“স্টিফেন হকিং-ই আমার কাছে স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করলেন!” - এক সাবেক শিখের ইসলামের পথে যাত্রা
প্রকাশের তারিখ
আমার মায়ের পরিবার খ্রিস্টান পটভূমির, আর আমার বাবার পরিবার শিখ পটভূমির। যুক্তরাজ্যের শিখদের মধ্যে মুসলিমদের প্রতি অনেক বিরূপতা রয়েছে। আমেরিকায় ৯/১১ হামলা ঘটে। কয়েক বছর পর ৭/৭ বোমা হামলা হয়, যেখানে বাস ও লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল। সেদিন আমার বাবার ওই ট্রেনে ওঠার কথা ছিল। অতঃপর আমি বাবাকে বার বার ফোন করার চেষ্টা করি, কিন্তু তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। আমি নানা ধর্ম সম্পর্কে খোঁজ করতে শুরু করি। বৌদ্ধধর্ম, শিখধর্ম... হিন্দুধর্ম এবং খ্রিস্টধর্মও দেখেছি। আমি স্টিফেন হকিংয়ের একটি বক্তৃতা দেখছিলাম। স্টিফেন হকিংই যেন আমার কাছে আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করে দিলেন। তারপর ভাবলাম, জানেন, সবচেয়ে খারাপ এরচেয়ে আর কী-ই বা হতে পারে?
তাই আমি কুরআন পড়া শুরু করলাম আর তারপর আমি মুসলিম হয়ে গেলাম। বাবা জানতে পারলেন, একদিন স্কুল থেকে ফিরে আসার পর আমার কোটে একটি টুপি দেখে। তিনি বললেন, “এটা কী? তুমি আমার পিঠে ছুরি মারলে। তুমি নিজের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। তুমি নিজের মানুষদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ।” অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি আর গালাগালি করেছিলেন। আমার মামার জন্মদিনে একটি ঘটনা ঘটেছিল, জানেন, মামা আমার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতার ভান করছিলেন, তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু এমনভাবে ধরলেন... যেন আমাকে হেডলকে আটকে রেখেছেন, পুরো পরিবারের সামনে। তাঁর হাতে ছিল শ্যাম্পেনের গ্লাস, সেটা আমার ঠোঁটে ঠেলে দিলেন এবং বললেন, “খাও।” আমি বললাম, “না, আমি খাবো না।” তিনি বললেন, “খাও!” “না!
আমি খেতে পারবো না!” আসসালামু আলাইকুম, ভাই রিস বাইফিল্ড। আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। Towards Eternity-তে আপনাকে পেয়ে আমরা আনন্দিত। আমি শুরু করতে চাই—রিস বাইফিল্ড কে? সংক্ষেপে আপনার জীবন সম্পর্কে বলবেন?
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। ভাই, আলহামদুলিল্লাহ, আপনাদের অতিথি হতে পারা আমার জন্য সম্মানের। আমি একটি মিশ্র বর্ণের পরিবারে জন্মেছি। আমার বাবা প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী; ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। আর আমার মা যুক্তরাজ্যেরই একজন ইংরেজ নারী। আমার মায়ের পরিবার খ্রিস্টান পটভূমির। আর আমার বাবার পরিবার শিখ পটভূমির। আমি নানা ধর্ম নিয়ে খোঁজ করেছি। তাই আমি কুরআন পড়া শুরু করি। আমি শাহাদাহ গ্রহণ করি এবং মুসলিম হয়ে যাই। তারপর প্রায় দুই বছর আমি আমার ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার পরিবার জেনে যায়। এরপর অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি আর গালাগালি শুরু হয়, এবং পরের তিন থেকে চার বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও খারাপ হতে থাকে। আমি কিংস কলেজ লন্ডন থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমি ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে পাশ করি। তারপর আমি ধর্মতত্ত্বে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি, ধর্মদর্শন ও ধর্ম নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ইসলাম গ্রহণের আগে বিশ্বাসের দিক থেকে আপনার জীবন কেমন ছিল?
আপনি কী বিশ্বাস করতেন? অবশ্যই আমি চার্চে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যেতাম, যেমন বিয়েশাদী বা যেকোন অনুষ্ঠানে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই, একজন মানুষই ঈশ্বর—এই ধারণা আমি মেনে নিতে পারতাম না। গুরদুয়ারাতেও, যেটি শিখদের ধর্মীয় উপাসনালয়, শিখ মন্দিরে, আমি এমন অনুষ্ঠানগুলোতে যেতাম। তখনই আমার মনে হতো, খুব অল্প বয়স থেকেই শিখধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে গুরু নানককে আমি বেশি দেখতাম একজন সমাজসংস্কারক হিসেবে, এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, যিনি ঐশী ওহি পেয়েছেন। সেই সময় কিছুটা বর্ণবৈষম্যের অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। ইংরেজরা আমাকে ইংরেজ মনে করত না, আর এশীয়রাও...
আমাকে এশীয় মনে করত না। ফলে এক অদ্ভুত মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। তার ঠিক এক বছর আগে আমেরিকায় ৯/১১ হামলা হয়েছিল। কয়েক বছর পর ৭/৭ বোমা হামলা হয়, যেখানে বাসগুলোতে আর লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল। এর ফলে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি সামাজিকভাবে এক ধরনের ঘৃণা তৈরি হয়। সেদিন আসলে যা হয়েছিল, আমার বাবার ওই ট্রেনে ওঠার কথা ছিল। সেন্ট্রাল লাইনের যে ট্রেনটিতে বিস্ফোরণ হয়েছিল। সেই ট্রেনেই তাঁর ওঠার কথা ছিল। এরপর থেকেই আমি বাবাকে ফোন করতে থাকি, কিন্তু তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম, বাবা ওই ট্রেনেই আছেন। আমি মাকে ফোন করে বললাম, বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে? খবর শুনেছ?
তিনি বললেন, আমিও ফোন করছি, কিন্তু সংযোগ পাচ্ছি না। আসলে যা হয়েছিল, বাবা ট্রেন স্টেশনের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁর আরেকটি ট্রেনে সেন্ট্রাল লাইনে যাওয়ার কথা ছিল। আর তিনি যখন সেন্ট্রাল লাইনে ছিলেন, ঠিক তখনই হামলাটি ঘটে। এরপর তারা পুরো এলাকাটি বন্ধ করে দেয়, কাউকে স্টেশন থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি, কাউকে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। এই কারণেই তাঁর ফোনে সিগন্যাল ছিল না, তাই তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডেই আটকে ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, মাত্র এক বা দুই ট্রেনের ব্যবধানে তিনি বেঁচে যান, কারণ সেদিন তাঁর একটু দেরিই হয়েছিল। একই সময়ে তথাকথিত ‘নিউ অ্যাথেইস্ট’ আন্দোলনেরও উত্থান হচ্ছিল। স্টিফেন হকিং এবং রিচার্ড ডকিন্স তাঁদের মত লোকেরা তখন নিজেদের ধারণাগুলো খুব জোরালোভাবে প্রচার করছিলেন। আমার বয়স যখন প্রায় ১৫-১৬, তখন তাঁর বই প্রকাশিত হয়। আমি যেন এই দুই ধারার মাঝখানে ছিলাম। একদিকে আমি এই প্রবাহে প্রভাবিত হচ্ছিলাম, এই চিন্তার ধারা গ্রহণ করছিলাম, এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছিলাম। কিন্তু একই সঙ্গে আমার ভেতরে একটা প্রবল অনুভূতিও ছিল যে, অবশ্যই কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে। আমি স্টিফেন হকিংয়ের একটি বক্তৃতা পুরোটাই দেখছিলাম। সেটি ছিল মহাবিশ্বের সূচনা নিয়ে; তিনি তাঁর গবেষণা ব্যাখ্যা করছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলো বলছিলেন বিগ ব্যাং পর্যন্ত ফিরে গিয়ে মহাবিশ্ব আবার কীভাবে শুরু হয়েছিলো। তারপর আমরা সেই প্রশ্নে এসে পৌঁছালাম— মহাবিশ্ব এলো কোথা থেকে?
বক্তৃতার উপসংহার ছিল, মহাবিশ্বের একটি সূচনা ছিল। তাহলে সেই সূচনা এলো কোথা থেকে? মহাবিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যইবা কী? আর তাঁর উত্তর ছিল, “এটা শূন্য থেকে এসেছে।” আমি ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম, লোকটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, আপনি কী বলছেন?
তারপর তিনি নিজেই যেন পিছু হটে বললেন, “আমরা জানি না।” তারপর আপনি এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ান যেখানে এমন একটা বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয় যা আমরা জানি। কিছুই শূন্য থেকে আসতে পারে না। এটা খুবই মৌলিক একটি বোধগম্য বিষয়। যদি কোনো ফল থাকে, তার একটি কারণও থাকে। আর আপনি বলছেন, এই সবকিছু, এই বিগ ব্যাং আমাদের পুরো মহাবিশ্বের সৃষ্টি শূন্য থেকে এসেছে। তারপর আপনি পদার্থবিজ্ঞানের পূর্ববর্তী শর্তগুলো নিয়ে কথা বলেন, যেন সেই শর্তগুলো হঠাৎ কাকতালীয়ভাবে ছিল। এত বুদ্ধিমান একজন মানুষের কাছ থেকে এটা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি, যাঁর এত বিপুল জ্ঞান ছিল। আমার মনে হলো, উত্তরটি আপনার জিহ্বার ডগায় আছে, যে উত্তরটি আপনার মুখ থেকে বেরিয়ে আসার কথা, সেই উত্তরটাই আপনি ইচ্ছা করে আটকে রাখছেন। আর আমার কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর। তখন আমি বুঝলাম, এই মানুষটি যিনি আমাকে তিন ঘণ্টা বক্তৃতা দিলেন, তিনি শুধু বিজ্ঞান বলছেন না, তিনি তাঁর মতাদর্শও চাপিয়ে দিচ্ছেন। আসলে বিজ্ঞান ও ওহির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকার প্রয়োজনই নেই। এই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, কারণ মানুষ নিজেরাই সেটা ঢুকিয়ে দেয়; নিজেদের মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়। ওই ভিডিও দেখার পর এবং বিষয়টি বুঝতে পারার পর, আল্লাহর অস্তিত্বের বিশ্বাস আমার ভেতরে দৃঢ়ভাবে বসে যায়। একটু হাস্যকরভাবে বললে, স্টিফেন হকিংই আমার কাছে আল্লাহকে প্রমাণ করে দিলেন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসটি আমার হৃদয়ে দৃঢ় হয়ে গেল। কারণ আমরা এই পৃথিবীতে স্রষ্টার নিদর্শন দেখি। আমরা স্রষ্টার সৃষ্টিশৈলী দেখতে পাই। অস্তিত্বে এমন একটি জিনিসও নেই, যা অন্য কিছুর ওপর নির্ভর না করে টিকে থাকতে পারে। যখন সবকিছুই নির্ভরশীল, তখন নির্ভরতার এক শৃঙ্খল তৈরি হয়। কিন্তু এই নির্ভরতার শৃঙ্খলকে কোথাও গিয়ে শেষ হতেই হবে। এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছাতে হবে, যা স্বাধীন কিছুর দিকে নিয়ে যায়, যা এই কাঠামোর বাইরে, কিন্তু পুরো কাঠামোটিকে ধারণ করে। পুরো মহাবিশ্বে সবকিছুই সম্ভাব্য ও নির্ভরশীল। এবং অস্তিত্বে আসার জন্য তার অবশ্যই অন্য কিছুর প্রয়োজন হয়। এরপর প্রশ্নটা হয়ে গেল, ‘আচ্ছা, যদি আল্লাহ থাকেন, তাহলে আল্লাহ কে?’ কে সেই সত্তা, যিনি ‘আল্লাহ’ নামের উপযুক্ত?
