Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

ইসলামে নারী মর্যাদা: বহুবিবাহ, উত্তরাধিকার এবং স্ত্রীদের প্রহার সম্পর্কিত আয়াতের ব্যাখ্যা!

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

সোশ্যাল মিডিয়া প্রোপাগান্ডায় ভরপুর। সেখানে দাবি করা হয়, ইসলাম নারীদের নিকৃষ্টভাবে দেখে। তাহলে সত্যটা কী? আগের এপিসোডে আমরা দেখেছি, ইসলাম নারীদেরকে কী অনন্য মর্যাদা দেয়। সেখানে স্পষ্ট হয়েছে, বিরোধীদের দাবিগুলো কতটা ভিত্তিহীন। এবং এখন তিনটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামে একজন পুরুষ কিভাবে চারজন স্ত্রী রাখতে পারে? এটা কি নারীদের মর্যাদা কমায় না? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, নারীরা কেন পুরুষদের তুলনায় অর্ধেক উত্তরাধিকার সম্পত্তি পায়? এবং শেষ প্রশ্ন, কুরআন কি সূরা আন-নিসার আয়াত ৩৪-এ নারীদের মারতে উৎসাহিত করেছে?

চারজন স্ত্রী পর্যন্ত বিয়ের বিষয়টি দিয়ে শুরু করা যাক। সবচেয়ে মৌলিক যে বিষয়টি বোঝা দরকার, এটা কোনো আদেশ নয়। বরং এটি একটি সীমাবদ্ধতা। যে সমাজে ইসলাম আবির্ভূত হয়েছিল, সেখানে বহুবিবাহ ছিল চরম পর্যায়ে। আর এটি ছিল বহু সমস্যার সমাধান। ইসলাম আসার পর এটি এক থেকে চার করা হয়নি। বরং আট-নয় থেকে কমিয়ে চার করা হয়েছে এবং এর চারপাশে শর্ত দেওয়া হয়েছে। যেহেতু কুরআন সর্বজনীন, তাই এমন একটি ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হয়েছে, যা সব সময় ও সব সমাজে প্রযোজ্য হতে পারে। এমন বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রয়োজন ছিল, যা প্রতিটি যুগের নানা পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য হবে। উদাহরণস্বরূপ, যুদ্ধের সময়, যখন ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে, তখন পুরুষ জনসংখ্যাই কমে যায়, নারী নয়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, কোটি কোটি পুরুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ফলস্বরূপ, অসংখ্য নারী বিধবা ও শিশু অনাথ হয়ে যায়। তাদের সবার যত্ন ও সহায়তা প্রয়োজন ছিল। এমন পরিস্থিতিতে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধিও বজায় রাখা দরকার। এ কারণেই এমন পরিস্থিতিতে একজন পুরুষের একাধিক নারীকে বিয়ে করা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। এ ছাড়া আমাদের আরো একটি বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। সেই সময়গুলোর দিকে তাকান, যেখানে বহুবিবাহ প্রচলিত ছিল। যদি তারা এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নকে খুব কঠিন মনে করত, তাহলে তারা ইসলাম গ্রহণে দ্বিধা করত। অথচ তাদের পরকাল এসবের ওপর নির্ভরশীল। তাই অবশ্যই এমন অনুমতি থাকা দরকার, যাতে এই মানুষগুলো ইসলাম থেকে দূরে সরে না যায়। মনে রাখতে হবে, এই ধর্ম কেবল একবিংশ শতাব্দীর জন্য অবতীর্ণ হয়নি। এটি ১৪ শতক ধরে প্রতিটি সংস্কৃতির মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত যারা আসবে তাদের কাছেও পৌঁছবে। তার পরও, বহুবিবাহ আজও সারা বিশ্বে বিদ্যমান। আমরা কেবল এ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নই। ২০২২ সালে একটি সুপরিচিত আমেরিকান গবেষণা প্রকল্প, জেনারেল সোশ্যাল সার্ভে (জিএসএস), বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের হার নিয়ে একটি সমীক্ষা চালায়, যার ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। সেই গবেষণা অনুযায়ী, বিবাহিত পুরুষদের ২০% পরকীয়ায় জড়িত ছিলেন। অর্থাৎ, বহুবিবাহ ইতিমধ্যেই বিদ্যমান, তবে সেটা অবৈধ উপায়ে। তাহলে গোপন ও অসৎ সম্পর্কের পরিবর্তে, ইসলাম খোলাখুলিভাবে ও আইনসম্মত উপায়ে পরিবার গড়ার পথ দেখায়। এটি গোপন সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে দেয়, এবং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের ফলে সমাজে যে নৈতিক অবক্ষয় ঘটে তা রোধে সহায়তা করে। অবশ্যই, এটি এমন কোনো অনুমতি নয়, যা হেলাফেলা করে মানা যায়। এখানে একটি গুরুতর শর্ত রয়েছে। সব স্ত্রীর সঙ্গে ন্যায্যভাবে আচরণ করতে হবে। মানসিক যত্ন ও মনোযোগ দেওয়া থেকে শুরু করে আর্থিক চাহিদা পূরণ পর্যন্ত, সম্পূর্ণ ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তবুও, নিচের আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম আসলে এক বিবাহতেই জোর দেয়। ‘আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি বিয়ে করো।’ (আল কুরআন ৪:৩) আরেকটি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি পালন করা কত কঠিন। ‘আর তোমরা যতই চেষ্টা করো না কেন তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ করতে কখনো পারবে না।’ (আল কুরআন ৪:১২৯) এমনকি এ বিষয়ে একটি হাদিসে ভয়াবহ সতর্কবার্তাও এসেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন একজন পুরুষের দুই স্ত্রী থাকে এবং সে তাদের মধ্যে একজনের প্রতি বেশি ঝুঁকে যায়, তখন কেয়ামতের দিনে সে এমন অবস্থায় আসবে যে তার এক পাশ ঝুলে থাকবে।’ অর্থাৎ এক পাশ অবশ হয়ে যাবে। ভাবতে পারেন, এটি কতটা কঠিন দায়িত্ব?

