Towards Eternity
ব্লগে ফিরে যান

ইসলামের সেই কঠিন দিনগুলো - এআই ভিজ্যুয়ালাইজড - ইয়া মুহাম্মাদ (সাঃ) | পর্ব ২

প্রকাশের তারিখ

YouTube-এ দেখুন

খাব্বাব ছিলেন একজন দক্ষ কামার। সেদিনও তিনি প্রতিদিনের মতো নিজের কর্মশালায় ছিলেন, কিন্তু কোনো কিছু গড়ার জন্য নয়, তাঁর হাত-পা শক্ত করে বাঁধা ছিল, পালানোর কোনো পথ তার ছিল না। ঘামে ভেজা শরীর নিয়েই, বারবার তাঁকে উপহাস ও অপমান করা হচ্ছিল। “তুমি আমাদের ধর্ম ছেড়ে মুহাম্মদের অনুসারী হয়েছ!” যে চুল্লির পাশে তিনি বছরের পর বছর ধরে কাজ করেছেন, সেই চুল্লিতেই এবার গরম করা হচ্ছিল একটি লোহার টুকরো। এবং কেন তা তাঁকে দেখানো হচ্ছিল, তা ছিল একেবারেই স্পষ্ট-- ভয়াবহ সেই মুহূর্ত ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছিল। এরপর আগুন থেকে টেনে বের করা হলো দগদগে লাল গরম লোহার টুকরোটি, আর তা ধীরে ধীরে আনা হলো খাব্বাবের দিকে। ওই জ্বলন্ত লোহাটা তারা তাঁর শরীরে চেপে ধরতে চায় নির্যাতনের জন্য। শেষবারের মতো তাঁকে একটা সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। শুধু একটাই কথা বলতে হবে তাকে। কেবল একটাই কথা, যা তাঁকে আসন্ন এই অত্যাচার থেকে বাঁচাতে পারে। আল্লাহর রাসূলকে মিথ্যাবাদী বলা নাউযুবিল্লাহ (আল্লাহ হেফাজত করুন)। এই নির্মম দৃশ্যটি ঘটছিল শুধু এজন্যই, কারণ তিনি বলেছিলেন, “আমার রব আল্লাহ।” আল্লাহ এক। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। কিন্তু তাঁর ঈমানের আলো এত গভীরভাবে তাঁকে পূর্ণ করেছিল যে, তা আগুনে দগ্ধ হওয়ার ভয়কেও হার মানিয়েছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। আর তাদের সব হুমকি ধামকি সোজা ফিরিয়ে দিলেন তাদের দিকেই। পাষণ্ড অত্যাচারীরা, যাদের হৃদয় পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল, এবং বিবেক সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তারা ক্ষিপ্ত হয়ে লাল দগদগে গরম লোহা চাপিয়ে দিল খাব্বাবের পিঠে। এই ভিডিও সিরিজটি বিশ্বস্ত সূত্রের ইসলামীক শত শত রেফারেন্সের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। সব AI ভিজ্যুয়াল প্রস্তুত করা হয়েছে যোগ্য মুসলিম আলেমদের পরামর্শে, এবং তা ইসলামী নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দৃশ্যটি ছিল সত্যিই ভয়ংকর। এমন এক অসহনীয় নির্যাতন, যা কল্পনাও করতে চায় না কোনো মানুষ। সেই বুকফাটা হৃদয়বিদারক আর্তনাদ আকাশে বাতাসে প্রকম্পিত হতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর, ব্যথার তীব্রতায় খাব্বাব অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এক দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন দৃঢ় ঈমানদার ও সাহসী এক মানুষ, আর অন্য দিকে ছিল এক নির্মম মূর্তিপূজক, যে কিনা কুফরীর জলাভূমিতে ডুবে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য খাব্বাবকে হত্যা করা নয়, তাঁকে কেবল তাঁর ধর্ম ত্যাগে বাধ্য করা। বহু বছর পরে, তিনি নিজের জামা তুলে পিঠ দেখাতেন, যা ছিল সেই দিনগুলোর এক জীবন্ত স্মৃতি। প্রতিটি দাগ ছিল তাঁর ঈমানের সিলমোহর, যা বহন করছিল তাঁর সহ্য করা নির্যাতনের চিহ্ন। খাব্বাব তাঁর সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতেন এভাবে-- “একদিন মূর্তিপূজকেরা আমাকে ধরে বেঁধে ফেলল। ‘নিয়ে চলো ওকে!’ তারা চুলায় আগুন জ্বালালো আর আমাকে তাতে চিৎ করে শুইয়ে দিল। এরপর তাদের একজন আমার বুকের ওপর পা রাখল, আর আগুন নিভে না যাওয়া পর্যন্ত আমাকে ছাড়ল না।” ভাবা যায়?

একবার কল্পনা করে দেখুনতো, সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়লে তাঁর মনের অবস্থা কেমন হতে পারে। কুরাইশদের কাছে তখন নতুন এই ধর্মটি একদমই গ্রহণযোগ্য ছিল না। কারণ এই ধর্ম অনুযায়ী, যে খাব্বাব তখন একজন দাস ছিলেন, তিনি এখন তাঁর সেই প্রভুর চেয়েও শ্রেষ্ঠ, যে তাঁকে নির্যাতন করছিল। কারণ তিনি জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন। এই ধর্ম সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিচ্ছিল। এটা কীভাবে সম্ভব? কীভাবে কালো-সাদা, ধনী-গরিব, অভিজাত আর সাধারণ, দাস ও মুনিব সবাই সমান হতে পারে? কীভাবে সবাইকে ভাই বলা যেতে পারে? আলি (রাঃ)-এর মতো এক তরুণ আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মতো একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ, আবু বকর (রাঃ)-এর মতো এক অভিজাত ব্যক্তি, আর খাব্বাবের মতো একজন দাস-- একই মজলিসে বসে কথা বলতে পারে?

মেয়েদের মূল্য দেওয়া, নারীদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে সম্মান করা, তাদের কথা বলার ও মত প্রকাশের অধিকার দেওয়া, এবং কীভাবে বলা হচ্ছে যে জান্নাত মায়েদের পায়ের নিচে… এই ধারণাগুলো সেই সমাজের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অচেনা। এই ধর্মটা কোথা থেকে এলো? এটি তাদের পুরো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল, এবং ন্যায় ও দয়ার ওপর ভিত্তি করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠছিলো। আর কুরাইশদের কাছে, এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য ছিল না। যদিও তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করত, তবুও তারা মনে করত, আল্লাহও তাদের ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। কিন্তু তারা কি শুধু বেঁচে থাকা আর মারা যাওয়ার জন্যই এই দুনিয়ায় এসেছিল?

নিজেদের বানানো আইনের মাধ্যমে, তারা মনে করত, যাকে খুশি তারা নির্যাতন করতে পারে। কিন্তু তারা যখন ইচ্ছেমতো শাসন করছিল, তখন আল্লাহ কীভাবে তাঁর আইন না পাঠিয়ে পারেন? তারা কি সত্যিই বিশ্বাস করত, তিনি জুলুম থামানোর জন্য কোনো ব্যবস্থা পাঠাবেন না? মানুষ যখন এই দুনিয়ায় যা খুশি বলছিল, তারা কি ভেবেছিল আল্লাহ তায়ালা চুপ করে থাকবেন?

ঠিক এই চিন্তাধারাই ছিল সাহাবিদের মাঝে। আর যত ভয়াবহই হোক নির্যাতন, তারা কখনো ঈমানের পথে পিছপা হননি। ইসলামে বিশ্বাস করা কোনো সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। এর জন্য প্রয়োজন ছিল সত্যিকারের সাহস। শুধু কেবল খাব্বাব ইবনুল আরতই নন, অন্যান্য বহু সাহাবিরাও অগণিত কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। কেউ কেউ প্রখর মরুভূমির সূর্যের নিচে এমনভাবে নির্যাতিত হয়েছিল, যা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি। কেউ কেউ আবার নিজের পিতার হাতেই ঘরে বন্দি ছিলেন, অনাহারে রাখা হয়েছিল তাদের, এবং পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। কারো কারো মায়ের চাপের মুখে পড়তে হয়েছিলো, মা বলতেন, “তুই যদি তোর ধর্ম না ছাড়িস তবে আমি না খেয়ে মারা যাব।” কেউ কেউ আত্মীয় স্বজনদের হাতেই বাঁধা পড়ে নির্যাতিত হয়েছিল। জ্বলন্ত বালির ওপর শুইয়ে রাখা হতো উনাদের অনেককেই, অনাহারে কষ্ট দেয়া হতো, তারপর তাদের ওপর চাপানো হয়েছিল ভারী ও জ্বলন্ত পাথর। অনেককেই এমনভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, যে তারা কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিল, এমনকি কেউ কেউ যন্ত্রণায় দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলেছিল। তাদের দিয়ে শুধু একটাই কথা বলানোর জন্য যা কিছু করা যায় সবই করেছিল তারা, “মুহাম্মদ মিথ্যাবাদী,” নাউযুবিল্লাহ (আল্লাহ হেফাজত করুন)। কিন্তু এসবের পরও, তাদের সংখ্যা একটুও কমেনি। বরং উল্টোটাই হয়েছিল তারা আরও বাড়তেই থাকল। এত দৃঢ় অঙ্গীকার দেখে মানুষ নিজেকে প্রশ্ন না করে থাকতে পারত না “যে বিশ্বাস মানুষকে এত দৃঢ় করে, এত শক্তিশালীএবং এত নির্ভীক করে তোলে সেটা কি সত্যিই মিথ্যা হতে পারে?” আর এটা শুধুমাত্র কয়েকজনের ব্যাপার ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার সাহাবি ত্যাগের অসংখ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। কীভাবে তারা সবাই এত অসাধারণ আত্মত্যাগ দেখাতে পারে?

