদিকে ইসলাম এমন একটি শরিয়াহ ব্যবস্থা, যেখানে কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে। একজন খ্রিষ্টান, যে বলে ‘ঈশ্বর প্রেম’, তাহলে সে কেন ইসলাম গ্রহণ করবে? আমি মাঝে মাঝে একটা উদাহরণ দিই। আমি উইসকনসিনের মার্শফিল্ড গিয়েছিলাম। সেখানে একটি মসজিদ খোলা ছিল। একজন নারী আমাকে ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলেন, ‘আচ্ছা ড.
সাবিল, আপনি বললেন ইসলাম খুব সুন্দর। তাহলে আপনাদের শরিয়াহর শাস্তিগুলো এত কঠোর কেন?’ আমি তাকে একটি উদাহরণ দিই। এই দেশে প্রতিবছর রিপোর্টকৃত ধর্ষণের সংখ্যা ৯০ হাজার। এগুলো কেবল রিপোর্ট করা সংখ্যাই। যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে একজন ধর্ষক গড়ে মাত্র ৫ থেকে ৭ বছর জেল খাটে। যখন সে মুক্ত হয়, সমাজ তখন অরক্ষিত হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী নারী চিন্তায় থাকে, সে আবারও আমাকে আক্রমণ করতে পারে। তাহলে সমাজের ন্যায্যতা, শান্তি আর ঐ নারীর নিরাপত্তা কোথায়? এই অপরাধী বা যাকে আমারা বলছি এই ধর্ষক যখন জেলে থাকে, তখন কে তাকে খাওয়াবে? কে তার থাকার ব্যবস্থা করবে? কে তাকে জেলের সব সুযোগ-সুবিধা দেবে? নিউ ইয়র্ক স্টেটে, বছরে প্রতি বন্দির পেছনে প্রায় ৯০ হাজার ডলার খরচ হয়। ৯০ হাজার!
আমার ট্যাক্সের টাকা। মানুষের পরিশ্রমের টাকা। ইসলাম বলে, শাস্তি হতে হবে ন্যায্য। যদি সেই শাস্তি জনসমক্ষে কার্যকর হয়, তাহলে সমাজের অন্যরাও দেখবে— এই অপরাধীর শাস্তি হচ্ছে, আর কোনো সম্ভাব্য ধর্ষক, খুনি কিংবা চোর, যদি তার মনে এমন কিছু করার চিন্তা থাকে, সে ভাববে, আমি যদি এমন কিছু করি, তাহলে আমার অবস্থাও এমনই হবে। সুতরাং ইসলামের শাস্তি হলো একটি সতর্কবার্তা। এগুলো কাজ করে। যদি আপনি তুলনা করেন, যেকোনো ইসলামী বা মুসলিম দেশে আমার বলা উচিৎ ধর্ষণ অনেক কম হয়। যেসব দেশে এই ধরনের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেই সেসব দেশের তুলনায় হত্যা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, সহিংসতা অনেক কম। এটাই প্রথম পয়েন্ট। দ্বিতীয়টি হচ্ছে— ধরুন, রাত ২টায় একজন ডাকাত আপনার দরজায় কড়া নাড়ল, তারপর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। আপনি বলবেন না, ‘স্বাগতম। এই ঘরটা আপনার। আপনি এই ঘরে থাকুন, আমি বাকি ঘরগুলোও দেখিয়ে দিচ্ছি।’ এটাই ‘আরেক গাল বাড়িয়ে দেওয়া’। কিন্তু এটা তো বাস্তবসম্মত না। এই দুনিয়া এভাবে চলে না। ভাবুন তো, সবাই যদি গাল বাড়িয়ে দিত, তাহলে পুরো পৃথিবী ডাকাত, চোর, ধর্ষক আর হামলাকারীতে ভরে যেত। এটা বাস্তবসম্মত নয়। কেউই এমনটা করে না। আমাদের দেশ, মানে আমি এই দেশটার কথাই বলছি, এই দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ৮০০ বিলিয়ন ডলার। ভাবুন তো, যদি আমেরিকা ‘আরেক গাল বাড়িয়ে দেওয়া’র নীতি মেনে চলত, তাহলে চীন ও রাশিয়া দেশটাকে গ্রাস করে ফেলত। বিশ্বাস করুন, তারা পুরো আমেরিকাকে দখল করে নিত। তখন আর এটা আমেরিকা থাকত না। কোনো পরিবার ‘গাল বাড়িয়ে দেওয়া’ চর্চা করে না। কোনো পুরুষের উচিত না, এই নীতি মেনে চলা। কারণ এটা বাস্তবসম্মত নয়। এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এতে সব ভালো মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। শরিয়াহ মানে হলো আইন। তো ইসলামি শরিয়াহ যেমন আছে, ফরাসি শরিয়াহ, অ্যাঙ্গলো-স্যাক্সন শরিয়াহও আছে। সব ধরনের শরিয়াহই ভালো আর সুন্দর। সবই মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু ইসলামি শরিয়াহ আর বাকি সব শরিয়াহর মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। আর তা হলো, এটা পরিপূর্ণ। এটা নিখুঁত। কেন?
