Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

ইতালিয়ান মাফিয়া বস -এর ইসলাম গ্রহণ: “সেদিন আমাকে ৬ রাউন্ড গুলি করা হয়েছিল!”

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

আমার অনেক টাকা ছিল। গাড়ি ছিল, বাইক ছিল। এক বছরে আমি ১.২৩ মিলিয়ন ডলার ইনকাম করেছিলাম। আমার সাপ্লায়ারও ছিল। আমাদের ২০ মিলিয়ন ডলারের ড্রাগ ডিল করার কথা ছিল। আমরা যখন ড্রাইভ শুরু করলাম, ওকে একটু সন্দেহজনক লাগছিল, কিন্তু আমি তেমন পাত্তা দিইনি। আমার ছেলে গাড়ি থেকে নামল, তাকে বিদায় জানাল, আর বিদায় বলার সময় ও তার বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে দিল। আর ধাম আমার ছেলেকে গুলি করল। ছেলেকে টেনে গাড়ির ভেতরে আনলাম, সে বলছিলো, “বাবা,” তারপর আমি তাকাতেই সে বন্দুকটা আমার দিকে তাক করল আমি এমন করে সরে গিয়ে গ্যাস প্যাডেলে পা চাপা দিলাম। আর, ধাপ, ধাপ, ধাপ, ধাপ। আমাকেও গুলি করল। হাসপাতালের জেল থেকে আমাকে মূল জেলে নিয়ে গেল। হাই সিকিউরিটি ইয়াতালা প্রিজনে। জেলের ভেতরই আমাকে শাস্তি সেলে পাঠাল। সেখানে আমি কোরআন পড়ছিলাম, সূরা আল ইমরান পড়ছিলাম। “প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে, আল্লাহর ইচ্ছায়, এবং সবই আগে থেকে লেখা।” যখন আমি সেই জায়গায় পৌঁছালাম, “সবই আগে থেকে লেখা,” আমার কাঁধের সমস্ত ভার কয়েক সেকেন্ডের ভেতর উধাও হয়ে গেল। আমি এতটাই সুখী হয়ে গেলাম। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আমি ভীষণ বিনীত বোধ করছি, আমাকে আপনার পডকাস্টে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমার জন্ম ইতালিতে, সালার্নো নামের একটি শহরে। ছয় বছর বয়সে আমি জীবনের প্রথম হিজরত করলাম। ইতালি থেকে অস্ট্রেলিয়ায়, সাউথ অস্ট্রেলিয়া, অ্যাডিলেডে। চৌদ্দ বছর বয়স থেকে আমি গ্যাংস্টার। সেরা সেরাদের সাথেই মিশেছি। যখন বলি সেরা, মানে নাইটক্লাবের বস আর সব বড় বড় লোক। গ্যাং জগতের ভেতরে আমি গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম, এতটাই যে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে কুখ্যাত ক্রিমিনাল বাইকার গ্রুপের একটা স্টেটের বস হয়ে গেলাম। বহু, বহু বছর আমি অপরাধী হিসেবেই কাটিয়েছি, যতক্ষণ না আমার সৎ ছেলে আমার কোলে মারা গেল। এর পরেই আমি ইসলাম গ্রহণ করি। আমি ছিলাম রোমান ক্যাথলিক। আমি সব সময়ই আল্লাহকে বিশ্বাস করতাম। জেলেও আমি প্রার্থনা করতাম। ক্রস আঁকতাম, দোয়া করতাম, গলায় ক্রস ঝুলাতাম। জানেন তো, মাফিয়ারাও আসলে অনেক ধর্মীয়, বিশ্বাস করুন বা না করুন। ওরা মাঝে মাঝে গির্জায় গিয়ে পাদ্রীর কাছে স্বীকারোক্তি দেয়। কারও কারও ভেতরে অপরাধবোধ থাকে। কিন্তু আমরা দুই দুনিয়াই পেতাম। আপনি যেতেন আর, স্বীকারোক্তি দিতেন। ওরা আপনাকে বলত, হেইল মেরি কতবার পড়তে হবে। আর গির্জা থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই আবার পেজারে মেসেজ— “ওখানে দেখা করি।” “ওখানে ড্রাগ বিক্রি করি।” তাই খ্রিস্টান, রোমান ক্যাথলিক বিশ্বাসটা আমাদের কাছে ছিল সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের একটা অংশ। আমাদের রক্তের ভেতরেই ছিল এভাবে থাকা, বুঝলেন?

মানুষ এটাই বুঝতে পারে না। আমাদের এমনভাবে শেখানো হয়েছিল, যদি আমরা পাদ্রীর কাছে যাই, দরজাটা খুলে, ছোট জানালার ভেতর দিয়ে বলি, “ফাদার, আমি পাপ করেছি। একজনকে গুলি করেছি, মারিনি, ড্রাগ বিক্রি করেছি, আমি বদলাতে চাই, কিন্তু এটা করেছি, ওটা করেছি।” সে বলবে, “আমার ছেলে, আসার জন্য ধন্যবাদ। যিশু আপনাকে ভালোবাসেন। ১৫ বার হেইল মেরি পড়ো, এটা করো।” কখনও কিছু দানও করতাম, তারপর সব শেষ। একদম সহজ। হ্যাঁ। হ্যাঁ। আমাদের এমনটাই বিশ্বাস করানো হতো। একজন ইতালিয়ান হিসেবে আপনি বড় হন এই জেনে যে মাফিয়া দুনিয়া চালায়। ইতালিয়ান হিসেবে আমি খুব দেশপ্রেমিক। আমরা আঙুলে আঙটি পরি। মানে আমরা মাফিয়ার অংশ। আমাদের ইতালিয়ানরা মাফিয়ার অংশ। আমাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে মাফিয়া আছে, গ্যাংস্টার আছে। আমরাই ড্রাগ ব্যবসা চালাই, আমরাই রাজনীতি চালাই। চৌদ্দ বছর বয়সী ড্রাগ বিক্রেতা হিসেবে রাস্তায় হাঁটতাম, নাইটক্লাবে ঢুকতাম যেখানে মালিক আর অ্যাডাল্ট ইন্ডাস্ট্রির লোকজন— স্ট্রিপ ক্লাব, এসব জায়গা। আমি নাইটক্লাবের লাইনে দাঁড়াতামই না। বাউন্সাররা আমাকে রক্ষা করত। পুলিশ যদি সেখানে ঢুকত, ওদের লাইসেন্স চলে যেত। তখন আমার বয়স ছিল এই ১৪, ১৫, ১৬, ১৭। সেখানে ঢোকার নিয়ম ছিল ১৮+। কিন্তু ওই রাস্তার সব নাইটক্লাবই আমাকে সম্মান দিত। একরকম প্রিভিলেজ ছিল। আমি অস্ত্র নিয়ে বের হতাম, শত্রুকে গুলি করার জন্য প্রস্তুত থাকতাম। যখনই আমাকে গুলি করা হয়েছে, একেবারে খুব কাছ থেকে করা হয়েছে। দূর থেকে নয়। সব সময়ই পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে, বুঝলেন?

