কুরআনের পাতায় অবিশ্বাস্য জ্যামিতিক ছন্দ! - হাজার বছরের সুপ্ত মু'জিযা যা আগে কখনো দেখা যায়নি!
প্রকাশের তারিখ
আমি আপনাদের একটি অলৌকিক ঘটনা দেখাবো যেটি আপনারা হয়তো এর আগে কখনো লক্ষ্যই করেননি: আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোর সুসজ্জিত করার ঘটনা। এই অলৌকিক ঘটনাটি এতোটাই পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট যে তা বোঝার জন্য শুধু এটি চোখে দেখলেই হবে। কোটি কোটি মানুষ পবিত্র কুরআন পড়ছেন এবং তা হিফজ করছেন, কিন্তু শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে, পবিত্র কুরআনের এই তিনটি সংকলনে তেমন কেউই সেই প্যাটার্নগুলো লক্ষ্য করেননি। আজ, আমরা দেখাবো পবিত্র কুরআন এর প্রতিটি বার্তায়, প্রতিটি পৃষ্ঠায়, প্রতিটি লাইনে, শব্দে, এবং এমনকি প্রতিটি অক্ষরে কিভাবে একটি অলৌকিক গ্রন্থ হিসেবে বারংবার প্রমাণিত হয়েছে। আপনি কখনো এমন কোন বই দেখেছেন যেখানে একাধিক পৃষ্ঠায়, প্রতিটি লাইন একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়?
এই মুশহাফে (কুরআনের একটি সংকলন), প্রতিটি লাইন একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখুন। প্রতিটি পৃষ্ঠায় সমান সংখ্যক লাইন রয়েছে, প্রতিটি লাইন একই দৈর্ঘ্যের, এবং সেই লাইনগুলোর প্রত্যেকটা একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। অথবা, কুরআনের এই সংকলনটিতে, প্রতিটি পৃষ্ঠায় একটি সাদৃশ্যপূর্ণ প্যাটার্ন রয়েছে এই পৃষ্টায় প্রথম এবং শেষ লাইন একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। দ্বিতীয় লাইন এবং শেষ থেকে দ্বিতীয় লাইনও একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। উপরে থেকে তৃতীয় লাইন এবং নিচ থেকে তৃতীয় লাইন আবারও একই। প্রতিটি লাইন এই নিয়মটি অনুসরণ করে, এবং আমরা দেখতে পাচ্ছি একই অলৌকিক ঘটনা প্রতিটি পৃষ্ঠায় পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এখন, আপনারা যে মুশহাফটি দেখছেন এটা হয়তো সবচেয়ে বেশি অবাক করার মতো। আজ, আমরা বেশ চমৎকার কিছু বিষয় দেখিয়েছি যা আপনাদের ঈমানকে আরো সুদৃঢ় নতুন একটি স্তরে নিয়ে যাবে। ১৮০০ শতকের শেষদিকে, হাফিজ ওসমান নূরি (রহঃ) নামক একজন ক্যালিগ্রাফার ছিলেন যিনি নিজ হাতে ১০৬ বার পুরো কুরআনকে লিখেছেন। জী, ১০৬ বার। কিন্তু শুধু তাঁর লেখা মুশহাফই তাঁর রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় কীর্তি নয়। এটি ছিল তাঁর লেখার ধরণ বা শৈলী এবং পৃষ্ঠার গঠন, যা এখন বিশ্বের নানা দেশে গৃহীত হয়েছে। একদিন, যখন পবিত্র কুরআনকে আরো একবার লিখতে গিয়ে, তিনি নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করেছিলেন: "কুরআন লেখার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?" সেই সময়, তাঁর কাছে কোনো ধারণাই ছিল না যে তিনি একটি অলৌকিক বিষয় আবিষ্কার করতে চলেছেন। কিছু সময় পরে, আল্লাহ তার হৃদয়ে একটি ধারণা দিয়ে অনুপ্রেরণা দেন। তিনি কুরআনের নিজস্ব মাপজোখ ব্যবহার করে একটি মুশহাফ লিখতে যাচ্ছিলেন। প্রতিটি লাইনের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করতে, তিনি সবচেয়ে ছোট সূরা (অধ্যায়) ব্যবহার করেছিলেন, সূরা আল-কাউসার (প্রাচুর্য কল্যাণের অধ্যায়), সেই লাইনটিকে রেফারেন্স হিসেবে নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন প্রতিটি লাইন ওই সূরার মতো দৈর্ঘ্য হবে। একটি পৃষ্ঠার দৈর্ঘ্য নির্ধারণের জন্য, তিনি সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াত (বাক্য) নির্বাচন করেছিলেন, আয়াত আল মুদায়ানা (ঋণ সম্পর্কিত আয়াত)। আর প্রতিটি পৃষ্ঠার দৈর্ঘ্য ওই আয়াতের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী হবে, যা একটি সম্পূর্ণ পৃষ্ঠা। কিন্তু যখন তিনি লেখা শুরু করলেন, তিনি বিশ্বাসই করতে পারলেন না কিভাবে আয়াতগুলো এত সুন্দরভাবে মিলে গেল। তিনি যা দেখেছিলেন তাতে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। প্রতিটি পৃষ্ঠার শুরু হয়েছিল কোন একটি পূর্ণ আয়াত দিয়ে, এবং পৃষ্ঠার শেষ হয়েছিল আরেকটি আয়াত শেষ করার মাধ্যমে। কোনো আয়াত কখনো পৃষ্ঠার ঠিক মাঝে বিভক্ত হয়নি। প্রতিটি পৃষ্ঠার সমাপ্তি হয়েছিলো কোন আয়াতের সমাপ্তির মাধ্যমে। আর পুরো কুরআন এইভাবে চলতে থাকে, ৬০০ পৃষ্ঠা। এটা কি অদ্ভুত না যে আল্লাহ তায়ালা নিজেই পবিত্র কুরআনে সঠিকভাবে লেখার উপায় কুরআনের মধ্যেই রেখে দিয়েছেন?
যারাই এই বিষয়টি দেখেছেন, তারাই অবাক হয়েছেন, এবং অতি অল্পসময়ের মধ্যেই, এই লেখার ধরন ইসলামিক বিশ্বের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একটা বিষয় কল্পনা করুন। ধরুণ এ পর্যন্ত লেখা প্রতিটি বই যদি আমরা একত্রিত করি, সেগুলিকে একটি কম্পিউটারে আপলোড করি। তারপর আমরা এআইকে প্রতিটি বই নতুন করে লিখতে বলি, কিন্তু সবচেয়ে ছোট অনুচ্ছেদটি একটি লাইনের জন্য মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করি এবং সবচেয়ে দীর্ঘ অনুচ্ছেদটি একটি পৃষ্ঠার আকার হিসেবে ব্যবহার করি। আপনার কি মনে হয়, এই বইগুলোর মধ্যে একটি বইও পবিত্র কুরআনের প্রতিটি পৃষ্ঠার সঙ্গে মিলে যেতে পারে?