আর আল্লাহ কেমন?” তখন আমার মনে হলো স্বাভাবিকভাবেই শুরু করা উচিত সবচেয়ে পুরোনো ধর্মগুলো থেকে। তারপর দেখলাম প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মগুলোর ধারণা, যেখানে দেবতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে হয়, নানা উৎসর্গ দিতে হয়। আমার কাছে ব্যাপারটা একেবারেই অর্থহীন লাগত। যে সর্বোচ্চ সত্তা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, সবকিছুর ওপর যার নিয়ন্ত্রণ, তাঁর সঙ্গে আপনার দরকষাকষি করতে হবে কেন? আল্লাহ এসবের ঊর্ধ্বে। মানুষের বৈশিষ্ট্য তাঁকে আরোপ করারও ঊর্ধ্বে তিনি, অর্থাৎ আমরা একে অপরের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করি, সেটাই আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি। এটা আমার কাছে খুবই অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল। প্রাচীন প্রায় সব পৌত্তলিক ধারাতেই আমি এমনটা দেখেছি। কখনো সেগুলো ছিল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম, যেখানে নেতারা...
আর রাজারা নিজেদের ‘ঐশী’ অবস্থানকে ব্যবহার করত, কথিত ঐশী কর্তৃত্বকে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। এটাই ছিল আমার প্রথম আপত্তি। তারপর আমি নানা ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করেছি। আমার বাবার দিকের শিখধর্মের কথা বললে, এর প্রতিষ্ঠাতা গুরু ছিলেন নানক। গুরু নানক হিন্দু পরিবারে বড় হয়েছিলেন। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যকার মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব নিয়ে তিনি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলেন। কথিত আছে, তিনি ধ্যান ও সত্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য। গুরু নানকের যাত্রায় তিনি হজও করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সফর থেকে ফিরে তিনি কিছু ধর্মীয় আদর্শ নিয়ে ফিরলেন, যা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। একইভাবে ভারতের অনেক ধর্মীয় ধারায়, যেমন বৌদ্ধধর্ম ও শিখধর্ম, এগুলো ছিল সমন্বয়ধর্মী বিশ্বাসব্যবস্থা। সমন্বয়ধর্মী ধর্ম হলো এমন ধর্ম, যা আশপাশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চাগুলো গ্রহণ করে নিজের ধর্মের মধ্যে মিশিয়ে নেয়। শিখধর্মে এর খুব স্পষ্ট উদাহরণ আছে। তাদের প্রার্থনার ধরন অনেকটা হিন্দু প্রার্থনার মতো। তবে কেউ যদি আজকের ভারতে যান, তাহলে দেখবেন, আসলে এটা খুবই সাধারণ বিষয়। আপনি হিন্দুদের মসজিদে যেতে দেখবেন, এমনকি কোনো কোনো হিন্দুকে তরিকার সঙ্গে যুক্ত হতেও দেখবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ভারতে হিন্দু নকশবন্দিও আছেন। আবার মুসলিমদেরও হিন্দুদের মন্দির বা ধর্মীয় স্থানে যেতে দেখা যায়, সেখানে পুরোহিতদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করতেও দেখা যায়। ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোর এ ধরনের মিশ্রণ, যা অনেকটা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় আমরা অনেক সময় ‘ভিলেজ রিলিজিয়ন’ বা গ্রামীণ ধর্ম বলি। এই ধরনের গ্রামীণ ধর্মীয় সংস্কৃতি ভারতে খুবই প্রচলিত। আমার কাছে শিখধর্ম মানুষের তৈরি ধর্ম মনে হয়েছিল, আর হিন্দুধর্মও আমি দেখেছি। হিন্দুধর্মের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আসলে ‘হিন্দুধর্ম’ নামে একটি একক ধর্মই নেই। প্রথম সমস্যা হলো, ‘হিন্দুইজম’ একটি ঔপনিবেশিক পরিভাষা। ব্রিটিশরা যখন ভারতে আসে, তারা যা করেছিল—তারা অনেক স্থানীয় মানুষকে নানা ধরনের উপাসনা ও ধর্মীয় চর্চা করতে দেখল। তারপর বলল, ‘আচ্ছা, এরা সবাই একই ধর্মের।’ তাদের ভিন্ন ভিন্ন সবাইকে একসঙ্গে এক শ্রেণিতে ফেলে দেওয়া হলো, যেন এরা সবাই একই ‘হিন্দু’ শব্দটিও তো সিন্ধু নদ থেকেই এসেছে, তাই না?
অর্থাৎ বলা হলো, এটাই এই মানুষদের ধর্ম। আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে গেল এটা অনেকটাই সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, মানুষের বড় অংশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি উপায়, এ ধরনের একটা ব্যাপার আরকি। তারপর আমি ইহুদিধর্ম নিয়ে দেখলাম। প্রথাগত ইহুদিধর্মে ইহুদিধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া সহজ বা স্বাভাবিক বিষয় নয়। ‘আল্লাহর মনোনীত জাতি’র অংশ হতে হলে ইহুদি পরিবারে জন্ম নিতে হয়—এমন ধারণা আছে। এই অর্থে এটি একটি জাতিগত ধর্ম। এই ধারণা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। দ্বিতীয় বিষয় ছিল, ইহুদি ঐতিহ্য নিজেই খতিয়ে দেখা, এবং বাইবেলের বর্ণনায় ইহুদিদের সঙ্গে তাঁদের নবীদের সম্পর্ক, আর সেই ঐতিহ্য নিজেই কীভাবে বর্ণনা করে যে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ইহুদি জাতি অঙ্গীকার রক্ষা করেনি, যেমনটা বাইবেলেই বলা আছে। বাইবেলেই বলা হয়েছে, ইহুদি জাতি আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। একই সঙ্গে দেখা যায়, বাইবেলের বর্ণনায় কিছু বিকৃতি ঘটেছে, বিশেষ করে কিছু কাহিনির ক্ষেত্রে। একটি কাহিনিতে বলা হয়, তিনি একজন মানুষকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন শুধু এই কারণে যে, যেন লোকটি মারা যায়, আর তিনি তার স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারেন। এ ধরনের আরও অনেক গল্প আছে, যা দেখে মনে হয়, এই ঐতিহ্যগুলো পরস্পরের সঙ্গে মেলে না, বিশেষ করে যখন বলা হয়, এরা আল্লাহর মনোনীত মানুষ। একই বই একদিকে নবীদের প্রশংসা করে এবং তাঁদের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ও সত্যবাদিতার কথা বলে। আবার একই সঙ্গে তাঁদের শুধু সাধারণ মানবিক ভুলের বাইরেও খুব বড় বড় ভুল করতে দেখায়, কারণ ছোট ভুল আর গুরুতর ভুল এক জিনিস নয়। এবং সেখানে কিছু বিরোধও দেখা যায়। এরপর স্বাভাবিকভাবেই খ্রিস্টধর্মকে খতিয়ে দেখলাম। আর যখন খ্রিস্টধর্মের গভীরে যান, তখন দেখতে পান কী ঘটেছে। ত্রিত্ববাদের ধারণা, অথবা কাউকে আল্লাহর আক্ষরিক পুত্র বলা— যেমন বলা হয়, যিশু ঈশ্বর। পিতা ঈশ্বর। পবিত্র আত্মা ঈশ্বর। তবু ঈশ্বর একজন, কিন্তু ব্যক্তি তিনজন। তার মানে প্রতিটি ব্যক্তিসত্তার আলাদা চিন্তা, আলাদা ইচ্ছা থাকার কথা। কারণ আপনি যদি বলেন, না, তাঁদের চিন্তা একই, ধারণা একই, ইচ্ছাও একই—সবকিছু তিনজনের মধ্যে একই, তাহলে যুক্তিগতভাবে তাঁরা একই ব্যক্তি হয়ে যান। তখন তিনজন মিলে আসলে এক সত্তাতেই এসে দাঁড়ান, তাই না?
আর যদি তাঁরা সমান ও অনাদি-অনন্ত হন, তাহলে তাঁরা কোনো বিষয়ে একমত হন কীভাবে? যদি যিশু ক্রুশে মৃত্যু চাইতেন না? কারণ বাইবেলে বলা হয়েছে, তিনি বাইবেলের ভাষায় আর্তনাদ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “পিতা, পিতা, কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছ?” তাহলে স্পষ্টতই তিনি ক্রুশবিদ্ধ হতে চাইছিলেন না। তাহলে সেই ইচ্ছার সমন্বয় হলো কীভাবে?
আমার কাছে তা যৌক্তিক লাগেনি। যিশু নিজেই তাওরাত অনুসরণ করতে বলেছিলেন এবং নিজেও ইহুদি ছিলেন। তিনি একজন ইহুদি মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর ‘I am’ ধরনের বক্তব্যগুলো এবং এমন অন্যান্য বক্তব্যকে যখন ইহুদি ধর্মতত্ত্বের আলোকে দেখি, তখন বুঝি, এসব বক্তব্যের অর্থ যিশু ঈশ্বর—এটা নয়। এগুলো তাঁকে ঈশ্বরত্ব দেওয়ার অর্থও বহন করে না। প্রথমত, ইহুদি ঐতিহ্যে ‘আল্লাহর পুত্র’ বলা মূলত একজন ধার্মিক মানুষকে বোঝাতে পারে। ইহুদি ঐতিহ্যে যখন একজন মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে কথা বলেন, তখন তাঁকে এমন একটি মর্যাদা দেওয়া হয়, যেন তিনি আল্লাহর প্রতিনিধি। এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার। প্রথমত, বাইবেলে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সত্তাকেও ‘Elohim’ বলা হয়েছে, যেখানে তাদের দেওয়া হয়েছে ঐশ্বরিক প্রতিনিধিত্বের একটি মর্যাদা। অর্থাৎ, এই ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিনিধি, কিন্তু তিনি নিজে আল্লাহ নন। দ্বিতীয়ত, যখন আমরা গসপেলগুলো দেখি, একদিকে আমরা যিশুর এমন বক্তব্য পাই, যেখানে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, বলেন, আমাকে অনুসরণ করো না, আল্লাহকে অনুসরণ করো। আমি ভালো নই; কেবল আল্লাহই ভালো। অর্থাৎ যিশু বলছেন, আমি আল্লাহর প্রতিনিধি এবং আল্লাহর সত্য নবী। আর তিনি নিজে কী নির্দেশ দিয়েছেন?
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে, আল্লাহকে অনুসরণ করতে, তাঁর বিধান মানতে— তাঁকে উপাসনা করতে নয়, বরং আল্লাহর বিধান মানতে এবং শুধু আল্লাহর ইবাদত করতে। তখন দেখা যায়, বাইবেল আসলে যিশুকে সরাসরি ঈশ্বর হিসেবে উপস্থাপন করে না; বরং এটি পরবর্তী পলীয় ধর্মতত্ত্বের আরোপিত ব্যাখ্যা। আমি তখন এই অনুসন্ধানের প্রায় শেষ প্রান্তে, কিন্তু তবুও সন্তুষ্ট ছিলাম না, কারণ স্টিফেন হকিংকে ঘিরে এই অভিজ্ঞতার পর আমি আল্লাহর অস্তিত্বে সন্ধান পেয়েছিলাম। কিন্তু একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যও খতিয়ে দেখেছিলাম, আর মনে হয়েছিল, এগুলো আমাকে যে উত্তর খুঁজছিলাম তা দিচ্ছে না। তখন আমার ক্লাসে একজন মুসলিম ছিল, সে আমাকে বলল, “তুমি কুরআনটা পড়ে দেখছ না কেন?