আমার মাথায় এখনো একটা গুলি আটকে আছে। ওরা কেটে বের করেছে, এখানে অস্ত্রোপচার করেছে। এখানে আমাকে গুলি করা হয়েছিল। এখানেও গুলি লেগেছিল। এদিক দিয়ে বেরিয়েছে। এখান দিয়ে গিয়ে দুইটা পাঁজর ভেঙেছে। হার্টে লাগার কথা, কিন্তু বুকে গিয়ে বেরিয়ে গেছে। আরেকটা গুলি আমার চামড়া কাটতে কাটতে মেরুদণ্ডের নার্ভের খুব কাছে গিয়েছিল। লাগলে সারাজীবন প্যারালাইজড থাকতাম। ওটা লাগেনি, আমি ঝুঁকে গিয়েছিলাম। আরেকটা এখানে, পায়ে গুলি খেয়েছি, আরও গুলি ছোড়া হয়েছে আমার দিকে। একবার বোমা দিয়ে হত্যাচেষ্টাও হয়েছিল। ওরা একটা বোমা রেখেছিল...

আমার বাড়ির কাছেই বোমা বসানোর চেষ্টা করছিল। যখন তারা বোমাটা নামাচ্ছিল, আমি প্রায় ২০ মিটার দূরে। এই ভোর পাঁচটা, সাড়ে পাঁচটার দিকে। গাড়ি থেকে বোমা নামাতেই সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ—ধাম। তো, আমার টাকা ছিল। গাড়ি ছিল, বাইক ছিল। নিজস্ব ব্যবসা ছিল। ড্রাগ ছিল, নাইটক্লাবে সম্মান ছিল। মেয়ে ছিল, আর যা যা ভাবতে পারেন সবই ছিল। সব রকম ঝলমলে জিনিস, ভাবতে পারেন এমন সব কিছুই আমার ছিল। মনেও ভালো লাগত, ভুল বলব না। সংগ্রহ করার, পাওয়ার অনুভূতিটা ভালো লাগত, ক্ষমতা, প্রভাব—সব। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় ছিল, যখন আমি বাড়ি ফিরতাম। ড্রাইভ করে একা ফিরতে ফিরতে ভেতরে একধরনের বিশাল শূন্যতা বোধ করতাম। সব সময়। বিশেষ করে বাড়ি ফেরার সেই পথে অথবা বিছানায় যাওয়ার আগে, অথবা ঘুম থেকে ওঠার পর। স্ত্রী-সন্তান ছিল, তারপরও ভেতরে সেই শূন্যতা। কিন্তু সবই আমার ছিল। এক বছরে আমি ১.২৩ মিলিয়ন ডলার বানিয়েছিলাম। সেটা সময়ের হিসেবে বিশাল টাকা। আর আপনি খরচ করতেন, বুঝলেন?

ভার্সাচে পোশাক, লিমুজিন, গাড়ি, এই-ওই। কিন্তু এর পরের যা থাকত, তা ছিল শুধু তীব্র শূন্যতা—খুব স্পষ্টভাবে। যখন হেলস অ্যাঞ্জেলসের সঙ্গে আমার বিরোধ বাঁধল, আমি পার্থের এক ইরাকির সঙ্গে মিলে গেলাম। ওদের গ্রুপের নাম ছিল সম্ভবত স্করপিয়ন কিংস বা এমন কিছু। ঠিক মনে নেই। কিন্তু তারা আমার কথা শুনেছিল আর অ্যাডিলেডে এসে আমার সঙ্গে ব্যবসা আর জোট বাঁধতে চেয়েছিল। শুনতে পাগলামি লাগবে, মনে হবে যেন আমি গুহায় থাকতাম। কিন্তু আমি ইসলাম বা মুসলমানদের সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ইসলাম সম্পর্কে আমি সত্যিই কিছু জানতাম না। পাগলাটে শোনালেও এটাই সত্য। তো, এই আরবরা এলো। সংক্ষেপে বলি, ওরা আমার সঙ্গে যুক্ত হলো, আমাদের শত্রুও ছিল একই। আমরা একটা নাইটক্লাবে গেলাম, গিজগিজে ভিড়। যা হওয়ার তাই হলো, সেখানে গোলাগুলি, মারামারি শুরু হলো। তারপর আমরা তাদের বাসায় ফিরলাম, তারা লম্বা পোশাক পরে, টাখনুর উপরে, ওজু করল—আমি তখন জানতাম না, ওরা নিজেদের পরিষ্কার করছে। তারপর সালাত শুরু করল। আমি ভাবছি, এটা কী হচ্ছে?

সে বলল, “ওরা নামাজ পড়ছে।” “নামাজ মানে?” “ওরা মুসলিম।” ওহ্‌, আচ্ছা। আমি কখনোই জানতাম না তারা মুসলিম। আমি বললাম, মুসলিম মানে কী?