আমরা এমন এক ধর্মের কথা বলছি, যা তাদের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এটা কি সত্যিই শুধু কোন একজন মানুষের কাল্পনীক কোন রূপকথা হতে পারে? শুধুই কী মনগড়া গল্প ছাড়া আর কিছু নয়? যে বিশ্বাস পুরোপুরি সত্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় না, তা কি মানুষকে এত শক্তি দিতে পারে?

কিন্তু কুরাইশরা তখনও এসবের কিছুই বুঝতে পারেনি। এভাবেই চলতে থাকলো সেই কঠিন দিনগুলো। ইসলামের শুরুর দিনগুলোতে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইসলামকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেননি। তবে তিনি যে ঐশী বার্তা এনেছিলেন, তা ইতিমধ্যেই নীরবে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, একজন থেকে আরেকজনে। কেউ বোঝার চেষ্টা করছিল, আর কেউ বুঝতেই পারছিল না যে কী হচ্ছে। আর কেউ কেউ এটাকে দেখছিল এক বিপর্যয় হিসেবে-- এক ভয়ংকর হুমকি হিসেবে। শুরুতে কুরাইশ নেতারা এমন ভান করল যেন এসবে তাদের কিছুই যায় আসে না। কিন্তু যখন তারা দেখল, মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করছে, তখন তারা নবী (সাঃ)-কে বিদ্রূপ করতে শুরু করল। তারা মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়ে তার সম্মান নষ্ট করতে চাইল, যে অপবাদগুলো তারা নিজেরাই সত্য মনে করত না। যাঁকে একসময় তারা “আল-আমিন”-- অর্থাৎ বিশ্বস্ত বলে ডাকত, আজ তাকে প্রকাশ্যে বলল মিথ্যাবাদী, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, আর যাদুকর--নাউযুবিল্লাহ (আল্লাহ হেফাজত করুন)। সাধারণভাবে, কারও ভাবমূর্তি ভাঙার জন্য এটাই হতো সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। কিন্তু সত্য এখানে অস্বীকার করার মতো ছিলো না। তাই তাদের হাতে যা ছিল, তা হচ্ছে শুধু মুমিনদের নির্যাতন করা। আসলে, একটা ব্যাপার তারা বুঝতে পারেনি' তা হলো, ইসলাম হচ্ছে সূর্যের মতো। আর কুরাইশ তো দূরের কথা, কেউই একে নিভিয়ে দিতে পারবে না। দিনে দিনে তাদের দলেরই মানুষজন অন্ধকার ছেড়ে বেরিয়ে আসছিল, আর সেই আলোকে ঘিরে সবাই একত্র হচ্ছিল। মুমিনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, প্রথম তিন বছর দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল গোপনে ইসলামের দাওয়াত চলেছিল গোপনীয়তা রক্ষা করে, বন্ধ দরজার আড়ালে। কিন্তু গোপনে হলেও, একটি স্থানের প্রয়োজন ছিল যেখানে আল্লাহর আয়াত শেখানো যাবে, আর মুসলিমরা একসাথে মিলিত হতে পারবে। কারণ এমন জায়গা ছাড়া, নতুন মুসলিমরা কীভাবে তাদের ধর্ম সম্পর্কে আরও জানতে পারবে?

তাদের দরকার ছিল একটি মাদ্রসা--একটি স্কুল, যেখানে তারা ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা করতে পারবে। কিন্তু সেটা কোথায় হতে পারে?

আবু বকরের ঘর হতে পারত না, কারণ সবাই তাকে চিনত। তার বাড়িতে কেউ গেলেই সাথে সাথে নজরে পড়ে যেত। জুবাইরের বা তালহার বাড়িও হতে পারত না, আর উসমানের ঘরতো একদমই নয়। এরা সবাই ছিল খুব পরিচিত মানুষ। তাদের বাড়িতে যাওয়া মানেই মুসলিমদের বড় বিপদে পড়ে যাওয়া। ঝুঁকিটা ছিল খুবই বেশি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অন্য বিকল্পগুলো নিয়ে ভাবতে লাগলেন। কিন্তু তিনি যে পথই ভাবছিলেন, সবকটাই যেন শেষপর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। পরিস্থিতি ছিল ভীষণ হতাশাজনক। সাহাবিরা চাইছিলেন আরও বেশি করে, আরও স্বাধীনভাবে তাদের দ্বীন শিখতে। ঈমানের জ্ঞানের জন্য তারা ছিলেন তৃষ্ণার্ত, কিন্তু তাদের হাত ছিল বাঁধা। কোনো সমাধানই যেন মাথায় আসছিল না। ঠিক তখনই, যখন সব আশা শেষ মনে হয়, আল্লাহ যেমনটা ফেরাউনেরই প্রাসাদ থেকে মূসাকে অতি যত্নে বড় করে তোলেন। তাহলে এই উম্মাহর ফেরাউন কে ছিল?

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেভাবে বলেছেন, সে ছিল আবু জাহেল। আর ঠিক তারই পরিবার থেকে আল্লাহ তুলে আনলেন এক বীরকে। সমাধানটি ছিল এই তরুণটি মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর। আল-আরকাম ইবন আবি আল-আরকাম। তিনি ছিলেন নব্য মুসলিমদের একজন এবং সদ্য বিবাহিত। মক্কার পুরো শহরের মধ্যে তার ছিল অন্যতম সুন্দর একটি বাড়ি। প্রশস্ত হলঘর, নিরিবিলি বাগান আর বড় আয়তনের কারণে, বাড়িটা সত্যিই ছিল অপূর্ব। আর সেই ঘরটি ছিল সাফা পাহাড়ে অবস্থিত যারফলে তা ছিল সবার চোখের আড়ালে, আর তাই তুলনামূলক নিরাপদ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যা যা খুঁজছিলেন, সবকিছুই ছিল সেখানে। এ জায়গাটিই হতে পারত সেই মাদরাসা, যেটি তিনি এতদিন ধরে খুঁজছিলেন। কিন্তু আরকাম কি রাজি হবেন?

এটা ছিল এক বিশাল ঝুঁকি। সে সময় এমন কাজে নিজের ঘর খুলে দেওয়া মানেই, পুরো মক্কার চোখে তাৎক্ষণিক লক্ষ্যবস্তু হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে যখন আপনার আত্মীয়ই হয় আবু জাহেল। কারণ মূর্তিপূজারীদের কাছে, নিজেদের আত্মীয়রাই ছিল নির্যাতনের সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য। আর বাইরে মুসলিমদের সঙ্গে তারা যা করছিল, তা দেখার পর এই সিদ্ধান্ত মোটেও সহজ ছিল না। তবুও, আরকাম রাজি হয়ে গেলেন। এখন একটু চিন্তা করে দেখুন একজন সদ্য বিবাহিত তরুণ। তিনি চাইলে বলতে পারতেন, “স্ত্রীর সঙ্গে শান্তিতে আরামে জীবন কাটাতে চাই,” কিন্তু তিনি তা বলেননি। এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। দ্বীনের খাতিরে তিনি নিজের ঘর খুলে দিয়েছিলেন। আর সেদিন থেকেই, ওটা আর শুধু একটি ঘর রইল না। তা হয়ে উঠল একটি স্কুল। যা ইতিহাসে পরিচিত হলো-- দারুল আরকাম নামে। সেখানে শেখা হবে বহু সত্য, আর নেওয়া হবে বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। যদি ইয়াসরিব একদিন মদিনা হয়, যদি ইসলাম পৌঁছে যায় বিশ্বের প্রতিটি কোণে, তবে তার ভিত্তি রচিত হবে ঠিক সেখানেই। নবী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবিরা যেসব ভালো অবস্থানগুলো খুঁজছিলেন, তার সবকিছুই যেন একত্রে পরিপূর্ণ ছিল সেই ঘরটির ভেতরে। অন্যদিকে, কেউ ভাবতেই পারেনি আবু জাহলের নিজের পরিবার থেকে, এমন কিছু ঘটতে পারে। বিশেষ করে মাত্র ১৭ বছরের এক ছেলের মাধ্যমে। আমরা যখন সাহাবিদের কথা ভাবি, সাধারণত বয়স্ক, খুব পরিণত পুরুষদের কথাই কল্পনা করি। আসলে মূলত, অনেক শীর্ষস্থানীয় সাহাবিই ছিলেন এই তরুণ আরকামের মতোই। যেমন বলা যায়, ইসলাম গ্রহণের সময় আলী (রাঃ)-এর বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। আব্দুল্লাহ ইবন উমর ছিলেন ১৩ বছরের। যায়দ ইবন হারিসা ছিলেন ১৫। আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ এবং যুবাইর ইবন আল-আওয়াম ছিলেন ১৬। তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ, আব্দুর রহমান ইবন আউফ, আরকাম ইবন আবি আল-আরকাম, এবং সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস ছিলেন ১৭। মুস‘আব ইবন উমাইর ছিলেন ১৮ থেকে ২০-এর মধ্যে। আর জা‘ফর ইবন আবি তালিব ছিলেন ২২। তারা মোটেও বৃদ্ধ ছিলেন না। তিন বছর ধরে সাহাবিরা দারুল আরকামে একত্র হতে থাকলেন, কুরাইশদের নজরের বাইরে থেকেই। আর সেই সময়টায়, তারা ঈমানের সত্যগুলো দিয়ে হৃদয় ভরিয়ে তুলেছিলেন। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত কি এভাবেই চিরদিন গোপনে চলতে থাকবে?

