Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

ইসলাম কী আসলেই নারীদের মূল্যায়ন করে? নারী অধিকার, বহুবিবাহ, হিজাব এবং অন্যান্য

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

ইসলামে নারীর মূল্য কতটুকু? ইসলামে কি নারীদের খাটো করে দেখা হয়? ইসলামে কি নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখা হয়? যখন আপনি কোন অমুসলিমের নারী বা পুরুষ সাথে ইসলামের ব্যাপারে কথা বলবেন, প্রথমেই তারা ইসলামে নারীর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে। আপনার কাছে কেন এমন হচ্ছে বলে মনে হয়?

কারণ অনেকগুলো মূলধারার গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারীর এই বিষয়টিকে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর তারা ইসলামকে আক্রমণ করেই যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিই অবাক করার মত একটি বিষয় হলো আমাদের কাছে থাকা ভিন্ন কিছু পরিসংখ্যান। যুক্তরাষ্ট্রে, ইসলাম গ্রহণ করা প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে চার জনই নারী। এছাড়াও, যুক্তরাজ্যে করা আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ২০০১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছেন তাদের মধ্যে প্রায় ৭৫% নারী। ইসলাম যদি সত্যি সত্যিই নারীর জন্য হুমকি স্বরূপ হয়, তাহলে সংখ্যাগুলো কি সম্পূর্ণ উল্টো হওয়া উচিত না? নাকি জনপ্রিয় মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা যে মূল্যবোধ খোঁজ করেছিলেন তা ইসলামেই পেয়েছেন?

আমারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আজ আলোচনা করবো, আর দেবো কিছু বিখ্যাত প্রশ্নের উত্তর। একজন পুরুষের কি চার জন স্ত্রী থাকতে পারে? হিজাব দিয়ে মাথা এবং শরীর ঢাকা কি আসলেই একটি সীমাবদ্ধতা? নারীরা কেন উত্তোরাধিকার অনুযায়ী সম্পত্তিতে পুরুষের অর্ধেক ভাগ পায়?

এবং পবিত্র কুরআনের একটি প্রসিদ্ধ আয়াত যা অনেক আপত্তির সম্মুখীন হয়েছে। আপনি তৈরি থাকলে চলুন শুরু করা যাক। ১৭০০ সালের দিকে, একজন ইংরেজ ইতিহাসবিদ এবং লেখক ইস্তানবুলে গমন করেন। লেডি এলিজাবেথ ক্রেভেন। আর এই ইসলামিক শহরটি তাঁকে অভিভূত করে। তাঁর দেশের নারীদের অবস্থার তুলনায় এই দেশের নারীদের অবস্থায় ছিলো আসমান-জমিন পার্থক্য। এই শহরটা যেন ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। আর তিনি মুসলিম নারীদের বর্ণনা করেছিলেন "পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সবচেয়ে সুখী প্রাণী" হিসেবে। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণগুলো এভাবে লিপিবদ্ধ করতেন। "আমার মনে হয়না আমি তুর্কির মত এমন কোন দেশ ইতিপূর্বে কখনো দেখেছি যেখানে নারীরা এত বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করে, এবং তারা সকল প্রকার নিন্দা, অপরাধ বা সমালোচনা থেকে মুক্ত।" সে সময়ের অটোম্যান সম্রাজ্য। তাহলে কোন জিনিসটি তাকে এত বেশি অবাক করেছিল?

তিনি ইংল্যান্ডে কি এমন দেখে এসেছিলেন যার কারনে তিনি এভাবে বলেছেন?

দুঃখজনকভাবে, আমরা ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট ভালো জানিনা। আমি যেসব সমস্যার কথা বলতে যাচ্ছি সেগুলোর কোনটিই তিনি যে ইসলামিক শহরে গিয়েছিলেন সেখানে ছিলনা। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকায়, যখন কোন নারী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতেন তার সকল ব্যক্তিগত সম্পত্তি প্রায়শই তার স্বামীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসত। এমনকি সেই নারী যদি চাকরীও করতেন, তার উপার্জন আইনত তার স্বামীর ছিল, এবং নারীদের সেগুলো দাবি করার কোন অধিকার ছিলনা। কোন নারীর পিতা মৃত্যুবরণ করলে, তার সকল সম্পত্তির উত্তরাধিরার সরাসরি তার স্বামীর কাছে চলে যেত, এতে তার কোন অধিকার থাকতো না। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে, সকল সন্তানকে বাবার কাছে দিয়ে দেওয়া হতো। মায়ের থেকে সন্তানদেরকে আলাদা করা হতো, যাদের তিনি জন্ম দিয়েছেন, লালন-পালন করেছেন, এবং তাদের জন্য সকল ধরণের ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আর এতে সন্তানরাও মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো। অতি অল্প কিছু সংখ্যক গোষ্টী বাদে, নারীদের ভরণপোষণের খরচ দেয়া হতোনা, অর্থাৎ বিচ্ছেদের পর তারা আর্থিক সহায়তা পেতেন না। তাছাড়া, এগুলো কেবল সামাজিক অবিচার ছিল না, এগুলো ছিল প্রতিষ্ঠিত আইন। এছাড়াও, নারীরা আরও বড় নৈতিক ও মানসিক অবিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। ইংল্যান্ডে বিংশ শতাব্দি পর্যন্ত কিছু অদ্ভুত প্রথা চালু ছিল। তার মধ্যে একটি ছিল স্ত্রীদের বিক্রয় করা। এর মানে আসলে কি?