কারণ প্রতিটি আইনই তার প্রণেতার বৈশিষ্ট্য বহন করে। যদি শরিয়াহ কোনো মানুষের তৈরি হয়, তাহলে তা সুন্দর হতে পারে, কারণ সেই মানুষটিও সুন্দর হতে পারে। কিন্তু শরিয়াহ আল্লাহর দেওয়া শরিয়াহ পরিপূর্ণ। এতে কোনো ত্রুটি নেই, কোনো ভুল নেই। অনেক সময় মানুষ ভাবে, তারা নাকি আল্লাহর চেয়েও বেশি জ্ঞানী। তখন তারা নিজের মতো আইন বানায়, কিন্তু পরে গিয়ে সেটা ব্যর্থ হয়। তো আল্লাহ যা বলেছেন, তার চেয়ে উত্তম কিছুই নেই। এটা আমার ব্যক্তিগত মত জানেন তো, আমি যদি মুসলিম না হতাম, আর ইসলাম সম্পর্কে যা কিছু জানি, সেগুলো না জানতাম, তাহলেও ইসলাম আমাকে আকর্ষণ করত নানা কারণে। তার মধ্যে একটি হলো শরিয়াহ। এটাও এক ধরণের অলৌকিক বিষয়। এর নাম হলো 'কুরআনের আইনগত মুজিজা।’ কেন?
কারণ সেই সময়ে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সমাজ চেষ্টা করছিল ভালো আইন বানাতে। রোমানরা চেষ্টা করছিল ভালো আইন তৈরি করতে। গ্রিকরাও চেষ্টা করছিল। আপনি যদি তাদের সেই পুরনো আইনগুলো এখন পড়ে দেখেন, তাহলে আপনার হাসি পাবে। কিন্তু কুরআনের আইন এখনো চলমান, আর এটা প্রতিটি সময়, সকল যুগের জন্য উপযোগী। এই কঠোর ধরনের শাস্তিগুলো আসলে যতজনকে ইচ্ছা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়। উদাহরণ দিলে, আমি এমন দেশে থাকি যেখানে ট্রাফিক আইন, দ্রিভেইং আইন খুব কঠোর। আর এজন্যই দেখবেন মানুষ নিয়ম মেনে গাড়ি চালায়। আপনি খুব বেশি দুর্ঘটনা দেখবেন না, যেটা অন্য কোথাও হয়। এগুলোর লক্ষ্য হলো, মানুষকে রক্ষা করা। আপনি যদি অপরাধীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, তাহলে মনে হবে শাস্তি কঠিন। কিন্তু ভিকটিমের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তারা তো চায় শাস্তি আরো কঠোর হোক। মানে করুন কোন এক লোকের বাসায় চুরি হয়েছে, আর তার সমস্ত টাকা লুট হয়েছে, তার কাছে তো এই অর্থ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে এটা বছরের পর বছর ধরে জমাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ কেউ একদিন বাড়িতে ঢুকে, এই অর্থ চুরি করে, তারপর সেটা দিয়ে মাদক কিনল। তো চুরের দৃষ্টিকোণ থেকে, যারা বলে ‘শাস্তি খুব বেশি কঠোর’, তারা চোরের প্রতি সহানুভূতিশীল, ভুক্তভোগীর প্রতি নয়। অনেকে বলে, ‘আপনারা কেন ব্যভিচারের জন্য মানুষকে শাস্তি দেন?’ ‘আর সে শাস্তি এতটাই গুরুতর, প্রাণদণ্ডও হতে পারে।’ তারা প্রশ্ন তোলে, কেন এমন শাস্তি?