অবশ্যই না। ততদিনে কুরাইশদের মধ্যে কমবেশি খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, আর তাই এটা লুকিয়ে রাখার আর কোনো সুযোগই ছিল না। এই সত্য সবার কাছে পৌঁছানো দরকার ছিল। এখন সময়--গোপন দাওয়াত থেকে প্রকাশ্য দাওয়াতে যাওয়ার। কিন্তু নবী (সাঃ) কোথা থেকে কীভাবে শুরু করবেন?

তারপর আল্লাহর নির্দেশ নাজিল হলো। “আর তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর।” এই ওহী তাঁর হৃদয়ের ভার আরও বাড়িয়ে দিল। এটা কোনো সহজ কাজ ছিল না। অচেনা মানুষের সাথে অনেক বিষয়ে কথা বলা যায়, কিন্তু নিজের আত্মীয়দের কথা শোনানো-- এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। এই দায়িত্বের ভারে নবী (সাঃ) এতটাই ভারাক্রান্ত হলেন যে, কয়েকদিন তিনি ঘর থেকেই বের হননি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটা পরিকল্পনা করলেন। একদিন আত্মীয়দের সবাইকে রাতের খাবারের দাওয়াত দিলেন যেন সবাই একসাথে হয়। খাবার প্রস্তুত হলো, অতঃপর, আব্দুল মুত্তালিবের পুত্ররা সবাই এলেন দাওয়াত পেয়ে খাবারের আয়োজনে। আবু লাহাবসহ প্রায় ৪০ জন মানুষ আসলেন উক্ত আয়োজনে। তারপর তারা সবাই মিলে খাবার খেতে বসলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মাংস কাটতে লাগলেন আর বললেন, “চলুন খাবার শুরু করা যাক। বিসমিল্লাহ।” কিন্তু তিনি নিজে খাবারে হাত দিলেন না। তিনি অপেক্ষা করছিলেন কখন কথা বলার জন্য সঠিক সময় আসবে, আর ভাবছিলেন কী দিয়ে তিনি কথা শুরু করবেন। সবাই পেট ভরে খাওয়ার পর, তারা যা দেখল তাতে বিস্মিত হয়ে গেল। “তুমি কি দেখছ আমি যা দেখছি?” “হ্যাঁ!

এটা কীভাবে সম্ভব হলো?” বরকতের (অফুরন্ত কল্যাণের) এক মুজিযা সদ্য ঘটে গেল। পেট ভরে গেলেও, খাবারটা ঠিক আগের মতোই থেকে গেছে' যেন কেউ এখান থেকে একটুও খায়নি। আলী (রাঃ), যিনি সেদিন উপস্থিত ছিলেন এবং তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৩, পরে বলতেন “আমি সবার জন্য যে খাবার পরিবেশন করেছিলাম, একজন মানুষই তা খেয়ে ফেলতে পারত।” তারা বোঝার চেষ্টা করছিল আসলে কী ঘটছে। ঠিক যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কথা বলতে যাচ্ছিলেন, আবু লাহাব হঠাৎ বাধা দিল এবং চিৎকার শুরু করল। “আমরা এরকম জাদু এর আগে কখনো দেখিনি!” এটা ছিল একেবারে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া একটি স্পষ্ট মু‘জিযা। কিন্তু আবু লাহাবের হৃদয় ও মনের তা উপলব্ধি করার কোন সক্ষমতাই ছিলো না। আল্লাহ তাদের কাছে একজন নবী পাঠিয়েছিলেন। আর স্বাভাবিকভাবেই, মানুষ কনোনা কোন প্রমাণ দেখতে চায়। প্রত্যেক নবীর মতোই, তাঁকেও মু‘জিযা দেওয়া হয়েছিল। যেমন--আল্লাহ যদি এমন কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম ভেঙে দেন যা আগে কখনো ঘটেনি, শুধুমাত্র সেই মানুষটার জন্যে, তাহলেই সেটাইতো হচ্ছে স্পষ্ট প্রমাণ, যে তিনি নির্বাচিত এবং সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। এ কারণেই মু‘জিযা ছিল প্রয়োজনীয়। আর নবুয়তের পুরো জীবনজুড়ে, আরও অনেক মু‘জিযা দেখা গিয়েছে। কিন্তু তবুও, আবু লাহাব এই মু‘জিযাকে জাদু বলেই আখ্যা দিল। তার কথাগুলো ক্রমেই আরও কঠোর হয়ে উঠছিল। “নিজের পরিবারে তুমি যে পরিমাণ অশুভতা আর ক্ষতি ডেকে এনেছ, তোমার মতো এমন কাউকে আমি এর আগে কখনো দেখিনি!” সে একের পর এক কটুক্তি ছুঁড়তে থাকল সুন্দর মুহূর্তটা নষ্ট করার জন্য যা মুখে আসলো তাই বলতে লাগলো। ফলস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটি কথাও বলার সুযোগ পেলেন না। আর তাঁর আত্মীয়রা সবাই একে একে ঘর ছেড়ে চলে গেল। একবার কল্পনা করে দেখুনতো। এক আল্লাহর আদেশের কারণে, তিনি কয়েকদিন ঘর থেকেই বের হতে পারেননি। নানান অনুভূতিতে ভর করে, তিনি সব প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কী বলবেন--প্রতিটি শব্দ তিনি গভীরভাবে ভেবে রেখেছিলেন। কিন্তু একটি মুহূর্তেই, সবকিছু ভেস্তে গেলো আবু লাহাবের কথায় সব এলোমেলো হয়ে গেল। এভাবেই, এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দিনটি এক হতাশাজনক সমাপ্তিতে পৌঁছাল। আবু লাহাব ছিলেন নবীর একজন চাচা। কিন্তু সামনের বছরগুলোতে, তিনি ইসলামের সবচেয়ে ঘৃণিত শত্রুদের একজন হয়ে উঠবেন। চরম ক্লান্তির মাঝেও, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) সবসময় একই দৃঢ়তা নিয়ে নিজেকে আবার দাঁড় করাতে পারতেন। হতাশাকে তিনি কখনোই হৃদয়ে জায়গা দেননি। প্রতিবারই তিনি নিজেকে সামলে নিতেন এবং আগের চেয়েও আরও শক্ত হয়ে নিজের পথে এগিয়ে যেতেন। পরদিনই, তিনি আবারও তাঁর আত্মীয়দের দাওয়াত দিলেন। অতিথিরা আসতে শুরু করলেন, আবু লাহাবও এসে হাজির হলো। কিন্তু এবার, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছিলেন আরো বেশী সতর্ক। তারা একসাথে বসে খাবার খেলেন। তারপর সেই মুহূর্তটা এলো। আবু লাহাব কোন একটা কথা বলার আগেই, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে কথা বলা শুরু করলেন। এখন কল্পনা করুন--আমরাও সেখানে আছি, সেই সমাবেশের একজন মানুষ হিসেবে। “সব প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা একান্তই আল্লাহর জন্য। আমিও কেবল তাঁরই প্রশংসা করি এবং কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি কেবল তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। আমি তাঁর ওপর ঈমান আনি এবং তাঁর ওপরই ভরসা করি। পূর্ণ নিশ্চয়তার সঙ্গে আমি আপনাদের জানাচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই।” এই কথা বলার পর, তিনি তাঁর উদ্দেশ্য এভাবে ব্যাখ্যা করলেন: “নিশ্চয়ই, যে ব্যক্তিকে চারণভূমি খুঁজতে পাঠানো হয়, সে ফিরে এসে নিজের পরিবারকে মিথ্যা বলবে না। আল্লাহর কসম, আমি যদি সমগ্র মানবজাতির কাছেও মিথ্যা বলতাম, তবুও আপনাদের কাছে কখনো মিথ্যা বলতাম না। আমি যদি সব মানুষকেও প্রতারণা করতাম, তবুও আপনাদের সাথে কখনোই না। আমি আপনাদের আহ্বান করছি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে-- যিনি এক ও অদ্বিতীয় উপাস্য। আর আমি তাঁর রাসূল, বিশেষ করে আপনাদের জন্য এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত।” তিনি তাঁর বার্তাটি সংক্ষেপে বললেন, তারপর আবার বললেন, “আল্লাহর কসম, আপনারা যেমনটা ঘুমিয়ে পড়েন, তেমনি আমরা মৃত্যু বরণ করবো। আর যেমনটা তোমরা জেগে উঠো, তেমনি আমাদের আবার জীবিত করা হবে। আর আমাদেরকে হিসাব দিতে হবে আমরা যা কিছু করছি তার সবকিছুর জন্য। যারা ভালো কাজ করবে তারা ভালো পুরস্কার পাবে, আর যারা মন্দ কাজ করে তাদেরকে সে অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।” তিনি যে কথাগুলো বলছিলেন, সবই ছিল হৃদয় থেকে উঠে আসা। তিনি জান্নাত ও জাহান্নামের কথা বললেন, এভাবেই তাঁর বক্তব্য চালিয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত, তিনি তাঁর আত্মীয়দের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। তিনি বললেন, “আমি আপনাদেরকে দু’টি কথার দিকে আহ্বান করছি-- যা জিহ্বায় হালকা, কিন্তু অনেক গুরুগম্ভীর সেই বাক্য। আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ। (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর রাসূল)।” তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তবে আপনাদের মধ্যে কে আমার ডাকে সাড়া দেবেন এবং আমার সমর্থক ও সহকারী হবেন?” কিন্তু চারদিকে নেমে এলো নীরবতা। কেউ মাথা তুলল না। একটি কণ্ঠও শোনা গেল না। তখন, মাত্র ১৩ বছর বয়স হওয়া সত্ত্বেও, একটি সাহসী কণ্ঠ নীরবতা ভেঙে দিল। এবং তা ছিল আলী (রাঃ) এর কণ্ঠস্বর। “হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ), আমি আপনাকে সাহায্য করব' যদিও আমি এখানকার সবার চেয়ে ছোট।” তারপর নবী (সাঃ) আবার জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু চল্লিশ জনের মধ্যে, আর কেউ সাড়া দিল না। সবাই অপেক্ষা করছিল আর কেউ এগিয়ে আসে কী না। তিনি তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন। “আপনাদের মধ্যে কে আমার ডাকে সাড়া দেবেন এবং আমার সমর্থক ও সহকারী হবেন?” তিনি আশা করছিলেন আরেকটি কণ্ঠ শুনবেন। কিন্তু প্রতিবারই, শুধু আলীই হাত তুলল। কিন্তু সেই এক হাত, একাই যথেষ্ট ছিল। ওটাই ছিল সেই হাত, যেটা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-র প্রয়োজন ছিল। প্রকৃতপক্ষে, আপনি যদি নবী (সাঃ)-র জীবন দেখেন, দেখবেন যখনই কোনো প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, প্রায় সবসময়ই আলীই এগিয়ে এসেছিলেন। তবে কি পরিবারের আর কেউ সাড়া দেয়নি?