কারণ এর মানে হলো, অন্য একজন মানুষের প্রতি অবিচার করার আসলেই ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণেই এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়, একটি সূক্ষ্ম সীমা, যা হেলাফেলা করে অতিক্রম করা যায় না। তা ছাড়া, একজন নারীরও অধিকার রয়েছে বিয়ের চুক্তিতে শর্ত যোগ করার। যদি সে বলে, ‘আমাকে ছাড়া তুমি আর কোনো নারীকে বিয়ে করতে পারবে না’, তাহলে পুরুষ আর দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবে না। বিষয়টা এতটাই সহজ। অন্যদিকে, একজন নারী চাইলেও স্বাধীনভাবে কারো দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রী হতে পারেন। এ বিষয়ে তাকে কেউ জোর করতে পারবে না। এবং ইসলামে কাউকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হারাম। তাহলে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করে নারী তা মেনে নিচ্ছে কী না এবং পুরুষ ন্যায় বিচার করতে পারছে কি না— তার ওপর। যখন উভয় পক্ষ রাজি থাকে, তখন অন্য কারো আপত্তি করার অধিকার থাকে না। মনে রাখবেন, আমরা একে অনুমতি বলেছিলাম। যুদ্ধের সময়ের মতো, এমন অনেক পরিস্থিতি আছে, যা হয়তো বিরল বা ব্যতিক্রমী, কিন্তু অতীতে ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। আমরা আরো উদাহরণ দিতে পারি, এবং সবগুলোই প্রমাণ করবে কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে এ ধরনের অনুমতি সব সময় বিকল্প হিসেবে থাকে। এই বিকল্প থাকা উচিত হলেও বাস্তবে আমরা দেখি, আজকের মুসলমানদের মধ্যে এ ধরনের প্রথা খুবই কম দেখা যায়। তা ছাড়া, আপনি যদি অন্যান্য ধর্মের দিকে তাকান, দেখবেন যে, বহুবিবাহ শুধু ইসলামের জন্যই বিশেষ কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ, খ্রিস্টান ধর্মের প্রায় ২.৩ বিলিয়ন অনুসারী আছে, এবং আপনি নিউ বা ওল্ড টেস্টামেন্টে এমন একটি শ্লোকও পাবেন না, যা বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করে। বরং আমরা সহজেই পুরনো নিয়মের নবীদের মধ্যে এর উদাহরণ দেখতে পাই, যেমন নবী ইব্রাহিম (আ.), নবী মূসা (আ.) ও নবী দাউদ (আ.)। কোনো খ্রিস্টান যদি এ জন্য ইসলামের সমালোচনা করে, তবে মনে রাখা উচিত, ওল্ড টেস্টামেন্টে অনুযায়ী নবী সুলায়মান (আ.)-এর ৭০০ স্ত্রী ছিলেন। একইভাবে, যখন আমরা হিন্দুধর্মের দিকে তাকাই, যে ধর্মটি ১.১ বিলিয়ন মানুষ অনুসরণ করে, সেখানেও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার কোনো নিয়ম নেই। আসলে, সেই ধর্মের মধ্যেও এর বহু উদাহরণ রয়েছে। আমরা আরো দেখতে পাই, বিষয়টি আরো বহু সমাজ ও সংস্কৃতিতেও প্রচলিত ছিল। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই, এমন একটি প্রথা, যা বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ মেনে নিয়েছে, তা নিয়ে ইসলামের সমালোচনা বা আপত্তি করা উচিৎ নয়। সংক্ষেপে বললে, কোনো বিধান কেবল আমাদের পরিচিত জীবনধারা থেকে আলাদা মনে হচ্ছে বলে তা ভুল হবে—এমন নয়। এবার আমরা সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নে চলে আসি। সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৪। কুরআন কি নারীদের মারতে পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছে?