একবার চেষ্টা করো।” তখন আমি ভাবলাম, ‘এরচেয়ে খারাপ আর কী-ই বা হতে পারে?’ তাই আমি কুরআন পড়া শুরু করলাম। তখন আমি আমার প্লেস্টেশন, প্লেস্টেশন ৩ ব্যবহার করতাম, এর ইন্টারনেট ব্রাউজার দিয়ে গোপনে কুরআন দেখতাম, কারণ আমি চাইতাম না কেউ জানুক যে আমি কুরআন পড়ছি। আমি পড়তে শুরু করলাম, মনে হয় সূরা ফাতিহা থেকে শুরু করে সূরা নাস পর্যন্ত পড়েছিলাম। যা আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছিল, তা ছিল ইসলামের সরলতা, ইসলামের সরাসরি ও পরিষ্কার বক্তব্য। ইসলাম অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত জটিল বা নাটকীয় গল্প বলে না। কুরআন আপনাকে পরিষ্কার গল্প দেয়, যার শিক্ষাও পরিষ্কার। সরাসরি মনের ভেতরে গিয়ে আঘাত করে। কুরআনে আমি দেখলাম, নবীদের কাহিনিতে যে বিকৃতিগুলো ছিল, সেগুলো পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, কুরআন হচ্ছে ‘মুহাইমিন’। অর্থাৎ এটি তত্ত্বাবধায়ক, রক্ষক, এবং আগের গ্রন্থগুলোর ওপর সত্য নির্ণয়ের মানদণ্ড। এটি ভুলগুলো পরিষ্কার করে এবং বিকৃতিগুলোও সংশোধন করে। আল্লাহ যেন আমাদের বলছেন, পৃথিবীর দিকে তাকাও, ‘দেখো না, তোমাদের জন্য কত নিখুঁতভাবে এটি সৃষ্টি করা হয়েছে?’ আজকের ভাষায় আমরা এটাকে ‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ যুক্তি বলি। আল্লাহ বলছেন, ‘চারপাশের জগতের দিকে তাকাও আর ভাবো, স্বচ্ছ হৃদয় ও মন নিয়ে। তাহলে বুঝবে, শুধু আল্লাহই এগুলো সৃষ্টি করতে পারেন।’ এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। ইসলাম একটি সরল, যুক্তিসঙ্গত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা দেয়। কুরআন পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট বিধান দেয়, যা যুক্তিসঙ্গত। আর আপনি দেখতে পারেন, যদি সমাজ এই বিধানগুলো মেনে চলে, তাহলে সমাজের জন্য স্পষ্ট উপকার হবে। যখন ইসলামের বিধানগুলো মানা হয়, তার সুফল দেখা যায়; আর না মানলে ধীরে ধীরে বোঝা যায়, কীভাবে কিছু বিষয় সমাজে অনিষ্ট তৈরি করে। কীভাবে এসব বিধান না মানলে সমস্যা ও দুর্নীতি সৃষ্টি হয়। ইসলাম কীভাবে মানুষের সম্মান রক্ষা করতে চায়। কীভাবে পরিবারকে সুসংহত করতে চায়, যাতে মানুষ অপমানিত না হয় বা পরিত্যক্ত না হয়, এবং প্রত্যেকে তার ন্যায্য অধিকার পায়। এমন পরিষ্কার ও সহজ উপস্থাপন আমি অন্য কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যে পাইনি। এত সুশৃঙ্খল ও সহজভাবে কোথাও বিষয়গুলো পাইনি। তারপর কী ঘটল যে আপনি শাহাদাহ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন?
শাহাদাহ নেওয়ার সময় আপনার অনুভূতি কেমন ছিল? সেই মুহূর্তগুলোতে আমাদের নিয়ে যাবেন? আমি ইউটিউবে কিছু বক্তৃতা দেখছিলাম, কিয়ামতের আলামত নিয়ে, অর্থাৎ শেষ সময় ও কিয়ামতের দিনের নিদর্শন নিয়ে। এসব দেখার পরই আমার হৃদয়ে ভয় প্রবেশ করলো যে, যেকোনো সময়, যেকোনো মুহূর্তে আমি মারা যেতে পারি। আর আমি কি এমন কোনো অবস্থায় মরতে চাই যেখানে আমি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অনুগত অবস্থায় নেই?
এই উপলব্ধিই আমাকে ইসলাম গ্রহণের দিকে নিয়ে যায়। আমরা নিজেদের ভুলিয়ে রাখি, মৃত্যুর কথা ভাবি না। কিন্তু সেই বাস্তবতা যখন আমাকে আঘাত করল, আমি বুঝলাম—এখনই করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুকে ফোন করে বললাম, ‘আজই আমি শাহাদাহ নিতে চাই।’ আর সময় নেই। সেই মুহূর্তে যখন বুঝলাম, আমি হয়তো আগামীকালই মারা যেতে পারি, এমনকি আজকের মধ্যেই মারা যেতে পারি। তখন ‘আগামীকাল’ বলে কিছু ছিল না, ‘পরে’ বলে কিছু ছিল না। আর দেরি নয় এক্ষুনি শাহাদাহ নিতে হবে। তাই আমি বন্ধুকে ফোন করলাম, সে আমাকে তার বাসায় যেতে বলল। তারপর আমরা তার এক পারিবারিক পরিচিতের কাছে গেলাম, যিনি মসজিদের ইমাম ছিলেন। তিনি এলেন, আর আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাঁর কাছে শাহাদাহ নিলাম। আমরা শাহাদাহর অর্থও বুঝে নিলাম। আমি যখন শাহাদাহ পড়ছিলাম, ঘরে খুব অল্প কয়েকজন মানুষ থাকলেও আমার মনে হচ্ছিল ঘরটা যেন আমার চারপাশে সংকুচিত হয়ে আসছে। মনে হচ্ছিল, প্রচণ্ড এক ভার আমার ওপর চেপে আছে। কিন্তু যেই মুহূর্তে আমি বললাম, ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ।’ এই কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, পৃথিবীর সব ভার আমার ওপর থেকে নেমে গেল। মনে হলো, আমার গুনাহের ভার সরে গেল। আমার দুশ্চিন্তাগুলোও যেন চলে গেল। এটা ছিল যেন এক ঝলক নির্মল বাতাস পাওয়ার অনুভূতি। যেমনটা আমরা বিমানের ভেতর থেকে বের হয়ে মুখে আবার সতেজ বাতাসের স্পর্শ অনুভব করি। শাহাদাহর পর ঠিক এমনই অনুভূতি হয়েছিল। আপনার ইসলাম গ্রহণে পরিবার ও আশপাশের মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল বিশেষ করে আপনার বাবা?
শুরুতে যখন আমি শাহাদাহ নিই, আমি জানতাম, বিষয়টা খুব কঠিন হবে। তাই প্রায় দুই বছর আমি ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখেছিলাম। বাড়িতে আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বাইরে গিয়ে মসজিদে যেতাম, নামাজ পড়তাম, হয়তো পোশাকের ধরনও বদলে ফেলেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার পরিবার জেনে যায়। আমার বাবা যেভাবে জানতে পারেন— একদিন আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম, তিনি আমার কোটের পকেটে একটি টুপি পেয়েছিলেন। তিনি বললেন, ‘এটা কী?
তুমি আমার পিঠে ছুরি মেরেছ। তুমি নিজের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। তুমি নিজের মানুষদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। এটা কোনভাবেই মানা সম্ভব না।’ তারপর অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি ও গালাগালি হয়। পরের তিন-চার বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও খারাপ হয়, শেষ পর্যন্ত তা সহিংসতা ও অপমানেও গড়ায়। আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আগেই স্কুলে চলে যেতাম। আর বাড়ি ফিরতাম খুব রাতে, কখনো রাত ২টা বা ৩টায়, শুধু বাবাকে এড়িয়ে চলার জন্য। বাবার প্রতিক্রিয়ার মূল বিষয় ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চাপ, মানুষকে কীভাবে তিনি বোঝাবেন যে তাঁর ছেলে মুসলিম হয়ে গেছে। একসময় আবার বাবা আমার সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে তর্ক করতে চাইলেন। তখন আমি তাঁকে বসিয়ে বললাম, ‘দেখুন, আমি আমার বিশ্বাস ছাড়ব না। ইসলামও ছাড়ব না। তাই হয় আমাকে মুসলিম হিসেবে মেনে নিন, নয়তো আমাকে ছেড়ে দিন। আর আমিও আলাদা হয়ে যাব।’ সেদিনের পর আমরা আর এ নিয়ে তর্ক করিনি। তবে বাবা থেমে গিয়েছিলেন বলেই বাবার দিকের পরিবারের সবাই' থেমে গিয়েছিল—এমন নয়। আমার মামার জন্মদিনে একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন পুরো পরিবার জড়ো হয়েছিল। আমার মামা তখন আমার সঙ্গে খুব বন্ধুসুলভ আচরণ করছিলেন, আমাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করানোর চেষ্টা করছিলেন। আমরা কিছু খাওয়া-দাওয়া করলাম। তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, কিন্তু এমনভাবে ধরলেন যেন আমাকে হেডলকে আটকে রেখেছেন। তারপর সবার সামনে, পুরো পরিবারের সামনে, এক হাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস নিয়ে সেটা আমার ঠোঁটে ঠেলে দিলেন। বললেন, ‘খাও।’ আমি বললাম, ‘আমি অ্যালকোহল খাই না।’ তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘আরে খাও খাও, তোমার সমস্যা কোথায়?’ সেই মুহূর্তে যেন আমাকে সবার সামনে লজ্জা দিতে চাইলেন, বললেন, ‘একটু খেয়েই ফেলো।’ তখন আমি তাঁর হাত থেকে গ্লাসটি নিলাম, ফেলে দিইনি, কিন্তু জোরে টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। বললাম, ‘আমি অ্যালকোহল খাই না। যে অ্যালকোহল খায়, সে শেষ পর্যন্ত নিজেকেই লজ্জায় ফেলে।’ আমি তাঁদের এটাই বলেছিলাম। পার্টির শেষে, তাঁরা যখন মাতাল হয়ে গিয়েছিলেন, হাঁটতে পারছিলেন না, নিজেদের গাড়িতেও উঠতে পারছিলেন না বা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছিলেন না, তখন আমি তাঁদের বললাম, যাকে আপনারা একটু আগে অপমান করছিলেন, সেই মানুষটাই এখন আপনাদের জন্য ট্যাক্সির ব্যবস্থা করছে। এ ধরনের ঘটনা আরও অনেকবার ঘটেছে, পরে আমার কাজিনদের সঙ্গেও। একবার আমাদের পারিবারিক জমায়েত ছিল, অনেক মানুষ ছিল সেখানে। আমি খুব তৃষ্ণার্ত ছিলাম, দিনটাও ছিল ভীষণ গরম। তখন আমার এক কাজিন উঠে দাঁড়িয়ে...
সবাইকে বলল, ‘আমি কিছু পান করতে আনতে যাচ্ছি, কারও কিছু লাগবে?’ একজন বলল, ‘আমার পেপসি লাগবে।’ আরেকজন বলল, ‘এটা’, কেউ বলল ‘পানি’। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আমার জন্য একটু পানি আনবে?’ সে বলল, ‘তোমার জন্য অ্যালকোহল আনব, নয়তো কিছুই না।’ আমি বললাম, ‘আমার পানি চাই।’ আমি ভেবেছিলাম সে মজা করছে। তারপর সে চলে গেল, আবার যখন ফিরে এলো, সে সত্যিই আমার জন্য কোনো পানীয় আনল না। আমি শুধু ভাবছিলাম, এ কেমন উদ্ভট আচরণ?