সেই রাতে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু দু’টি প্রধান মনোভাব সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল: আবু তালিবের এবং আবু লাহাবের। তাঁরা দুজনই তাঁর চাচা ছিলেন, কিন্তু তাঁদের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। আবু লাহাবের মনোভাব বদলালো না। সে বলল: “হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানরা! আমি শপথ করে বলছি, এটা ভয়ংকর এক অকল্যাণ! অন্যরা তার হাত ধরে থামানোর আগেই, তোমরাই তার হাত ধরে তাকে থামাও! আজ যদি তোমরা তার কথা মানো, তাহলে অপমান আর লাঞ্ছনা তোমাদের ভাগ্য হবে! আর যদি তাকে রক্ষা করতে চাও, তবে তোমাদের হত্যা করা হবে! সে দাওয়াতটিকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু তালিব। তার কথায় তিনি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। “তুমি কাপুরুষ! আল্লাহর শপথ! যতদিন আমরা বেঁচে আছি, ততদিন আমরা তাকে সাহায্য করব!

হে আমার ভাতিজা, যখনই তুমি মানুষকে দাওয়াত দিতে চাও, আমাদের জানিও--আমরা সশস্ত্র ভাবে তোমার সঙ্গে যাবো!” তবে আবু তালিবের এই সমর্থন ঈমানে পরিণত হয়নি। তিনি বললেন-- “আমি নিজেকে আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করতে রাজি করতে পারিনি। তাই আমি সেই ধর্মেই মৃত্যুবরণ করব, যে ধর্মে তিনি মারা গিয়েছিলেন।” ফলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যে ফলাফলের আশা করেছিলেন, তা পেলেন না, আর অতিথিরা নীরবে চলে গেলেন। অন্য কোনো পথ খুঁজতেই হতো। তিনি হতাশাকে জিততে দিতে পারেন না। মানুষ গ্রহণ করুক বা না করুক, তার দায়িত্ব স্পষ্ট ছিল-- সতর্ক করা, দাওয়াত দেওয়া, এবং বার্তাটি পৌঁছাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। তার দরকার ছিল শুধু একটি উপায়, যাতে মক্কার মানুষদের এক জায়গায় জড়ো করে তাদেরকে কথাগুলো যেন শোনানো যায়। তিনি ভাবতে থাকলেন কিভাবে কি করা যায়, অবশেষে একটি উপায় খুঁজে পেলেন। একদিন মক্কায় শোনা গেল এক উচ্চস্বরে ডাক। “ইয়া সাবাহাহ!

ইয়া সাবাহাহ!” (হায় সকালবেলার বিপর্যয়!) এই শব্দটা কী? শব্দটি আসছিল সাফা পাহাড় থেকে। মানুষ কৌতূহলী হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল এক ভিড় জমে গেল। কুরাইশদের প্রতিটি গোত্রের মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিল। কিন্তু কী এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা এত মানুষকে একত্র করল? এই ডাকের অর্থই বা কী? এটি ছিল এক ধরনের জরুরি সতর্ক সংকেত। মক্কার মানুষ এটি শুনলেই বুঝত, কোনো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। জরুরি খবর এসেছে। সবাই জড়ো হলে তারা দেখল-- ডাক দিচ্ছেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। আবু লাহাবও সেখানে উপস্থিত ছিল। সবাই অপেক্ষা করছিল-- নবী (সাঃ) কী বলবেন?

এরপর তিনি দিলেন তার সেই অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক ভাষণ। তিনি বললেন-- “আমি যদি আপনাদের বলি, এই পাহাড়ের পেছনে কিংবা ওই উপত্যকায় শত্রু অশ্বারোহীরা লুকিয়ে আছে এবং সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তে আক্রমণ করবে-- আপনারা কি আমাকে বিশ্বাস করবেন?” তারা সবাই বলল, “হ্যাঁ, আমরা বিশ্বাস করব।” তখন তিনি বললেন-- “তবে জেনে রাখুন, আমি আপনাদের সামনে থাকা এক মহাশাস্তির সতর্কবার্তা দিতে এসেছি।” আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন আমার নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করতে আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে। আমি আপনাদের দাওয়াত দিচ্ছি এই কথা বলার জন্য-- ‘আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই।’ আমি তাঁর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। আপনারা যদি আমার কথা গ্রহণ করেন, আমি আপনাদের জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আর এটাও জেনে রাখবেন যতক্ষণ না আপনারা বলছেন ‘আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই,’ আমি আপনাদের এই দুনিয়াতে কোন সাহায্য করতে পারব না, এমনকি আখিরাতেও না। আবু লাহাব ক্রোধে উন্মাদ হয়ে উঠল। নিজ পরিবারের মধ্যেই সে এই দাওয়াত সহ্য করতে পারছিল না। আর এবার আল্লাহর রাসূল (সাঃ) সমগ্র কুরাইশদের উদ্দেশ্যে কথা বলছিলেন। এরপর সে যা করল, তা ছিল সীমা লঙ্ঘনের চূড়ান্ত পর্যায়। আরও একবার সে ইসলামের বার্তা থামানোর চেষ্টা করল। রাগে ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা তুলে নিল এবং চিৎকার করতে করতে তা ছুড়ে মারল তার ভাতিজার দিকে, “তোমার হাত ধ্বংস হোক!

এই কারণেই কি তুমি আমাদের এখানে ডেকেছিলে?” সে যা ই ছুড়ে মেরেছিল, তা আসলে আল্লাহর দ্বীনের দিকেই নিক্ষেপ করা হয়েছিল, একমাত্র ওহির বিরুদ্ধেই। এই কথাগুলো বলা হয়েছিল পরম করুণাময়ের দিকে আহ্বানের জবাবে, চিরস্থায়ী জান্নাতের দাওয়াতের প্রতিক্রিয়ায়। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, নবী (সাঃ)-এর জন্য এটা কতটা কষ্টকর ছিল?