এখন এমন একজন মানুষকে কল্পনা করুন, যিনি কখনো তার স্ত্রীদের গায়ে হাত তোলেননি এবং কখনো এমন কথা বলেননি, যা তাদের হৃদয় ভেঙে দেয়। তিনি তাদের সাথে মজা করতেন, প্রতিটি সুযোগে ভালোবাসা দেখাতেন, এবং সারা বিশ্বের জন্য আদর্শ হয়ে উঠে ছিলেন। আর সেই মানুষটি, অর্থাৎ মহানবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে তার স্ত্রীর সাথে সবচেয়ে ভালো আচরণ করে।’ আগের এপিসোডে আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি, ইসলাম নারীদের কত মূল্য দেয়। তাহলে কি এটা সম্ভব যে এই মানুষটির পৌঁছে দেওয়া কুরআন আসলেই নারীদের মারতে পুরুষদের উৎসাহিত করবে?

মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে ‘হেঁটে চলা কুরআন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আর তিনি জীবনে কখনোই এমন কাজ করেননি, একবারও না। তাহলে অবশ্যই এখানে কিছু সূক্ষ্ম বিষয় আছে, যা আমরা মিস করছি। এখন চলুন আমরা এই আয়াতটি একটু গভীরভাবে দেখি। এটি এভাবে শুরু হয়, ‘পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক।’ দেখুন, শুরু থেকেই স্বামীর ভূমিকা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে— তার স্ত্রীকে সুরক্ষা দেওয়া। আর সংজ্ঞা অনুসারে, যে রক্ষা করে সে কখনো ক্ষতি করে না। বরং সে নিশ্চিত করে যেন অন্যজনের কোনো ক্ষতি না হয়। তাহলে আয়াতের প্রথম অংশ থেকেই আমরা বুঝতে পারি, বিষয়টি হয়তো একটু ভিন্ন, যা আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম তার চেয়ে। এখানে যে বিধান দেওয়া হয়েছে, তা সব নারীর জন্য প্রযোজ্য নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট ও সীমিত গোষ্ঠীকে উদ্দ্যেশ্য করে বলা হয়েছে। এখানে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তা হলো ‘নুশূয’। এটি আরবিতে একটি কাজের নাম। আর যে নারী এই কাজ করে, তাকে বলা হয় ‘নাশিযাহ’। আসলে এর অর্থ কী?

এখানে এই শব্দটি কোন্‌ অর্থে ব্যবহার হয়েছে?