এটা বিশ্বাস করাও কঠিন, কিন্তু যখন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর প্রতি বিরক্ত হতেন অথবা আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন, তখন তিনি চাইলে তার স্ত্রীকে বাজারে নিয়ে একটা বস্তুর মতো বিক্রি করে দিতে পারতেন। সত্যি বলতে, ১৯১৩ সালের রেকর্ড অনুযায়ী, একজন ইংরেজ তার স্ত্রীকে ১ ব্রিটিশ পাউন্ডে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এদিকে, মধ্যযুগীয় ইউরোপে যা ঘটছিল তা ছিল আরও ভয়াবহ। ১৫ থাকে ১৭ শতকের মধ্যে, ক্যাথলিক চার্চ ডাইনি শিকার করত। নির্দোষ নারীদের নির্বিচারে অভিযোগ ও অপবাদের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। রেকর্ড অনুযায়ী, ৪০,০০০ থেকে ১০০,০০০ নারীদের নৃশংস মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন?

কেউ যদি কোন নারীকে অনাকর্ষণীয় মনে করে, তারা বলতে পারে যে সে হয়তো ডাইনি। অথবা কোন নারী কোন পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করলেই সে ডাইনি হয়ে যেতো। তাদের জীবন শেষ। এগুলোর চিন্তা-ভাবনাও ভীতিকর। আর সেই একই সমাজে মানুষ রীতিমতো তর্ক করছিলো যে, "নারীরা কি আদতে মানুষ? তাদের কি আত্মা আছে?" লেডি ক্রেভেন অকারণে এই কথাগুলো বলেননি। সেই ইসলামিক শহরে তিনি যা দেখছিলেন পাশ্চাত্যে তার বিপরীত চিত্র দেখছিলেন। যেই অধিকার পশ্চিমা নারীরা এক শতাব্দী পরে পেয়েছিলেন, ১৮৮২ সালে, সেই অধিকার এখানে শতাব্দী ধরেই নারীরা উপভোগ করে আসছিলেন। এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছিল?

একজন নারী মামলা দায়ের করতে পারেন, সম্পত্তির বিষয়ে আইনি চুক্তি করতে পারেন, সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেতে পারবেন, ইংরেজ নারীদের তুলনায় অনেক বেশি অধিকার উপভোগ করতে পারছেন। আপনি নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন যে সে সময়ে পাশ্চাত্যে নারীদের শিক্ষা গ্রহনেরও সুযোগ ছিলনা। অন্যদিকে, যখন আমরা বিশ্বের প্রাচীনতম এবং ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়টির দিকে তাকাই, দেখতে পাই সেটি একজন মুসলিম নারীর দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আপনি এটা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও খুঁজে পাবেন। ৮৫৯ সালে ফাতিমা আল-ফিহরি মরক্কোর আল-ক্বারাওয়াইয়িন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে বোঝা যায় মুসলিম সমাজে নারীদের শিক্ষা গ্রহন করার সুযোগ ছিল যার ফলে ফাতিমা এত বড় একটি কাজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই ঘটনায় আরও বোঝা যায় নারীদের সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার ছিল, নয়তো তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে পারতেন না। এছাড়াও, এটা প্রমান করে যে মুসলিম নারীরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভুমিকা রাখতে পারতেন যা এই অর্জনকে সম্ভব করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি বড় হয়েছেন একটি মুসলিম পরিবারে, যেখানে সে অপমানিত হয়ে নয় বরং আত্মবিশ্বাস নিয়ে, এবং নিজের লিঙ্গ ও পরিচয়ের মর্যাদা অনুভব করে বেড়ে উঠেছে। চোখ বন্ধ করে এই দৃশ্যটা একবার কল্পনা করুন। ১ লাখ এর বেশি মানুষ উৎসাহ ও কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছে। আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন নেতা যিনি ইতিহাসের ধারা পরিবর্তন করেছেন। নবী মুহাম্মদ (সাঃ), সেই সালটা ছিলো ৬৩২, আর তিনি তার বিখ্যাত বিদায় হজের খুতবা দেওয়ার একটা পর্যায়ে, তিনি বলে উঠলেন "হে লোক সকল!

আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি নারীদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে এবং এ বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করতে। তোমরা নারীদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে পেয়েছ, এবং আল্লাহর কালেমার মাধ্যমে তাদের সতীত্বকে তোমাদের জন্য হালাল করেছ। নারীদের ওপর তোমাদের যেমন অধিকার আছে, তেমনি নারীদেরও তোমাদের ওপর অধিকার আছে।" তিনি যেই অঞ্চলে বসবাস করতেন সেখানে অসংখ্য বিষয়ের মধ্যে নারীর অধিকার নিয়ে তিনি বিশাল পরিবর্তন এনেছিলেন। এখন চলুন তখনকার সমাজে বসবাসকারী একজন নারীর জীবনের বিভিন্ন ধাপগুলো দেখি, এবং ইসলাম আসার আগে ও পরের সময়ের মধ্যে পার্থক্যগুলো তুলে ধরি। ইসলাম আগমণের পূর্বে, যখন কোনো কন্যা সন্তানের জন্ম হতো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটাকে কন্যার পিতা লজ্জার কারণ মনে করতেন, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। ইসলাম এসে এই প্রথা সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ করে। যদি সে কোনোভাবে বেঁচেও যেত, তবু সে কখনোই তার পিতার কাছ থেকে প্রত্যাশিত ভালোবাসা ও মমতা পেত না। তার পিতার চোখে সেই কন্যা সন্তান সর্বদা মূল্যহীন থাকত। কিন্তু পরে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছিলেন, "যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করলো, তাদেরকে আদব শিক্ষা দিলো, বিয়ে দিলো এবং তাদের সাথে সুন্দর ব্যবহার করলো, তার জন্য জান্নাত রয়েছে"। ধরুন, একজন কন্যা সন্তান বড় হলো এবং বিয়ের উপযোগী বয়সে পৌঁছাল। ইসলাম আসার আগে, তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হতো। তার মতামত বা অনুভূতির কথা কেউ জানতে চাইত না। কিন্তু ইসলাম আসার পর নারীর সম্মতি ছাড়া বিয়ে নিষিদ্ধ করলো। তখন থেকেই, যদি কোনো পুরুষ কোন নারীকে বিয়ে করতে চায়, তাকে প্রথমে প্রস্তাব দিতে হয়। কয়েকবার দেখা-সাক্ষাতের পর, যদি নারীর সম্মতি থাকে এবং তিনি মনে করেন তারা একে অপরের উপযোগী, তবেই বিয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিয়ের চুক্তির অংশ হিসেবে, বর অবশ্যই কনেকে মোহর দিবেন, যা হলো টাকা অথবা মূল্যবান কোন উপহার। এটি আসলে একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কোন কারণে যদি তাদের তালাক হয় অথবা যদি স্বামী মারা যান, তবে ঐ নারী এই অর্থ ব্যবহার করে বেশ কিছু সময় পর্যন্ত নিজেকে আর্থিকভাবে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন। আর মোহর নেওয়ার উদ্দেশ্য শুধু এটিই নয়। নারীরা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী জীবনের যেকোন সময় এই টাকা বা সম্পদ ব্যবহার করতে পারবেন। তারা নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে পারবেন, লাভজনক স্থানে বিনিয়োগ করতে পারেবেন, অথবা চাইলে মোহর রেখে দিতে পারবেন। মোহরের পরিমাণ নারী নিজেই নির্ধারণ করবেন। আর সেটা অবশ্যই পুরুষকে পরিশোধ করতে হবে, এবং পরে তিনি সেটা ফেরত নিতে পারবেন না। তবে, একজন নারী যদি তার স্বামীকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে চান, সেটা ভিন্ন বিষয়। বিয়ের পর নারীর ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পুরোপুরি তার স্বামীর উপর বর্তায়। চাকরি করা, কাজ করা, অথবা সংসারের খরচে অবদান রাখা এসব বিষয়ে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বিয়ের আগে তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব ছিল পিতার। আর বিয়ের পরে সেই দায়িত্ব নেয় স্বামী। তবে, এখনো আমরা দেখি যে পৃথিবীর অনেক জায়গায় বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা যখন শাইখা ফাতিমা বারকাতুল্লাহর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, যিনি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত একজন মহিলা ইসলামিক স্কলার, তিনি আমাদের অবাক করা মতো একটি কথা বলেছিলেন। এটি এমন একটি বিষয় যা অমুসলিম নারীদের ইসলামের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে, কারণ সাধারণভাবে, তারা তাদের সমাজে অন্য কারো দ্বারা ভরণপোষণের ধারণাটাই পায়নি। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর, প্রায়ই অবিবাহিত মেয়েরা তাদের পিতার থেকে এক রকম আলাদা হয়ে যায়। নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার ধারণা থেকে, তাদের এমন এক জীবনে ঠেলে দেওয়া হয় যার সাথে তারা পরিচিত নয়, এবং যার কোনো বাধ্যবাধকতাও তাদের নেই। এর ফলে, লক্ষ লক্ষ মেয়েরা দীর্ঘদিন যাবত কষ্টকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়, আর প্রায়শই তারা অসৎ উদ্দেশ্য সম্পন্ন লোকদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়। বিয়ের আগে এবং পরে দুই সময়েই তারা তাদের জীবনে আত্মরক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যায়। অথচ ইসলাম বিয়ের আগে পিতার উপর এবং বিয়ের পরে স্বামীর উপর নারীর ভরণ পোষণের দায়িত্ব ন্যস্ত করেছে। আবার, যখন বিয়ের বিষয়টি আসে, যে পুরুষ তাকে ভরণপোষণ করতে পারবেন বলে তিনি মনে করেন, তাকে বেছে নেওয়াটাও সম্পূর্ণ নারীর নিজের সিদ্ধান্ত। চলুন এই আলোচনা চালিয়ে যাই। ইসলাম আসার আগে, যখন একজন নারী বিয়ে করতেন এবং মা হতেন, তখন তার মূল্য বা সম্মান বৃদ্ধি পেত না। কিন্তু আমাদের নবী (সাঃ) বলেন, "’মুমিনদের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণ মুমিন ঐ ব্যক্তি যে চরিত্রে সবার চেয়ে সুন্দর, আর তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি, যে তাঁর নিজের স্ত্রীর জন্য সর্বোত্তম।" মায়েদের মর্যাদা বোঝাতে তিনি একবার তার এক সাহাবীকে বলেছিলেন, "জান্নাত তোমার মায়ের পায়ের নিচে" তিনি মায়ের অধিকার লঙ্ঘন এবং তার ওপর জুলুম করাকে সবচেয়ে বড় পাপগুলোর একটি হিসেবে গণ্য করেছেন। ইসলাম আসার আগে, যদি কোনো নারীর স্বামী মারা যেত, তাহলে তিনি স্বামীর কোনো সম্পত্তির ভাগ পেতেন না। উল্টো, ঐ বিধবা নারী এবং তার সন্তানদেরকেও সম্পত্তির অংশ হিসেবে গণ্য করা হতো। যেকোনো পুরুষ ঐ পরিবারের উপর নিজের দাবি জানিয়ে সেই নারীকে বিয়ে করতে পারত। ইসলাম এসে এই প্রথার অবসান ঘটায়। এবং এর পরিবর্তে, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তার স্ত্রী, সন্তান এবং পিতা-মাতার মাঝে নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগ করে দেওয়া হয়। আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে, পিতা-মাতারাও সম্পত্তির উত্তরাধিকার পায়। এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমানে অনেক তথাকথিত উন্নত দেশে, পিতা-মাতারা সন্তানের সম্পত্তি থেকে কিছুই পান না। তবে যুক্তিযুক্তভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, মৃত ব্যক্তির পিতা-মাতা যখন বার্ধক্যে উপনীত হন তখন তাদের দেখাশুনা করার প্রয়োজন হয়। ইসলাম পিতা-মাতার এই দায়িত্ব ছেলে সন্তানের ওপর আরোপ করে, আর যদি ছেলে মারা যায়, তবে সেই দেখাশুনার উদ্দেশ্যে তাদের মৃত ছেলের উত্তরাধিকার থেকে অংশ দেয়। অর্থাৎ, একজন নারী মা হওয়ার পরেও ইসলাম তাকে অবহেলা করে না। ঐ নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব তার সন্তানদের। এক অর্থে, বিষয়টি উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনে অগ্রসর হওয়ার জন্য নারীদের জন্য একটি উৎসাহ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। যদি আপনার কাজ করার প্রয়োজন না হয় অথবা আপনি কাজই করতে না চান, তবে আয় রোজগারের পিছনে আপনার সময় নষ্ট না করে। আপনি শিক্ষার মতো আরও বৃহৎ কোনো কিছুতে আপনার সময় উৎসর্গ করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাই তো সব কিছুর মূল ভিত্তি, তাই না?