পশ্চিমা দুনিয়ায় বলা হয়, ‘এটা তো বর্বরতা।’ আমি বলি, কিন্তু আপনি কি জানেন ব্যভিচার কত বড় ক্ষতির কারণ হয়? দেখুন ইসলামে ব্যভিচার প্রমাণের জন্য আইন খুবই কঠিন। এখানে চারজন সাক্ষীর দরকার হয়, আর তাদের প্রত্যক্ষভাবে ঘটনাটি দেখা লাগে… শুধু দুজন মানুষ একসাথে আছে এটা না। তাদের সব কিছু দেখার সাক্ষী হতে হয়। খুব কঠিন শর্ত। শর্তগুলো মানুষকে ভয় দেখিয়ে দূরে রাখার জন্য। কিন্তু শাস্তিটা এত কঠোর কেন? কেন?
কারণ এর উদ্দেশ্যই হলো, ব্যভিচার থেকে মানুষকে দূরে রাখা। আপনি যদি আমেরিকান সংস্কৃতির দিকে তাকান, শিকাগো ট্রিবিউনের একটি জরিপ বলছে, এই দেশে একজন সাধারণ পুরুষের অন্তত সাতজন করে প্রেমিকা থাকে, বিয়ের আগেই কিংবা পরেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়। আর একজন পুরুষ যদি বিয়ের বাইরে কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়, আর সেই নারী যদি তার গর্ভে সন্তান ধারণ করে, লোকটি তখনোও চাইলে পালিয়ে যেতে পারে। শুধু কিছু ন্যূনতম খরচ দিলেই চলবে। কিন্তু সেই সন্তান পিতাহীন থেকে যাচ্ছে। একক অভিভাবকের পরিবার এটাই কি সমাধান?
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, গবেষণা বলছে, যেসব শিশু একক অভিভাবকের ঘরে জন্ম নেয় বা বড় হয়, আমি বলছি পরিসংখ্যানগতভাবে সব নয়, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, তাদের আইকিউ কম থাকে। তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয় দুই অভিভাবকের ঘরে বেড়ে ওঠা শিশুর তুলনায়। তারা স্কুল থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে বেশি। তাদের মধ্যে বেকার থাকার সম্ভাবনাও বেশি। তারা মাদক, গ্যাং এসবের দিকেও বেশি ঝুঁকে পড়ে। আর এই খারাপ চক্র চলতেই থাকে। এই পরিস্থিতি পশ্চিমাদেশগুলোর জন্য এত বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায় যে তারা বাধ্য হয় আইন করতে— যেসব পুরুষ বিয়ের বাইরে সন্তান জন্ম দেবে, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে সেই সন্তানের খরচ দিতে হবে। কারণ করদাতাদের অনেক অর্থ এতে ব্যয় হচ্ছিল। পুরো ব্যাপারটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। এই তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’র জন্য। দুঃখিত এটা কি সত্যিই ঘটেছে?
আপনি কি বলছেন? আপনি কি বুঝাতে চাইছেন। সরকার কি এ বিষয়ে কোনো আইন করেছে? হ্যা, এখন সব পশ্চিমা দেশে এটাই নিয়ম। হুম... হ্যাঁ, যদি কোনো পুরুষ নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করে, আর সেই নারী গর্ভবতী হয়, আর সে যদি সেই সন্তানকে রেখে দেয়, মানে গর্ভপাত না করায়, তাহলে সেই পুরুষকে সন্তানের ভরণপোষণের জন্য খরচ দিতে হয়। এমনকি তাদের বিয়ে না হলেও। এমনকি তাদের বিয়ে না করলেও কারণ ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। ঠিক আছে, কিন্তু সেই নিষ্পাপ শিশুর কী হবে? তার তো কোনো দোষ নেই। কিন্তু পরিণতি তো থাকেই। আপনি পরিণতি ছাড়া কিছু করতে পারবেন না, ঠিক আছে। কিন্তু এ ব্যবস্থায়ও নতুন সমস্যা দেখা দিল। এখানে কিছু পুরুষ ভাবতে লাগল, ‘আমি নিশ্চিত না, এটা আসলে আমার সন্তান কি না।’ ওই নারী তো অন্য পুরুষের সঙ্গেও ছিল। তাই না?
কিভাবে জানব এটা আমার সন্তান? তাই এর একমাত্র উপায় হলো জেনেটিক টেস্ট করা, আর টেস্টে যদি প্রমাণ হয়, এটা তার সন্তান নয়, তখন আপনি বলতে পারেন যে এরপর সে দায়মুক্তি পাবে। কিন্তু এমনও হয়, অনেক সময় নারী নিজেই জানে না তার সন্তানের বাবা কে?