আয়াতে দুই ধরনের বিপরীত স্বভাবের নারীর কথা বলা হয়েছে— সালিহা ও নাশিযাহ। আয়াতে সালিহা নারীদের এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে— ‘সুতরাং পুণ্যবতী নারীরা অনুগত, তারা লোকচক্ষুর আড়ালে হিফাযাতকারিনী ঐ বিষয়ের যা আল্লাহ হিফাযাত করেছেন।’ অর্থাৎ, যখন স্বামী পাশে নেই, তখন এই ধরণের নারী নিজের পবিত্রতা রক্ষা করে। তাহলে এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি, নাশিযাহ নারীদের গুণাবলী এগুলোর ঠিক বিপরীত। অর্থাৎ, এখানে কোনো সাধারণ পরিস্থিতি নিয়ে কথা হচ্ছে না। এখানে পরিবারের সম্মান হুমকির মুখে। সে অন্য পুরুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে, তাদের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করে। সে গায়রে মাহরাম পুরুষদের সাথে কথা বলে। ইসলামী সীমারেখা অনুযায়ী যাদের সাথে তার কথা বলা উচিত নয়। সে এমন পুরুষদের সাথে কথা বলে, যাদের সাথে তার কথা বলা স্বামী মেনে নেন না। সে শালীনতা ও গোপনীয়তা রক্ষার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে, যাদের থেকে দূরে থাকা উচিত, তাদের সাথে অযথা ঘনিষ্ঠ ও অসতর্ক আচরণ করে। আর এর ফলে ঘরে অশান্তি তৈরি হয়। সে স্বামীর প্রতি অবাধ্য ও অসম্মানজনক হয়ে ওঠে, এবং দাম্পত্য জীবনে নিয়মিত বিরোধ সৃষ্টি হয়। তাহলে যখন আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর’, এটি এমন এক পরিস্থিতিকে বোঝাচ্ছে, যা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। কেবল তর্ক নয়, বরং সম্পর্কের গভীর ও চলমান সমস্যার কথা বলা হচ্ছে। এবার একটু থামি এবং ইতিহাসের যেকোনো একটা সময়ে ফিরে যাই। একজন স্বামী যদি দেখতেন তার স্ত্রী এই রকম বাজে আচরণ করছে, তিনি কী করতেন?

তিনি হয়তো তাকে কঠোরভাবে মারতেন। তাকে থামানোরও কেউ থাকত না। আমরা কি আজও দেখি না, একই ধরনের পরিস্থিতি কখনো হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়?

কিন্তু এ আয়াত এখানে ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। প্রথম ধাপ হলো— কথা দিয়ে সতর্ক করা। দ্বিতীয় ধাপ হলো— শয্যা ত্যাগ করা। এই ধাপগুলোর ভেতরে সুন্দর সূক্ষ্মতা আছে, যা প্রথমে হয়তো চোখে পড়ে না। কিন্তু আগে চলুন শেষ ধাপে আসা ‘মারা’ শব্দটিকে একটু গভীরভাবে দেখি, এর মানে এই নয় যে তাকে কঠোরভাবে মারবে। এটার সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারিত আছে। যেমন, মুখে আঘাত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ছাড়া এমনভাবে মারা যাবে না, যাতে শরীরে দাগ পড়ে বা জখম হয়। অতএব, আমরা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এক ধরনের আঘাতের কথা বলছি। যেমন, কখনো কখনো আমরা কারো কাঁধ ধরে ঝাঁকাই আর বলি, ‘নিজেকে সামলাও’— শুধু যাতে সে তার করণীয় বুঝতে পারে। এটিও এর একটি উদাহরণ হতে পারে। কারণ এখানে আসল উদ্দেশ্য হলো পরিবারের ঐক্য রক্ষা করা এবং যে স্পষ্টভাবে ভুল করছে তাকে এই পদ্ধতিতে থামানো, কিন্তু তা যেন কাউকে নির্যাতন করে না হয়। তাহলে একে প্রতীকী কাজও বলা যায়। এখানে আঘাত শরীরে নয়, বরং মনে লাগে। চার স্ত্রী বিয়ের প্রসঙ্গ মনে আছে?

আমরা বলেছিলাম, কুরআন এক থেকে বাড়িয়ে চার করেনি। বরং আট-নয় থেকে কমিয়ে চার করেছে। এখানেও একই ধারণা প্রযোজ্য। কুরআন আঘাত করতে উৎসাহ দেয় না বা আদেশও দেয় না। বরং এমন স্বামীকে আটকায়, যে ইতিমধ্যে সেটা করতে যাচ্ছিল। একটু ভাবুন তো— আপনি কি মনে করেন, যে স্বামী তার স্ত্রীকে মারলো, সে বলবে— “আমি তো মারতে চাচ্ছিলাম না, আয়াত আমাকে বাধ্য করেছে?” না, অবশ্যই না। সে হঠাৎ রাগের বশেই করবে। সেই মুহূর্তে ধর্ম বা ঈমানের কথা তার মনে আসবেই না। আয়াতটি যা করে তা হলো, এমন স্বামীর ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, যিনি নিজেকে সংযত না করে সহিংসতার আশ্রয় নিতেন। আয়াতটি একভাবে তাকে বলে, ‘না, তুমি ইচ্ছেমতো যখন বা যেভাবে ইচ্ছা মারতে পারবে না। প্রথমে তোমাকে এই দুই ধাপ অনুসরণ করতে হবে।’ আর সেই ধাপগুলো কী ছিল?