একটি সমাজের পরিপুর্ণ পরিবর্তন এবং তার আত্মিক উন্নতি আপনার হাতেই। আবার যদি কোনো নারী কাজ করতে চান, সেক্ষেত্রেও ইসলামের ইতিহাসে অনেক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ রয়েছে। রাসুল (সাঃ)-এর স্ত্রী খাদিজা (রাঃ) মক্কার সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ীদের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ নারী ব্যবসায়ী। অথবা মনে করুন ফাতিমা আল-ফিহরিকে, যিনি প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি ছিল একটি সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ উদ্যোগ। যতক্ষণ না হালাল ও হারামের সীমা বজায় রাখা হয়, ততক্ষণ এতে কোনো সমস্যা নেই। সাধারণভাবে, একটি সমাজের মানুষদের ধূমপানের অভ্যাস ছাড়াতে বলাও প্রায় অসম্ভব মনে হয়। অথচ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) একাই দাঁড়িয়ে খুব সল্প সময়ের মধ্যেই সেই সমাজের মানুষদের ভয়াবহ সব রীতি ও প্রথা থেকে ফিরিয়ে আনেন। আর শুধু তাই নয়, তিনি এইসব প্রথার পরিবর্তে এমন সুন্দর ও ন্যায়সঙ্গত নীতিমালা উপস্থাপন করেন যে, বহু শতাব্দী পরেও মানুষ সেই উচ্চতায় পৌছাতে পারেনি। এমন আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। এবং এই পুরো পরিবর্তন ঘটেছিল মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে। এই পরিবর্তন কতটা বিশাল ছিল তা বোঝাতে, বিখ্যাত ইসলামিক পণ্ডিত বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী বলেন, "যদি ১০০ জন দার্শনিককে একত্রিত করে, তাদের সেই সময় ও স্থানে পাঠিয়ে ১০০ বছরও কাজ করতে বলা হয়, তবুও কি তারা ঐ মহান পুরুষ মাত্র এক বছরে যে অর্জন করেছেন, তার ১% ও অর্জন করতে পারবে?" এমনকি রাসুল (সাঃ)-এর ইন্তেকালের ২০ বছর না যেতেই বিশ্বের ইতিহাসে আরও একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী নেতাদের একজন যিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং ন্যায়বিচারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এখন আমরা ইসলাম নারীদের কতটা সম্মান ও আত্মবিশ্বাস দিয়েছে তার একটি উদাহরণ দেখব। একদিন, ওমর (রাঃ) এর কাছে অভিযোগ আসে যে নারীরা বেশি পরিমাণে মোহর দাবি করছে। ইয়া উমর!