আমার সত্যিই এটা মনে হয় না। এটি আবারও প্রমাণিত করে পবিত্র কুরআন আল্লাহ তায়ালার বাণী । কারণ পবিত্র কুরআনের কাঠামো এতটাই সূক্ষ্ম, এটা মানুষের পক্ষে স্বইচ্ছায় ডিজাইন করা অসম্ভব। এছাড়াও নবী মুহাম্মদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিরক্ষর ছিলেন; তিনি পড়তে বা লিখতে পারতেন না। এবং আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং সূরাগুলি ২৩ বছর সময় নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে, আর সর্বদা নির্দিষ্ট কোন সময়ে, সব একসাথে নাযিল হয়নি। আরও বিস্ময়কর বিষয় হল যে যে ক্রম অনুযায়ী সূরাগুলি অবতীর্ণ হয়েছে, আর নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সাহাবীদের যে ক্রম অনুযায়ী শেখাতেন তা সম্পুর্ণ আলাদা ছিলো। যেহেতু, তিনি নিজে এই কাঠামোর পরিকল্পনা করতে পারতেন না, এবং আমরা যেহেতু কখনোই অন্য কোনো বইতে এমনটা দেখিনি, তাহলে স্পষ্ট যে এটি একটি অলৌকিক ঘটনা। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালে, বিখ্যাত তাফসির (কুরআনিক ব্যাখ্যা) স্কলার বদিউজ্জামান একই সংকলনে আরও লুকানো রহস্য আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে মূল শব্দগুলি যেমন আল্লাহ, রব (স্রস্টা/প্রভু), রহমান (অতি দয়ালু), নবীদের নাম, এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো, এমনভাবে সুসজ্জিত ছিল, যা দেখে কখনই অপরিকল্পিত মনে হয় না । কিছু কিছু ক্ষেত্রে তসবীহতে গাঁথা পুতির মতো, একই পৃষ্ঠায় সুসজ্জিত দেখা গেছে। কিছু শব্দ একে অপরের উপর পুরোপুরি মিলে গেছে' যখন আপনি দুইটি মুখোমুখি পৃষ্ঠা একত্রিত করবেন। অন্যগুলো পৃষ্ঠার উভয় দিকে একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে। আসলে তিনি এমনভাবে একটি কুরআন লিখতে চেয়েছিলেন যাতে এই সাজ সজ্জাগুলি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। আর এখানে যা বেরিয়ে এলো তা ছিল পবিত্র কুরআনের আল্লাহ প্রদত্ত সজ্জিত রূপ। চলুন, একবার ভালো করে দেখার চেষ্টা করি। দেখা যাক, পৃষ্ঠা ৩৫-এ যাই। দেখুন কিভাবে 'রব' (স্রস্টা/প্রভু), মানে প্রভু শব্দটি যা আল্লাহর দিকে ইঙ্গিত করে, পাঁচবার একে অপরের সাথে সাজানো হয়েছে। এখন চলুন পৃষ্ঠা ৬২ এবং ৬৩-এ যাই। দেখুন পৃষ্ঠা ৬২-এ 'আল্লাহ' শব্দটি নয়বার কীভাবে বিন্যাস হয়েছে। কী চমৎকার একটি প্যাটার্ন। এর বিপরীত পৃষ্ঠায়, আবার একই ঘটনা ঘটছে। নয়টিই একটার নিচে আরেকটা সাজানো। পরপর পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকলে দেখবেন, সম্পূর্ণ কুরআন জুড়েই কেবল এই ভার্টিক্যাল এলাইনমেন্ট এই ঐশ্বরিক বিন্যাস, আমরা আরো দেখতে পাব, ২৫৯ পৃষ্ঠায় যাওয়া যাক। দেখুন এখানে রব শব্দটি কিভাবে এসেছে, একই পৃষ্ঠায় একটার উপর আরেকটা, এভাবে মোট নয় বার। ৮২ এবং ৮৩ পৃষ্ঠায় খুবই অবাক করা একটা বিষয় আছে। দেখুন কিভাবে আল্লাহ শব্দটি' দুইটি পরস্পর মুখোমুখি পৃষ্ঠায় চার বার এসেছে এবং কত নিখুঁতভাবে তা খাপে খাপে মানিয়ে গেছে। কী অসাধারণ, তাইনা?
সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সুসজ্জিত পবিত্র কুরআনের একই পাতার ২য় পৃষ্ঠায়ও তাই দেখা যায়। ৩৩ এবং ৩৪ পৃষ্ঠার সম্পূর্ণ পাতায় দেখা যাক। আবার যেই পাতায় ২৮৯ আর ২৯০ পৃষ্ঠা আছে, সেখানে কুরআন শব্দটি একই পাতার দুই অংশে নিখুঁতভাবে খাপে খাপে মিলে যায়। এরকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। যার মধ্যে আমি খুব সামান্যই দেখিয়েছি। এবার আপনি খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত একটা বিষয় দেখতে যাচ্ছেন। পৃষ্ঠা ৪২২। এখন আপনাদের সেই পৃষ্ঠায় নিয়ে যাই যেখানে আল্লাহ নামটি সবচেয়ে বেশিবার উল্লেখ করা হয়েছে। এই পৃষ্ঠায় আল্লাহ শব্দটি নিখুঁতভাবে বিন্যাসের মাধ্যমে ১৫ বার এসেছে। পুরো কুরআনের ৬০৪ পৃষ্ঠার মধ্যে, আল্লাহ শব্দটি এখানেই সবচেয়ে বেশি আছে। আর আপনি কি জানেন কোন আয়াতটি এই পৃষ্ঠার নিচের দিক থেকে তৃতীয় লাইনে শুরু হয়েছে?
"ইয়া আয়্যুহাল্লাযিনা আমানুয কুরুল্লহা যিকরন কাছিরো।" "হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।" আল্লাহ তায়ালা আমদেরকে অধিক পরিমাণে তাঁকে স্মরণ করতে বলেছেন, এবং এর সাথে তিনি তার নামও এই পৃষ্ঠায় সর্বাধিক উল্লেখ করেছেন, যা ঐশ্বরিক বিন্যাস সম্পর্কে কুরআনের আরেকটি অলৌকিকতা প্রদর্শন করে। বদিউজ্জামান যিনি কুরআনের এই অলৌকিকতা আবিষ্কার করেছিলেন, তার মতে, আল্লাহ শব্দটি কুরআনে ২,৮০৬ বার এসেছে। আর সবখানেই এরকম ঐশ্বরিক বিন্যাস দেখা যায়। এছাড়াও, রব (মালিক/প্রভু) শব্দটি ৮৪৬ বার এসেছে, রহিম (পরম করুণাময়) নামটি ২২০ বার, রহমান (অসীম দয়ালু) নামটি ১৫৬ বার। এবং এর অনেকগুলোয় আমরা আল্লাহ প্রদত্ত সুসজ্জিত করার বিষয়টি স্পষ্ট দেখতে পাই। আরেক সেট শব্দ এভাবে সাজানো লক্ষ্য করা যায় সেগুলো হচ্ছে নবীদের নাম। উদাহরণসরূপ, ৩২৭ পৃষ্ঠায়, আমরা সুলাইমান (আঃ) এবং দাউদ (আঃ) এর নাম দেখতে পাই। ওয়া সুলাইমান, সুলাইমান, ওয়া সুলাইমান। এছাড়াও আরবিতে "ওয়া" মানে কিন্তু "এবং"। এবং এছাড়াও দাউদ, এবং দাউদ। যেমন আপনি দেখতে পাচ্ছেন, নামগুলো একটার নিচে আরেকটা সাজানো আছে। ৪৪৯ পৃষ্ঠায়, আমরা নবিদের নাম দেখি ইসহাক (আঃ), মুসা (আঃ), এবং হারুন (আঃ)। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন মুসা, মুসা, হারুন এবং হারুন, ইসহাক এবং ইসহাক। দেখুন সবার কথাই এখানে দুইবার দেওয়া আছে। এবং সবার নামই এখানে লম্বালম্বি ভাবে সাজানো আছে। ১৯ নম্বার পৃষ্ঠায়, ইবরাহিম (আঃ) এর নাম পরপর তিন বার একের উপর এক নিখুভাবে সাজানো অবস্থায় এসেছে। যেমন দেখতে পাচ্ছেনঃ ইবরাহিম, ইবরাহিম, এবং আবারও ইবরাহিম। ২৩৫ পৃষ্ঠায়, ইউসুফ (আঃ) এর নাম চার বার এসেছে। এবং আবারো একি ভাবে, একটার নিচে আরেকটা। দেখুন, চারবারই নিখুঁতভাবে সাজানো রয়েছে। ইউসুফ, ইউসুফ, ইউসুফ, এবং আবার ইউসুফ। এখন যদি আমি আপনাকে ইউসুফ (আঃ) এর সবচেয়ে পরিচিত গুনের কথা জিজ্ঞাসা করি, এক কথায় আপনি কি বলবেন?
তার সৌন্দর্য, তাইনা? যেই গুনের কথা আমরা সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করি। ২৩৫ পৃষ্ঠায় যাওয়া যাক। এখানে ছয় নম্বর লাইনে ইউসুফ শব্দটি এসেছে। এখন, পৃষ্ঠা উলটিয়ে দেখি আগের পৃষ্ঠার কোন শব্দটার সাথে এই শব্দটা একই যায়গায় মিলেছে। দেখতে পাচ্ছেন, "জামীল", যার অর্থ সুন্দর। অদ্ভুত তাইনা?
আমরা এখানে এমন একটা বইয়ের কথা বলছি যেটা কিনা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ২৩ বছর ধরে অবতীর্ণ হয়েছে। মাঝে মাঝে কোন পরিস্থিতির অথবা কোন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হিসেবেও কোন কোন আয়াত নাজিল হয়েছিল। তাই, কেউ যদি দাবী করে কুরআন নবী (সঃ) লিখেছেন, নাউজুবিল্লাহ, তবে তাঁর তো এভাবে সাজানোর সময় পাবার কথা না। আমি কি বলতে চাচ্ছি তা আপনি তাঁর জীবনী পড়লেই, বুঝতে পারবেন। কখনো কখনো কোন আয়াত নাযিল হয়েছিল মানুষদের উত্তর দেওয়ার জন্য বা কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছিল। একবার ভাবুনতো, যদি তিনি এই কথাটি না বলতেন বা একই ভাবেই যদি না বলতেন, তাহলে কুরআনের সম্পূর্ণ গঠনশৈলীই নষ্ট হয়ে যেত। একজন মানুষ কি বলবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও, কিন্তু অন্য কেউ কি বলবে তা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবং অবশ্যই তার সাথে কী কী ঘটবে সম্পূর্ণই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যাই হচ্ছে এটাঃ এগুলো হল আল্লাহর বাণী, যার কাছে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সবকিছুরই জ্ঞান আছে। পূর্বের উদাহরণের দিকে যাই। ইউসুফ এবং জামীল যার মানে সুন্দর। তাহলে, কুরআনে আমরা যতদূর জানতে পেরেছি আল্লাহ প্রদত্ত সুসজ্জিত করার সাথে সাথে, এই বিশেষ ধরনের অলঙ্করণও আছে। চলুন এর থেকে আলাদা এক প্রকারের বিন্যাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই যা আপনাকে বিস্মিত করবে। আপনি কি আল কাহাফের (গুহাবাসী) অধিবাসীদের বিখ্যাত কুকুর সম্পর্কে শুনেছেন?