সে ভাবে হয়তো বর্তমান প্রেমিকই তার বাবা, কিন্তু কিন্তু বাস্তবে হয়তো অন্য কেউ, অথবা স্বামী ভাবছে সে বাবা, কিন্তু তার বাইরেও কারো সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। হয়তো এক রাতে কোনো পাব বা ক্লাবে দেখা হয়েছিল, তারা বাইরে গিয়ে অ্যালকোহল খেয়েছিল। পরে আর মনে নেই কার সঙ্গে ছিল। বিষয়টা এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে গিয়েছিল যে ফ্রান্সে গিয়ে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায়, তারা এখন জেনেটিক টেস্ট নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। কারণ বহুবার এমনটা ঘটেছিল যে, নারী যে পুরুষকে বলেছে, ‘এই লোকটাই তার সন্তানের বাবা’, সে আসলে সন্তানের বাবা নয়। এগুলোই সেই ধরনের পরিণতি, যেগুলো এখন পশ্চিমে দেখা যাচ্ছে। আর মানুষকে, তাদের বলা হচ্ছে, তুমি যদি খোলামেলা পোশাক না পরো, বা তোমার পোশাক, যদি তোমার সম্পদ, সৌন্দর্য আর ক্ষমতা না দেখায়, তাহলে কেউ তোমার প্রতি মনোযোগ দেবে না। আর মনোযোগ মানেই ভালো। তাতে তুমি টাকা আয় করতে পারবে, সম্মান পেতে পারবে। সবাই মনোযোগ পেতে চায়। তারা এমনভাবে পোশাক পরে, যাতে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। প্রতিদিনই আপনি এমন বিজ্ঞাপন দেখছেন, যা ব্যভিচারকে, অথবা নারীর সঙ্গে প্রতারণাকে প্রশ্রয় দেয়। তারপর তারা অবাক হয়, ব্যভিচারের বা প্রতারণার হার এত বেশি কেন?
পশ্চিমে ডিভোর্সের হার এখন শতকরা ৫০ ভাগ। মানে প্রতি দুটি বিয়ের একটির পরিণতি বিচ্ছেদ। তারা ভাবে, এটা কেন হচ্ছে? কারণ মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারছে না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাস নেই। সবসময় তারা দুশ্চিন্তায় ভোগে। উদ্বিগ্ন থাকে। ‘আমার স্বামী কি প্রতারণা করছে?
নাকি আমার স্ত্রী করছে?’ এটাই পশ্চিমা সমাজ। এটাই সেই তথাকথিত সুখ, যেটা ‘স্বাধীনতা’ এনে দিয়েছে। সবার মনে ভয়, দুশ্চিন্তা, নিরাপত্তাহীনতা। রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনে যুদ্ধ ছিল। আর ইসলামেও ‘জিহাদ’ নামে একটি বিষয় আছে। কেউ যদি প্রশ্ন করে, ‘এসব কি বর্বরতা ও সহিংসতার উদাহরণ না?’ যখন মানুষ রাসূল (সাঃ)-এর যুদ্ধ নিয়ে কথা বলে, তিনি কতগুলো যুদ্ধ করেছেন তা তুলে ধরে, তখন বলা দরকার, ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রায় সব নবীই তো যুদ্ধ করেছেন, মূসা (আঃ), দাউদ (আঃ) ও সোলায়মান (আঃ)-ও যুদ্ধ করেছিলেন আমি আরো অনেক নবীর নাম বলতে পারি, যারা যুদ্ধ করেছেন। আসলে কেউ যুদ্ধ করেছেন বলে তাকে নবুয়ত থেকে বাদ দেয় যায়, এমনটা না। শুধু যুদ্ধ করার কারণে কাউকে নবী হিসেবে অযোগ্য বলা যায় না। তাহলে নবীর মানদণ্ড কী? তিনি কোনো যুদ্ধ করবেন না?