নিজের চাচা--যার কাছ থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি সমর্থন আশা করেছিলেন, তিনিই তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করছিলেন। সেই মুহূর্ত থেকেই আবু লাহাব ও তার স্ত্রী-- দুজনেই তাদের জীবন ব্যয় করল নবী (সাঃ)-কে কষ্ট দেওয়ার নিমিত্তেই। এই কাজের মাধ্যমে সে নিজের পরিণতি নিজেই নির্ধারণ করে ফেলেছিল। এরপর নাযিল হয় সূরা আল-মাসাদ, যেখানে তার ভয়াবহ পরিণতির ঘোষণা দেওয়া হয়। এই সূরায়, আল্লাহ বলেন: “আবু লাহাবের হাত ধ্বংস হোক, আর সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার সমস্ত সম্পদ আর তার সব উপার্জন কোনো উপকারেই আসেনি। সে দগ্ধ হবে জ্বলন্ত আগুনে। আর তার স্ত্রী--সেই আগুনের বাহক হবে। তার গলায় থাকবে খেজুরের আঁশের দড়ি।” এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দিল সে নিশ্চিতভাবেই জাহান্নামে যাবে। অর্থাৎ, সে কখনো ঈমান আনবে না। মূলত, বাহ্যিকভাবে দেখলে, এটা যেন এক বিশাল ঝুঁকি হয়ে যেতো। যদি আবু লাহাব ঈমান এনে ফেলত তবে, তাহলে এই আয়াতগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যেত। এমনকি সে যদি শুধু ভান করেও ঈমান আনত, ফলাফল একই হতো। সে সত্যিই ইসলাম গ্রহণ করুক বা শুধু ভুল প্রমাণ করতেই চাইতো, তাকে শুধু বললেই হতো-- “আমি ঈমান এনেছি।” তো শেষপর্যন্ত কী হলো?

এই সূরা নাযিল হওয়ার পর সে আরও সাত বছর জীবিত ছিল। কিন্তু তার ঘৃণা একটুও কমেনি। সে কাফের অবস্থাতেই মারা যায়। আবু লাহাব ইসলামকে ঘৃণা করত এবং এই দ্বীনের ক্ষতি করতে যা কিছু সম্ভব ছিল, করত। তাহলে এমন সোনালি সুযোগ তাকে কেন থামিয়ে দিল? এর চেয়েও বড় কথা-- যদি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর বার্তা মিথ্যা হতো, তাহলে তিনি এমন ভয়ংকর ঝুঁকি কীভাবে নিতে পারতেন?

উত্তরটি খুবই সহজ। আল্লাহ এভাবেই চেয়েছিলেন। তিনি অতীত, ভবিষ্যৎ এবং মধ্যবর্তী অবস্থানের সবকিছুই জানেন। তাই এক অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে, তিনি ঘটনা ঘটার বহু আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন আবু লাহাব নিজেই তার ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, কারণ তিনি সেই সত্তার ওপর ভরসা করেছিলেন যিনি এটি নাযিল করেছিলেন। কিন্তু আবু লাহাব এটা বুঝতেই পারেনি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কথার কোনো জবাব কেউ দেয়নি। তারা এমন কিছু শুনেছিল, যা তারা আগে কখনো শোনেনি। তবুও তারা নীরবই রইল। তারা শুধু ফিসফিস করে কথা বলল এবং সেখান থেকে চলে গেল। সেই দিন থেকেই ইসলামের দাওয়াত আর গোপন রইল না। প্রকাশ্য দাওয়াতের যুগ শুরু হয়ে গেল। এটাই ছিল এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এখন এমন এক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছিলেন, যা চিরস্থায়ী সুখের পথ দেখায়, শুধু নিজের গোত্রের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য। কিন্তু এর মূল্য ছিল অত্যন্ত চড়া। তাকে সহ্য করতে হবে অগণিত অপমান, নির্যাতন, অত্যাচার আর মিথ্যাচার। যাদের তিনি অনন্ত ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছিলেন, তারাই তাকে নির্মমভাবে কষ্ট দেবে। হীরা ও কয়লা, সোনা ও তামা-- এবার একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যাবে। এমনই একটি দিন আবার এসেছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কাবার সামনে নামাজ আদায় করছিলেন। চারপাশে ছিল ঘৃণা ও ক্রোধে ভরা দৃষ্টি। তাদের বিদ্রূপ ও অপমান উপেক্ষা করে তিনি নামাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই দৃষ্টিগুলো ছিল আসন্ন এক ভয়ংকর ঘটনার পূর্বাভাস। তিনি সিজদায় ছিলেন, সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে প্রশান্ত মুহূর্তগুলোর একটিতে। কিন্তু নির্মম মূর্তিপূজকেরা অবশেষে তাদের সুযোগ পেয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আসন্ন বিপদের কিছুই অনুমান করতে পারেননি, আর তারা উটের নাড়িভুঁড়ি তাঁর কাঁধের ওপর ঢেলে দিয়েছিলো। প্রচণ্ড রোদে সেই দুর্গন্ধ আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছিলো। তিনি ঠিকমতো শ্বাসও নিতে পারছিলেন না। আবু জাহেল অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। এটা ছিল তারই পরিকল্পনা। যুক্তি দিয়ে হারাতে না পেরে এমন নোংরা পদ্ধতিতে সে সত্যকে অপমান করতে চেয়েছিল। যেই সত্যকে সে কোনভাবেই পরাজিত করতে পারেনি। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো তবুও, তিনি নামায ভাঙ্গেননি। যা আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-কে নামাজ ভাঙতে দেয়নি?

কী ছিল সেই শক্তি? চারপাশের মূর্তিপূজকেরা যখন হাসাহাসি ও বিদ্রূপ করছিল, কী তাঁকে নামাজে অটল রাখছিল? কয়েক বছর আগেও কি তিনি কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন না? তাহলে কী তাঁকে এত ঘৃণার মুখে পড়ার ঝুঁকি নিতে বাধ্য করেছিল? এত অপমানের পরও কোন শক্তি তাঁকে এত দৃঢ় রেখেছিল?

কিছুক্ষণ পরে তার কন্যা ফাতিমা, যিনি তখন শিশু ছিলেন, তাঁকে সেই অবস্থায় দেখে আতঙ্কিত হয়ে গেলেন। সে চিৎকার করে কেঁদে উঠল, “আবাতি, আবাতি!” এই দৃশ্য দেখে তার ছোট্ট হৃদয় ভীষণভাবে কেঁপে উঠেছিল। চোখভরা অশ্রু নিয়ে সে ছুটে গেল বাবার কাছে। সে তাঁর কাঁধ থেকে নাড়িভুঁড়ি সরাতে প্রাণপণে চেষ্টা করল, আর তাঁকে পরিষ্কার করতে লাগল। তারপর সে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ওই নির্দয় লোকগুলোর দিকে চেঁচিয়ে উঠল এবং তাদেরকে কঠিন কথা শোনাল। “মুহাম্মদ আমাদের নাম ধরে আমাদের ওপর বদদোয়া করেছেন! আল্লাহ যদি তাঁর দোয়া কবুল করে আমাদের ধ্বংস করে দেন?” এটা তো এমনও নয় যে, একটি শিশু তার বাবাকে একবারই এই অবস্থায় দেখেছে। রাসূলুল্লাহ স্বাভাবিক, আরামদায়ক একটি জীবনও কাটাতে পারতেন। তাহলে কেন তিনি এইসব কষ্ট নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন?