কুকুরটার নাম ছিল কিত্মির। এবার ২৯৪ পৃষ্ঠায় চলে যাই যেখানে তাদের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে । এখানে সপ্তম লাইনের শেষে, বলা হয়েছে, "ওয়া কাল্বুহুম," যার অর্থ, "এবং তাদের কুকুর।" কুকুরটার নাম কি ছিল? কিত্মির তাইনা? এখন, পাতা উল্টানো শুরু করুন। আমরা কতদূর যাবো? এক পৃষ্ঠা, দুই, ১০, ২০... ঠিক ১৪১ পৃষ্ঠা পর। এবং সপ্তম লাইনের শুরুতে আমরা কি পেলাম?
কিত্মির। এখানে একটা শব্দ সপ্তম লাইনের শেষে, এবং আরেকটা বসেছে শুরুতে। কিন্তু আপনি যদি কুরআন বন্ধ করে দেখেন, তাহলে দেখবেন, এই দুইটি শব্দ একশত পৃষ্ঠারও আগে পরে থাকার পরেও, সম্পূর্ণ ভাবে একে অপরের অভিমুখি। একবার ভাবুন তো। যদি সেই ১৪০ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করা ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে ঘটতো, অথবা ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে বলা হত, যদি বাক্যগঠন ভিন্ন হত, যদি সেই অংশগুলো বাদ দেওয়া হত, বা অন্যকিছু বর্ণনা করা হত, তাহলে এই এলাইনটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেত। অসংখ্য সম্ভাব্যতার মধ্যেও, এই সংস্করণই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। অভূতপূর্ব এই গ্রন্থটি গভীর অর্থসম্বলিত, এবং একই সাথে, শত শত অলৌকিকতার সমন্বয়ে পরিপূর্ণ। যা হয়তো আমদের বোধশক্তির বাইরে। এখন কি আপনি বুঝতে পারছেন কেন কেউই কুরআনের মতো কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারেনা?
অবশ্য এটাই একমাত্র কারণ নয়, যদিও এই অসাধারণ বৈশিষ্ট্যই কারো পক্ষে তৈরি করা সম্ভব না। চলুন এবার ২৯৪ পৃষ্ঠায় আসহাবে কাহাফ (গুহাবাসী) এর প্রসঙ্গে চলে যাই। যখন তারা তাদের সেই শান্তির আরামদায়ক ঘুম থেকে জেগে উঠল, তারা বুঝতে চেষ্টা করছিল তারা কতদিন এই গুহায় ছিল। ১১ নম্বর লাইনে তাদের একজন বলল, "লাবিসনা ইয়াওমান আও বা'দা ইয়াওম," "আমরা একদিন কিংবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি।" তারা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিল। এর বিপরীত পৃষ্ঠায় খেয়াল করে দেখুন। আল্লাহ যেন সরাসরি তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। "ওয়া লাবিসু ফি কাহফিহিম সালাসা মি'আতি সিনিনা ওয়াঝদাদু তিস'আ।" "আর তারা তাদের গুহায় অবস্থান করেছে তিনশ’ বছর এবং এর সাথে অতিরিক্ত হয়েছিল ‘নয়’।" আবার কুরআনে একই ধরনের অর্থ সম্বলিত দুটি আয়াত সমন্বয় করা হয়েছে যদিও বা তাদের মধ্যে ডজনেরও বেশি পৃষ্ঠা মাঝখানে থাকুক না কেন যা কুরআনের একটি ভিন্ন প্রকারের চাক্ষুষ অলৌকিকতা। উদাহরণস্বরূপ, ৩৪২ পৃষ্ঠায়, আমরা পড়ি, "ওয়া আনঝালনা মিনাস সামা'ই মা'আম বি কদর," "আর আমি আকাশ থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেছি।" ঠিক ১৪৭ পৃষ্ঠা পরে, ৪৮৯ পৃষ্ঠার শুরুতে বলা হয়েছে, "ওয়াল্লাযি নাঝঝালা মিনাস সামা'ই মা'আম বি ক্বদর," "আর যিনি আসমান থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেন।" যেমন দেখছেন, দুটি আয়াতের অর্থ একই রকম, এগুলোকে পৃষ্ঠার শুরুতে সমন্বয় করা হয়েছে। আবার, আপনি যদি ৭১ এবং ৫১১ নম্বর পৃষ্ঠায় ৪ নম্বর লাইন দেখেন, আপনি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন একই রকম অর্থের বাক্যগুলো, একই স্থান থেকে শুরু হয়েছে। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। "ইয়াকুলুনা বি আফওয়াহিহিম মা লাইসা ফি কুলুবিহিম," এবং আরেকটায়, "ইয়াকুলুনা বি আলসিনাতিহিম মা লাইসা ফি কুলুবিহিম," "তারা মুখে তা বলে যা তাদের অন্তরে নেই।" এদের মধ্যে ৪৪০ পৃষ্ঠার থাকার পরেও একই প্যাটার্ন ১১২ এবং ২৮৬ পৃষ্ঠা তুলনা করলে পাওয়া যায়। নিচের দিক থেকে চতুর্থ লাইনে লেখা আছে, "ওয়াবতাগু ইলাইহি ওয়াসিলা," "...এবং তার নৈকট্যের অনুসন্ধান কর," এবার অন্য পৃষ্ঠায় লক্ষ করলে দেখা যাবে। "ইয়াবতাগু ইলা রাব্বিহিমুল ওয়াসিলা," "তারা নিজেরাই তো তাদের রবের কাছে নৈকট্যের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে যে," এখন ২১৯ আর ৪১৫ পৃষ্ঠা দেখা যাক। দুটি পৃষ্ঠারই তৃতীয় লাইনে, আয়াত দুটিতে প্রায় একই শব্দ ব্যবহার করে শুরু করা হয়েছে। "ওয়ালাও শা'আ রাব্বুকা লা'আমানা মান ফিল আরদি কুল্লুহুম জামি'আ," "আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে যমীনের সকলেই ঈমান আনত।" এখানেও দুটি পৃষ্ঠাতেই তৃতীয় লাইনের আয়াতগুলোর অর্থ প্রায় একই। "ওয়ালাও শি'না লা'আতাইনা কুল্লা নাফসিন হুদাহা," "আর যদি আমি ইচ্ছা করতাম, তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার হিদায়াত দান করতাম।" যেমন এই আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, মানুষের ঈমান আল্লাহর প্রয়োজন নেই। বরং, আমাদের নিজের জন্যেই ঈমান প্রয়োজন। তিনি যদি চাইতেন, কোনরকম স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই আমাদেরকে ঈমান আনতে আদেশ দিতে পারতেন। কিন্তু, তারপরেও তিনি আমাদেরকে এমন অগণিত নিদর্শন দিয়ে রেখেছেন, যাতে আমরা ঈমান আনি এবং আমাদের পরকাল রক্ষা করতে পারি। যে কুরআনের কপিটির কথা আমরা বলছি এটি তিনটি প্রধান ঐশ্বরিকভাবে সমন্বিত কুরআনগুলোর মধ্যে একটা। যেমন আমি আগে উল্লেখ করেছি, এমন আরও দুটো আছে এবং প্রত্যেকটারই তার নিজস্ব এক অনন্যতা রয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে নিয়ে এটার মতো এতো বিস্তারিতভাবে পড়াশোনা করা হয়নি, তাই আমরা এখনো জানিনা সেগুলো আমাদের জন্য কি বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছে, অথবা আরো কতগুলো এমন ঐশ্বরিক বিন্যাস সম্বলিত কুরআন আবিষ্কৃত হবার অপেক্ষায় আছে। চলুন এবার আমরা চট করে দেখে আসি সেগুলোর মধ্যে একটা কুরআন কিভাবে লেখা হয়েছিল। অটোম্যান যুগের আরেকজন পণ্ডিত, হাফিয হুন্সারি। তিনি একবার নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) কে তাঁর স্বপ্নে দেখলেন। তখন পর্যন্ত, তিনিও হাতে কুরআন লিখছিলেন। স্বপ্নে, নবী মুম্মাদকে (সাঃ) তিনি তাঁর কাজের কথা বললেন, এবং একটা আধ্যাত্মিক উপহার চাইলেন। নবী করিম (সাঃ) তাঁর এই অনুরোধ রাখলেন এবং তাঁকে দেখালেন কুরআন লিখার ভিন্ন একটি উপায়। তাঁর এই নির্দেশাবলী অনুসরণ করে, তিনি প্রত্যেক পৃষ্ঠা ১১ লাইন করে লিখলেন, এর ফলাফল হয়েছিল চমকপ্রদ। এই কুরআনের প্রত্যেক পৃষ্ঠার লাইনের প্রথম অক্ষরগুলো একটা নিখুঁত প্যাটার্ন অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম লাইনটা যদি ফা হরফ দিয়ে শুরু হয়, তাহলে শেষের লাইনও ফা হরফ দিয়ে শুরু হবে। দ্বিতীয় লাইন যদি আলিফ দিয়ে শুরু হয়, তাহলে নিচের দিক দিয়ে দ্বিতীয় লাইনও আলিফ দিয়ে শুরু হবে। তৃতীয় লাইন এবং নিচের দিক দিয়ে তৃতীয় লাইনও একই প্যাটার্ন অনুসরণ করেঃ লাম, লাম। চতুর্থ লাইনও লাম দিয়ে শুরু