ও বোঝাতে লাগল, এই-ওই। প্রথম রাতে আমি লিভিং রুমে বসে ছিলাম, ওনারা আলি, হামজা, আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সম্পর্কে বলতে শুরু করল। আর আমি ভীষণ আগ্রহী হয়ে উঠলাম। ওরা যোদ্ধাদের গল্প বলছিল, যোদ্ধা আলির কথা, ইসলামের কথা। তারা আল্লাহকে কত ভালোবাসে, কত বিশ্বস্ত তারা আল্লাহর প্রতি। তাদের ঈমানই সব। আমি ভাবছি, ওয়াও, আর এই লোকগুলোও আবার যোদ্ধা। তারপর তারা নবী মুহাম্মদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথা বলতে লাগল। কি অসাধারণ গল্প। আমরা তো জানতাম, আমাদের কাছে শেষজন হলো যিশু (আলাইহিস সালাম)। নবী, মসীহ, প্রভু। বাইবেলে যা লেখা আছে, তাই। তারপর তারা যিশু (আলাইহিস সালাম)-এর কথাও বলতে লাগল। আমি উঠে দাঁড়ালাম, বললাম, “এক মিনিট, থামুন, থামুন। আপনারা যিশু সম্পর্কে কী জানেন?

তিনি তো আমার রব। আমার মসীহ। ” আমি বললাম, আমি বলি। মানে আমি তো বাইবেল জানি। ওরা বলল, “না, না, ভিন্স, না। আমরা উনাকে ভালোবাসি।” “হ্যাঁ?” “আমরা উনাকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি, সম্মান করি, অনুসরণ করি। মাদার মেরি আছে…

ভার্জিন মেরি, বাইবেলের সেই গল্পগুলো। তারপর তারা কোরআনে মেরিয়মের গল্প বলতে লাগল। যা আমাকে অবাক করল, তা হলো কোরআনে মেরিয়মের নামে একটা পুরো সূরা আছে। বাইবেলে মাদার মেরি (রাযিয়াল্লাহু আনহা) মোটে চার-পাঁচবারের মতোই এসেছে, যদি ভুল না করি—শুধু উল্লেখ হিসেবে। এখানে কিন্তু একটি পূর্ণ সূরা। একটা পুরো অধ্যায় মেরিয়মের, বিশ্বাসীদের মায়ের। আর যিশু (আলাইহিস সালাম)-এর গল্প। ওরা যতই বলছিল, আমি শপথ করে বলছি, নিজেকে ঠিক মনে হচ্ছিল একটা শিশু' যেন প্রিয় সিনেমা দেখছে। দৃষ্টি আটকে ছিল ওখানেই। সেই মুহূর্তেই আমার মনে হয়, আমি বিশ্বাস করি। নেশা থাকুক বা না থাকুক, আল্লাহ তখনই আমাকে হিদায়েত দিয়েছিলেন। আর আমি ভীষণ কৌতূহলী হয়ে গেলাম। এখন সমস্যা হল রোমান ক্যাথলিকদের— আমরা সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যই অনুসরণ করি। বাইবেল পড়ি। আমিও বাইবেল পড়েছি। আমি বলছি না যে আমি বাইবেল-গুরু। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস আমি জানতাম। যেমন, যিশু (আলাইহিস সালাম) তার লোকদের বলেছিলেন, “হে আমার জাতি, আমার ইবাদত কোরো না, আমি তোমাদের রব নই।” খুব সহজ, পরিষ্কার কথা, তাই না?

আচ্ছা। কিন্তু আমরা তাঁকেই ইবাদত করি। অর্থাৎ, আমরা বাইবেল পড়ি, কিন্তু শুধু পড়ি। ভাবি না। সবকিছুই শুধু বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য। যিশু (আলাইহিস সালাম) বলেছেন, “শূকরের মাংস খেও না।” ক্যাথলিকরা খায়। আমরা খাই না। যিশু (আলাইহিস সালাম) বলেছেন, “মদ থেকে বিরত থাকো।” “কারণ এটা সব বড় গুনাহর দরজা খুলে দেয়।” যিশু (আলাইহিস সালাম) বাইবেলে বলেছেন, “প্রার্থনা করো না, কারো সামনে ঝুকো না। কোনো মূর্তি, প্রতিমা বা সৃষ্টিকে সিজদা করো না। প্রার্থনা করো না।” জমিতে, পানিতে, আকাশে যা কিছু আছে কোনো কিছুকেই ইবাদত কোরো না। সরাসরি আমাদের পিতার কাছে, প্রভুর কাছে, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো। কারণ আল্লাহ গেয়রতের, ঈর্ষান্বিত এক রব।” আর আমরা ক্রসের সামনে, মাদার মেরির সামনে, শিশু যিশুর সামনে প্রার্থনা করি। যাই হোক, সংক্ষেপে, ওরা যিশু (আলাইহিস সালাম)-এর কথা বলছিল। বাইবেলের কথা বলছিল, আর সবকিছু চোখের সামনে পরিষ্কার হতে লাগে। এবার দ্বিতীয় রাত, তৃতীয় রাতে, নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর গল্প—অত্যন্ত হৃদয়ছোঁয়া। আলি, ওরা বলত আলি দ্য ম্যাগ্নিফিসেন্ট। আর তিনি সত্যিই মহিমান্বিত ছিলেন, মাশাআল্লাহ, আল্লাহ তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আমি ভীষণ মুগ্ধ হচ্ছিলাম, ভীষণ আকৃষ্ট হচ্ছিলাম এসব গল্পে। তারপর বাইবেল নিজেই নিজেদের বিপরীতে যেতে লাগল। মানে, আমরা তো পড়েছি যে শয়তান— “শয়তান ইবলিস যিশু (আলাইহিস সালাম)-কে ৪০ দিন ৪০ রাত মরুভূমিতে নিয়ে ঘুরেছে।” তারপর নাকি যিশু (আলাইহিস সালাম)-কে বলেছে— এটাই বলছিলাম, বাইবেল পড়ার মানে কী— সে নাকি বলেছে, “তোমার রবের প্রতি ঈমান ত্যাগ করো।“ যিশু (আলাইহিস সালাম) কে বলছে। “তোমার রোবের প্রতি ঈমান ত্যাগ করো, তোমার ঈমান আমাকে দাও।” তাহলে তিনি কি ঈশ্বর, না ঈশ্বরের নবী?

বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাই? বাইবেলে এমন অনেক উদাহরণ আছে যা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যিশু (আলাইহিস সালাম) ঈশ্বর নন। এমনকি তিনি নিজেই বলেছেন, “আমার রব, তোমাদের রব,আমার আল্লাহ, তোমাদের আল্লাহ।” এসব কথা আমার মাথায় ঘুরতে লাগল। আমি বিরক্ত হতে লাগলাম— কীভাবে এভাবে আমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলা হলো?

তৃতীয় দিনের সকালে আমি বের হচ্ছি। সে দরজা খুলল, আমি দরজা বন্ধ করলাম। বললাম, “আমি শেষ। বলুন, মুসলিম হব কীভাবে?” বললাম, “একই আল্লাহ, এক আল্লাহই রব। আর যিশু (আলাইহিস সালাম) হলেন শুধু রাসুল, নবী, মরিয়মের গর্ভে যার জন্ম।” এই দুই মুসলিম তখন উত্তেজনায় ভরে গেল। বলল, “আসো, ভিন্স, আমার সাথেসাথে রিপিট করো। প্রস্তুত,হ্যাঁ?” “আমি প্রস্তুত।” “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ।” আমি ওটা পুনরাবৃত্তি করলাম। “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ।” দেখুন, কত বড় বাক্য। আমি একবারেই নিখুঁতভাবে বলে ফেললাম। সত্যিই, যেন নদীর মত প্রবাহিত হচ্ছিল। আমি তাকে একবারও থামতে বলিনি, বিভাগ ভাগ করিনি। সে যেমন করে বলল, “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...” বুঝাচ্ছিলো। সে বলল, “ভাই, আপনি বলে ফেলেছেন।” আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, “তাকবির!” সবাই বলল, “আল্লাহু আকবার!” আমি বললাম, “সত্যি আমি এখন মুসলিম?” “আল্লাহু আকবার।” আর আমার জানা ছিল শুধু আসসালামু আলাইকুম আর আল্লাহু আকবার। যখন প্রথমবার সেজদায় মাথা রাখলাম, চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছিল। আমি এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলাম। সত্যিই আমি আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করলাম। আমি কোনো শিরক করতে চাই না, আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। কিন্তু আমি অনুভব করছিলাম, উনি আমাকে দেখছেন, সামলে রাখছেন। তখনই আমি বুঝলাম, আল্লাহ আছেন, সবসময়ই ছিলেন। আমি আগেও বলেছি, আমাকে একাধিকবার, অনেকবার গুলি করা হয়েছে, প্রায় পাঁচবার, আলাদা আলাদা সময়ে। শেষবার গুলিবর্ষণে আমার সৎ ছেলে মারা যায়, ওর হার্টে গুলি লাগে। আমাদের ২০ মিলিয়ন ডলারের ড্রাগ ডিল করার কথা ছিল। আমি নিজের কাছে বলেছিলাম, এইটা ঠিকঠাক হয়ে গেলে এই জীবন এখানেই শেষ। ২০ মিলিয়ন ডলার কিন্তু প্রচুর টাকা। সেই সময় আমার সরবরাহকারী ছিল কুইন্সল্যান্ড থেকে। আমরা ছিলাম সাউথ অস্ট্রেলিয়ায়। সে কিনতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কী, তার আসল আগ্রহ হয়তো ব্যবসায় ছিল না। ও শুধু আমাকে হত্যা করতেই আগ্রহী ছিল। সে আমাকে এমন বিশ্বাস করাল যেন ডিল নিয়ে আমাদের কথা হবে। আমি গিয়ে তাকে তুললাম,আমরা গাড়ি নিয়ে বের হলাম। ড্রাইভ শুরু করার পর তাকে কিছুটা সন্দেহজনক লাগছিল, কিন্তু আমি তেমন পাত্তা দিইনি। যখন তাকে নামিয়ে দিতে গেলাম, সে গাড়ি থেকে নামল, সে আসলে আমাকে মারতেই চেয়েছিল। আমি যখন তাকে নামিয়ে দিচ্ছি, সে বলল, “এখানকার পার্কেই আমাকে নামিয়ে দিন।” আমি ভাবলাম স্বাভাবিকই তো। আমার ছেলে গাড়ি থেকে নামল, বিদায় জানাল, আমি আগে বলেছি, তারা তো বন্ধু। আর বিদায় বলার মুহূর্তেই সে বন্দুকটা ওর বুকে ঠেকিয়ে ধাম। আমার ছেলেকে গুলি করল। আমি সাথে সাথে ছেলেকে টেনে গাড়ির ভেতর আনলাম। সে বলল, “বাবা।” তারপর আমি তাকাতেই লোকটা বন্দুক আমার দিকে তাক করল, আমি এভাবে ঝুঁকে গ্যাস প্যাডেলে পা চাপলাম। ধাম, ধাম, ধাম, ধাম, ধাম, ধাম, ধাম, ধাম, ধাম। আমাকেও গুলি করল। আমি টেরই পাইনি যে আমিও গুলি খেয়েছি। আমি শুধু আমার ছেলেকেই দেখছিলাম। করোনারি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, সে সাথে সাথেই মারা গেছে। তার মুখের চেহারা বদলে গিয়েছিল, সবুজ চোখ...

আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম...