নাকি, নবী হওয়ার শর্ত এটা নয়। অনেক সময় যুদ্ধ অপরিহার্য হয়ে যায়, শান্তি রক্ষা ও আত্মরক্ষার জন্য। রাসূল (সাঃ) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন, তখন তিনি একটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করেন। তখন মক্কার মুশরিকরা, অবিশ্বাসীরা ও তাদের মিত্ররা, বারবার রাসূল (সাঃ)-এর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলো, আজকের দুনিয়ার বহু সংবিধানের তুলনায় ইসলাম যুদ্ধ সম্পর্কিত নৈতিক ও ন্যায্য দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এমনকি যদি যুদ্ধ ন্যায্য হয়, তবুও সেটির জন্য কিছু বিধি-নিষেধ মানতেই হবে। কুরআনের ২ নম্বর সূরার ১৯০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।’ আপনার ওপর কেউ যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে আপনি আত্মরক্ষার অধিকার রাখেন। তবে সেই যুদ্ধে আল্লাহ বলছেন, আপনাকে অবশ্যই কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। সীমা অতিক্রম করা যাবে না। তাহলে কয়েকটি নিয়ম কী কী?
কুরআনের ৫ নম্বর সূরার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "একজন নিরীহ মানুষের জীবন কেঁড়ে নেওয়া, সমগ্র মানব জাতীর জীবন কেঁড়ে নেওয়ার সম্মান।" অর্থাৎ, যুদ্ধ ন্যায্য হলেও আপনি নারী-শিশু বা নিরস্ত্র কাউকে আঘাত করতে পারবেন না। নিরপরাধদের ক্ষতি করা যাবে না। এটাই হলো একটি নির্দেশনা। ইসলামে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে হামলা বলে কিছু নেই। ইসলামে নেই হিরোশিমা বা নাগাসাকির মতো গণবিধ্বংসী হামলা। ইসলামে কোনোভাবেই নির্বিচারে হত্যা করার অনুমতি নেই। যেমনটা কিছু দেশ করে থাকে। এবং বেসামরিক মানুষের সম্পদ ধ্বংস করাও নিষিদ্ধ। ফসল, পশুসম্পদ, বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট এগুলো ধ্বংস করা যাবে না। সবশেষে, যদি শত্রুপক্ষ বলে, ‘চলুন আমরা শান্তিচুক্তি করি’, যদি তারা অস্ত্র ফেলে দেয়, শান্তির দিকে এগিয়ে আসে, তাহলে কুরআনের ৮ নম্বর সূরার ৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাহলে আপনিও তার প্রতি ঝুঁকে পড়েন।’ তাদের পেছন থেকে গুলি করবেন না, শান্তি গ্রহণ করুন। বিশ্বে অন্য যেসব যুদ্ধ হয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে, একটা উদাহরণ দিই, ধরা যাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি। কারণ তাদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ বেসামরিক মানুষ। ইসলাম এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলে, নৈতিক নির্দেশনার মাধ্যমে। তাই কেউ যদি ইসলামের নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে, তাহলে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি অনেক কমে যেত। এবং যুদ্ধও কমে যেত। কারণ এতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিবন্ধকতা থাকত। যেভাবে ইসলাম মানুষকে জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়— শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে নিজের প্রতিবেশীর সঙ্গে চলা। এই বিষয়গুলোর বহু উদাহরণ দেওয়া যায়। যদি ইসলাম সত্যিই মুসলমানদের অমুসলিমদের হত্যা করতে বলত, কেবল তারা অমুসলিম হওয়ার কারণে, তাহলে মুসলমানরা যখন ভারতে প্রায় হাজার বছর শাসন করেছিল, তখন তো তারা চাইলে সব হিন্দুকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারত। তাহলে আজ আর একজন হিন্দুও থাকত না সেখানে। তাদের বর্তমান বংশধররাই প্রমাণ, মুসলিম শাসকরা এই অভিযোগটি বাস্তবে প্রয়োগ করেননি, যে অমুসলিমদের হত্যা করতে হবে। মুসলিমরা স্পেনে ৭৭০ বছর শাসন করেছিল। তাহলে তো প্রতিটি ক্যাথলিক ও ইহুদিকে হত্যা করা হতো। কিন্তু তারা তা করেনি। কারণ ইসলাম এমনটি বলে না। মিসরে এখনো প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ কপটিক খ্রিস্টান রয়েছে। তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে ইসলাম উৎসাহ দেয় না, বরং ইসলাম নিষেধ করে, কাউকে হত্যা করতে, যদি সে আপনার অধীনে বা সঙ্গে বসবাস করে। আর তুরস্ক, ইরান, ইরাকেও তাই। আমি একবার এক নাপিতের কাছে গিয়েছিলাম, তিনি বললেন, ‘আমি ইরাকের একজন খ্রিস্টান।’ তিনি নিজেই সাক্ষ্য দিলেন, যখন মুসলমানরা ইরাক শাসন করছিল, তারা আমাদের হত্যা করেনি। আচ্ছা একটি আয়াত আছে, সুরা হাদীদে, আল্লাহ বলেন, সুরা হাদীদের ২৫ নাম্বর আয়াতে সম্ভবত, ‘নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে স্পষ্ট প্রমাণাদি এবং তাদের সাথে কিতাব ও ন্যায়ের মানদন্ড নাযিল করে পাঠিয়েছি। যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।’ তাই ইসলাম হলো ন্যায়বিচারের ধর্ম। ঠিক আছে আর এরপর আল্লাহ আরো বলেন, কারণ আপনি দেখবেন, রাসূল পাঠানো, কিতাব পাঠানো এগুলো শান্তিপূর্ণ মাধ্যম, যার মাধ্যমে মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হয়?