হয়, নিচের দিক দিয়ে চতুর্থ লাইনও তাই লাম দিয়ে শুরু হয়। পঞ্চম লাইন শুরু হয় আলিফ দিয়ে, নিচের দিক থেকে পঞ্চম লাইনও আলিফ দিয়ে শুরু হয়। সম্পূর্ণ কুরআন জুড়েই এই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া যায়। পৃষ্ঠার পড় পৃষ্ঠা, লাইনের পর লাইন এই প্যাটার্ন অনুসরণ করেছে। আপনি যেই পৃষ্ঠাতেই যান না কেন। তৃতীয় ঐশ্বরিক বিন্যাস সম্ববলিত কুরআন পাকিস্তানের লাহোর থেকে আমাদের কাছে এসেছে। এটার নাম কুরআন মজিদ আলফি। সে সময়, এটা সম্পূর্ণ হতে ১২ বছর লেগেছিল, যেই পণ্ডিত এটা লিখে ছিলেন তিনি ক্রমাগত রোজা রাখতেন। এটার প্রত্যেক পৃষ্ঠায় ২১ টা লাইন আছে, যেমনটা দেখছেন, প্রত্যেকটা লাইন আলিফ হরফ দিয়ে শুরু হয়েছে। আপনি যেই পৃষ্ঠাতেই যাননা কেন, সবখানেই এই একই ব্যাপার দেখতে পারবেন। সম্পূর্ণ মুসহাফটিতে (হার্ড কপি) ২২১টি পৃষ্ঠা আছে। হাফিয হান্সারির স্টাইলে লেখা মুসহাফের মতো, এই মুসহাফটির অনন্য ডিজাইন আর অন্য কোন বইয়ে পাওয়া যাবেনা। আর যেমন দেখতে পাচ্ছেন, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বাণীকে এই তিনটি অবিশ্বাস্য দৃশ্যমান কাঠামোর সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ করে দিয়েছেন, যা সন্দেহের আর কোন অবকাশই রাখেনা। কিন্তু যদি আমি আপনাদের বলি যে এগুলোই শেষ নয়?
এখন আমি আপনাদেরকে এমন অলৌকিক বিষয় দেখাব যা এই সৌন্দর্যকে একটি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবে এমনকি কুরআনে কিছু শব্দের পুনরাবৃত্তির সংখ্যাও একটি অলৌকিকতা প্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, "ইয়াওম" শব্দটির অর্থ, "দিন", যা কুরআনে ঠিক ৩৬৫ বার এসেছে, স্পষ্টতই এটা একটি বছরে দিনের সংখ্যার দিকে নির্দেশ করে। "শাহার" শব্দটির অর্থ "মাস" যা কুরআনে ঠিক ১২ বার এসেছে, পুরো বছরের মাসের সংখ্যার নির্দেশ করার মতো। "মালাক" শব্দটির অর্থ "ফেরেশতা," এর বিপরীত হল "শয়তান," দুটোই ৮৮ বার এসেছে। আপনি এটা এআই দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। সংখ্যাগুলো একদম একই। জান্নাত এবং জাহান্নাম, দুটোই ৭৭ বার এসেছে। "রাজুল" (পুরুষ) এবং ইমরা'আ (নারী), উভয়েই ২৪ বার করে এসেছে।" আরেকটি উদাহরনঃ পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "অবশ্যই, ঈসা (আঃ) আল্লাহর দৃষ্টিতে আদমের (আঃ) মতোই। এই আয়াত দ্বারা বোঝানো হয়েছে দুজনকেই আল্লাহ বাবা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন, তারা অন্য মানুষের থেকে আলাদা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাঁদের দুজনের নামই ঈসা এবং আদম, কুরআনে ২৪ বার এসেছে। সমানভাবে তাদের নাম নেওয়া হয়েছে। এবার, আপনাদেরকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা উদাহরণ দেই। কুরআনে সবচেয়ে বড় সুরা, সুরা আল-বাকারায়, ২৮৬টি আয়াত আছে। এই সুরাতে আল্লাহ শব্দটি ২৮২ বার এসেছে। এবং "হুয়া" সর্বনামটি এসেছে ৪ বার, যার অর্থ "তিনি" এখানে তিনি বলতে আল্লাহ তায়ালাকেই বোঝানো হচ্ছে। দুটো যোগ করলে, নিখুঁতভাবে হয়ঃ ২৮৬ বার। যা হুবহু সুরাটির আয়াত সংখ্যার সমান। অথবা, সুরা আন-নিসার কথা যদি ধরি, আল-মায়েদা এবং সুরা আন-আম। এই তিনটি সূরার মোট আয়াত সংখ্যা ৪৬৪। বলুন তো কি ঘটলো?
আল্লাহর নাম এই তিনটি সুরায় ঠিক ৪৬৪ বার এসেছে। এবার, এর থেকেও বিস্ময়কর প্যাটার্নের ব্যাপারে বলি। প্রথম পাঁচটা সুরা, সুরা বাকারা থেকে শুরু করে, আল ইমরান, আন-নিসা, আল-মায়িদা, এবং আন-আম, ২ থেকে ৬ নম্বর অধ্যায়। এই গ্রুপে 'আল্লাহ' নামটি যতবার এসেছে, তা ঠিক পরবর্তী পাঁচটি সূরার মোট সংখ্যার দ্বিগুণ: আল-আরাফ, আল- আনফাল, আত-তাওবা, ইউনুস, এবং হুদ। এবং আবারও, এরকম চলতেই থাকে। দ্বিতীয় গ্রুপটিও ঠিক পরবর্তী পাঁচটির দ্বিগুণ: ইউসুফ, রা'দ, ইবরাহিম, আল-হিজর এবং আন-নাহল। এই সুরাগুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। তবুও, অলৌকিকভাবে, কুরআনে আমরা এই প্যাটার্নটি দেখতে পাই। আর এগুলো তো শুধু আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি সেটুকুই। কে জানে আরও কতগুলো আয়াতে একই ধরনের প্যাটার্ন আছে। সব শেষে আমাদের এই বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। একজন মানুষের পক্ষে এতকিছু একসাথে সুসজ্জিত করা এক কথায় অসম্ভব। এমনকি নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেও কখনো এই বিষয়টিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেননি। যদি তিনি এভাবে কুরআন সাজাতেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে উল্লেখ করতেন।" মূলত এগুলো বহু শতাব্দী পরে আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়াও, কুরআনের বিষয়বস্তু অন্য যে কোনো বইয়ের মতো না। কুরআন আমাদের ঈমানি শিক্ষা দেয়, নবীদের কাহিনী বর্ণনা করে, এটি প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোকে কিভাবে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে হয় তা শেখায়, এবং এই পবিত্র কুরআন পরকাল, জান্নাত ও জাহান্নাম, পুরস্কার এবং শাস্তি সম্পর্কে আমদের অবহিত করে। কখনো কখনো এটা ইতিহাসের গভীরেও প্রবেশ করে; কখনো কখনো, এই বইটি ভবিষ্যতে আসন্ন ঘটনাগুলোর ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী করে। এটি দার্শনিক সমস্যা সমাধান করে যা কোনো চিন্তাবিদ কখনো সমাধান করতে পারেনি। এটি আদর্শ অভিভাবক কীভাবে হতে হয় তা শেখায়, ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা সম্পর্কে অবহিত করে," এটি চিকিৎসা ক্ষেত্রও অসামান্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে, এই কুরআন ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব নিদর্শন দেখিয়েছে। এটি আইনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী পরামর্শ দেয়, বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়গুলো তুলে ধরে, এটি শিক্ষাক্ষেত্রে এবং সমাজবিজ্ঞানেও আমাদেরকে মূল্যবান বিষয়ে শিক্ষা দেয়। আর এটাতো পুরো তালিকাও নয়। একজন মানুষ বড়জোর একটা বা দুইটা ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতে পারে, কিন্তু কুরআন একটি অলৌকিক সাদৃশ্যপূর্ণ কাঠামোর মাধ্যমে সকল জ্ঞান ধারণ করে এবং তার বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এর লাইনের মধ্যে গণিতবিদ্যা আছে। এর আয়াত প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। এর বাকশৈলীতে, শিল্প আছে। এর আয়াতসমূহ, জ্ঞান মণ্ডিত। এবং এর বাণীতে রয়েছে চিরন্তনতা। পবিত্র কুরআন একটি ঐশ্বরিক গ্রন্থ যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দেশনা দিতে আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। "তো, এমন একটি প্রজন্মের জন্য এটা পরিষ্কারভাবে একটা অলৌকিক দৃষ্টান্ত নয় কি?