আমি তার মুখ চাপছিলাম, ওকে মুখে-মুখে শ্বাস দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম। বার বার তাকে সিপিআর দিচ্ছিলাম, এদিকে অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করলাম। কারণ বুঝলাম, আমি নিজেই হসপিটালে পৌঁছাতে পারব না সময়মতো। আমি বললাম, “দেখুন, আমাকে মাঝপথে ধরুন।” একদিকে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, দেখছিলাম, সে আসলে চলে গেছে। কিন্তু ভিতরে আমার এক অংশ বিশ্বাস করতে চাইছিল না। অ্যাম্বুলেন্সে কথা বলতে বলতে আমি হঠাৎ রক্ত কাশি দিতে শুরু করলাম। আমি ফোনটা নিচে রাখলাম, সরি। ড্যাশবোর্ড ভরে রক্ত থুথু ফেললাম, একের পর এক। রক্ত দেখে বুঝলাম, আমাকেও গুলি করা হয়েছে, এবং রক্তটা আমার ফুসফুস থেকে আসছে। তখন নিজেকে এমন এক অবস্থায় রাখলাম, যেখানে আমি শুধু বলছিলাম, “ইয়া আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দিন।” আমি আল্লাহকে বললাম, অনুরোধ করলাম, বিনতি আকুতি করলাম, “দয়া করে আমার সৎ ছেলেকেও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দান করে দিন।” যেন সে ওই কালিমাতেই মৃত্যু পায়। দয়া করে তাকে এই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ দিন। কারণ সে চলে গেছে। তারপর আমি আল্লাহকে বললাম, “আমার সব ভুল-ত্রুটি মাফ করে দিন। আমার এই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কবুল করুন।” ড্রাইভ করতেই থাকলাম, অ্যাম্বুলেন্স এসে গেল। আমি গাড়ি থেকে নামলাম, ছেলের কাছে যেতে চাইলাম। পুলিশ আমাকে থামাল, “ভিন্স, প্লিজ।” আমি পড়ে গেলাম। আমার পাঁজরে তীব্র ব্যথা শুরু হলো। তখনই বুঝলাম, আমার পাঁজরেও গুলি লেগেছে। ওরা আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল, হাসপাতালে নিয়ে গেল। করোনারি রিপোর্টে বলা হল, আমার ছেলে মারা গেছে কারণ গুলিটা সরাসরি তার হার্টে গিয়ে লেগেছিল। সে মারা গেছে, বাবাকে রক্ষা করতে গিয়ে। সে মুসলিম হয়েছিল। আর তখন আমি ছিলাম গুলিতে ঝাঁঝরা। হাসপাতালে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমি শিকল বাঁধা অবস্থায় ফোনে কোর্টের সঙ্গে কথা বলছিলাম— সুপ্রিম কোর্ট, ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারকের সঙ্গে, যেন আমাকে জামিন দেয়। ছেলের জানাজায় যেতে পারি, তাকে গোসল দিতে পারি। তাকে যেন ধুয়ে গোসল দিতে পারি, তার জানাজার অংশ হতে পারি। আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন বিষয় ছিল হাসপাতালের কারাগারের বেডে শুয়ে টিভিতে নিজের ছেলের জানাজা দেখা। ওটা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। আমাকে সেটাই সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু ওয়াল্লাহি, জীবনে এত কষ্ট আর কখনো অনুভব করিনি। আমি ওকে দাফন হতে দেখেছি, সব দেখেছি। বিচারক আমাকে বেরোতে দিলেন না। আমার জীবন বদলাতে শুরু করল জেলে। হাসপাতালের জেল থেকে আমাকে মূল জেলে নিল, হাই-সিকিউরিটি ইয়াতালা প্রিজনে। জেলের ভেতরেই আমাকে শাস্তি সেলে রাখল। পুরোপুরি সেগ্রিগেটেড। ঘটনার প্রায় তিন মাস পরের কথা, দু’–আড়াই মাস হবে সম্ভবত, আমি কোরআন পড়ছিলাম, সূরা আলে ইমরান পড়ছিলাম। আমি ১৪৫ নম্বর আয়াতে পৌঁছালাম। “প্রত্যেক প্রাণই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে, আল্লাহর হুকুমে, আর সব কিছুই লেখা হয়ে গেছে অনেক আগেই। আপনি যদি দুনিয়ার ভালো চান, আল্লাহ আপনাকে তা দেবেন। আপনি যদি আখিরাতের ভালো চান, আল্লাহ আপনাকে তা-ও দেবেন।” কিন্তু দুনিয়ার রিযিক আর আখিরাতের রিযিক— আয়াতের সেই অংশ আমি আগে কখনো পড়িনি। আমি যখন “সব কিছুই লেখা” অংশটায় পৌঁছালাম, আমার বুকের ভেতর যে গিঁটটা ছিল—উদ্বেগের, অপরাধবোধ, ছেলের মৃত্যুজনিত ডিপ্রেশন—শপথ করে বলছি...

সব খুলে গেল। আমি নিশ্বাস নিতে পারছিলাম। কাঁধের উপরের সেই ভার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চলে গেল। আমি ভেঙে পড়ে কাঁদতে লাগলাম, জীবনে কখনো এত কাঁদিনি। দুঃখে নয়, আনন্দে কাঁদছিলাম। আমি এতটাই সুখী হয়েছিলাম। পুরো দুঃখ তো দূর হয়নি, কিন্তু আমাকে মুক্ত করে দিয়েছে। এমন এক অন্ধকার থেকে আমাকে বাঁধামুক্ত করেছে যার উদাহরণ আমি এভাবে দেব— ভাবুন, পাহাড় বেয়ে হাঁটছেন, উঁচুতে ওঠা কষ্টকর, তাই না?