মৌখিকভাবে সতর্ক করা, তারপর আলাদা বিছানায় ঘুমানো। মৌখিক সতর্ক করার ধাপটি রাখা হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতা ঠেকানোর জন্য। কারণ কিছু সময় পর পুরুষের আবেগ শান্ত হয়ে যাবে। তার রাগ তখন আর ততটা তীব্র লাগবে না, যেমনটা প্রবল উত্তেজনার মুহূর্তে লেগেছিল। এবার আসুন, এই ধাপগুলোর সূক্ষ্ম দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করি, যা আমি আগেই বলেছিলাম। কুরআনে প্রথম ধাপের জন্য নির্বাচিত শব্দটি, যেটি মৌখিক সতর্কতা নির্দেশ করে— খুবই আকর্ষণীয়। ফা'ঈযুহুন্নাহ— এই ক্রিয়ার মূল শব্দ হলো, যার অর্থ ভালোবাসা ও সহানুভূতির সাথে উপদেশ দেওয়া, এমন পরামর্শ দেওয়া যা সত্যিই শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাই এটি চিৎকার নয়। এটি এমন কঠিন কথা বলা নয়— ‘যথেষ্ট হয়েছে, আর নিতে পারছি না। এখনই থামো।’ বরং এটি হলো অন্যজনকে ঠিক করার চেষ্টা করা এমনভাবে, যা তার মনকে কোমল করে। এবং যা তার হৃদয় ও মনের— দুটোর সাথেই কথা বলে। এটি ভাঙা বা কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়, বরং মেরামত ও আরোগ্যের জন্য। ধরা যাক, স্বামী এটি যথেষ্ট সময় ধরে আদর্শভাবে করে যাচ্ছে। যদি এতো কিছুর পরও কাজ না হয়, তাহলে শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ, যেটা হলো শয্যা আলাদা করা। এখন আমি আরেকটা মজার ব্যাপার বলি। আয়াতে কিন্তু সরাসরি বলা হয়নি, ‘আলাদা বিছানায় ঘুমাও।’ বলেছে, সেখানে বলা হয়েছে, বিছানায় তাদেরকে ত্যাগ কর। অর্থাৎ, যাকে সোফায় যেতে হবে, সে আসলে স্বামী। তার এই কাজ দিয়ে সে স্ত্রীকে যেন বলছে, ‘তোমার এই আচরণের কারণে আমি এখন তোমার পাশে থাকতে চাই না। আমি অন্য কোথাও ঘুমাব, তবুও চাই তুমি যেন স্বস্তিতে থাকো। তুমি বিছানায় থাকো।’ সম্মানের আরেকটা নিদর্শন হিসেবে, সে ভদ্রলোকের মতো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। যাই হোক, মনে রাখবেন আমরা একজন নাশিযাহ (অবাধ্য) নারীর কথা বলছি, যিনি স্পষ্টভাবে ভুল করছেন, সাধারণ কোনো নারীর কথা নয়। এবং আয়াতে বলা এই ধাপগুলোর মূল উদ্দেশ্য তাকে এসব আচরণ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে আস্তে আস্তে নিরুৎসাহিত করা। তো এখন কী ঘটবে?

আসলে এখান থেকেই সব শুরু হয়। অবিবাহিত মানুষ হয়তো এটার গুরুত্ব পুরোটা বুঝবে না, কিন্তু একজন বিবাহিত নারী, যার স্বামীর সাথে আবেগের বন্ধন আছে, তার জন্য এটা ভীষণ ভারী। যেসব অবিবাহিত বোনেরা এটা দেখছেন, তারা নিজেদের আশপাশের বিবাহিত নারীদের এটা জিজ্ঞেস করতে পারেন। আপনার স্বামী যদি বলে, সে আলাদা ঘুমাতে চায় পাঁচ দিনের জন্য, তাহলে আপনি কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন? কী অনুভব করবেন?