নারীরাতো বেশি পরিমাণে মোহর দাবি করছে। হ্যাঁ জনাব, উনি ঠিক কথাই বলছেন, আমাদের বিয়ের ব্যাপারে প্লিজ আপনি কিছু করেন! মোহর মনে করতে পারছেন তো? এটি সেই আর্থিক নিরাপত্তা, যা একজন নারীর বিয়ের সময় চাওয়ার অধিকার রয়েছে। বেশি মোহরের এই সমস্যার সমাধানে ওমর (রাঃ) একটি জনসম্মুখে ভাষণ দেন এবং মোহরের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের পরামর্শ দেন। কিন্তু ওমর (রাঃ) এর বিরোধিতার সাহস কে'ই বা করতে পারত?

তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেন এবং রোমানদের বিরুদ্ধে বড় বড় বিজয় অর্জন করেন। এমন শক্তিশালী ছিলেন তিনি। কিন্তু এমন সময়, একজন সাধারণ নারী দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলেন। তিনি সাহসের সঙ্গে বললেন, "আপনি কি শুনেননি যে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, "আর তাদের কাউকে তোমরা প্রচুর সম্পদ প্রদান করে থাক, তবে তোমরা তা থেকে কোন কিছু নিও না। এমনকি তা যদি প্রচুর স্বর্ণও হয়। একজন মহিলার পক্ষে একজন শাসকের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করার বিষয়টি অভূতপূর্ব ছিল। তাহলে ওমর (রাঃ) কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানালেন?

তিনি বিনীতভাবে স্বীকার করলেন যে সেই মহিলা সত্য কথা বলেছেন এবং ওমর (রাঃ) ভুল করেছেন। সকলেরই ওমরের (রাঃ) চেয়ে বেশি জ্ঞান রয়েছে। তারপর তিনি একটি উঁচু স্থানে উঠে গিয়ে মানুষের সামনে তার কথা প্রত্যাহার করলেন। আপনি যদি এটা নিয়ে ভেবে দেখেন তবে এটা আসলেই বিশ্ময়কর। তাহলে আসল সমস্যা হলো, মূলধারার গণমাধ্যম ইসলামকে ব্যাপকভাবে মন্দরূপে উপস্থাপন করে থাকে। আপনাদের কারো কারো হয়তো মনে আছে বিখ্যাত আইরিশ গায়িকা যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, সিনেড ও’কনর। তিনি একজন নারীবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এবং যখন তিনি ইসলামে তার যাত্রা সম্পর্কে কথা বলেছিলেন, "আমি বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগ্রন্থ পড়তে করতে শুরু করেছিলাম, স্রষ্টা সম্পর্কে আসল সত্যি খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। আমি কখনও ভাবিনি যে আমি অন্য কোন ধর্ম গ্রহন করব, আমি ইসলামকে সবচেয়ে শেষের কাতারে রেখেছিলাম কারণ ইসলাম সম্পর্কে আমার অনেক ভুল ধারনা ছিল।" বিশেষ করে যখন নারীদের কথা আসে, ইসলামের সম্পর্কে ব্যাপকভাবে ভ্রান্ত তথ্য প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু যখন মানুষ আসলেই এ ব্যাপারগুলো নিয়ে খুঁজতে শুরু করে, তারা বুঝতে পেরেছে যে সত্যিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এজন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম হওয়া প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চারজনই নারী। এবং একই কারণেই, যুক্তরাজ্যে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৭৫% নারী। এখন, আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি। যদি ইসলাম এমন একটি ব্যবস্থা হতো যা সত্যিই নারীদের উপর নির্যাতন করে, নারীরা কি এ থেকে পালিয়ে যেতনা?

কিন্তু তার পরিবর্তে তারাই ইসলামকে সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করছে। কারণ তারা দেখে যে ইসলাম নারীদের প্রকৃত মূল্য দেয় এবং তারা উপলব্ধি করে যে, এটাই তাদের প্রকৃত আশ্রয়স্থল। মানব ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আমরা একটি প্যাটার্ন দেখতে পাই। যখনই স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়নি, যখনই মানুষ ধর্মীও নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে, নারীরাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করেছে। তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং নিপীড়ন করা হয়েছে। এমনকি আজও, আধুনিক বিশ্ব নারীর অধিকার সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করতে সক্ষম হয়নি। এখনও অনেক জায়গায় একই কাজের জন্য পুরুষ নারী সমান অর্থ পান না। তাদের শরীরকে বিজ্ঞাপনে পণ্য প্রচারের জন্য ব্যবহৃত বস্তু হিসেবে দেখানো হয়। একটি নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের মানদণ্ড তাদের উপর ক্রমাগত চাপিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাদের মনে হয় তাদের এতে মানিয়ে নিতে হবে, নয়তো তাদের মূল্য থাকবে না। অসংখ্য নারীকে ফ্লার্ট করে প্রভাবিত করা হয়। এবং অনেকেই অসুস্থ সম্পর্কের কারণে মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এমনকি কেউ কেউ যৌন সহিংসতারও শিকার হন। অন্যদিকে, হাজার হাজার নারী সন্তান জন্মদানের পরেই তাদের সঙ্গী তাদেরকে ছেড়ে চলে যায়। ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের ২৩৬টি শহরে, অর্ধেকেরও বেশি পরিবার একক মায়েদের দ্বারা পরিচালিত হয়। একবার ভাবুন তো, ওই মহিলাদের উপর কতটা ভারী বোঝা চাপানো হয়েছে এবং তাদের সন্তান কোন আদর্শ পুরুষ চরিত্র ছাড়াই বড় হবার সময় হাজার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। এবং আপনি যদি অপরাধপ্রবণ মানুষের দিকে তাকান, তাহলে প্রায়শই দেখতে পাবেন যে তারা একজন পিতৃতুল্য ব্যক্তিত্ব ছাড়াই বড় হয়েছে। সমস্যা যেন কখনো শেষই হয় না। তাহলে আমাদের আসলে কী প্রয়োজন?