আমার পাহাড়টা যেন ছিল সরাসরি মৃত্যু। নখ দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে, দাঁত দিয়ে আঁকড়ে ধরে আমি উপরে উঠতে চাইছি। কিন্তু আমার হাতে ধরার মতো একটা রশি ছিল। আর নিচের দিকে তাকালেই দেখতাম, ওলফগুলো লাফিয়ে উঠছে দাঁত বের করে, আমাকে টেনে নিতে চাইছে। ওই নেকড়েগুলো ছিল আমার আবেগ, আমার মানসিক স্বাস্থ্য, আমার শারীরিক অবস্থা। আর সেই রশিটা ছিল কোরআন। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই রশিটাই শক্ত করে ধরে রাখব। আর আল্লাহকে ধন্যবাদ বলতে আমার ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘন্টা লেগে গেল। আমি শুধু উনাকেই ধন্যবাদ দিতে চাইছিলাম। আমি এতটাই কৃতজ্ঞ ছিলাম, বুঝলেন তো? ৪৫ মিনিট লেগেছিল। চোখের পানি থামছিল না, কিন্তু আমি এত... আপনি যখন কাউকে খুব ভালোবাসেন...

আর তার সহায়তায় এতটাই তৃপ্ত, এতটাই কৃতজ্ঞ হন, আমরা তো দুনিয়ার উদাহরণেই দেখি, মানুষ তখন কাঁদে। বলে, “ধন্যবাদ, আপনি আমাকে বাঁচিয়ে দিলেন।” এই তো স্রষ্টা। আমি তাঁর উপস্থিতি অনুভব করছিলাম। সেই মুহূর্তেই আমার আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কটা কংক্রিট হয়ে গেল। আর কোনো সন্দেহ থাকল না। আমি দুআ করলাম। তাঁকে ধন্যবাদ দিলাম, বললাম, “ধন্যবাদ, ইয়া আল্লাহ।” আমি হাত তুলে বললাম, “ইয়া রাব্বি, ইয়া আল্লাহ, আমার সব গুনাহ মাফ করে দিন।” আমি তাঁকে মিনতি করছিলাম, বলছিলাম, “প্লিজ আল্লাহ।” আর আজ আমি এখানে। আমি পনেরো বছর ধরে মুসলিম। আমি পরিপূর্ণ নই। আমি কোনো আলেম নই, শায়খ নই, এমন দাবি করি না। আমার জ্ঞানও খুব সামান্য। কিন্তু আমি আল্লাহকে ভালোবাসি। আমি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ভালোবাসি, দীনকে ভালোবাসি, সাহাবাদের ভালোবাসি। ওমর ইবনুল খত্তাব (রাযি.)— এরা সেই মানুষ, যাদের আমরা অনুসরণ করা উচিত। দুঃখের বিষয়, আজকের তরুণরা পুরোপুরি পথ হারিয়ে ফেলছে এই দুনিয়ায়। তো, এই ছিল আমার সফর। এই ছিল আমার টার্নিং পয়েন্ট। হা, আপনি নিজেকে থামাতে পারেন না, তাই না?

এটা আমার জন্য খুব স্পর্শকাতর বিষয়, তবু আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ। আমার মা— আমি যতটা সম্ভব সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করব। আমি তার ছবির দিকে ঠিকমতো তাকাতেও পারি না। আমি তাকে ভীষণ মিস করি, কিন্তু...

আল্লাহ ওনাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন। আমার মা আর আমি ছিলাম সেরা বন্ধু। আমাকে ডিপোর্ট করার আগে, ডিপোর্টেশন চলাকালীন, আমার হাতে ছিল ২৮ দিন। ডিপোর্টের প্রক্রিয়ার মধ্যেই তিনি হাসপাতালে গেলেন, ডাক্তারদের কাছে গেলেন, আর ধরা পড়ল স্টেজ ফোর ক্যান্সার। স্পটগুলো বড় হতে লাগল, ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। আমি ডাক্তারকে বললাম, “দয়া করে উনাকে বলবেন না ওনার ক্যান্সারের কথা।” পরে আমি উনাকে মালয়েশিয়ায় নিয়ে এলাম, অক্টোবরে। তিনি যখন এলেন, আমি ভাবলাম, ওয়াও, আমি একেবারে আবেগে ভেসে গেলাম। আমার মা এখানে। ঠিক আছে, বাইবেল বের করলাম। বললাম, “মা, বাইবেলে যিশু বলেছেন, ‘আমাকে ইবাদত কোরো না।’ তিনি বলেছেন, ‘আমার ইবাদত কোরো না, আমি তোমাদের রব নই, মা।’” আমি বললাম, “মুসলমানরা কি তাকে ইবাদত করে?” তিনি বললেন, “না।” “তাহলে আপনি কেন করবেন?” প্রতিদিনই আমি তাকে এসব বলতাম। প্রতিদিনই বলতাম, “যিশু বলেছেন, ‘মদ খেও না, শূকর খেও না।’ মা, যিশু কীভাবে নামাজ পড়তেন?” সবই বাইবেল থেকে—কোরআনের কোনোকিছু না। একদমই না। বুঝলেন, প্রত্যেক দিনই। আর প্রতিদিনই বলতাম, “মা, আমি আপনাকে ভালোবাসি।” “মা, জাযাকাল্লাহু খাইরান।” শেষ দিকে এসে এমন একটা সময় এলো, আমি বললাম, “মা, আপনি কি সত্যিই মনে করেন যিশুই ঈশ্বর?” তিনি বললেন, “না। শোন, ছেলে, যিশু ঈশ্বর নন।” ধাম, আমার হৃদয় কেঁপে উঠল। দুঃখিত, আমি এখন আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি। এরপর তিনি শাহাদাহ পড়লেন, আপনি বিশ্বাস করবেন না। তিনি বললেন, “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ” একটুও ভুল ছাড়াই। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমি তাকে ভিডিও করছিলাম, কাঁদছিলাম, ভিডিও করছি। দেখুন, আল্লাহ তাকে কতটা ভালোবাসেন। এতটাই যে তিনি মুসলিম হলেন, আর আল্লাহ তাকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরোপুরি এক বিশেষ প্যাকেজ দিলেন। তিনি ঘুমের ভেতর শান্তিতে মারা গেছেন—তাহাজ্জুদের সময়, ফজরের আগে মুহূর্তে, জুমার দিন, রমজান মাসে, রমজানের শেষ দশ দিনের মধ্যে। তার জানাজা পড়া হয়েছে জুমার দিনে, একটা নতুন মসজিদে, আর তাকে দাফন করা হয়েছে নতুন কবরস্থানে...