যারা বলে, 'আমি আমার চোখে না দেখলে কিছুই বিশ্বাস করি না'।
এই মুশহাফে (কুরআনের একটি সংকলন), প্রতিটি লাইন একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তা করে দেখুন। প্রতিটি পৃষ্ঠায় সমান সংখ্যক লাইন রয়েছে, প্রতিটি লাইন একই দৈর্ঘ্যের, এবং সেই লাইনগুলোর প্রত্যেকটা একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। অথবা, কুরআনের এই সংকলনটিতে, প্রতিটি পৃষ্ঠায় একটি সাদৃশ্যপূর্ণ প্যাটার্ন রয়েছে এই পৃষ্টায় প্রথম এবং শেষ লাইন একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। দ্বিতীয় লাইন এবং শেষ থেকে দ্বিতীয় লাইনও একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়। উপরে থেকে তৃতীয় লাইন এবং নিচ থেকে তৃতীয় লাইন আবারও একই। প্রতিটি লাইন এই নিয়মটি অনুসরণ করে, এবং আমরা দেখতে পাচ্ছি একই অলৌকিক ঘটনা প্রতিটি পৃষ্ঠায় পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এখন, আপনারা যে মুশহাফটি দেখছেন এটা হয়তো সবচেয়ে বেশি অবাক করার মতো। আজ, আমরা বেশ চমৎকার কিছু বিষয় দেখিয়েছি যা আপনাদের ঈমানকে আরো সুদৃঢ় নতুন একটি স্তরে নিয়ে যাবে। ১৮০০ শতকের শেষদিকে, হাফিজ ওসমান নূরি (রহঃ) নামক একজন ক্যালিগ্রাফার ছিলেন যিনি নিজ হাতে ১০৬ বার পুরো কুরআনকে লিখেছেন। জী, ১০৬ বার। কিন্তু শুধু তাঁর লেখা মুশহাফই তাঁর রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় কীর্তি নয়। এটি ছিল তাঁর লেখার ধরণ বা শৈলী এবং পৃষ্ঠার গঠন, যা এখন বিশ্বের নানা দেশে গৃহীত হয়েছে। একদিন, যখন পবিত্র কুরআনকে আরো একবার লিখতে গিয়ে, তিনি নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করেছিলেন: "কুরআন লেখার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?" সেই সময়, তাঁর কাছে কোনো ধারণাই ছিল না যে তিনি একটি অলৌকিক বিষয় আবিষ্কার করতে চলেছেন। কিছু সময় পরে, আল্লাহ তার হৃদয়ে একটি ধারণা দিয়ে অনুপ্রেরণা দেন। তিনি কুরআনের নিজস্ব মাপজোখ ব্যবহার করে একটি মুশহাফ লিখতে যাচ্ছিলেন। প্রতিটি লাইনের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করতে, তিনি সবচেয়ে ছোট সূরা (অধ্যায়) ব্যবহার করেছিলেন, সূরা আল-কাউসার (প্রাচুর্য কল্যাণের অধ্যায়), সেই লাইনটিকে রেফারেন্স হিসেবে নিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন প্রতিটি লাইন ওই সূরার মতো দৈর্ঘ্য হবে। একটি পৃষ্ঠার দৈর্ঘ্য নির্ধারণের জন্য, তিনি সবচেয়ে দীর্ঘ আয়াত (বাক্য) নির্বাচন করেছিলেন, আয়াত আল মুদায়ানা (ঋণ সম্পর্কিত আয়াত)। আর প্রতিটি পৃষ্ঠার দৈর্ঘ্য ওই আয়াতের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী হবে, যা একটি সম্পূর্ণ পৃষ্ঠা। কিন্তু যখন তিনি লেখা শুরু করলেন, তিনি বিশ্বাসই করতে পারলেন না কিভাবে আয়াতগুলো এত সুন্দরভাবে মিলে গেল। তিনি যা দেখেছিলেন তাতে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। প্রতিটি পৃষ্ঠার শুরু হয়েছিল কোন একটি পূর্ণ আয়াত দিয়ে, এবং পৃষ্ঠার শেষ হয়েছিল আরেকটি আয়াত শেষ করার মাধ্যমে। কোনো আয়াত কখনো পৃষ্ঠার ঠিক মাঝে বিভক্ত হয়নি। প্রতিটি পৃষ্ঠার সমাপ্তি হয়েছিলো কোন আয়াতের সমাপ্তির মাধ্যমে। আর পুরো কুরআন এইভাবে চলতে থাকে, ৬০০ পৃষ্ঠা। এটা কি অদ্ভুত না যে আল্লাহ তায়ালা নিজেই পবিত্র কুরআনে সঠিকভাবে লেখার উপায় কুরআনের মধ্যেই রেখে দিয়েছেন?
যারাই এই বিষয়টি দেখেছেন, তারাই অবাক হয়েছেন, এবং অতি অল্পসময়ের মধ্যেই, এই লেখার ধরন ইসলামিক বিশ্বের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একটা বিষয় কল্পনা করুন। ধরুণ এ পর্যন্ত লেখা প্রতিটি বই যদি আমরা একত্রিত করি, সেগুলিকে একটি কম্পিউটারে আপলোড করি। তারপর আমরা এআইকে প্রতিটি বই নতুন করে লিখতে বলি, কিন্তু সবচেয়ে ছোট অনুচ্ছেদটি একটি লাইনের জন্য মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করি এবং সবচেয়ে দীর্ঘ অনুচ্ছেদটি একটি পৃষ্ঠার আকার হিসেবে ব্যবহার করি। আপনার কি মনে হয়, এই বইগুলোর মধ্যে একটি বইও পবিত্র কুরআনের প্রতিটি পৃষ্ঠার সঙ্গে মিলে যেতে পারে?
আমার সত্যিই এটা মনে হয় না। এটি আবারও প্রমাণিত করে পবিত্র কুরআন আল্লাহ তায়ালার বাণী । কারণ পবিত্র কুরআনের কাঠামো এতটাই সূক্ষ্ম, এটা মানুষের পক্ষে স্বইচ্ছায় ডিজাইন করা অসম্ভব। এছাড়াও নবী মুহাম্মদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিরক্ষর ছিলেন; তিনি পড়তে বা লিখতে পারতেন না। এবং আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং সূরাগুলি ২৩ বছর সময় নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে, আর সর্বদা নির্দিষ্ট কোন সময়ে, সব একসাথে নাযিল হয়নি। আরও বিস্ময়কর বিষয় হল যে যে ক্রম অনুযায়ী সূরাগুলি অবতীর্ণ হয়েছে, আর নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সাহাবীদের যে ক্রম অনুযায়ী শেখাতেন তা সম্পুর্ণ আলাদা ছিলো। যেহেতু, তিনি নিজে এই কাঠামোর পরিকল্পনা করতে পারতেন না, এবং আমরা যেহেতু কখনোই অন্য কোনো বইতে এমনটা দেখিনি, তাহলে স্পষ্ট যে এটি একটি অলৌকিক ঘটনা। পরবর্তীতে ১৯৩২ সালে, বিখ্যাত তাফসির (কুরআনিক ব্যাখ্যা) স্কলার বদিউজ্জামান একই সংকলনে আরও লুকানো রহস্য আবিষ্কার করেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে মূল শব্দগুলি যেমন আল্লাহ, রব (স্রস্টা/প্রভু), রহমান (অতি দয়ালু), নবীদের নাম, এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো, এমনভাবে সুসজ্জিত ছিল, যা দেখে কখনই অপরিকল্পিত মনে হয় না । কিছু কিছু ক্ষেত্রে তসবীহতে গাঁথা পুতির মতো, একই পৃষ্ঠায় সুসজ্জিত দেখা গেছে। কিছু শব্দ একে অপরের উপর পুরোপুরি মিলে গেছে' যখন আপনি দুইটি মুখোমুখি পৃষ্ঠা একত্রিত করবেন। অন্যগুলো পৃষ্ঠার উভয় দিকে একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে গেছে। আসলে তিনি এমনভাবে একটি কুরআন লিখতে চেয়েছিলেন যাতে এই সাজ সজ্জাগুলি স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। আর এখানে যা বেরিয়ে এলো তা ছিল পবিত্র কুরআনের আল্লাহ প্রদত্ত সজ্জিত রূপ। চলুন, একবার ভালো করে দেখার চেষ্টা করি। দেখা যাক, পৃষ্ঠা ৩৫-এ যাই। দেখুন কিভাবে 'রব' (স্রস্টা/প্রভু), মানে প্রভু শব্দটি যা আল্লাহর দিকে ইঙ্গিত করে, পাঁচবার একে অপরের সাথে সাজানো হয়েছে। এখন চলুন পৃষ্ঠা ৬২ এবং ৬৩-এ যাই। দেখুন পৃষ্ঠা ৬২-এ 'আল্লাহ' শব্দটি নয়বার কীভাবে বিন্যাস হয়েছে। কী চমৎকার একটি প্যাটার্ন। এর বিপরীত পৃষ্ঠায়, আবার একই ঘটনা ঘটছে। নয়টিই একটার নিচে আরেকটা সাজানো। পরপর পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকলে দেখবেন, সম্পূর্ণ কুরআন জুড়েই কেবল এই ভার্টিক্যাল এলাইনমেন্ট এই ঐশ্বরিক বিন্যাস, আমরা আরো দেখতে পাব, ২৫৯ পৃষ্ঠায় যাওয়া যাক। দেখুন এখানে রব শব্দটি কিভাবে এসেছে, একই পৃষ্ঠায় একটার উপর আরেকটা, এভাবে মোট নয় বার। ৮২ এবং ৮৩ পৃষ্ঠায় খুবই অবাক করা একটা বিষয় আছে। দেখুন কিভাবে আল্লাহ শব্দটি' দুইটি পরস্পর মুখোমুখি পৃষ্ঠায় চার বার এসেছে এবং কত নিখুঁতভাবে তা খাপে খাপে মানিয়ে গেছে। কী অসাধারণ, তাইনা?
সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সুসজ্জিত পবিত্র কুরআনের একই পাতার ২য় পৃষ্ঠায়ও তাই দেখা যায়। ৩৩ এবং ৩৪ পৃষ্ঠার সম্পূর্ণ পাতায় দেখা যাক। আবার যেই পাতায় ২৮৯ আর ২৯০ পৃষ্ঠা আছে, সেখানে কুরআন শব্দটি একই পাতার দুই অংশে নিখুঁতভাবে খাপে খাপে মিলে যায়। এরকম আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। যার মধ্যে আমি খুব সামান্যই দেখিয়েছি। এবার আপনি খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত একটা বিষয় দেখতে যাচ্ছেন। পৃষ্ঠা ৪২২। এখন আপনাদের সেই পৃষ্ঠায় নিয়ে যাই যেখানে আল্লাহ নামটি সবচেয়ে বেশিবার উল্লেখ করা হয়েছে। এই পৃষ্ঠায় আল্লাহ শব্দটি নিখুঁতভাবে বিন্যাসের মাধ্যমে ১৫ বার এসেছে। পুরো কুরআনের ৬০৪ পৃষ্ঠার মধ্যে, আল্লাহ শব্দটি এখানেই সবচেয়ে বেশি আছে। আর আপনি কি জানেন কোন আয়াতটি এই পৃষ্ঠার নিচের দিক থেকে তৃতীয় লাইনে শুরু হয়েছে?
"ইয়া আয়্যুহাল্লাযিনা আমানুয কুরুল্লহা যিকরন কাছিরো।" "হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।" আল্লাহ তায়ালা আমদেরকে অধিক পরিমাণে তাঁকে স্মরণ করতে বলেছেন, এবং এর সাথে তিনি তার নামও এই পৃষ্ঠায় সর্বাধিক উল্লেখ করেছেন, যা ঐশ্বরিক বিন্যাস সম্পর্কে কুরআনের আরেকটি অলৌকিকতা প্রদর্শন করে। বদিউজ্জামান যিনি কুরআনের এই অলৌকিকতা আবিষ্কার করেছিলেন, তার মতে, আল্লাহ শব্দটি কুরআনে ২,৮০৬ বার এসেছে। আর সবখানেই এরকম ঐশ্বরিক বিন্যাস দেখা যায়। এছাড়াও, রব (মালিক/প্রভু) শব্দটি ৮৪৬ বার এসেছে, রহিম (পরম করুণাময়) নামটি ২২০ বার, রহমান (অসীম দয়ালু) নামটি ১৫৬ বার। এবং এর অনেকগুলোয় আমরা আল্লাহ প্রদত্ত সুসজ্জিত করার বিষয়টি স্পষ্ট দেখতে পাই। আরেক সেট শব্দ এভাবে সাজানো লক্ষ্য করা যায় সেগুলো হচ্ছে নবীদের নাম। উদাহরণসরূপ, ৩২৭ পৃষ্ঠায়, আমরা সুলাইমান (আঃ) এবং দাউদ (আঃ) এর নাম দেখতে পাই। ওয়া সুলাইমান, সুলাইমান, ওয়া সুলাইমান। এছাড়াও আরবিতে "ওয়া" মানে কিন্তু "এবং"। এবং এছাড়াও দাউদ, এবং দাউদ। যেমন আপনি দেখতে পাচ্ছেন, নামগুলো একটার নিচে আরেকটা সাজানো আছে। ৪৪৯ পৃষ্ঠায়, আমরা নবিদের নাম দেখি ইসহাক (আঃ), মুসা (আঃ), এবং হারুন (আঃ)। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন মুসা, মুসা, হারুন এবং হারুন, ইসহাক এবং ইসহাক। দেখুন সবার কথাই এখানে দুইবার দেওয়া আছে। এবং সবার নামই এখানে লম্বালম্বি ভাবে সাজানো আছে। ১৯ নম্বার পৃষ্ঠায়, ইবরাহিম (আঃ) এর নাম পরপর তিন বার একের উপর এক নিখুভাবে সাজানো অবস্থায় এসেছে। যেমন দেখতে পাচ্ছেনঃ ইবরাহিম, ইবরাহিম, এবং আবারও ইবরাহিম। ২৩৫ পৃষ্ঠায়, ইউসুফ (আঃ) এর নাম চার বার এসেছে। এবং আবারো একি ভাবে, একটার নিচে আরেকটা। দেখুন, চারবারই নিখুঁতভাবে সাজানো রয়েছে। ইউসুফ, ইউসুফ, ইউসুফ, এবং আবার ইউসুফ। এখন যদি আমি আপনাকে ইউসুফ (আঃ) এর সবচেয়ে পরিচিত গুনের কথা জিজ্ঞাসা করি, এক কথায় আপনি কি বলবেন?
তার সৌন্দর্য, তাইনা? যেই গুনের কথা আমরা সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করি। ২৩৫ পৃষ্ঠায় যাওয়া যাক। এখানে ছয় নম্বর লাইনে ইউসুফ শব্দটি এসেছে। এখন, পৃষ্ঠা উলটিয়ে দেখি আগের পৃষ্ঠার কোন শব্দটার সাথে এই শব্দটা একই যায়গায় মিলেছে। দেখতে পাচ্ছেন, "জামীল", যার অর্থ সুন্দর। অদ্ভুত তাইনা?
আমরা এখানে এমন একটা বইয়ের কথা বলছি যেটা কিনা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ২৩ বছর ধরে অবতীর্ণ হয়েছে। মাঝে মাঝে কোন পরিস্থিতির অথবা কোন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হিসেবেও কোন কোন আয়াত নাজিল হয়েছিল। তাই, কেউ যদি দাবী করে কুরআন নবী (সঃ) লিখেছেন, নাউজুবিল্লাহ, তবে তাঁর তো এভাবে সাজানোর সময় পাবার কথা না। আমি কি বলতে চাচ্ছি তা আপনি তাঁর জীবনী পড়লেই, বুঝতে পারবেন। কখনো কখনো কোন আয়াত নাযিল হয়েছিল মানুষদের উত্তর দেওয়ার জন্য বা কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছিল। একবার ভাবুনতো, যদি তিনি এই কথাটি না বলতেন বা একই ভাবেই যদি না বলতেন, তাহলে কুরআনের সম্পূর্ণ গঠনশৈলীই নষ্ট হয়ে যেত। একজন মানুষ কি বলবে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও, কিন্তু অন্য কেউ কি বলবে তা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এবং অবশ্যই তার সাথে কী কী ঘটবে সম্পূর্ণই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এর একমাত্র সম্ভাব্য ব্যাখ্যাই হচ্ছে এটাঃ এগুলো হল আল্লাহর বাণী, যার কাছে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সবকিছুরই জ্ঞান আছে। পূর্বের উদাহরণের দিকে যাই। ইউসুফ এবং জামীল যার মানে সুন্দর। তাহলে, কুরআনে আমরা যতদূর জানতে পেরেছি আল্লাহ প্রদত্ত সুসজ্জিত করার সাথে সাথে, এই বিশেষ ধরনের অলঙ্করণও আছে। চলুন এর থেকে আলাদা এক প্রকারের বিন্যাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই যা আপনাকে বিস্মিত করবে। আপনি কি আল কাহাফের (গুহাবাসী) অধিবাসীদের বিখ্যাত কুকুর সম্পর্কে শুনেছেন?