তাহলে আয়াতটিতে আরো বলা হয়েছে, ‘আমি আরো নাযিল করেছি লোহা, তাতে রয়েছে প্রচন্ড শক্তি ও মানুষের জন্য বহু কল্যাণ।’ তাই যখন শান্তিপূর্ণ উপায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হয়, তখন তা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তো ইসলাম হলো ন্যায়বিচারের ধর্ম। শান্তি ও যুদ্ধ উভয়ই হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। আল্লাহ আমাদের বলেন, ‘প্রথমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করো।’ যুদ্ধ কেবল রাষ্ট্রের হাতে থাকা বহু উপকরণেরগুলোর মধ্যে একটি। মানুষ যখন ইসলামের কথা ভাবে, তারা ইসলামী রাষ্ট্রকে বিচার করার জন্য এক ভিন্ন মানদণ্ড ব্যবহার করে, ইসলাম পরিচালিত সরকার হলে তারা আলাদা করে দেখে। কিন্তু অন্য রাষ্ট্রগুলোকে এভাবে দেখে না। আপনি যদি এখন কোনো সরকারকে বলেন, তোমাদের সেনাবাহিনী থাকা উচিত নয়, আর চূড়ান্ত অবস্থায় আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধও করা উচিত নয়, তাহলে সবাই বলবে, এই ধারণা বাস্তবে সম্ভব নয় বলেই মনে হবে। তাহলে ইসলাম যদি মানুষকে মূল্য দেয়, সেখানে দাসত্বের ধারণা কেন আছে?
ইসলাম কি দাসত্ব পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে পারত না? না, ইসলাম দাসত্ব বিলুপ্ত করেছে, আর পশ্চিমও দাসত্ব বিলুপ্ত করেছে কিন্তু ভিন্নভাবে। দেখা যাক, কোন পদ্ধতি ভালো ছিল বা কোনটা কার্যকর ছিল। যেভাবে আমেরিকায় এটা নিষিদ্ধ হয়েছে, এটা হয়েছে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে। ইসলাম করেছে দাসত্ব নিরুৎসাহিত করে, সরাসরি নিষিদ্ধ না করে। আব্রাহাম লিংকন, একজন সাহসী নেতা, একটি বিল সই করেছিলেন, যার মাধ্যমে এক দিনে ৪০ লাখ দাসকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যাতে ৫ লাখ মানুষ মারা যায় আর আরো ৫ লাখ মানুষ অক্ষম হয়ে যায়। ঠিক আছে, হ্যাঁ এটাকে বলা যেতে পারে স্বাধীনতার মূল্য। সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলাম কিভাবে এটা করেছে?
আজকের দিনে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের সম্পর্ক দেখুন। দাসত্ব বিলুপ্তির ১৫০ বছর পরও বৈষম্য রয়ে গেছে। অন্যদিকে আমাদের দেশে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ নিয়ে সমস্যা নেই। কেন? কারণ ইসলাম যেভাবে এটা করেছে, ইসলাম মানুষের হৃদয়ে স্বাধীনতার ভালোবাসা সৃষ্টি করেছে। তো ইসলাম মুসলমানদের বুঝিয়েছে দাসত্ব ভালো নয়। ইসলাম চায়, আপনি এটার অবসান করুন। ঠিক আছে, ধরুন, উদাহরণ স্বরূপ, কোনো প্রতিজ্ঞা ভেঙে ফেলেছেন। তাহলে কি করবেন?