আমার বাবার বড় একটি সমস্যা ছিল ইসলামকে তিনি যেভাবে দেখতেন, সেই ধারণাটি। তাঁর কাছে ইসলাম মানেই ছিল পাকিস্তানিদের ধর্ম। কিছুদিন আগে, হয়তো এক-দুই বছর আগে, আমি একটি DNA পরীক্ষা করিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, বাবার দিকের সবাই শুধু ভারতীয় বংশোদ্ভূত হবে। বাবার দিকের পরিবার অবশ্যই প্রধানত ভারতীয়, কিন্তু পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আরও বড় একটি অংশ আমার মনে হয় তাঁর DNA-র প্রায় ২৪ শতাংশ আফগানিস্তান থেকে এসেছে। আমি তাঁকে বললাম, ‘আসলে আপনি এতটা ভারতীয়ও নন।’ বরং আপনার DNA-র বড় অংশই ভারতের বাইরের। এর বড় একটি অংশ পাকিস্তানি ও আফগান উৎসের। তারপর আমাদের আমি আসলে মজা করে তাঁকে বললাম, ‘তাহলে কি কাবুলি পোলাও খেতে যাওয়া যায়?’ বললাম, ‘এটা তো এখন আমাদেরই খাবার।’ আপনি কি কখনো এমন কোনো অসাধারণ ঘটনার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন যেখানে মনে হয়েছে, আল্লাহর সঙ্গে আপনার বিশেষ সংযোগ রয়েছে?
একদিন আমি বাড়ি ফিরছিলাম, হঠাৎ ভীষণ ভারী বৃষ্টি শুরু হলো। এমন বৃষ্টি ছিল, যারফলে ড্রেনও উপচে পড়ছিল। সব ড্রেন পানিতে ভরে উপচে পড়ছিল, আর রাস্তায়ও পানি জমে উঠছিল। পানি ফুটপাতের ওপর উঠে আসছিল। বৃষ্টি ছিল প্রচণ্ড। আমি তখন বাড়ি ফিরছিলাম, তারপর একটি দোকানের নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম, একটা সুপারমার্কেটের মতো জায়গা, যার সামনে এমন একটি ছাউনি বা বাধার মতো কাঠামো ছিল। আমি তার নিচে গিয়ে বৃষ্টি থেকে একটু আশ্রয় নিলাম। তারপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে দোয়া করলাম। প্রথমে আমি আল্লাহর কাছে চেয়েছিলাম, বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত যেন বৃষ্টিটা থেমে যায়। বললাম, ‘আমি আমার রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত বৃষ্টি কি থামিয়ে দিতে পারেন?’ জানি না কেন, এভাবে চাইতে আমার মনে হলো। তারপর আমি ছাউনির নিচ থেকে বের হলাম। দেখলাম, বৃষ্টি আর নেই। সম্পূর্ণ থেমে গেছে। আমি সেখান থেকে হেঁটে বাড়ির দিকে চললাম। পথটা প্রায় দেড় ঘণ্টার হাঁটা ছিল। আমি হাঁটতে হাঁটতে আমার রাস্তায় পৌঁছাতেই আবার হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। তবে সেটা ছিল শুধু হালকা কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি। আর যেই মুহূর্তে আমি বাড়ির দরজায় পৌঁছালাম, বৃষ্টি আবার ঠিক আগের মতো জোরে শুরু হয়ে গেল। যখন কোনো সমস্যা হয়, আল্লাহর সঙ্গে কথা বলুন যেভাবে একজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। এটা ভাববেন না যে সবসময় অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিক হতে হবে। হ্যাঁ, দোয়া করার সুন্নাহ পদ্ধতি আছে। কিন্তু কথা শুরু করার পর, মন খুলে বলুন। কারণ আল্লাহ কোনো ধারণামাত্র নন। আল্লাহ আপনাকে শুনছেন, আপনার কথা শুনছেন। ইসলামের আগের রিস আর ইসলামের পরের রিসের মধ্যে কী পার্থক্য দেখেন?
ইসলাম আমাকে আমার শক্তি ও গুণগুলোকে ভালো কাজে ব্যবহার করার ক্ষমতা দিয়েছে। আমি মানুষ হিসেবে বদলাইনি; আমার পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। এটা আমাকে এমন অনেক কিছু দিয়েছে, যা আমি আগে ভাবতেও পারিনি। আমি কথা বলতে পছন্দ করি। ইসলামের আগে মানুষ আমার কথা শুনতে চাইত না, আমার সঙ্গে কথা বলত না। এখন মানুষ আমার কথা শুনতে চায়। মানুষ আমাকে মসজিদে ডাকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে। ইসলাম একজন মানুষকে মর্যাদা দেয়। আমি যখন অমুসলিম ছিলাম এবং সেকেন্ডারি স্কুলে পড়তাম, পরীক্ষার জন্য খুব একটা চেষ্টা করতাম না। পড়াশোনাতেও খুব একটা মনোযোগ দিতাম না। তখন যদি কেউ বলত, বড় হয়ে তুমি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, আমি বলতাম, আপনি বাজে কথা বলছেন। কিন্তু এখন যদি জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন?
আমি বলব, ‘বি-ইযনিল্লাহ ভাই, ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া আমার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছিল।’ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াও আমার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছিল। আমি যখন ডিগ্রি করছিলাম, তখন আমার দাদা মারা গেলেন, দাদিও মারা গেলেন। তখন কোভিডের সময় চলছিল, আমার ছেলের বয়স ছিল এক বছর। আমাকে চাকরিও করতে হতো, আবার আড়াই ঘণ্টা... কেমব্রিজ যেতে হতো, আবার আড়াই ঘণ্টা ফিরে এসে কাজও করতে হতো। আল্লাহ আমার জন্য বিষয়গুলো সহজ করে দিয়েছিলেন। ইসলামি জীবনযাপন গ্রহণ করা আপনার জন্য কতটা কঠিন ছিল? যেমন হারাম থেকে বেঁচে থাকা, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। এসব কি আপনার জন্য কঠিন ছিল, অথবা সারাদিন রোজা রাখা?
আমি বলব, রোজা ও নামাজ আমার জন্য কঠিন ছিল না। আসল চ্যালেঞ্জ হলো পরিবেশ। আপনি যদি এমন মানুষের সঙ্গে থাকেন, যারা সবসময় আপনাকে হারামের দিকে ডাকে, তাহলে কী হবে? স্বাভাবিকভাবেই ভুল করার ঝুঁকি বাড়বে, এবং আপনি সেই কাজগুলো করে ফেলতে পারেন। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তুষ্টির জন্য যখন আপনি নিজেকে সেই পরিবেশ থেকে সরিয়ে নেন, তখন সেই চক্র থেকে বের হতে পারেন। একই সঙ্গে বলব, কেউ রাতারাতি বদলে যায় না। আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো হলো ভালো সঙ্গ বেছে নেওয়া। কারণ এই মানুষগুলো আপনাকে সাহায্য করবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?
আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে তাঁর নেতৃত্বের ধরন। আপনি এমন একজনকে দেখেন যিনি কোমল, সবার খোঁজ রাখেন। আপনি এমন একজনকে দেখেন, যিনি মানুষের পাশে থাকেন। তিনি সবসময় মানুষের দিকে লক্ষ্য রাখতেন... এবং ভাবতেন, ‘আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি? তাদের কী প্রয়োজন?’ তারা কী নিয়ে সংগ্রাম করছে? তিনি মানুষের প্রয়োজনের দিকে তাকাতেন, তাদের চাওয়া এবং কীভাবে তাদের সাহায্য করা যায়—সেদিকে নজর দিতেন। এটাই ছিল তাঁর নেতৃত্বের ধরন। কিন্তু এই কোমলতার পাশাপাশি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। একটি হাদিসের কথা মনে পড়ে, যেখানে বলা হয়েছে...
মদিনার প্রান্তে হঠাৎ একটি শব্দ শোনা গিয়েছিল, মনে হয়েছিল, হয়তো কেউ তাদের ওপর আক্রমণ করতে এসেছে। জোরে শব্দ ও ধাক্কার আওয়াজ শোনা গেল। তখন সাহাবিরা দ্রুত বর্ম পরে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু তাঁরা যখন বাইরে যাচ্ছিলেন, ততক্ষণে দেখলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ একাই ফিরে আসছেন। তিনি আগেই একা গিয়ে দেখে এসেছেন, আর ফিরে এসে বললেন, কিছু হয়নি। সব ঠিক আছে, আমি দেখে এসেছি। আপনারা ফিরে গিয়ে ঘুমাতে পারেন। আমার কাছে এটাই প্রকৃত পুরুষত্ব ও নেতৃত্বের ভারসাম্য—কোমল হওয়া, ভালোবাসাপূর্ণ ও যত্নশীল হওয়া, কিন্তু একই সঙ্গে সাহসী ও নীতিতে দৃঢ় থাকা। যদি পৃথিবীর সব অমুসলিমের সঙ্গে এক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন, তাহলে আপনি কী বলতে চাইতেন? আমাদের সবারই এক মুহূর্ত থেমে একটি সহজ প্রশ্ন করা দরকার। ‘আমি আজ যা বিশ্বাস করি, সেটা কেন বিশ্বাস করি?
আমি কি খ্রিস্টান শুধু এই কারণে যে আমার বাবা-মা খ্রিস্টান? আমি কি শিখ শুধু এই কারণে যে আমার বাবা-মা শিখ? আমি কি হিন্দু শুধু এই কারণে যে আমার পরিবার হিন্দু? আপনি যে ধর্ম ও ঐতিহ্যগুলো অনুসরণ করছেন, সেগুলোর পেছনে আসল কারণ কী? যেগুলোর প্রতি আপনি এত দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ?’ কারও জন্য এটা সহজ নয় শুনতে যে সে ভুল, বা নিজের বিশ্বদৃষ্টি ভুল—এটা মেনে নিতে। বরং এটা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি, কারণ এতে অহংবোধে আঘাত লাগে, কারণ তখন নিজেকেই বলতে হয়, পৃথিবী সম্পর্কে আমার ধারণা ভুল ছিল। কিন্তু এক মুহূর্ত থামুন। মিথ্যার মধ্যে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্যকে জানা কি ভালো নয়? সবচেয়ে লজ্জার বিষয় কোনটা? মিথ্যার মধ্যে বেঁচে থাকা, নাকি অহংয়ে সামান্য আঘাত মেনে নিয়ে নিজের বিশ্বদৃষ্টিকে প্রশ্ন করা ও সত্য গ্রহণ করা?
কুরআন পড়ুন। আল্লাহ মানবজাতির কাছে কী চান, তা পড়ুন। হিদায়াতের বাণী পড়ুন। আল্লাহ আপনার কাছ থেকে কী চান তা পড়ুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন পড়ুন। আর আপনার প্রশ্ন থাকলে, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আলোচনায় আসুন। নিজেকে চ্যালেঞ্জ করুন, দেখুন এই ধর্ম আসলে কী বলে? অন্তত আপনি বুঝতে পারবেন ইসলাম কী। আপনিও কি ইসলাম গ্রহণ করেছেন, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না? কিংবা, হয়তো আপনি সারাজীবন মুসলিমই ছিলেন, কিন্তু নতুনভাবে শুরু করে একদম শুরু থেকে ইসলামকে জানতে আগ্রহী?