কুকুরটার নাম ছিল কিত্মির। এবার ২৯৪ পৃষ্ঠায় চলে যাই যেখানে তাদের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে । এখানে সপ্তম লাইনের শেষে, বলা হয়েছে, "ওয়া কাল্বুহুম," যার অর্থ, "এবং তাদের কুকুর।" কুকুরটার নাম কি ছিল? কিত্মির তাইনা? এখন, পাতা উল্টানো শুরু করুন। আমরা কতদূর যাবো? এক পৃষ্ঠা, দুই, ১০, ২০... ঠিক ১৪১ পৃষ্ঠা পর। এবং সপ্তম লাইনের শুরুতে আমরা কি পেলাম?
কিত্মির। এখানে একটা শব্দ সপ্তম লাইনের শেষে, এবং আরেকটা বসেছে শুরুতে। কিন্তু আপনি যদি কুরআন বন্ধ করে দেখেন, তাহলে দেখবেন, এই দুইটি শব্দ একশত পৃষ্ঠারও আগে পরে থাকার পরেও, সম্পূর্ণ ভাবে একে অপরের অভিমুখি। একবার ভাবুন তো। যদি সেই ১৪০ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করা ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে ঘটতো, অথবা ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে বলা হত, যদি বাক্যগঠন ভিন্ন হত, যদি সেই অংশগুলো বাদ দেওয়া হত, বা অন্যকিছু বর্ণনা করা হত, তাহলে এই এলাইনটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেত। অসংখ্য সম্ভাব্যতার মধ্যেও, এই সংস্করণই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। অভূতপূর্ব এই গ্রন্থটি গভীর অর্থসম্বলিত, এবং একই সাথে, শত শত অলৌকিকতার সমন্বয়ে পরিপূর্ণ। যা হয়তো আমদের বোধশক্তির বাইরে। এখন কি আপনি বুঝতে পারছেন কেন কেউই কুরআনের মতো কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারেনা?
অবশ্য এটাই একমাত্র কারণ নয়, যদিও এই অসাধারণ বৈশিষ্ট্যই কারো পক্ষে তৈরি করা সম্ভব না। চলুন এবার ২৯৪ পৃষ্ঠায় আসহাবে কাহাফ (গুহাবাসী) এর প্রসঙ্গে চলে যাই। যখন তারা তাদের সেই শান্তির আরামদায়ক ঘুম থেকে জেগে উঠল, তারা বুঝতে চেষ্টা করছিল তারা কতদিন এই গুহায় ছিল। ১১ নম্বর লাইনে তাদের একজন বলল, "লাবিসনা ইয়াওমান আও বা'দা ইয়াওম," "আমরা একদিন কিংবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি।" তারা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছিল। এর বিপরীত পৃষ্ঠায় খেয়াল করে দেখুন। আল্লাহ যেন সরাসরি তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। "ওয়া লাবিসু ফি কাহফিহিম সালাসা মি'আতি সিনিনা ওয়াঝদাদু তিস'আ।" "আর তারা তাদের গুহায় অবস্থান করেছে তিনশ’ বছর এবং এর সাথে অতিরিক্ত হয়েছিল ‘নয়’।" আবার কুরআনে একই ধরনের অর্থ সম্বলিত দুটি আয়াত সমন্বয় করা হয়েছে যদিও বা তাদের মধ্যে ডজনেরও বেশি পৃষ্ঠা মাঝখানে থাকুক না কেন যা কুরআনের একটি ভিন্ন প্রকারের চাক্ষুষ অলৌকিকতা। উদাহরণস্বরূপ, ৩৪২ পৃষ্ঠায়, আমরা পড়ি, "ওয়া আনঝালনা মিনাস সামা'ই মা'আম বি কদর," "আর আমি আকাশ থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেছি।" ঠিক ১৪৭ পৃষ্ঠা পরে, ৪৮৯ পৃষ্ঠার শুরুতে বলা হয়েছে, "ওয়াল্লাযি নাঝঝালা মিনাস সামা'ই মা'আম বি ক্বদর," "আর যিনি আসমান থেকে পরিমিতভাবে পানি বর্ষণ করেন।" যেমন দেখছেন, দুটি আয়াতের অর্থ একই রকম, এগুলোকে পৃষ্ঠার শুরুতে সমন্বয় করা হয়েছে। আবার, আপনি যদি ৭১ এবং ৫১১ নম্বর পৃষ্ঠায় ৪ নম্বর লাইন দেখেন, আপনি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন একই রকম অর্থের বাক্যগুলো, একই স্থান থেকে শুরু হয়েছে। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। "ইয়াকুলুনা বি আফওয়াহিহিম মা লাইসা ফি কুলুবিহিম," এবং আরেকটায়, "ইয়াকুলুনা বি আলসিনাতিহিম মা লাইসা ফি কুলুবিহিম," "তারা মুখে তা বলে যা তাদের অন্তরে নেই।" এদের মধ্যে ৪৪০ পৃষ্ঠার থাকার পরেও একই প্যাটার্ন ১১২ এবং ২৮৬ পৃষ্ঠা তুলনা করলে পাওয়া যায়। নিচের দিক থেকে চতুর্থ লাইনে লেখা আছে, "ওয়াবতাগু ইলাইহি ওয়াসিলা," "...এবং তার নৈকট্যের অনুসন্ধান কর," এবার অন্য পৃষ্ঠায় লক্ষ করলে দেখা যাবে। "ইয়াবতাগু ইলা রাব্বিহিমুল ওয়াসিলা," "তারা নিজেরাই তো তাদের রবের কাছে নৈকট্যের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে যে," এখন ২১৯ আর ৪১৫ পৃষ্ঠা দেখা যাক। দুটি পৃষ্ঠারই তৃতীয় লাইনে, আয়াত দুটিতে প্রায় একই শব্দ ব্যবহার করে শুরু করা হয়েছে। "ওয়ালাও শা'আ রাব্বুকা লা'আমানা মান ফিল আরদি কুল্লুহুম জামি'আ," "আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে যমীনের সকলেই ঈমান আনত।" এখানেও দুটি পৃষ্ঠাতেই তৃতীয় লাইনের আয়াতগুলোর অর্থ প্রায় একই। "ওয়ালাও শি'না লা'আতাইনা কুল্লা নাফসিন হুদাহা," "আর যদি আমি ইচ্ছা করতাম, তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার হিদায়াত দান করতাম।" যেমন এই আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, মানুষের ঈমান আল্লাহর প্রয়োজন নেই। বরং, আমাদের নিজের জন্যেই ঈমান প্রয়োজন। তিনি যদি চাইতেন, কোনরকম স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই আমাদেরকে ঈমান আনতে আদেশ দিতে পারতেন। কিন্তু, তারপরেও তিনি আমাদেরকে এমন অগণিত নিদর্শন দিয়ে রেখেছেন, যাতে আমরা ঈমান আনি এবং আমাদের পরকাল রক্ষা করতে পারি। যে কুরআনের কপিটির কথা আমরা বলছি এটি তিনটি প্রধান ঐশ্বরিকভাবে সমন্বিত কুরআনগুলোর মধ্যে একটা। যেমন আমি আগে উল্লেখ করেছি, এমন আরও দুটো আছে এবং প্রত্যেকটারই তার নিজস্ব এক অনন্যতা রয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে নিয়ে এটার মতো এতো বিস্তারিতভাবে পড়াশোনা করা হয়নি, তাই আমরা এখনো জানিনা সেগুলো আমাদের জন্য কি বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছে, অথবা আরো কতগুলো এমন ঐশ্বরিক বিন্যাস সম্বলিত কুরআন আবিষ্কৃত হবার অপেক্ষায় আছে। চলুন এবার আমরা চট করে দেখে আসি সেগুলোর মধ্যে একটা কুরআন কিভাবে লেখা হয়েছিল। অটোম্যান যুগের আরেকজন পণ্ডিত, হাফিয হুন্সারি। তিনি একবার নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) কে তাঁর স্বপ্নে দেখলেন। তখন পর্যন্ত, তিনিও হাতে কুরআন লিখছিলেন। স্বপ্নে, নবী মুম্মাদকে (সাঃ) তিনি তাঁর কাজের কথা বললেন, এবং একটা আধ্যাত্মিক উপহার চাইলেন। নবী করিম (সাঃ) তাঁর এই অনুরোধ রাখলেন এবং তাঁকে দেখালেন কুরআন লিখার ভিন্ন একটি উপায়। তাঁর এই নির্দেশাবলী অনুসরণ করে, তিনি প্রত্যেক পৃষ্ঠা ১১ লাইন করে লিখলেন, এর ফলাফল হয়েছিল চমকপ্রদ। এই কুরআনের প্রত্যেক পৃষ্ঠার লাইনের প্রথম অক্ষরগুলো একটা নিখুঁত প্যাটার্ন অনুসরণ করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম লাইনটা যদি ফা হরফ দিয়ে শুরু হয়, তাহলে শেষের লাইনও ফা হরফ দিয়ে শুরু হবে। দ্বিতীয় লাইন যদি আলিফ দিয়ে শুরু হয়, তাহলে নিচের দিক দিয়ে দ্বিতীয় লাইনও আলিফ দিয়ে শুরু হবে। তৃতীয় লাইন এবং নিচের দিক দিয়ে তৃতীয় লাইনও একই প্যাটার্ন অনুসরণ করেঃ লাম, লাম। চতুর্থ লাইনও লাম দিয়ে শুরু হয়, নিচের দিক দিয়ে চতুর্থ লাইনও তাই লাম দিয়ে শুরু হয়। পঞ্চম লাইন শুরু হয় আলিফ দিয়ে, নিচের দিক থেকে পঞ্চম লাইনও আলিফ দিয়ে শুরু হয়। সম্পূর্ণ কুরআন জুড়েই এই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া যায়। পৃষ্ঠার পড় পৃষ্ঠা, লাইনের পর লাইন এই প্যাটার্ন অনুসরণ করেছে। আপনি যেই পৃষ্ঠাতেই যান না কেন। তৃতীয় ঐশ্বরিক বিন্যাস সম্ববলিত কুরআন পাকিস্তানের লাহোর থেকে আমাদের কাছে এসেছে। এটার নাম কুরআন মজিদ আলফি। সে সময়, এটা সম্পূর্ণ হতে ১২ বছর লেগেছিল, যেই পণ্ডিত এটা লিখে ছিলেন তিনি ক্রমাগত রোজা রাখতেন। এটার প্রত্যেক পৃষ্ঠায় ২১ টা লাইন আছে, যেমনটা দেখছেন, প্রত্যেকটা লাইন আলিফ হরফ দিয়ে শুরু হয়েছে। আপনি যেই পৃষ্ঠাতেই যাননা কেন, সবখানেই এই একই ব্যাপার দেখতে পারবেন। সম্পূর্ণ মুসহাফটিতে (হার্ড কপি) ২২১টি পৃষ্ঠা আছে। হাফিয হান্সারির স্টাইলে লেখা মুসহাফের মতো, এই মুসহাফটির অনন্য ডিজাইন আর অন্য কোন বইয়ে পাওয়া যাবেনা। আর যেমন দেখতে পাচ্ছেন, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বাণীকে এই তিনটি অবিশ্বাস্য দৃশ্যমান কাঠামোর সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ করে দিয়েছেন, যা সন্দেহের আর কোন অবকাশই রাখেনা। কিন্তু যদি আমি আপনাদের বলি যে এগুলোই শেষ নয়?