একজন দাসকে মুক্ত করুন। ঠিক আছে, তো আপনি কোনো কিছুর শপথ করেছিলেন, পরে দেখলেন, আরো ভালো কিছু আছে। সমস্যা নেই, সেই ভালোটা করুন এবং এক দাস মুক্ত করুন। ঠিক আছে, রোজা রাখার সময় যদি অকারণে ভেঙে ফেলেন, তাহলে কাফফারা দিতে গিয়ে একজন দাস মুক্ত করতে হবে। যদি ভুলবশত কাউকে হত্যা করেন। ধরুন, গাড়ি দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেল। সমস্যা নেই, এক দাস মুক্ত করুন। আপনি জানেন, এর মানে কী? আপনি ভুল করে কারো জীবন কেড়ে নিয়েছেন। ঠিক আছে, সমস্যা নেই এখন আপনি অন্য একজনকে জীবন দিন। কিন্তু কিভাবে অন্য কাউকে জীবন দেবেন?
একজন বন্দি মানুষকে মুক্তি দিয়ে, যে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত ছিল। মানে হলো, ইসলামে স্বাধীনতা মানে জীবন। এই সব বিধানের মাধ্যমে ইসলাম মুসলমানদের মনে স্বাধীনতার প্রতি ভালোবাসা গেঁথে দিয়েছে। এবং এর ফলেই দাসত্ব শেষ হয়েছে। যেটা সমাজে গভীরভাবে ছিল, যেটি বিলুপ্ত হয়েছে ধাপে ধাপে, আর মানুষ নিজের ইচ্ছায়। আর তাই অনেক দাস যখন মুক্তি পেল, তারা এমনকি তাদের মালিকদের ছেড়েও যেতে চায়নি। তারা বলেছে, ‘হ্যা, আমি মুক্ত, কিন্তু আমি কি আপনার সাথে থাকতে পারি?’ তো ‘দাস’ শব্দটা কিছু বছরের মধ্যেই, এটা প্রায় হারিয়ে যায়, আর নতুন একটা শব্দ আসে, যেটা হলো ‘মাওয়ালি’। ‘মাওয়ালি’ মানে হলো, সাবেক দাস অথবা সাবেক মালিক। যেমন, সালিম মাওয়ালি আবু হুঝাইফা, মানে আবু হুঝাইফার সাবেক দাস। আবার আবু হুঝাইফা মাওয়ালি সালিম, মানে সাবেক মালিক। তাদের উপাধি একই ছিল। এটা সত্যিই বিস্ময়কর। এরপর মানুষ এসে বলে, ‘তোমরা তো দাসত্ব নিষিদ্ধ করোনি!’ এক্সকিউজ মি!
আপনারা আমাদের মতো দাসত্ব বিলুপ্ত করুন। মানুষ যখন দাসত্বের কথা ভাবে, তখন মনে পড়ে আমেরিকার দাসত্বের ইতিহাস। সেখানে নিষ্ঠুর ব্যবহার হতো, অধিকার কেড়ে নেওয়া হতো। ঘন্টার পর ঘণ্টা কাজ হতো কৃষিক্ষেতে, বাগানে। এই দৃশ্যটাই আমাদের মাথায় আসে। ইসলাম সেই দাসপ্রথাকেই বিলুপ্ত করেছে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেখুন, দাসত্ব তখন ছিল একটা প্রতিষ্ঠান। আর ইসলাম সেটা তৈরি করেনি। এটা তো আগেই ছিল, বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি আর দেশে, সপ্তম শতাব্দীরও আগে থেকেই। সেই প্রতিষ্ঠানটিকেই ইসলাম নতুনভাবে গঠন করে ‘দাস’ শব্দটি বদলে ফেলে। তার বদলে বলা হয়, এরা আমাদের দুধ-ভাই, এরা আমাদের দুধ-বোন। তাদেরকে অধিকার দেওয়া হয়েছে, ন্যায়বিচার দেওয়া হয়েছে। এখন তারা পরিচিত ‘দুধ-ভাই’ হিসেবেই। তাদের সঙ্গে খুবই সুন্দরভাবে আচরণ করতে বলা হয়েছে। আপনি যেসব পোশাক পরেন, তারাও সেই একই পোশাক পরবে। আপনি যেসব খাবার খান, তারাও সেই খাবারই খাবে। তাদের সাথে রূঢ় ব্যবহার করা যাবে না, বেশি বোঝাও দেওয়া যাবে না। আরও অনেক উপায় আছে ধরুন, আর যদি তারা বলে, ‘আপনি কি আমাদের মুক্তি দেবেন?’ তাহলে একজন ভালো মুসলিম অবশ্যই তাদের মুক্তি দেবে। মুসলিম যদি কোনো শপথ ভেঙে ফেলে, তাহলে তাকে দাস মুক্ত করতে হয়। যখন দাসরা মুক্তি পেয়েছে, তখন তাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাদের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। তাদের উচ্চ পদ দেওয়া হয়েছে, সম্মান দেওয়া হয়েছে। এবং এখন তারা অন্যদের মতো সমান মর্যাদা পায়। কিন্তু আমেরিকায় যখন দাসদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তখন সেটা হয়নি। তাই আজও, দুর্ভাগ্যবশত, আমরা এখনো তার প্রভাব দেখতে পাই...