দুই বা তিন দিনের জন্য আলাদা থাকা এক ব্যাপার, কিন্তু যখন সেটা চার বা পাঁচ দিনে গড়ায়, তখন তা আর কেউ সহ্য করতে পারে না, আর সমাধান খুঁজতে চায়। কারণ সেই রাতগুলোতে স্ত্রী এক ঘণ্টা পার হওয়ার আগে ঘুমোতেই পারে না। তার মাথার ভেতর চলে এক অস্থির যুদ্ধ, অগণিত চিন্তা আর দুশ্চিন্তা। অবহেলার কষ্ট তাকে আঘাত করে আর নিজের দোষ খোঁজার দিকে ঠেলে দেয়। তখন সে নিজের ভুলগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। শুধু স্ত্রী নয়, স্বামীও আসলে এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই উপভোগ করে না। আর অবশ্যই, যদি রাতে তারা আলাদা ঘুমায়, তাহলে দিনের বেলায় তাদের সম্পর্ক দুর্দান্ত বলা যাবে কি? শেষ পর্যন্ত, সেই রাতগুলোর একটিতে, তাদের একজন নীরবতা ভেঙে, সঙ্গীর কাছে যায়, এবং কথা বলে সমস্যার সমাধান করতে চায়। ভাবতে পারেন?

৬০০ সালের দিকে নাজিল হওয়া সত্ত্বেও, কুরআন আসলে এক ধরনের দাম্পত্য থেরাপি শিখিয়ে দিয়েছে। এটা কি সত্যিই আশ্চর্যজনক নয়? এখন ধরুন, এত কিছু করেও যদি নাশিযাহ নারীর আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, আর তার সব কিছু আগের মতোই খারাপ পথে চলতে থাকে, তাহলে কি আপনি মনে করেন না যে এই বিয়ে এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে? তখন কুরআন শেষ ধাপের কথা বলে, অর্থাৎ শেষ চেষ্টা। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা যেমন বলেছি, আমাদের প্রিয় নবী (সা.) কুরআন অনুযায়ী জীবনযাপনের সেরা উদাহরণ। তিনি কখনো তার স্ত্রীদের কারো ওপর হাত তোলেননি, বরং যারা তাদের স্ত্রীদের মারত, তাদের বহুবার সতর্ক করেছেন। আমার মনে হয়, বিষয়টি এখন আরো পরিষ্কার হয়েছে। এবার আসি শেষ প্রশ্নে। ইসলামে কেন নারীরা পুরুষদের তুলনায় অর্ধেক উত্তরাধিকার সম্পত্তি পায়?

এটা কি অন্যায্য নয়? চলুন আগের ভিডিওতে ফিরে যাই। ইসলাম আসার আগে নারীদের উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো সম্পত্তি পাওয়ার অধিকারই ছিল না, কিন্তু ইসলাম সেই অধিকার তাদের দিয়েছে। আসলে, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রেও ১৮০০ সালের আগে নারীদের এই অধিকার ছিল না। কিন্তু ইসলামে কেন নারীরা উত্তরাধিকার সম্পত্তির অর্ধেক পায়?