আমাদের এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজন যা পুরুষ এবং নারী উভয়কেই সবচেয়ে পরিপূর্ণ এবং নিখুঁত উপায়ে জানে এবং বোঝে এবং কোনও মানুষের পক্ষে তা সম্ভব না। কারণ দিন শেষে, আমরা সবাই কিন্ত অসম্পূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ। আমরা ভুল করি। আমরা ভুল বিচার করি, আমরা ভুল বুঝি। এই কারণেই আমাদের এমন একটি ব্যবস্থার প্রয়োজন মানুষের সীমাবদ্ধতার বাইরে। এমন একটি ব্যবস্থা যা পুরুষ এবং নারী উভয়ই সন্তুষ্টচিত্তে এবং স্বেচ্ছায় অনুসরণ করবে। এটি সেই স্রষ্টার দ্বারা প্রেরিত একটি ব্যবস্থা যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন কারণ তিনি আমাদের সবচেয়ে ভালো জানেন, যতটা ভালো আমরাদের নিজেদেরকে জানা সম্ভব তারচেয়েও বেশি। তিনি পুরুষ এবং নারী উভয়েরই সমস্ত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানেন, এমনকি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়ও। তিনি অসীম জ্ঞানের অধিকারী, আর তাই কেবল তিনিই সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত এবং নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এবং যেহেতু আল্লাহ পুরুষও নন, নারীও নন, তাই তাঁর বিধানে পক্ষপাতিত্বের কোন স্থান নেই। অন্য সবগুলো ব্যবস্থা, যত উন্নতই হোক না কেন, ত্রুটি থাকবেই, এবং আমরা তা দেখছি। সংক্ষেপে বললে, আমরা যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি, যেসব সমস্যার সমাধান আমরা বছরের পর বছর ধরে বের করার চেষ্টা করে আসছি ইসলামের মাধ্যমে ১৪০০ বছর পূর্বেই তা আমাদের দেয়া হয়েছে। আর আমরা যে সকল সমস্যার কথা উল্লেখ করেছি, তা সহ আরও অনেক কিছুর সমাধান ইসলামে পাওয়া যাবে। আপনি যখন আরও গবেষণা করবেন এবং পড়বেন, আপনি নিজেই এটি আবিষ্কার করতে পারবেন। কিন্তু এখানেই কিছু প্রশ্ন মনে আসে। এ পর্যন্ত সবকিছুই যুক্তিসঙ্গত। হ্যাঁ, ইসলাম নারীদেরকে এক অনন্য মূল্য দেয়। হ্যাঁ, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনিই সত্যিকার অর্থে আমাদের প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন নির্ধারণ করতে পারেন। কিন্তু তবুও, যেমনটি আমরা শুরুতেই বলেছি, ইসলামে নারীদের সম্পর্কে কিছু বিষয় আছে যা মানুষ বিভ্রান্তিকর মনে করে। প্রথমে হিজাব সম্পর্কেই কথা বলা যাক। লক্ষ লক্ষ মানুষ একই প্রশ্ন করে। "এটা কি একটা বড় বিধিনিষেধ নয়?" যদিও হিজাবকে প্রায়শই নিপীড়ন বা সীমাবদ্ধতার একটি রূপ হিসেবে চিত্রিত করা হয়, কিন্তু এটা এমন একটি বিষয় যা অমুসলিম নারীদের ইসলাম সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। অদ্ভুত, তাই না?

এমন কেন হয়? যদি আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, একজন নাস্তিকও হিজাব পরার প্রয়োজনীয়তা বোধ করতে পারে। একজন নাস্তিক?

হ্যাঁ। কারণ যেকোনো কিছু ঢেকে রাখাটাই স্বাভাবিক ব্যাপার, যা মানুষের স্বভাবগত। স্বভাবতই, একজন নারী এমন একজন পুরুষের খোঁজ করেন যার সাথে তিনি প্রশান্তি, সুখী এবং নিরাপদ বোধ করেন। একইভাবে একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে বিশ্বাস করতে চান, একটি প্রেমময় বন্ধন গড়ে তুলতে চান, এবং তার সাথে সুখী থাকতে চান। পরিবারের শান্তি এবং সুখ রক্ষা করার জন্য, এই বন্ধন সুদৃঢ় রাখা প্রয়োজন। এজন্যই প্রায়ই পারিবারিক পরামর্শদাতারা অত্যাবশ্যক সত্যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেন। একটি সুস্থ বিবাহের জন্য পরস্পরের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বাস থাকা প্রয়োজন। এখানেই ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পর্দার সমাধান নিয়ে আসে। সুরা আন-নুরে, আল্লাহ বলেছেন, "মুমিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।" তারপরের আয়াতে, নারীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপনি যদি লক্ষ করে থাকেন, পর্দার নির্দেশ পুরুষদের আগে দেওয়া হয়েছে। "চোখের দৃষ্টি নত কর।" একভাবে, তাদের চোখের পাতাই তাদের হিজাব। এখানে, আমরা একটা দ্বিমুখী সতর্কতা দেখতে পাচ্ছি। আল্লাহ তার বান্দাদের পরিবার রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছেন এবং তাঁদের সুখ সংরক্ষিত করতে চাচ্ছেন। কিন্তু আজ, নারী পুরুষ উভয় প্রকারের হিজাব নিরন্তর আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তাহলে যদি এই সুরক্ষাগুলি একটি পরিবার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় তবে কী হবে?