ঠিক এই কারণেই আমরা Step Islam অ্যাপটি তৈরি করেছি। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং বিজ্ঞাপনমুক্ত একটি অ্যাপ, যা আপনাকে ইসলাম শেখায় পরিষ্কার ও সাজানোভাবে। আপনি সহজেই ঈমানের মূল ভিত্তি, কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা শিখতে পারবেন, আর নিজের গতিতে এমন বাস্তবসম্মতভাবে কাজগুলো সম্পন্ন করবেন, যেন আজীবনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। শয়তানকে সুযোগ দেবেন না, যেন সে আপনাকে এটি পিছিয়ে দিতে পারে। নিচের লিংকে ক্লিক করুন, Step Islam ডাউনলোড করুন, আর আজই চিরস্থায়ী সুখের পথে আপনার প্রথম পদক্ষেপ নিন।
তাই আমি কুরআন পড়া শুরু করলাম আর তারপর আমি মুসলিম হয়ে গেলাম। বাবা জানতে পারলেন, একদিন স্কুল থেকে ফিরে আসার পর আমার কোটে একটি টুপি দেখে। তিনি বললেন, “এটা কী? তুমি আমার পিঠে ছুরি মারলে। তুমি নিজের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। তুমি নিজের মানুষদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ।” অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি আর গালাগালি করেছিলেন। আমার মামার জন্মদিনে একটি ঘটনা ঘটেছিল, জানেন, মামা আমার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতার ভান করছিলেন, তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু এমনভাবে ধরলেন... যেন আমাকে হেডলকে আটকে রেখেছেন, পুরো পরিবারের সামনে। তাঁর হাতে ছিল শ্যাম্পেনের গ্লাস, সেটা আমার ঠোঁটে ঠেলে দিলেন এবং বললেন, “খাও।” আমি বললাম, “না, আমি খাবো না।” তিনি বললেন, “খাও!” “না!
আমি খেতে পারবো না!” আসসালামু আলাইকুম, ভাই রিস বাইফিল্ড। আমাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ। Towards Eternity-তে আপনাকে পেয়ে আমরা আনন্দিত। আমি শুরু করতে চাই—রিস বাইফিল্ড কে? সংক্ষেপে আপনার জীবন সম্পর্কে বলবেন?
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। ভাই, আলহামদুলিল্লাহ, আপনাদের অতিথি হতে পারা আমার জন্য সম্মানের। আমি একটি মিশ্র বর্ণের পরিবারে জন্মেছি। আমার বাবা প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী; ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। আর আমার মা যুক্তরাজ্যেরই একজন ইংরেজ নারী। আমার মায়ের পরিবার খ্রিস্টান পটভূমির। আর আমার বাবার পরিবার শিখ পটভূমির। আমি নানা ধর্ম নিয়ে খোঁজ করেছি। তাই আমি কুরআন পড়া শুরু করি। আমি শাহাদাহ গ্রহণ করি এবং মুসলিম হয়ে যাই। তারপর প্রায় দুই বছর আমি আমার ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার পরিবার জেনে যায়। এরপর অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি আর গালাগালি শুরু হয়, এবং পরের তিন থেকে চার বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও খারাপ হতে থাকে। আমি কিংস কলেজ লন্ডন থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আমি ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে পাশ করি। তারপর আমি ধর্মতত্ত্বে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি, ধর্মদর্শন ও ধর্ম নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ইসলাম গ্রহণের আগে বিশ্বাসের দিক থেকে আপনার জীবন কেমন ছিল?
আপনি কী বিশ্বাস করতেন? অবশ্যই আমি চার্চে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যেতাম, যেমন বিয়েশাদী বা যেকোন অনুষ্ঠানে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই, একজন মানুষই ঈশ্বর—এই ধারণা আমি মেনে নিতে পারতাম না। গুরদুয়ারাতেও, যেটি শিখদের ধর্মীয় উপাসনালয়, শিখ মন্দিরে, আমি এমন অনুষ্ঠানগুলোতে যেতাম। তখনই আমার মনে হতো, খুব অল্প বয়স থেকেই শিখধর্মের প্রতিষ্ঠাতাকে গুরু নানককে আমি বেশি দেখতাম একজন সমাজসংস্কারক হিসেবে, এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, যিনি ঐশী ওহি পেয়েছেন। সেই সময় কিছুটা বর্ণবৈষম্যের অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। ইংরেজরা আমাকে ইংরেজ মনে করত না, আর এশীয়রাও...
আমাকে এশীয় মনে করত না। ফলে এক অদ্ভুত মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলাম। তার ঠিক এক বছর আগে আমেরিকায় ৯/১১ হামলা হয়েছিল। কয়েক বছর পর ৭/৭ বোমা হামলা হয়, যেখানে বাসগুলোতে আর লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল। এর ফলে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি সামাজিকভাবে এক ধরনের ঘৃণা তৈরি হয়। সেদিন আসলে যা হয়েছিল, আমার বাবার ওই ট্রেনে ওঠার কথা ছিল। সেন্ট্রাল লাইনের যে ট্রেনটিতে বিস্ফোরণ হয়েছিল। সেই ট্রেনেই তাঁর ওঠার কথা ছিল। এরপর থেকেই আমি বাবাকে ফোন করতে থাকি, কিন্তু তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। আমি ভাবছিলাম, বাবা ওই ট্রেনেই আছেন। আমি মাকে ফোন করে বললাম, বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে? খবর শুনেছ?
তিনি বললেন, আমিও ফোন করছি, কিন্তু সংযোগ পাচ্ছি না। আসলে যা হয়েছিল, বাবা ট্রেন স্টেশনের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁর আরেকটি ট্রেনে সেন্ট্রাল লাইনে যাওয়ার কথা ছিল। আর তিনি যখন সেন্ট্রাল লাইনে ছিলেন, ঠিক তখনই হামলাটি ঘটে। এরপর তারা পুরো এলাকাটি বন্ধ করে দেয়, কাউকে স্টেশন থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি, কাউকে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। এই কারণেই তাঁর ফোনে সিগন্যাল ছিল না, তাই তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডেই আটকে ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, মাত্র এক বা দুই ট্রেনের ব্যবধানে তিনি বেঁচে যান, কারণ সেদিন তাঁর একটু দেরিই হয়েছিল। একই সময়ে তথাকথিত ‘নিউ অ্যাথেইস্ট’ আন্দোলনেরও উত্থান হচ্ছিল। স্টিফেন হকিং এবং রিচার্ড ডকিন্স তাঁদের মত লোকেরা তখন নিজেদের ধারণাগুলো খুব জোরালোভাবে প্রচার করছিলেন। আমার বয়স যখন প্রায় ১৫-১৬, তখন তাঁর বই প্রকাশিত হয়। আমি যেন এই দুই ধারার মাঝখানে ছিলাম। একদিকে আমি এই প্রবাহে প্রভাবিত হচ্ছিলাম, এই চিন্তার ধারা গ্রহণ করছিলাম, এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছিলাম। কিন্তু একই সঙ্গে আমার ভেতরে একটা প্রবল অনুভূতিও ছিল যে, অবশ্যই কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে। আমি স্টিফেন হকিংয়ের একটি বক্তৃতা পুরোটাই দেখছিলাম। সেটি ছিল মহাবিশ্বের সূচনা নিয়ে; তিনি তাঁর গবেষণা ব্যাখ্যা করছিলেন এবং তাঁর তত্ত্বগুলো বলছিলেন বিগ ব্যাং পর্যন্ত ফিরে গিয়ে মহাবিশ্ব আবার কীভাবে শুরু হয়েছিলো। তারপর আমরা সেই প্রশ্নে এসে পৌঁছালাম— মহাবিশ্ব এলো কোথা থেকে?
বক্তৃতার উপসংহার ছিল, মহাবিশ্বের একটি সূচনা ছিল। তাহলে সেই সূচনা এলো কোথা থেকে? মহাবিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যইবা কী? আর তাঁর উত্তর ছিল, “এটা শূন্য থেকে এসেছে।” আমি ল্যাপটপের পর্দার দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম, লোকটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, আপনি কী বলছেন?
তারপর তিনি নিজেই যেন পিছু হটে বললেন, “আমরা জানি না।” তারপর আপনি এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ান যেখানে এমন একটা বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয় যা আমরা জানি। কিছুই শূন্য থেকে আসতে পারে না। এটা খুবই মৌলিক একটি বোধগম্য বিষয়। যদি কোনো ফল থাকে, তার একটি কারণও থাকে। আর আপনি বলছেন, এই সবকিছু, এই বিগ ব্যাং আমাদের পুরো মহাবিশ্বের সৃষ্টি শূন্য থেকে এসেছে। তারপর আপনি পদার্থবিজ্ঞানের পূর্ববর্তী শর্তগুলো নিয়ে কথা বলেন, যেন সেই শর্তগুলো হঠাৎ কাকতালীয়ভাবে ছিল। এত বুদ্ধিমান একজন মানুষের কাছ থেকে এটা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি, যাঁর এত বিপুল জ্ঞান ছিল। আমার মনে হলো, উত্তরটি আপনার জিহ্বার ডগায় আছে, যে উত্তরটি আপনার মুখ থেকে বেরিয়ে আসার কথা, সেই উত্তরটাই আপনি ইচ্ছা করে আটকে রাখছেন। আর আমার কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর। তখন আমি বুঝলাম, এই মানুষটি যিনি আমাকে তিন ঘণ্টা বক্তৃতা দিলেন, তিনি শুধু বিজ্ঞান বলছেন না, তিনি তাঁর মতাদর্শও চাপিয়ে দিচ্ছেন। আসলে বিজ্ঞান ও ওহির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকার প্রয়োজনই নেই। এই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, কারণ মানুষ নিজেরাই সেটা ঢুকিয়ে দেয়; নিজেদের মতাদর্শ চাপিয়ে দেয়। ওই ভিডিও দেখার পর এবং বিষয়টি বুঝতে পারার পর, আল্লাহর অস্তিত্বের বিশ্বাস আমার ভেতরে দৃঢ়ভাবে বসে যায়। একটু হাস্যকরভাবে বললে, স্টিফেন হকিংই আমার কাছে আল্লাহকে প্রমাণ করে দিলেন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসটি আমার হৃদয়ে দৃঢ় হয়ে গেল। কারণ আমরা এই পৃথিবীতে স্রষ্টার নিদর্শন দেখি। আমরা স্রষ্টার সৃষ্টিশৈলী দেখতে পাই। অস্তিত্বে এমন একটি জিনিসও নেই, যা অন্য কিছুর ওপর নির্ভর না করে টিকে থাকতে পারে। যখন সবকিছুই নির্ভরশীল, তখন নির্ভরতার এক শৃঙ্খল তৈরি হয়। কিন্তু এই নির্ভরতার শৃঙ্খলকে কোথাও গিয়ে শেষ হতেই হবে। এমন একটি বিন্দুতে পৌঁছাতে হবে, যা স্বাধীন কিছুর দিকে নিয়ে যায়, যা এই কাঠামোর বাইরে, কিন্তু পুরো কাঠামোটিকে ধারণ করে। পুরো মহাবিশ্বে সবকিছুই সম্ভাব্য ও নির্ভরশীল। এবং অস্তিত্বে আসার জন্য তার অবশ্যই অন্য কিছুর প্রয়োজন হয়। এরপর প্রশ্নটা হয়ে গেল, ‘আচ্ছা, যদি আল্লাহ থাকেন, তাহলে আল্লাহ কে?’ কে সেই সত্তা, যিনি ‘আল্লাহ’ নামের উপযুক্ত?
আর আল্লাহ কেমন?” তখন আমার মনে হলো স্বাভাবিকভাবেই শুরু করা উচিত সবচেয়ে পুরোনো ধর্মগুলো থেকে। তারপর দেখলাম প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মগুলোর ধারণা, যেখানে দেবতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে হয়, নানা উৎসর্গ দিতে হয়। আমার কাছে ব্যাপারটা একেবারেই অর্থহীন লাগত। যে সর্বোচ্চ সত্তা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, সবকিছুর ওপর যার নিয়ন্ত্রণ, তাঁর সঙ্গে আপনার দরকষাকষি করতে হবে কেন? আল্লাহ এসবের ঊর্ধ্বে। মানুষের বৈশিষ্ট্য তাঁকে আরোপ করারও ঊর্ধ্বে তিনি, অর্থাৎ আমরা একে অপরের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করি, সেটাই আল্লাহর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি। এটা আমার কাছে খুবই অস্বস্তিকর মনে হয়েছিল। প্রাচীন প্রায় সব পৌত্তলিক ধারাতেই আমি এমনটা দেখেছি। কখনো সেগুলো ছিল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম, যেখানে নেতারা...