এখন আমি আপনাদেরকে এমন অলৌকিক বিষয় দেখাব যা এই সৌন্দর্যকে একটি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবে এমনকি কুরআনে কিছু শব্দের পুনরাবৃত্তির সংখ্যাও একটি অলৌকিকতা প্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, "ইয়াওম" শব্দটির অর্থ, "দিন", যা কুরআনে ঠিক ৩৬৫ বার এসেছে, স্পষ্টতই এটা একটি বছরে দিনের সংখ্যার দিকে নির্দেশ করে। "শাহার" শব্দটির অর্থ "মাস" যা কুরআনে ঠিক ১২ বার এসেছে, পুরো বছরের মাসের সংখ্যার নির্দেশ করার মতো। "মালাক" শব্দটির অর্থ "ফেরেশতা," এর বিপরীত হল "শয়তান," দুটোই ৮৮ বার এসেছে। আপনি এটা এআই দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। সংখ্যাগুলো একদম একই। জান্নাত এবং জাহান্নাম, দুটোই ৭৭ বার এসেছে। "রাজুল" (পুরুষ) এবং ইমরা'আ (নারী), উভয়েই ২৪ বার করে এসেছে।" আরেকটি উদাহরনঃ পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, "অবশ্যই, ঈসা (আঃ) আল্লাহর দৃষ্টিতে আদমের (আঃ) মতোই। এই আয়াত দ্বারা বোঝানো হয়েছে দুজনকেই আল্লাহ বাবা ছাড়া সৃষ্টি করেছেন, তারা অন্য মানুষের থেকে আলাদা। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাঁদের দুজনের নামই ঈসা এবং আদম, কুরআনে ২৪ বার এসেছে। সমানভাবে তাদের নাম নেওয়া হয়েছে। এবার, আপনাদেরকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা উদাহরণ দেই। কুরআনে সবচেয়ে বড় সুরা, সুরা আল-বাকারায়, ২৮৬টি আয়াত আছে। এই সুরাতে আল্লাহ শব্দটি ২৮২ বার এসেছে। এবং "হুয়া" সর্বনামটি এসেছে ৪ বার, যার অর্থ "তিনি" এখানে তিনি বলতে আল্লাহ তায়ালাকেই বোঝানো হচ্ছে। দুটো যোগ করলে, নিখুঁতভাবে হয়ঃ ২৮৬ বার। যা হুবহু সুরাটির আয়াত সংখ্যার সমান। অথবা, সুরা আন-নিসার কথা যদি ধরি, আল-মায়েদা এবং সুরা আন-আম। এই তিনটি সূরার মোট আয়াত সংখ্যা ৪৬৪। বলুন তো কি ঘটলো?
আল্লাহর নাম এই তিনটি সুরায় ঠিক ৪৬৪ বার এসেছে। এবার, এর থেকেও বিস্ময়কর প্যাটার্নের ব্যাপারে বলি। প্রথম পাঁচটা সুরা, সুরা বাকারা থেকে শুরু করে, আল ইমরান, আন-নিসা, আল-মায়িদা, এবং আন-আম, ২ থেকে ৬ নম্বর অধ্যায়। এই গ্রুপে 'আল্লাহ' নামটি যতবার এসেছে, তা ঠিক পরবর্তী পাঁচটি সূরার মোট সংখ্যার দ্বিগুণ: আল-আরাফ, আল- আনফাল, আত-তাওবা, ইউনুস, এবং হুদ। এবং আবারও, এরকম চলতেই থাকে। দ্বিতীয় গ্রুপটিও ঠিক পরবর্তী পাঁচটির দ্বিগুণ: ইউসুফ, রা'দ, ইবরাহিম, আল-হিজর এবং আন-নাহল। এই সুরাগুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে। তবুও, অলৌকিকভাবে, কুরআনে আমরা এই প্যাটার্নটি দেখতে পাই। আর এগুলো তো শুধু আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি সেটুকুই। কে জানে আরও কতগুলো আয়াতে একই ধরনের প্যাটার্ন আছে। সব শেষে আমাদের এই বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। একজন মানুষের পক্ষে এতকিছু একসাথে সুসজ্জিত করা এক কথায় অসম্ভব। এমনকি নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেও কখনো এই বিষয়টিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেননি। যদি তিনি এভাবে কুরআন সাজাতেন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে উল্লেখ করতেন।" মূলত এগুলো বহু শতাব্দী পরে আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়াও, কুরআনের বিষয়বস্তু অন্য যে কোনো বইয়ের মতো না। কুরআন আমাদের ঈমানি শিক্ষা দেয়, নবীদের কাহিনী বর্ণনা করে, এটি প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোকে কিভাবে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখতে হয় তা শেখায়, এবং এই পবিত্র কুরআন পরকাল, জান্নাত ও জাহান্নাম, পুরস্কার এবং শাস্তি সম্পর্কে আমদের অবহিত করে। কখনো কখনো এটা ইতিহাসের গভীরেও প্রবেশ করে; কখনো কখনো, এই বইটি ভবিষ্যতে আসন্ন ঘটনাগুলোর ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী করে। এটি দার্শনিক সমস্যা সমাধান করে যা কোনো চিন্তাবিদ কখনো সমাধান করতে পারেনি। এটি আদর্শ অভিভাবক কীভাবে হতে হয় তা শেখায়, ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা সম্পর্কে অবহিত করে," এটি চিকিৎসা ক্ষেত্রও অসামান্য অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে, এই কুরআন ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব নিদর্শন দেখিয়েছে। এটি আইনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী পরামর্শ দেয়, বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়গুলো তুলে ধরে, এটি শিক্ষাক্ষেত্রে এবং সমাজবিজ্ঞানেও আমাদেরকে মূল্যবান বিষয়ে শিক্ষা দেয়। আর এটাতো পুরো তালিকাও নয়। একজন মানুষ বড়জোর একটা বা দুইটা ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হতে পারে, কিন্তু কুরআন একটি অলৌকিক সাদৃশ্যপূর্ণ কাঠামোর মাধ্যমে সকল জ্ঞান ধারণ করে এবং তার বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এর লাইনের মধ্যে গণিতবিদ্যা আছে। এর আয়াত প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। এর বাকশৈলীতে, শিল্প আছে। এর আয়াতসমূহ, জ্ঞান মণ্ডিত। এবং এর বাণীতে রয়েছে চিরন্তনতা। পবিত্র কুরআন একটি ঐশ্বরিক গ্রন্থ যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দেশনা দিতে আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। "তো, এমন একটি প্রজন্মের জন্য এটা পরিষ্কারভাবে একটা অলৌকিক দৃষ্টান্ত নয় কি?
যারা বলে, 'আমি আমার চোখে না দেখলে কিছুই বিশ্বাস করি না'।