কারণ ন্যায্যতা কেবল এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। প্রথমে আমাদের যেটা বুঝতে হবে, সমতা আর ন্যায্যতা— এ দুটো কিন্তু এক জিনিস নয়। সত্যিকারের ন্যায্যতা হচ্ছে দায়িত্বের ভিত্তিতে প্রাপ্য অংশ দেওয়া। মনে করুন, আগের পর্বে আমরা বলেছিলাম, পরিবারের আর্থিক দায়ভার স্বামীর কাঁধেই থাকে। স্ত্রীর তেমন কোনো দায়িত্ব নেই। মেয়েটি প্রাপ্তবয়স্ক হলেও, বিয়ে হওয়া পর্যন্ত তার ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবারই থাকে। আর বিয়ের পর সেই দায়িত্ব চলে যায় স্বামীর কাছে, এবং স্ত্রীর জন্য সংসারের খরচে কোনো কিছু দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। উল্টো বিয়ের সময় সে দেনমোহর পায়, যা আসলে বিয়ের চুক্তির অংশ হিসেবে দেওয়া অর্থ, এবং এর কোনো অংশই তাকে সংসারে খরচ করতে হয় না। এরপর বয়স বাড়লে তার দেখাশোনার দায়িত্ব যায় ছেলের ওপর, এমনকি সে তার ছেলের সম্পত্তি থেকেও অংশ পাওয়ার অধিকারী। এবার ভাবুন তো, বিয়ের পর সংসার চালানোর দায় তো স্বামীরই থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্ত্রীই আসলে ভরণপোষণ পান। ইতিহাসজুড়ে, এমনকি কুরআনের এই আয়াতগুলো নাজিল হওয়ার আগেও, আর্থিক দায়িত্ব সব সময় পুরুষদের কাঁধেই ছিল। তাহলে ইসলাম অনুযায়ী উত্তরাধিকার যেভাবে বণ্টন করা উচিত, ধরুন, একজন বাবা মারা গেলেন, এক ছেলে আর এক মেয়ে রেখে গেলেন। এক্ষেত্রে ছেলে পাবে মেয়ের দ্বিগুণ অংশ, কারণ তার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির বড় একটা অংশ খরচ হবে তাদের জন্য, যাদের সে ভরণপোষণ দেবে। মেয়ের প্রাপ্ত অংশের তুলনায়, বাকি অংশ সমানও হতে পারে, আবার কমও হতে পারে। তাহলে বাস্তবে, মেয়ে অর্ধেক পাচ্ছে— এটা ঠিক নয়। বরং, ছেলে দ্বিগুণ পাচ্ছে তার দায়িত্বের কারণে। অথবা, এভাবে ভাবুন— সেই বোন তার উত্তরাধিকারী অংশ তো পাচ্ছে, কিন্তু সেটা সংসারে খরচ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ সেই দায়িত্ব তার স্বামীর। তাই দীর্ঘমেয়াদে স্বামীর সম্পদই তার জন্য ব্যয় হবে। তাহলে উত্তরাধিকার সূত্রে তার পাওয়া সম্পত্তি আর স্বামীর ভরণপোষণ মিলিয়ে দেখলে, সে তার ভাইয়ের সমান বা তার থেকেও ভালো অবস্থায় পৌঁছবে। কারণ ভাই নিজের সম্পদ সংসারে ব্যয় করে। তার ওপর, যদি স্বামীও উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পায়, সেখান থেকেও সে উপকৃত হয়। তাই, যেমনটা বলেছি, সমতা মানেই ন্যায্যতা নয়। ন্যায্যতা মানে হলো দায়িত্ব অনুযায়ী প্রত্যেকের তার প্রাপ্যটুকু পাওয়া। আর ইসলাম সেটাই করে। এই ভিডিওতে আমরা যা যা আলোচনা করেছি, বিশেষ করে আগের ভিডিওতে, এ থেকে বোঝা যায়, ইসলাম না পুরুষকে নারীর উপরে তোলে, না আবার নারীর মর্যাদা কমায়। আপনি যদি প্রথম ভিডিওটি দেখে থাকেন, তাহলে আমি এখন যা বলব, তা আরো ভালো বুঝবেন। মনে করুন, আমরা আগেই একটি পরিসংখ্যান শেয়ার করেছিলাম, যেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে প্রতি ৫ জনে ৪ জনই নারী। আজ, হাজারো নারী সত্যের সন্ধান পাচ্ছেন প্রচারণার গণ্ডি পেরিয়ে, নিজস্বভাবে গবেষণা করে। তারা এমন একটি ধর্মের দিকে ফিরছেন, যেখানে তারা শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায্যতা পান। কারণ তাদের কাছে ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়— এটি এক আশ্রয়স্থল। যখন তারা ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তারা ঠিক সেই অনুভূতিই পান, যা বিখ্যাত আইরিশ ইসলাম গ্রহণকারী সিনিড ও’কনর পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ঘরে ফিরেছি।’ আমরা মানুষ, আমাদের বুদ্ধি আছে, আমরা প্রশ্ন করি, যুক্তি খুঁজি। তাহলে পক্ষপাত বা পূর্বধারণা ছাড়া, পুরুষ ও নারীর মধ্যে সবচেয়ে ন্যায্য ভারসাম্য কে রাখতে পারবে?

আমরা মানুষ, নাকি সেই স্রষ্টা, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন? শত শত বছর ধরে চেষ্টা করেও বারবার ব্যর্থ হওয়া ব্যবস্থা, না কি সেই চিরন্তন ও পরিপূর্ণ স্রষ্টার প্রতিষ্ঠিত আইন?