আমরা যে বিশ্বাস এবং আনুগত্যের কথা বলেছি, তা সময়ের সাথে সাথে নষ্ট হতে শুরু করে। প্রত্যেক নারীরই সুন্দর দেখানো এবং প্রশংসা পাওয়ার একটি সহজাত প্রবণতা থাকে। আর যখন এই সহজাত প্রবণতা সম্পন্ন কোনও মহিলা হিজাব না পরে বাইরে বের হন, তার কাছে দুটি বিকল্প থাকে। হয় সে বাইরের মানুষের কাছে মার্জিত এবং আকর্ষণীয় দেখাবে তার পোশাক, আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র, চুল এবং শরীরে দিয়ে, অথবা সে উদাসীন এবং অনাকর্ষণীয় দেখাবে। হয় এদিক নয় ওদিক মাঝামাঝি কিছু নেই। কিন্তু তার স্বভাব অনুযায়ী, সে সুন্দর দেখাতে এবং প্রশংসিত হতে চায়। তাই বাইরে বেরোনোর সময় অনিবার্যভাবে, সে এই চেষ্টাই করবে যেন তাকে সুন্দর দেখায় এবং সারাদিন এভাবেই কাটে। হিজাব ছাড়া, এটাই অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাহলে আপনার কি মনে হয় যে কত শতাংশ পুরুষ চিন্তা করবেন যে, "ইনি কারো স্ত্রী হতে পারে, আমার তাকানো উচিত নয়?" একটি সামাজিক পরীক্ষা মাধ্যমে আমাদের এর উত্তর দিতে দিন। কয়েক বছর আগে। হয়তো আপনিও এটা দেখেছেন যে একজন মহিলা নিউ ইয়র্ক সিটিতে পাঁচ ঘন্টা ধরে খোলামেলা পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, এবং ফলস্বরূপ, ১০৮ বার তাকে মৌখিকভাবে হয়রানি করা হয়েছিল। অর্থাৎ, তিনি সে অশোভন মন্তব্যের শিকার হয়েছেন। এবং এছাড়াও অনেক পুরুষ তার দিকে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু মজার বিষয়টা হচ্ছে। একই মহিলা পরেরবার হিজাব পরে পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করলেন। ফলাফল?

কেউ আগের মতো করে তার দিকে তাকায়নি। স্বামী স্ত্রী সেটা বুঝতে পারুক বা না পারুক, পর্দাহীনতা ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে বিশ্বাস ধ্বংস করে। ঈর্ষা ও অবিশ্বাসের মত বিষয়গুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যা পরবর্তীতে সম্পর্কের মধ্যে শান্তি নষ্ট করে। কোনও পুরুষ তার স্ত্রীর দিকে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তাকানো সহ্য করবে না। সে ঈর্ষান্বিত এবং আধিপত্যপ্রবণ হয়ে ওঠে। এটি তার সহজাত স্বভাব। তেমনিভাবে, নারীদের সহজাত স্বভাব হচ্ছে সে চায় তার স্বামী যেন শুধু তার প্রতিই আগ্রহী থাকে এবং অন্য নারীর দিকে না তাকায়। এই দুটি অনুভূতিই শান্তি ও সম্প্রীতি এনে দেয়, যখন উভয় পক্ষই পর্দার আদেশ মেনে চলে। এখন চলুন বিপরীত পরিস্থিতি কল্পনা করি। ধরুন উভয় পক্ষই তাদের হিজাব সম্পর্কে সচেতন। পার্থক্য কী হবে?

একজন স্বামীর আর কোন সন্দেহ বা উদ্বেগ থাকবে না অন্য পুরুষরা তার স্ত্রীর দিকে তাকাচ্ছে কিনা তা নিয়ে। একইভাবে, যখন একজন পুরুষ তার দৃষ্টি সংযত করে, তখন সে নিশ্চিতভাবে তার স্ত্রীর প্রতি তার আনুগত্য প্রদর্শন করবে। এটা তার স্ত্রীর মনে কোনও সন্দেহ রাখবে না যেমন ধরুন, "সে কি অন্য মহিলাদের দিকে তাকাচ্ছে?