আর রাজারা নিজেদের ‘ঐশী’ অবস্থানকে ব্যবহার করত, কথিত ঐশী কর্তৃত্বকে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। এটাই ছিল আমার প্রথম আপত্তি। তারপর আমি নানা ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করেছি। আমার বাবার দিকের শিখধর্মের কথা বললে, এর প্রতিষ্ঠাতা গুরু ছিলেন নানক। গুরু নানক হিন্দু পরিবারে বড় হয়েছিলেন। হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যকার মতবিরোধ ও দ্বন্দ্ব নিয়ে তিনি বেশ অসন্তুষ্ট ছিলেন। কথিত আছে, তিনি ধ্যান ও সত্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য। গুরু নানকের যাত্রায় তিনি হজও করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সফর থেকে ফিরে তিনি কিছু ধর্মীয় আদর্শ নিয়ে ফিরলেন, যা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। একইভাবে ভারতের অনেক ধর্মীয় ধারায়, যেমন বৌদ্ধধর্ম ও শিখধর্ম, এগুলো ছিল সমন্বয়ধর্মী বিশ্বাসব্যবস্থা। সমন্বয়ধর্মী ধর্ম হলো এমন ধর্ম, যা আশপাশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চাগুলো গ্রহণ করে নিজের ধর্মের মধ্যে মিশিয়ে নেয়। শিখধর্মে এর খুব স্পষ্ট উদাহরণ আছে। তাদের প্রার্থনার ধরন অনেকটা হিন্দু প্রার্থনার মতো। তবে কেউ যদি আজকের ভারতে যান, তাহলে দেখবেন, আসলে এটা খুবই সাধারণ বিষয়। আপনি হিন্দুদের মসজিদে যেতে দেখবেন, এমনকি কোনো কোনো হিন্দুকে তরিকার সঙ্গে যুক্ত হতেও দেখবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ভারতে হিন্দু নকশবন্দিও আছেন। আবার মুসলিমদেরও হিন্দুদের মন্দির বা ধর্মীয় স্থানে যেতে দেখা যায়, সেখানে পুরোহিতদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করতেও দেখা যায়। ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলোর এ ধরনের মিশ্রণ, যা অনেকটা সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় আমরা অনেক সময় ‘ভিলেজ রিলিজিয়ন’ বা গ্রামীণ ধর্ম বলি। এই ধরনের গ্রামীণ ধর্মীয় সংস্কৃতি ভারতে খুবই প্রচলিত। আমার কাছে শিখধর্ম মানুষের তৈরি ধর্ম মনে হয়েছিল, আর হিন্দুধর্মও আমি দেখেছি। হিন্দুধর্মের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আসলে ‘হিন্দুধর্ম’ নামে একটি একক ধর্মই নেই। প্রথম সমস্যা হলো, ‘হিন্দুইজম’ একটি ঔপনিবেশিক পরিভাষা। ব্রিটিশরা যখন ভারতে আসে, তারা যা করেছিল—তারা অনেক স্থানীয় মানুষকে নানা ধরনের উপাসনা ও ধর্মীয় চর্চা করতে দেখল। তারপর বলল, ‘আচ্ছা, এরা সবাই একই ধর্মের।’ তাদের ভিন্ন ভিন্ন সবাইকে একসঙ্গে এক শ্রেণিতে ফেলে দেওয়া হলো, যেন এরা সবাই একই ‘হিন্দু’ শব্দটিও তো সিন্ধু নদ থেকেই এসেছে, তাই না?
অর্থাৎ বলা হলো, এটাই এই মানুষদের ধর্ম। আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে গেল এটা অনেকটাই সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, মানুষের বড় অংশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি উপায়, এ ধরনের একটা ব্যাপার আরকি। তারপর আমি ইহুদিধর্ম নিয়ে দেখলাম। প্রথাগত ইহুদিধর্মে ইহুদিধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া সহজ বা স্বাভাবিক বিষয় নয়। ‘আল্লাহর মনোনীত জাতি’র অংশ হতে হলে ইহুদি পরিবারে জন্ম নিতে হয়—এমন ধারণা আছে। এই অর্থে এটি একটি জাতিগত ধর্ম। এই ধারণা আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। দ্বিতীয় বিষয় ছিল, ইহুদি ঐতিহ্য নিজেই খতিয়ে দেখা, এবং বাইবেলের বর্ণনায় ইহুদিদের সঙ্গে তাঁদের নবীদের সম্পর্ক, আর সেই ঐতিহ্য নিজেই কীভাবে বর্ণনা করে যে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ইহুদি জাতি অঙ্গীকার রক্ষা করেনি, যেমনটা বাইবেলেই বলা আছে। বাইবেলেই বলা হয়েছে, ইহুদি জাতি আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। একই সঙ্গে দেখা যায়, বাইবেলের বর্ণনায় কিছু বিকৃতি ঘটেছে, বিশেষ করে কিছু কাহিনির ক্ষেত্রে। একটি কাহিনিতে বলা হয়, তিনি একজন মানুষকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন শুধু এই কারণে যে, যেন লোকটি মারা যায়, আর তিনি তার স্ত্রীকে বিয়ে করতে পারেন। এ ধরনের আরও অনেক গল্প আছে, যা দেখে মনে হয়, এই ঐতিহ্যগুলো পরস্পরের সঙ্গে মেলে না, বিশেষ করে যখন বলা হয়, এরা আল্লাহর মনোনীত মানুষ। একই বই একদিকে নবীদের প্রশংসা করে এবং তাঁদের আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ও সত্যবাদিতার কথা বলে। আবার একই সঙ্গে তাঁদের শুধু সাধারণ মানবিক ভুলের বাইরেও খুব বড় বড় ভুল করতে দেখায়, কারণ ছোট ভুল আর গুরুতর ভুল এক জিনিস নয়। এবং সেখানে কিছু বিরোধও দেখা যায়। এরপর স্বাভাবিকভাবেই খ্রিস্টধর্মকে খতিয়ে দেখলাম। আর যখন খ্রিস্টধর্মের গভীরে যান, তখন দেখতে পান কী ঘটেছে। ত্রিত্ববাদের ধারণা, অথবা কাউকে আল্লাহর আক্ষরিক পুত্র বলা— যেমন বলা হয়, যিশু ঈশ্বর। পিতা ঈশ্বর। পবিত্র আত্মা ঈশ্বর। তবু ঈশ্বর একজন, কিন্তু ব্যক্তি তিনজন। তার মানে প্রতিটি ব্যক্তিসত্তার আলাদা চিন্তা, আলাদা ইচ্ছা থাকার কথা। কারণ আপনি যদি বলেন, না, তাঁদের চিন্তা একই, ধারণা একই, ইচ্ছাও একই—সবকিছু তিনজনের মধ্যে একই, তাহলে যুক্তিগতভাবে তাঁরা একই ব্যক্তি হয়ে যান। তখন তিনজন মিলে আসলে এক সত্তাতেই এসে দাঁড়ান, তাই না?
আর যদি তাঁরা সমান ও অনাদি-অনন্ত হন, তাহলে তাঁরা কোনো বিষয়ে একমত হন কীভাবে? যদি যিশু ক্রুশে মৃত্যু চাইতেন না? কারণ বাইবেলে বলা হয়েছে, তিনি বাইবেলের ভাষায় আর্তনাদ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “পিতা, পিতা, কেন আমাকে পরিত্যাগ করেছ?” তাহলে স্পষ্টতই তিনি ক্রুশবিদ্ধ হতে চাইছিলেন না। তাহলে সেই ইচ্ছার সমন্বয় হলো কীভাবে?
আমার কাছে তা যৌক্তিক লাগেনি। যিশু নিজেই তাওরাত অনুসরণ করতে বলেছিলেন এবং নিজেও ইহুদি ছিলেন। তিনি একজন ইহুদি মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর ‘I am’ ধরনের বক্তব্যগুলো এবং এমন অন্যান্য বক্তব্যকে যখন ইহুদি ধর্মতত্ত্বের আলোকে দেখি, তখন বুঝি, এসব বক্তব্যের অর্থ যিশু ঈশ্বর—এটা নয়। এগুলো তাঁকে ঈশ্বরত্ব দেওয়ার অর্থও বহন করে না। প্রথমত, ইহুদি ঐতিহ্যে ‘আল্লাহর পুত্র’ বলা মূলত একজন ধার্মিক মানুষকে বোঝাতে পারে। ইহুদি ঐতিহ্যে যখন একজন মানুষ আল্লাহর পক্ষ থেকে কথা বলেন, তখন তাঁকে এমন একটি মর্যাদা দেওয়া হয়, যেন তিনি আল্লাহর প্রতিনিধি। এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার। প্রথমত, বাইবেলে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সত্তাকেও ‘Elohim’ বলা হয়েছে, যেখানে তাদের দেওয়া হয়েছে ঐশ্বরিক প্রতিনিধিত্বের একটি মর্যাদা। অর্থাৎ, এই ব্যক্তি আল্লাহর প্রতিনিধি, কিন্তু তিনি নিজে আল্লাহ নন। দ্বিতীয়ত, যখন আমরা গসপেলগুলো দেখি, একদিকে আমরা যিশুর এমন বক্তব্য পাই, যেখানে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, বলেন, আমাকে অনুসরণ করো না, আল্লাহকে অনুসরণ করো। আমি ভালো নই; কেবল আল্লাহই ভালো। অর্থাৎ যিশু বলছেন, আমি আল্লাহর প্রতিনিধি এবং আল্লাহর সত্য নবী। আর তিনি নিজে কী নির্দেশ দিয়েছেন?
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে, আল্লাহকে অনুসরণ করতে, তাঁর বিধান মানতে— তাঁকে উপাসনা করতে নয়, বরং আল্লাহর বিধান মানতে এবং শুধু আল্লাহর ইবাদত করতে। তখন দেখা যায়, বাইবেল আসলে যিশুকে সরাসরি ঈশ্বর হিসেবে উপস্থাপন করে না; বরং এটি পরবর্তী পলীয় ধর্মতত্ত্বের আরোপিত ব্যাখ্যা। আমি তখন এই অনুসন্ধানের প্রায় শেষ প্রান্তে, কিন্তু তবুও সন্তুষ্ট ছিলাম না, কারণ স্টিফেন হকিংকে ঘিরে এই অভিজ্ঞতার পর আমি আল্লাহর অস্তিত্বে সন্ধান পেয়েছিলাম। কিন্তু একই সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যও খতিয়ে দেখেছিলাম, আর মনে হয়েছিল, এগুলো আমাকে যে উত্তর খুঁজছিলাম তা দিচ্ছে না। তখন আমার ক্লাসে একজন মুসলিম ছিল, সে আমাকে বলল, “তুমি কুরআনটা পড়ে দেখছ না কেন?