যেমন শিকাগোর সাউথ সাইড, বা ডেট্রয়েট এলাকা। যেখানে আফ্রিকান ভাই-বোনরা, কৃষ্ণাঙ্গ ভাই-বোনরা আজও ঠিকমতো সাংস্কৃতিক অধিকার পায় না। তারা এখনো বঞ্চনার শিকার, বৈষম্যের শিকার। কিন্তু ইসলাম দাসদের শুধু মুক্তিই দেয়নি, বরং তাদের ক্ষমতায়িতও করেছে। তাই আলহামদুলিল্লাহ, এটা যে মানবতার জন্য এক বরকত, তা আমরা দেখতে পাই। এই ব্যাখ্যাগুলোর পর, ইসলামের ব্যাপারে প্রশ্ন বা সন্দেহ থাকা একজন খ্রিষ্টানকে আপনি কী বলতে চান?
আমার খ্রিষ্টান ভাই-বোনদের এবং যেকোনো মানুষের প্রতি আমার কথা হলো, আমাদের জীবন শুধু একটিই। খুব শিগগিরই আমাদের সবার মৃত্যু হবে। তখন আমরা আল্লাহর সামনে, সৃষ্টিকর্তার সামনে দাঁড়াব। সেই সময় আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না, ঠিক বিশ্বাস, ঠিক পথ, ঠিক সৃষ্টিকর্তাকে বেছে নেওয়ার। তাই আমার অনুরোধ হবে, আমার খ্রিষ্টান ভাই-বোনসহ সব মানুষের প্রতি, একটা কুরআন নিন, অন্তত শিক্ষা বা জানার উদ্দেশ্যে পড়ুন। আপনি তাতে সঠিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা পাবেন, যা সব নবীদের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। আপনি জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাবেন, যা আল্লাহ কুরআনে ব্যাখ্যা করেছেন। আপনি ইসলামে খুঁজে পাবেন বর্ণবাদ, হত্যা, আত্মহত্যা বা পরিবার ভাঙনের মতো বড় বড় সমস্যার সঠিক সমাধান। ইসলাম দেয় শক্তিশালী পরিবার, নৈতিকতা, মা-বাবার প্রতি সম্মান। আজকাল সন্তানরা মা-বাবার কথা শুনে না, মাদকাসক্তি বাড়ছে। সান ফ্রান্সিসকোতে ফেন্টানাইলের অপব্যবহার চলছে। গৃহহীনতা আছে, দারিদ্র্য আছে। বর্ণবাদ, মাদকাসক্তি, সবই মহামারির মতো ছড়াচ্ছে। এর সমাধান কী?
ইসলাম দেয় নিখুঁত সমাধান, ন্যায়সংগত সমাধান, ব্যবহারিক সমাধান। এই সব সমস্যার জন্য। আমাদের যা প্রয়োজন, ইসলাম তা দেয়, আপনারও সেটি প্রয়োজন। সুতরাং শেষ পর্যন্ত, আপনি যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবেন, তখন আর ফিরে আসা যাবে না। আর তখন ভাববেন, ‘ইস, আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করতাম!’ জীবন একটাই। একবার কুরআন পড়ে দেখুন, আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি পেয়ে যাবেন। এটা আপনাকে শান্তি দেবে। এটা আপনাকে সমাধান দেবে। এটা আপনাকে মুক্তির পথ দেখাবে। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, ‘হে আল্লাহ, আমাকে সত্য দেখাও, আমাকে সত্যের পথে পরিচালিত করো।’ ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে সত্যের পথ দেখাবেন। আল্লাহ আপনাকে ইসলামের পথে পরিচালিত করবেন।