কোন মহিলাকে সে আমার থেকেও আকর্ষণীয় মনে করে?" এসব ভেবে সে অস্বস্তি বোধ করবে না। হিজাব এমন একটি জিনিস যা একজন মহিলাকে সস্তা হওয়া থেকে রক্ষা করে। এটা তার সম্মান বৃদ্ধি করে এবং তাকে আরও মূল্যবান করে তোলে। তার অনুমতি ছাড়া কেউ তার চুলও দেখতে পারবে না। আমি আপনাদের সাথে যে সামাজিক পরীক্ষাটি শেয়ার করেছি তা একবার ভাবুন। যখন মহিলাটি খোলামেলা পোশাকে হেঁটে যাচ্ছিল, সে অসংখ্য নোংরা দৃষ্টি এবং মৌখিক নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু যখন সে হিজাব পরলো, সে দেখিয়ে দিল যে তার শরীরের প্রকৃত মালিক কে। সে বার্তা দিল সে কেবল একটি বস্তু নয়, বরং তার ধারণা এবং ব্যক্তিত্ব তাকে সত্যিকার অর্থে মূল্যবান করে তোলে। একই সাথে, এক অর্থে, সে তার কাছে যেতে পারে এমন মানুষ আলাদা করতে পারে। হিজাব পরার সময়, যারা শুধুমাত্র বাহ্যিক দিকে মনোযোগ দেয় অথবা যাদের নৈতিক শিক্ষা নিম্নমানের তারা তার প্রতি আগ্রহী হয়না কারণ সে আর তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। এই ক্ষেত্রে, হিজাব পরার অর্থ হলো শুধুমাত্র তাঁদের সাথেই যোগাযোগ থাকা যারা আপনার প্রকৃত সত্তার জন্যই আপনার সাথে যোগাযোগ রাখে। যারা আপনার চেহারার দিকে নয়, বরং আপনার আত্মার দিকে মনোনিবেশ করে, এবং যাদের নৈতিকতার উঁচু মানদণ্ড রয়েছে। ভুলে যাবেন না। আপনি অন্যদের দ্বারা সুন্দর বা অসুন্দর হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঊর্ধ্বে। আপনাকে অন্যদের ইচ্ছা এবং প্রত্যাশার উপর ভিত্তি করে অন্যের নির্ধারিত মানদণ্ডের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে না। আপনার অন্যদের মতামত অনুসারে পোশাক পরা উচিত নয়, বরং আল্লাহর প্রত্যাশা অনুসারে পোশাক পরা উচিত। যিনি শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার পায়ের নীচের মাটিকে স্থাপন করেছেন। কিছু মানুষ হয়তো আপনার সৌন্দর্যের জন্য আপনাকে ভালোবাসতে পারে, কিন্তু আল্লাহ আপনাকে সৃষ্টি করেছেন কারণ তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। তিনি আপনাকে এমন এক অনন্য সৌন্দর্য দিয়েছেন যা তিনি অন্য কাউকে দেননি। মনে রাখবেন আমরা বলেছিলাম যে দুই ধরণের হিজাব আছে। নারীর হিজাব এবং পুরুষের হিজাব। এর পাশাপাশি, নারী পুরুষের মেলামেশায় কিছু সীমারেখাও টানা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোন ব্যক্তির বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে হাসি-ঠাট্টা করা অন্তরঙ্গ কথোপকথনে লিপ্ত হওয়া নিষিদ্ধ। যে তার পরিবার বা তার স্ত্রী নয়। তাই যখন উভয় পক্ষই এই নিয়মগুলি অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়, তারা একে অপরকে আকর্ষণ করতে শুরু করে যেমন চুম্বকের দুই মেরু, আর তখনই পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা হয়। যৌন প্রবণতা কর্মে রূপান্তরিত হতে শুরু করে, অবৈধ সম্পর্ক, বিকৃতি এবং শেষ পর্যন্ত তা অপরাধে রুপ নেয়। এখানে উভয় পক্ষেরই দায়িত্ব কর্তব্য আছে, এবং যখন উভয়ই তাদের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন দোষ উভয় পক্ষের ওপরেই বর্তায়। সিডিসির একটি গবেষণা অনুসারে, ২০২০ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫০০,০০০ গর্ভপাত করা হয়েছিল এবং এই শিশুদের ৮৬% অবৈধ ছিল। একটি দেশে মাত্র এক বছরে, অবৈধ সম্পর্কের কারণে ৪০০,০০০ অজাত শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অবশ্যই, এটি একজন মহিলার জন্য অত্যন্ত কঠিন। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সন্তান জন্ম হয়। একই সংস্থার অন্য একটি গবেষণা অনুসারে, ২০২১ সালে, শুধুমাত্র আমেরিকাতেই ১৪ লক্ষ অবৈধ শিশুর জন্ম হয়েছে। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, মাকে একাই এই বোঝা বহন করতে হয়। তিনি বছরের পর বছর ধরে তার পাশে সন্তানের বাবার সহযোগিতা ও সমর্থন ছাড়াই সন্তানের যত্ন নেন এবং বড় করার চেষ্টা করেন। এই পরিস্থিতিতে একজন মায়ের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করুন, এবং বাবা ছাড়া বেড়ে ওঠা একটি শিশুর মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলি সম্পর্কে চিন্তা করুন। এবং এটি পবিত্র কুরআনের দুটি আদেশ দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব যা আমরা আগে উল্লেখ করেছি। আমি বিশ্বাস করি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ছবিটি এখন অনেকটাই স্পষ্ট, কিন্তু আমাদের এখনও অন্যান্য প্রশ্ন রয়েছে যার উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। একজন পুরুষকে সর্বোচ্চ চারজন নারীকে বিয়ে করার অনুমতি, বোনরা তাদের ভাইদের তুলনায় অর্ধেক উত্তরাধিকার পাচ্ছে, এবং সূরা আন-নিসার ৩৪ নম্বর আয়াত প্রায়শই জিজ্ঞাসিত এবং বিতর্কিত বিষয়। এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমাদের ধারণার চেয়েও সহজ। আমরা ভিডিওর সেকেন্ড পার্টে সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আমাদের সঙ্গেই থাকুন।