একবার চেষ্টা করো।” তখন আমি ভাবলাম, ‘এরচেয়ে খারাপ আর কী-ই বা হতে পারে?’ তাই আমি কুরআন পড়া শুরু করলাম। তখন আমি আমার প্লেস্টেশন, প্লেস্টেশন ৩ ব্যবহার করতাম, এর ইন্টারনেট ব্রাউজার দিয়ে গোপনে কুরআন দেখতাম, কারণ আমি চাইতাম না কেউ জানুক যে আমি কুরআন পড়ছি। আমি পড়তে শুরু করলাম, মনে হয় সূরা ফাতিহা থেকে শুরু করে সূরা নাস পর্যন্ত পড়েছিলাম। যা আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছিল, তা ছিল ইসলামের সরলতা, ইসলামের সরাসরি ও পরিষ্কার বক্তব্য। ইসলাম অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত জটিল বা নাটকীয় গল্প বলে না। কুরআন আপনাকে পরিষ্কার গল্প দেয়, যার শিক্ষাও পরিষ্কার। সরাসরি মনের ভেতরে গিয়ে আঘাত করে। কুরআনে আমি দেখলাম, নবীদের কাহিনিতে যে বিকৃতিগুলো ছিল, সেগুলো পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, কুরআন হচ্ছে ‘মুহাইমিন’। অর্থাৎ এটি তত্ত্বাবধায়ক, রক্ষক, এবং আগের গ্রন্থগুলোর ওপর সত্য নির্ণয়ের মানদণ্ড। এটি ভুলগুলো পরিষ্কার করে এবং বিকৃতিগুলোও সংশোধন করে। আল্লাহ যেন আমাদের বলছেন, পৃথিবীর দিকে তাকাও, ‘দেখো না, তোমাদের জন্য কত নিখুঁতভাবে এটি সৃষ্টি করা হয়েছে?’ আজকের ভাষায় আমরা এটাকে ‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ যুক্তি বলি। আল্লাহ বলছেন, ‘চারপাশের জগতের দিকে তাকাও আর ভাবো, স্বচ্ছ হৃদয় ও মন নিয়ে। তাহলে বুঝবে, শুধু আল্লাহই এগুলো সৃষ্টি করতে পারেন।’ এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল। ইসলাম একটি সরল, যুক্তিসঙ্গত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা দেয়। কুরআন পরিষ্কার ও নির্দিষ্ট বিধান দেয়, যা যুক্তিসঙ্গত। আর আপনি দেখতে পারেন, যদি সমাজ এই বিধানগুলো মেনে চলে, তাহলে সমাজের জন্য স্পষ্ট উপকার হবে। যখন ইসলামের বিধানগুলো মানা হয়, তার সুফল দেখা যায়; আর না মানলে ধীরে ধীরে বোঝা যায়, কীভাবে কিছু বিষয় সমাজে অনিষ্ট তৈরি করে। কীভাবে এসব বিধান না মানলে সমস্যা ও দুর্নীতি সৃষ্টি হয়। ইসলাম কীভাবে মানুষের সম্মান রক্ষা করতে চায়। কীভাবে পরিবারকে সুসংহত করতে চায়, যাতে মানুষ অপমানিত না হয় বা পরিত্যক্ত না হয়, এবং প্রত্যেকে তার ন্যায্য অধিকার পায়। এমন পরিষ্কার ও সহজ উপস্থাপন আমি অন্য কোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যে পাইনি। এত সুশৃঙ্খল ও সহজভাবে কোথাও বিষয়গুলো পাইনি। তারপর কী ঘটল যে আপনি শাহাদাহ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন?
শাহাদাহ নেওয়ার সময় আপনার অনুভূতি কেমন ছিল? সেই মুহূর্তগুলোতে আমাদের নিয়ে যাবেন? আমি ইউটিউবে কিছু বক্তৃতা দেখছিলাম, কিয়ামতের আলামত নিয়ে, অর্থাৎ শেষ সময় ও কিয়ামতের দিনের নিদর্শন নিয়ে। এসব দেখার পরই আমার হৃদয়ে ভয় প্রবেশ করলো যে, যেকোনো সময়, যেকোনো মুহূর্তে আমি মারা যেতে পারি। আর আমি কি এমন কোনো অবস্থায় মরতে চাই যেখানে আমি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অনুগত অবস্থায় নেই?
এই উপলব্ধিই আমাকে ইসলাম গ্রহণের দিকে নিয়ে যায়। আমরা নিজেদের ভুলিয়ে রাখি, মৃত্যুর কথা ভাবি না। কিন্তু সেই বাস্তবতা যখন আমাকে আঘাত করল, আমি বুঝলাম—এখনই করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুকে ফোন করে বললাম, ‘আজই আমি শাহাদাহ নিতে চাই।’ আর সময় নেই। সেই মুহূর্তে যখন বুঝলাম, আমি হয়তো আগামীকালই মারা যেতে পারি, এমনকি আজকের মধ্যেই মারা যেতে পারি। তখন ‘আগামীকাল’ বলে কিছু ছিল না, ‘পরে’ বলে কিছু ছিল না। আর দেরি নয় এক্ষুনি শাহাদাহ নিতে হবে। তাই আমি বন্ধুকে ফোন করলাম, সে আমাকে তার বাসায় যেতে বলল। তারপর আমরা তার এক পারিবারিক পরিচিতের কাছে গেলাম, যিনি মসজিদের ইমাম ছিলেন। তিনি এলেন, আর আলহামদুলিল্লাহ, আমি তাঁর কাছে শাহাদাহ নিলাম। আমরা শাহাদাহর অর্থও বুঝে নিলাম। আমি যখন শাহাদাহ পড়ছিলাম, ঘরে খুব অল্প কয়েকজন মানুষ থাকলেও আমার মনে হচ্ছিল ঘরটা যেন আমার চারপাশে সংকুচিত হয়ে আসছে। মনে হচ্ছিল, প্রচণ্ড এক ভার আমার ওপর চেপে আছে। কিন্তু যেই মুহূর্তে আমি বললাম, ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুল্লাহ।’ এই কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো, পৃথিবীর সব ভার আমার ওপর থেকে নেমে গেল। মনে হলো, আমার গুনাহের ভার সরে গেল। আমার দুশ্চিন্তাগুলোও যেন চলে গেল। এটা ছিল যেন এক ঝলক নির্মল বাতাস পাওয়ার অনুভূতি। যেমনটা আমরা বিমানের ভেতর থেকে বের হয়ে মুখে আবার সতেজ বাতাসের স্পর্শ অনুভব করি। শাহাদাহর পর ঠিক এমনই অনুভূতি হয়েছিল। আপনার ইসলাম গ্রহণে পরিবার ও আশপাশের মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল বিশেষ করে আপনার বাবা?
শুরুতে যখন আমি শাহাদাহ নিই, আমি জানতাম, বিষয়টা খুব কঠিন হবে। তাই প্রায় দুই বছর আমি ইসলাম গ্রহণ গোপন রেখেছিলাম। বাড়িতে আমি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বাইরে গিয়ে মসজিদে যেতাম, নামাজ পড়তাম, হয়তো পোশাকের ধরনও বদলে ফেলেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমার পরিবার জেনে যায়। আমার বাবা যেভাবে জানতে পারেন— একদিন আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম, তিনি আমার কোটের পকেটে একটি টুপি পেয়েছিলেন। তিনি বললেন, ‘এটা কী?
তুমি আমার পিঠে ছুরি মেরেছ। তুমি নিজের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। তুমি নিজের মানুষদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। এটা কোনভাবেই মানা সম্ভব না।’ তারপর অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি ও গালাগালি হয়। পরের তিন-চার বছরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে আরও খারাপ হয়, শেষ পর্যন্ত তা সহিংসতা ও অপমানেও গড়ায়। আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আগেই স্কুলে চলে যেতাম। আর বাড়ি ফিরতাম খুব রাতে, কখনো রাত ২টা বা ৩টায়, শুধু বাবাকে এড়িয়ে চলার জন্য। বাবার প্রতিক্রিয়ার মূল বিষয় ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চাপ, মানুষকে কীভাবে তিনি বোঝাবেন যে তাঁর ছেলে মুসলিম হয়ে গেছে। একসময় আবার বাবা আমার সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে তর্ক করতে চাইলেন। তখন আমি তাঁকে বসিয়ে বললাম, ‘দেখুন, আমি আমার বিশ্বাস ছাড়ব না। ইসলামও ছাড়ব না। তাই হয় আমাকে মুসলিম হিসেবে মেনে নিন, নয়তো আমাকে ছেড়ে দিন। আর আমিও আলাদা হয়ে যাব।’ সেদিনের পর আমরা আর এ নিয়ে তর্ক করিনি। তবে বাবা থেমে গিয়েছিলেন বলেই বাবার দিকের পরিবারের সবাই' থেমে গিয়েছিল—এমন নয়। আমার মামার জন্মদিনে একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন পুরো পরিবার জড়ো হয়েছিল। আমার মামা তখন আমার সঙ্গে খুব বন্ধুসুলভ আচরণ করছিলেন, আমাকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করানোর চেষ্টা করছিলেন। আমরা কিছু খাওয়া-দাওয়া করলাম। তারপর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, কিন্তু এমনভাবে ধরলেন যেন আমাকে হেডলকে আটকে রেখেছেন। তারপর সবার সামনে, পুরো পরিবারের সামনে, এক হাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস নিয়ে সেটা আমার ঠোঁটে ঠেলে দিলেন। বললেন, ‘খাও।’ আমি বললাম, ‘আমি অ্যালকোহল খাই না।’ তখন তিনি চিৎকার করে বললেন, ‘আরে খাও খাও, তোমার সমস্যা কোথায়?’ সেই মুহূর্তে যেন আমাকে সবার সামনে লজ্জা দিতে চাইলেন, বললেন, ‘একটু খেয়েই ফেলো।’ তখন আমি তাঁর হাত থেকে গ্লাসটি নিলাম, ফেলে দিইনি, কিন্তু জোরে টেবিলের ওপর রেখে দিলাম। বললাম, ‘আমি অ্যালকোহল খাই না। যে অ্যালকোহল খায়, সে শেষ পর্যন্ত নিজেকেই লজ্জায় ফেলে।’ আমি তাঁদের এটাই বলেছিলাম। পার্টির শেষে, তাঁরা যখন মাতাল হয়ে গিয়েছিলেন, হাঁটতে পারছিলেন না, নিজেদের গাড়িতেও উঠতে পারছিলেন না বা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছিলেন না, তখন আমি তাঁদের বললাম, যাকে আপনারা একটু আগে অপমান করছিলেন, সেই মানুষটাই এখন আপনাদের জন্য ট্যাক্সির ব্যবস্থা করছে। এ ধরনের ঘটনা আরও অনেকবার ঘটেছে, পরে আমার কাজিনদের সঙ্গেও। একবার আমাদের পারিবারিক জমায়েত ছিল, অনেক মানুষ ছিল সেখানে। আমি খুব তৃষ্ণার্ত ছিলাম, দিনটাও ছিল ভীষণ গরম। তখন আমার এক কাজিন উঠে দাঁড়িয়ে...
সবাইকে বলল, ‘আমি কিছু পান করতে আনতে যাচ্ছি, কারও কিছু লাগবে?’ একজন বলল, ‘আমার পেপসি লাগবে।’ আরেকজন বলল, ‘এটা’, কেউ বলল ‘পানি’। আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আমার জন্য একটু পানি আনবে?’ সে বলল, ‘তোমার জন্য অ্যালকোহল আনব, নয়তো কিছুই না।’ আমি বললাম, ‘আমার পানি চাই।’ আমি ভেবেছিলাম সে মজা করছে। তারপর সে চলে গেল, আবার যখন ফিরে এলো, সে সত্যিই আমার জন্য কোনো পানীয় আনল না। আমি শুধু ভাবছিলাম, এ কেমন উদ্ভট আচরণ?