সত্যি বলতে কী, আমি হয়তো মাটির নিচে পচে যেতাম, খুন হয়ে, অথবা অন্তত ৩০ বছরের জেল খাটতাম, কাউকে খুন করার দায়ে, অথবা ওই জগতের কাউকে খুন করতে গিয়ে। কিন্তু আল্লাহু আকবার, আল্লাহ আমাকে ইসলামের জন্য বেছে নিয়েছেন। ওয়াল্লাহি, তিনি আমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে এনেছেন। দিয়েছেন প্রজ্ঞা, জ্ঞান, হিকমা। আহ, কী চমৎকার জীবন। মুসলিম হিসেবে কী সুন্দর এক জীবন। ওয়াল্লাহি, ওয়াল্লাহি। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রত্যেক গুণই মহিমান্বিত, অসাধারণ । প্রতিটি দিক থেকেই সর্বোচ্চ সুন্দর ও পরিপূর্ণ। এই দুনিয়ায় তাঁর মত মানুষ আর কখনই আসেননি, এত নিখুঁত, এত সুন্দর, এত সদয়, এত ভালোবাসাময়। তিনি-ই প্রকৃত আদর্শ, যেমনটা হওয়া উচিত একজন মানুষের। রোল মডেল। আমরা তাঁর মতো হতে পারি?

অসম্ভব। কিন্তু আমার কাছে যা সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে, সবকিছুর চেয়ে বেশি। আমি তাঁর সীরাহ পড়ছিলাম। মিরাজের কাহিনি, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা। পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, সুবহানআল্লাহ। শৈশব থেকেই তাঁর জীবন, সবকিছু— এমন কিছু নেই, যা আমাদের ভেতর গভীরভাবে নাড়া না দেয়। আমাদের হৃদয়কে না ধরে—এমন কিছু নেই। কিন্তু এক জায়গায় এসে আমি এত কেঁদেছি, তিনি তখন মৃত্যুশয্যায়। ভাবুন তো, আপনি মরতে যাচ্ছেন। মৃত্যুর আগের সেই উঠানামা অনুভব করছেন। তিনি সাহাবাদের বললেন, “আমাকে আমার উম্মতের কাছে নিয়ে চল, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।” উনারা বললেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি পারবেন না, আপনার শরীর খারাপ, এই-ওই।” ওরা যেন তাঁকে যেতে দিচ্ছিল না, কিন্তু তিনি যেতে চেয়েছিলেন। আমি যখন এটা পড়ছিলাম, দেখলাম, সাহাবারা তাঁকে কাঁধে নিয়ে যাচ্ছেন, দুই পাশে একজন করে ধরে আছেন, আর তাঁর পা মাটিতে লেগে যাচ্ছে, তিনি নিজে হাঁটতেও পারছেন না। উম্মতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা দেখুন। আমরা সামান্য বমি বমি লাগলেই বিছানা থেকে উঠতে পারি না। ওই বিরক্তিকর অনুভূতি কল্পনা করুন। এই মহান নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), এই সুন্দর সৃষ্টিটি, নিজে যা-ই অনুভব করুন না কেন, তিনি শেষবারের মতো নিজের উম্মতের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। যখন পড়লাম, তাঁকে টেনে আনা হচ্ছে, পা টেনে নিয়ে, ভাবো কেমন করে এবং তিনি উম্মতের সামনে দাঁড়ালেন, আমি ভেঙে পড়ে কাঁদতে লাগলাম। সাহাবারা এমন সব কিছুর কোরবানি দিয়েছেন, রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ভালোবাসায়, যা আমরা কল্পনা করতে পারি না। আল্লাহর জন্য, এই উম্মতের জন্য। আমরা তাহলে কৃতজ্ঞতা হিসেবে কী করব?

সব কিছুই আমাকে স্পর্শ করেছে, কিন্তু এই অংশ আমাকে সবচেয়ে বেশি কাঁদিয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সালাম দিতেন, “আসসালামু আলাইকুম” আপনি তাঁর পিছনের দাঁতও দেখতে পেতেন। কিন্তু যখন তিনি আল্লাহর পথে মাঠে যুদ্ধ করতেন, তিনি ছিলেন হিংস্র সিংহের মত, একজন মহান যোদ্ধা। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রাযি.), তারপর হামজা (রাযি.), ইসলামের সিংহ। তারপর আলি, হুসাইন, হাসান, আবু উবাইদাহ (রাযি.), ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.), উসমান (রাযি.), আবু বকর (রাযি.)— আমরা কি সত্যি হলিউড, মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির লোকদের অনুসরণ করব এই মহাব্যক্তিত্বদের বাদ দিয়ে?