হ্যাঁ, তিনি এমন কেউ নন, যাকে আল্লাহ কখনো ব্যর্থ হতে দেবেন। সব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায়ই গিয়ে দাঁড়ায়। তাঁর উদ্দেশ্যের আন্তরিকতা এবং সত্যতা। কাবা--এমন নিষ্ঠুরতারও সাক্ষী ছিল। এত কাছে--মাত্র কয়েক কদম দূরে থাকা সত্ত্বেও, সাহাবিদের কেউই সেখানে নির্ভয়ে ইবাদত করতে পারতেন না। আর যারা যাওয়ার সাহস করত, তাদেরকে যেকোনো বিপদের ঝুঁকি মেনে নিয়েই যেতে হতো। তারা জানত, তাদের সংখ্যা খুব কম। তারা বিপদ টের পেত। তবুও তারা চেয়েছিল সব মানুষের সামনে সত্যকে জোর গলায় ঘোষণা করতে। ঈমানের আলোয় আলোকিত কোনো হৃদয়ের পক্ষে চুপ থাকা আর কিচ্ছু না করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে যদি সেই হৃদয় হয় রাসূল (সাঃ)-এর একজন সাহাবির। একদিন তারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে রাজি করালেন কাবার কাছে যেতে, এবং তারা সেখানে গিয়ে বসে পড়লেন। সেখানে ইসলামের শত্রুদের একটা দলও উপস্থিত ছিল। মুহূর্তটা ছিল ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু আবু বকর তার হৃদয়ে গেঁথে থাকা গভীর সত্যগুলো আর চেপে রাখতে পারলেন না। ভিতরের তাগিদটাকে তিনি আর ঠেকাতে পারলেন না। তিনি অন্য দলের দিকে ফিরে তাকিয়ে খুব জোরে জোরে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি বলতে লাগলেন আল্লাহর ওপর ঈমান আনার মাহাত্ম্য, আর বললেন--মূর্তিপূজা সম্পূর্ণ অর্থহীন, এসব কোনো কাজেই আসবে না। এই কথাগুলো মুশরিকদের ভীষণভাবে উসকে দিল। তাদের হৃদয় আগেই ঘৃণা আর ক্রোধে পরিপূর্ণ ছিল। তাই তারা তৎক্ষণাত আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলো না এবং নবী (সাঃ)-কে ভয়াবহভাবে গালাগালি করতে শুরু করল। কিন্তু এতকিছুর পরও তারা থামলোনা। রাগ ঝাড়তে তারা আবু বকরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তাকে ঘিরে ধরে মারতে শুরু করলো। নির্মমভাবে আঘাতের পর আঘাতে তাকে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলো। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, উতবা ইবনে রাবি‘আ তখন তার ওপর চড়ে বসল এবং শক্ত জুতা পরে নৃশংসভাবে তার মাথায় লাথি মারতে লাগল। কিন্তু এটাও তার কাছে যথেষ্ট ছিল না। এক বিন্দু দয়াও না দেখিয়ে, সে এরপর আবু বকরের মুখ মাটিতে পিষতে লাগলো। তার মুখে রক্ত আর বালি একাকার হয়ে গেল। তিনি একেবারে মুমূর্ষু হয়ে গিয়েছিলেন। অমানবিক প্রহারে রক্তে ভেজা অবস্থায় তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। নিজ গোত্র বানু তাইমের কিছু লোকের সাহায্যে তিনি তাদের হাত থেকে কোনোমতে রেহাই পেলেন, অন্যথায় সেদিনই সব শেষ হয়ে যেত। তারপর তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। সন্ধ্যার অনেক পরে গিয়ে তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন। সবকিছু সহ্য করার পরও তার মুখ থেকে প্রথম যে কথাগুলো বের হলো, “আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কোথায়?

তিনি কেমন আছেন?” যেন ওই দিন এই ভয়াবহ মারধর তার ওপর হয়নি। যেন তার ব্যাথা কষ্ট কোন কিছুই হয়নি। তার দুশ্চিন্তা ছিল শুধুই নবী (সা.)-কে নিয়ে। তিনি ভাবছিলেন-- রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে যে অপমান করা হয়েছিল, সেই অপমানগুলোর কথা। তিনি চিন্তা করলেন-- কুরাইশরা তাঁর কি কোনো ক্ষতি করেছে? তিনি ছিলেন রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত, কিন্তু যখন তারা বলল, “তুমি ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত। কিছু খাবে না?

পানি পান করবে না?” তখন তিনি কেবল একটি জিনিসই জানতে চাইলও শুধু এই খবরটা শোনা, যে আল্লাহর রাসূল নিরাপদ আছেন।। “না, আমি কিচ্ছু খাব না, এক ফোঁটা পানিও পান করব না, যতক্ষণ না আল্লাহর রাসূল সম্পর্কে খবর পাই।” সেই দিনের আরেকটি উদাহরণ হলো, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ। কিছু সাহাবি মন খারাপ করে একটি বিষয়ে আক্ষেপ করছিলেন। কুরাইশদের সামনে প্রকাশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছিল না। নবীজি (সাঃ) ছাড়া আর কেউ আওয়াজ করে কুরআন তিলাওয়াত করেননি। তাদের মনে হচ্ছিল-- যদি প্রকাশ্যে তিলাওয়াত করা হয়, তাহলে হয়তো তাদের মন বদলে যাবে। হয়তো এই কঠিন দিনগুলো একদিন শেষ হবে। হয়তো তারা অবশেষে সত্য বুঝবে। তারা সত্যিই এটাই করতে চেয়েছিল। কিন্তু কে এই সাহস করবে?

কুরাইশদের মনোভাব ছিল একদমই পরিষ্কার, যে তিলাওয়াত করবে, তার ওপর হামলা অনিবার্য। মব জাস্টিস প্রায় নিশ্চিত ছিল। এইসব আলোচনা চলার সময়, ইবনে মাসউদ ছিলেন সম্ভবত তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল। তার বয়স তখন কেবল বিশের কোঠার শুরুতেই। কী হবে তিনি ভালোভাবেই জানতেন, তবুও তিনি এগিয়ে এসে বললেন, “আমি করব।” কিন্তু তার সাথীরা জোর দিয়ে তাকে বাধা দিলেন। কারণ কুরাইশ যখন আক্রমণ করবে, তখন এমন কারো সামনে আসা উচিত যার শক্ত পারিবারিক বন্ধন আছে--যে তাকে রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের এমন কোনো আশ্রয় বা সমর্থন ছিল না। তবুও তিনি প্রস্তুত ছিলেন--সবকিছু সয়ে নিতে। কাউকেই তিনি মোকাবিলা করতে ভয় পেতেন না। তারপর এল সেই দিন। সত্যকে সুউচ্চ স্বরে ঘোষণা করতে তিনি যেন আর অপেক্ষা করতে পারছিলেন না। সবকিছুর পরও, তার ভেতর আশা ছিল হয়তোবা আরেকটা হৃদয় ইসলামের জন্য খুলে যাবে। হয়তো আর মাত্র একজন মানুষ সত্যকে গ্রহণ করবে। যদিও সেটা একজন মানুষই হতো, তবুও সেটা তুচ্ছ ছিল না। ওই একটি আত্মার জন্যই তিনি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন। তিনি কাবার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং উচ্চ কণ্ঠে তিলাওয়াত শুরু করলেন, “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম” (পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে)। তারপর তিনি সূরা আর-রাহমান (পরম করুণাময়ের সূরা) তিলাওয়াত করতে লাগলেন। “আর-রাহমান।” (পরম করুণাময়) “আল্লামাল কুরআন।” (তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন) “খালাকাল ইনসান।” (তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন) “আল্লামাহুল বায়ান।” (তিনি তাকে বাক্‌-প্রকাশ/স্পষ্ট বক্তব্য শিখিয়েছেন) ওই তিলাওয়াত, ওই শব্দগুলো…

এমন কিছু--যা তারা আগে কখনও শোনেনি। তবুও সেগুলো অচেনা লাগছিল না। কুরাইশদের নেতারা বুঝে গেল--এটা কুরআন। আর তারা সাথে সাথেই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের দিকে দৌড়ে গেল। মানুষের এসব কথা শোনা উচিত নয়-- কারণ শুনলে তাদের হৃদয় গলে যাবে। এমনকি কুরাইশরাও নিজেরাই এই শব্দগুলোর হৃদয়ে ছুঁয়ে যাওয়া গভীর প্রভাব ঠেকাতে পারছিল না। তারা কীভাবে অন্যদের বোঝাবে, যখন তারা নিজেরাই এখনো নিজেদের মনে চলা দ্বন্দ্বের সাথে লড়ছে?

ইবনে মাসউদকে মুশরিকরা ঘিরে ফেলল। বারবার আঘাত খেয়েও তিনি থামেননি। ওই আল্লাহর কালামে বার বার আল্লাহর নিয়ামতের কথা আসছিল। তারপর এল সেই আয়াত-- “ফাবি আইয়ি আলা-ই রব্বিকুমা তুকাযযিবান?” এতো অত্যাচারের মাঝেও আবদুল্লাহ সত্যকে চিৎকার করে ঘোষণা করছিলেন। ওই মুহূর্ত, ওই দৃশ্য আর অনুভূতি সবকিছুই একেবারে স্পষ্ট ছিল। কুরাইশ কতটা অসহায়--তার একেবারে স্পষ্ট ছবি। তিনি বারবার তিলাওয়াত করতে থাকলেন' “ফাবি আইয়ি আলা-ই রব্বিকুমা তুকাযযিবান?” যতক্ষণ না তাঁর কথা বলার শক্তি অবশিষ্ট থাকল। যখন সব শেষ হলো, যে বন্ধুরা দুঃখে আর চিন্তায় ভেঙে পড়েছিল, তাদেরকে তিনি বললেন-- “এই মুহূর্তে আমার চোখে, আল্লাহর শত্রুদের মধ্যে এদের চেয়ে দুর্বল আর এদের চেয়ে অপমানিত আর কেউ নেই। আপনারা চাইলে, আমি আগামীকালও ফিরে গিয়ে আজকের মতোই তাদের সামনে কুরআন তিলাওয়াত করব।” কুরাইশ যতই যা করুক, পরের দিন, তারা মুসলমানদের আগের চেয়ে আরও দৃঢ় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল। একজন মুমিনও তার ঈমান থেকে ফিরে যায়নি। আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কখনও তাঁর মিশন থেকে সরে আসেননি। একাকী হোক বা দলবদ্ধ-- কুরাইশরা বারবার নিজেদের জিজ্ঞেস করত-- “মুহাম্মদকে এই আহ্বান ছেড়ে দিতে বাধ্য করবে--এমন কিছু আছে কি?