আমার বাবার বড় একটি সমস্যা ছিল ইসলামকে তিনি যেভাবে দেখতেন, সেই ধারণাটি। তাঁর কাছে ইসলাম মানেই ছিল পাকিস্তানিদের ধর্ম। কিছুদিন আগে, হয়তো এক-দুই বছর আগে, আমি একটি DNA পরীক্ষা করিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, বাবার দিকের সবাই শুধু ভারতীয় বংশোদ্ভূত হবে। বাবার দিকের পরিবার অবশ্যই প্রধানত ভারতীয়, কিন্তু পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আরও বড় একটি অংশ আমার মনে হয় তাঁর DNA-র প্রায় ২৪ শতাংশ আফগানিস্তান থেকে এসেছে। আমি তাঁকে বললাম, ‘আসলে আপনি এতটা ভারতীয়ও নন।’ বরং আপনার DNA-র বড় অংশই ভারতের বাইরের। এর বড় একটি অংশ পাকিস্তানি ও আফগান উৎসের। তারপর আমাদের আমি আসলে মজা করে তাঁকে বললাম, ‘তাহলে কি কাবুলি পোলাও খেতে যাওয়া যায়?’ বললাম, ‘এটা তো এখন আমাদেরই খাবার।’ আপনি কি কখনো এমন কোনো অসাধারণ ঘটনার অভিজ্ঞতা পেয়েছেন যেখানে মনে হয়েছে, আল্লাহর সঙ্গে আপনার বিশেষ সংযোগ রয়েছে?
একদিন আমি বাড়ি ফিরছিলাম, হঠাৎ ভীষণ ভারী বৃষ্টি শুরু হলো। এমন বৃষ্টি ছিল, যারফলে ড্রেনও উপচে পড়ছিল। সব ড্রেন পানিতে ভরে উপচে পড়ছিল, আর রাস্তায়ও পানি জমে উঠছিল। পানি ফুটপাতের ওপর উঠে আসছিল। বৃষ্টি ছিল প্রচণ্ড। আমি তখন বাড়ি ফিরছিলাম, তারপর একটি দোকানের নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম, একটা সুপারমার্কেটের মতো জায়গা, যার সামনে এমন একটি ছাউনি বা বাধার মতো কাঠামো ছিল। আমি তার নিচে গিয়ে বৃষ্টি থেকে একটু আশ্রয় নিলাম। তারপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে দোয়া করলাম। প্রথমে আমি আল্লাহর কাছে চেয়েছিলাম, বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত যেন বৃষ্টিটা থেমে যায়। বললাম, ‘আমি আমার রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত বৃষ্টি কি থামিয়ে দিতে পারেন?’ জানি না কেন, এভাবে চাইতে আমার মনে হলো। তারপর আমি ছাউনির নিচ থেকে বের হলাম। দেখলাম, বৃষ্টি আর নেই। সম্পূর্ণ থেমে গেছে। আমি সেখান থেকে হেঁটে বাড়ির দিকে চললাম। পথটা প্রায় দেড় ঘণ্টার হাঁটা ছিল। আমি হাঁটতে হাঁটতে আমার রাস্তায় পৌঁছাতেই আবার হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। তবে সেটা ছিল শুধু হালকা কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি। আর যেই মুহূর্তে আমি বাড়ির দরজায় পৌঁছালাম, বৃষ্টি আবার ঠিক আগের মতো জোরে শুরু হয়ে গেল। যখন কোনো সমস্যা হয়, আল্লাহর সঙ্গে কথা বলুন যেভাবে একজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। এটা ভাববেন না যে সবসময় অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিক হতে হবে। হ্যাঁ, দোয়া করার সুন্নাহ পদ্ধতি আছে। কিন্তু কথা শুরু করার পর, মন খুলে বলুন। কারণ আল্লাহ কোনো ধারণামাত্র নন। আল্লাহ আপনাকে শুনছেন, আপনার কথা শুনছেন। ইসলামের আগের রিস আর ইসলামের পরের রিসের মধ্যে কী পার্থক্য দেখেন?
ইসলাম আমাকে আমার শক্তি ও গুণগুলোকে ভালো কাজে ব্যবহার করার ক্ষমতা দিয়েছে। আমি মানুষ হিসেবে বদলাইনি; আমার পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। এটা আমাকে এমন অনেক কিছু দিয়েছে, যা আমি আগে ভাবতেও পারিনি। আমি কথা বলতে পছন্দ করি। ইসলামের আগে মানুষ আমার কথা শুনতে চাইত না, আমার সঙ্গে কথা বলত না। এখন মানুষ আমার কথা শুনতে চায়। মানুষ আমাকে মসজিদে ডাকে তাদের সঙ্গে কথা বলতে। ইসলাম একজন মানুষকে মর্যাদা দেয়। আমি যখন অমুসলিম ছিলাম এবং সেকেন্ডারি স্কুলে পড়তাম, পরীক্ষার জন্য খুব একটা চেষ্টা করতাম না। পড়াশোনাতেও খুব একটা মনোযোগ দিতাম না। তখন যদি কেউ বলত, বড় হয়ে তুমি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, আমি বলতাম, আপনি বাজে কথা বলছেন। কিন্তু এখন যদি জিজ্ঞেস করেন, কীভাবে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন?
আমি বলব, ‘বি-ইযনিল্লাহ ভাই, ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া আমার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছিল।’ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়াও আমার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছিল। আমি যখন ডিগ্রি করছিলাম, তখন আমার দাদা মারা গেলেন, দাদিও মারা গেলেন। তখন কোভিডের সময় চলছিল, আমার ছেলের বয়স ছিল এক বছর। আমাকে চাকরিও করতে হতো, আবার আড়াই ঘণ্টা... কেমব্রিজ যেতে হতো, আবার আড়াই ঘণ্টা ফিরে এসে কাজও করতে হতো। আল্লাহ আমার জন্য বিষয়গুলো সহজ করে দিয়েছিলেন। ইসলামি জীবনযাপন গ্রহণ করা আপনার জন্য কতটা কঠিন ছিল? যেমন হারাম থেকে বেঁচে থাকা, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া। এসব কি আপনার জন্য কঠিন ছিল, অথবা সারাদিন রোজা রাখা?
আমি বলব, রোজা ও নামাজ আমার জন্য কঠিন ছিল না। আসল চ্যালেঞ্জ হলো পরিবেশ। আপনি যদি এমন মানুষের সঙ্গে থাকেন, যারা সবসময় আপনাকে হারামের দিকে ডাকে, তাহলে কী হবে? স্বাভাবিকভাবেই ভুল করার ঝুঁকি বাড়বে, এবং আপনি সেই কাজগুলো করে ফেলতে পারেন। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সন্তুষ্টির জন্য যখন আপনি নিজেকে সেই পরিবেশ থেকে সরিয়ে নেন, তখন সেই চক্র থেকে বের হতে পারেন। একই সঙ্গে বলব, কেউ রাতারাতি বদলে যায় না। আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো হলো ভালো সঙ্গ বেছে নেওয়া। কারণ এই মানুষগুলো আপনাকে সাহায্য করবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে?
আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে তাঁর নেতৃত্বের ধরন। আপনি এমন একজনকে দেখেন যিনি কোমল, সবার খোঁজ রাখেন। আপনি এমন একজনকে দেখেন, যিনি মানুষের পাশে থাকেন। তিনি সবসময় মানুষের দিকে লক্ষ্য রাখতেন... এবং ভাবতেন, ‘আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি? তাদের কী প্রয়োজন?’ তারা কী নিয়ে সংগ্রাম করছে? তিনি মানুষের প্রয়োজনের দিকে তাকাতেন, তাদের চাওয়া এবং কীভাবে তাদের সাহায্য করা যায়—সেদিকে নজর দিতেন। এটাই ছিল তাঁর নেতৃত্বের ধরন। কিন্তু এই কোমলতার পাশাপাশি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। একটি হাদিসের কথা মনে পড়ে, যেখানে বলা হয়েছে...
মদিনার প্রান্তে হঠাৎ একটি শব্দ শোনা গিয়েছিল, মনে হয়েছিল, হয়তো কেউ তাদের ওপর আক্রমণ করতে এসেছে। জোরে শব্দ ও ধাক্কার আওয়াজ শোনা গেল। তখন সাহাবিরা দ্রুত বর্ম পরে বেরিয়ে পড়লেন। কিন্তু তাঁরা যখন বাইরে যাচ্ছিলেন, ততক্ষণে দেখলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ একাই ফিরে আসছেন। তিনি আগেই একা গিয়ে দেখে এসেছেন, আর ফিরে এসে বললেন, কিছু হয়নি। সব ঠিক আছে, আমি দেখে এসেছি। আপনারা ফিরে গিয়ে ঘুমাতে পারেন। আমার কাছে এটাই প্রকৃত পুরুষত্ব ও নেতৃত্বের ভারসাম্য—কোমল হওয়া, ভালোবাসাপূর্ণ ও যত্নশীল হওয়া, কিন্তু একই সঙ্গে সাহসী ও নীতিতে দৃঢ় থাকা। যদি পৃথিবীর সব অমুসলিমের সঙ্গে এক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন, তাহলে আপনি কী বলতে চাইতেন? আমাদের সবারই এক মুহূর্ত থেমে একটি সহজ প্রশ্ন করা দরকার। ‘আমি আজ যা বিশ্বাস করি, সেটা কেন বিশ্বাস করি?
আমি কি খ্রিস্টান শুধু এই কারণে যে আমার বাবা-মা খ্রিস্টান? আমি কি শিখ শুধু এই কারণে যে আমার বাবা-মা শিখ? আমি কি হিন্দু শুধু এই কারণে যে আমার পরিবার হিন্দু? আপনি যে ধর্ম ও ঐতিহ্যগুলো অনুসরণ করছেন, সেগুলোর পেছনে আসল কারণ কী? যেগুলোর প্রতি আপনি এত দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ?’ কারও জন্য এটা সহজ নয় শুনতে যে সে ভুল, বা নিজের বিশ্বদৃষ্টি ভুল—এটা মেনে নিতে। বরং এটা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি, কারণ এতে অহংবোধে আঘাত লাগে, কারণ তখন নিজেকেই বলতে হয়, পৃথিবী সম্পর্কে আমার ধারণা ভুল ছিল। কিন্তু এক মুহূর্ত থামুন। মিথ্যার মধ্যে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্যকে জানা কি ভালো নয়? সবচেয়ে লজ্জার বিষয় কোনটা? মিথ্যার মধ্যে বেঁচে থাকা, নাকি অহংয়ে সামান্য আঘাত মেনে নিয়ে নিজের বিশ্বদৃষ্টিকে প্রশ্ন করা ও সত্য গ্রহণ করা?
কুরআন পড়ুন। আল্লাহ মানবজাতির কাছে কী চান, তা পড়ুন। হিদায়াতের বাণী পড়ুন। আল্লাহ আপনার কাছ থেকে কী চান তা পড়ুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন পড়ুন। আর আপনার প্রশ্ন থাকলে, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আলোচনায় আসুন। নিজেকে চ্যালেঞ্জ করুন, দেখুন এই ধর্ম আসলে কী বলে? অন্তত আপনি বুঝতে পারবেন ইসলাম কী। আপনিও কি ইসলাম গ্রহণ করেছেন, কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না? কিংবা, হয়তো আপনি সারাজীবন মুসলিমই ছিলেন, কিন্তু নতুনভাবে শুরু করে একদম শুরু থেকে ইসলামকে জানতে আগ্রহী?
ঠিক এই কারণেই আমরা Step Islam অ্যাপটি তৈরি করেছি। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি এবং বিজ্ঞাপনমুক্ত একটি অ্যাপ, যা আপনাকে ইসলাম শেখায় পরিষ্কার ও সাজানোভাবে। আপনি সহজেই ঈমানের মূল ভিত্তি, কুরআনের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা শিখতে পারবেন, আর নিজের গতিতে এমন বাস্তবসম্মতভাবে কাজগুলো সম্পন্ন করবেন, যেন আজীবনের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। শয়তানকে সুযোগ দেবেন না, যেন সে আপনাকে এটি পিছিয়ে দিতে পারে। নিচের লিংকে ক্লিক করুন, Step Islam ডাউনলোড করুন, আর আজই চিরস্থায়ী সুখের পথে আপনার প্রথম পদক্ষেপ নিন।