এরা-ই তো প্রকৃত নায়ক। আল্লাহর কসম। রংধনুর শেষে কোনো সোনার হাঁড়ি নেই। টানেলের শেষে কোনো আলো থাকে না। সবই মিথ। আমি কোরআন থেকে এমন একটা কথা বলব, যা শুনে আপনাদের পাগলামি লাগতে পারে। একদম ধাক্কা খাওয়ার মতো। ওই লাইফস্টাইলে কোনো বিশ্বস্ততা নেই। যে সবচেয়ে বেশি টাকা বানাতে পারে, বিশ্বস্ততার মান ওরাই নির্ধারণ করে। আর আপনি যদি টাকা তুলতে ভাল না হন, আপনি হয়ে যান বোঝা। কিন্তু আমি কোরআন থেকে একটা কথা বলব, যা সবার জন্যই একটা আয়না। যদি আপনার ভেতর সম্মান ও প্রজ্ঞা থাকে, বুঝবুদ্ধি থাকে, সামান্য নবিলিটিও থাকে, আর মাথাটা একটু খোলা থাকে। এই আয়াত সব অপরাধীদের জন্য— সব বিলিয়নিয়ারদের জন্যও এই আয়াত, সব রাজা, সব জালিম, সব নিপীড়িতদের জন্য, মোটকথা সেই টাকার পেছনে দৌড়ানো সব মানুষদের জন্য, যেই লাইফস্টাইলই হোক না কেন। যারা দুনিয়ার লোভে দৌড়াচ্ছেন— আমি এই আয়াত দিচ্ছি। আল্লাহ কোরআনে বলেন, এটা সরাসরি মানুষদের উদ্দেশে বলা— “তোমরা যদি কিয়ামতের দিন আমার কাছে আসো পুরো দুনিয়ার সব সম্পদ নিয়ে,” ভাবুন, আল্লাহ বলছেন, সব সম্পদ— কিয়ামতের দিনে তুমি সব নিয়ে আমার সামনে আসবে, ওগুলো দিয়ে বলতে চাইবে, “ইয়া আল্লাহ, এগুলো নিন, আমাকে জান্নাত দিন বা আমাকে ফিরিয়ে দিন।” আল্লাহ বলেন, “আজ এটার কোনো মূল্য নেই, আজ বিচার দিবস, আজ শেষ সিদ্ধান্তের দিন।” তোমার সব শেষ। তাহলে আমরা কীসের পেছনে দৌড়াচ্ছি?

কোন টাকার পেছনে? কোন মিলিয়ন? কোন বিলিয়ন? কোন ফেরারি?

আমার এনজিওর নাম সাহাবাহ— যার মানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহচররা। আর ৯৯—আল্লাহর ৯৯টি নাম ও গুণের ইশারা। আমাদের টি-শার্টের পেছনে একটি হাদিস লেখা আছে, যা আমি আগে বলেছি, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে-ই, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকারে আসে।” আমরা চেষ্টা করি, ওরা যেন কিকবক্সিং, ময় থাই বক্সিং শিখে, সেলফ ডিফেন্স শিখে, চ্যারিটি করে, এ সব কাজের ভেতর থাকে। আমরা মুসলিম কমিউনিটির জন্য সব দিক থেকেই কাজ করার চেষ্টা করি দ্বীন আমাদের কাছে সবকিছু। প্যালেস্টাইন আমাদের জন্য বড় ইস্যু। আমরা সেখানে ফুড ট্রাক পাঠাই, মানুষের জন্য খাবার পৌঁছে দিই। যারা স্প্যাগেটি বোলোনেজ পাস্তায় কেচাপ ঢালে, তাদের সঙ্গে আমি যা করতে চাই, তা হল তাদের সারাজীবনের জন্য গ্রেফতার করা, তারপর চাবি ফেলে দেওয়া। —গ্রেফতার করব। আরে, না, না, না—ওদের জেলে পাঠাতে হবে, সারা জীবনের জন্য। অপরাধ। ইতালিতে পিৎজায় পাইনঅ্যাপল দেবেন না, আর ইতালিতে পাস্তায় কখনো কেচাপ ঢালবেন না, ঠিক আছে?

আমার মতে, তাদের একটা আলাদা ফ্যাসিলিটিতে লক করে রাখা উচিত। হয়তো সাধারণ জেলের বদলে মানসিক হাসপাতালে, যেন দেখা যায়, তাদের মাথায় আসলে কী সমস্যা আছে। একটা স্প্যাগেটির প্লেটে তুমি টমেটো সস কী করে ঢালবে?

একজন শেফ ধীরে ধীরে রসুন কেটে নিলেন, অলিভ অয়েলে ফ্রাই করলেন, হালকা ক্যারামেলাইজ করলেন, টমেটো পেস্ট দিলেন, অ্যাসিড কমিয়ে এমন স্টেজে নিলেন, যাতে আপনার হার্টবার্ন না ওঠে, তারপর দিলেন বাসিল পাতা, তারপর টমেটো সস, তারপর লবণ, আর সব মশলা— পুরো বিষয়টা রীতির মত বিশ মিনিটের। তারপর ওই সস আরও তিরিশ মিনিট রান্না করলেন, যাতে সসটায় টেস্ট আসে। মাঝেমধ্যে স্বাদ নিয়ে ঠিক করলেন, সব মিলিয়ে এক ঘণ্টার পরিশ্রম। আর আপনি আসলেন, চিনি মেশানো টমেটো কেচাপ নিয়ে ওই স্প্যাগেটির ওপর ঢেলে দিলেন। জেল, কারাদণ্ড, আজীবন সাজা। এই তো। আর পিৎজায় পাইনঅ্যাপল? কমপক্ষে পনেরো বছর পাথর ভাঙার কাজে লাগানো উচিত। কোনো খামারে গিয়ে পাথর কুটুক। ফল আর পিৎজা একসঙ্গে—ইয়া আল্লাহ!

আমার ইতালিয়ান খুব একটা ভালো নয়, তবু যতটা পারি চেষ্টা করছি। প্রথমেই আমি সালাম জানাতে চাই কাভি দি তিরেনি, সালার্নো, আমার পরিবারকে— ফোকারেল্লি পরিবার, সাভাস্তানি পরিবারকে। সবাইকে অনেক ভালোবাসা, অনেক চুমু। আর ইতালিতে যারা আছেন, যাদের মাথায় এখনো সামান্য বুদ্ধি আছে, তারা রোমান ক্যাথলিকিজম আর এই খ্রিস্টান ধর্মের ভুল ধারণা ছেড়ে দিন। সম্মানের সঙ্গে বলছি— একটা কোরআন হাতে নিন,ওটাকে পড়ুন, আর মুসলমানদের জীবনের ভেতরে এসে দেখুন। দেখবেন, আপনার জীবন সবসময় শান্তিতে ভরে যাবে। আমার সব আত্মীয়, সব বন্ধু, যারা ইতালিতে আছেন— সবাই মুসলিম হয়ে যান। ইতালির আমার পরিবারের সবাই, আমার সব বন্ধু— ইসলাম গ্রহণ করে নিন। —তাকবির! —তাকবির! —আল্লাহু আকবার!