কে এটা থামাতে পারবে?

আমরা যা যা করলাম--কিছুই কেন কাজ করছে না?” এই প্রশ্নগুলো তাদের মাথায় ঘুরতে ঘুরতে একটা নাম সামনে এলো। একটা নাম--যেটাতে সবাই একমত হলো। যদি কেউ রাসূলুল্লাহর মত বদলাতে পারে-- তাহলে সে-ই পারবে। শৈশব থেকে ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে মানুষটা তাকে বাবার মতো করে বড় করেছেন-- তার চাচা--আবু তালিব। আবু তালিব ছিলেন মক্কার সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের একজন। তিনি বয়স্ক ছিলেন, এবং যদিও তাঁর খুব বেশি সম্পদ ছিল না, তবুও মানুষ তাকে সম্মান করত এবং তার কথা শুনত। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, কিন্তু তার ভাতিজার সাথে বন্ধন ছিল গভীর-- দশকের পর দশক ভালোবাসা, আনুগত্য, আর পারস্পরিক সম্মানে গড়া এক সম্পর্ক। এটা প্রথমবার নয়-- কুরাইশরা এর আগেও এই ব্যাপারে তার কাছে এসেছিল। গতবার, আবু তালিব খুবি কোমল ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন। তিনি তাদের শান্ত করেছিলেন এবং ভদ্রভাবে বিদায় করেছিলেন। কিন্তু এবার তারা অনেক বেশি কঠোর ছিল। তারা স্পষ্ট দাবি নিয়ে এল রাসূলকে তাঁর দাওয়াত/মিশন ছেড়ে দিতে বাধ্য করতে হবে। “হে আবু তালিব!

আপনি আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের একজন, আমাদের অভিজাতদের একজন। আমরা আগেও আপনার কাছে এসেছিলাম আর আপনার ভাতিজাকে থামাতে বলেছিলাম, কিন্তু আপনি আমাদের কথা রাখেননি। সে আমাদের বোকা বলে, আর আমাদের দেবতাদের অপমান করে…

আপনি তাকে থামান, নইলে আমরা তার সাথে আপনাকেও যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেব যতক্ষণ না আমাদের আর কারোর কোন ক্ষতি হয়ে যায়।” এই হুমকিতে বৃদ্ধ আবু তালিব কেঁপে উঠলেন। এবার তারা ছিল অনেক বেশি কঠোর, অনেক বেশি দৃঢ়। তিনি সারাজীবন এই লোকগুলোর মাঝেই কাটিয়েছেন। তারা তাকে সম্মান করত, আর বহু বছরের পরিশ্রমের বিনিময়ে তাঁর এই অর্জন ছিল। তিনি তাদের প্রতি একধরনের গভীর আত্মীয়তার টান অনুভব করতেন। নিজের লোকদের দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ার চিন্তা তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক ছিল। কিন্তু অন্য পাশে ছিল তার ভাতিজা-- যাকে তিনি নিজের সন্তানের থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। সেই ভাতিজার দিক থেকেও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিতে পারলেন না। তিনি দিশেহারা হয়ে গেলেন--দুই দিকের টানে একেবারে ভেঙ্গে যাচ্ছিলেন। তার হৃদয় ভারী হয়ে উঠল। অনেক ভেবে-চিন্তে তিনি রাসূলুল্লাহকে ডেকে বললেন-- “আমার প্রিয় ভাতিজা, তোমার গোত্রের নেতারা আমার কাছে এসেছিল। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি-- আমার ওপর এবং নিজের ওপর দয়া করো। এমন বোঝা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিও না যা আমরা কেউই বহন করতে পারব না। দয়া করে, লোকদের ক্ষেপিয়ে তোলে--এমন কথা বলা বন্ধ করো তোমরা।” চাচার কথায় নবী (সাঃ) এক মুহূর্ত থমকে গেলেন, ক্ষণিকের জন্য একটু চিন্তা করলেন। পরিস্থিতি সত্যিই খুব কঠিন ছিল। একসময় যে দৃঢ়তা আবু তালিব দেখিয়েছিলেন যখন রাসূল তার আত্মীয়দের ভোজে দাওয়াত দিয়েছিলেন' এখন সেই দৃঢ়তা যেন আর নেই। সেই মুহূর্ত পর্যন্ত, গোত্রের ভেতরে আবু তালিবই ছিলেন একমাত্র ঢাল--যিনি তাঁকে রক্ষা করতেন। এখন…

তিনিও কি মুখ ফিরিয়ে নেবেন? তিনিও কি তাঁকে একা ছেড়ে দেবেন?

এই কথাগুলো হৃদয়ে ভারী হয়ে বাজলেও, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) জানতেন-- তার প্রকৃত রক্ষক একমাত্র একজনই। আল্লাহ--আসমান ও জমিনের রব। দুনিয়ার সবাই যদি তাঁর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়েও নেয়, তাতে কিছুই বদলাবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ জানতেন সবকিছু তাঁর ইচ্ছাতেই ঘটে, আর তাঁর অনুমতি ছাড়া কিছুই ঘটে না। এটা আল্লাহর দ্বীন এটা কোনো একজন মানুষের ওপর নির্ভরশীল নয়। আল্লাহ চাইলে যাকে খুশি, যেভাবে খুশি তার মাধ্যমে এটাকে শক্তিশালী করতে পারেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন সেই অবিস্মরণীয় কথাগুলো। “জেনে রাখবেন, হে আমার চাচা। যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদও এনে দেয়, তবুও আমি কখনও এই দ্বীন, এই আহবান ছেড়ে দেব না। হয় আল্লাহ এই দ্বীনকে বিজয়ী করবেন, নইলে আমি এই পথেই নিজের জীবন দিয়ে দিব।” এই কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরছিল। চাচার পক্ষ থেকে একা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু তার সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আর যখন তিনি চলে যেতে ঘুরে দাঁড়ালেন, তার দৃঢ়তা আর অটল অঙ্গীকার আবু তালিবের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–এর সাহস তাকে অনুপ্রাণিত করল এবং তাকেও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবার শক্তি দিল। “হে আমার কলিজার টুকরা ভাতিজা, তুমি যা করছ, তা চালিয়ে যাও। তোমার মন যা চায় করো। আল্লাহর কসম, আমি কোনো কারণেই তোমাকে কারোর হাতে তুলে দেব না।” আর আবারও মুশরিকদের চেষ্টা ব্যর্থ হলো। কীভাবেইবা সফল হবে?

মৃত্যুকে তিনি বিন্দুমাত্র ভয় করতেন না। তিনি তাদের হুমকি তাদের মুখের ওপরই ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। যখন তিনি বললেন, “যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদও এনে দেয়,” এটা শুধু কথার কথা ছিল না। আসমান-জমিন সাক্ষী ছিল তার আন্তরিকতা আর সত্যতার। আবু তালিবের কাছে যাওয়ার পাশাপাশি, কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–কে নানা প্রলোভনও দিত। তারা প্রস্তাব করেছিল, “তুমি যদি সম্পদ চাও, আমরা তোমাকে অঢেল সম্পদ দেব, যতক্ষণ না তোমার সম্পদ আমাদের থেকেও বেশি হয়। যদি তুমি মর্যাদা আর সম্মান চাও, আমরা তোমাকে নিজেদের থেকেও বড় হিসেবে মান্য করব। তোমার আদেশ আমরা কখনও অমান্য করব না। আর যদি তুমি সত্যিই রাজত্ব চাও, তাহলে আমরা তোমাকেই আমাদের রাজা বানাব।” কিন্তু তারা যতই প্রস্তাব দিক না কেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সবকিছুই প্রত্যাখ্যান করতেন। যদি তিনি সত্যিই তাদের ধারণা মতো মিথ্যা বলতেন, তাহলে কেন তিনি এসব গ্রহণ করলেন না?

ব্যক্তিগত লাভটা কোথায়? তার হাতে কষ্ট আর বিপদ ছাড়া আর কী ছিল? সত্যটা ছিল স্পষ্ট। কুরআনের বাণী আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–এর চরিত্র দিনে দিনে কাফিরদের ওপরও প্রভাব ফেলছিল। তাদের চলার পথের ওপর আস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছিল। তবুও তারা কোনোভাবেই সত্য গ্রহণ করছিল না। তাহলে কী ছিল, যা তাদেরকে এতটা জেদ ভরে অস্বীকার করাতে চাচ্ছিল? কী তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–কে উপহাস করতে আর তার কথা উড়িয়ে দিতে বাধ্য করছিল? কেন কুরআন তিলাওয়াত হলে তারা কান বন্ধ করে ফেলত। কী তাদেরকে এত একগুঁয়েভাবে আলোর দিকে চোখ বন্ধ করে রাখছিল?

সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল অহংকার আর আত্মগর্ব। একবার ভাবুনতো, যদি তারা এই দ্বীন মেনে নিত, তাহলে তাদেরকে স্বীকার করতে হতো বছরের পর বছর ধরে তারা যা করেছে, সবই ছিলো ভুল। আর বড় অহংকারী মানুষদের জন্য নিজেদের ভুল মানা বিশেষ করে এমন বড় বিষয়ে যা একদমই সহজ নয়। তারা এটাও মানতে চাইত না যে, তাদের পূর্বপুরুষরাও ভুল করেছিলেন' যেভাবে তারাও মূর্তি পূজা করছে। তাই তাদের অহংকারটা শুধু নিজের জন্য নয় বরং পূর্বপুরুষদের “ধারা” রক্ষার অহংকারও বটে। মনে আছে--আবু তালিবের কাছে গিয়ে তারা কী বলেছিল?

“সে আমাদের পূর্বপুরুষদের বিরুদ্ধে কথা বলে আর আমাদের বোকা বলে।” বছরের পর বছর তারা মূর্তির নামে কুরবানী দিত, ভক্তি নিয়ে প্রতিদিন সেই মূর্তির গায়ে হাত-মুখ ঘষত, ঘর থেকে বের হওয়ার আগে। তারা মানতে চাইত না-- সবটাই বৃথা ছিল। সত্যের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে তাদের কাছে মাটির নিচে শুয়ে থাকা পূর্বপুরুষদের “সম্মান” ছিল অনেক দামী। একাই কবরে নামতে হবে জেনেও, তারা যুক্তির কণ্ঠস্বরের বদলে অতীতের ডাকই বেছে নিল। কারণ তারা অতীতের ধ্বনিকে যুক্তির ধ্বনির চেয়ে বড় করে দেখেছিল। তাদের অহংকারের আরেকটা দিক ছিল-- তারা মনে করত, নবী (সাঃ)–এর পরিবার খুব একটা “অভিজাত” নয়। এমনকি একবার, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–এর সঙ্গে কথা বলে আবু জাহেল তার বন্ধুকে বলল-- “আল্লাহর কসম, আমি জানি--সে যা বলে তা সত্য।” তবুও কেন সে ঈমান আনল না?

এতটা স্বীকার করেও?

কারণ এরপরই সে তুলনা করতে লাগল-- রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–এর গোত্রের সাথে নিজের গোত্রের। প্রত্যেক গোত্রের “শ্রেষ্ঠত্ব” গুনে গুনে বলল, দুটি ঘোড়া পাশাপাশি দৌড়ানোর মতো করে তুলনা করল। তারপর বলল, “আর এখন তারা বলে-- ‘আমাদের গোত্রে একজন নবীও আছে!’ না, আল্লাহর কসম, আমি এটা মানতে পারবো না।” আরেকবার, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সম্পর্কে উমাইয়া ইবনে আবি আস-সলত আবু সুফিয়ানকে বলেছিল-- “সে সত্যিই একজন নবী। তাকে অনুসরণ করো।” “তাহলে তুমি কেন অনুসরণ করছ না?” “আমি লজ্জা পাব--যদি সাকিফের নারীরা বলে, ‘উমাইয়া গিয়ে আবদ মানাফের বংশের এক যুবকের অনুসারী হয়ে গেল।’” আরবদের মাঝে, একজনের মর্যাদা যত বেশি, মানুষের কথা--“লোকে কী বলবে?”-- এই চাপ তার চেয়ে বেশি কাজ করত। তারা অন্যের মতামত দেখে জীবন সাজাত। অথচ শেষ পর্যন্ত, অল্প দিনের দুনিয়ার জন্য তারা আখিরাতের জীবনকে কুরবানী করছিল। তাই আবু তালিবের বিরুদ্ধে তাদের হুমকি কাজ করল না। কিন্তু তাদের ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙ্গে যাচ্ছিল। ইসলামের ব্যাপারে তাদের সহ্যশক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না। ক্রোধ আর ঘৃণা থেকে, যে সুযোগই পেত-- তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে কষ্ট দিতে চাইত। তিনি সালাতে থাকলে, তারা পেছন থেকে এসে তাকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করত। তিনি সিজদায় গেলে, পাথর দিয়ে মাথা পিষে দেওয়ার চেষ্টা করত। বারবার তাঁর দরজার সামনে পশুর ময়লা ফেলে দিত আর প্রতিদিন তাঁর চলার পথে কাঁটাঝোপ ছড়িয়ে দিত। কঠিন কথা বলে তাঁর পবিত্র হৃদয়ে আঘাত করত, অপমান করতে চাইত। তবুও তিনি সবকিছু ধৈর্য নিয়ে সহ্য করতেন, এবং কখনও হাল ছাড়তেন না। ঘৃণার কোনো কাজ, কোনো অপমান, কোনো হুমকি তাঁকে তাঁর পথ থেকে ফেরাতে পারেনি। দিন-রাত একই নিষ্ঠায়, তিনি মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকতে থাকতেন, আর আশা করতেন--আরও একটি আত্মা যেন বাঁচতে পারে। তিনি নিজের জন্য চিন্তিত ছিলেন না। কিন্তু সে দিনগুলোতে সাহাবিদের জন্য তাঁর দুশ্চিন্তা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিলো। প্রতিদিন মক্কায় মুসলিম হিসেবে বেঁচে থাকা আরও কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছিল। দিনের সবচেয়ে প্রচণ্ড গরম সময়টুকুতে, মক্কা জুড়ে প্রতিধ্বনি হতো নির্যাতিত মুসলমানদের আর্তনাদ। যতক্ষণ না তাদের কণ্ঠে আর ক্ষীণ শব্দ বের হওয়ার শক্তি থাকত। এমনকি আরকামের ঘরও এখন আর মুমিনদের রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)–কে মুসলিমদের জন্য এমন একটা পথ খুঁজতে হলো, যাতে তারা আরও স্বাধীনভাবে দ্বীন পালন করতে পারে। এটা ছিল নবুওয়তের পঞ্চম বছর। একদিন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবিদের একত্র করলেন। তাদেরকে বলার মতো তাঁর একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল। তিনি বললেন, “এখন তোমরা দুনিয়ার জমিনে ছড়িয়ে পড়ো। আল্লাহ তোমাদের সবাইকে আবার একত্র করবেন।” কিন্তু তারা যাবে কোথায়?

“হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কোথায় যাব?” রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাত দিয়ে ইশারা করে বললেন-- “ওখানে।” তিনি সাগরের ওপারের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। অর্থাৎ, সেখানে যেতে হলে তাদেরকে সমুদ্রপথে সফর করতে হবে। কিন্তু কোথায় সেটা?

দূরদেশে ইসলামের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়া, মাত্র অল্প কিছু মুমিনকে নিয়ে, কষ্টের পরে স্বস্তি আসা, ইসলামের কাতারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাম যুক্ত হওয়া-- যে নামগুলো কুরাইশকে ভিতর থেকে কাঁপিয়ে দেবে, কাফিরদের ওপর একের পর এক আঘাত নেমে আসা, আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এক মহান দুআ-- যা কবুল হবে-- সবকিছুই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে পরের পর্বে। সাথেই থাকুন। শুনতে কিছুটা অন্যরকম মনে হতে পারে, কিন্তু আমরা একটি অনলাইন কুরআন কোর্স পরিচালনা করি, এবং ইতোমধ্যে ৪৩,০০০ জন সেখান থেকে শিখা শুরু করে তাদের কুরআনের যাত্রা শুরু করেছেন। জী, আমি আমাদের লামেলিফ কুরআন মোবাইল অ্যাপের কথাই বলছি। অ্যাপটি সম্পূর্ণ ফ্রি আর এতে আমরা কোনো বিজ্ঞাপন চালাই না। তুর্কি ও ইংরেজি - উভয় ভাষায় দারুণ সফল এই অ্যাপটি এখন ইনশাআল্লাহ বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের জন্য ১৩টি ভিন্ন ভাষায় চালু করা হবে। তবে এই প্রকল্পে বেশ পরিশ্রম প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়নের জন্য আমাদের তৈরি করতে হবে ২,০০০ মিনিটের শিক্ষামূলক ভিডিও। এবং বর্তমানে আমরা অনুবাদ ও ভয়েসওভারের খরচ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। আমাদের টিম মোট অর্থকে ৩০ ডলারের ছোট ছোট শেয়ারে ভাগ করেছে, যাতে আপনি আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী এক বা একাধিক শেয়ার স্পন্সর করে সহায়তা করতে পারেন, ইনশাআল্লাহ। এই অ্যাপের কাজ সম্পন্ন করতে আমাদের আপনার সহায়তা প্রয়োজন। এর প্রতি ব্যবহারকারী যখন একটি হরফ তিলাওয়াত করবে, তখন তার সওয়াবে শরিক হতে চাইলে এখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।